অপেক্ষা

কাশিমপুর কারাগার-২। গেটে বড় বড় করে লেখা, ”রাখিব নিরাপদ দেখাব আলোর পথ”। এই কারাগারের বাইরে সাক্ষাৎ  প্রার্থীরা অপেক্ষা করছে। ভিতরে, এই কারাগারের উঁচু, অপ্রতিরোধ্য দেওয়াল বেষ্টিত স্থানে তাদের প্রিয়জনরা এতক্ষণে জেনে গেছে বাইরে তাদের জন্য তাদের নিকটজনেরা অপেক্ষা করছে। এই সাক্ষাৎ প্রার্থীদের মধ্যে একটি মেয়ে নাম এন্ট্রি করে রাস্তার পাশে সরু দুই ইটের গাঁথুনির ওপর বসে অপেক্ষা করছে। আগের ব্যাচ এর দর্শনার্থীরা বের হওয়ার পর কয়েদিদের সংখ্যা গণনার জন্য কিছুক্ষণের বিরতি তারপর আবার গেট খোলার অনুমতি মিলবে দুপুর সাড়ে বারোটায়।

সাড়ে বারোটা আর কতক্ষণ বাকি? মেয়েটি একবার ঘড়ির দিকে তাকাল, এখন মাত্র সাড়ে এগারোটা বাজে, সাড়ে বারোটা বাজতে আরো এক ঘণ্টা বাকি। আশেপাশে আরো অনেক দর্শনার্থী আছে তারাও সবাই অপেক্ষা করছে কিন্তু তারা কখনো কখনো চিনাবাদাম, চানাচুর খাচ্ছে, পরস্পরের মধ্যে কথাবার্তা বলে অপেক্ষার এই দুর্বিষহ সময় পাড়ি দিচ্ছে, কিন্তু তারা যেন একেবারেই স্বাভাবিক, যেন এই জায়গাটা তাদের অনেক পরিচিত। কারারক্ষীদের কেউ কেউ তাদের পরিচিত বলে মনে হলো। হুম্‌ সত্যিই তো, কারো কারো কারা রক্ষীদের সঙ্গে সখ্যতাও গড়ে উঠেছে। কারাগারে ঘন ঘন আসা কিংবা কারা রক্ষীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠার অর্থটা কি ভালো? গর্বের নাকি অপমানের?

অনেকক্ষণ বসে থাকার পর মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। এই ইটের গাঁথুনির ওপর বসে থাকতে থাকতে তার কোমর ব্যথা হয়ে গেছে। সে মাথা নিচু করে কয়েক পা হাঁটাহাঁটি করল। উঠে দাঁড়াবার আগে দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি মুছল, তার সঙ্গে থাকা ছোট হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট আয়না বের করে নিজের মুখ দেখল। আয়নায় নিজের চোখের প্রতিবিম্ব দেখে একরকম চমকে উঠল, অনেকক্ষণ থেকে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে পড়তে আর রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চোখ লাল হয়ে গেছে। সে ইটের গাঁথুনি থেকে উঠার আগে একবার ওড়না দিয়ে ভালোভাবে মুখ ঢাকল, কয়েক মিনিট পায়চারি করল ধীর পদে, কোনদিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে, তারপর আবার আগে যেমন করে বসেছিল তেমনিভাবে বসে পড়ল।

হৃদয়ের জন্য এমনভাবে সে প্রায় দু’বছর থেকে অপেক্ষা করছে, না হৃদয় কোন নাম নয়, ছেলেটির পুরো নাম মাসুদুর রহমান। কোন একদিন আবেগের বশে সে তার এই মনের কোণে লালিত স্বপ্ন পুরুষটির নাম রেখেছে হৃদয়। সেদিন থেকে সে তাকে হৃদয় বলে ডাকে। হৃদয় যেন তারই হৃদয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশের নাম। তার হৃদয়ের একটি অংশই এখন কারাগারে, তার জন্য এই অপেক্ষা। মেয়েটি নিজেই জানে না কয়েক দিন, কয়েকমাস, কয়েকবছর নাকি সারা জীবন অপেক্ষা করতে হবে তাকে? একটা জীবন শেষ হতে আর কত সময় বাকি? সে মনে মনে তার বয়স হিসেব করল তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

এখনো কারাগারের মূল গেট খোলেনি। ভিতর থেকেই একজন কারারক্ষী জোরে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ফাঁসির আসামির সঙ্গে দেখা করবেন কে?

কারারক্ষীর কণ্ঠস্বরটা অনেকটা কর্কশ। যেন কথাতে কোন মাধুর্য নেই, হয়ত এখানে এটাই নিয়ম তাছাড়া একজন ফাঁসির আসামির আত্মীয়, তার সঙ্গে ব্যবহার বা মাধুর্যই হবে কেন? হাজার হলেও একজন ফাঁসির আসামির প্রিয়জন।

মেয়েটির বুকটা ধক করে উঠল। ফাঁসির আসামি! সেই সঙ্গে একটা ঘৃণাও মনের মধ্যে অনেকটা অংশে তিক্ততা শুরু হলো। এমন কী অপরাধ করেছে সে যার জন্য তার ফাঁসি হয়েছে? হবে কোন খুন বা আরো অনেক বড় অপরাধ, যাই হোক না কেন, যে এই অপরাধ করেছে সে মানুষ নয় অমানুষ। কিন্তু তারপরই মনের মধ্যে একটা সহানুভূতি সৃষ্টি হলো, তাইতো একজন জঘন্য অপরাধীকে, একজন অমানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সুস্থ চিন্তার বিবেকবান মানুষ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চিন্তা করে ঠাণ্ডা মাথায় অপরাধ প্রমাণ করে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছে। মেয়েটি একবার কারাগারের মূল গেটের ওপর লেখাটি পড়ল, ”রাখিব নিরাপদ দেখাব আলোর পথ”। তার মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্নের উদয় হলো, তবে কি একজন অপরাধীর জন্য মৃত্যুর দণ্ডই আলোর পথ? তার হৃদয়েরও কি ফাঁসি হবে? মেয়েটি আবার চোখ মুছল।

আচ্ছা তার হৃদয়ের কী হবে? হৃদয়ের কোন অপরাধ নেই, একটা মিথ্যা মামলায়, ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক হয়রানির মামলায় তাকে হাজতবাস করতে হচ্ছে। তবুও কম সময় না, এই হাজতেই তার দু’বছর কেটে গেল, এখনো বিচার শুরুই হয় নি। তারপর বছরের পর বিচার কাজ চলবে। কিন্তু বিচারে যদি  হৃদয়েরও ফাঁসি হয়, না, না তা হবে কেন? এমন কথা মনে পড়তেই মেয়েটি বুকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল।

হৃদয় তো সেরকম ছেলেই না। যে কী না একটা পিঁপড়া দেখলে ভয় পায়, একটা মুরগির রক্ত দেখলে যার শরীর শিউরে উঠে, সে মানুষ খুন করবে কীভাবে? কিন্তু একটা কথা মেয়েটির অন্তরাত্মাকে বার বার ক্ষতবিক্ষত করেছে, বার বার আতঙ্কিত করেছে, রাতের পর রাত চোখের পানি ঝরিয়েছে, সে কথাটা তার না, উকিলের। উকিল সাহেব তাকে বলেছিলেন, আসলে মামলা পরিচালনা হয় সাক্ষী-সাবুদের ওপর, অনেক জটিল ধারার মামলার আসামিও সাক্ষী-সাবুদের অভাবে পার পেয়ে যায় কিন্তু নিরপরাধ মানুষ? কোন নিরপরাধ মানুষ কি সাক্ষী-সাবুদের অভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় না? তারপর নিরপরাধ মানুষেরও ফাঁসি হয়? তাহলে তার হৃদয়ের কী হবে?

একজন কারারক্ষী কারাগারের মূল গেটের দিকে চাবি নিয়ে যেতেই সবাই গেটের দিকে ছুটে চলল। মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার চলায় কোন চাঞ্চল্য নেই। মুখের ওপর যেন গাঢ় কালো মেঘ। মূল গেট দিয়ে ঢোকার পর মোবাইলটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখল তারপর ব্যাগটা রাখতে হলো কারারক্ষীদের কাছে। ঢুকেই করিডোর টাইপের একটি লম্বা কক্ষ, সেই কক্ষটি আবার ইউ টার্ন নিয়ে আরেকটা কক্ষে ঢুকলো কিছুটা জিগজ্যাগ টাইপের। তারপর একটা কক্ষের বাইরে তাকে দাঁড়াতে হলো। এখানে অনেকেই এসেছে, তারা তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলছে কিন্তু হৃদয় এখনো আসেনি। তাকে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো তারপর হৃদয় বেরিয়ে এলো। মেয়েটির হৃদয়ের গভীর থেকে একটি করুণ শব্দ বেরিয়ে এলো, হৃদয়!

লম্বা এই করিডোর টাইপের কক্ষটিতে ততক্ষণে অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করছে। কেউ কেউ তার প্রিয়জনদের সাথে কথা বলতে শুরু করেছে আবার কেউ কেউ এখনো অপেক্ষা করছে, তাদের কৌতূহলী চোখ অপর প্রান্তের সেই দরজার দিকে। দেয়ালের একপাশে উন্মুক্ত পৃথিবী আর অপর প্রান্তে বন্দি খাঁচায় আবদ্ধ মানুষ মাঝখানে পুরু দেয়ালের মাঝে মাঝে ছিদ্রগুলোতে তিন স্তরের লোহার জালি। এই লোহার জালি ভেদ করে চলছে কথা আদান-প্রদান, সৃষ্টি হয়েছে একটা গুঞ্জনের। তাতেও যেন দুই প্রান্তের মানব-মানবীর কথা বলার বা শোনার কোন অসুবিধাই নেই। অসংখ্য কথার মাঝেও মেয়েটির কথা ঠিকই হৃদয়ের কানে পৌঁছেছে, তারপর হৃদয়ে, তারপর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দু’চোখের বৃষ্টিতে, নদী!

হৃদয়ের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দু’টো যেন কোটরের গভীরে ঢুকে গেছে। কয়েক মুহূর্ত কারো মুখে কোন কথা নেই।  বোবার মতো পরস্পরের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে, দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অঝোর ধারায় চোখের পানি। কেউ চোখের পানি মুছল না, যেন সেদিকে কারো খেয়াল নেই। নদী আগেও এখানে কয়েকবার এসেছে কিন্তু এভাবে তার চোখ দিয়ে বর্ষা নামেনি। হয়ত আজকেও নামতও না কিন্তু ঐ যে অপেক্ষার সময়ের সেই ফাঁসির আসামির ডাক তার সব এলোমেলো করে দিয়েছে।

নদীই প্রথমে কথা বলল, তার গলা যেন এখনো কাঁপছে, হৃদয় তুমি ভালো আছ?

মাসুদের কণ্ঠ বুজে আসছে তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। সে নদীর কথার উত্তর না দিয়ে দু’চোখ মুছে জিজ্ঞেস করল, আমার কথা থাক, তুমি তোমার কথা বলো? কেমন আছ তুমি?

নদী আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল, ভালো।

হৃদয় মাথা নেড়ে সায় দিল, হুঁম কেমন ভালো আছ তা তো বুঝি, কিন্তু কী করবো?

তুমি কবে এসেছ?

আজ সকালে।

নেমেই আমার সাথে দেখা করতে এসেছ? আজকের দিনটা রেস্ট নিয়ে আগামী কাল আসতে।

না, দিনাজপুর তোমাকে ছেড়ে মাসের পর মাস থাকতে পারি কিন্তু ঢাকা এসে তোমাকে না দেখে এই কয়েক ঘণ্টা থাকাও খুব কঠিন।

যাবে কবে?

নদী ডানে-বাঁয়ে মাথা বাঁকা করে বলল, যাব না।

যাব না মানে?

নদী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল তারপর রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, আমি একেবারে ঢাকা চলে এসেছি হৃদয়।

মাসুদের চোখে বিস্ময়, মানে?

হুঁম, আমি তোমাকে না জানিয়ে ঢাকায় একেবারে চলে এসেছি হৃদয়, আমাকে তুমি ক্ষমা করো।

কেন? এমন কী হয়েছে যে তুমি একেবারে ঢাকা চলে এসেছ? আবার আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছ?

ওখানে আর থাকা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই ঢাকা চলে এসেছি।

দিনাজপুরে তোমার বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, দিনাজপুরই তো তোমার সব। তারপরও দিনাজপুরে থাকা সম্ভব হচ্ছে না, মানে!

নদী মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল।

আর তুমি এভাবেই বা কথা বলছ কেন?

থাকা সম্ভব হচ্ছে না বলেই তো চলে এসেছি। আবার দিনাজপুর যাব একেবারে তোমাকে নিয়ে, ততদিন ঢাকায় থাকবো, আমার হ্যাজবেন্ড যেখানে আছে আমিও সেখানেই থাকবো।

মাসুদ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, তুমি কি তোমার হ্যাজবেন্ডের কাছে থাকতে পারছ?

কাছে থাকতে না পারি, ঢাকায় তো আছি। ঢাকায় থাকলে আমি মাঝে মাঝে তোমাকে দেখতে আসতে পারবো। অনেকক্ষণ তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারবো, এটাই আমার শান্তি, বলতে বলতে নদীর কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

মাসুদ অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, ঢাকা শহরে একা থাকবে কীভাবে? তোমার দিন চলবে কীভাবে?

নদীর মনে অনেক বল, অনেক আত্মবিশ্বাস, একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলবো, মেসে থাকবো আর সপ্তাহে একদিন করে তোমাকে দেখতে আসবো। তবু তো মনের কাছে একটা সান্ত্বনা যে আমি আমার হ্যাজবেন্ডের কাছে আছি।

কিন্তু তুমি কি জানো আমি কবে জেল থেকে ছাড়া পাবো? আদৌ জেল থেকে ছাড়া পাবো নাকি ফাঁসিতে ঝুলবো?

একদিন তো ছাড়া পাবেই, বলে নদীর বুকটা যেন আবার কেঁপে উঠল, কানের কাছে কারারক্ষীর কর্কশ কথাগুলো ভেসে এলো। সে নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করে বলল, তোমার সেই ছাড়া পাওয়া যতদিনই হোক ততদিনই আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো হৃদয়, তুমি কিচ্ছু ভেবো না।

না আমি চাই তুমি দিনাজপুর ফিরে যাও।

নদী মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কেন?

ঢাকা শহরে তুমি থাকতে পারবে না, এখানে তোমার মতো একা একজন মেয়ের টিকে থাকা কঠিন।

তুমি আমার ঢাকায় থাকাকে, আমার হারিয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছ?

না।

তো?

একজন কারারক্ষী মাসুদকে ভিতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এলো। মাসুদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ভাই প্লিজ আরেকটু সময় দিন।

কারারক্ষী কর্কশ কণ্ঠে ঠিক আছে তাড়াতাড়ি শেষ করুন বলে ভিতরে চলে গেল।

ঢাকা অনেক বড় শহর, এখানে কেউ কারো খোঁজখবর রাখে না, আবার যারা খোঁজখবর রাখে তাদের মনে কোন না কোন খারাপ উদ্দেশ্যে থাকে।

নদী অভিমানের সুরে বলল, হৃদয় আমি বুঝতে পাচ্ছি তুমি কী বলতে চাচ্ছ? তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, আমি তোমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবো।

মাসুদ যেন পাগলের মতো আচরণ করল, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, তুমি আমার মাথা ছুঁয়ে বলো তুমি ঠিক থাকবে? মাথা ছুঁতে না পারো এই লোহার খাঁচা ছুঁয়ে বলো, তুমি ঠিক থাকবে?

নদী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ছিঃ হৃদয় এভাবে বলতে হয় না। তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তুমি আমাকে বুঝতে পাচ্ছ না?

কারারক্ষী আবার মাসুদের কাছে এসে বলল, চলুন।

মাসুদ কারারক্ষীকে বলল, চলুন। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, তারমানে আমার মাথা ছুঁয়ে প্রোমিজ করার মতো মনোবল তোমার নেই।

কথাটা নদীর বুকে প্রচণ্ড আঘাত করল। তার বুক চিরে অষ্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো, কাছে এসো, কাছে এসো হৃদয় আমি তোমার মাথা ছুঁয়ে প্রোমিজ করছি, আর মাথা ছুঁয়ে প্রমিজ করতে না পারলে এই লোহার গ্রিল ছুঁয়ে প্রমিজ করছি। কিন্তু ততক্ষণে কারা রক্ষী মাসুদকে ভিতরের গেটের কাছে নিয়ে গেছে। ভিতরে ঢোকার আগে সে একবার নদীর দিকে ফিরে তাকাল, তার চোখে তখন নদীর প্রতি সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ঘৃণা।

দুই

মাসুদের চলে যাওয়ার কথা নদীর বার বার করে মনে পড়ছে। নদীকে দেখে সে প্রথমে খুব খুশি হয়েছিল, নদীর ভালোবাসার প্রশংসাও করেছিল উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে কিন্তু তার একেবারে ঢাকায় চলে আসাটা সে পছন্দ করে নি। নদীর এই একেবারে চলে আসাটাকে সে সন্দেহের চোখে দেখেছে, তাকে অবিশ্বাস করেছে। কিন্তু কেন? বিয়ের আগে নদী তো কোন দিন ঢাকায় আসেনি যে এমন কেউ আছে যার জন্য নদী ছুটে এসেছে। তার জীবনের এমন কোন ঘটনা নেই যে সে মাসুদকে বলে নি। তবে নদী ঢাকায় এলে সে অবিশ্বাস করবে কেন?

না মাসুদ হয়ত তাকে অবিশ্বাস করে নি, হয়ত সে বোঝাতে চেয়েছে ঢাকা শহরের গোলক ধাঁধাঁর কোন চক্করে পড়ে যাবে আর সে তখন নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু মাসুদ আসলে জানে না একা একটি মেয়ের জন্য শুধু ঢাকা কেন পৃথিবীর কোন জায়গায় নিরাপদ না, সবসময়, সবজায়গায় তাকে আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়। তবে কোথায় থাকবে নদী?

বিয়ের আগেও তার জীবনটা ছিল এখনকার মতোই। শৈশবে নদী খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। তার মা বলে হাঁটতে শেখার পর থেকেই সে নাকি ঘুমানোর আগে কোন দিন কোথাও বসে থাকে নি, শুধু হেঁটেছে। হাঁটতে শেখার শুরুতেই সে একবার বারান্দায়, তারপর আঙ্গিনায়, তারপর বান্ধবীদের সঙ্গে কোথায় কোন মেলা লেগেছে সেই মেলায়, কোন দিন বাড়ির সামনে খেলার মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় আর না হয় তার একটা ঠিকানা তো আছেই পূণর্ভবার ধারে।

দুই ভাইবোন, সবুজ আর নদী। সবুজ নদীর চেয়ে বছর তিনেকের বড়। হুমায়ুন সাহেব সরকারি চাকুরে, মনোয়ারা গৃহিণী। সকালবেলা বিছানা থেকে উঠেই মনোয়ারা তাড়া পড়ে যেত সবাইকে নিজ নিজ কাজে পাঠানোর জন্য নাস্তা তৈরি করার। হুমায়ুন সাহেব অফিসে চলে যেতেন, সবুজ আর নদী স্কুলে। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে সবুজ ক্রিকেটের ব্যাট নিয়ে বেরিয়ে পড়তো আর নদীও বেরিয়ে পড়তো তার বান্ধবীদের সঙ্গে। রাতে সবাই একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসতো। খুব সুন্দর সাজানো-গুছানো একটা সংসার ছিল তাদের, যেন সিনেমার একটা আদর্শ সংসারের মতো।

হুমায়ুন সাহেব খুব হিসেবি মানুষ ছিলেন। আর হিসেবি না হয়েই বা উপায় কী? একজন কম বেতনের সরকারি কর্মচারীর বেতনের সামান্য টাকা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন ছিল। হুমায়ুন সাহেবের প্রখর জীবনবোধের এটাও একটা কারণ। তিনি প্রায়ই বলতেন মানুষের জীবনটা ঠিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের মতো। কখনোই এক’শতে এক’শ মিলবে না। কখনো আংশিক আবার কখনোবা পুরোপুরি উল্টো। নদীও দেখেছে আসলে তার বাবা একজন সামান্য মানুষ হলেও তার এই দার্শনিকের মতো কথাটা তাদের জীবন-সংসারে মিলেছে একেবারে এক’শতে এক’শ।

নদীর বয়স তখন বারো কিংবা তেরো বছর। একদিন রেডিও, টি,ভি’তে ঘন ঘন ঝড়ের পূর্বাভাষ প্রচারিত হলো, বাড়তে থাকলো বিপদ সংকেতের নাম্বার এক, দুই, তিন, আরো, আরো বেশি…। এই ঝড়ের বিপদ সংকেত অনুযায়ী বাড়তে থাকলো দমকা হাওয়া, সমুদ্রের ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা। রাষ্ট্র যন্ত্রের সংশ্লিষ্ট অংশগুলো দীর্ঘদিন অলস সময় কাটানোর পর আবার সচল হলো, দ্রুত সমুদ্র উপকূল থেকে জানমাল নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হলো, প্রস্তুতি শুরু হলো দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার।

নদী তখন মা’র সঙ্গে তার খালার বাড়ি ভোলায়। হুমায়ুন সাহেব নিউ হোটেলের পাশের ফোন/ফ্যাক্সের দোকান থেকে টেলিফোনে বার বার খবর নিচ্ছেন, তার কণ্ঠে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা। মনোয়ারা হুমায়ুনকে আশ্বস্ত করছে, আমরা ঠিক আছি, তুমি জানো না আপারা তিনতলা বাসার দোতলায় ভাড়া থাকে। আমরা ঠিক আছি, তুমি আমাদের নিয়ে ভেবো না তো।

হুমায়ুন সাহেব রেগে গেলেন, তোমাকে এত করে বললাম, তাড়াতাড়ি চলে এসো, এসময়টায় ওই দিকে সাইক্লোন হয় জলোচ্ছ্বাস হয়, না তুমি আরো দু’য়েকদিন পর আসবে।

মনোয়ারা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল, আচ্ছা ঠিক আছে, ঝড় থামলেই আমরা চলে আসবো।

হুমায়ুন সাহেব উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, নদী কোথায়? কী করছে?

ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।

হুমায়ুন সাহেবের কণ্ঠে আবারো উৎকণ্ঠা, এই সাইক্লোনের দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে! ওকে ভিতরে ডেকে আনো।

আচ্ছা, বলে মনোয়ারা জোরে নদী বলে ডাক দিতেই নদী ভিতরে ঢুকলো।

তোর বাবার ফোন, তোর সঙ্গে কথা বলবে, বলে মনোয়ারা রিসিভারটা নদীকে দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে বলতে বেরিয়ে গেল, বড় আপার বাড়ি অনেক বছর পর এসেছি, ভাবলাম ‘’দিন থেকে যাই তাতে যেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল।

নদী রিসিভারটা কানের কাছে নিল, হ্যালো বাবা।

মা তোরা ঠিক আছিস তো? কোন অসুবিধা নেই তো?

বাবা আমরা ঠিক আছি তুমি চিন্তা করো না তো।

আমার খুব চিন্তা হচ্ছে রে মা, তুই আর বারান্দায় যাস না, ঘরে বসে থাক।

জি বাবা।

নদীর কৌতূহলী মন বাবার কথা মানলো না। আবার দক্ষিণ দিকের ঝুলন্ত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। না ভোলায় তো ঝড়ের তাণ্ডব নেই, তবে আকাশে মেঘ জমেছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণের মেঘটা বেশ তামাটে, একটু একটু বাতাস, তার সঙ্গে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা শুরু হয়েছে। নদীর আরো একটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করল কিন্তু মা আর খালার পীড়াপীড়িতে ভিতরে ঢুকলো। এখন বিকেল অথচ অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, যেন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। একটা তীক্ষ্ণ আলো সমস্ত পৃথিবীকে আলোকিত করল তার কয়েক সেকেন্ড পরেই প্রচণ্ড গর্জন করে বজ্রপাতের শব্দ হলো, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। সমস্ত শহরে একটা ভুতুড়ে অবস্থা, যেন ভোলা শহর একটা মৃত্যু পুরীতে পরিণত হয়েছে। সারারাত নদীর মা আর খালা নফল নামাজ পড়েছে, তসবিহ জপ করেছে, শহরের মসিজদগুলো থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। নদীও কানের কাছে ছোট রেডিও নিয়ে বার বার করে আবহাওয়ার খবর শুনছে।

কয়েক ঘণ্টা পর প্রচারিত হলো, ’’বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি গতি পরিবর্তন করে উড়িষ্যা উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে আগামী কাল সকালে উড়িষ্যা উপকুলে আঘাত হানতে পারে এসময় সমুদ্র উত্তাল থাকবে এবং উপকূলবর্তী জেলাসমূহে বৃষ্টিপাতসহ ঘণ্টায় সর্ব্বোচ্য ষাট কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কা আছে’’। নদী রেডিওটা নিয়ে তার মা’র কাছে গেল, মা শোনো, শোনো, ঘূর্ণিঝড় কেটে গেছে।

নদী সাউন্ড বাড়িয়ে দিয়ে তার খালাকে শোনালো। রেডিওর খবর শুনে তার খালা, আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।

আসলে হুমায়ুন সাহেব ঠিকই বলতেন জীবনটাও যেন ঠিক আবহাওয়ার সংবাদের মতোই। নদীর জীবনটাও ঠিক সেবারে উড়িষ্যা উপকুলে আঘাত হানার মতো। উড়িষ্যার সাধারণ মানুষ এবং ভারত সরকার যেমন আবহাওয়ার এই বৈরী পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের মতো প্রস্তুত ছিল না তেমনি নদীও তার জীবনে এমন একের পর এক দুর্ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

প্রথম দুর্ঘটনাটা ঘটল হুমায়ুন সাহেবের জীবনে। একদিন গভীর রাতে হুমায়ুন সাহেবের বুকে ব্যথা শুরু হলো। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় এ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে না নিতেই তিনি এপারের সমস্ত সুখ-দুঃখের হিসেব শেষ করে ওপারে পাড়ি জমালেন। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে অসহায় স্ত্রী মনোয়ারা যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল।

নদী তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী আর সবুজ সবেমাত্র এইচ.এস.সি প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাবার পেনশনের টাকা তুলতে প্রায় ছ’মাস সময় লাগলো। ততদিনে নদীর এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সে এস.এস.সি পাস করার পর কলেজ যাওয়া শুরু করল। নদী জানতো না তার জন্য আরেকটা ঝড় অপেক্ষা করছে।

নদীর নামটা রেখেছিল তার দাদু। পূণর্ভবা নদীতে তখন ভরা যৌবন, পূর্ণিমার চাঁদটাও যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে নদীতে, জোড়া নৌকায় গরু গাড়ী পারাপারের সময় নদীর পানির সঙ্গে নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে তখন যেন এক মধুর ধ্বনির তৈরি হয়েছে এমনি এক রাতে সেই অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে নদীর পানি আর পূর্ণিমার চাঁদের সঙ্গে যে নতুন সৌন্দর্যের যোগ হলো তা নবাগত এক শিশুর আনন্দের ক্রন্দন ধ্বনি। তার গায়ের রংটিও যেন মিশে গেছে আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ আর নদীর পানির সঙ্গে। নদীর দাদু, ঘাটে একটা ছোট্ট দোকান করতো, স্বল্প শিক্ষিত মানুষ। দোকানদারি আর ঘর-সংসার ছাড়া তার জীবনে আর কিছু ছিল না। তার জ্ঞানের পরিসীমাও ছিল পূণর্ভবার ঘাট, ছোট্ট দোকান আর সংসার এর মধ্যে সীমিত। চাঁদ আর নদীর সম্পর্কের কথা ভেবেই হয়ত স্বল্প শিক্ষিত মানুষটি তার স্ত্রীর কাছে নবাগত শিশুর আগমন সংবাদ দিতেই সে আনন্দের সাথে বলে ফেলেছিল, আমার এই নাতনির নাম আমিই রাখলাম, ’’নদী’’।

নদীর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার গায়ের রংটাও যেন আরো সুন্দর হয়েছে, শৈশবের ছিপছিপে শরীরে আরো মাংসের ভার বেড়েছে। নদী তখন ষোল/সতেরো বছর বয়সের আকর্ষণীয়, লাবণ্যময়ী এক তরুণী। কলেজ জীবনে প্রবেশের সাথে সাথে বন্ধু-বান্ধব বাড়তে শুরু করেছে, ভালোবাসার প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। কিন্তু নদীর চোখে এক রাশ স্বপ্ন, একদিন বড় হবে, অনেক বড়। লেখাপড়া শেষ করে একটা ভালো চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তার সেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা এই প্রথম হোঁচট খেল।

নদীদের বাড়ির সামনেই একটা মোড় পেরিয়ে তাকে কলেজ যেতে হয়। কলেজ যাওয়া-আসার পথে মোড়ে বখাটে ছেলেরা প্রায়ই তাকে বিরক্ত করে, প্রেমের প্রস্তাব দেয়, বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে। নদী মাথা নিচু করে কোনভাবে মোড়টা অতিক্রম করে, কোন দিন তার বান্ধবীর সঙ্গে যায়। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? একদিন এক ছেলে তো একেবারে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে নদীর সামনে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেম নিবেদন করল, হ্যালো নদী আমি তোমাকে ভালোবাসি, আই লাভ ইউ।

নদীর মন ঘৃণায় ভরে গেল। তার বুক ফেটে কান্না এলো। এই ছেলেটিকে সে চেনে, দু’বার এস.এস.সি ফেল করে এখন এই মোড়ে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো কখনো রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে যায়। এই উনিশ/বিশ বছর বয়সে মুখের চেহারাটা কর্কশ, চোয়াল দু’টো বসে গেছে। ছেলেটি জিন্সের প্যান্টটা হাঁটুর কাছে ছিঁড়ে গেছে, গায়ের গেঞ্জিটাও যেন জীর্ণ। নদী কী করবে ভেবে পেল না। নিজের অজান্তে দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

সঙ্গে নদীর বান্ধবী রিয়াও ছিল। সে একবার রিয়ার দিকে তাকিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, তুই যা রিয়া আমি আর আজ কলেজ যাব না।

তুই না গেলে আমিও যাব না, বলে দু’জনে বাসায় ফিরে এলো।

বাসায় ফেরার পথে আগে রিয়ার বাসা। রিয়া একরকম জোর করে নদীকে তাদের বাসায় নিয়ে গেল। রিয়ার মা রিয়াকে কলেজ থেকে ফিরে যাওয়া দেখে কী যেন বলতে যাচ্ছিল কিন্তু নদীর মুখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। নদীর গণ্ডদেশ বেয়ে চোখের পানি ঝরে পড়ার দাগ তখনো শুকায় নি।

রিয়ার মা রিয়াকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে রিয়া?

রিয়া কিছু বলল না। সে নদীকে তার ঘরে নিয়ে গেল। তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে তার মায়ের কথা উত্তরে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। রিয়ার মা সবকিছু শুনে বলল, এটা তো খুব খারাপ কথা। বখাটে ছেলেরা মহল্লার মোড়ে দাঁড়িয়ে স্কুল-কলেজ যাওয়ার পথে মেয়েদের উত্যক্ত করবে আর মেয়েরা স্কুল-কলেজ যাওয়া বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকবে?

রিয়ার ভাই মাসুদ তখনো ঘরে শুয়েছিল। রিয়া যখন তার মাকে নদীর উত্যক্ত হওয়ার কথা বলছিল তখন সে বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করে সব শুনছিল। এবার সে তার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এলো, কোন ছেলে তোদের ডিস্টার্ব দিয়েছে রে?

ভাইয়া ছেলেটার নাম ছোটন, রিয়া বলল।

ছোটন, না? আচ্ছা আমি দেখছি। নদী কোথায়?

আমার ঘরে।

তুই একটু নদীকে আমার সামনে ডাক দে তো।

রিয়া তার ঘরে গিয়ে নদীকে আসতে বলল কিন্তু নদী এলো না, সে বালিশে মুখ গুঁজে শুধু কাঁদছে।

রিয়া বেরিয়ে এলো, ভাইয়া ওর মনটা খুব খারাপ এখন আসবে না।

আচ্ছা থাক আসতে হবে না, আমি যাচ্ছি বলে সে উঠে দাঁড়াতেই নদী বেরিয়ে এলো, দু’চোখ মুছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, না আপনি যাবেন না।

মাসুদ জিজ্ঞেস করল, কেন?

নদী মাসুদের কথার কোন উত্তর দিল না চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

মাসুদ আবার জিজ্ঞেস করল, নদী আমাকে যেতে নিষেধ করছ কেন? নাকি তোমার দিক থেকে-

নদী মাসুদের কথার প্রতিবাদ করল, না আমার দিক থেকে কিছু নেই।

তো?

নদী মাসুদের কথার উত্তরে বলল, এখন না হয় আপনি শাসন করবেন কিন্তু যখন আপনি থাকবেন না তখন কী হবে?

তখন কী হবে মানে?

রিয়া বলল, ভাইয়া নদী বলছে তুমি তো ওদের শাসন করেই চলে গেলে তারপর ওরা যদি নদীকে কিছু করে, যদি আমাকেও-

মাসুদ প্রচণ্ড রেগে গেল, তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, তোরা প্রতিবাদ করিস না দেখে ওরা তোদের সাথে এমন ব্যবহার করার সাহস পায়, বুঝলাম নদীর সাথে ছোটনের কোন সম্পর্ক নেই, এরকম একটা ফুটপাথের ছেলে যখন নদীকে প্রেমের প্রস্তাব দিল তখন নদী ওর গালে একটা ঠাস করে চড় মেরে দিল না কেন? আর তুই বা কী করছিলি? নদী না হয় নার্ভাস হয়ে পড়েছিল তুই তো সুস্থ ছিলি, তুই তো একটা থাপ্পড় দিতে পারতিস। নিজেরাও প্রতিবাদ করবি না আর আমাকেও শাসন করতে দিবি না, আমি চুপ করে থাকবো, না? আমি গেলাম আমি এর একটা বিহিত করে ছাড়বো, শুধু তাই নয় আমি কথা দিচ্ছি ওরা আর কোনদিন তোদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহসও পাবে না বলে মাসুদ আর পিছনে ফিরে তাকাল না। নদী একবার ডাক দিল কিন্তু নদীর কথা যেন হৃদয়ের কানেই গেল না।

তিন

সেদিনের পর থেকে ছোটন এবং তার দলবলের মোড়ের আড্ডাটা একরকম বন্ধ হয়ে গেছে। নদী নিজ মুখে সেদিনের ঘটনাটা তার মাকে বলে নি কিন্তু এই মহল্লার কোন কথাই যেন গোপন থাকে না। তেমনি নদীকে উত্যক্ত করার ঘটনাটাও তার মায়ের কানে গেছে, শুনে প্রথমে তো মনোয়ারা বুকে একটা ধাক্কা খেল, তারপর যখন শুনল মাসুদ ছোটনকে ধমক দিয়ে শুধু নদীকে উত্যক্ত করার প্রতিশোধ কেন মোড়ের আড্ডাটাও গুঁড়িয়ে দিয়েছে তখন তার মনের মধ্যে মাসুদের প্রতি কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি একটা আনন্দের অনুভূতিও তৈরি হলো।

রিয়া-দের বাড়ি থেকে যে রাস্তাটা সোজা পশ্চিম দিকে পূণর্ভবার দিকে চলে গেছে সেই রাস্তা দিয়ে কয়েক’শ ফুট পরেই নদী-দের বাড়ি। কলেজ বন্ধ থাকলে কিংবা দু’য়েকদিন নদীর সঙ্গে দেখা না হলে রিয়া একবার না একবার যাবেই নদীর সঙ্গে দেখা করতে, শুধু তাই নয় আজকাল প্রায় দিনই মাসুদও রিয়াকে নদীর কথা জিজ্ঞেস করে। নদীর প্রতি মাসুদের এই জিজ্ঞাসা কী দায়িত্ববোধ না অন্যকিছু!

নদী আর রিয়া প্রতিবেশী, আগে থেকেই জানাশোনা আছে, দু’জনে আলাদা দু’টি প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভ পাস করে যখন দিনাজপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে ভর্তি হলো তখন তাদের মধ্যে যেন একটা গাঢ়, গভীর অকৃত্রিম বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি হলো। নদী প্রায়ই রিয়া-দের বাড়িতে আসতো রিয়াও কোন নোট বা সাজেশন নিতে নদী-দের বাড়িতে আসতো, এই দুই বাড়ির যাতায়াত খুব স্বাভাবিক হলেও ক’দিন আগেও সম্পর্কটা প্রতিবেশী ভাইবোন হিসেবেই ছিল কিন্তু এই বখাটে তাড়ানোর পর থেকে সম্পর্কটা যেন একটু অন্যরকম বাঁক নিয়েছে। আগে নদী যেমন মাসুদকে বাসায় দেখলে নিজেকে একটু আড়াল করে ফিসফিস করে রিয়ার সঙ্গে কথা বলে চলে আসতো এখন আর তেমনটি নেই, এই চাপাস্বরে, কম্পিত কণ্ঠে কথা বলার জড়তাটা কাটিয়ে মনের মধ্যে একটু সাহস সঞ্চয় করেছে। মাসুদও আগে নদীকে রিয়ার সঙ্গে বাসায় আসতে দেখলে কোন না কোন অজুহাতে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়তো অথবা তার রুমে গিয়ে টি.ভি দেখতো এখন আর সেরকম দেখা যায় না।

সেদিন নদী গিয়েছিল রিয়ার কাছে, মাসুদ নদীর গলার স্বর শুনতে পেয়েই রিয়ার রুমের দরজার প্রায় কাছাকাছি এসে নদীকে শুনিয়ে শুনিয়ে রিয়াকে জিজ্ঞেস করল, এই রিয়া নদী এসেছে নাকি রে?

জি ভাইয়া।

মাসুদের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই নদীর বুকটা যেন কেমন করে উঠল, সে রিয়ার রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই মাসুদের চোখে চোখ পড়ল, তার হৃৎপিণ্ডে স্পন্দন বেড়ে গেল।

মাসুদ জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ নদী?

নদীর কণ্ঠস্বরটা একটু আবেগ জড়ানো, জি ভালো।

আগের দিনে যখন তাদের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক বয়োজ্যেষ্ঠ আর কনিষ্ঠ’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তখন হলে নদীর গলার স্বরটা কেঁপেই উঠতো না, এই জি বলার সঙ্গে ভাইয়া কথাটিও যুক্ত থাকতো।

মোড় পার হতে আর কোন সমস্যা নেই তো? মাসুদ জিজ্ঞেস করল।

না।

মাসুদের মুখে একটা দুষ্টামির হাসি, ওদেরই বা দোষ কী? এমন-কথাটা বলতে গিয়ে মাসুদ কী যেন বলতে যাচ্ছিল কিন্তু চোখের সামনে তার মায়ের শাড়ির আঁচলের কোনা পড়ল। ওমনি সে যেন কথাটা ঘুরিয়ে নিল। আর ডিস্টার্ব না করলেই হলো, করলে আমাকে বলবে।

মাসুদের মা বিষয়টি বুঝতে পেরেছে, মাসুদের এমন কথাটা বলার পরের কথাটা যে তারই সৌন্দর্যের প্রশংসা করতো সে চলে আসায় ছেলেটি প্রসঙ্গ ফিরিয়ে নিল একথা বুঝতে পেরে সে একটা মুচকি হাসি হেসে চলে গেল।

না নদীর সঙ্গে মাসুদের সম্পর্কটা এখন আর শুধু প্রতিবেশী ভাইবোরেন মধ্যে সীমাবদ্ধ না, হয়ত অন্যকিছু। অনেকটা হৃদয়ঘটিত। তাই এই টানটা, এই অনুভূতিটা শুধু মাসুদের হৃদয়ে না, নদীর হৃদয়ের মাঝে মাঝে ঝড় তোলে। নদী মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। সোজাসুজি কিছু বলতেও পারে না। কলেজ যাওয়ার পথে কিংবা রিয়া তাদের বাড়ি এলে একটু কৌশলে ঠোঁটের কোণায় একটা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে, মাসুদ ভাই চলে গেছে নাকি রে?

কোথায় যাওয়ার কথা আমি জানি না তো।

ঢাকা যাওয়ার কথা না?

কই আমি জানি না তো, তুই জানলি কী করে?

নদী কিছুটা লজ্জা পেল।

হুঁম, ভিতরে ভিতরে অনেকদূর এগিয়েছিস।

যাহ্‌ তোকে জিজ্ঞেস করেই ভুল করেছি।

জি, তারচেয়ে তুই নিজেই ফোন দিলে পারতিস, তোকে তো মোবাইল নাম্বার দিয়েছে, আর তুইও তো কথা বলিস।

নদী কোন কথা বলল না, তার মুখের ওপর একটা হাল্কা আভা ফুটে উঠল, সে মনে মনে বলল, তুই তো আমার মনের কথাটাই বলেছিস।

নদী আর কথা বাড়ালো না।

সেদিনের পর থেকে মাসুদের সঙ্গে নদীর প্রায় দিনই মোবাইলে কথা হতো। যেন কথার শেষ নেই। কথা বলতে শুরু করলে চলতে থাকে অনেকক্ষণ। কয়েক দিন পর মাসুদের সঙ্গে দেখা হলো তাদের বাসায়। অবশ্য আজকাল নদী কখন কোথায় যায় তার আলাপ আগেই মাসুদের সঙ্গে হয়। নদী আসার আগেই সে মাসুদকে তাদের বাসায় আসার কথা বলেছে, মাসুদ প্রতিদিন এসময় বাসায় থাকে না। কিন্তু আজ কোথাও গেল না। বিকেলে নদীকে আসতে দেখে রিয়া একটু মুচকি হেসে বলল, কী ব্যাপার ভাইয়া? আজ তুমি বাইরে গেলে না যে?

রিয়া যে তাকে খোঁচা মেরে কথা বলেছে সেকথা সে বুঝতে পেরেছে। সে সরাসরি প্রতিবাদ করল না, কিছুটা লজ্জিত হলো বটে। আজ রিয়া নদীকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে গেল। মাসুদও বসল আরেকটা সোফায়। রিয়া আবার বেরিয়ে গেল, নদী বস আমি মাকে নাস্তা দিতে বলি।

রিয়া চলে গেলে মাসুদ প্রথমে কথা বলল, কেমন আছ নদী?

সোফায় বসতে গিয়ে নদী একবার মাসুদের মুখের দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়ল।

নদী কয়েক মুহূর্ত মাসুদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তার বুকের মধ্যে যেন একটা তোলপাড় শুরু হলো, মাসুদের মধ্যেও যেন একটা ঝড় শুরু হয়েছে, কেন এমন হচ্ছে? কেন? নদী জানে না কিন্তু তার মনে হচ্ছে তার বুকটা আজ যেন শূন্য হয়ে যাচ্ছে। মাসুদ দিনাজপুর থাকতে সবসময় তার মনে হতো সে একটা নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আছে, মাসুদ তাকে শক্ত হৃদয়ের বন্ধনেও আবদ্ধ করে রেখেছে। এই বন্ধন শুধু বখাটের উশৃঙ্খলতা থেকে তাকে আলাদা করে নি, সমস্ত পৃথিবী থেকে তাকে একটা আলাদা জগত দিয়েছে। এই জগত শুধু মাসুদ আর তার জগত। তাই মাসুদের চলে যাওয়ার কথা শুনে সে ছুটে এসেছে তাকে এক পলক দেখার জন্য, তার চোখে চোখ রেখে কথা উজাড় করে বলার জন্য কিন্তু একি? সে বলবে কী? তার কণ্ঠস্বর বুজে আসছে, ঠোঁট দু’টো শিথিল  হয়ে আসছে, নিজের অজান্তে দু’চোখ ছলছল করছে। নদী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, আপনি নাকি আজ চলে যাবেন?

নদীর কথা মাসুদের কানে যেতেই সে মুখ তুলে তাকাল, হুঁম।

আমি ভেবেছিলাম আপনি আরো ক’দিন থাকবেন।

কেন?

নদীর চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল, না এমনি বলছিলাম।

মাসুদের কানে এতক্ষণ নদীর আর্দ্র কণ্ঠের স্বর ভেসে আসছিল এবার তার মুখের দিকে তাকাতেই নদীর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া হৃদয়ের চোখে পড়ল।

মাসুদ এতক্ষণ নদীর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসেছিল এবার উঠে দাঁড়াল। তারপর দু’পা এগিয়ে গিয়ে নদীর অশ্রুসিক্ত মুখ উঁচু করে ধরে বলল, নদী!

নদী একবার তার হাত সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু ততক্ষণে আবেগে তার দু’চোখ বন্ধ হয়ে গেছে, তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। মাসুদ তার দু’চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিতে দিতে অষ্ফুটস্বরে বলল, নদী!

নদী দু’চোখ খুলে মাসুদের চোখে চোখ রাখল, হুঁম।

আরো আগে এলে না কেন?

নদী মাসুদের একথার কোন জবাব দিল না। সে মাথা নত করে কয়েক মুহূর্ত বসে রইল তারপর আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল, আপনি কবে আসবেন?

এবার বেশি দেরি করবো না।

তবু?

একটা নতুন চাকরি পেয়েছি, এবার গিয়ে আগের চাকরিটা ছেড়ে দিব তারপর নতুন চাকরিতে জয়েন করে ছুটি নিয়ে চলে আসবো।

আপনি আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে পারবেন না?

তুমি তো কেবল অনার্স ফার্স্ট ইয়ার, অনার্স শেষ হোক তারপর না হয় একটা ব্যবস্থা হবে।

আরো ওতো দিন।

কেন?

আমার আর লেখাপড়া করতে ইচ্ছা করছে না।

তো কী করবে?

মাসুদের একথার উত্তরে নদী মাসুদের মুখের দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল। বুকের ভেতর ঢেউটা যেন আবার তোলপাড় শুরু করল।

প্রথম যেদিন নদীকে বখাটেরা অপমান করেছিল সেদিন মাসুদ নদীকে অপমানের জন্য সে বখাটেদের শাসন করেছিল একটা দায়িত্ববোধ থেকে আর সে দায়িত্ববোধের তৈরি হয়েছিল তার ছোটবোন রিয়ার বান্ধবী হিসেবে, একজন প্রতিবেশিনী হিসেবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সে দায়িত্ববোধ সেখানে থেমে থাকে নি। দিনের পর দিন নদীর সঙ্গে কথা বলে তার মধ্যেও একটা ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল, সেদিনের দায়িত্ববোধটা ছিল কর্তব্য আর আজ নদীকে ছেড়ে যেতে তার যে কথাটা বার বার মনে হচ্ছে সেটা হলো হৃদয়ের টান। এতদিনে সেও নদীকে অন্তর থেকে অনুভব করছে আজ নদীকে ছেড়ে যেতে তারও খুব কষ্ট হচ্ছে। তাদের দু’জনের বিরহ বেদনায় ঘরের মধ্যে যেন একটা গম্ভীর, গুমোট হাওয়ার সৃষ্টি করেছিল। মাসুদ এই গুমোট ভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য নদীকে বলল, তাতে তোমার কোন অসুবিধা হবে না, বখাটে ছেলেরা আর কোন দিন তোমার দিকে তাকাবার সাহস পাবে না।

নদী আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল, আমি কি তাই বলেছি?

রিয়া নাস্তার ট্রে নিয়ে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আমি ভেবেছিলাম প্রগ্রেসটা শুধু মোবাইলে মোবাইলে কিন্তু এখন তো দেখছি…

মাসুদ রিয়ার কথার মাঝে বাধা দিল, রিয়া।

চলবে…

এই উপন্যাসটি পেতে আসুন, নওরোজ কিতাবিস্তন, স্টল নাম্বার-১৭২-১৭৩, অমর একুশে বইমেলা, ঢাকা।

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস
One comment on “অপেক্ষা
  1. Prodeep Roy says:

    খুব ভালো লাগলো। লেখা চালিয়ে যান প্লিজ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*