ছায়া পুরুষ


তন্দ্রা এটা চায়নি। সে জীবনটাকে সাজাতে চেয়েছিল নিজের মতো করে, তার স্বামী থাকবে, সংসার থাকবে, সন্তান থাকবে, এই সব নিয়ে সে একটা স্বর্গ রচনা করবে, স্বর্গ! সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়া করে স্বামীর জন্য নাস্তা তৈরি করবে, বাচ্চাকে স্কুল যাওয়ার জন্য কাপড়-চোপড় পরিয়ে দিবে। সবাই নিজ নিজ কাজে বেরিয়ে পড়ার পর সে সংসার গুছানোর কাজে লেগে যাবে। কাজ শেষে সবাই বাসায় ফিরবে, নীরব বাসা সরব হয়ে উঠবে, বাসা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠবে। তার এই চাওয়াটা বাড়তি কিছু না, সবাই যা চায় সেও তাই আশা করেছে। তার সেই আশা পূরণ না হওয়ারও কোন কারণ নেই। সে পেয়েছেও সবকিছু, স্বামী আছে, সংসার আছে, ছোট্ট ফুটফুটে সুন্দর একটা মেয়ে আছে। তাহলে নেই কী? প্রেম? ভালোবাসা? দাম্পত্য সুখ? সমস্ত কিছুর মধ্যে প্রাণের ছোঁয়া?
তন্দ্রা পারভেজের ভালো বন্ধু হতে চেয়েছিল, হতে চেয়েছিল ভালো প্রেমিক তারপর সারাজীবনের সঙ্গী। সবকিছুই হলোও ঠিকমতো কিন্তু যাকে নিয়ে এতকিছু ভাবনা, স্বপ্নের জাল তৈরি করা সেই মানুষটি বদলে গেল ক’দিনেই, তন্দ্রা অনুভব করল বন্ধু পারভেজ, প্রেমিক পারভেজ আর স্বামী পারভেজের মধ্যে তফাৎ অনেক। অনেকটা পরস্পর বিপরীত মেরুর তিন তিনটি আলাদা মানুষ।
পারভেজ যখন বন্ধু ছিল তখন তন্দ্রার মনে হতো পৃথিবীতে এত আপন মানুষ আর হয় না। যার সাথে সবকিছু শেয়ার করা যায়, পরামর্শ পাওয়া যায়, সহযোগিতা পাওয়া যায় এবং দুঃসময়ে পাশে পাওয়া যায়। এই সম্পর্কটাতে পারভেজ ভালো পারফরমেন্স দেখিয়েছে, বন্ধু হিসেবে পারভেজ যেন এক’শ তে এক’শ।
প্রেমিক পারভেজ ছিল আবেগপ্রবণ, একসময় তন্দ্রাকে সে এতো বেশি ভালোবাসতো যে তন্দ্রার মনে হতো পারভেজ তার জন্য সবকিছু করতে পারবে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী তরুণী, অঢেল অর্থ বিত্ত, বিষয়-সম্পত্তি সবকিছুই একদিকে ফেলে তন্দ্রাকে নিয়ে সে খোলা আকাশের নিচে যাযাবোরের মতো সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। পারভেজ করেছেও তাই।
তন্দ্রা যখন মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী তখন পরিচয় হলো পারভেজের সঙ্গে। তন্দ্রার ক্লাস ফ্রেন্ড মিতুর বড় ভাই পারভেজ। সেদিন দুপুর থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি, তন্দ্রা আর মিতু লবিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। বৃষ্টি ছাড়ারও কোন লক্ষণ নেই দেখে মিতু ফোন করল, হ্যালো ভাইয়া।
কী রে তুই কোথায়?
ভাইয়া ভার্সিটিতে আটকা পড়ে গেছি, তুমি একটা গাড়ি পাঠিয়ে দাও না।
গাড়ি পাঠাব, আমার ড্রাইভার তো ছুটিতে।
তাহলে তুমিই চলে এসো।
কিন্তু আমি তো এখনো লাঞ্চ করিনি, তোর কাছে যেতে আসতে আমার তো অনেক সময় লাগবে।
ভাইয়া প্লিজ!
ওকে তুই দাঁড়া আমি আসছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা গাড়ি লবিতে এসে দাঁড়াল।
মিতু তন্দ্রাকে জিজ্ঞেস করল, তন্দ্রা তুই কোথায় যাবি?
কলাবাগান।
আমার সঙ্গে আয়, আমি তো ধানমণ্ডি যাবো, তোকে লিভ দিব।
থ্যাঙ্ক ইউ মিতু।
পারভেজ গাড়ির দরজা খুলতেই মিতু আর তন্দ্রা গাড়িতে উঠল।
মিতু পরিচয় করে দিল, ভাইয়া এ হচ্ছে তন্দ্রা আমার ফ্রেন্ড আর তন্দ্রা আমার ভাইয়া।
তন্দ্রা সালাম দিল।
গাড়িতে আর কোন কথা হলো না।
বৃষ্টির মাত্রা যেন আরো বেড়ে গেছে, রাস্তায় তেমন যানজট নেই। গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে মিরপুর রোডের একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল।
মিতু জিজ্ঞেস করল, দাঁড়ালে কেন?
তোকে বললাম না আমার খিদে লেগেছে।
মিতু খুব খুশি হলো, ওয়াও তুমি লাঞ্চ করাবে।
তন্দ্রা মৃদু আপত্তি করল, আমি চলে যাই রে।
তুমি যাবে কীভাবে? এসো একসঙ্গে লাঞ্চ করি তারপর তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমরা চলে যাবো।
মিতু বলল, চল তন্দ্রা।
তন্দ্রা আর আপত্তি করল না।

সেদিন লাঞ্চের সময় তন্দ্রার সঙ্গে পারভেজের কয়েকবার দৃষ্টি বিনিময় হলো। ফাঁকে ফাঁকে দু’য়েকটা কথাও হলো, তোমাদের বাসা কোথায়? ভাইবোন ক’জন? তুমি কী পছন্দ করো? তোমার শখ কী? ইত্যাদি, ইত্যাদি। তন্দ্রা কথার উত্তর দিচ্ছিল। লাঞ্চ শেষে মিতু পারভেজকে খোঁচা মেরে বলল, ভাইয়া তুমি তো আমার ফ্রেন্ডের পুরো একটা ইন্টার্ভিউ নিয়ে নিলে, চাকরি দিবে নাকি?
মিতু বড়দের এভাবে কথা বলতে হয় না।
সরি ভাইয়া।
গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়ার সময় পারভেজ তন্দ্রাকে একটা ভিজিটিং কার্ড দিল। সেদিন কার্ডটা নিয়ে তন্দ্রা তার ব্যাগে রেখে দিয়েছিল। কয়েকদিন পর সেদিন রাতে ব্যাগে কী যেন খুঁজতে গিয়ে কার্ডটা তন্দ্রার হাতে উঠে এলো। তন্দ্রা কার্ডটা পড়ে দেখল, লেখা ছিল শওকত পারভেজ, ডাইরেক্টর ফাইন্যান্স। তারপর তাদের গ্রুপ অফ কোম্পানিজের নাম। পারভেজ কোম্পানির ফাইন্যান্স ডাইরেক্টর হলেও বয়সে তরুণ। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে এম.বি.এ পাস করে পৈত্রিক সূত্রে কোম্পানির ডাইরেক্টর হয়েছে কিন্তু চালচলনে এখনো ছেলেমানুষিই রয়ে গেছে। কথায় কথায় মিতু একবার বলেছিল পারভেজ তার চেয়ে মাত্র পাঁচ বছরে বড়। হ্যাঁ পারভেজের চালচলনেও তাই বোঝা যায়। তন্দ্রা কার্ড থেকে মোবাইল নাম্বারটা তার মোবাইলে সেভ করতে গিয়ে সুইচে টিপ পড়ল।
তন্দ্রা কিছুটা থতমত খেল। সঙ্গে সঙ্গে পারভেজ কল ব্যাক করল।
তন্দ্রা কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। পরপর দু’বার রিং হলো কিন্তু সে রিসিভ করল না, তৃতীয়বার তন্দ্রা রিসিভ করল, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। কে বলছেন প্লিজ?
সরি ভাইয়া আমি আসলে রিং দিতে চাইনি।
দিতে চাননি কিন্তু দিয়েছেন, নো প্রবলেম।
ভাইয়া আমি তন্দ্রা।
তন্দ্রা? তন্দ্রা?
মিতুর ফ্রেন্ড, সে-ই যে আপনি আমাদের লাঞ্চ করালেন, আমাকে লিভ দিলেন।
হ্যাঁ চিনতে পেরেছি, কেমন আছ?
জি ভাইয়া ভালো, আপনি?
আমিও ভালো আছি, তোমার লেখাপড়া কেমন চলছে?
এই তো মোটামুটি ভালো চলছে। আমি আশা করেছিলাম তুমি আরো আগে ফোন দিবে। এ্যানিওয়ে ফোন দিতে না চেয়েও যে ফোন দিয়েছ সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
না, আসলে আপনি অনেক বড় দায়িত্ব পালন করেন আর সবসময় ব্যস্ত থাকেন তো তাই ফোন দিই নি।
এখন থেকে ফোন দিবে।
আচ্ছা।
এসো না একদিন, আমার অফিসে।
জি ভাইয়া আসবো।

ক’দিন পরেই তন্দ্রা মিতুর সঙ্গে পারভেজের অফিসে গিয়েছিল, মিতু কিছুক্ষণ তন্দ্রার সঙ্গে পারভেজের টেবিলের সামনে বসেছিল। তারপর উঠে দাঁড়াল, তন্দ্রা তুই একটু বস, আমি আসছি।
তন্দ্রা একবার ডানে-বাঁয়ে তাকালো, আমিও যাই তোর সাথে। বলে তন্দ্রা উঠতে যাচ্ছিল।
পারভেজ বাধা দিল, বসো না।
মিতু তন্দ্রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, তুই বস রে। আমি একটু বড় ভাই’র সঙ্গে দেখা করে আসি। বলে মিতু উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেল।
তন্দ্রা মিতুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একবার পুরো চেম্বারটায় চোখ বুলালো।
পারভেজ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, কী দেখলে?
আপনার চেম্বারটা তো খুব লাক্সারিয়াস।
পারভেজ মৃদু হাসল।
এই অফিসে যদি আমি চাকরি করতে পারতাম!
তুমি চাকরি করবে?
হ্যাঁ।
আগে লেখাপড়া শেষ করো।
তন্দ্রা কিছু বলল না।
পারভেজ জিজ্ঞেস করল, তন্দ্রা কী খাবে, ঠাণ্ডা নাকি গরম?
মিতু কিছু বলল না।
পারভেজ বলল, তাহলে ঠাণ্ডা আনাই।
পারভেজ ইন্টারকমে দু’টা কোল্ড ড্রিঙ্কস এর অর্ডার দিল।
ড্রিঙ্কস খেতে খেতে দু’জনে অনেক কথা হলো। পারভেজ খুব সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারে, তার কথা বলার ভঙ্গিটাও অদ্ভুত, যেন একটা আকর্ষণ আছে। তন্দ্রা পারভেজ এর সঙ্গে যতই কথা বলছিল ততই মুগ্ধ হচ্ছিল।
কথায় কথায় পারভেজ বলেছিল, আমাদের পুরো ফ্যামিলিই বিজনেসম্যান।
কী প্রসঙ্গে যেন বলেছিল তন্দ্রার মনে নেই। আজ অনেকদিন পর তন্দ্রার মনে হলো সত্যি সত্যি পারভেজ বিজনেসম্যান, সারাদিন টাকার পিছনে ছুটোছুটি করে রাতে যাবে কোন কল গার্ল কিংবা সোসাইটি গার্লের কাছে এনজয় করতে, বাসায় বউ থাকবে যেন একটা সাইনবোর্ড, তার কোন স্বাধীন সত্তা থাকবে না, সারাদিন স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবে, কোনদিন ইচ্ছা হলে স্বামী ঘরে ফিরবে আর না হয় ফিরবে না। পারভেজের কাছে বউ একটা পণ্য ছাড়া বেশি কিছুই না। যখন ইচ্ছা ব্যবহার করবে, যখন ইচ্ছা করবে না আর তন্দ্রা পারভেজের অনেকগুলো পণ্যের মধ্যে একটা পণ্যে।

দুই

পারভেজ লম্বা, ফর্সা, সুঠাম দেহের অধিকারী, মাথার চুল সামান্য ঢেউ খেলানো, হাঁটার স্টাইলে একটা আর্ট আছে। পারভেজ যখন কথা বলে তন্দ্রা তখন তার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে, তার চোখের দিকে তাকাতেই তন্দ্রা যেন তার মাঝে হারিয়ে যায়। তার কথাবার্তায় যেন মাদকতা আছে, সে তার কথা দিয়ে তন্দ্রাকে মাতাল করে ফেলেছে। তার সমস্ত অস্তিত্বে, শিরায় শিরায় তখন শুধু পারভেজ।
তন্দ্রা তখন বাইশে পা দিয়েছে, সুন্দরী, লাবণ্যময়ী। তার জীবনে প্রেমের প্রস্তাব আসা শুরু করেছে সেই ষোল বছর বয়স থেকে, নিজের রূপ, লাবণ্যর জন্য তন্দ্রার একটা অহঙ্কার ছিল, সে কারণে হয়ত কারো সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া বাবা-মা তাকে খুব বিশ্বাস করে সে এতদিন তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে কিন্তু পারভেজের বিষয়টা সে কীভাবে উপস্থাপন করবে? বাবা, মা কী মনে করবে?
তন্দ্রাকে আর উপস’াপন করতে হলো না। তার রাত জেগে মোবাইলে কথা বলা, ভার্সিটি বন্ধ থাকলেও সারাদিন বাসার বাইরে কাটানো, চলাফেরায় চঞ্চলতা এসব পরিবর্তন দেখে বাবাই তাকে একদিন কাছে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকিস কেন রে মা? তোর কী রাতে ঘুম কম হয়? কোন ফ্রাস্টেশনে ভুগছিস?
না বাবা, আমার তো কিছু হয়নি।
তো।
বাবা বললাম তো আমার কিছু হয়নি।
কিছু তো হয়েছে, আমাকে বল আমি তো সিনেমার বাবাদের মতো স্বৈরাচারী বাবা না, আমি তোর বন্ধুর মতো, বলে তিনি হাসলেন।
বাবার কথায় তন্দ্রা যেন আশ্বাস পেল। সে পারভেজের সঙ্গে তার পরিচয় থেকে শুরু করে সব কথা খুলে বলল। সব শুনে বাবা কিছু বললেন না। তাঁর মুখের ওপর একটা কালো মেঘের ছায়া পড়ল। তিনি বললেন, তোকে একটা কথা বলি রে মা।
বলো বাবা?
আমার ভয় শুধু ওদের আভিজাত্য নিয়ে, তুই তো আমাদের অবস’া জানিস, পরে সে যদি তোকে অবহেলা করে।
না বাবা, করবে না, পারভেজ ওরকম ছেলেই না।

পরদিন তন্দ্রার যখন পারভেজের সঙ্গে দেখা হলো তখন তন্দ্রা তার বাবার আশঙ্কার কথা পারভেজকে বলামাত্র পারভেজ প্রচণ্ড রেগে গেল, তন্দ্রা তোমার কি আমাকে বিশ্বাস হয় না?
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা না।
তো কী? আমি বুঝতে পাচ্ছি আমাকে তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে চলো আমি আজই তোমাকে বিয়ে করবো।
তন্দ্রা তো অবাক, তুমি কি বলছ?
হ্যাঁ আমি ঠিকই বলেছি, আমি তোমাকে বিয়ে করবো।
হঠাৎ করে বিয়ের কথা আসছে কেন?
বিয়ের কথা আসছে আমার প্রতি তোমার বিশ্বাসের অভাব দেখে, আমি তোমাকে আজই বিয়ে করবো, তোমার কোন আপত্তি আছে?
তন্দ্রা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, বাবা-মা’কে না জানিয়ে আমি এভাবে বিয়ে করতে পারব না।
আমি পারব তো তুমি পারবে না কেন?
তন্দ্রা কয়েক মুহূর্ত পারভেজের চোখে চোখ রাখল, পারভেজের চোখে সরলতা। মনোবল দৃঢ়। তন্দ্রা অষ্ফুটস্বরে বলল, পাগলামি করো না তো।
পাগলামি না, আমি সত্যি সত্যি বলছি, চলো, এখনই চলো।
কোথায়?
কাজি অফিসে।
তন্দ্রা কোন কথা না বলে মাথা নত করে রইল।
পারভেজ আবার তাড়া করল, চুপ করে আছ কেন? তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
বাসি।
তো?
এখনি তো বিয়ের কথা ভাবি নি?
আমিও ভাবি নি কিন্তু এখন তো আর না ভেবে হচ্ছে না। তুমি ভয় পাচ্ছ? আমার ওপর ভরসা করতে তোমার ভয় হচ্ছে?
তন্দ্রা কোন কথা বলল না। পারভেজের চোখ থেকে চোখ নামিয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল।
পারভেজ রাগ করে তন্দ্রার হাত ছেড়ে দিল, বুঝেছি তুমি আসবে না। তবে থাকো আমি চলে গেলাম।
তন্দ্রা পারভেজের হাত টেনে ধরল, কোথায় যাচ্ছ?
পারভেজ আবার তন্দ্রার হাত ধরে একটা চাপ দিয়ে একটু হেসে বলল, কোথায় যাচ্ছি? আগে যাই তারপর বুঝতে পারবে।
যেখানে যাবে সেখানে আমাকেও নিয়ে চলো।
তাহলে আজই, এখুনি।
তন্দ্রা চুপ করে রইল।
পারভেজের যেই কথা সেই কাজ। দু’জনে যে অবস’ায় ছিল সে অবস’ায় কাজি অফিসে চলে গেল।
তন্দ্রাও আর কোনকিছু ভাবল না। তন্দ্রার মনে এখন নানান প্রশ্ন জাগে, সেদিনের কাজটা ঠিক হয়েছে কী না। সেদিন যদি একবার ভাবতো, আবেগপ্রবণ না হয়ে একবার যদি বাস্তববাদী হতো। আসলে তন্দ্রার অবস্থাটা হয়েছে গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করার মতো। আবেগে পড়ে, কারো কাছ থেকে বঞ্চনা, প্রতারণা এবং অবহেলা, জীবনের প্রতি চরম হতাশা কিংবা বিতৃঞ্চা থেকে মানুষ আত্মহত্যার করার জন্য গলায় ফাঁসি দেয় কিন্তু যখন মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হয়, বাস্তবে ফিরে আসে তখন মুক্তির জন্য পা ছুঁড়াছুঁড়ি করে। কিন্তু ততক্ষণে মুক্তির পথ বন্ধ হয়ে যায়। ছিঃ, তন্দ্রা কি তার সাথে পারভেজের প্রেমকে, বিয়েকে গলায় ফাঁস পরানোর সঙ্গে তুলনা করছে?
বাসর রাত হলো হোটেলে। কয়েক দিন কেটে গেল হোটেলেই তারপর পারভেজ তন্দ্রাকে নিয়ে উঠল বনশ্রী’র ভাড়া বাসায়। তারপর পারভেজ বাড়িতে গেল, যাওয়ার সময় তন্দ্রাকে বলে গেল সে আজকেই ফিরে আসবে। ফিরেও এলো, সঙ্গে মিতুও এলো, সে দুষ্টুমি করে বলল, ভাবী কোন চিন্তা করবেন না, আমি থাকতে আপনার কোন চিন্তা নেই।
তন্দ্রা মৃদু হেসে বলল, হ্যাঁ তোর ভরসাতেই তো-
মিতু মুখ বিকৃত করে বলল, হ্যাঁ এখন তো বলবেনই আমার ভরসাতে কিন্তু আসার আগে তো একবার বললেন না।
এই তুই কি আমাকে সত্যি, সত্যি ভাবী বলবি নাকি রে?
না, সিরিয়াসলি বলছি তুই আমার ফ্রেন্ড ফ্রেন্ডই থাকবি।
মিতুর সঙ্গে অনেক কথা হলো কিন্তু তার কথাবার্তায় হেঁয়ালিপনা, বাবাকে তো তুমি চেনো না, একেবারে সেই আগের দিনের সিনেমার স্বৈরাচারী বাবাদের মতো, তোর এতবড় সাহস আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করেছিস, আমি তোকে-মিতু নিজেই হেসে ফেলল, টেনশন করিস না, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
রাতে পারভেজ বলল, বাবা খুব রাগ করেছে, আমি চেষ্টা করছি, আরো আমাদের যারা আত্মীয়-স্বজন আছে তাদের দিয়ে ম্যানেজ করার, ক’দিন পরে বাবা শান্ত হলে, সিচুয়েশন ভালো হলে তোমাকে নিয়ে যাবে। ততদিন আমাদের এই বাসাতেই থাকতে হবে। বলে পারভেজ তন্দ্রার থুতনি উঁচু করে ধরে চোখে চোখ রেখে বলল, আমিও তোমার সঙ্গে আছি।
পারভেজের চেয়ে ভালো প্রেমিক আর কে হতে পারে?

তিন

আর স্বামী পারভেজ! যার মধ্যে বন্ধুত্বের কোন গুণ নেই। প্রেমিকের মতো কোন আবেগ নেই। প্রথম প্রথম যে দায়িত্ববোধ ছিল এখন তাও খুব একটা নেই। অল্প ক’দিনেই তন্দ্রার জীবনের বর্ণালী দিনগুলো বিবর্ণ হয়ে গেল। কয়েক বছরের মধ্যে আবিষ্কার হলো দায়িত্বহীন, বিবেকহীন, পরনারীতে আসক্ত চরিত্রহীন এক পুরুষ। স্বামী পারভেজ!
পারভেজ সেভাবে বাবা-মা’কে ম্যানেজ করার চেষ্টাও করছিল মিতু এবং তাদের অন্য আত্মীয়-স্বজনদের। যোগাযোগটা চলতে থাকলে একসময় হয়ত সবকিছু ঠিক হয়ে যেতে পারতো। পারভেজ তন্দ্রাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে উঠতো। শ্বশুর-শাশুড়ির যৌথ পরিবারে সবাই আছে অথচ পারভেজ তাকে আলাদা রেখেছে, বাড়ির বউ ভাড়া বাসায় থাকবে আর শ্বশুরের বাড়ি থেকেও সে বাড়িতে বউ থাকতে পারবে না এটা মাঝে মাঝে তন্দ্রার যেন কেমন লাগত। একটা প্রশ্ন মাঝে মাঝে তন্দ্রার মনকে খোঁচা দিত, আমি কি পারভেজের বউ নাকি অন্য কিছু?
তাই তন্দ্রা পারভেজকে বার বার তার বাবা-মা’র সঙ্গে তাদের বিষয়ে কথা বলতে বলে কিন্তু একসময় পারভেজ নিজেই যেন থেমে গেল। তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে বললে রেগে যেতো, এখানে তোমার কীসের অভাব? যৌথ পরিবারে নানান রকম প্রবলেমও আছে। একা আছ, ভালো আছ।
ভালো আছি নাকি মন্দ আছি সেটা তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমি বলছিলাম ছন্দার কথা, ও বড় হচ্ছে ক’দিন পর ও যখন দাদু-দাদির কথা জানতে চাইবে তখন আমি কী বলবো?
যখন জানতে চাইবে তখন দেখা যাবে।
তুমি যা-ই বলো না কেন তুমি দেখো আমি কোনদিন ছন্দাকে নিয়ে ওর দাদা-দাদির কাছে চলে যাবো।
পারভেজ যেন ফোঁস করে উঠল, না, এই কাজ কখনো করবে না।
কেন? তোমার সমস্যা কী? আমি যদি ছন্দার অজুহাতে সবাইকে ম্যানেজ করতে পারি?
সমস্যা আছে, আমি কখনো চাই না তুমি ওবাড়িতে যাও। তুমি যদি আমাকে না জানিয়ে কিংবা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাও তবে তোমাকে অনেক মূল্য দিতে হবে। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু বলবো না।
শুধু তাই নয় তার আচার ব্যবহারেরও আমূল পরিবর্তন হলো। বিয়ের পর প্রথম প্রথম পারভেজ অফিস শেষ করেই বাসায় ফিরতো। তন্দ্রাকে সময় দিতো, অফিস থেকে বের হয়েই তন্দ্রাকে ফোন করতো, তন্দ্রা রেডি থেকো আজ আমরা বাইরে যাবো। তন্দ্রা কাপড়-চোপড় পরে তৈরি থাকতো। পারভেজ আর উপরে উঠতো না। নিচে এসেই তন্দ্রাকে ফোন করে বলতো, নেমে এসো তন্দ্রা।
তন্দ্রা নিচে আসতো। যেদিন বাইরে যেতো সেদিন রাতের খাবার বাইরেই খেয়ে আসতো। ছুটির দিনে দু’জনে বেরিয়ে পড়তো ঢাকার বাইরে, সারাদিন দু’জনে ঘুরে বেড়াতো। এসব দিন এখন তন্দ্রার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হয়। মনে হয় কোন একসময় সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। বাস্তবে ফিরে এসে দেখছে আসলে সে কোনদিন সুখ পায়নি, সুখের স্বপ্ন দেখেছে মাত্র।
তারপর শুরু হলো পারভেজের দেরিতে বাসায় ফেরা। কত দেরিতে? তার কোন সীমা নেই। কোনদিন বাসায় ফেরে রাত দশটা, কোনদিন বারোটা আবার কোনদিন গভীর রাতে। এনিয়ে কোন কথা বললে পারভেজ রেগে যায়, আমি ব্যবসায়ী মানুষ, কাজের প্রয়োজনে বাসায় ফিরতে রাত হতেই পারে। এনিয়ে রাগ করলে তো চলবে না তন্দ্রা। তুমি একটু সেক্রিফাইজ করে, দেখ, ব্যবসা-বাণিজ্য বাদ দিয়ে পাঁচটা বাজলেই বাসায় ফিরতে হবে? তবে তো ব্যবসা-বাণিজ্য সব নষ্ট হয়ে যাবে।
তন্দ্রা সেক্রিফাইজ করল। পারভেজ দেরিতে এলেও সে আর কোনকিছু বলতো না কিন্তু পারভেজের এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সবসময় তার মন দুশ্চিন্তায় ভরে থাকতো। দিনের বেশিরভাগ সময় মনে হতো পারভেজ আর আগের পারভেজ নেই তার বন্ধু পারভেজ, স্বামী পারভেজ আর আগের মতো নেই। এমনি করে দিন অতিবাহিত হলো তন্দ্রার কোল জুড়ে আলোকিত করে এলো ছন্দা।
ছন্দা তন্দ্রা আর পারভেজের প্রথম সন্তান, একমাত্র সন্তান। তন্দ্রা মনে করেছিল ছন্দা তার আর পারভেজের সম্পর্কের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে। ছন্দার মুখ দেখে পারভেজ সংসারী হবে। তাকে দেখার জন্য না হোক ছন্দাকে দেখার জন্য তাড়াতাড়ি ছুটে আসবে কিন্তু বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন ঘটল না। পারভেজ আরো বেপরোয়া হলো। তন্দ্রা লক্ষ্য করেছে পারভেজের মোবাইলে অনেক সময় ফোন আসে কিন্তু সে রিসিভ করে না। কখনো কখনো ফোন রিসিভ করলেও আড়ালে গিয়ে ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে চাপাস্বরে কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একদিন রাতে পারভেজ বাসায় এসে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য বাথ রুমে ঢুকেছে এমনসময় সাইলেন্স করা মোবাইল ফোনে আলো জ্বলে উঠল, তন্দ্রা ফোন রিসিভ করে চুপ করে রইল।
হ্যালো পারভেজ, হ্যালো।
অল্প বয়সের মেয়ের কণ্ঠস্বর। কিন্তু পারভেজকে তুমি বলবে কেন? তন্দ্রা কোন কথা বলল না।
মেয়েটি আবার বলল, হ্যালো পারভেজ কথা বলছ না কেন? কথা বলো?
তন্দ্রা আবারো কোন কথা বলল না। সে মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দিল।
দিনে দিনে এরকম কিছু টুকরো টুকরো ঘটনা তন্দ্রার মনে সন্দেহ ও পারভেজের প্রতি তার অবিশ্বাসের জন্ম দিল। পারভেজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কার কাছে করবে তন্দ্রা?
না কারো কাছে তার কোন অভিযোগ নেই। সে পারভেজকে এসব বলল কিন্তু পারভেজ পুরোপুরি অস্বীকার করল এবং ধমকের সুরে বলল, তন্দ্রা তুমি কিন্তু আমাকে অযথা সন্দেহ করছ। আসলে তোমাকে কী বলবো? সুখে আছ তো তাই তোমার মনে আজেবাজে চিন্তা আসছে।
হ্যাঁ সুখেই তো আছি।
তা নয় তো কী? তোমার কীসের অভাব? কোনকিছু না চাইতেই সব পাচ্ছ। বলো তোমার কোনকিছুর অভাব আছে?
তুমি ঠিকই বলেছ পারভেজ আমার কোনকিছুর অভাব নেই। এত বড় লাক্সারিয়াস ফ্ল্যাটে রেখেছ, না চাইতেই হাতের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু এনে দিয়েছ কিন্তু একবার কি ভেবেছ আমার মনের অবস্থা? তোমার মেয়ের অবস’া? আমি সারাদিন বোবার মতো বাসায় থাকি, বিকেল হতেই মেয়েটা আব্বু, আব্বু বলে ডাকে আর তুমি আসো সেই গভীর রাতে, তাতে এতটুকু বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়ে। তুমি কি কোনদিন এসে মেয়েটার মুখ দেখতে চেয়েছ?
পারভেজ কোন কথা বলল না।
তা চাইবে কেন? সারাদিন তুমি ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকো, অফিস শেষ করে চলে যাও ফুর্তি করতে, বাসায় আসতে আসতে তুমি ক্লান্ত হয়ে যাও, তখন আর আমাদের খবর নেয়ার সময় কোথায় তোমার? বলতে বলতে তন্দ্রার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
তন্দ্রার কণ্ঠস্বর শুনে ছন্দার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সে বিছানায় উঠে বসে আব্বু, আব্বু বলে কাঁদতে শুরু করেছে।
পারভেজ ছন্দাকে তো কোলেই নিল না। গম্ভীর স্বরে তন্দ্রাকে বলল, ছন্দাকে নাও, ওকে ঘুমিয়ে রাখো।
এমনিভাবে দিনের পর দিন পারভেজের বিশৃঙ্খল জীবন-যাপন, তার প্রতি অবহেলা, অবিশ্বাস আর দাম্পত্য কলহে তন্দ্রার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একটা প্রশ্ন বার বার তাকে বিদ্ধ করছিল, পারভেজকে বিয়ে করে কি আমি ভুল করেছি? পারভেজের আভিজাত্য, প্রাচুর্যে অন্ধ হয়ে তারেকের কাছ থেকে চলে আসা কি আমার ভুল হয়েছে?
ভুল হোক আর ঠিকই হোক, বিয়ে তো মানুষের একবারই হয়। সংসারে এমন অশান্তি হতেই পারে এটা হয়ত সাময়িক, একসময় ঠিক হয়ে যাবে তাই বলে সবাইতো আর সংসার ভাঙ্গে না। সংসার তো আর একদিন দু’দিনের জন্য নয়। সংসারে মনোমালিন্য হবে, দ্বন্দ্ব হবে, তারপরও একসঙ্গে থাকতে হবে হাসি মুখে। এটাই নিয়ম। এই নিয়ম মেনেই নির্যাতন ও বঞ্চনা সহ্য করে পৃথিবীতে বিয়ে নামক সম্পর্কটা টিকে আছে বছরের পর বছর। সবাই যদি সেক্রিফাইজ না করে ক্যালকুলেটর টিপে নিজেদের দেনাপাওনার হিসেব করে তবে তো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সংসার ভেঙ্গে যাবে, সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে।
তন্দ্রা সেক্রিফাইজ করল, স্বামী পারভেজকে বন্ধু পারভেজ এবং প্রেমিক পারভেজ হিসেবে চোখের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করল। পারভেজকে নিয়ে যখন তার ভালোবাসার স্মৃতিগুলো হৃদয়ে ভেসে উঠে তখন তন্দ্রার গর্ব হয়, কখনো কখনো নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়। তবে এটা ছিল ক্ষণিকের, না ক্ষণিকের বললে ভুল হবে, মুহূর্তের। দীর্ঘ স্বপ্নের রাত্রি নয়, যেন কয়েক সেকেন্ডের একটা তন্দ্রা। বাস্তবে পারভেজ যা বলেছিল তাই নিষ্ঠুর সত্য, আমি বিজনেসম্যান, আমাদের পরিবারের কোন বউ চাকুরি করে না। সারাদিন ছুটোছুটি করবো টাকার পিছনে তারপর বাসায় গিয়ে দেখব বউ অফিসে এটা আমার ভালো লাগবে না। কথাগুলো পারভেজই একদিন বলেছিল তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কয়েক দিন পরেই। এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে তন্দ্রার হাত থেকে মোবাইল ফোনটা পড়ে গেল।

চার

সেদিন রাতে বাসায় না ফেরায় তন্দ্রাকে প্রথমে ফোন করল তরু। তন্দ্রা ফোন রিসিভ করল না। কী বলবে সে তরুকে? দু’ভাইবোনের মধ্যে তরু ছোট। বড় বোন হয়ে ছোট ভাইকে কীভাবে বলবে তার পালিয়ে বিয়ে করার কথা। তারপর যদি মা ফোন করে? তারপর বাবা? একবার না একবার তো সবাইকে জানাতেই হবে তার বিয়ের কথা। বাবা খুব কষ্ট পাবে। আর মা?
মাকে তন্দ্রা ভালো করেই চেনে। প্রথমে হয়ত কান্নাকাটি করবে, বকাবকি করবে। তারপর একসময় থেমে যাবে। শুধু থেমেই যাবে না, চোখের পানি দিয়ে একসময় বাবাকেও ম্যানেজ করবে। তাছাড়া মা পারভেজকে চেনে। তন্দ্রাই একদিন পারভেজকে তাদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে মাকে পারভেজের প্রশংসা করতে শুনেছে। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর মেলাতে গিয়ে তন্দ্রা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে, কোনদিন মা যদি জিজ্ঞেস করে, তুই একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে, এভাবে বিয়ে করলি কেন? আমাদের বললে তো আমরাই ধুমধাম করে পারভেজের সঙ্গে তোর বিয়ে দিতাম।
কিন্তু তন্দ্রা জানে বিত্তবান মানুষের প্রতি বাবার জেলাসি আছে। বাবা প্রায়ই বলে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ অনেক সময় মানুষের বিবেক ধ্বংস করে, মানুষকে অমানুষ করে তোলে।
তাই বলে মাস্টার্স পাস একটা মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করবে? তন্দ্রা পত্র-পত্রিকায় পড়েছে স্কুল-কলেজ পড়-য়া ছেলেমেয়েরা আবেগে অন্ধ হয়ে প্রেমিকের হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় কিন্তু সে তো সেই বয়স অতিক্রম করেছে অনেক আগে। সেও কি আবেগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল?
হ্যাঁ, তন্দ্রা সত্যি, সত্যি আবেগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তন্দ্রার চোখে তখন পারভেজ, শুধু পারভেজ!
তরুর ফোন রিসিভ না করে তন্দ্রা পারভেজকে জিজ্ঞেস করল, কী বলবো?
পারভেজ কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, যা সত্যি তাই বলবে।
তন্দ্রাও তাই ভেবেছিল, যা সত্যি তাই বলবে। শুধু তার মাকে ফোন করে বলবে।
তন্দ্রা তার মাকে ফোন করল। মা’র ফোন নাম্বার টিপতেই তন্দ্রার বুকটা একবার কেঁপে উঠল, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। হৃৎপিণ্ড যেন দ্রুত গতিতে চলতে লাগল।
তন্দ্রার মা রিসিভ করল, হ্যালো, মা তুই কোথায়?
আমি আছি মা।
কোথায় আছিস? এখনো বাসায় এলি না কেন?
তন্দ্রা একবার পারভেজের দিকে তাকালো, মনের মধ্যে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে পারভেজের সঙ্গে তার বিয়ের কথা বলল। শুনে তো তার মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
তন্দ্রা কী বলবে কিছু বুঝতে পারল না।
তন্দ্রাকে আর কিছু বলতে হলো না। তার মা-ই ফোন রেখে দিল।

তারপর অনেকদিন তন্দ্রার বাবা-মা’র সাথে কথা হলো না। মাঝে মাঝে তরু ফোন করে তন্দ্রাকে বাবা-মা’র ভালো-মন্দের কথা জানাতো। তন্দ্রা আবার তার মা’র সঙ্গে কথা বলল প্রায় তিন মাস পর। তন্দ্রার মা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। মা’র কান্নার শব্দ পেয়ে তন্দ্রাও আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, আমারো তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে মা, তুমি একদিন এসো না আমার বাসায়।
আমি যেতে চাইলেই কি পারব? আমি ঢাকা শহরের কী চিনি তুই বল?
তন্দ্রা বলল, তরুকে নিয়ে এসো।
তোর বাবা যদি জানতে পারে?
বাবা জানতে পারলে কী হবে মা? বাবার কি আমার ওপর থেকে এখনো রাগ কমেনি?
তন্দ্রার মা কিছুটা আমতা আমতা করে বলল, একটু কমেছে, আমি বুঝিয়ে-সুজিয়ে একটু শান্ত করেছি কিন্তু আমি তোর বাসায় গেছি জানলে যদি আবার রেগে যায়?
রেগে যাবে না মা। তুমি বলবে আমার মেয়েকে আমার দেখতে ইচ্ছা করেছিল তাই গেছি। আমি দোষ করেছি কিন্তু তাই বলে কি তুমি মা হয়ে আমাকে ফেলে দিবে?
মোবাইল ফোনে তন্দ্রার মায়ের কান্নার শব্দ ভেসে এলো। তন্দ্রা বলল, মা তুমি কেঁদো না তো। আমি বলছি তুমি তরুকে নিয়ে আমার বাসায় চলে এসো।
আচ্ছা বলে তন্দ্রার মা ফোন রেখে দিল।
কয়েকদিন পর তরু আর তন্দ্রার মা এলো। আসার আগে তরু ফোন করে তন্দ্রার বাসার ঠিকানা নিল। তন্দ্রার বাসা দেখে তার মা খুশি হলো, জামাইরা অনেক বড় না রে মা?
হ্যাঁ মা।
তোকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা কিছু বলেছে?
না মা।
কেন?
জানি না, তোমার জামাই বলে আমরা নাকি এখানে ভালো আছি। আমারো তাই মনে হয়।
তন্দ্রার মা প্রসঙ্গ পাল্টালো, জামাইর অফিস ক’টা থেকে ক’টা রে?
ওতো চাকরি করে না মা। ওদের নিজেদের কোম্পানি।
তবু একটা যাওয়া-আসার টাইম আছে না?
যাওয়ার টাইম আছে মা কিন্তু আসার টাইম নেই।
দুপুরে ভাত খেতে আসে না?
মা ওর অফিস তো গুলশান আর এটা বনশ্রী।
টিফিন ক্যারিয়ারে করে ভাত নিয়ে যেতে পারে।
তন্দ্রা কিছুটা বিরক্ত হলো, মা তুমি আসলে ওর লেভেল চিন্তা করতে পারছ না।
তন্দ্রা ফোন করে পারভেজকে তার মা আসার কথা বলল। তন্দ্রার মা ভেবেছিল তার আসার কথা শুনে পারভেজ বাসায় আসবে, কথায় কথায় তন্দ্রাকে জিজ্ঞেস করল, জামাই আসবে না তন্দ্রা?
ও খুব ব্যস্ত মা।
দুপুরে মা-মেয়ে আর তরু এক সঙ্গে ভাত খেল। তরুও খুব খুশি হলো। বোনের রাজকীয় অবস’া দেখে তরুও বায়নার সুরে বলল, আপু আমাকে একটা জিনিস কিনে দিবি?
কী জিনিস?
আগে বল দিব।
তন্দ্রা তরুর মুখের দিকে তাকিয়ে তার দাবি অনুমান করতে চাইল কিন্তু বুঝতে পারল না, তুই না বললে দিতে পারব কী না কীভাবে বুঝব?
আপু আমার ফ্রেন্ডরা সবাই ল্যাপটপ কিনেছে, তুই যদি-
তরুর কথা শেষ হওয়ার আগে তন্দ্রার মা তরুর দিকে শাসনের চোখে তাকালো, এই, এই ল্যাপটপ তুই কী করবি রে?
তরু বায়নার সুরে বলল, আপু প্লিজ!
তন্দ্রা তরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, তুই ভালোভাবে লেখাপড়া কর আমি তোকে অবশ্যই ল্যাপটপ কিনে দিব।
তরু খুশিতে টগবগিয়ে উঠল, আপু সত্যি বলছিস!
হুঁমম।
তন্দ্রার মা যাওয়ার জন্য তৈরি হলো বিকেল চারটায়। মাকে বিদায় দিতে গিয়ে তন্দ্রার চোখ আরেকবার পানিতে ভরে গেল। সে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, মা তুমি একটু বাবাকে বলো না।
তন্দ্রার মা আঁচলে চোখ মুছে বলল, বলবো মা। আমি তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলবো। তারপর তরু এসে তোকে নিয়ে যাবে।

পাঁচ

মিতু অনেকদিন পর তন্দ্রার বাসায় এলো তার স্বামীসহ। মিতুর বিয়ে হয়েছে সে যখন অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়তো তখন। মিতুর স্বামী মাহফুজ কম্পিউটার সায়েন্সে হায়ার এডুকেশনের জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল। সেখানে কয়েক বছর থাকার পর ক’দিন আগে দেশে ফিরেই তন্দ্রার বাসায় এলো।
তন্দ্রা কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলে দিল, মিতু!
মিতু জিজ্ঞেস করল, কীরে কেমন আছিস?
ভালো, তুই?
ভালো।
কথা বলতে বলতে সবাই ড্রয়িং রুমে ঢুকল।
মিতু মাহফুজের সঙ্গে তন্দ্রার পরিচয় করে দিল, তন্দ্রা…
তন্দ্রা মিতুর কথা শেষ করতে দিল না, মাহফুজ, তোর হ্যাজবেন্ড। দুলাভাই আমি হচ্ছি তন্দ্রা, মিতুর ফ্রেন্ড।
মাহফুজ সালাম দিল, আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। কেমন আছেন আপনি?
জি ভালো।
মিতু বলল, তুই আমার শুধু ফ্রেন্ড? ভাবী না?
অবশ্যই। আচ্ছা তুই বস, দুলাভাই একটু বসুন আমি আসছি। বলে তন্দ্রা রান্না ঘরে চলে গেল। বুয়াকে নাস্তা তৈরি করতে বলে আবার চলে এলো।
হ্যাঁ বল, তোদের কেমন কাটছে?
মিতু মুচকি হেসে বলল, ভালো। তোরও তো ভালোই যাচ্ছে।
হ্যাঁ, তুই তো জানিস। বলে তন্দ্রা মাহফুজকে জিজ্ঞেস করল, আপনি তো লেখাপড়া শেষ করে এসেছেন?
হ্যাঁ।
যাক ভালোই হয়েছে। মিতু অনেকদিন অপেক্ষা করল। আহ বেচারির কষ্ট, বলে তন্দ্রা তিন বার চুক চুক করল।
মিতু লজ্জা পেল, এই আমি তোকে কোনদিন বলেছি আমার কষ্টের কথা?
বলিস নি কিন্তু বুঝি তো। যখনই জিজ্ঞেস করি, কী করিস?
মিতু বলে নেটে আছি।
আমি যদি বলি এতো নেটে কী করিস? ও বলবে মাহফুজের সাথে চ্যাটিং করছি। যাক ভিডিও চ্যাটিংয়ের সেই লোকটা এবার কাছে এসেছে। একেবারেই এসেছেন তো?
হ্যাঁ।
তন্দ্রা মিতুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কীরে এবার হয়েছে তো?
মিতু কোন কথা বলল না।
মিতু বস আমি দেখি, বলে তন্দ্রা আবার উঠল।
মিতুও তন্দ্রার পেছনে পেছনে রান্না ঘরে এলো। ততক্ষণে বুয়া নাস্তা তৈরি করতে শুরু করেছে, তন্দ্রা বুয়াকে বলল, বুয়া তুমি যাও, আমিই নাস্তা তৈরি করি।
বুয়া চলে গেল।
তন্দ্রা মিতু বলে আবার থেমে গেল। মিতু জিজ্ঞেস করল, কীরে থামলি কেন?
না, থাক।
থাক কেন? আমাকে বল? কোন সমস্যা?
না, ঠিক সমস্যা না, আবার…
বল না, আমাকে বল? আমি তো তোর শুধু ননদই না, ফ্রেন্ডও।
না আসলে তোর ভাই আজকাল খুব অনিয়ম করছে।
কী রকম অনিয়ম?
এই খাওয়া-দাওয়া, বাসায় ফেরা…
ও এসব তো হবেই। আসলে অল্প বয়সে অনেক দায়িত্ব পড়েছে তো। আমি ভেবেছিলাম অন্য কিছু।
তা ঠিক আছে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে শুধু দায়িত্বের কারণে নয়।
তো?
অন্যকিছু। “অন্যকিছু” বলার সময় তন্দ্রার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হলো।
মিতু তন্দ্রার একটা হাত ধরে নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে দেখল তন্দ্রার চোখ পানিতে ছলছল করছে। সে বলল, এই তন্দ্রা কী হয়েছে? ভাইয়া?
তন্দ্রা চোখ মুছল, না, এখনো কনফার্ম না।
তোর কি সন্দেহ হচ্ছে?
তন্দ্রা মাথা উঁচু-নিচু করে জানাল, তার সন্দেহ হচ্ছে।
মিতু বলল, কনজুগ্যাল লাইফে সন্দেহ জিনিসটা খুব খারাপ। আরো ভালো করে দেখ, একেবারে কনফার্ম না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলিস না।
না আমি ওকে কিছু বলিনি।
আমি জানি ভাইয়া ব্যস্ত মানুষ, হয়ত দেরিতে বাসায় ফেরে, তোকে বেশি সময় দিতে পারে না কিন্তু তাই বলে তুই যেন ভুল না বুঝিস। আরো দেখ, হাজার বার দেখ।
তন্দ্রা চোখ মুছল, আচ্ছা।
তন্দ্রা নাস্তার ট্রে নিয়ে ড্রয়িং রুমে এলো। মিতুও তন্দ্রার পেছনে পেছনে ড্রয়িং রুমে ঢুকল। তন্দ্রা নাস্তার ট্রে টেবিলে রেখে মৃদু হেসে বলল, আপনাকে অনেকক্ষণ একা বসিয়ে রেখেছি ভাই। আপনি বোধ হয় বোর ফিল করছিলেন?
না, ঠিক আছে।
মিতু বলল, বোর ফিল করবে না, বউকে ছেড়ে বিদেশে যখন বছরের পর বছর কাটিয়েছে তখন এই ক’মিনিটে ও বোর ফিল করবে না।
বাইরের কথা আলাদা। তবু তো বউয়ের কাছে ছুটে এসেছে।
তা অবশ্য ঠিক।
তন্দ্রা মিতু এবং মাহফুজকে নাস্তা তুলে দিয়ে সোফায় বসল। কয়েক মুহূর্ত দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইল। মাহফুজ বিদেশে থাকতে প্রতিদিন মিতুর সঙ্গে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছে। দীর্ঘদিন পর, উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আবার দেশে ফিরে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে নিশ্চয়ই মিতুর চেয়ে সুন্দর মেয়ের অভাব নেই। ইচ্ছা করলে মাহফুজও মিতুকে ছেড়ে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করে বিদেশে থেকে যেতে পারতো কিন্তু না সে ছুটে এসেছে মিতুর কাছে। মিতু যে খুব সুন্দর তাও না। গায়ের রং শ্যামলা, লম্বা পাঁচ ফুট, লম্বার তুলনায় ওজন একটু বেশিই হবে। আর মাহফুজ লম্বা, ফর্সা, স্মার্ট। দু’জনকে যে খুব সুন্দর মানিয়েছে তাও না। অথচ দু’জনের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন কত মজবুত! তন্দ্রার শাশুড়ি বলেছিল রক্তের দোষের কথা। তন্দ্রার ভাশুর তো বাবার সঙ্গে ব্যবসা করছে, বউ একেবারে কম শিক্ষিত, আনস্মার্ট কিন্তু তার সম্পর্কেও তো আজ পর্যন্ত তন্দ্রার কানে কোন খারাপ কথা এলো না। মিতুর শরীরেও তো একই রক্তের ধারা বইছে কিন্তু সে তো মাহফুজের দেশের বাইরে থাকার সুযোগে অন্যের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায় নি? আর মাহফুজ ছুটে এসেছে মিতুর টানে। স্বামী হিসেবে মাহফুজ কত দায়িত্ববান! কত আবেগপ্রবণ!
তন্দ্রাকে চুপ করে থাকতে দেখে মিতু জিজ্ঞেস করল, কীরে চুপ করে আছিস কেন?
আসলে তোর কাছে তো জানাই হয়নি, তোর দেবর-ননদ ক’জন?
ওরা তিন বোন দু’ভাই। মাহফুজই সবার ছোট। বোনদের বিয়ে দিয়েছে, এতদিন আমার ভাশুর একাই বিজন্যাস দেখাশুনা করতো আর এখন তো…
আপনিও বিজন্যাস করবেন?
অফকোর্স।
অস্ট্রেলিয়া থেকে লেখাপড়া করে এসে বিজন্যাস করবেন?
তাতে কী? লেখাপড়া করে এসেছি বলে চাকরি করতে হবে? আমাদের ফ্যামিলিতে কেউ চাকরি করে না।
তাহলে তো দুই ফ্যামিলির মধ্যে একটা ভালো মিল আছে।
মিতু বলল, হ্যাঁ, তাছাড়া তো বাবা আমাকে ওর সঙ্গে বিয়েই দিত না।
হ্যাঁ, তোদের ফ্যামিলিতে আবার সবাই বিজন্যাস মাইন্ডেট। দুলাভাই’র ফ্যামিলিতেও সবাই বিজন্যাস ম্যান, দেখুন দুলাভাই মিতুকে যেন কখনো বিজন্যাসের পাল্লায় মাপবেন না।
মাহফুজ জিজ্ঞেস করল, একথা কেন বলছেন ভাবী? পারভেজ ভাই কি আপনাকে বিজন্যাসের পাল্লায় মাপে নাকি?
তন্দ্রা কোন কথা বলল না।
মাহফুজ আবার বলতে শুরু করল, আমার কাছে বিজন্যাস আলাদা, ফ্যামিলি আলাদা। যখন অফিসে থাকবো তখন পুরো বিজন্যাস ম্যান আবার যখন বাসায় ফিরবো তখন পুরো হ্যাজবেন্ড।
বাহ আপনার যুক্তি তো খুব সুন্দর। মিতু খুব লাকি যে আপনার মতো হ্যাজবেন্ড পেয়েছে।
তিনজনে আরো অনেকক্ষণ আড্ডা চলল। তারপর মিতু বলল, আজ উঠি রে। ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হলে ভালো হতো।
থাক, রাতের খাবার খেয়ে যাবি। তোর ভাইয়ার সঙ্গে দেখাও হবে।
না, ভাইয়ার তো ঠিক নেই।
মাহফুজও উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে তার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে দিল। তন্দ্রা কথা বলতে বলতে ল্যান্ডিং পর্যন্ত এলো। তারপর হাত তুলে বিদায় জানিয়ে বাসায় চলে এলো।

ছয়

তন্দ্রার ধারণা ছিল তাদের সংসারে নতুন অতিথি আসার আগমনের খবরে পারভেজ খুশি হবে। তাকে খুব আদর করবে, তাদের দু’জনের সম্পর্কে উন্নতি হবে কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। সেদিন রাতে পারভেজ যখন রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল তখন তন্দ্রা পারভেজে পাশে বসে একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, এই ঘুমালে নাকি?
না।
শোন একটা খবর আছে।
পারভেজের তেমন কোন আগ্রহ নেই, বলো?
পারভেজ চোখ বুজে কথা বলছিল, তন্দ্রা বলল, একটু চোখ খোল।
পারভেজ চোখ বন্ধ করেই বলল, কেন? চোখ খুলতে হবে কেন?
বলছি, খোল না প্লিজ!
পারভেজ চোখ খুলল, বলো?
তন্দ্রা পারভেজের কানের কাছে মুখ নিয়ে তার শরীরে আগত অতিথির কথা বলল।
কিন্তু পারভেজের মধ্যে কোন আগ্রহ নেই। সে জিজ্ঞেস করল, কীভাবে বুঝলে?
বাঃ রে আমি বুঝব না। এগুলো কীসের লক্ষণ?
কাল একবার প্রেগনেন্সি টেস্ট করো।
আমি একা?
কেন? অসুবিধা কী?
পারভেজ একা একজন মেয়ে প্রেগনেন্সি টেস্ট করতে যাওয়াটা ভালো দেখায় না।
কেন? ভালো না দেখানোর কী আছে? তোমার চিন্তাভাবনাগুলো এখনো মিডল ক্লাসেই রয়ে গেছে।
তন্দ্রার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমনি কথায় কথায় পারভেজ তাকে মিডল ক্লাস বলে খোঁটা দেয়। মিডল ক্লাসে জন্ম গ্রহণ করাটা কারো অপরাধ না। পারভেজের আচরণে তন্দ্রার চোখ পানিতে ছলছল করে উঠল।

তন্দ্রা পরদিনই প্রেগনেন্সি টেস্ট করল। রেজাল্ট পজিটিভ দেখার পর তন্দ্রা খুব খুশি হলো কিন’ যখনই পারভেজের কথা মনে পড়ল তখনই তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সেদিন রাতে তন্দ্রা তার মাকে ফোন করে জানাল। পরদিনই মা ছুটে এলো, সঙ্গে তাদের বাসার কাজের বুয়া।
পারভেজ রাতে বাসায় এলো। তার মাকে ডাইনিংয়ে দেখে শুধু সালাম দিল একবার ভালো-মন্দ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না। দেখে তন্দ্রার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। বিয়ের আগে পারভেজ যখন তাদের বাড়িতে যেত তখন তার মা’র সঙ্গে অনেক কথা বলতো। খালা আম্মা বলে এমনভাবে ডাকতো যেন মনে হতো ডাকটা তার হৃদয় থেকে বের হচ্ছে অথচ আজ তার সেই খালা আম্মা যখন শাশুড়ি হয়েছে তখন এক মিনিট কথা বলার মতো আগ্রহ পারভেজের নেই।
তন্দ্রার মা সেদিন রাত থেকে পরদিন চলে গেল। যাওয়ার সময় তাদের বাসার কাজের বুয়াকে রেখে গেল। বুয়া তন্দ্রার গ্রামের সম্পর্কে ফুপু। তন্দ্রা তাকে ফুপু বলেই ডাকে। তন্দ্রা লক্ষ্য করেছে তার মা বাসায় যে আগ্রহ নিয়ে, আনন্দ নিয়ে এসেছিল যাওয়ার সময় তেমনি কালো মুখ নিয়ে গেল। মায়ের মন হয়ত তার মেয়ের সুখের কথা বুঝতে পেরেছে। তারপরও তন্দ্রাকে তেমন কিছু বলল না, শুধু মাতৃত্ব কালীন কিছু পরামর্শ দিয়ে চলে গেল।

তন্দ্রা রাতে ফোন করল মিতুকে। মিতু তো শুনে মহা খুশি, তারমানে আমি ফুপি হচ্ছি?
তন্দ্রা বলল, হ্যাঁ।
আচ্ছা আমি কালই আসছি তোকে মিষ্টি খাওয়াবো।
আচ্ছা আসিস, বলেই তন্দ্রার মুখটা কালো হয়ে গেল, মিতু আম্মাকে কি তুই একবার ফোন করে বলবি?
আমি কেন? তুই বল।
নারে আমার…
লজ্জা পাচ্ছে?
তন্দ্রা কিছু বলল না।
মিতু বলল, আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলবো।
মিতু হয়ত তখনই ফোন করে তন্দ্রার শাশুড়িকে বলেছিল তাই কিছুক্ষণের মধ্যে শাশুড়ি ফোন করল।
তন্দ্রা শাশুড়ির ফোন নাম্বার দেখে তাড়াতাড়ি রিসিভ করল, আম্মা আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। কনগ্রাচূলেশন বউ মা।
থ্যাঙ্ক ইউ আম্মা। আম্মা আপনি ভালো আছেন তো?
আছি মা। তুমি কিন’ স্বাসে’্যর যত্ন নিও, ঠিকমতো খাবার খেও। ও বউমা ভালো কথা বিহাই-বিহাইনকে জানিয়েছ তো?
জানিয়েছি আম্মা।
এসেছিল কেউ?
জি আম্মা, আমার মা এসেছিল।
বিহাইনকে ক’দিন থাকতে বলতে, এসময় কাছের মানুষ কাউকে থাকতে হয়।
তন্দ্রা শাশুড়ির আগ্রহ দেখে খুব খুশি হলো, আপনি আসুন না আম্মা।
তন্দ্রার শাশুড়ি একটু হাসল, আসবো মা, আমি দোয়া করছি তোমার আর আমার দাদু বা দিদির জন্য।
থ্যাঙ্ক ইউ আম্মা।

কয়েকদিন পর মিতু এলো। সত্যি সত্যি মিষ্টি নিয়ে এসেছে। বাসায় ঢুকে তার হাতের মিষ্টির প্যাকেটটা ডাইনিং টেবিলে রেখে প্যাকেট খুলে কয়েকটা মিষ্টি বের করল। তারপর তন্দ্রার মুখে একটা মিষ্টি পুরে দিয়ে বলল, খা, এমন একটা সুসংবাদে তোকে অনেকগুলো মিষ্টি খাওয়ানো উচিৎ।
তন্দ্রার দু’চোখ পানিতে ভরে গেল। মিতু তার ফ্রেন্ড এবং ননদ আর পারভেজ তার স্বামী। পারভেজের অস্তিত্বই তন্দ্রার ভেতরে দিনে দিনে বড় হচ্ছে। অথচ পারভেজের কোন আগ্রহ নেই, কোন আনন্দ নেই। সে যেন একেবারেই গতানুতিক। তন্দ্রা অনেক সময় পারভেজের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছে কিন’ পারভেজকে সে চিনতে পারেনি। আসলে তাদের সংসারে নতুন অতিথি আসার ব্যাপারে খুশি না হওয়ার কারণটা তন্দ্রা জানতে পারেনি। পারভেজ কি এখনি বেবি নিতে চায়নি? কেন?
মিতু জিজ্ঞেস করল, কীরে ভাইয়ার অনুভূতি কী?
তন্দ্রা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, কী জানি?
খুশি হয়নি?
তাও জানি না।
কেন?
কী জানি আমি তোর ভাইকে ইদানীং চিনতে পারছি না রে। কেমন জানি বেবি হওয়াতে ওর মুডটা একটু ভার।
মিতু একটু আহত হলো, কী বলিস?
আমার তাই মনে হয় রে। শুনেছি বেবি হলে নাকি ছেলেমানুষের বউয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। তোর ভাইরও কি তাই হলো নাকি?
আমি তো শুনেছি উল্টো। অনেক সংসারে নতুন অতিথি এলে কনজুগ্যাল লাইফের প্রবলেমগুলো কমে যায়।
তোর কথায় যেন সত্যি হয় মিতু।

সাত

ছন্দা! পারভেজের অস্তিত্ব ছন্দা এলো! বিয়ের ক’দিন পরই কোন এক আবেগের মুহূর্তে পারভেজই বলেছিল তাদের মেয়ে হলে নাম রাখবে ছন্দা। আজ সত্যি সত্যি একটা মেয়ে সন্তান প্রসব করতে পেরে তন্দ্রার অনেক শারীরিক অসুস’তার পরও আনন্দ লাগছে। কিছুক্ষণ আগে তন্দ্রার ঘুম ভেঙ্গেছে। ঘুম থেকে জেগে একবার ডানে-বাঁয়ে তাকালো, তার পাশে বিছানায় ছন্দা ঘুমাচ্ছে। পারভেজ কি তার ছন্দাকে দেখেছে? তন্দ্রা মনে করার চেষ্টা করল। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার আগে সে বাবাকে একবার দেখেছে। অনেকদিন পর বাবা অবশেষে তাকে দেখতে এলো। বাবা তার কপালে হাত দিল, তাঁর চোখ দু’টো পানিতে টলমল করছিল। তিনি কিছু বলতে পারলেন না। মা কান্না কান্না গলায় বলল, ভয় নেই মা, আল্লাহ আছেন।
তারপর সবাই চলে গেল। পারভেজ এলো, তন্দ্রার বিছানার এক কোণায় বসল। তন্দ্রা পারভেজের দিকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, আমার জন্য দোয়া করো। আমি যেন তোমাকে একটা ভালো বেবি দিতে পারি।
পারভেজেরও দু’চোখ পানিতে ভরে গেল। সে তন্দ্রার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, পারবে, তুমি পারবে, তুমি না আসা পর্যন্ত আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবো।
তন্দ্রা অনেক খুশি হলো। অনেকদিন পর পারভেজের আচরণে সে খুশি হয়েছে। তন্দ্রা আস্তে আস্তে ডাক দিল, সিস্টার, সিস্টার।
নার্স এলো।
দেখুন তো পারভেজ আছে কী না?
সিস্টার জিজ্ঞেস করল, থাকলে কি আসতে বলবো?
হ্যাঁ।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পারভেজ এলো। তাকে কিছুটা আবেগ প্রবণও দেখাচ্ছে। কেবিনে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল, কই আমাদের…
তন্দ্রা মৃদু হেসে বলল, ছন্দা।
পারভেজ হেসে উঠল, ঠিক বলেছ। বলে কয়েক মুহূর্ত ছন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার গাল ছুঁয়ে একটু হাসল।
ছন্দাকে দেখার পর পারভেজ তন্দ্রার বিছানার কোণে বসল, তন্দ্রা এখন ভালো লাগছে?
তন্দ্রা মাথা নেড়ে জানাল তার ভালো লাগছে তারপর রুদ্ধ স্বরে বলল, তুমি পাশে থাকলে আমার কোন কষ্ট নেই।
পারভেজ মৃদু হাসল।
তন্দ্রার মনটা অনেকটা হাল্কা হলো। তার ধারণা ছিল তার মা হওয়ার সংবাদে পারভেজ যেমন খুশি হয়নি তেমনি ছন্দাকে দেখেও সে খুশি হবে না। কিন’ পারভেজের আচরণে সে অনেক খুশি হয়েছে।

পারভেজ বেরিয়ে যাবোার পর তন্দ্রার বাবা-মা, তরু এলো। ছন্দা সবার সাথে একটা সম্পর্কের সেতু তৈরি করল। বাবা তাঁর রাগের কথা ভুলে গেছেন। ছন্দাকে দেখে তিনিও খুব খুশি হয়েছেন। তিনি ছন্দার জন্য নিয়ে আসা প্যাকেটটা পাশের টেবিলে রেখে ছন্দাকে আদর করে বললেন, বাহ খুব সুন্দর হয়েছে তো নানু আমার।
তন্দ্রার মা তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ছন্দাকে দেখছিল আর হাসছিল। তন্দ্রার বাবা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেলেন, মা বসে রইল। তন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মা’র চোখ পানিতে ভরে গেল, এখন একটু ভালো লাগছে মা?
হ্যাঁ মা। আমার তো কোন কষ্ট হয়নি। তুমি আমার জন্য চিন্তা করো না তো।
সিস্টার এলো, তন্দ্রার মাকে বাইরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। তন্দ্রার মা যাওয়ার সময় তন্দ্রার কপাল ছুঁয়ে আদর দিয়ে বলল, থাক মা আমি বাইরে আছি, তুই যে ক’দিন এখানে আছিস সে ক’দিন আমি তোর সঙ্গে থাকব। কোন চিন্তা করিস না মা।
তন্দ্রা হাত নেড়ে জানাল সে চিন্তা করবে না।

মিতু এলো বিকেলবেলা। কেবিনে ঢুকেই ছন্দার কাছে গেল, ওয়াও, কিউট বেবি। খুব সুন্দর হয়েছে তো!
তন্দ্রা মুচকি হাসল।
মিতু বলল, তোর মতো হয়েছে।
সেও ছন্দার গালে আদর দিয়ে বলল, নাম কী রাখবি রে?
তোর ভাই নাম রেখেছে।
কী?
ছন্দা।
মিতু তন্দ্রার খাটের কোণায় এসে একবার মাথা উঁচু নিচু করে ভঙ্গিমা করে বলল, নামটা কি আগেই রাখা ছিল?
তন্দ্রা মাথা উঁচু-নিচু করে সায় দিল।
ভাইয়া খুশি হয়েছে তো?
হ্যাঁ।
তোকে আদর করেছে?
তন্দ্রা এক হাত দিয়ে মিতুকে সরিয়ে দিল, যাহ্‌, তুই শুধু সবসময় ইয়ার্কি করিস!
মা খুব খুশি হয়েছে। শোনার সঙ্গে সঙ্গে আল্‌হামদুলিল্লাহ বলেছে। আর-
আর বলে তন্দ্রার কৌতূহল বাড়ানোর জন্য মিতু একটু থামল। তন্দ্রা মিতুর হাতে একটা টান মেরে বলল, থামলি কেন? আর কী বলেছে?
মিতু তার ব্যাগ থেকে একটা স্বর্ণের চেইন বের করে দিয়ে বলল, ছন্দাকে এটা দিতে বলেছে। বলে মিতু ছন্দার ছবি তুলতে লাগল।
তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, ছবি তুলছিস কেন?
বাহ্‌, ছবি তুলব না। আমি ফুপি হয়েছি ফেসবুকে ওর ছবি দেবো। বলে মিতুর মনে একটা দুষ্টুমি জাগল, তাছাড়া-
আবার তাছাড়া কীরে? কেটে কেটে কথা বলিস কেন?
তাছাড়া মা ছবি তুলে নিয়ে যেতে বলেছে।
তন্দ্রার বুক ভরে গেল। যে কোন কারণেই হোক তার শাশুড়ি আসতে পারেনি। তাই তিনি এখানে আসতে পারবেন না। কিন’ নাতনীকে স্বাগত জানাতে তিনি কোন ত্রুটিও করেন নি। তিনি মিতুকে দিয়ে ছোট বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে পাঠিয়েছেন। তন্দ্রার মনে আজ নতুন একটা প্রশ্ন জাগল। তার শাশুড়িও তাকে খুব ভালোবাসেন, তাদের বংশের নাতনীকে দেখতে তারও ইচ্ছা প্রবল, তবে তন্দ্রাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারভেজের বাধা কি শুধু তার শ্বশুর? তন্দ্রা সুস’ হয়ে এবার ওবাড়িতে যাওয়ার একটা পথ বের করবেই। এই ছন্দা, ছন্দাকে নিয়ে সে সবাইকে এক সুতোয় বাঁধবে।
মিতু তন্দ্রার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, কী ভাবছিস?
কিছু না।
তন্দ্রার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তুই মা হলি, ভালো লাগছে না?
ভালো তো লাগবেই।
অনুভূতিটা একটু বল, ভিডিও করি। বলে মিতু ক্যামেরা তাক করল।
এই অনুভূতি বলে বুঝানো যাবে না মিতু, তুই যেদিন মা হবি সেদিন বুঝবি।
ঠিকই বলেছিস।
আরো ভালো লাগছে ছন্দার কারণে সবাই আজ একত্রিত হয়েছে। ছন্দা একটু বড় হোক তখন ওকে নিয়ে যাবো আব্বার কাছে যাবো। আমি দোষ করেছি, পারভেজ দোষ করেছে কিন’ ছন্দা তো কোন দোষ করে নি। ছন্দা কেন তার দাদু বাড়িতে থাকতে পারবে না?
মিতুও বিষয়টা কেন জানি এড়িয়ে গেল, এখন ওসব কথা রাখ তো। আগে সুস’ হয়ে বাসায় যা, ছন্দা বড় হোক তারপর।
আচ্ছা।

আট

তন্দ্রার সবসময় নিজেকে একা মনে হয়। বাবা মাঝে মাঝে ফোন করে, ছন্দার খোঁজখবর নেয়। তার শাশুড়িও ছন্দার খবর নেয়। কিন’ তার নিজেকে একা মনে হওয়ার কারণ পারভেজ। পারভেজ যদি সারাদিনে একবার ফোনে কথা বলতো, অফিস শেষে বাসায় ফিরতো। মাঝে মাঝে তাকে সময় দিত কিন’ এর কোনটিইতে সে নেই। বরং ড্রিঙ্ক করা এবং পরনারীতে আসক্ত হওয়ায় সবসময় পারভেজকে নিয়ে তার মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা ও অবিশ্বাস তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। অফিস শেষ হওয়ার পরও পারভেজ বাসায় না ফেরা পর্যন্ত তার মনে হয় সে কোন না কোন নারীকে নিয়ে…
আর ভাবতে পারে না তন্দ্রা, তার নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়, এই কোটি মানুষের ঢাকা শহরেও তার একা মনে হয়। তন্দ্রার সবসময় মনে হয় তার জীবনে যদি হারানো দিনগুলো ফিরে পেতো? ছাত্রজীবনের মতো হৈ চৈ করে বেড়াতে পারতো তবে জীবনটা অনেক মজার হতো। অথচ আজ সে একেবারে একা, মন খুলে কথা বলার মতো তার কোন বন্ধু নেই, তার ইচ্ছা করে সবসময় তার নি:সঙ্গ জীবনটাকে ভুলে থাকতে, অনেক বন্ধুর মাঝে, অনেক বড় সার্কেলের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে কিন’ ভার্সিটি থেকে লেখাপড়া শেষ করার পর তন্দ্রার আর কারো সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না। একেবারে কাছের দু’য়েকজন বলতে ঝুমুর একজন। ঝুমুর তার কলেজ জীবনের বন্ধু। প্রায় তিন বছর আগে ঝুমুরের বিয়ে হয়েছে এর মধ্যে একটা মেয়েও হয়েছে। মেয়েটির নাম রেখেছে সৌধ। সৌধর জন্মদিনে তন্দ্রা গিয়েছিল। তন্দ্রার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল পারভেজসহ। সেদিন রাতে তন্দ্রা পারভেজকে একথা বলতেই সে তন্দ্রার দিকে এমনভাবে তাকালো যে তন্দ্রা যেন বড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে।
তন্দ্রা আর কিছু বলেনি। পারভেজই বলল, তোমার কাছে তো টাকা আছে তুমি ভালো কোন গিফট নিয়ে চলে যাবে। এসব অনুষ্ঠানে যাওয়ার মতো কি আমার সময় আছে?
তন্দ্রা আর কথা বাড়ায় নি।
তন্দ্রা রাস্তায় যানজটে পড়েছিল তাই ঝুমুরের বাসায় পৌঁছাতে অনেক দেরি হলো ততক্ষণে প্রায় সব অতিথি পৌঁছে গেছে। তন্দ্রা পৌঁছামাত্র কেক কাটা হলো। সবাই আনন্দের সাথে বলে উঠল, হ্যাপি বার্থ ডে টু সৌধ।
তারপর শুরু হলো আনন্দ উল্লাস। জোরে গান চলছে, সবাই কেক, ড্রিঙ্কস আর আড্ডায় মেতে উঠেছে। তন্দ্রা ছন্দাকে নিয়ে আড্ডায় যোগ দিয়েছিল কিন’ কোনভাবেই পারভেজের ওপর তার রাগ কমছিল না। এক ভদ্রলোক কাছে এলো, পাশে ঝুমুরও এসেছে। সে-ই পরিচয় করে দিল, তন্দ্রা আমার কাজিন তারেক, ভাইয়া ও হচ্ছে তন্দ্রা আমার ফ্রেন্ড। শুধু ফ্রেন্ড না আমরা কলেজে একসঙ্গে পড়তাম, আমার বুজম ফ্রেন্ড।
তন্দ্রা সালাম দিল। তারেক সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন?
তন্দ্রা মৃদু হেসে উত্তর দিল, ভালো, আপনি?
ভালো আছি। আপনাকে খুব আনইজি দেখাচ্ছে, কোন প্রবলেম হয়েছে?
তন্দ্রা একটু লজ্জা পেল, আপনি কী করে বুঝলেন আপনি কি মনোবিজ্ঞানী নাকি?
তা না।
কিন’ যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে আপনি মনোবিজ্ঞানী বা কোন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।
কেন? মিলে গেছে?
তন্দ্রা মাথা নত করে রইল।
আমি অনেকক্ষণ থেকে দেখছি আপনি আনমনা হয়ে বসে আছেন, ভাবলাম-
ঠিকই করেছেন, আপনি কী সাবজেক্ট নিয়ে লেখাপড়া করেছেন?
ফিজিক্স।
তাহলে মুখ দেখে বুঝতে পারেন কীভাবে?
হয়ত আন্দাজি বলি তারপর মিলে যায়, বলে তারেক হাসল।
কোথায় থাকেন আপনি?
মহাখালী, আপনি?
বনশ্রী। একদিন ভাবীকে নিয়ে আসবেন আমাদের বাসায়।
আচ্ছা।
আসার আগে ফোন দিয়েন, আমার ফোন নাম্বার বলে তন্দ্রা তার মোবাইল নাম্বার বলল। তারেক তন্দ্রার মোবাইল নাম্বার মোবাইলে সেভ করে নিয়ে তন্দ্রার মোবাইলে রিং করল। তারপর তারেক জিজ্ঞেস করল, বাই দি বাই। দুলাভাই কী করেন?
তন্দ্রা পারভেজের কোম্পানির নাম বলে তার ডেজিগনেশনের কথা বললভভে।
ও তাহলে তো আপনি শিল্পপতির স্ত্রী।
তন্দ্রার মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেল, হুঁ।
উনি আসেন নি?
আসার কথা ছিল কিন’ ও খুব ব্যস্ত তাই এরকম অনুষ্ঠানে আমিই পার্টিসিপেট করি।
আর উনি শুধু টাকার পেছনে ছুটাছুটি করেন।
তন্দ্রা স্বীকার করল, অনেকটা তাই।
আর আপনার-
এতক্ষণ ছন্দা তন্দ্রার পাশে দাঁড়িয়েছিল এবার তাকে আদর দিয়ে বলল, এই তো আমার সোনামণিকে নিয়ে।
ঝুমুর এলো। তার সঙ্গে এলো তারেকের বউ। ভদ্র মহিলার গায়ের রং শ্যামলা, খাটো, দেখতে সুন্দর বললে ভুল হবে তবে অসুন্দরও না। তারেক তন্দ্রাকে রিভার সঙ্গে পরিচয় করে দিল। তন্দ্রা এ হচ্ছে রিভা আমার-
তন্দ্রা মুচকি হেসে বলল, বুঝেছি বলে নিজের পরিচয় দিল, আমি তন্দ্রা, ঝুমুরের ফ্রেন্ড।
রিভা কিছুটা ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন আপনি?
ভালো, আপনি?
ভালো।
রিভা তারেককে একরকম জোর করে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, এখানে কী করো? মেয়ে মানুষ দেখলে আলাপ জমাতে ইচ্ছা করে, না? এদিকে এসো তো।
তারেক হাত তুলে বলল, ওকে বাই।

নয়

অনেকদিন পর শৈলী ফোন করল। তন্দ্রা তো প্রথমে চিনতেই পারেনি। শৈলী তন্দ্রার ওপর কিছুটা রাগ করল, চিনতে পারিস নি তবে বলছি। আমি শৈলী তোর সাথে কুড়িগ্রাম মহিলা কলেজে এক সঙ্গে পড়তাম।
ও মনে পড়েছে। তোর কথা খুব মনে পড়ে রে।
হুঁম সেজন্যই তো আমাকে চিনতে পারছিস না, শৈলীর কণ্ঠে অভিমান।
না, আসলে আমি ভাবতে পারিনি তোর সাথে আবার আমার যোগাযোগ হবে। তুই আমার নাম্বার পেলি কার কাছে?
ঝুমুরের কাছে, ক’দিন আগে ঝুমুরের সঙ্গে দেখা হলো কুড়িগ্রামে, ওর কাছে তোর মোবাইল নাম্বার নিলাম।
ভালো আছিস তো?
হ্যাঁ, তুই?
আমিও ভালো আছি। তোর ছেলেমেয়ে ক’জন? তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল।
এক ছেলে। তোর?
এক মেয়ে। তোর ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে রে?
ক্লাস থ্রিতে। তোর বাসা তো বনশ্রী? শৈলী বলল।
হ্যাঁ, তোর?
রামপুরা।
তন্দ্রা যেন আনন্দে লাফিয়ে উঠল, রামপুরা! দেখছিস আমরা কাছাকাছি থাকি অথচ কেউ কারো রাখি না, আয়, চলে আয়।
হ্যাঁ, আসবো।
কবে?
কবে…, বলে শৈলী কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর বলল, আগামীকাল।
আচ্ছা, আসিস কিন’।
তুই তো কোথাও যাস না?
তন্দ্রা একটা নিঃশ্বাস নিল, আমি আর কোথায় যাবো? বাসাতেই থাকি সবসময়।

শৈলী এলো পরদিন সকাল দশটায়। আসার আগে ফোন করে বাসার ঠিকানা নিল। রাস্তায় আসতে আসতে আরো কয়েকবার ফোন করল। তন্দ্রা দরজা খুলে দিল, শৈলী! কেমন আছিস?
ভালো।
কথা বলতে বলতে দু’জনে ড্রয়িং রুমে ঢুকল। শৈলীকে সোফায় বসতে দিয়ে তন্দ্রা শৈলীর পাশের সোফায় বসল, অনেকদিন পর দেখা হলো রে।
শৈলী মনে মনে হিসেব করল, কতদিন, কতদিন হবে। বারো বছর পর।
ঠিক বলেছিস। এক যুগ।
আয় আমার সঙ্গে বলে তন্দ্রা তার বাসাটা ঘুরে ঘুরে শৈলীকে দেখালো। শৈলী তো অবাক, খুব সুন্দরভাবে সাজিয়েছিস তো বাসাটা, দেখতে হবে না শিল্পপতির-
তন্দ্রা একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, হ্যাঁ কিন’ আমার তো শিল্পের পতি দরকার ছিল না। আমার পতি দরকার ছিল।
এভাবে বলছিস কেন?
শিল্পপতি তো ব্যস্ত শিল্প নিয়ে, বলতে বলতে তন্দ্রা ফ্রিজ থেকে নাস্তা বের করে প্লেট সাজাতে লাগল।
সব হ্যাজবেন্ডরাই এমন রে, ওয়াইফদের ব্যাপারে উদাসীন।
কথা বলতে বলতে দু’জনে আবার ড্রয়িং রুমে ঢুকল।
তোর হ্যাজবেন্ড তো ইঞ্জিনিয়ার?
হ্যাঁ।
তোরই ভালো হয়েছে, সকালবেলা অফিস যাবে অফিস শেষে বাসায় ফিরে আসবে। অফিসের একটা ধরাবাঁধা সময় আছে।
ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্কে তোর ধারণা মোটেই ঠিক না।
কেন?
ওর সকালবেলা অফিস যাওয়ার সময়টা ঠিক আছে কিন’ ফেরার সময় ঠিক নেই। সারাদিন আমিও-
শৈলীর মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মুচকি হেসে সোফা থেকে উঠে বাইরে বারান্দায় গেল। তারপর একবার ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে ফোন রিসিভ করল, হ্যালো।
কেমন আছ শৈলী?
ভালো, তুমি?
ভালো, তবে তোমার কথা মনে পড়ছে, তুমি কোথায়?
আমি আমার এক ফ্রেন্ডের বাসায় এসেছি।
ফ্রেন্ডের?
হ্যাঁ।
বয় ফ্রেন্ড না তো?
আরে না, তুমিই তো আমার একমাত্র ।
হ্যাঁ তাইতো জানি, কখন আসবে?
আসতে দেরি হবে।
তোমার সঙ্গে আজ দেখা হবে না।
একটু বোঝার চেষ্টা করো।
আচ্ছা ফ্রি হয়ে ফোন দিও।
আচ্ছা।
শৈলী বারান্দা থেকে আবার ড্রয়িং রুমে ঢুকল। তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, কার সঙ্গে কথা বললি এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে?
আমার এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে।
তোর কী রকম ফ্রেন্ড যে আমার সামনে থেকে কথা বলা গেল না? বয় ফ্রেন্ড নাকি?
শৈলী একটা মুচকি হাসল।
তন্দ্রা মৃদু হেসে বলল, এই বয়সে?
কেন আমার বয়স কি খুব বেশি হয়েছে? বত্রিশ বছর বয়স কি খুব বেশি?
তন্দ্রা একবার নিজের বয়স হিসেব করল, তার বয়সও বত্রিশ বছর। সে মিনমিন করে বলল, না, বেশি না।
এই বয়সে বয় ফ্রেন্ড তো থাকতেই পারে। এটা মনের ব্যাপার, কাউকে তো আমার ভালো লাগতেই পারে। আমাকেও কেউ ভালোবাসতে পারে তখন কি আমি বলবো, আমার বয়স হয়েছে, আমার মন মরে গেছে। আমি এখন শুধু বাচ্চা মানুষ করবো আর স্বামীর বাসায় আসার জন্য পথচেয়ে থাকবো?
শৈলী যখন কথা বলছিল তখন তন্দ্রা তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। এবার বলল, প্রেম করছিস? পরকীয়া প্রেম?
শৈলী হেসে ফেলল, প্রেম প্রেমই। পরকীয়া বললে প্রেমকে অপমান করা হয়। বিয়ের আগে প্রেম পবিত্র থাকবে আর বিয়ের পর অপবিত্র হয়ে যাবে?
তন্দ্রা মৃদু ধমক দিল, চুপ, এসব কথা আর বলবি না। সবাই তোকে খারাপ বলবে।
হ্যাঁ সেজন্যই তো সমাজের কাছে ভালো থাকার জন্য-
লুকিয়ে, লুকিয়ে, বলে তন্দ্রা হাসতে হাসতে তার বেড রুমে ঢুকল। তন্দ্রা আয়নায় নিজের চেহারা দেখল। তন্দ্রার দুধে আলতা গায়ের রং এর ওপর একটু কালচে দাগ পড়েছে, কপালের চামড়ায় একটু ভাঁজ পড়েছে, চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে। এই ক’বছরে তার চেহারায় কিছুটা মলিনতাও এসেছে। শৈলীর কথা শুনতে শুনতে তার দু’চোখ পানিতে ভরে গেছে। শৈলীর কথাগুলো যে তারই মনের কথা। সে চোখ মুছে আবার ড্রয়িং রুমে ঢুকল।
শৈলী একবার ঘড়ির দিকে তাকালো, আর সময় নেই রে।
তন্দ্রা আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল, চলে যাবি?
শৈলীর দু’চোখ পানিতে ছলছল করে উঠল, তোকে অনেক কিছু বলে ফেললাম রে মনে কিছু করিস না।
না, আমি তোর ফ্রেন্ড, না? ক্লাস ফ্রেন্ড।
শৈলী সোফা থেকে উঠল, একদিন আয় না আমার বাসায়।
আসবো।
তন্দ্রা দরজা খুলে দিল। শৈলী সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে তন্দ্রার দিকে একবার তাকালো, তন্দ্রা একটা মুচকি হাসি হেসে বলল, যা তোর বয় ফ্রেন্ড আবার-
দু’জনে হাসল।
দশ

সেদিন প্রথম পরিচয়ের পর তারেকের সঙ্গে কথা হলো প্রায় পনেরো দিন পর তারেকই তন্দ্রাকে ফোন করল, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম।
তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, আপনি কে বলছেন প্লিজ!
আমাকে চিনতে পারেন নি?
মনে করতে পারছি না। যদি বলতেন প্লিজ!
ওয়ান্ডারফুল! আপনি আমার নাম্বারটা পর্যন্ত সেভ করে রাখেন নি?
সরি, আপনি মনে হয় রং নাম্বারে ফোন করেছেন?
আমি ঠিক নাম্বারে ফোন করেছি। আপনি তন্দ্রা না?
হ্যাঁ, কিন্তু-
আমি তারেক।
ও চিনতে পেরেছি, সেদিন ঝুমুরের মেয়ের জন্মদিনে আপনার সাথে পরিচয় হয়েছিল, সরি-
না, ঠিক আছে, কেমন আছেন আপনি?
ভালো, আপনি ভালো আছেন?
ভালো আছি। আপনি তো বাসায়?
হ্যাঁ। আপনি অফিসে?
হ্যাঁ।
সেদিন ভালোভাবে কথা বলা হলো না। কী করেন যেন আপনি?
আমি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করি।
ভাবী?
ও কিছু করে না।
খুব খারাপ কথা বললেন আপনি। একথা বলতে হয় না। হাউজওয়াইফরা বুঝি কিছু করে না। একটা সংসারে কত কাজ কোনদিন হিসেব করেছেন? ভাত রান্না করা, বাচ্চা-
থাক, থাক আর বলতে হবে না। সরি-
থ্যাঙ্ক ইউ, তবু যে বুঝতে পেরেছেন। মেয়েরা এই কাজ হাসি মুখে করে তো তাই বুঝতে পারেন না। যদি কোন মেয়ে বেঁকে বসে আর বেতন দিয়ে কাউকে দিয়ে করে নিতেন তবে বুঝতেন মেয়েরা মাসে কত টাকার কাজ করে।
আমি কিন্তু সরি বলেছি। সরি বললে আর কিছু বলতে হয় না। আপনি এভাবে রাগ করবেন জানলে-
তন্দ্রা হেসে ফেলল, না, রাগ করিনি।
সেদিনের পর থেকে তারেক প্রায়ই কথা বলে। তন্দ্রার কুশলাদি জানতে চায়, তন্দ্রা হেসে বলে, ভালো আছি। তারেক আবারো জিজ্ঞেস করে, সত্যি বলছেন?
হ্যাঁ।
কিন্তু আপনার ফেস তা বলে না।
তাই নাকি?
সেদিন আপনাকে দেখেছি না?
এক পলক দেখে আর পাঁচ মিনিট কথা বলে আপনি বুঝতে পারেন কে সুখে আছে আর কে কষ্টে আছে?
ভুল তো হয় না।
সেদিনের পর থেকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারেক তন্দ্রার সাথে কথা বলে। আর দিনের শেষে একবার কথা বলে অনেকক্ষণ। যেন তার কথার শেষ নেই। তন্দ্রা লক্ষ্য করেছে, যত নিঃসঙ্গতা, যত একাকীত্বই থাকুক না কেন তারেক ফোন করলে তার মনটা একটু হাল্কা হয়। অন্তত: সেই সময়টুকুর জন্য পারভেজের ক্রমাগত অবহেলা ও বঞ্চনার কথা তার মনে থাকে না। মনে হয় সে যেন একঘেয়েমি কাটিয়ে একটা নতুন জীবন পেয়েছে।
তন্দ্রার জীবনে বন্ধুত্বই হোক আর প্রেমই হোক ঐ একজনই, পারভেজ। কিন্তু দিনে দিনে তারেকের সাথে তার যে সম্পর্ক গড়ে উঠছে এটা কি তার প্রেম? তন্দ্রা আপনমনে একবার হেসে উঠল, গৃহিণী, এক সন্তানের জননী হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে প্রেম করার চিন্তাটা কি পরকীয়া প্রেম?
না, তারেকের সাথে তার যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এটাকে সে পরকীয়া নামে ভাবতে চায় না। তারেকের সঙ্গেও তার সম্পর্কটা এখনো পতিত্রতা, শালীনতা, নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে নি। তারেক এখনো তাকে এমন কোন কথা বলেনি যাতে করে তন্দ্রার মনে হয়েছে তারেকের সাথে তার কোন অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বন্ধুত্বের এই সম্পর্কটিকে সে এর চেয়ে বেশিদূর এগিয়ে নিতে চায় না। তারেক শুধুই তার বন্ধু।
ছন্দা পিছন থেকে এসে তন্দ্রার পিঠের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তন্দ্রা চমকে উঠল, আম্মু, দুষ্টুমি করতে হয় না।
ছন্দা তন্দ্রার কথার প্রতিবাদ করল, আম্মু আমি তো দুষ্টুমি করছি না, তোমার সাথে খেলছি।
তন্দ্রা ছন্দাকে কোলে তুলে নিল, খেলছিস, না? বলে তন্দ্রা কয়েক মুহূর্ত ছন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

এগারো

তন্দ্রার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। তারেক ফোন করেছে। তন্দ্রা রিসিভ করল, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। মনটা ভার কেন তন্দ্রা? তারেক কথাটা এমনভাবে বলল যেন সে তন্দ্রাকে দেখে বলছে।
তন্দ্রা একটা কষ্টের হাসি হেসে বলল, না তো।
আমার কাছে লুকাচ্ছেন?
লুকাইনি তো। আচ্ছা তারেক সাহেব আপনি কি আমার সম্পর্কে কারো কাছ থেকে কিছু শুনেছেন?
না তো।
তো আপনি কীভাবে জানলেন আমার মন খারাপ?
আপনি কি রাগ করেছেন?
না, না, রাগ করবো কেন? এমনি জানতে চাচ্ছিলাম।
সরি তন্দ্রা, আমি আসলে কোন কিছু জেনে বলিনি। আপনি যদি আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকেন তবে মাফ করবেন।
আপনি জেনে বলেন নি কিন্তু আসলে আপনি আমার মনের কথা বলেছেন। আজ আমার মনটা খুব খারাপ। আজ আমার বার বার মনে হচ্ছে জীবনে এমন একটা ভুল করেছি যার ফল আমাকে সারাজীবন ভোগ করতে হবে।
তন্দ্রা প্রথম যেদিন ঝুমুরের বাসায় আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো সেদিনই মনে হয়েছে আপনার মনের মধ্যে অনেক কষ্ট জমে আছে। আমাকে বলুন, আমি আপনার ফ্রেন্ড, ফ্রেন্ডই তো দুঃসময়ে ফ্রেন্ডের পাশে দাঁড়ায়।
কিন্তু আপনি আমার পাশে দাঁড়াবেন কীভাবে?
একজন ফ্রেন্ডের পাশে আরেকজন ফ্রেন্ড যেভাবে দাঁড়ায়। একজন কাছের মানুষ আরেকজন কাছের মানুষের পাশে যেভাবে দাঁড়ায়।
সত্যি বলছেন তো?
আমি মিথ্যা কথা বলি না। তবে আপনার ওপর আমার অনেক রাগ আছে।
কেন?
আপনি অনেক কষ্টে আছেন অথচ ফ্রেন্ড হিসেবে আপনি আমার সাথে আরো আগে শেয়ার করতে পারতেন।
আসলে ব্যাপারটা একান্তই ব্যক্তিগত তো। তাই বলতে চাইনি। তাছাড়া আপনিও সবসময় ব্যস্ত থাকেন।
যত ব্যস্তই থাকি না কেন আপনি কিছু বলতে চাইলে আমার শোনার সময়ের অভাব হতো না।
তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, আপনার কি আজ একবার সময় হবে?
কখন বলুন তো?
বিকেলে।
কেন?
তন্দ্রা আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, না এমনি বলছিলাম।
এমনি কেন? বলে ফেলুন, আসুন না আজ একবার এক সঙ্গে বসে কফি খাওয়া যাবে।
এক্সাক্টলি, আপনি এটাও আমার মনের কথা বলেছেন। আমিও ভাবছিলাম আজ আপনার সঙ্গে দেখা হলে আমার একটু হলেও ভালো লাগবে।
কোথায় আসবো বলুন?
আমি তো বিকেলে একবার বের হবো, আচ্ছা আপনার অফিস কোথায় বলুন তো?
গুলশান এক নাম্বারে।
তাহলে তো ভালোই হলো। আপনার অফিস তো পাঁচটা পর্যন্ত?
হ্যাঁ।
আচ্ছা আমি আগেই রওয়ানা দিব।
কোন রেস্টুরেন্টে বসবো?
তন্দ্রা রেস্টুরেন্টের নাম বলল।

তারেকের অফিস থেকে সেই রেস্টুরেন্টের দূরত্ব বেশি না। সে কয়েক মিনিটের মধ্যে রেস্টুরেন্টে পৌঁছে তন্দ্রাকে ফোন করল, হ্যালো।
এই তো এসে গেছি। আর পাঁচ মিনিট।
আচ্ছা।
তারেক একবার রেস্টুরেন্টের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিল। রেস্টুরেন্ট প্রায় হাউজফুল, তবে এখানকার বেশিরভাগ কাস্টমরই তাদের মতোই বয়সের। প্রত্যেক টেবিলে মুখোমুখি দু’জন করে বসেছে। পরস্পরের মধ্যে কথাবার্তা চলছে, ঠোঁট নড়ছে, কেউ কেউ হাসিতে টলে পড়ছে কিন্তু কোন শব্দ নেই, কোন গুঞ্জন নেই। হিমশীতল বাতাস বইছে, ঝাড়বাতি থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে কিন্তু কারো মুখ স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে না। এটা ঢাকা শহর, দেড় কোটি মানুষের শহরে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারেক মনে মনে বলল, না সম্ভাবনা নয়, আশঙ্কা। এখানে কারো সঙ্গে দেখা হওয়াটা আশঙ্কারই। তারেক দরজার দিকে মুখ করে বসেছে। ছোট একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে একজন মহিলা ঢুকল। তারেক ভালোভাবে লক্ষ্য করল, হ্যাঁ তন্দ্রাই তো।
তন্দ্রা ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে, কাউকে খুঁজছে। তারেক একটা হাত তুলল।
তন্দ্রা কাছে এসে তারেকের মুখোমুখি চেয়ারে বসল। তন্দ্রা ছন্দার একটা হাত ধরে পাশের চেয়ারে বসাল।
তারেক জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন?
তন্দ্রা একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, আপনি তো মুখ দেখে, কণ্ঠস্বর শুনে বলতে পারেন। তবে আর-
তা পারি কিন্তু এই ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করাটা একটা ভদ্রতা।
ছন্দা কিছুক্ষণ তারেকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, আঙ্কল আপনার নাম কী?
তারেক কিছু বলার আগে তন্দ্রা ছন্দাকে বলল, ভালো আঙ্কল আম্মু, ভালো আঙ্কল।
ছন্দা আর কিছু বলল না। সে তার হাতের খেলনা নিয়ে খেলতে লাগল।
তন্দ্রা বলল, আমি আছি ঠিক আগের মতোই। আপনি তো অবশ্যই ভালো আছেন?
তা বলা যায় কিন্তু এক কথায় বলা যাবে না।
এক কথায় বলা যাবে না কেন?
এই ভালো থাকা নিয়ে আমার একটা ছোট্ট গল্প আছে।
এমনসময় বয় এলো। তারেক প্রাইজ লিস্টটা তন্দ্রার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, আগে খাবারের অর্ডারটা দিয়ে দিই। আপনি বলুন প্লিজ!
না। আপনি বলুন।
তারেক একবার চোখ তুলে তাকাতেই তন্দ্রা বলল, ওরে বাবা। বলছি, আমি বলছি, বলে তন্দ্রা খাবারের অর্ডার দিল। তারপর বলল, আপনার চোখ তো ভয়ঙ্কর।
শুধু ভয়ঙ্করই দেখলেন। আর কিছু দেখলেন না?
তন্দ্রা তারেকের দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল। একটা নতুন অনুভূতি যেন তাকে গ্রাস করে ফেলল। বুকটা কেমন করে উঠল, হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। তন্দ্রা একটা ঢোক গিলে মুচকি হাসল।
তারেক জিজ্ঞেস করল, কী দেখলেন?
থাক। এখন আপনার ভালো থাকা-মন্দ থাকার গল্প বলুন।
তারেক গল্প বলতে শুরু করল, একদিন এক মাওলানা মিলাদ মাহফিলে যাচ্ছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য তার পরনে পাঞ্জাবি-পায়জামা, টুপি ছিল। যাকে বলে ধর্মীয় লেবাস।
তিনি যে রাস্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন সেই রাস্তার পাশে একটা দ্বিতল বিল্ডিং ছিল।
তারপর-
তিনি যখন সেই বিল্ডিং অতিক্রম করছিলেন তখন ওপর তলা থেকে তাঁর মাথার ওপর ছাই পড়ল। তখন তিনি ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, আল্‌হামদুলিল্লাহ, আল্‌হামদুলিল্লাহ।
তন্দ্রা মুগ্ধ হয়ে তারেকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাস্তার পাশে কয়েকজন বখাটে ছেলে দাঁড়িয়েছিল। মাওলানা সাহেবের মাথায় ছাই পড়েছে দেখে তারা দৌড়ে কাছে এলো। ছাই পড়ার পরও মাওলানা সাহেব আলহামদুলিল্লাহ বলছেন দেখে বখাটে ছেলেদের একজন বলল, হুজুর আপনার মাথায় ঐ মহিলা ছাই ফেলে দিল আর আপনি আল্‌হামদুলিল্লাহ বলছেন? আপনি না পারেন তো আমাদের বলুন। আমরা ঐ মহিলাকে-
মাওলানা সাহেব ছেলেদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেন, তোমরা উত্তেজিত হচ্ছ কেন? আমার ওপর ছাই পড়েছে আমি তো উত্তেজিত হচ্ছি না।
ছেলেরা থমকে গেল, তাইতো।
মাওলানা সাহেব বলতে শুরু করলেন, আমি আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করছি এজন্য যে ঐ মহিলা আমার মাথায় ছাই ফেলেছেন তিনি যদি ছাই না ফেলে আগুন ফেলতেন তবে তো শুধু আমার জামা-কাপড়ই নষ্ট হতো না। আমিও পুড়ে যেতাম।
তন্দ্রা মুচকি হাসল, এই গল্পের সাথে আপনার ভালো থাকা-মন্দ থাকার সম্পর্ক কী?
মানে, আমার মাথায় আসলে ছাই পড়েছে, আগুন পড়েনি। কিন্তু যদি আগুন পড়তো তবে তো আমিও আগুনে পুড়ে যেতাম।
তারমানে আপনিও-
আমি তো ভালো নেই বলছি না।
ভালো আছেন তাও তো বলেন নি।
এই বেঁচে থাকা। যে অবস’ায় আছি সে অবস’াকেই ভালো বলে মেনে নিয়েছি।
আপনাকে দেখে আমার কিন্তু কখনো মনে হয়নি যে আপনার মনেও কোন কষ্ট থাকতে পারে।
তারেক প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করল, আচ্ছা আমার কথা থাক, এখন আপনার কথা বলুন?
আপনিই তো গল্পের মাধ্যমে বলে ফেললেন, আপনার মাথায় যদি ছাই পড়ে থাকে তবে তো আমার মাথায় আগুন পড়েছে। বলে দু’জনে হেসে উঠল।
তারেক বলল, না, এভাবে নিরাশ হবেন না।
না, নিরাশ হচ্ছি না। আপনার কথা শুনে সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আপনার সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখ সব কিছুরই একটা মিল আছে।
আপনার কি প্রেম করেই বিয়ে হয়েছে?
হ্যাঁ, শুধু প্রেম করে না বলতে পারেন পালিয়ে। ও আমার জন্য অনেক রিস্ক নিয়েছে, আমিও বাবা-মা সবার কাছ থেকে এক কাপড়ে চলে এসেছি।
তবে তো এরকম হওয়ার কথা না।
কথা না কেন? জীবন কি কোন সূত্র মানে?
তা অবশ্য ঠিক।
অশান্তির সংসারেও সারাজীবন কেটে যায় আবার প্রেম করে বিয়ে করেও ক’দিনেই সংসার ভেঙ্গে যায়। পৃথিবীটা বড়ই বিচিত্র। যে মানুষটা আমার জন্য রাজপ্রাসাদ ছেড়ে ফুটপাথে চলে এলো ক’বছরে সেই মানুষটা-
তবে কী-
তন্দ্রা বাধা দিয়ে বলল, না, না, ওকথা বলবেন না। যত অশান্তিই হোক, যত কষ্টই হোক ওকথাটা আমি মুখে আনতে চাই না।
তো?
আমি একটু ভালো থাকতে চাই, একটু আনন্দ চাই, একটু সুখ চাই, একটু শান্তি চাই।
কিন্তু ম্যাডাম-
তন্দ্রা ধমকের সুরে বলল, কী আপনি ম্যাডাম, ম্যাডাম করছেন, বলেই হেসে ফেলল।
তো?
একজন ফ্রেন্ড কি আরেকজন ফ্রেন্ডকে স্যার বা ম্যাডাম বলে?
আমরা দু’জনে আরো ভালো ফ্রেন্ড হতে পারি তন্দ্রা।
তন্দ্রা চোখ মুছল, তুমি কিন্তু আমার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছ?
তারেক জোর দিয়ে বলল, অবশ্যই।
তন্দ্রা তারেকের চোখে চোখ রাখল। তারেকের চোখে সরলতা আছে। তারপরও তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, থাকবে তো?
বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে কারো না কারো ওপর ভরসা রাখতে হয় তন্দ্রা, তুমি আমার ওপর ভরসা রাখতে পারো।
তন্দ্রা একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল, তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তারেক। প্লিজ কোনদিন-তন্দ্রার শেষের কথাগুলো করুণ শোনালো।
কোনদিন কী?
না থাক।
আমি বুঝতে পাচ্ছি, তুমি আমার ওপর ভরসা পাচ্ছ না। থাক যেদিন তোমার সবকিছু বলতে ইচ্ছা করবে সেদিন বলো। আসলে একদিনের পরিচয়ে কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন কিন্তু একটা কথা মনে রেখ যে আপন হয় সে একদিনেই হয় আর যে হয় না সে কোনদিনও হয় না।
বয় খাবার নিয়ে এলো। খেতে খেতে আরো অনেক গল্প হলো। ছন্দা এতক্ষণ চেয়ারে বসেছিল। এবার খাবার দেখে চেয়ার থেকে চামচ ধরার জন্য হাত বাড়ালো।
খেতে খেতে তন্দ্রার সাথে তারেকের আরো কয়েকবার দৃষ্টি বিনিময় হলো।
যখন দু’জনে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলো তখন রাত আটটা বাজে। তারেক বলল, তোমার অনেক রাত করে ফেললাম। তোমার সাহেব যদি বাসায়-
তারেকের অসমাপ্ত কথা শেষ করল তন্দ্রা, এত তাড়াতাড়ি বাসায় এলে তো ভালোই হতো। বাসায় এসে যদি জিজ্ঞেস করতো কোথায় গেছিলাম? কেন গেছিলাম? তবে তো ভালোই হতো। আমি তো এটাই চাই।
ক’টায় বাসায় আসেন ভদ্রলোক?
রাত বারোটা, একটা।
এতক্ষণ তুমি কী করো?
তন্দ্রা একটা শুষ্ক হাসি হাসল।
তারেক জিজ্ঞেস করল, কোনদিন কিছু জিজ্ঞেস করো না?
তন্দ্রা ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল সে কোনদিন কিছু জিজ্ঞেস করবে না।
তো?
আসবে, খাবার বাড়িয়ে দিলে কোনদিন খাবে, কোনদিন খাবে না, বলতে বলতে তন্দ্রা কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াল। তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, তোমার বাসা কোথায় যেন?
মহাখালী, তোমার তো বনশ্রী।
হ্যাঁ।
চলো তোমাকে লিভ দিই?
না, আমি একাই যেতে পারব।
তা পারবে কিন্তু আমি যে তোমার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি।
তন্দ্রা মৃদু হেসে বলল, থ্যাঙ্কস।
একটা সি.এন.জি এসে দাঁড়াল। তারেক একটা হাত তুলে বিদায় জানালো, নাইস টু মিট ইউ তন্দ্রা।
তন্দ্রা বলল, সেম টু ইউ।
তন্দ্রা ছন্দার হাত উঁচু করে ধরে বলল, বলো আম্মু, বলো, ভালো আঙ্কল বাই।

বারো

তারেক কলিং বেলে টিপ দিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল কিন্তু রিভা দরজা খুলল না। তারেক রিভার মোবাইলে ফোন করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর রিভা দরজা খুলে দিল। রিভার গায়ের রং এমনিতেই শ্যামলা তারওপর তারেক দেরিতে বাসায় ফেরায় যেন মুখে আষাঢ়ের মেঘ জমেছে। সে দরজা খুলে দিয়ে কোন কথা না বলে সামনে হেঁটে চলল।
তারপর রান্না ঘরে তারেককে শুনিয়ে শুনিয়ে বিড়বিড় করে কথা বলতে শুরু করল। তারেক কোন কথা বলল না। সে কাপড় পরিবর্তন করে খাবার টেবিলে এলো। রিভার কোন কথা নেই। তারেকের সামনে খাবার প্লেট বাড়িয়ে দিল একটু জোরে শব্দ করে। রিভা যে প্রচণ্ড খেপেছে দেরিতে দরজা খুলে দেয়া, খাবারের প্লেট একটু শব্দ করে বাড়িয়ে দেয়া এসব তারই বহিঃপ্রকাশ।
রুমা তখন তার পড়ার রুমে বসে পড়ছিল। টেবিলে প্লেট রাখার শব্দে সে ডাইনিংয়ে এলো। মা’র ভয়ঙ্কর মূর্তি আর বাবার অসহায় নত মুখ দেখে আবার তার রুমে চলে গেল। এমন দৃশ্য সে শৈশব থেকে দেখে দেখে অভ্যস’। বাবাকে সে একসময় দেখেছে মা’র দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ করতে, তখন মা চিৎকার করে কথা বলতো। তারপর মান-সম্মানের ভয়ে বাবাই থেমে যেত। এমনিভাবে একসময় বাবার প্রতিবাদ থেমে গেল। তার মা যখন তার বাবার সঙ্গে কোন বিষয়ে দুর্ব্যবহার করে তখন তার বাবা অসহায়ের মতো মাথা নত করে বসে থাকে আর দিনের বেলা হলে বাইরে চলে যায়, সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে পরিসি’তি কিছুটা শান্ত হলে বাসায় আসে। বাবা কেন মা’র এমন দুর্ব্যবহার মেনে নিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিল রুমা জানে না। বাবা-মা’র এসব বিষয় নিয়ে সে ভাবতে চায় না।
রাতের খাবার খেয়ে তারেক বিছানায় শুয়ে পড়েছে। তার চোখে একটু একটু ঘুমের ভাব এসেছে তখন রিভা বেড রুমে ঢুকল। অফিস থেকে দেরিতে বাসায় ফেরা নিয়ে অনেকক্ষণ বিড়বিড় করে বকাবাকি করল। তারেক কোন কথা না বলে চুপ করে রইল।
রিভা দরজা খুলে দিয়ে রান্না ঘরে ঢুকে যখন বিড়বিড় করে বকাবকি করছিল তখন তন্দ্রার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্য তার মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল। কিন্তু সেই বকাবকি যখন চলতে থাকল তার সেই অপরাধবোধ কিছুটা লাঘব হলো। তাছাড়া রিভা তো শুধু আজকেই নয়, এমনিভাবে বিনা কারণে অথবা সামান্য কারণে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। তারপরও রিভাকে নিয়েই তারেক সংসার করছে বছরের পর বছর।
তারেক একবার মনে মনে হিসেব করল, তার বিয়ের কত বছর হলো? পনেরো বছর। অথচ এই পনেরো বছরের একটি মুহূর্তও রিভাকে তার আপন মনে হয়নি। বিয়ের পর রিভাকে যখন তার পাশে বসালো তখনই তারেকের বুক শুকিয়ে গেল, এই মেয়েটিকে নিয়ে তাকে সারাজীবন কাটাতে হবে? কাটাতে হলো পনেরো বছর, হয়ত বাকি দিনগুলোও কাটিয়ে দিতে হবে। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক রাষ্ট্র ও সমাজ স্বীকৃত রিভা তার স্ত্রী। হৃদয়ের সম্পর্ক থাকুক আর না থাকুক তবু থাকতে হবে একই সঙ্গে, হয়ত শরীরের প্রয়োজনেও।
এমনিভাবে যখনই তারেকের মন বিষিয়ে উঠতো তখনই তার মনে হতো সংসারের এই শেকল ছিন্ন করার কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি, কখনো কখনো অনুভব করতো সংসার শেকলের, বাইরে রাষ্ট্র ও সমাজের বাইরে অন্য কোন জগত। আজ তন্দ্রার সঙ্গে দেখা করার পর থেকে তার মনে হচ্ছে তন্দ্রা, তন্দ্রাই পারে তাকে নতুন জগতের সন্ধান, সুখ, শান্তি এবং স্বস্তি।
তন্দ্রার কথা মনে পড়তেই তার ছবিটা যেন তারেকের চোখের সামনে ভেসে উঠল। প্রথম দিন তন্দ্রাকে দেখেই তারেকের বুকটা দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছিল। তন্দ্রার চোখে চোখ পড়তেই তার মনে হয়েছিল তন্দ্রা তার অনেক দিনের চেনা। তন্দ্রাও যেন কেমন করে উঠেছিল। হয়ত তন্দ্রার বুকেও ঢেউ উঠেছিল সেজন্য তারেকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটা ঢোক গিলেছিল। আর আজ তন্দ্রার সঙ্গে দেখা করার পর থেকে তারেকের মনে হয়েছে রিভা পনেরো বছরেও তার হৃদয়ের এক বিন্দু জয় করতে না পারলেও তন্দ্রা একদিনে তার সমস্ত সত্ত্বাকে দখল করে বসে আছে। তন্দ্রা, তারেকের সমস্ত হৃদয় জুড়ে এখন তন্দ্রা, না তন্দ্রাকে নিয়ে সে খারাপ কিছু ভাবছে না। প্রেম কিংবা বিয়ে নয় একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যে সম্পর্কের মধ্যে কোন আইন বা সমাজের কোন বন্ধন নেই। অথচ একজন আরেকজনের অনেক কাছের। যে সম্পর্কের মধ্যে কোন অশালীনতা বা অনৈতিকতার কোন চিহ্ন নেই তেমনি পবিত্র একটা সম্পর্ক। এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমের ঘোরে তারেক রিভার দিকে মুখ ফেরালো, তন্দ্রা, ত, ত, ত…….
এতক্ষণ রিভা তারেকের বিপরীত মুখী হয়ে পাশেই শুয়েছিল এবার সেও তারেকের দিকে মুখ ফিরিয়ে তারেককে এটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, এই, এই…
তারেক চমকে উঠল, কী? কী হয়েছে?
রিভাও তারেককে জড়িয়ে ধরল, কী ত, ত… করছ?
তারেক মনে করার চেষ্টা করল কিন্তু কিছু মনে করতে পারল না।

তন্দ্রা বাসায় ফিরে ছন্দাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যে ছন্দা ঘুমিয়ে পড়েছে তারপর থেকে তন্দ্রার শুরু হয়েছে পারভেজের জন্য অপেক্ষার পালা। ছন্দা নিত্যদিনের মতো টি.ভি দেখতে দেখতে ঘুমানোর চেষ্টা করল। তন্দ্রা লক্ষ্য করেছে গতকাল রাতেও তন্দ্রার পারভেজের জন্য অপেক্ষা করার সময়গুলো খুব লম্বা মনে হচ্ছিল কিন্তু আজ তারেকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে সবসময় শুধু তারই কথা মনে পড়ছে।
পারভেজের প্রাচুর্য আছে, অহঙ্কার করার মতো বংশীয় এবং সামাজিক মর্যাদা আছে কিন্তু তন্দ্রার তো এতকিছুর প্রয়োজন নেই। তার প্রয়োজন একজন ভালো বন্ধু, একজন আদর্শ স্বামী। সেজে গুঁজে গভীর রাত পর্যন্ত সে শুধু স্বামীর জন্যই অপেক্ষা করবে। পারভেজ বাসায় ফিরবে, তাকে একটু সময় দিবে এই তো! কিন্তু গত ক’বছরে পারভেজ ভালো বন্ধু এবং আদর্শ স্বামীর স’ান থেকে অনেকদূর সরে গেছে। পারভেজের সঙ্গে তার হৃদয়ঘটিত রঙ্গিন সম্পর্কটা যেন কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে।
তারেক সুদর্শন, লম্বা, ফর্সা ধবধবে। কথাবার্তায় মার্জিত, কোন অহঙ্কার নেই। পোশাক পরিচ্ছদে রুচিবোধের পরিচয় আছে। তারেকের কথাবার্তায় সরলতা আছে, চোখের দিকে তাকালে তার মনের ছবি ভেসে ওঠে। তারেক খুব সহজে তন্দ্রাকে আপন করে নিয়েছে। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে একদিনের, এক ঘণ্টার আলাপচারিতায় আর কয়েকবার দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তন্দ্রার যেন তারেককে একজন বন্ধু হিসেবে নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়েছে। একদিন পারভেজের বাইরে সে কাউকে কল্পনা করতে পারতো না অথচ আজ তারেকের সঙ্গে কথা বলে তার মনে হয়েছে তারেক তার অনেক কাছের, অনেক আপন একজন মানুষ। তন্দ্রার চোখের সামনে এখন অন্য এক দিগন্ত, অন্য এক জগত।
তন্দ্রা একটু ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু ঘুম নেই। গতকালই তো, তন্দ্রা যখন ঘুমানোর চেষ্টা করছিল তখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল পারভেজের ছবি, পারভেজের পাশে থাকা এক অচেনা তরুণীর ছবি। আর আজ! আজ পারভেজের কথা ভাবতে গেলেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তারেকের ছবি, একটা অন্যরকম নতুন সম্পর্কের অনুভূতি। শৈলী ঠিকই বলেছে, পৃথিবীতে এসে কষ্ট করতে করতেই যদি সারাজীবন কেটে যায় তবে এই জগতে আসার অর্থ কী? আমার একটু সুখ চাই, শান্তিতে জীবন-যাপন করতে চাই।
তন্দ্রা বলল, তুই তো সুখেই আছিস?
সুখে নেই। অর্থ বিত্তের মধ্যে আছি। কিন্তু আমার সব চাই। অর্থ বিত্তও চাই, সুখ-শান্তিও চাই।
তন্দ্রা বলল, শৈলী একজীবনে সব হয় না। কোন না কোন শূন্যতা তো থাকবে, কোন না কোনদিক সেক্রিফাইজ তো করতেই হবে।
কিন্তু আমার এক জীবনেই সব চাই।
সেদিন শৈলীর কথাগুলো তন্দ্রার কাছে অসংলগ্ন বলে মনে হয়েছিল। তন্দ্রা বলেছিল, শৈলী এভাবে বলতে হয় না। মানুষ খারাপ বলবে।
বলবে, মানুষের খারাপ বলাতে তো আমার কিছু যায় আসে না। সবার কাছে ভালো হওয়ার জন্য বাবা-মা’র বেঁধে দেয়া পাত্রকে বিয়ে করেছি। অনেকদিন ভালো থাকার কম্পিটিশন করেছি কিন্তু ভালো থেকে কোন লাভ নেই। আমি আর ভালো থাকার কম্পিটিশনে নেই। এখন থেকে আমার যা ইচ্ছা তাই করবো। সামাজিক শৃঙ্খলে থেকে সুখ খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। এখন এই বৃত্তটা অতিক্রম করে যদি সুখ পাই তবে আমি বৃত্তের বাইরেই সুখ খুঁজবো।
সেদিন তন্দ্রা শৈলীকে ধিক্কার দিয়েছিল, ছিঃ শৈলী মেয়েদের এভাবে কথা বলতে হয় না।
শৈলী তন্দ্রার ধিক্কারের জবাব দিয়েছিল তিরস্কারের মাধ্যমে, ও কথা বলার বেলাতেও মেয়ে-ছেলে তফাৎ আছে নাকি? তা থাকতেই পারে। সমাজটা তো পুরুষের হাতের তৈরি। তাইতো পুরুষরা যাচ্ছেতাই করতে পারে আর নারীরা কোনকিছু করতে পারে না। নারীর হাত-পা বাঁধা।
অনেকটা তাই।
তন্দ্রার এই মেনে নেয়াটা শৈলী মেনে নিতে পারেনি। সে রেগে গিয়েছিল, তুই সবকিছু মেনে নিতে পারিস কিন্তু আমি পারব না। হ্যাজবেন্ড দিনের পর দিন ড্রিঙ্ক করে, অন্য নারী নিয়ে ফুর্তি করে গভীর রাতে বাসায় ফিরবে আর ওয়াইফ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করবে এটা আমাকে দিয়ে হবে না। আমি হ্যাজবেন্ডকেও সমান জবাব দিব।
তন্দ্রা আর কথা বাড়ায় নি। সেদিন শৈলীর কথাগুলো অসংলগ্ন বলে মনে হয়েছিল কিন্তু আজ মনে হচ্ছে শৈলীর কথায় যুক্তি আছে। আজ তারেকের সঙ্গে দেখা করার পর তন্দ্রার বার বারই মনে হচ্ছে তাকে সুখ খুঁজতে হবে বৃত্তের বাইরে এবং সেটা তারেকের কাছে। তারেক তার বিশ্বস’, নির্ভরযোগ্য কিন্তু শত যুক্তি তর্কের মধ্যেও তন্দ্রা তারেকের সঙ্গে তার সম্পর্ককে বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করতে দিতে চায় না।
তন্দ্রার হাত থেকে মোবাইল ফোনটা পড়ে গিয়ে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

তেরো

ছন্দা তন্দ্রাকে তার বাবা-মা এবং শাশুড়িকে একত্রিত করেছিল। পারভেজ আর তন্দ্রার মধ্যে ঘটে যাওয়া ছন্দ পতনে আবার ছন্দ তুলেছিল কিন্তু সেটা ছিল সাময়িক, ক’দিন যেতে না যেতেই পারভেজ আবার আগের মতোই শুরু করল। পারভেজ প্রতিদিন বাসা থেকে বেরিয়ে যায় সেই সকালবেলা। সারাদিনে ভুল করেও একবার ফোন পর্যন্ত করে না। কোনদিন তন্দ্রা ফোন করলে দু’য়েক মিনিট কথা বলেই ব্যস্ত বলে ফোন রেখে দেয়। ফিরে আসে একেবারে গভীর রাতে, তন্দ্রা লক্ষ্য করেছে বেশির ভাগ দিনই পারভেজ ড্রিঙ্ক করে বাসায় ফেরে, তবে মাতাল না একেবারে স্বাভাবিক। বাসায় এসেই কাপড় পরিবর্তন করে শুয়ে পড়ে, তারপর গভীর ঘুম।
সেদিন রাতে তন্দ্রা ছন্দাকে ঘুমিয়ে রাখার জন্য বিছানায় শুয়েছিল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই। যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। তন্দ্রা পারভেজকে ফোন করল। কয়েকবার রিং করার পর পারভেজ রিসিভ করল, হ্যালো।
তন্দ্রার কানে টি.ভি’র শব্দ ভেসে এলো সেই সাথে নারী কণ্ঠস্বর। তন্দ্রার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল, হ্যালো, তুমি কোথায়?
কেন?
কেন আবার? বাসায় আসবে না?
আসছি।
তন্দ্রা ফোন রাখল। পারভেজ বাসায় এলো আরো প্রায় আধ ঘণ্টা পর। পারভেজ বরাবরের মতোই কাপড় বদলে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, খাবে না?
না।
কেন?
খেয়ে এসেছি।
তন্দ্রা আর কোন কথা বলল না। সে পারভেজের কাপড় গুছিয়ে রাখতে তার হাতে পড়ল একটা লম্বা চুল। সে কয়েক সেকেন্ড চুলটা হাতে নিয়ে ভাবল, হ্যাঁ কোন নারীর চুল। তন্দ্রা কষ্ট পেল, তার চোখ দু’টো যেন ঝাপসা হয়ে এলো। সে কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বিছানার কোনায় বসে পারভেজকে মৃদু ঝাঁকুনি দিল, এই।
পারভেজের কোন সাড়া নেই।
সে আবার ডাক দিল, এই।
পারভেজের ঘুম জড়ানো গলায় বলল, হুঁ।
ওঠো তো।
কেন?
তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
কাল বলো।
তন্দ্রা রেগে গেল, কাল না আমি আজই বলবো। এখনই।
এত তাড়া কীসের?
না আমাকে এখনই বলতে হবে। আমি কোন কিছু বলতে গেলে তুমি বলো কাল বলো, আবার দিনের বেলা বলতে চাইলে ব্যস্ততা দেখাও। তাহলে আমি কখন তোমার সাথে কথা বলবো?
এত কথার কী আছে? কোন সমস্যা?
হ্যাঁ। তুমি ওঠো।
পারভেজ উঠল না। যেভাবে শুয়েছিল সেভাবেই বলল, তাহলে বলো।
তুমি কার বাসায় গেছিলে আজ?
কার বাসায় মানে?
মনে হয় বুঝতে পাচ্ছ না। আমি যখন তোমাকে ফোন করলাম তখন তুমি কারো বাসায় ছিলে, শুধু বাসায় না, কোন মেয়ের কাছে। তুমি শেষ পর্যন্ত…
তন্দ্রা ভেবেছিল পারভেজ প্রতিবাদ করবে, রেগে যাবে কিন্তু সে কিছু বলল না।
তুমি ব্যবসার কথা বলে দেরিতে বাসায় আসো, আমাকে সেক্রিফাইজ করতে বলেছ, আমি সেক্রিফাইজ করেছি। তুমি ড্রিঙ্ক করো তাও আমি মেনে নিয়েছি কিন্তু তুমি অন্য মেয়ের কাছে গিয়ে…বলতে বলতে তন্দ্রার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
পারভেজ তবুও কোন কথা বলল না।
তন্দ্রা আবার বলতে শুরু করল, এটা তো কোন নারী মেনে নিতে পারে না। তুমি সারাদিন বাসায় থাকো না, আমি ছন্দাকে নিয়ে বোবার মতো বাসায় দিন কাটাই। তোমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আর তুমি যখন বাসায় ফেরো তখন ফেরো ড্রিঙ্ক করে অন্য নারীর সঙ্গে ফুর্তি করে। সেক্রিফাইজ করতে করতে আর ধৈর্য ধরতে ধরতে আমি যে আর পারছি না।
তবে কী করতে চাও?
আমি কিছু করতে চাই না। আমি চাই তুমি ওসব রাস্তা থেকে ফিরে এসো।
পারভেজ রেগে গেল, তন্দ্রা আমার ঘুম পেয়েছে, তুমি কি আমাকে একটু ঘুমাতে দিবে?
তন্দ্রা আর কোন কথা বলল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সে কিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। তার মুখ থেকে যেন হাসি হারিয়ে গেছে। পারভেজের প্রতি তার সমস্ত বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা হারিয়ে গেছে। পারভেজের কাছে তার নিজেকে মূল্যহীন, বোঝা বলে মনে হচ্ছে। তন্দ্রা বার বার মনে হচ্ছে যদি তার কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকতো তবে সে এক মুহূর্ত পারভেজের কাছে থাকতো না।
পারভেজের নিষেধ সত্ত্বেও তন্দ্রা মিতুর সাথে একদিন তন্দ্রা ছন্দাকে নিয়ে তার শ্বশুর বাড়ি গেল। পারভেজ তখন তিন দিনের অফিসিয়াল কাজে চট্টগ্রাম গেছে, তন্দ্রা সেসুযোগটাই নিল। তন্দ্রা পা ছুঁয়ে সালাম করতেই তার শাশুড়ি তন্দ্রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ছন্দাকে কোলে নিয়ে অনেক আদর করলেন, কাছে বসিয়ে নিজে তুলে খাওয়ালেন। সুযোগ বুঝে তন্দ্রা তার শাশুড়িকে পারভেজের গভীর রাতে ড্রিঙ্ক করে বাসায় ফেরা, গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে লঙ ড্রাইভে যাওয়া সবকিছু খুলে বলল।
তন্দ্রার শাশুড়ি গভীর মনোযোগ সবকিছু শুনলেন। কয়েক মুহূর্ত তন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখ দু’টো পানিতে ছলছল করছিল।
তন্দ্রা বিনয়ের সুরে বলল, সেজন্য আমি আপনার কাছে এসেছি আম্মা। আমি ছন্দাকে নিয়ে আপনার কাছে একেবারে চলে আসবো বলে।
ছন্দা এতক্ষণ দূরে খেলা করছিল। সে দৌড়ে তন্দ্রার কাছে আসতে গিয়ে তার দাদির সামনে পড়ে গেল। তন্দ্রার শাশুড়ি ছন্দাকে কোলে তুলে নিলেন। তাঁর দু’চোখে পানি এসে গেল।
তন্দ্রার দু’চোখে পানি এসে গেল। সে রুদ্ধ স্বরে বলল, আম্মা আপনি কিছু বলুন?
তন্দ্রার শাশুড়ি ছন্দাকে একটা চুমু দিয়ে মৃদু হেসে বলল, আমি আর কী বলবো বউমা?
তন্দ্রার বুকটা ভরে গেল। তার মনে আজ অনেক সাহস জমেছে। এতদিন তার মনে হতো এবাড়ির দরজাটা বুঝি তার জন্য কোনদিন উম্মুক্ত হবে না। আজ তার শাশুড়ির সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে আরো আগে তার শাশুড়ির কাছে আসা উচিত ছিল।
তন্দ্রা আবারো তার শাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করল।

চৌদ্দ

তন্দ্রা গতকাল তার শাশুড়ির কাছ থেকে আসার পর থেকে অনেক ভেবেছে, তার বার বার মনে হয়েছে শ্বশুর বাড়িতে তার শ্বশুর আছে, শাশুড়ি আছে, জা আছে সঙ্গে তাদের দুই ছেলেমেয়ে আছে। বাসায় ঢুকতে কিংবা বের হতে একবার হয়ত পারভেজ তার মা’র চোখে পড়বে। মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না, সেখানে যেমন আছে মায়ের স্নেহের আঁচল তেমনি শাসন। তন্দ্রা একবার মিতুর সঙ্গে কথা বলল। মিতু শুনে বলল, চলে আয়।
তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, এই তুই কোথায় রে?
আমার শ্বশুর বাড়ি।
তবে যে বলছিস চলে আয়, আমি ভেবেছিলাম তুই বোধ হয় বাবার বাড়ি আছিস।
ঐ হলো।
মিতু একটু সিরিয়াসলি বল। আমার কি ঠিক হবে?
মিতু একটু সিরিয়াস হলো, দেখ তন্দ্রা আমার মনে হয় মা বাবাকে ম্যানেজ করতে পারবে কিন্তু প্রবলেম ভাইয়াকে নিয়ে।
তা অবশ্য ঠিক তোর ভাইয়া আগেও একদিন আমাকে নিষেধ করেছে। আচ্ছা একবার ভেবে দেখি।
দেখ কী করছিস আমাকে জানাস কিন্তু।
অবশ্যই জানাবো।

পরদিন সকাল থেকেই তন্দ্রা তারেকের ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তারেক তো তার সেই নির্ধারিত সময়ে ফোন করবে। তন্দ্রা এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলাপ করবে জানলে অবশ্যই আগে ফোন করতো। তন্দ্রা একবার মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকালো। এগারোটা বাজে। আজ সেই প্রথম ফোন করল।
তারেক রিসিভ করেছে, হ্যালো তন্দ্রা।
তন্দ্রা একটু অভিমানের সুরে বলল, তোমার সময় হচ্ছে না, না?
এই তো আর কয়েক মিনিট পরেই তো তোমাকে ফোন দিতাম।
তা জানি কিন্তু আমি একটা বিষয় নিয়ে সিরিয়াস টেনশনে আছি।
আমাকে বলবে?
হ্যাঁ তোমাকে বলবো বলেই তো ফোন করেছি। তুমি ফ্রি তো?
হ্যাঁ বলো?
গতকাল আমি শ্বশুর বাড়ি গেছিলাম।
তুমি না একদিন বললে পারভেজ তোমাকে নিষেধ করেছে?
হ্যাঁ তারপরও গেছি।
তারপর-
আমার শাশুড়ি তো আমাকে আর ছন্দাকে দেখে খুব খুশি।
খুশি তো হবারই কথা। যেমন সুন্দর মা, তেমন সুন্দর তোমার মেয়ে।
তন্দ্রা এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে কথা বলছিল এবার তারেকের কথা শুনে হেসে ফেলল, এই তুমিও বিষয়টা হাল্কাভাবে নিচ্ছ। আমি বলেছি না আমি একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলবো।
সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় কি মুখ-চোখ কালো করে, কণ্ঠস্বর গম্ভীর করে কথা বলতে হয়।
তন্দ্রা আবারো হেসে ফেলল, আচ্ছা ঠিক আছে বলছি।
বলো?
কথায় কথায় আম্মাকে ছন্দাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে একেবারে চলে যাওয়ার কথা বললাম।
তারপর-
তিনি ষ্পষ্ট করে কিছু বলেন নি, তবে আমার মনে হয় আমি গেলে তিনি নিষেধ করবেন না।
তুমি কি যেতে চাচ্ছ?
সেজন্যই তো তোমাকে ফোন করলাম।
তারেক কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিল, তারপর বলল, আমার মনে হয় তোমার যাওয়া উচিত।
যদি কোন প্রবলেম হয়?
একবার ভেবে দেখ কী প্রবলেম হতে পারে?
আম্মার তো সম্মতি আছে কিন্তু আব্বার সঙ্গে তো আমার কোনদিন দেখাই হয়নি। শুনেছি তিনি নাকি খুব কড়া মানুষ।
তোমার শাশুড়ি ম্যানেজ করতে পারবে না।
যা বুঝলাম তাতে তো পারবে বলে মনে হয়।
তাহলে আর কি প্রবলেম হতে পারে?
পারভেজ যদি কিছু বলে? একদিন আমাকে একটা খুব খারাপ কথা বলেছে।
তোমার শ্বশুর-শাশুড়ি যদি মেনে নেয় তবে ও আর কিছু বলতে পারবে না। প্রথম প্রথম তোমার ওপর একটু রাগ করতে পারে, একসময় ঠিক হয়ে যাবে।
তন্দ্রা একটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল, তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার ডিসিশন নেয়া সহজ হলো তারেক, তুমি আমার…
তারেক বাধা দিয়ে বলল, থাক, থাক আর বলতে হবে না।
মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানো?
কী?
বাবা আমার নামটা তন্দ্রা রেখে ভুল করেছে।
কেন?
আমার নাম হওয়া উচিত ছিল তন্দ্রাহারা।
এমন কথা বলতে হয় না। তুমি শুধু তোমার প্রবলেমটার কথা ভাবছ, আসলে একেকজনের প্রবলেম একেক রকম, সবকিছু নিয়েই চলতে হবে।
আমার জন্য দোয়া করো তারেক।
অবশ্যই।
পনেরো

তন্দ্রার শাশুড়ি হোসনে আরা হেনা। সংসারটাকে সাজিয়েছেন নিজের মতো করে। স্বামী ব্যবসায়ী, তিনি সারাজীবন ছুটেছেন টাকার পেছনে। টাকা রোজগার ছাড়া সংসারের অন্যান্য কাজ একজন পুরুষ মানুষের মতো করেই করেছেন। স্বামীর পাশে থেকেছেন একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে। তাই ছেলেমেয়েরা সবাই আজ উচ্চ শিক্ষিত। তিনি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। সে সময় দেশে চাকরির অভাব ছিল না। তাঁর নিজেরও ইচ্ছা ছিল চাকরি করবেন কিন্তু বাবা-মা রক্ষণশীল পরিবারের হওয়ায় সে সময় আর চাকরি করা হয়নি। আগে তিনি এই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন, বেলকনিতে বসে পুরো বাসার ওপর নজরদারি করতেন। একে একে ছেলেমেয়েরা আসতো তিনি বুয়াকে জোরে ডাক দিয়ে বলতেন কুলসুম দরজাটা খুলে দে তো, অমুক এসেছে। তারপর নিজে ডাইনিং টেবিলে খাবার বাড়িয়ে দিতেন।
একে একে ছেলেমেয়েরা বড় হলো। মুরাদের বিয়ে হলো তাকে একটা ফ্ল্যাট ছেড়ে দিলেন। আরেকটা ফ্ল্যাট ছেড়ে দিলেন মিতু আর পারভেজকে। তিনি নিচতলায় চলে এলেন। মিতুর বিয়ের পর অনেক দিন থেকে ফ্ল্যাটটা ফাঁকাই পড়ে আছে। তাঁর সেই স্মৃতিময় বেলকনিটা এখন শুধুই স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে। পারভেজ তন্দ্রাকে বিয়ে করার পর আর এ বাড়িতে আসেনি। স্বামী আসিফ সাহেব অনেকটা জেদি প্রকৃতির। অনেকটা একগুঁয়েমি করে বলে ফেললেন, কাকে না কাকে বিয়ে করেছে আর আমার বাড়িতে উঠবে, না?
তাঁর জিদের সময় হেনা কোনদিন প্রতিবাদ করেন নি। তিনি মেনে নিয়েছেন যত কষ্টই হোক। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তন্দ্রাকে বাড়িতে তোলাটাই প্রথম প্রতিবাদ। না, প্রতিবাদ করতে চান না হেনা। কৌশলে, মানবিক দৃষ্টিতে, নিজের সন্তানকে কাছে পাবার যুক্তিতে তিনি বিষয়টি উপস’াপন করবেন স্বামীর কাছে।
হেনা কুলসুমকে আগেই বলে রেখেছিলেন। রাতের খাবারের পর আসিফ সাহেব কিছুক্ষণ টি.ভি’র সামনে বসেন। এই সময়টায় স্বামী-স্ত্রী সংসারের ভালো-মন্দ নিয়ে কথা বলেন। আজো বসেছেন এমনসময় কুলসুম ছন্দাকে নিয়ে এলো। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই ছন্দা হেনার কাছে গেল। হেনা ছন্দার মুখ তার দাদুর দিকে ঘুরিয়ে দিল, যাও, কাছে যাও।
আসিফ সাহেব কোলে নিয়ে আদর করলেন, বাহ্‌ খুব সুন্দর তো, কী নাম তোমার?
ছন্দা।
আসিফ সাহেব একবার ছন্দার দিকে আরেকবার হেনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে মেয়েটি?
হেনা কিছুটা অভিমানের সুরে বললেন, এভাবে বলো, পরিচয় দিলে তো লজ্জা পাবে।
কে?
আমাদেরই নাতনি।
মানে?
পারভেজের মেয়ে।
আসিফ সাহেবের পর্বতসম জিদ যেন মুহূর্তেই গলে গেল। তাঁর দু’চোখের কোণায় পানি জমল। তিনি ভেজা কণ্ঠে বললেন, হেনা আজ সারাজীবনে একবারই আমি তোমার কাছে হেরে গেলাম। ছন্দা, এই ছন্দার জন্য…বলতে বলতে তিনি ছন্দাকে কোলে তুলে নিলেন।
হারজিতের কথা বলছ কেন? আমাদের ছেলে, আমাদের বউমা, অথচ বাইরে ভাড়া বাসায় থাকবে, আমাদের নাতনিকে আমরা চিনবো না এটা তো হয় না।
আসিফ সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন, তুমি একটা বড় রিস্ক নিয়েছিলে।
হেনা ইন্টারকমের রিসিভার তুললেন, বউমা, একবার নিচে এসো তো।
তন্দ্রা যেন এমন একটা ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার মনের মধ্যে অনেক শঙ্কা, কী ঘটতে যাচ্ছে তার জীবনে। তন্দ্রা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নেমে ড্রয়িং রুমে ঢুকে শ্বশুরের পা ছুঁয়ে সালাম করল।
আসিফ সাহেব হাততালি দিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন। তন্দ্রার বুকটা কেঁপে উঠল, এই হাসি আনন্দের নাকি নিষ্ঠুরতার তা বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। আসিফ সাহেব হাসি থামিয়ে বললেন, বসো বউমা, বসো।
তন্দ্রা বুঝতে পারল তার ভাগ্যের ওপর থেকে গাঢ়, কালো মেঘটা সরে গেছে। তার মুখের ওপরও একটা হাল্কা তৃপ্তির নি:শ্বাস ফুটে উঠল। তন্দ্রা শ্বশুরের সামনে সোফায় বসতে কিছুটা ইতস্তত করল। সে তার শাশুড়ির মুখের দিকে একবার তাকালো। হেনা তাকে বসার জন্য ইশারা করলেন।
আসিফ সাহেব বলতে শুরু করলেন, হেনা আমি আগে জানতাম না যে তোমার মধ্যে এত বড় একটা গুণ আছে।
হেনা আসিফ সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন, কী গুণ?
তুমি নিজেও হয়ত জানো না।
হেনা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আসিফ সাহেব বললেন, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে তুমি যদি নাটক লিখতে তবে ভালো করতে।
হেনা লজ্জা পেলেন।
তন্দ্রা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইল। হেনা ওপরে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন। তন্দ্রা সালাম দিয়ে ওপরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর তন্দ্রার বাসার কলিং বেল বেজে উঠল। তন্দ্রা দরজা খুলে দিতেই কুলসুমের সঙ্গে আট দশ বছর বয়সের একটা ছেলে দৌড়ে ভেতরে এলো। পেছনে পেছনে এলো একটা মেয়ে, বয়স বারো চৌদ্দ। আরো পেছনে এলো এক ভদ্র মহিলা। কুলসুমই পরিচয় করে দিল, ভাবী ইনি হচ্ছেন ছোট ভাবী।
কুলসুম এবার তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বলল, আর ইনি হচ্ছেন বড় ভাবী মানে সানু ভাবী।
তন্দ্রা সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিল, ভাবী আমার নাম তন্দ্রা।
সানু কিছুটা ভাব গম্ভীর দৃষ্টিতে তন্দ্রার দিকে আপাদমস্তক তাকিয়ে বলল, তোমার কথা শুনেছি, তুমি এলে তাহলে?
কথাটা এমনভাবে বলল যেন তন্দ্রার এ বাসায় আসার কথা না। তন্দ্রার একবার ইচ্ছা হলো তাকে জিজ্ঞেস করবে কেন তার এ বাড়িতে আসতে কোন বাধা আছে নাকি কিন্তু তন্দ্রা তার প্রথম দিনেই বিতর্কে জড়াতে চাইল না।
সানু চলে গেল।
তন্দ্রা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী নাম আম্মু?
টুনটুনি।
কোন ক্লাসে পড়?
ক্লাস এইটে।
আর তুমি? তন্দ্রা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল।
ক্লাস টুতে।
তোমার নাম কী আব্বু?
রনি।
রনি ছন্দাকে আদর দিল। টুনটুনি ছন্দাকে কোলে তুলে নিল।

তন্দ্রার দুশ্চিন্তার শেষ এখানেই নয়। এ বাড়িতে তার ঠাঁই হয়েছে কিন্তু পারভেজ এখনো কিছু জানে না। জানার পর সে যদি কিছু মনে করে। তন্দ্রাকে…
না, তন্দ্রা সে ভয় করে না। তার শাশুড়ি তাকে যেভাবে এ বাড়িতে বসিয়েছে, তার শ্বশুর তাকে যেভাবে গ্রহণ করেছে তাতে করে পারভেজ আর না করতে পারবে না।

ষোল

একে একে সব হলো। তন্দ্রার মনের মধ্যে একটা কষ্ট ছিল। যখন সে বনশ্রীতে ভাড়া বাসায় ছিল তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। পারভেজের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাদের বাড়িতে তার কোন স’ান না থাকায় নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হতো। শ্বশুর বাড়িতে আসার পর তার সেই কষ্ট কিছুটা মোচন হলো। তন্দ্রার ধারণা ছিল পারভেজ তাদের বাড়িতে থাকলে বাড়ি থেকে যাওয়া-আসার ওপর তার শাশুড়ির একটা শাসন থাকবে, একটু হলেও জবাবদিহিতা থাকবে। জবাবদিহিতা থাকল, কোনদিন গভীর রাতে বাড়িতে ফিরলে পরদিন পারভেজকে জিজ্ঞেস করতেন, কী রে এক সঙ্গে কাজ করিস, তোর বাবা তো ম্যানেজিং ডাইরেক্টর সন্ধ্যার আগেই চলে আসে, তোর ভাই ডাইরেক্টর এডমিনও সন্ধ্যার আগেই আসে তোর আবার এতো দেরি হয় কেন?
কাজ করতে করতে অনেক দেরি হয়ে যায় মা।
ও ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, ডাইরেক্টর এডমিনের চেয়ে ডাইরেক্টর ফাইন্যান্সের কাজ বেশি নাকি?
অবশ্যই বেশি মা। টাকা-পয়সার ব্যাপারটা তো আমার কাছে, সবকিছুর মুলেই তো টাকা। একটু হিসেবটা ভালো করে দেখেশুনে না রাখলে কেমন করে হবে, বলো?
কথা বললে তো তর্ক করবি, যুক্তি দেখাবি। অফিসে কাজ শেষ হলে একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসিস। বউমা সারাদিন একা একা থাকে, বোর ফিল করে। ছন্দাও তোকে দেখার জন্য অসি’র হয়ে ওঠে।
একা কেন মা? ছন্দা আছে, তুমি আছ, পাশের ফ্ল্যাটে ভাবী আছে।
আমি এত কিছু বলতে চাচ্ছি না। তুই অফিস শেষ করে বাসায় আসবি এটাই।
পারভেজ বিরক্তির সুরে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে।
দোতলায় উঠে এসে পারভেজ তন্দ্রার দিকে রাগান্বিত চোখ তুলে তাকায়, তন্দ্রা তুমি ইদানীং মাকে সব কথা বলো?
কী সব কথা?
এই যে আমি কখন আসি, এত রাত পর্যন্ত আমি কোথায় যাই, এসব…
আমি বলবো কেন? আম্মা তো এবাড়ির সবার দিকে নজর রাখে। তোমার যাওয়া-আসা আমাকে বলতে হবে কেন?
পারভেজ তন্দ্রার কথায় সন্ত্বোষ্ট হতে পারল না। একটা নি:শ্বাস টেনে বলল, বুঝেছি।
তন্দ্রা কিছু বলল না ’’বুঝেছি’’ কথাটার অর্থ যে অনেক বেদনাদায়ক হতে পারে এটা অনুমান করে তার বুক কেঁপে উঠল।
এ বাড়িতে আসার পর প্রথম দিকে পারভেজের আচরণে একটু পরিবর্তন হলেও দিনে দিনে আবার সে আগের মতোই বদলে গেল। মায়ের শাসন আর স্ত্রীর ভালোবাসা তাকে নিষিদ্ধ পথ থেকে ফেরাতে পারল না। পারভেজের আচরণে তার শাশুড়ি বিরক্ত হলেন, একসময় শাসনও ছেড়ে দিলেন। ফলে এবাড়িতে আসায় তন্দ্রা পারভেজের যতটুকু নৈতিক উন্নতি আশা করেছিল তার অনেকটাই অপরিপূর্ণ রয়ে গেল।
প্রথম দিন সানুর তন্দ্রার দিকে আপাদমস্তক তাকানোর ভঙ্গিটা তন্দ্রার বার বার মনে পড়ে, কেমন যেন তন্দ্রাকে সে তুচ্ছ করেছিল। তারপরও তন্দ্রা সানুর সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। গায়ে পড়ে সানুর বাসায় গিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু তন্দ্রা লক্ষ্য করেছে সানু সবসময় তার আর নিজের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি করে। সানু তাকে কোন কথা বলতে গিয়ে যেন মেপে মেপে কথা বলে। তার কথাবার্তায় সবসময় একটা বাবার বাড়ির অহঙ্কার লেগেই থাকে। তবু সবকিছু পাশ কাটিয়ে তন্দ্রা যথেষ্ট চেষ্টা করেছে তার সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে। কিন্তু এর মধ্যে ঘটল আরেক ঘটনা। দুই জা’য়ের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও ছন্দার সঙ্গে টুনটুনি আর রনির মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে টুনটুনি ছন্দাকে তাদের বাসায় নিয়ে যায়। একদিন খেলতে খেলতে ছন্দা একটা গ্লাস ভেঙ্গে ফেলল। এনিয়ে সানু ছন্দাকে একটা ধমক দিতেই ছন্দা আতঙ্কে কেঁদে উঠল। এ পর্যন্তই শেষ নয়, সানু ছন্দাকে হাত ধরে তন্দ্রার কাছে নিয়ে এলো, দেখ তন্দ্রা ছন্দা আমার কত শখের গ্লাসটা ভেঙ্গে ফেলল। তুমি তোমার বাচ্চাকে একটু শাসন করো। এভাবে দুষ্টুমি করলে তো বড় হয়ে-
তন্দ্রা সানুর কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, ছোট বাচ্চারা একটু দুষ্টুমি করতেই পারে আপা তাই বলে আপনি ছন্দাকে যে ধমক দিলেন-
ও আমারাই দোষ হয়েছে, না? ঠিক আছে তুমি ছন্দাকে একটু দেখে রাখ। এরকম দুষ্ট বাচ্চা নিজের কাছে রেখে দিও। আবার আমার বাসায় গিয়ে কী না কী করে।
তন্দ্রার খুব খারাপ লাগল। সানু যখন ছন্দাকে জোরে ধমক দিয়েছিল তাতেই তন্দ্রার চোখ থেকে ছিটকে পানি এসেছিল। তারওপর এভাবে বাসায় এসে বলায় তন্দ্রা আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। প্রতিবাদ করতে গিয়ে তন্দ্রা শুধু তার উচিত অনুচিতটা ধরে দিয়েছে তাতে সানু তাকে ছন্দাকে তাদের বাসায় যেতে নিষেধ করল।
তন্দ্রা প্রচণ্ড রেগে সে বলল, এভাবে না বলে সোজা কথায় তো বলতে পারেন আপা ছন্দা যেন আমার বাসায় না আসে।
হ্যাঁ তাই করো। আবার যেন তোমাকে আমার কিছু বলতে আসতে না হয়, বলে সানু উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেল।
সেদিনের পর থেকে তন্দ্রার সঙ্গে সানুর কথাবার্তা বন্ধ হলো। শুধু তাদের দু’জনের মধ্যেই নয়। টুনটুনি আর রনির সাথে ছন্দার কথা বলাও বন্ধ হলো। ফলে একই ছাদের নিচে, পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকলেও দ্বিতীয় তলায় তন্দ্রা আর ছন্দা একা। নিচতলায় শাশুড়ি থাকে। তাঁর সঙ্গে তন্দ্রার সম্পর্ক ভালো কিন্তু বয়সের তফাতের কারণে এই ভালো সম্পর্কের মাঝেও একটা দূরত্ব আছে। তন্দ্রা শাশুড়িকে কোন কথা বলতে গিয়ে যেন থমকে যায়, আগে চিন্তা করে বলা ঠিক হবে কী না।
কয়েক দিন পর সেদিন সকালবেলা মিতু এলো। নিচে মাকে সালাম দিয়েই ওপরে চলে এলো, তন্দ্রা দরজা খুলে দিতেই মিতু তন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরল, ভাবী।
দু’জনে কথা বলতে বলতে ড্রয়িং রুমে ঢুকল। মিতু একটা সোফায় বসে বলল, বস আগে তোর সঙ্গে কথা বলি, বল কেমন আছিস?
তন্দ্রা ডানে-বাঁয়ে মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দিল।
কেন? কে কী করেছে আমাকে বল?
কেউ কিছু করেনি রে, সব দোষ আমার কপালের।
তন্দ্রা কিছুটা অভিমানের সুরে বলল, এই, এভাবে কথা বলছিস কেন? আম্মা কিছু বলেছে?
উঁহু। আম্মা তো আমাকে খুব স্নেহ করেন।
তাহলে বড় ভাবী? ওর কথা আর বলিস না। সাঙ্ঘাতিক আত্মকেন্দ্রিক। নিজেরটা ছাড়া কিছু বুঝে না। বিয়ের ক’মাস পর থেকে নিজেই আলাদা হয়েছে। দেখ মা’র সঙ্গে যে বউ মিলেমিশে থাকতে পারে না জা’র সঙ্গে সে কীভাবে থাকতে পারবে। বাদ দে তো ওসব।
তন্দ্রার আর কিছু বুঝতে বাকি নেই।
মিতু আবার বলতে শুরু করল, তুই আগে যেমন একা থাকতিস সেভাবে থাকবি। মা তো তোকে ভালো জানে?
হ্যাঁ।
শোন আমার মা’র মতো শাশুড়ি পাওয়া অনেক ভাগ্যের।
তা ঠিক বলেছিস।
তাহলে তো সব মিটেই গেল। তোর ষোলকলা পূর্ণ হলো।
তন্দ্রা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, না রে, আসল প্রবলেম যেটা ছিল সেটা তো আর সলভ হলো না।
তুই কি ভাইয়ার কথা বলছিস?
তন্দ্রা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
ধীরে ধীর সব ঠিক হয়ে যাবে।
তন্দ্রা মিতুর একটা হাত চেপে ধরে তার মুখের দিকে তাকালো, আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস?
মিতু কোন কথা বলল না। কয়েক মুহূর্ত দু’জনে চুপ করে রইল। তারপর তন্দ্রা হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, তুই বস আমি তোকে নাস্তা দিচ্ছি।
এখানে নাস্তা খাবো না রে, তুইও চল নিচে গিয়ে ভাত খাবো।
তন্দ্রা একবার ঘড়ির দিকে তাকালো, ও তাইতো।

সতেরো

হঠাৎ করেই পারভেজ সেদিন বাসায় ফিরল না। রাত বারোটা, সাড়ে বারোটায় বাসায় ফেরাটা পারভেজের স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু রাত একটা পর্যন্ত সে যখন বাসায় ফিরল না তখন তন্দ্রা বার বার করে তাকে ফোন দিল কিন্তু পারভেজের মোবাইল ফোন বন্ধ।
মোবাইল ফোন চালু হলো পরদিন সকাল ন’টায়। তন্দ্রার ফোন রিসিভ করল, হ্যালো।
তন্দ্রা উৎকণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, কোথায় তুমি?
অফিসে।
রাতে কোথায় ছিলে? বাসায় এলে না যে?
তন্দ্রা আমি পরে তোমার সঙ্গে কথা বলবো। এখন অফিসের কাজে একটু ব্যস্ত আছি, বলে পারভেজ মোবাইল রেখে দিল।
বিকেলে তন্দ্রা একবার নিচ তলায় গিয়েছিল। তন্দ্রার মুখ কালো দেখে তার শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন, কাল রাতে বোধ হয় পারভেজ আসেনি বউমা?
তন্দ্রা নীরব সমর্থন দিল।
কোথায় ছিল কিছু বলেছে?
না মা।
হেনা আর কোন কথা বললেন না। তার মুখের ওপর একটা বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল।
সারাদিন পারভেজের আর কোন কথা নেই। বাসায় এলো রাত দশটায়। প্রায় দিন পারভেজ বাসায় আসে গভীর রাতে ততক্ষণে ছন্দা ঘুমিয়ে পড়ে আজ অনেকদিন পর বাবাকে দেখে ছন্দার সে কী আনন্দ! আব্বু এসেছে! আব্বু এসেছে! বলে হাত তালি দিল। কিন্তু পারভেজ একবারো ছন্দার হাতটা পর্যন্ত ধরল না, একটুও আদর করল না। তার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। তার চোখে-মুখে যেন একটা বিরক্তির ভাব ফুটে আছে, চোখ দু’টো লাল, সমস্ত শরীরে ক্লান্তির ছাপ।
তন্দ্রার ইন্টার কম বেজে উঠল। নিচ তলা থেকে তার শাশুড়ি রিং করেছে, বউমা, পারভেজকে নিচে আসতে বলো তো।
তন্দ্রা ইন্টার কমের রিসিভার কানে ধরে রেখেই পারভেজকে বলল, এই আম্মা তোমাকে নিচে যেতে বলছে।
পারভেজ বলল, বলো আমি খুব টায়ার্ড।
তুমিই বলো।
পারভেজ তন্দ্রার দিকে এগিয়ে গিয়ে রিসিভার হাতে নিল, মা আমি খুব টায়ার্ড।
হেনা আর কোন কথা না বলে রিসিভার রেখে দিলেন।
পারভেজ রিসিভার রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
তন্দ্রার একবার ইচ্ছা হলো তাকে কিছু বলবে কিন্তু পারভেজ বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে একবার কথা বলার চেষ্টা করল কিন্তু পারভেজ অফিস যাওয়ার জন্য এত ব্যস্ততা দেখল যে তন্দ্রার আর কোনকিছু বলার সুযোগ হলো না।
কয়েকদিন পর আবার একদিন রাতে পারভেজ বাসায় এলো না। তারপর শুরু হলো একটানা দু’রাত, তিনরাত পর্যন্ত বাসায় না ফেরা। কোনকিছু বলতে গেলেই পারভেজ রেগে যায়, সব বিষয়ে কি তোমার কাছে আমাকে জবাব দিতে হবে?
তন্দ্রারও সেদিন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল, হ্যাঁ জবাব দিতে হবে, আমি তোমার স্ত্রী, তুমি রাতে কোথায় থাকো সেটা জানাতে হবে।
হ্যাঁ কথাটা মনে রেখ তুমি আমার স্ত্রী। আমি স্বামী হিসেবে তোমার সব দায়িত্ব পালন করছি। আর কী চাও?
আমি কিছু চাই না, শুধু তোমাকে চাই। তুমি সকালবেলা বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে, রাতের পর রাত বাইরে কাটাবে এটা আমি কোনভাবে মেনে নেবো না।
কী করবে তুমি?
কী করবো? তোমার মাকে সবকিছু বলবো, তোমার বাবাকেও বলবো।
প্রতিদিনই তো সবকিছু বলছ।
এতদিন তোমার মাকে বলেছি, এবার তোমার বাবাকে বলবো। আমার কাছে জবাব দিতে হবে না। তোমার বাবার কাছে জবাব দিও।
পারভেজ প্রচণ্ড রেগে গেল, বলেছি তো তুমি আমার স্ত্রী, আদর্শ স্ত্রীর মতোই থাক।
তন্দ্রা আপতত নিজেকে সামলে নিল।
পরদিন সকালবেলা নাস্তা শেষ তন্দ্রা তার শাশুড়িকে পারভেজের বিষয় কথা তুলল। হেনা সবকিছু শুনে বললেন, তুমি কী বলবে বউমা আমি তো নিজের চোখে সবকিছু দেখছি। তুমি ভাবছ আমি বুঝি না। কিন্তু কী করবো বল। আমার তো আরো একটা ছেলে আছে, কই তার জন্য তো আমাকে কোনদিন ভাবতে হচ্ছে না। এক মায়ের দু’সন্তান তো একই রকম হয় না মা। তুমি একটু ধৈর্য ধরো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তন্দ্রা নিরাশ হলো। তার শাশুড়িকেই বা সে কী বলবে। পারভেজ তো আর ছোট ছেলে নয় যে তাকে শাসন করবে। তবুও প্রথম দিকে তার শাশুড়ি পারভেজকে অনেক বলেছে। সে নিজেও চেষ্টা করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারভেজ ভালো হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। তার অবনতি হচ্ছে যেন দ্রুত গতিতে।
পারভেজ অফিসের কাজের কথা বলে, রাতে পর রাত বাইরে কাটাবে, অন্য নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে এটা কোন নারী মেনে নিতে পারে না। তন্দ্রারও কিছু বলার নেই। বাবার বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে পারভেজকে বিয়ে করেছে, সেদিক থেকে সহানুভ’তি পাওয়ারও কোন সুযোগ নেই। আর বাবা মাকে বলেই বা কী হবে? তারাও শুধু শুধু কষ্ট পাবে। শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে ওপরে উঠে তন্দ্রা বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল।
আর কার কাছে তার মনের কথা খুলে বলবে তন্দ্রা! এখন তার একমাত্র বন্ধু এবং ননদ মিতু। আজকাল সে মিতুকে ছাড়া আর কাউকে কিছু বলে না। এই তো ক’দিন আগে মিতু এলো, তন্দ্রা পারভেজের বিষয় তাকে বলল কিন্তু তারই বা কী করার আছে। মিতু পারভেজের ছোট বোন। বয়সে বড় হলেও একটু বলতে পারতো। পারভেজের আচরণে তন্দ্রার মনটা ভারী হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে কারো কাছে মন খুলে কথা বলতে পারলে হয়ত মনটা একটু হাল্কা হতো। সে মিতুকে ফোন করে তার বাসায় আসতে বলল।
মিতু বাসায় ঢুকতেই জিজ্ঞেস করল, কী রে একেবারে আর্জেন্ট ডাকলি যে?
তন্দ্রা একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, হ্যাঁ আর্জেন্টই তো।
কী ব্যাপার বলতো?
দু’জনে ড্রয়িং রুমে ঢুকল, মিতু জিজ্ঞেস করল, ছন্দা কোথায়?
ও ঘুমাচ্ছে, তুই বস।
আগে মাকে বলি, বলে মিতু সোফা থেকে উঠে বেলকনিতে গিয়ে জোরে ডাক দিল, এই কুলসুম।
কুলসুম বেলকনির নিচেই ছিল, জি আপা।
মাকে বলতো আমি এসেছি। এখন ছোট ভাবীর কাছে। বলে মিতু আবার সোফায় এসে বসল। তন্দ্রা তখনো বসেই আছে আনমনা হয়ে।
মিতু কয়েক মুহূর্ত তন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তুই খুব শুকিয়ে গেছিস রে।
মরে যাইনি তাই ভালো।
কেন? মিতুর কণ্ঠে কৃত্রিম উৎকণ্ঠা।
ইয়ার্কি করছিস না?
না, সিরিয়াসলি বলছি, আবার কী হয়েছে বলতো?
তন্দ্রা আর মিতু সোফার পাশাপাশি বসেছিল। তন্দ্রা একটা হাত মিতুর হাতের ওপর রেখে বলল, আমি ভালো নেই মিতু।
কী হয়েছে আমাকে বলবি তো?
তন্দ্রা পারভেজের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবনের সব কথা খুলে বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বর বুজে এলো, দু’চোখের পানি গণ্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
মিতু তন্দ্রার চোখের পানি মুছে দিল। তন্দ্রার কথা শুনতে শুনতে মিতুর চোখেও পানি চলে এলো। তন্দ্রা মিতুর হাতে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, মিতু তুই কিছু জানিস?
মিতু চমকে উঠল, কী?
তোর ভাই’র কোন খবর?
কী খবর বলতো? বলে মিতু তন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তুই কিছু জানলে বল মিতু, প্লিজ! আমি তোর শুধু ভাবী নই, ফ্রেন্ডও।
মিতু মাথা নিচু করে বলতে শুরু করল। মিতুর কথা শুনতে শুনতে তন্দ্রা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
মিতু তন্দ্রাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, তুই কষ্ট পাবি জেনে আমি বলতে চাইনি তন্দ্রা।
বিছানা থেকে উঠে হাঁটতে হাঁটতে ছন্দা ড্রয়িং রুমে এলো।
তন্দ্রা ছন্দাকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে আবারো কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

আঠারো

শৈলীর বাসাটা বেশ সাজানো গুছানো। তন্দ্রা পুরো বাসাটা ঘুরে ঘুরে দেখল, দেয়ালে টাঙ্গানো প্রকৃতির ছবিতে ভরা। তন্দ্রা জিজ্ঞেস করতেই শৈলী বলল, প্রকৃতির ছবি তার খুব প্রিয়। ডাইনিং রুমে ফলমূলের ছবি, বেড রুমে সুন্দর ফুটফুটে একটা শিশুর ছবি, পাশে তার আর তার ছেলের কয়েকটা ছবি। অনেক আগের শৈলীর কিছু মডেল ছবিও আছে। তন্দ্রা লক্ষ্য করল তাদের কলেজ জীবনের ছবিও আছে কয়েকটা পোস্টার আকৃতির ছবিতে। দেখে তন্দ্রার খুব ভালো লাগল, পুরাতন দিনের স্মৃতি কার না ভালো লাগে। কিন্তু কোথাও স্বামী-সন্তানসহ তার কোন ছবি নেই। তন্দ্রা অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করল, তারপর জিজ্ঞেস করল, এই তোর বিয়ের ছবি নেই কেন রে? তোর সাহেবের ছবি-বলেই তন্দ্রা থমকে গেল।
কথাটা শোনা মাত্র শৈলীর মুখের ওপর একটা কালো মেঘে ঢেকে গেল। তার চোয়াল দু’টো শক্ত হলো। তন্দ্রা শৈলীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অনেকক্ষণ পর শৈলী উত্তর দিল, আমার বিয়ের ছবি দেখবি?
তন্দ্রা আর কিছু বলল না।
শৈলী একটা এ্যালবাম বের করে তন্দ্রার হাতে দিয়ে বলল, তুই দেখ আমি ততক্ষণে তোর জন্য নাস্তা নিয়ে আসি।
এ্যালবামের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তন্দ্রার মন খারাপ হয়ে গেল। সে ঠিক দেখছে তো, শৈলীকে তার হ্যাজবেন্ডের পাশে দেখে দু’জনকে বাপ ও মেয়ে বলে তন্দ্রার মনে হয়েছে, এটা কী করে সম্ভব? শৈলীর পাশে বর সেজে যে লোকটি বসে আছে তার বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই আর শৈলীর বয়স তো তন্দ্রা জানেই। বিয়ের সময় তন্দ্রার বয়স খুব বেশি হলে উনিশ কিংবা বিশ। চল্লিশ বছর বয়সের একটা আধ বয়সী মানুষের সঙ্গে শৈলীর বাবা-মা বিশ বছরের একটা মেয়ের বিয়ে দিল কীভাবে? তারা কি শৈলীর পছন্দ-অপছন্দের কথা চিন্তা না করে, তার জীবনের কথা না ভেবে শুধু আর্থিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে শৈলীকে বিয়ে দিয়েছে? অনার্স পড়-য়া একটা মেয়েকে তারা শুধু বোঝা ভেবেছে? শৈলী একেবারে খারাপ ছাত্রী ছিল না। লেখাপড়া করলে সে হয়ত একদিন অনেক বড় হতো।
শৈলী নাস্তা নিয়ে এলো। পাশাপাশি দু’বান্ধবী বসল। শৈলী জিজ্ঞেস করল, দেখছিস?
তন্দ্রার সংক্ষিপ্ত উত্তর, দেখলাম তো।
কী বুঝলি?
কী আর বুঝব, ভালোই তো।
সবাই তাই বলে আমি ভেবেছিলাম তুই সত্যি কথাটা বলবি।
সত্যি কথাটা আবার কী রে?
আমার সঙ্গে আমার বরের বয়সের তফাতটা দেখলি না।
তন্দ্রা শৈলীকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলল, এটা খারাপ কিছু না। আমাদের দেশে তো মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের বয়স একটু বেশিই হয়।
একটু বেশি!
তুই জানিস আমার আর আমার বরের বয়সের তফাৎ কত?
তন্দ্রা আবারো শৈলীকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলল, আমি এটা কখনো চিন্তা করিনি কারণ এটা চিন্তা করার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। যাক ওসব এখন বাদ দে। আল্লাহ দিলে তোর টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ির অভাব নেই, ছেলেটাও বড় হয়েছে এখন আর নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?
তুই না ভাবতে পারিস কিন্তু আমি পারি না। কী পেলাম আমি জীবনে? বিয়ে হলো উনচল্লিশ বছর বয়সের এক লোকের সঙ্গে, বিয়ের পর কী একটু দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াবো, না ওর সময় নেই, রুচি নেই। রুচি থাকবে কী করে বয়স তো একটা ফ্যাক্টর না কি বলিস?
তন্দ্রা আমতা আমতা করে বলল, তা ঠিক।
বিয়ের পর বাসায় এসে ঢুকেছি, তখন থেকে ঘর-সংসার। বিয়ের এক বছরের মাথায় ছেলে হলো। ছোট বাচ্চা নিয়ে আর কোথায় যাবো, বাচ্চা একটু বড় হতেই তো ওর স্কুল।
এখন কি ফ্রি?
অনেকটা।
এখন তো সাহেবের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারিস?
সাহেবের সঙ্গে? তুই জানিস না ওর কতগুলো অসুখ?
মানে?
হ্যাঁ চল্লিশ বছর বয়সে ডায়াবেটিস আর হাই প্রেসার ধরেছে। এখন কিডনি আর হার্ট, ওর এখন বলতে বলতে শৈলীর দু’চোখ পানিতে ভরে গেল।
তন্দ্রা শৈলীকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। সে শৈলীর চোখের পানি মুছে দিয়ে চুক চুক করে বলল, সেজন্য এখন বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে…
হ্যাঁ তাই করবো।
আচ্ছা বাদ দে তো এখন আর কষ্টের কথা ভালো লাগছে না, তোর বয়ফ্রেন্ডের কথা বল?
ও খুব ভালো মানুষ, আমার সমস্যাগুলোকে নিজের সমস্যা মনে করে। সবসময় আমার খোঁজখবর রাখে। মাঝে মাঝে দেখা হয়, আড্ডা হয়।
তন্দ্রা খোঁচা মেরে বলল, আর কিছু-
শৈলী তন্দ্রাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, এই আর কিছু কী রে? আমাকে-
না, তোকে আর কী বলবো?
তুই খুব সুখী রে, শৈলী জিজ্ঞেস করল।
তন্দ্রা প্রতিবাদ করল, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।
তোর আবার কী হলো? তুই তো প্রেম করে বিয়ে করেছিস? শুনেছি তো সবকিছু, একেবারে পালিয়ে নাইন টেন পড়-য়া ছেলেমেয়েদের মতো।
হ্যাঁ তা ঠিকই বলেছিস। আমারো ধারণা ছিল প্রেম করে বিয়ে করলে দাম্পত্য জীবন সুখের হয়।
তোর আবার কোন অসুখ ধরল।
আমার ধরেনি, ওর ধরেছে।
ওর মানে?
ওর মানে আমার হ্যাজবেন্ডের।
কী হয়েছে?
তন্দ্রা করুণ সুরে বলল, সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না রে।
কেন?
ও এখন কোন এক মডেল কন্যার পেছনে ঘুরছে।
তুই না বাবা-মা সবাইকে ছেড়ে শুধু ওর হাত ধরে চলে এসেছিস।
হ্যাঁ, ওতো আমার হাত এখনো শক্ত করেই ধরে আছে, বন্ধনটাও আছে আগের মতোই, শুধু নেই-
কী নেই?
রোমাঞ্চ নেই, যেন একটা নিষ্প্রাণ সম্পর্ক। আছে দায়িত্ববোধ, লোক দেখানো স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা, আমারো সব আছে কিন্তু শুধু ওর সঙ্গে কেমন যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে, বলতে বলতে তন্দ্রার কণ্ঠ স্বর ভিজে গেল।
দুনিয়াটা যে কী? আমি ভেবেছিলাম প্রেম করে বিয়ে করলে বিয়ের আগেই নিজের পছন্দ-অপছন্দগুলো জানা যায়। ভবিষ্যৎ স্বামীকে চেনা যায়। কিন্তু এখন তো দেখছি কোন নিশ্চয়তা নেই।
বয় ফ্রেন্ড আর হ্যাজবেন্ড এক না রে। বিয়ের আগে সব বয় ফ্রেন্ডরাই খুব ভালোবাসে, বিয়ের পর ভালোবাসে না তা আমি বলবো না কিন্তু দু’টোর মধ্যে তফাৎ অনেক।
তাহলে?
তোর আজকের এই খারাপ থাকার পেছনে একটা যুক্তি আছে, তোর বাবা-মা’কে তুই দোষ দিতে পারিস কিন্তু আমি? আমি কাকে দোষ দিব? এখন না পারি বাবা-মা’র কাছে আমার কষ্টের কথা বলতে আর না পারি ওর সবকিছু মেনে নিয়ে শান্তিতে থাকতে। তুই একটা কষ্ট বুকে নিয়ে সবাইকে নিয়ে আছিস আর আমি একটা কষ্ট বুকে নিয়ে একেবারে একা আছি। না পারি মানতে আবার না পারি কারো সঙ্গে শেয়ার করতে। যে কাউকে বললেই বলে তুই তো খুব সুখেই আছিস। প্রেম করে বিয়ে করেছি শিল্প পতিকে, স্বামীর অগাধ টাকা-পয়সা। সব কথা তো আর সবাইকে বলা যায় না।
আমিও কাউকে কিছু বলি না রে, বাবা-মা হয়ত কিছু অনুমান করে কিন্তু আমি বুঝতে দিই না। সেদিন তোকে কাছে পেয়েই আমার বুকটা ভরে গেল। তাই কথায় কথায় অনেক কিছু বলে ফেললাম।
আমি তোর ক্লাস ফ্রেন্ড আমি জানলেও কোনদিন কাউকে বলবো না। আর কাউকে যেন বলিস না। আমার বিষয়টা ডিফারেন্ট, দাম্পত্য জীবনে সমস্যা থাকতেই পারে কিন্তু তোর এই বয়ফ্রেন্ডের ব্যাপারটা কেউ সহজভাবে মেনে নিবে না, বলে তন্দ্রা একবার ঘড়ির দিকে তাকালো। তারপর বলল, অনেকক্ষণ হলো রে, আজ উঠি।
না, কী বলিস? বস আমি নাস্তা নিয়ে আসি।

উনিশ

পারভেজের সঙ্গে তন্দ্রার দাম্পত্য জীবন অনেক বছরের। এই দীর্ঘ সময়ে পারভেজের সঙ্গে তার অনেক স্মৃতি আছে যা সে কোনদিনই ভুলতে পারবে না। তাদের সংসারে ছন্দার মতো সুন্দর ফুটফুটে একটা মেয়ে আছে, দু’জনে আবদ্ধ আছে আইন ও সমাজ স্বীকৃত পবিত্র দাম্পত্য সম্পর্কের বন্ধন দ্বারা তাই টিকে আছে সংসার। তাহলে পারভেজের সঙ্গে তন্দ্রার সম্পর্ক যে টিকে আছে তা কি শুধু বন্ধনের জোরেই? তাহলে সংসারে, দাম্পত্য জীবনে, ভালোবাসার স’ান কোথায়?
এই যে তন্দ্রা পারভেজের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করছে তাতে কি এখন ভালোবাসার ন্যূনতম স’ান আছে? কোন নারী হ্যাজবেন্ড সম্পর্কে এমন কথা শোনার পরও কি তাকে ভালোবাসতে পারে? তারপরও টিকিয়ে রাখতে হবে সংসার, ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আবদ্ধ থাকতে হবে এই সংসারের মধ্যে। সমাজ সংসারের কাছে ভালো থাকার এটাই নিয়ম। সমাজের এই বন্ধন, এই শৃঙ্খল অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে লালন করাও নিন্দনীয়।
পারভেজ নামটা এখন তন্দ্রার কাছে ঘৃণিত একটা নাম। পারভেজের সঙ্গে কথা বলে, সারাক্ষণ পাশাপাশি থেকেও তন্দ্রার কিছু মনে হয় না। অথচ তারেক ফোন করলে তন্দ্রার ভালো লাগে। মনে হয় তারেক যেন তার কত দিনের, কাছের মানুষ। আর পারভেজ! পারভেজের ফোন এলে তন্দ্রার মধ্যে কোন অনুভূতি জাগে না। অনেকক্ষণ রিং বাজার পর একটা দায়িত্ববোধ থেকে ফোন রিসিভ করে। পারভেজও নিষ্প্রাণ দু’য়েকটা কথা জিজ্ঞেস করে, যার মধ্যে দায়িত্ববোধের বাইরে কিছু নেই। পারভেজও মত্ত আছে তার গার্ল ফ্রেন্ড কিংবা রক্ষিতা নিয়ে। সে আছে মহাসুখে অঢেল বিষয়-সম্পত্তি, বাসায় বউ, বাইরে গার্ল ফ্রেন্ড।
শৈলী কি ঠিক করছে? স্বামীর অনুপসি’তিতে, ছেলের চোখে ফাঁকি দিয়ে বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেটিং! অবশ্য শৈলী তার এই স্বেচ্ছাচারিতার জন্য কিছু যুক্তিও তৈরি করেছে। হোক সে যুক্তি দুর্বল, অনৈতিক এবং নিন্দনীয়। শৈলীকে তার বাবা-মা তার লেখাপড়া বন্ধ করে, বিয়ে দিয়েছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, যার সঙ্গে তার রুচি ও পছন্দের কোন মিল নেই। তাই তার মন বার বার করে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে, কিন্তু তন্দ্রার! একসময় তন্দ্রাই পারভেজের হাত ধরে চলে এসেছে। পারভেজও তন্দ্রাকে বুকে টেনে নিয়েছে, তন্দ্রার শৈলীর মতো শেকল ছিঁড়ে কিংবা লুকিয়ে লুকিয়ে বয় ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরে বেড়ানোর যুক্তি কী?
না, তন্দ্রার মনও আজকাল কোন যুক্তিই মানতে চায় না। পারভেজের অবহেলা ও বঞ্চনার কারণে তার মনও বার বার বিদ্রোহ করতে চায় কিন্তু তন্দ্রা শৈলীর মতো বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে……না, তন্দ্রা আর ভাবতে চায় না। সে চায় পারভেজ তাকে আগের মতোই ভালোবাসবে, তার সেই স্বপ্ন ছোট্ট একটা সংসার থাকবে কিন্তু পারভেজ….
তারেকের সঙ্গে তন্দ্রার রাষ্ট্র কিংবা সমাজ স্বীকৃত কোন সম্পর্ক নেই, পরষ্পরের মধ্যে কোন জবাবদিহিতা নেই। আছে শুধু ভালো লাগা, শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক। প্রতিদিন সকাল এগারোটা বাজলেই তন্দ্রার মন অপেক্ষা করতে থাকে তারেকের ফোনের জন্য, বার বার মনে হয় এতক্ষণও তারেক ফোন করছে না কেন? দায়িত্ববোধের বাইরে, জবাবদিহিতার বাইরে এ এক হৃদয়ের অন্যরকম চাওয়া।
তারেক জিজ্ঞেস করে, হ্যালো।
হ্যাঁ বল? তন্দ্রার সংক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর।
কেমন আছ তন্দ্রা?
তুমিই বলো, খুব তো ফোন রিসিভ করেই বলতে পারো, আমি ভালো আছি কী না?
তারেক হেসে ফেলল, সে তো তুমি নিজেই বলেছ তোমার মাথায় আগুন পড়েছে।
হ্যাঁ, ওই শ’ কথার এক কথায় বলেছি। বলে তন্দ্রা আরো কিছু বলতে গিয়েই তার কণ্ঠস্বর বুজে এলো, আমি ভালো নেই তারেক।
কেন?
আমি খুব একা তারেক।
একা কেন? তোমার শ্বশুর-শাশুড়ি, ছন্দা, পারভেজ সবাই তো আছে। এত মানুষের মাঝেও তোমার নিজেকে একা মনে হচ্ছে?
তন্দ্রার ভেজা গলায় বলল, আমি যতই মানুষের ভিড়ে থাকি না কেন সবসময় একটা নিঃসঙ্গতা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। আমি চোখ বন্ধ করে আপনজন খুঁজি কিন্তু আমার কেউ নেই।
তারেক একটু গম্ভীর হলো, তোমার সঙ্গে পারভেজের সম্পর্কটা কি খুব খারাপ যাচ্ছে?
তন্দ্রা চোখের কোনা পানিতে ভরে গেল, তোমাকে তো সবই বলেছি।
তারেক একটু উত্তেজিত হলো, তা তো শুনেছি, আমি ভাবছি এর মধ্যে নতুন কিছু হলো নাকি?
না।
তো?
তন্দ্রা পারভেজের অধঃপতনের শেষটা বলবে কী না কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিল।
তারেক জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে আমাকে বলো? আমি তোমার ফ্রেন্ড।
তন্দ্রা চোখ মুছে বলল, তারেক আমি ওর কাছে পুরানা হয়ে গেছি, ও-
কী করেছে?
কথাটা বলতে গিয়ে মনটা ঘৃণায় ভরে গেল, শুনেছি ও নাকি একটা মডেল কন্যার সঙ্গে লিভ টুগেদার করছে, বলেই তন্দ্রা চাপা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
তারেক তন্দ্রাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল, তন্দ্রা, তন্দ্রা চুপ করো প্লিজ! শোনা কথায় বিশ্বাস করতে নেই। তুমি একটু শক্ত হও। পারভেজ তোমার সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছে। তোমাদের পরষ্পরের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে তাই বলে এতদিনের ভালোবাসার মানুষকে তুমি অবিশ্বাস করবে?
তবুও তন্দ্রার কান্না থামল না। সে আবার বলতে শুরু করল, এর চেয়ে ও যদি আমাকে ডিভোর্স করতো তবুও আমি কম কষ্ট পেতাম।
তারেক কিছুটা ধমকের সুরে বলল, কী সব আজেবাজে কথা বলছ তুমি।
হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি। এখন যেভাবে আমার দিন যাচ্ছে তাতে ডিভোর্সের তো আর কিছু বাকি নেই। ডিভোর্স তো শুধু আইনের শেকল ছেঁড়া, মনের শেকল তো আগেই ছিঁড়েছে, আইনের যে শেকল আর সমাজের যে বন্ধন আছে এটা মানুষকে একত্রিত করে রাখতে পারে কিন্তু সুখ দিতে পারে না, শান্তি দিতে পারে না। যে বন্ধন সুখ-শান্তি দিতে পারে না সে বন্ধনের প্রয়োজন কী?
তারেক গম্ভীর স্বরে বলল, তন্দ্রা আমি তোমার ফ্রেন্ড, একজন ফ্রেন্ড হিসেবে আমি তোমার ভালো চাই।
সত্যি বলছ?
হ্যাঁ। কিন্তু আমরা যতই বলি না কেন বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যে কোন স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই, কোন আইন বা সামাজিকতার কোন শৃঙ্খল নেই কিন্তু সীমাবদ্ধতা তো আছেই।
তন্দ্রা ভেবেছিল তারেক তার কথা শুনে খুশি হবে, তাকে পারভেজের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করবে কিন্তু তারেক তাকে ধৈর্য ধরতে, আরো অপেক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছে। তারেকের কথা তার প্রতি তন্দ্রার মন কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। সে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল, তুমি খুব ভালো তারেক, তুমি খুব ভালো।
তারেক হেসে উঠল, তন্দ্রা!

বিশ

পারভেজ বাসা থেকে বেরিয়ে গেল অফিসের কথা বলে, রাত দশটায় ফোন করে জানাল, রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম যাবে। কথাটা শুনে তন্দ্রার সন্দেহ হলো আগে যতবার তারেক ঢাকার বাইরে গেছে ততবারই বাসায় এসে ব্যাগ নিয়ে গেছে। এবার ব্যাগ নিয়ে গেল না। পারভেজ তার চট্টগ্রাম যাওয়ার কথাটা বলেই তাড়াহুড়া করে ফোন রেখে দিল যেন তার ট্রেন এখনই চলে যাচ্ছে। এটাও পারভেজের একটা কৌশল। ফোন কানের কাছে ধরে রাখলে তন্দ্রা যদি কিছু জানতে চায়।
অফিসে তন্দ্রার তেমন কেউ পরিচিত নেই। অফিসের কেউ বাড়িতে আসে না। বাসায় একজন কেয়ারটেকার আছে অফিসে তার যাতায়াত নেই। বাড়ির সঙ্গে অফিসের তেমন একটা যোগাযোগ নেই। পারভেজের অফিসের কেউ তন্দ্রার পরিচিত না হলেও পারভেজের অপকর্মের অনেক খবর তন্দ্রা জানতে পারে মাহফুজের কাছে। মাহফুজ মিতুর স্বামী, পারভেজের সব খবর মাহফুজ জানলে মিতুও জানার কথা কিন্তু মিতুও তার ভাইয়ের দোষ লুকাতে চায়? আবার এমনো হতে পারে মাহফুজ এসব খবর অন্য কারো কাছে জানে, হয়ত মিতুকেও সে বলে না। এমনি অনেক চিন্তা করে কথাটা একদিন মাহফুজকে জিজ্ঞেস করল, মাহফুজ বলল না এসব কথা হয়ত মিতু জানে না। মাহফুজের এক ফ্রেন্ড পারভেজের কোম্পানিতে চাকরি করে সেই পারভেজের সব কথা মাহফুজকে জানায়।
পারভেজ চলে যাওয়ার পর তন্দ্রা মাহফুজকে ফোন করল, মাহফুজ প্রথমে বলতে চাইল না। তন্দ্রা কিছুটা অভিমানের সুরে বলল, বলতে চাচ্ছেন না কেন? আমি কষ্ট পাবো তাই?
মাহফুজ আমতা আমতা করল।
তন্দ্রা আবার তাড়া করল, বলুন আমি সব কথা সহ্য করতে প্রস’ত আছি। খুব বেশি হলে ঐ মডেল কন্যাকে নিয়ে হানিমুনে গেছে এই তো! সেজন্য আপনি বলতে ভয় পাচ্ছেন?
মাহফুজ চুপ করে রইল।
তন্দ্রা রাগের সুরে বলল, সরি কিছু মনে করবেন না। আসলে আমার মনটা ঠিক নেই।
আমি বুঝতে পেরেছি ভাবী।
এক্সটিমলি সরি।
ঠিক আছে ভাবী আমি কিছু মনে করিনি।
মাহফুজ আপনি আমার ভাইয়ের মতো, আমাকে একটা কথা বলবেন?
জি ভাবী বলুন?
এসব কথা কি মিতু জানে?
সেটা তো বলতে পারব না ভাবী, আমি কিছু বলি না তবে এটা ওদের ফ্যামিলির ব্যাপার জানতেও পারে। আপনি যেন আগ বাড়িয়ে কিছু বলবেন না।

পারভেজ বাসায় ফিরল তিন দিন পর। তার চোখে-মুখে ক্লান্তি কিন্তু অপরাধবোধ নেই। যেন নিজের স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে অন্য নারীর সঙ্গে রাত কাটানোয় তার কোন অপরাধ হয়নি, সে একেবারে স্বাভাবিক। বাসায় ঢুকেই কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল ঠিক বরাবরের মতোই।
তন্দ্রা টেবিলে খাবার তৈরি করে ডাক দিল, পারভেজের কোন সাড়া নেই। তন্দ্রা রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পারভেজকে মৃদু কণ্ঠে ডাক দিল, এই।
পারভেজের কোন সাড়া নেই তবে তন্দ্রা বুঝতে পেরেছে সে ঘুমায়নি তাকে এড়িয়ে চলার জন্যই ঘুমের ভান করছে। তন্দ্রাও নাছোড়বান্দা হয়ে আবার ডাক দিল, ওঠো তো।
পারভেজ চোখ খুলল, কেন?
তুমি কোথায় গেছিলে?
চিটাগাং।
কেন?
অফিসের কাজে।
তোমাদের অফিসের কি চিটাগাংয়ে কোন ব্রাঞ্চ আছে?
পারভেজ কিছুটা রেগে গেল, এত কিছু জানতে চাচ্ছ কেন?
সেটা তুমি একবার চিন্তা করে দেখো, কেন আমি আজ এতকিছু জানতে চাচ্ছি।
পারভেজ চুপ করে রইল।
আমি তোমার স্ত্রী, আমি সবকিছু বুঝতে পারি কিন্তু বলতে চাই না। আমার অনুরোধ তুমি ঐসব পাপ পথ থেকে ফিরে এসো। আমি তোমার একসময়ের ফ্রেন্ড, গার্ল ফ্রেন্ড আর এখন তোমার স্ত্রী, আমার মধ্যে কী নেই যে তুমি ঐসব কলগার্লের-বলতে বলতে তন্দ্রার কণ্ঠ স্বর বুজে এলো।
পারভেজ আবার রেগে গেল, তন্দ্রা তুমি কী বলছ? কাকে তুমি কল গার্ল বলছ?
সেটা তো তুমিই ভালো জানো। আমি শুধু তোমাকে রিকোয়েস্ট করছি তুমি ফিরে এসো, একবার ছন্দার দিকে তাকাও, ও আমাদের মেয়ে, ও যখন বড় হয়ে জানবে ওর বাবার কোন কেলেঙ্কারির কথা তখন কী বলবে? বলো?
এবার পারভেজ তন্দ্রাকে জোরে ধমক দিল, তুমি থামবে! আজ ক’দিন পর বাসায় এলাম আর তুমি শুরু করলে কানের কাছে…
তন্দ্রা আর কিছু বলল না। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল।

একুশ

তারেক তখন সবেমাত্র চাকরিতে জয়েন করেছে, বেকার জীবনের মেস ছেড়ে সাবলেট উঠেছে তার চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। রিভা তারেকের চাচাতো ভাইয়ের শ্যালিকা। সে তখন এইচ.এস.সি পাস করে অনার্স ভর্তির জন্য এডমিশন টেস্ট দিতে ঢাকা এসে উঠেছে দুলাভাই’র বাসায়। একই বাসায় থাকায় রিভার সঙ্গে তারেকের দু’য়েকবার কথাও হয়েছে। একদিন শুক্রবার তারেকের অফিস বন্ধ ছিল তাই ভাবী অনেক অনুরোধ করে তারেককে পাঠিয়ে দিল রিভার সঙ্গে। ধীরে ধীরে তারেকের সঙ্গে রিভার একটু ঘনিষ্ঠতাও হলো যে ঘনিষ্ঠতার মধ্যে হৃদয়ঘটিত কোন ব্যাপার নেই। কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতেই তারেকের ভাবীই প্রথম তুলল রিভার সঙ্গে তারেকের বিয়ের কথা। তারেক তো অবাক, ভাবী আপনি এটা কী বলছেন?
কেন ভাই? অসুবিধা কী? রিভা তোমাকে ভালোবাসে, তুমিও তো রিভাকে ভালোবাসো।
তারেক অস্বীকার করল, আমি রিভাকে ভালোবাসতে যাবো কেন?
ভালোবাসার আগে তো কেউ কোনদিন চিন্তা করে না। তুমিও চিন্তা করোনি, একটু একটু করে একসময় ভালোবাসা হয়ে গেছে। এখন রিভা তো তোমার জন্য একেবারে অসি’র।
তারেক তার ভাবীর মুখের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারেক বুঝতে পারল এটা তার ভাবীর একদিনের পরিকল্পনা না। আজকের এই উদ্দেশ্যেই সে রিভাকে তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে।
তাছাড়া তোমাদের এই ব্যাপারটাও অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। এখন মেয়েটাকে যদি তুমি বিয়ে না করো তবে ওর কী হবে?
ভাবীর এমন আচরণে তারেক অবাক হলো। ভাবী কি এখন সত্যি সত্যি রিভাকে তার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাচ্ছে? হ্যাঁ সত্যি, তার ভাবীর কথাবার্তায় কোন কৃত্রিমতা নেই। একেবারে ষ্পষ্ট। তারেক বিষয়টা একবার তার চাচাতো ভাই’র সঙ্গে আলাপ করতে চাইল কিন্তু সুযোগ হলো না।
পরদিন বিকেলে তারেক বাসায় ফিরে দেখল। বগুড়া থেকে রিভার বাবা-মা এসেছে, তাদের কাছের আরো দু’য়েকজন আত্মীয়-স্বজন এসেছে। তারেকের সন্দেহ হলো। সে একবার মনে করল, আজ রাতটা কোনভাবে কাটিয়ে কাল সকালেই এখান থেকে চলে যাবে কিন্তু রাতে পরিসি’তি আরো জটিল হলো। তারেক তার চাচাতো ভাই’র সঙ্গে কথা বলল কিন্তু সেও তার শ্যালিকারই পক্ষ নিল। রিভার আত্মীয়-স্বজনরা তাকে কনে সাজিয়ে একটা রুমে বসালো। সবকিছু ঘটছে তারেকের চোখের সামনেই কিন্তু তার বলার কিছু নেই। সে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করছে। মেয়েদের ইচ্ছা বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়ার ঘটনা সে অহরহ শুনেছে কিন্তু কোন ছেলেকে এভাবে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়ার ঘটনা আজকেই প্রথম দেখল এবং সে ঘটনার মুখ্য চরিত্রে সে নিজেই।
সেদিনের সেই অবলা রিভাই এখন তার সবলা স্ত্রী রিভা। এতদিন সে যার অনেক অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেছে। আর কোনদিন প্রতিবাদ করলে রিভা তাকে নারী নির্যাতন মামলার ভয় দেখিয়েছে। এবার তারেক যেন সাহসী হয়েছে। রিভার গম্ভীর কালো মুখ গর্জে উঠল, কী হয়েছে তোমার?
কিছু হয়নি তো।
আজকাল অফিস থেকে দেরিতে ফিরছ কেন?
কাজ থাকতে পারে না?
অফিস টাইমের পর তো তোমার অফিসে কোন কাজ থাকে না।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই।
তোমার আবার বন্ধু হলো কবে?
কেন আমার বন্ধু থাকতে পারে না?
পারে, বন্ধুরা মেয়ে না তো?
বিয়ের পর থেকেই রিভা সবসময় তারেককে সন্দেহ করে। রিভা খুব ভালো করেই জানে তারেক তাকে পছন্দ করে না। বেকায়দায় পড়ে বিয়ে করেছে, এর মধ্যে মেয়েও হয়েছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে হতে পারে কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে তো ভালোবাসা হয় না। সংসার টিকে থাকে হৃদয়হীন, ভালোবাসাহীন হয়ে কিন্তু হৃদয়কে তো আর জোর করে বেঁধে রাখা যায় না। তারপরও রিভা দীর্ঘ দিন তারেককে বেঁধে রেখেছে। এখন তাদের মেয়ে বড় হয়েছে কিন্তু তারপরও রিভার সন্দেহ কমে নি। রিভার ধারণা তার প্রতি তারেকের ক্ষোভ আছে, কোন সুন্দর, স্মার্ট মেয়ের সান্নিধ্যের প্রতি দুর্বলতা আছে। তাই সে সবসময় তারেককে চোখে চোখে রাখে।
তারেক কোন কথা বলল না।
রিভা আবার বলল, আজকাল তোমাকে দেখে আমার একটু অন্যরকম লাগছে।
তারেক তবুও কিছু বলল না।
রিভা একটু উত্তেজিত হলো, কথা বলছ না কেন?
কী কথা বলবো?
আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দিবে।
এখনো আমাকে তোমার অবিশ্বাস হয়?
ছেলেমানুষকে বিশ্বাস নেই।
সব ছেলেমানুষকে নাকি শুধু আমাকে?
সবাইকে। তবে তোমাকে আরো বেশি।
কেন? আমি তো সারাজীবনে তোমার প্রতি অবিশ্বাসের কিছু করিনি।
করোনি কিন্তু করতে কতক্ষণ।
এবার তারেক রেগে গেল। কিন্তু উচ্চ স্বরে কিছু বলল না। চাপাস্বরে বলল, জোর করে, একরকম ফাঁদে ফেলে তুমি আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছ। সেজন্য সবসময় তোমার আমাকে অবিশ্বাস হয়, আমাকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা হয়। তোমার সবসময় মনে হয় আমি বুঝি তোমাকে ছেড়ে অন্য কারো হয়ে গেলাম। তোমার সঙ্গে আমার বন্ধনটা যদি ভালোবাসার হতো, বিশ্বাসের হতো, শ্রদ্ধার হতো তবে তুমি আমাকে এভাবে অবিশ্বাস করতে না। আর আমি যদি নিজের ইচ্ছায় তোমাকে বিয়ে করতাম তবে হয়ত আমিও সারাজীবন সুখে কাটাতে পারতাম।
আমাকে নিয়ে তোমার জীবন সুখে কাটছে না?
সেটা নিজেকে প্রশ্ন করো?
আমার নিজেকে কোন প্রশ্ন নেই। আমি চাই যেভাবে দিনগুলো কেটে গেল সেভাবে বাকি দিনগুলোও কেটে যাক।
তোমার আগের দিনগুলো ভালো কেটেছে কিন্তু আমার?
তোমারও ভালো কেটেছে। আমি তোমার পাশে আদর্শ স্ত্রী হয়ে থেকেছি।
হ্যাঁ সেজন্য তো আমি আমার বাবা-মা ভাইবোন সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে সারাজীবন হেয় হয়েছি।
হেয় হয়েছ কেন? আমি কি দেখতে খুব খারাপ? কম শিক্ষিত?
না, তুমি দেখতে খুব খারাপ না, শিক্ষিতও কম না কিন্তু তোমার শিক্ষাটা সার্টিফিকেট সর্বস্ব।
মানে?
মানে সার্টিফিকেট অনুযায়ী তুমি এইচ.এস.সি পাস কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধির দিক থেকে-
অশিক্ষিত?
অনেকটা তাই। আমার বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজনদের ধারণা তুমি আমাকে সবসময় শাসন করো, আমার সঙ্গে মিস বিহেভ করো আর আমি নীরবে হজম করি।
আমি তোমার সঙ্গে মিস বিহেভ করি আর তুমি নীরবে হজম করো?
হ্যাঁ, হজম করি তো, এতদিন সামাজিকতার জন্য করতাম আর এখন মেয়ের জন্য করি।, প্লিজ তুমি একটু সংযত হও। নিজের জন্য না হোক মেয়ের জন্য হও।
রিভা কয়েক সেকেন্ড তারেকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

বাইশ

ঝুমুরের সঙ্গে মাঝে মাঝেই ফোনে কথা হয় কিন্তু তার মেয়ের জন্মদিনের পর তার সঙ্গে তন্দ্রার দেখা হয়নি। সেদিন ঝুমুর বাসায় এলো। প্রায় দু’ঘণ্টা ছিল তার মধ্যে ওর হ্যাজবেন্ড দু’বার ফোন করল। প্রথমে একবার ফোন করে জেনে নিল, বাসায় কী না?
ঝুমুর বলল তার বান্ধবীর বাসায় এসেছে।
তারপর জিজ্ঞেস করল, কোন বান্ধবী?
ঝুমুর বলল, তন্দ্রা। শেষ পর্যন্ত তন্দ্রার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে ফোন রাখল।
ঝুমুর বিরক্ত হলো, দেখতো সবসময় এমন করবে।
তোকে সন্দেহ করে নাকি রে?
নাহ্‌।
তাহলে খুব ভালোবাসে?
হ্যাঁ, আমাকে ছাড়া ও কিচ্ছু বুঝে না।
ভালো তো।
ঝুমুর মুচকি হেসে বলল, খুব বিরক্ত লাগে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফোন করবে আর জিজ্ঞেস করবে কোথায় গেছি? কেন গেছি? কখন ফিরবো?
ঝুমুরের প্রতি তার স্বামীর ভালোবাসা দেখে তন্দ্রার বার বার পারভেজের কথা মনে হলো, তার সঙ্গে পারভেজের সম্পর্কটা যদি এমন হতো, পারভেজ সারাদিনে যদি একবার তাকে ফোন করে তার খোঁজখবর নিতো। তন্দ্রাও তো ছোটখাটো কাজে বাসার বাইরে যায়, কোনদিন তো পারভেজ একবারো ফোন করল না। যদি একবার ফোন করে রাস্তায় বাসের শব্দ শুনে তন্দ্রাকে জিজ্ঞেস করতো, তুমি কোথায়? বাসের শব্দ পাচ্ছি কেন? তবে তন্দ্রার বুকটা ভরে যেত।
ঝুমুর আবার বলতে শুরু করল, মোবাইলে একটা ফোন এলেই কে ফোন করেছিল? কেন করেছিল? হাজারটা জবাব দিতে হবে।
ঝুমুর তন্দ্রার চোখের সামনে হাত নাড়ল কিন্তু তন্দ্রার চোখের পাতা নড়ল না। ঝুমুর তন্দ্রার চিবুকে টোকা মেরে বলল, এই কী ভাবছিস রে?
তন্দ্রা তন্দ্রা ফিরে পেল, সে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল, তুই খুব সুখী রে ঝুমুর।
আর তুই?
তন্দ্রা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারেক ঝুমুরের মামাতো ভাই। তারেক তন্দ্রা সম্পর্কে ঝুমুরের সঙ্গে কোন কথা বলেছে কী না তন্দ্রা জানে না। তারেকের সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুত্বের তবু তন্দ্রা তারেকের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের বিষয়টা ঝুমুরকে বলতে চায় না। তারেককে সে লুকিয়ে রাখতে চায়, সবার দৃষ্টির আড়ালে তার সঙ্গে তারেকের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা শুধু তার আর তারেকের মাঝেই থাকবে।
তন্দ্রাকে চুপ করে থাকতে দেখে ঝুমুর জিজ্ঞেস করল, কী রে? কী ভাবছিস?
তন্দ্রা চমকে উঠল, না, কিছু না।
কথা বলছিস না যে? তোর কোন সমস্যা হয়েছে নাকি?
না, আমার আবার কী সমস্যা?
কেমন যেন তোকে দেখে খুব আনমনা দেখাচ্ছে।
না, তবে আমি তোর মতো সুখী নই রে।
কেন?
কোন কারণ নেই কিন্তু আল্লাহ তো আর সবাইকে সমান সুখ দিয়ে পাঠায় নি। এই যে তোর হ্যাজবেন্ড বার বার ফোন করে তোর খবর নিচ্ছে এটা দেখে আমার খুব ভালো লাগল।
হ্যাঁ, ও খুব দায়িত্ববান আর সেটাই আমার কাছে মাঝে মাঝে খারাপ লাগে, এত কী? মোবাইল ফোনটা একটু বিজি দেখলেই ফোন করে জিজ্ঞেস করতে হবে কে ফোন করেছিল? আমারো তো একটা স্বাধীনতা আছে, আমারো তো দু’য়েকজন ফ্রেন্ড থাকতে পারে।
তন্দ্রা একটা শুষ্ক হাসি হাসল, তোর হ্যাজবেন্ড যদি তোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না রাখতো তবে বুঝতিস তুই কত অসুখী। একটা কথা মনে রাখবি ঘরে যদি সুখ না থাকে তবে বাইরে সুখ পাওয়া যায় না রে।
দু’জনে আরো অনেকক্ষণ আড্ডা দিল। তারপর ঝুমুর চলে গেল। যাওয়ার সময় বলল, মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তন্দ্রা আর কথা বাড়াল না। দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল। ঝুমুরের কথা শুনে তন্দ্রার মনে হলো পারভেজকে নিয়ে সে আসলে এমনি একটা স্বপ্ন দেখেছিল। ঝুমুরের সঙ্গে তার হ্যাজবেন্ডের সম্পর্কটা চমৎকার। বিয়ের আগে দু’জনে সামান্য জানাশোনা ছিল তারপর উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিয়ে হলো। অথচ তন্দ্রার পারভেজের সঙ্গে কত গভীর সম্পর্ক ছিল, বিয়ের আগে দু’জনে সম্পর্কটা কত রোমাঞ্চকর ছিল। আর বিয়ের পরই সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেল।
কত বিচিত্র সবকিছু। শৈলী ক্লাসে সবচেয়ে শান্ত-শিষ্ট ছাত্রী ছিল। কারো সঙ্গে কোন আড্ডা, হৈ চৈ এর মধ্যে ছিল না। পুরো ক্লাসের সময় জুড়ে সে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কথাও বলতো না। অথচ বিয়ের পর সে কেমন প্রতিবাদী হয়ে উঠল। শৈলী এই প্রতিবাদটা যদি বিয়ের আগে করতে পারতো, যদি মুখ ফুটে, দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পারতো, না, এই বিয়েতে আমার সম্মতি নেই। তাহলে হয়ত শৈলীর জীবনটা অন্যরকম হতো। তাতেই বা লাভ কী! তন্দ্রা তো নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করেছে, শুধু পছন্দ করেই বিয়ে করেনি একেবারে সেই মানুষটির হাত ধরে চলে এসেছে, সেই মানুষটি আজ কোথায় যার হাত ধরে সে বাবা-মা’র কাছে থেকে চলে এসেছে। জীবনের অঙ্ক বড়ই জটিল।

তেইশ

তন্দ্রার চোখে ঘুম নেই। এমন নির্ঘুম রাতে আজকাল তন্দ্রার মাথায় অনেক আজেবাজে চিন্তা আসে। বিশেষ করে তারেকের কথা মনে পড়ে। তারেক তার খুব ভালো বন্ধু, বনশ্রীর বাসায় থাকতে তারেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তখন তার দিন যাচ্ছিল খুবই নি:সঙ্গতার মধ্য দিয়ে। এ বাড়িতে আসার পর ভেবেছিল যৌথ পরিবারে বসবাস করলে হৈ চৈ এরে মধ্য দিয়ে তার দিন কেটে যাবে। কিন্তু এ বাড়িতে আসার কয়েকদিন পরই শাশুড়ি তাকে আলাদা করে দিল। জা’র সঙ্গেও কথাবার্তা বন্ধ হলো। তাহলে আর যৌথ পরিবার থাকল কীভাবে? তন্দ্রা অনেকের কাছে শুনেছে এমনকি নিজেও দেখেছে আজকাল মেয়েরা বিয়ের পরপরই শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে আলাদা হয়ে যায়, যৌথ পরিবারে তাল রেখে চলতে চায় না। আর সে নিজেই শাশুড়ির সঙ্গে থাকতে চাইলে শাশুড়ি বলল, না বউমা, তুমি নতুন এসেছে, সংসারটা নিজের মতো করে গুছিয়ে নাও।
তন্দ্রা একবার প্রতিবাদ করেছিল, কী দরকার আম্মা? আমি তো আর আপনার সঙ্গে ঝগড়া করছি না।
না তার শাশুড়ি কোন কথাই শুনলেন না। ফলে তন্দ্রা বনশ্রীর বাসায় যেমন নি:সঙ্গ ছিল তেমনি রইল। তারপরও এটা তার শ্বশুর বাড়ি। এটাকে সে অনেকটা নিজের বাড়ি ভাবতে পারে। এ বাড়িতে আসার পর তারেকের সঙ্গে একটু দূরত্ব হয়েছিল। তন্দ্রা ইচ্ছা করেই পাশ কাটিয়েছিল কিন্তু ক’দিন পর আবার আগের মতোই কথা বলা শুরু হলো। তবে বয় ফ্রেন্ড বলতে অনেকেই খারাপ অর্থ বুঝালেই সে অর্থে তারেক অনেক ভালো। তারেক সবসময় তাকে ভালো পরামর্শ দেয় এবং তন্দ্রার বিশ্বাস যেকোন বিপদে তারেক তার পাশে দাঁড়াবে একজন বিশ্বস’ বন্ধু হিসেবে।
সেদিন শৈলী কথায় কথায় বলেছিল, একজন নারী আর পুরুষের বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না।
তো?
শেষ পর্যন্ত বুঝিস নি?
তন্দ্রা বুঝেছিল কিন্তু না বোঝার ভান করে না সূচক মাথা নেড়ে ছিল।
শৈলী তন্দ্রার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কথা বলে একটা দুষ্টুমির হাসি হেসেছিল।
তন্দ্রা লজ্জা পেয়েছিল। সে মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল, তুই শুধু আজেবাজে কথা ভাবিস।
না তন্দ্রা আর একথা ভাবতে চায় না। তারেক সম্পর্কে সে নেতিবাচক কিছু ভাবতে চায় না। তার সঙ্গে তারেকের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা যা-ই হোক না কেন এটাকে সে ধরে রাখতে চায় সারাজীবন। এমন একটা সম্পর্ক সে আশা করেছিল পারভেজের কাছে, পারভেজ কেন তার কথা ঠিক রাখল না? পারভেজ কি কোনদিন তন্দ্রার কথা ভেবেছে? তন্দ্রার জগত খুব ছোট, চার দেয়ালের মধ্যে সে, বাসার সব জড়বস’গুলো আর একজন কাজের বুয়া। সারাদিন তো সে শুধু পারভেজের কথাই ভাবতো। সারাদিন মোবাইল ফোনটা কোন কোন দিন একবারো বেজে উঠতো না। স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের বাইরে সে কোনদিন কারো সঙ্গে প্রেম করবে এমন কথা ভাবতেও পারেনি। শৈলীর বেলাতেও তাই। শৈলী গ্রামের মেয়ে, লেখাপড়া শিখে বাবা-মা একটা ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবে আর শৈলী তাকে নিয়েই কাটিয়ে দিবে সারাজীবন। এমন একটা স্বপ্ন নিয়েই শৈলী বড় হয়েছে কিন্তু হঠাৎ করে তার বাবা-মা তাকে তুলে দিল একজন আধবয়সী পুরুষের হাতে। শৈলীর রঙ্গিন স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে গেল। একদিন তো কথাগুলো বলতে বলতে শৈলী কেঁদেই ফেলল, তন্দ্রা জানিস ঐ লোকটাকে যখন আমি প্রথম দেখলাম তখন আমরা বুকটা ভেঙ্গে গেল। বাসর রাত! বলে শৈলী একটা কষ্টের হাসি হেসেছিল। ঐ রাতটা আমার জীবনের একটা কাঙ্ক্ষিত রাত হতে পারতো কিন্তু হলো না। আমি যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাসর রাতেই প্রথম ধর্ষিত হলাম। তারপর দিনের পর দিন আমি নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে ঐ লোকটার কাছে সঁপে দিয়েছি। আমিও তো মানুষ, আমার শরীরেও তো রক্ত-মাংস আছে, আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে, অনুভূতি আছে। কতদিন আর নিজেকে তিলে তিলে নিজেকে ধুঁকে ধুঁকে মারবো।
সেদিন তন্দ্রা মৃদু প্রতিবাদ করেছিল, তাই বলে-
হ্যাঁ, আমার ইচ্ছা আমি প্রেম করছি। এই চার দেয়ালের বাইরে, আইন, সামাজিকতা, প্রচলনের বাইরে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু শান্তি খুঁজে পাই।
শৈলীর কথা শুনতে শুনতে তন্দ্রার চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। সে চোখ মুছে হাসবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে বলেছিল, ও কে রে?
ও বলে শৈলী একটা কষ্টের হাসি হেসে বলেছিল, আমার ফ্রেন্ড! তুই একবার ভেবে দেখ বাবা-মা যদি আমার পছন্দের ছেলের সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিত তবে কি আমি আজ বৃত্তের বাইরে কিছু খুঁজতাম। বলে শৈলী তন্দ্রা হাতের ওপর একটা হাত রেখে বলেছিল, আর কিছু না হোক দিনগুলো তো একটু ভালো কাটছে।
এটাকে কী বলে?
সুখের নামে একটা সান্ত্বনা পেয়েছি। আসলে আমি সুখই চেয়েছিলাম কিন্তু সুখ পেলাম না, সান্ত্বনা পেলাম। বলতে বলতে শৈলী একেবারে কেঁদে ফেলেছিল।
কিন্তু তন্দ্রা! তন্দ্রা তো নিজের পছন্দমতো বিয়ে করেছে। সে কেন ঘরের বাইরে সুখ খুঁজবে? তন্দ্রার জীবনেও কোন অপ্রাপ্তি ছিল না। কিন্তু কেমন করে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। পারভেজ যদি বদলে না যেত, তাকে যদি একটু সময় দিত? না, সময় না দিক, সে তার ব্যবসা বাণিজ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকুক কিন্তু কল গার্লদের সঙ্গে মেলামেশা, শেষ পর্যন্ত লিভ টুগেদার! কথাটা মনে হতেই তন্দ্রার বুকে একটা ঢেউ আঘাত করল। তীর ভাঙ্গা ঢেউ।
তন্দ্রা একবার মোবাইলের ঘড়িতে সময় দেখল। রাত দু’টা বাজে। না, আজ আর পারভেজ বাসায় আসার সময় নেই। তন্দ্রা পারভেজের মোবাইলে ফোন দিল। পারভেজের মোবাইল ফোন বন্ধ। তন্দ্রার বুকে আবার একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পারভেজের সঙ্গে থাকা এক নারীর প্রতিচ্ছবি। প্রায় সারারাত তন্দ্রার কেটে গেল বিছানায় ছটফট করে। একবার মনে হলো তারেককে একটা ম্যাসেজ লিখবে কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো এত রাতে তারেক তো তার বউয়ের কাছেই আছে। অযথা তাকে বিরক্ত করে আর কী হবে?
পরদিন সকালবেলা পারভেজ ফোন করে জানাল তার ব্যাগে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে দিতে। তন্দ্রা কিছু জিজ্ঞেস করতেই লাইন কেটে দিল। প্রায় এক ঘণ্টা পর ড্রাইভার এসে পারভেজের ব্যাগ নিয়ে গেল। তন্দ্রার পারভেজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হলো। এর আগে পারভেজ যতবার ঢাকার বাইরে গেছে ততবারই সে নিজে বাসায় এসে তার ব্যাগ নিয়ে গেছে, এবারই প্রথম ড্রাইভারকে দিয়ে ব্যাগ নিয়ে অফিস থেকেই পারভেজ চলে গেল। তন্দ্রার একবার মনে হলো পারভেজকে ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, সে কোথায় যাবে? কেন যাবে?
কথাটা ভেবেই তন্দ্রা একটা শুষ্ক হাসি হেসে আপনমনে বলল, যে যেতে চায় তাকে আটকে রেখে কী লাভ?
না, তন্দ্রা আর পারভেজকে আটকে রাখার চেষ্টা করবে না, প্রথম প্রথম পারভেজের মোবাইল ফোনে কোন মেয়ে ফোন করলেই তন্দ্রার মাথা চক্কর দিত, সেটা একসময় সহনীয় হলো। তারপর তন্দ্রা একসময় অনুভব করল পারভেজের পরনারীতে আসক্তির কথা। তন্দ্রাকে সেটাও মেনে নিতে হলো। তন্দ্রা ভেবেছিল পারভেজের নৈতিক পতনের বুঝি এটাই শেষ কিন্তু না, এটাও শেষ না। পারভেজের লিভ টুগেদারের খবরটা যেদিন তন্দ্রার কানে এলো সেদিন তন্দ্রার আর তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। তন্দ্রা সবকিছু সইতে সইতে একেবারে পাথর হয়ে গেছে। সবকিছু ছেড়ে দেয়ার পর তন্দ্রাও আর পারভেজের দিকে ফিরে তাকাতে চায় না।

চব্বিশ

অনেক দিন থেকে হেনার ইচ্ছা একবার ভারতে গিয়ে আজমির শরীফ জিয়ারত করার কিন্তু মিতুর বিয়ে, পারভেজের বউকে ঘরে তোলা নিয়ে পারিবারিক কিছু সমস্যার জন্য সম্ভব হচ্ছিল না। একে একে সব শেষ হলো। হেনা একটা স্বস্তির নি:শ্বাস নিলেন। এবার তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা আসিফ সাহেবকে জানালেন। প্রথমে আসিফ সাহেব অফিসের কাজের কথা বললেন কিন্তু হেনা যখন জোর দিয়ে বললেন, সারাজীবন তো কাজ করলে এখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে এখন একটু বিশ্রাম নাও, দেখবে ওরা ঠিকই চালাবে সবকিছু। তোমার ছেলে না?
আসিফ সাহেব মৃদু হাসলেন, শুধু আমার ছেলে? তোমার না?
আচ্ছা যাই হোক আমাদের ছেলে তো, ওরা ছোটবেলা থেকে বেশ বুদ্ধিমান।
তাহলে কবে যেতে চাচ্ছ?
তুমি সবকিছু গুছিয়ে নাও। যদি আগামী মাসে যাওয়া যায়।
আচ্ছা।
এক মাস পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনে চলে গেলেন। বাড়িটা একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। সন্ধ্যা হলে নিচতলা আর আলোয় আলোয় ঝলমল করে না। গাড়ি বারান্দার নিচের লাইটটা মিট মিট করে জ্বলে। শুধু একজন মানুষের অনুপসি’তি সবকিছু এমন করে তুলতে পারে তন্দ্রা কখনো ভাবতে পারেনি। তন্দ্রার কাছে সবকিছু যেন খাপছাড়া বলে মনে হয়। এ বাড়িতে আসার পর থেকে তন্দ্রা সকালবেলা পারভেজকে অফিসে বিদায় দিয়ে নিচে চলে যেত। শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করে তার সময় কেটে যেত।
পাশের ফ্ল্যাটে তন্দ্রার জা’র সঙ্গে তো অনেক আগেই কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে। টুনটুনি আর রনি মাঝে মাঝে আড়াল থেকে ছন্দা বলে ডাক দেয়। তারপর ডানে-বাঁয়ে তার মাকে দেখে ভয়ে পাশ কেটে চলে যায়। এতদিন ছন্দাও তার দাদির সঙ্গে খেলা করতে পারত। দাদির অনুপসি’তিতে সেও মন খারাপ করে বসে থাকে।
তন্দ্রার মা বনশ্রীর বাসায় কয়েকবার এসেছে কিন্তু এ বাড়িতে এসেছে একবারই। তখন তার শাশুড়ির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আর একবার এসেছিল তার শাশুড়ি আজমির শরীফ যাওয়ার আগের দিন দেখা করতে। কয়েকদিন পর তন্দ্রা তার মাকে আসতে বলল। প্রথমে তার বাবা নিষেধ করেছিল কিন্তু তার মা বাবাকে বুঝিয়ে চলে এসেছে কয়েকদিন পর।
দাদির অনুপসি’তিতে ছন্দা প্রথম কয়েকদিন মন খারাপ করে থাকলেও নানীর আগমনে সে আবার আগের মতোই নানীর সঙ্গে খেলাধুলা করে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। এই তো সেদিন তারেক ফোন করেছিল। তন্দ্রার তখন রান্না ঘরে। ছন্দা ফোন রিসিভ করল, হ্যালো।
তন্দ্রার মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছে আর হাসছে, সালাম দাও নানু, সালাম দাও।
হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। কেমন আছ ছন্দা?
ভালো, আপনি কি ভালো আঙ্কল বলছেন?
এই তো ঠিকই বলেছ। আমি তোমার ভালো আঙ্কল।
ছন্দা মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে তার মাকে দিল, আম্মু ভালো আঙ্কল।
তন্দ্রা মোবাইল ফোন নিল, হ্যালো।
কেমন আছ তন্দ্রা?
ভালো, আলহামদুলিল্লাহ, তুমি?
ভালো।
কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
রান্না ঘরে।
তুমি রান্না করতে পারো?
একটা বোকার মতো প্রশ্ন করলে?
কেন?
বাংলাদেশের প্রায় সব মেয়েরাই কম-বেশি রান্না করতে পারে।
তোমাকে দেখে তো মনে হয় না।
ও এতদিন জানতাম তুমি কণ্ঠস্বর শুনে ভালো আছি কী না বলতে পারো এখন শুনলাম তুমি চেহারা দেখে বলে দিতে পারো কেউ রান্না করতে পারে কী না?
তারেক হেসে উঠল।
হাসছ কেন?
তুমিও দেখি আজকাল অনেক কথা বলছ। ছন্দাও ভালোই কথা বলতে শিখেছে। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে ম্যাচুর্ড মেয়ে।
এসো না একদিন আমাদের বাসায় আমি রান্না করতে পারি কী না খেয়ে যাবে আর আমার মেয়েকে দেখে যাবে।
তোমাকে দেখে আসবো না?
আচ্ছা, আচ্ছা আমাকেও দেখতে এসো, সেই কতদিন থেকে তোমার সঙ্গে দেখা হয় না।
তুমি তোমার শ্বশুর বাড়িতে না?
হ্যাঁ।
তবুও আসতে বলছ?
এত প্রশ্ন করো না তো। আসতে বলছি তুমি আসবে। ফ্রেন্ড ফ্রেন্ডের বাসায় আসতে তাতে আবার এত প্রশ্ন কীসের?
না আসলে আমি তোমাকে কোন…
থাক, থাক আর বলতে হবে না। তুমি চলে এসো।
আচ্ছা, কাল বিকেলে?
ওকে।
তন্দ্রা কথা বলা শেষ করে ফোন রেখে দিচ্ছিল। ছন্দা আবার কথা বলার জন্য বায়না ধরল, আম্মু, আম্মু।
তুমি কথা বলবে?
ছন্দা মাথা নেড়ে সায় দিল।
তন্দ্রা আবার তারেকের মোবাইল ফোনে রিং করল।
তারেক রিসিভ করল, হ্যালো।
ছন্দা তোমার সঙ্গে কথা বলবে, আজকেই প্রথম ফোনে কথা বলল তো, খুব খুশি হয়েছে।
আচ্ছা দাও।
ছন্দা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে বলল, হ্যালো ভালো আঙ্কল।
জি আম্মু।
তন্দ্রা ছন্দার কানে ফিসফিস করে শিখিয়ে দিল, বলো আম্মু, ভালো আঙ্কল আমাদের বাসায় এসো কিন্তু।
ছন্দা তন্দ্রার শিখিয়ে দেয়া কথা বলল, ভালো আঙ্কল আমাদের বাসায় এসো কিন্তু।
তন্দ্রা আবার ছন্দাকে শিখিয়ে দিল, বলো ভালো আঙ্কল এখন রাখি, বাই।
ছন্দা বলল, ভালো আঙ্কল এখন রাখি বাই।
ছন্দার কথা বলা শেষে তন্দ্রা মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল।

পঁচিশ

তারেক লক্ষ্য করেছে যেদিন তার কোন কাজ থাকে সেদিন অফিস থেকে বের হতেও দেরি হয় আর যেদিন সে একেবারে ফ্রি থাকে সেদিন ঠিক সময়ই তার কাজ শেষ হয়। আজ তন্দ্রার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্য সে সেই সকাল থেকে মনে মনে প্রস’তি নিচ্ছে। অথচ অফিসে এমন একটা কাজে আটকে গেল যে ছুটি পেতে পেতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেল। অফিস থেকে বের হয়েই তন্দ্রাকে ফোন করল, হ্যালো তন্দ্রা।
হ্যালো। আসছ না?
হ্যাঁ।
এখন কোথায়?
মনে হয় তোমার বাসার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি।
আচ্ছা। গেটে এসে একবার রিং দিও।
আচ্ছা।
বড় গেট। তারেক একবার বাসার ঠিকানাটা মিলিয়ে নিল। তারপর তন্দ্রাকে ফোন করল।
সিকিউরিটি গার্ডের পাশের একটা টুলে রাখা ইন্টারকম বেজে উঠল।
সে হ্যালো বলে কানের কাছে কয়েক মুহূর্ত রিসিভার ধরে রাখল। তারপর তারেককে জিজ্ঞেস করল, আপনি ছোট ভাবীর কাছে যাবেন?
হ্যাঁ।
আসুন প্লিজ! বলে গার্ড গেট খুলে দিয়ে বলল, দ্বিতীয় তলা বাম পাশের ফ্ল্যাট।
থ্যাঙ্ক ইউ।
গেট দিয়ে ঢুকতেই বাঁ পাশে একটা গাড়ির গ্যারেজ, ডানে একটা ছোট আকারে ফুল বাগান। সোজা রাস্তা চলে গেছে দ্বিতল ডুপ্লেক্স বাসার দিকে। রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো গার্ডেন লাইট। হাঁটতে হাঁটতে তারেক ডুপ্লেক্স বাসার কাছে চলে এলো ওপর থেকে ছন্দার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ভালো আঙ্কল।
তারেক ওপরের দিকে একবার তাকালো, ছন্দা হাত তুলে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।
তারেককে কলিং বেল টিপতে হলো না। সে দরজায় দাঁড়াতেই তন্দ্রা দরজা খুলে দিল, এসো।
তারেক তন্দ্রার পিছনে পিছনে ড্রয়িং রুমে ঢুকল।
ছন্দা তারেকের কাছে এলো।
তারেক ছন্দাকে কোলে নিয়ে বলল, কেমন আছ ছন্দা?
ভালো, আপনি?
আমিও ভালো আছি, বলে তারেক ছন্দার হাতে তার জন্য নিয়ে আসা প্যাকেটটা দিয়ে বলল, এটা রাখ আম্মু।
না। ছন্দা নিতে অসম্মতি জানিয়ে তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে রইল।
তন্দ্রা সম্মতি দিল, নাও আম্মু।
ছন্দা প্যাকেটটা নিয়ে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।
তন্দ্রা একটা লাল রং-এর একটা শাড়ি পরেছে। তন্দ্রা যখন ভার্সিটিতে পড়তো তখন প্রায় লাল শাড়ি পরতো। এই লাল শাড়িতেই বন্ধুরা তাকে দেখে খুব মজা করতো। কেউ কেউ বলতো কী রে সবসময় লাল শাড়ি পরিস কেন? বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে নাকি?
তন্দ্রা হাসতো।
পারভেজও তাকে যেদিনই লাল শাড়িতেই দেখেছে সেদিনই তার খুব প্রশংসা করেছে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম যখন দু’জনে বেড়াতে যেত তখন পারভেজই তাকে লাল শাড়ি পরতে বলতো। পারভেজ যেদিন থেকে তার পর হয়ে গেছে সেদিন থেকেই তন্দ্রা লাল শাড়ি পরা বাদ দিয়েছে আজ তারেককে আসতে বলে সে আবার লাল শাড়ি পরেছে। শুধু তাই নয়, তন্দ্রা লাল শাড়ি পরে বার বার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে আর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখেছে। অনেকদিন পর কিশোরী বয়সের মতো শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর পর তন্দ্রা নিজেই হেসেছে। সে নিজেও খেয়াল করেছে লাল শাড়িতে তার সৌন্দর্য আরো অনেকগুণ ফুটে উঠেছে কিন্তু তারেকের কথাটা যেন একেবারে সত্যি তন্দ্রার হাসিতে প্রাণ নেই। তন্দ্রা তারেককে বসতে বলে নিজেও পাশের সোফায় বসল।
তারেক কয়েক মুহূর্ত তন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথাও গেছিলে নাকি আজ?
না।
তবে সেজে গুঁজে…
অনেক দিন থেকে সেজে গুঁজে কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। তাই সাজলাম। তাছাড়া তুমি আসছ! বলে তন্দ্রা মুচকি হাসল।
তারেক মৃদু হেসে বলল, তন্দ্রা ইউ আর লুকিং নাইস।
তন্দ্রাও হাসল।
তন্দ্রা সোফা থেকে উঠল। তুমি বসো আমি তোমার জন্য নাস্তা তৈরি করছি, তুমি মা’র সঙ্গে গল্প করো, বলে তন্দ্রা মা বলে একটা ডাক দিয়ে চলে গেল।
তন্দ্রার মা ড্রয়িং রুমে ঢুকল।
তারেক দাঁড়িয়ে সালাম দিল।
তন্দ্রার মা সামালের জবাব দিয়ে বলল, বসো বাবা, বসো।
তারেক সোফায় বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন খালা আম্মা?
ভালো, তুমি?
জি খালা আম্মা, ভালো।
শুনলাম তুমি নাকি ঝুমুরের চাচাতো ভাই।
জি খালা আম্মা।
তোমার খালুর পোস্টিং তখন কুড়িগ্রাম, তন্দ্রা কুড়িগ্রাম মহিলা কলেজে পড়ত। ঝুমুর প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতো। তন্দ্রার সঙ্গে খুব মিল ছিল। তা তুমি কী করো বাবা?
আমি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরী করি।
তোমার ছেলেমেয়ে ক’জন।
এক মেয়ে।
তন্দ্রা নাস্তা নিয়ে এলো। তার মা সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল, তোমরা বসো বাবা।
বসুন খালা আম্মা।
তন্দ্রাও বলল, মা বসো।
কিন্তু তন্দ্রার মা বসল না।
তারেক দু’য়েকবার নাস্তা তুলে মুখে দিতেই বলল, বাহ খুব সুন্দর তো তোমার রান্না। তুমি তো রাঁধুনি হিসেবেও অসাধারণ।
তারমানে তোমার এই ক্যালকুলেশনটা ঠিক হলো না, বল তন্দ্রা মুচকি হাসল। তারপর বলল, তোমরা ছেলেরা মেয়েদের শুধু রাঁধুনি, গৃহিণী, ঘরণী হিসেবে দেখতেই পছন্দ করো। কোন প্রশংসা করতে গেলে এই ভাষাগুলোই মুখে আসে। একবার অফিসে বসিয়ে দিয়ে দেখ না একটা বড় অফিস কিংবা একজন এক্সিকিউটিভ হিসেবে ভালোভাবে চালাতে পারি কী না?
তারেক তন্দ্রার মুখের দিকে তাকালো, তন্দ্রা তোমার মধ্যে ইজমটা খুব বেশি। তুমি ভালো রেঁধেছ তাই ভালো রাঁধুনি বলেছি তুমি যদি এ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভালোভাবে চালাতে তবে সেই কাজেরও প্রশংসা করতাম।
নাস্তা খাওয়া শেষ হতে না হতেই ছন্দা এসে তারেকের একটা হাত ধরে টানতে টানতে বলল, ভালো আঙ্কল একটু এদিকে এসো না!
তারেক উঠে ছন্দার সঙ্গে গেল। ছন্দা তারেককে প্রথমে তন্দ্রার বেড রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তারেক দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, এটা কার রুম ছন্দা?
আম্মু-আব্বুর, বলে ছন্দা আরো রুমের দিকে টানছিল। তারেক জিজ্ঞেস করল, তোমার রুম কোনটা?
ছন্দা তারেককে আরেকটা রুমে নিয়ে গেল। তারেক ভেতরে ঢুকে বলল, তুমি এই রুমে থাক?
নাহ্‌। আমি আম্মুর রুমে থাকি। আম্মু বলেছে আমি যখন বড় হব তখন এই রুমে থাকব।
ছন্দা তারেককে বেলকনিতে নিয়ে গেল।
তারেক জিজ্ঞেস করল, এটাকে কী বলে বল তো?
ছন্দা পরিপক্ব স্বরে বলল, বেলকনি। আমি এখানে খেলি।
তারেক ছন্দার চিবুক ছুঁয়ে আদর দিল।
দু’জনে আবার ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকল।
তন্দ্রাও চা নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকল, ছন্দা আমাকে তোমার পুরো বাসা ঘুরে ঘুরে দেখাল। খুব ট্যালেন্ট মেয়ে।
হ্যাঁ।
তোমার বাসাটা খুব সুন্দর।
হ্যাঁ, আমার তো সবই সুন্দর, বাসা সুন্দর, আমার ফুটফুটে মেয়েটি সুন্দর, আমার রান্না সুন্দর কিন্তু আমি-
তারেক শাসনের সুরে বলল, আর কোন কিন্তু নেই, তোমার সব ভালো লাগা মন্দ লাগা শেষ পর্যন্ত ঐ এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঐ একটা বিষয়কে বাদ দিয়ে ভাবতে পারো না। আমাকে দেখছ না? আমাকে কোনদিন এনিয়ে ভাবতে দেখেছ।
তারেকের কথা শুনতে শুনতে তন্দ্রার দু’চোখে পানি চলে এলো। তন্দ্রা অনেকের কাছে শুনেছে মানুষ কষ্টের কথা শুনে সহানুভ’তির নামে, সহযোগিতার নামে সুযোগ খুঁজে বিশেষ করে ছেলেরা কিন্তু তারেক একেবারে উল্টো তন্দ্রার কষ্টের কথায় সে গঠনমূলক পরামর্শ দেয়।
তন্দ্রাকে চুপ করে থাকতে দেখে তারেক জিজ্ঞেস করল, কী হলো?
তন্দ্রা আবেগজড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, পৃথিবীর সব ভালো মানুষগুলোই কি সেক্রিফাইজ করতে করতে সারাজীবন কাটিয়ে দিবে?
তারেক তন্দ্রার কথার কোন উত্তর দিল না। সে চা শেষ করে, উঠে দাঁড়াল, তন্দ্রা।
তন্দ্রা চোখ মুছতে মুছতে বলল, যাবে?
হ্যাঁ, বলে তারেক ছন্দা বলে জোরে ডাক দিতেই ছন্দা চলে এলো।
তারেক ছন্দার গালে আদর দিয়ে বলল, ছন্দা, আমি আসি আম্মু।
তারেক ড্রয়িং রুম থেকে বের হয়ে একসঙ্গে মা-মেয়ে দু’জনের নাম ধরে ডাকল, তন্দ্রা, ছন্দা।
তন্দ্রা দরজা খুলে দিল।
তারেক বাসা থেকে বেরিয়ে ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে হাত তুলল, তন্দ্রা, ছন্দা দু’জনে হাত তুলে বিদায় জানাল।
ছন্দা দরজা থেকে আবার বেলকনিতে দৌড়ে এলো। পিছনে পিছনে তন্দ্রাও এলো।
তন্দ্রা ছন্দাকে কোলে তুলে নিল, ছন্দা আবার হাত তুলে বলল, ভালো আঙ্কল আবার আসবেন কিন্তু।

ছাব্বিশ

আজকাল অফিসের কাজের নামে চট্টগ্রাম যাওয়াটা পারভেজের বেড়ে গেছে। যখন তন্দ্রার শ্বশুর-শাশুড়ি ছিল তখন হয়ত কোথাও যাওয়ার আগে বাবাকে না হলেও মাকে বলে যেত কিংবা মা পারভেজকে জিজ্ঞেস করতো কিন্তু তাঁরা আজমির শরীফ যাওয়ার পর সে যেন লাগামহীন হয়ে গেছে। আগে কোথাও যাওয়ার আগে পারভেজ আগের দিন রাতে তন্দ্রাকে কাপড়-চোপড় গুছাতে বলতো কিন্তু আজ সকালবেলা বিছানা থেকে উঠেই পারভেজ নিজেউ ব্যাগ গুছাতে লাগল। তন্দ্রা জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবে তুমি?
চিটাগাং।
নিজে ব্যাগ গুছাচ্ছ কেন? আমাকে বললেই তো আমি গুছিয়ে দিতাম।
তন্দ্রা তখনো বিছানায় শুয়ে ছিল। পারভেজ একবার তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বিছানা থেকে ওঠোনি তো তাই নিজেই গুছাচ্ছিলাম।
তন্দ্রা বিছানা থেকে উঠল। পারভেজকে সরিয়ে দিয়ে ওয়্যার ড্রপ থেকে কাপড় নিয়ে পারভেজের ব্যাগ গুছাতে লাগল। ব্যাগ গুছানো শেষে তন্দ্রা রান্না ঘরে চলে গেল, তুমি বসো আমি ততক্ষণে তোমাকে নাস্তা দিচ্ছি।
পারভেজের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। পারভেজ রিসিভ করল না।
পারভেজ বেড রুম থেকে জোরে বলল, তন্দ্রা নাস্তা খাব না। দেরি হয়ে গেছে।
নাস্তা তৈরি হতে তন্দ্রা কয়েক মিনিট সময় নিল। ততক্ষণে পারভেজ ব্যাগ নিয়ে দরজার কাছে চলে গেছে। তন্দ্রা নাস্তার প্লেট ডাইনিং টেবিলে রেখে বলল, নাস্তা খেয়ে যাও।
পারভেজের মোবাইল ফোন আবার বেজে উঠল। পারভেজ একবার ফিরেও তাকালো না, যেভাবে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যাচ্ছিল সেভাবেই চলে গেল।

পারভেজ চলে যাবোার পর তন্দ্রা আবার শুয়ে পড়ল। তার মাথায় অনেক চিন্তা ভিড় করছে। পারভেজ এমনভাবে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল যেন কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে, সে একরকম ছুটে গেল। তন্দ্রা পারভেজের দিকে কয়েকবার তাকিয়েছে, তার চোখে চোখ রেখে বোঝার চেষ্টা করেছে কিন্তু পারভেজ চোখ সরিয়ে নিয়েছে। তন্দ্রার মনে হয়েছে পারভেজ কিছু লুকাতে চাচ্ছে।
ছন্দা জেগে উঠল। সে তার বাবাকে হাতড়াতে লাগল, আব্বু।
তন্দ্রা বলল, আব্বু বাইরে গেছে আম্মু।
ছন্দা মুখ কালো করল।
তন্দ্রা ছন্দাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার দু’চোখ পানিতে ভরে গেল।
তন্দ্রাকে বিছানা থেকে উঠতে না দেখে তার মা দরজা নক করল। তন্দ্রা একবার সময় দেখল, ন’টা বাজে।
সে বিছানা থেকে উঠল। সবাই একসঙ্গে বসে নাস্তা খেল। তন্দ্রার মা জিজ্ঞেস করল, জামাই কোথায় গেল তন্দ্রা?
চিটাগাং।
আজ বন্ধের দিনে?
ব্যবসায়ীদের তো বন্ধ খোলা নেই মা।
ছন্দা বায়নার সুরে বলল, আম্মু চলো না আমরাও বাইরে যাই।
কোথায় যাবে আম্মু?
বাইরে।
আচ্ছা। এখন নাস্তা খাও, বিকেলে তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবো।
আচ্ছা।
দুপুরের খাওয়ার পর থেকেই ছন্দা বের হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নিজে নিজেই আলনা থেকে তার কাপড়-চোপড় বের করে পরতে লাগল। তন্দ্রাও নাস্তা শেষ করে কাপড়-চোপড় পরে মা-মেয়ে বের হলো।
বাসা থেকে বের হয়েই একটা সি.এন.জি নিল। তন্দ্রা সি.এন.জিতে উঠেই ছন্দাকে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবে আম্মু?
ছন্দা বলল, পার্কে।
তন্দ্রা সি.এন.জি’র ড্রাইভারকে বলল, শিশু মেলা যাও।
রাস্তায় তেমন যানজট নেই। সি.এন.জি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সি.এন.জি’র সামনে একটা বাস যাচ্ছিল। জাহাঙ্গীর গেট পার হয়ে সি.এন.জি বিজয় স্মরণীর দিকে এগিয়ে চলছে। হঠাৎ করে সামনের বাসটি জোরে ব্রেক কষতেই সি.এন.জি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসের পিছনে জোরে ধাক্কা খেয়ে ডানে কাত হয়ে পড়ে গেল। সি.এন.জি পিছনে আরো কয়েকটি সি.এন.জি এবং অটোরিকশা ছিল। তন্দ্রা যে সি.এন.জিতে ছিল সে সি.এন.জির পেছনে এসে ধাক্কা দিল। মুহূর্তেই রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েক জন পথচারি এসে সি.এন.জি তুলল। তন্দ্রা হাতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল তার জামার হাত রক্তে ভিজে গেছে। সে তার হাতের দিকে তাকাতেই চিৎকার করে কেঁদে উঠল। একজন পথচারী তন্দ্রার হাত ধরে জোরে টান দিতেই তার ভেঙ্গে যাওয়া হাতটা শব্দ হয়ে সোজা হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা এ্যাম্বুলেন্স সামনে এসে দাঁড়াল। কয়েকজন পথচারী তাকে এবং ছন্দাকে এ্যাম্বুলেন্সে তুলল। তন্দ্রা একবার ছন্দাকে কোলে নিতে চাইল কিন্তু নিতে পারল না। সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে ছন্দার শরীরের কয়েক জায়গায় চামড়া উঠে গেছে আর ছন্দা খুব জোরে চিৎকার করে কাঁদছে।
এ্যাম্বুলেন্স পঙ্গু হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াল। সিস্টার, ওয়ার্ড বয়সহ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী কাছে এসে তাকে স্ট্রেচারে তুলে ওয়ার্ডে নিয়ে একটা বেডে শুইয়ে দিল।
তন্দ্রা সিস্টারকে তার মোবাইল ফোনটা বের করে দিতে বলল। তন্দ্রার বাম হাতটা ভেঙ্গে গেছে। রক্তাক্ত অবস’ায় সে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সে কোন রকমে বাম হাত দিয়ে মোবাইলের বাটন টিপে প্রথমে পারভেজের মোবাইল ফোনে রিং করল কিন্তু পারভেজের মোবাইল ফোন বন্ধ। তারপর সে তার ভাশুরের মোবাইল ফোনে রিং করল।
তন্দ্রার সঙ্গে তার ভাশুরের তেমন কথাবার্তা হয়নি। মাঝে মাঝে শুধু সালাম বিনিময় হয়েছে মাত্র। তন্দ্রার ফোন রিসিভ করে তিনি বললেন, কে বউমা?
জি ভাই আমি তন্দ্রা।
কী হয়েছে তোমার?
এক্সিডেন্ট। ভাইজান আপনি একবার আসবেন পঙ্গু হাসপাতালে বলে তন্দ্রা সিস্টারের কাছ থেকে শুনে ওয়ার্ড নাম্বার এবং বেড নাম্বার বলল।
আচ্ছা বউমা আমি আসছি বলে তার ভাশুর মোবাইল ফোন রেখে দিল।
তারেকের মোবাইল ফোনে রিং দিতে দিয়ে তন্দ্রা কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিল। তারপর রিং করল।
তারেক ফোন রিসিভ করেছে, হ্যালো তন্দ্রা।
হ্যাঁ তুমি একবার আসতে পারবে…বলতে বলতে তন্দ্রা জ্ঞান হারাল।

সাতাশ

তারেক রিং ব্যাক করে সিস্টারের কাছে তন্দ্রার ঠিকানা নিয়ে ছুটে এলো ঝড়ের বেগে। তার চুলগুলো এলোমেলো, মুখ শুকনো। হাঁপাতে হাঁপাতে তন্দ্রার বেডের পাশে এসে দাঁড়াল, তন্দ্রা!
তন্দ্রার পাশে ছন্দা বসেছিল। তারও হাতে পায়ে কয়েকটা ব্যান্ডেজ। সে তারেককে দেখে কেঁদে উঠল, ভালো আঙ্কল।
তারেক ছন্দাকে কোলে নেয়ার জন্য হাত বাড়াল।
তন্দ্রা নিষেধ করল, থাক, ওর গায়েও ব্যথা হচ্ছে।
আর তোমার? বলে তারেক তন্দ্রার ডান হাতের দিকে তাকালো, তোমার ডান হাতে লেগেছে?
হ্যাঁ ভেঙ্গে গেছে।
পারভেজকে ফোন করেছ?
ফোন করেছিলাম, মোবাইল বন্ধ।
নাম্বারটা বলো দেখি আমি আবার চেষ্টা করছি।
তন্দ্রা পারভেজের মোবাইল নাম্বারটা বলল।
তারেক কয়েক বার ফোন করার পর পারভেজ রিসিভ করল, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম।
আপনি কি পারভেজ সাহেব বলছেন?
জি বলুন।
আপনার স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখন হাসপাতালে, বলে তারেক আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। তন্দ্রা ফোনটা তাকে দেয়ার জন্য তারেককে ইশারা করল।
তারেক তন্দ্রাকে ফোন দিল, হ্যালো।
পারভেজ বলল, কী হয়েছে তন্দ্রা?
আমি ছন্দাকে নিয়ে একটু বাইরে বেরিয়েছিলাম। রাস্তায় আমাদের সি.এন.জি এক্সিডেন্ট করল। আমরা এখন পঙ্গু হাসপাতালে।
তোমার কী অবস’া?
আমার ডান হাতটা বলে তন্দ্রা আর কথা বলতে পারল না। তার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
কী হয়েছে তোমার বাম হাতটা?
ভেঙ্গে গেছে।
আর ছন্দা?
ছন্দা ভালো আছে।
আচ্ছা আমি আসছি।
তুমি এখন কোথায়?
চিটাগাং।
এসো প্লিজ!
তারেক জিজ্ঞেস করল, তোমাদের বাসায় ফোন করেছ?
না। আমি পারভেজকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ওকে তো পাইনি, ভাশুরকে ফোন করেছি, আসছে বোধ হয়। আর তোমাকে ফোন করেছি।
আচ্ছা ফোন নাম্বার বল, আমি ফোন করে বলছি।
তন্দ্রা তার মোবাইল ফোন থেকে একে একে সবার ফোন নাম্বার বলল আর তারেক সবাইকে তন্দ্রার দুর্ঘটনার খবর দিল।
সিস্টার জিজ্ঞেস করল, আপনি পেশেন্টের…
অনেক কষ্টের মাঝে তন্দ্রা একটু হেসে বলল, আত্মীয়।
সিস্টার তন্দ্রাকে ইশারা করে বলল, চলুন। তারপর তারেকের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল, আপনি এগুলো ঔষধ নিয়ে আসুন।
তন্দ্রা একবার কী যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু দু’জন সিস্টার ততক্ষণে তন্দ্রাকে দু’পাশে ধরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
তারেক বাজার থেকে ঔষধ নিয়ে আসার অনেকক্ষণ পর তন্দ্রাকে এনে আবার বিছানায় শুইয়ে দিল। তার গণ্ডদেশের চোখের পানির আভা তখনো মিশেনি। প্লাস্টার করা ডান হাতটা গলার সঙ্গে বাঁধা। সিস্টার তন্দ্রাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে হাতটা ঠিক করে দিয়ে তন্দ্রাকে বলল, হাতটা সবসময় এভাবে রাখবেন।
তারেকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তন্দ্রার দু’চোখের কোনায় পানি জমে গেল। সে কয়েক মুহূর্ত তারেকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, অনেক রাত হয়েছে, আমার জন্য তুমি অনেক করেছ। এখন বাসায় যাও।
এভাবে বলছ কেন? এখন তোমাকে সুস’ করে তোলাই সবচেয়ে বেশি জরুরি তন্দ্রা।
তন্দ্রার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, তারেক!
সমাপ্ত

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস