দাগ

শুভ্রর চোখে চোখ পড়তেই উর্মী চমকে উঠল, আপন মনে বলল, শুভ্র না?

হ্যাঁ শুভ্রই তো, ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত ক্লাসের সেকেন্ড বয় ছিল।

শুভ্র আপন মনে বলল, মেয়েটা এমন একটা বোরকা পরেছে শুধু মুখ কেন, চোখ দু’টাও দেখার উপায় নেই। নাক পর্যন্ত ঢাকা, শুধুমাত্র চোখ দু’টা খোলা আছে তারওপর আবার সানগ্লাস। মানুষ এখনো এত পর্দা মানে? মেয়েটা খুব গোঁড়া নাকি? নাকি একেবারে ধর্মান্ধ? নাকি কেউ দেখলে তার রূপ ক্ষয় হয়ে যাবে?

উর্মী একটা চাপা নিঃশ্বাস মোচন করল, উঃ এতদিন সবার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, আমার জীবনে তখন একটার পর একটা অঘটন ঘটেই যাচ্ছিল, তারপর সবচেয়ে কলঙ্কিত ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর থেকে সেই যে বোরকা পরেছি তারপর আর কারো সামনে বোরকার ভেতর থেকে মুখ বের করিনি। শুধু তাই নয় আমি নিজেকে আড়াল করার জন্য অ্যাফিডেভিড করে নিজের নাম চেঞ্জ করেছি। সব সময় নিজেকে খুব কাছের বান্ধবীরা ছাড়া অন্য কারো কাছে পরিচয় দিইনি কিন্তু আজ বোধ হয় আর শেষ রক্ষা হলো না।

উর্মী নিজেকে সামলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, নিজের মনের কাছে সান্ত্বনা খুঁজে বের করার চেষ্টা করল, আমি তো বোরকা পরে আছি আমার শুধুমাত্র চোখ দু’টা দেখতে পাবে, শুধু মাত্র চোখ দেখে কি সাত/আট বছর আগের কোন মেয়েকে কেউ চিনতে পারবে? না, না, তা পারবে না কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর? আমি আমার কণ্ঠস্বর লুকাবো কি করে?

উর্মী আবারো নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, যাক এখানে তো অনেকেই আসে ঘটনাক্রমে এই যে শুভ্রর সঙ্গে আমার দেখা হলো আর তো কোনদিন দেখা নাও হতে পারে। কয়েক মিনিট কোনভাবে কাটিয়ে দিতে পারলেই হয়।

উর্মী মুখ ফিরিয়ে নিল।

উর্মী সব সময় যে রকম বোরকা পরে থাকে তাতে কেউ তাকে চিনে ফেলার কথা নয়। শুভ্রও উর্মীকে চিনতে পারেনি।

উর্মী রিসিপশনিস্টকে সালাম দিয়ে তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দিল।

রিসিপশনিস্ট জিজ্ঞেস করল, আপনি আফসানা বেগম উর্মী?

জি।

কম্পিউটার সেকশনে নতুন জয়েন করবেন?

জি।

আপনি বসুন প্লি­জ।

দু’বার জি বলতে শুনেই যেন শুভ্র চমকে উঠল তার কাছে উর্মীর কণ্ঠস্বর খুব পরিচিত মনে হলো। সে মনে করার চেষ্টা করল, এই কণ্ঠস্বর তার কাছে খুব পরিচিত, যেন তার অনেক কাছের।

রিসিপশনিস্ট শুভ্রকে জিজ্ঞেস করল, আপনি?

জি আমিও জয়েন করতে এসেছি।

কম্পিউটার সেকশনে?

জি।

উর্মীর বুকটা আবার ধক করে উঠল। তারমানে কিছুক্ষণ না একই সেকশনে অনেকদিন কাজ করতে হবে? শুভ্র কোনকিছু জানে না তো। ওরা ধামইরহাট থেকে চলে যাবার অনেক পরের সেই ঘটনা? পত্র-পত্রিকায় আমার নামে লেখালেখি এসব?

রিসিপশনিস্ট শুভ্রর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দেখি আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা?

শুভ্র তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দিল।

রিসিপশনিস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দেখে বলল, একই পদে?

শুভ্র হাসল।

রিসিপশনিস্ট মৃদু হেসে বলল, সো ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। মিঃ শুভ্র আপনিও বসুন। আমি ভাই’র সঙ্গে কথা বলি। তারপর আপনাদের বলছি।

শুভ্র বসল।

রিসিপশনিস্ট ইন্টারকমে উর্মী আর শুভ্রর পরিচয় দিয়ে তাদেরকে ভিতরে পাঠিয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইল।

রিসিপশনিস্ট ইন্টারকম রেখে দিয়ে বলল, আপনারা একটু বসুন।

উর্মীর মুখ যেন কালো মেঘে ঢেকে গেল। সে বুকে একটা হাহাকার অনুভব করল, আজ বোধ হয় আর নিজেকে আড়াল করতে পারলাম না। শুভ্র যখন আমার সবকিছু জানবে তখন কি ভাববে? শুভ্র কি বুঝবে আমার কোন দোষ ছিল না। নাকি আমাকে প্রতারক মনে করবে? এতদিন পর আবার আমি এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। উঃ তুই কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলি মামুন? কেন এমন করলি? কেন আমাকে এত ভালোবাসলি? পাগলামি করে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের চেয়ে আমাকে বেশি ভালোবাসলি? মামুন তুই থাকলে আমি সমস্ত কিছু ছেড়ে তোর কাছে চলে যেতাম, আমি যত অপরাধই করি না কেন তুই আমাকে ফিরিয়ে দিতিস না। সব কলঙ্ক মুছে দিয়ে তুই আমাকে বুকে তুলে নিতিস।

মানুনের কথা ভাবতেই এক অর্থ পিপাসু, হৃদয়হীন অমানুষের স্মৃতি উর্মীর হৃদয়ে ভেসে উঠল, নেমকহারাম, আমার জীবন নষ্ট করলি শুধু জেল পর্যন্তই তোর শাস্তি হওয়া ঠিক হয়নি তোর ফাঁসি হওয়া উচিৎ ছিল।

কয়েক মিনিট পর পিয়ন এলো।

রিসিপশনিস্ট বলল, প্লিজ আপনারা ভিতরে যান।

শুভ্র চেয়ার ছেড়ে উঠল কিন্তু উর্মী উঠল না।

উর্মীকে আনমনা বসে থাকতে দেখে শুভ্র ডাকল, হ্যালো ম্যাডাম চলুন।

উর্মী নিজের কণ্ঠস্বর লুকানোর জন্য কিছু বলল না।

শুভ্র আপন মনে বলল, কি আনসোশ্যাল মেয়ে রে বাবা? কোন কথা বলল না।

          একটা চেম্বারে একজন মধ্যবয়সী ভদ্র লোক বসে ছিলেন।

দু’জনে সালাম দিয়ে ভিতরে ঢুকল।

তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, বস।

দু’জনে চেয়ারে বসল।

ভদ্রলোক আগে নিজের পরিচয় দিলেন, তারপর শুভ্রর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম?

শুভ্র বলল, জি স্যার আমার নাম জহিরুল ইসলাম শুভ্র।

স্যার বলবে না আমাদের এখানে কেউ কাউকে স্যার বলেনা, একজন আরেকজনকে ভাই বলে, তোমরা আমাকে জামান ভাই বলে ডাকবে।

শুভ্র মাথা নেড়ে বলল, জি ভাই।

জামান সাহেবের ইন্টারকম বেজে উঠল।

তিনি রিসিভ করে বললেন, জি ভাই।

তারপর তিনি অপর পাশের কথা শুনে বললেন, জি ভাই ঠিক আছে।

জামান সাহেব উর্মীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো উর্মী?

জি।

শুভ্র কিছুটা অবাক হলো তারমানে উর্মী সবার পূর্বপরিচিত।

জামান সাহেব শুভ্রকে জিজ্ঞেস করলেন, শুভ্র তো আগেও কাজ করেছ?

জি ভাই।

আচ্ছা তোমরা জয়েনিং লেটার লিখে এনেছ?

শুভ্র বলল, জি।

উর্মী তুমি?

উর্মী মাথা বাঁকিয়ে জানাল সে জয়েনিং লেটার লিখে আনেনি।

জামান সাহেব কলিং বেল টিপ দিতেই পিয়ন চলে এলো।

জামান সাহেব বললেন, আগে হাসানকে আসতে বল তারপর আমাদের জন্য তিন কাপ কফি দিয়ে যাও।

উর্মী বলল, সরি ভাই আমি এখন কিছু খাব না।

জামান সাহেব বললেন, তাহলে দু’কাপ।

কয়েক মিনিট পর হাসান ভিতরে ঢুকল।

জামান সাহেব উর্মীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এবং শুভ্রর কাছ থেকে জয়েনিং লেটারটা নিয়ে হাসানকে দিয়ে বললেন, হাসান এই হলো উর্মীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আর শুভ্রর জয়েনিং লেটার, তুমি উর্মীর জয়েনিং লেটারটা তৈরি করে নিয়ে আসো।

জি ভাই আনছি, বলে হাসান চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর কফি চলে এলো।

কফি খেতে খেতে জামান সাহেব অনেক আলাপ করলেন। তারপর ইন্টারকম তুলে বললেন, ভাই আমি কি উর্মী আর শুভ্রকে আপনার কাছে নিয়ে আসব।

অপর পাশ থেকে কি বলল তা শোনা গেল না।

ওকে ভাই থ্যাঙ্ক ইউ।

জামান সাহেব ইন্টারকম রেখে বললেন, উর্মী চলো তোমাদের একবার এডিটর ভাই’র সঙ্গে পরিচয় করে দিই।

দু’জনে জামান সাহেবের সঙ্গে গেল।

এডিটর সাহেবের সঙ্গে কথা বলে জামান সাহেব তাদের দু’জনকে তাদের সেকশনের সকলের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়ে ডেস্ক দেখিয়ে দিয়ে বললেন, উর্মী তুমি এখানে বসবে আর শুভ্র তুমি পাশের ডেস্কে বসবে। উর্মী তোমার জয়েনিং লেটারটা নিয়ে এলে সই করে দিও।

থ্যাঙ্ক ইউ ভাই।

তোমরা তাহলে বস। কোন কাজ না বুঝলে আমার কাছে চলে আসবে। মনে রাখবে আমাদের কম্পিউটার সেকশন অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং কাজের মান অত্যন্ত উন্নত আমরা এই গুডউইলটা ধরে রাখতে চাই।

দু’জনে বলল, জি ভাই, আমরা আপনাকে সহযোগিতা করবো।

শুভ্র আপন মনে ভাবতে লাগল, এত পরিচিত কণ্ঠস্বর যেন অনেকদিন আগে শুনেছে কিন্তু উর্মীকে সেকথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে যেন তার মুখ আড়ষ্ট হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ দু’জনে নীরব। পিয়ন একটা কাগজ এনে উর্মীকে দিল।

উর্মী কাগজটা নিয়ে ইন্সট্রাকশনটা পড়ে কাজ শুরু করল।

কয়েক মিনিট পর উর্মীই প্রথম কথা বলল, মিঃ শুভ্র একটু দেখবেন?

শুভ্র তার চেয়ার ছেড়ে উর্মীর কাছে গেল। কম্পিউটারে ডিজাইনটা দেখে বলল, খুব সুন্দর হয়েছে।

শুভ্র সাহেব আপনি কিন্তু আমাকে খুশি করার চেষ্টা করছেন। আমি জানি আসলে ডিজাইনটা আরও সুন্দর করা যেত। প্লিজ আপনি যদি একটু দেখতেন, প্রথম কাজ তো, বলে উর্মী চেয়ার ছেড়ে দিল।

শুভ্র কিছুক্ষণ কাজ করার পর উর্মী ডিজাইনটা দেখে বলল, আরও সুন্দর হয়েছে, আমি বলেছিলাম না আপনি দেখলে আরও সুন্দর হবে, থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ শুভ্র।

মোস্ট ওয়েলকাম মিস উর্মী, বলেই শুভ্র জিহ্বায় কামড় কাটল, সরি এখনো জানা হয়নি আপনি মিস নাকি মিসেস?

উর্মী মনে মনে বলল, সরি বলার দরকার নেই, আমি আনমেরিড কি না জানার জন্য আপনি ইচ্ছা করেই একথা বলেছেন।

শুভ্র উর্মীর দিকে তাকিয়ে রইল।

উর্মী বলল, কোনটাই বলতে হবে না, আপনি আমাকে শুধু উর্মী এবং তুমি বলেই ডাকবেন।

শুভ্রর উর্মীর কণ্ঠস্বর আবারো খুব পরিচিত বলে মনে হলো।

সে বলল, আচ্ছা উর্মী তোমার তোমার কণ্ঠস্বর আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি?

উর্মী যেন চমকে উঠল, সরি শুভ্র সাহেব আপনাকে কোথাও দেখেছি বলে তো আমার মনে পড়ছে না।

উর্মী তুমি কিন্তু নিয়ম মানলে না আমরা একসঙ্গে, একই পোস্টে কাজ করছি আমাকে তুমি বলে ডাকলেই খুশি হব।

উর্মী কোন কথা বলল না।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শুভ্র আবার বলল, উর্মী তোমার গ্রামের বাড়ি যেন কোথায়?

উর্মী পাশ কাটিয়ে বলল, শুভ্র তুমি কিন্তু একেবারে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে?

সরি উর্মী।

শুভ্র আর কোন কথা বলল না। বার বার করে তার মনে হলো উর্মী যেন তার অনেকদিনের চেনা কিন্তু নাম কিংবা চাল-চলন কিছুই মিলছে না। তার সঙ্গে একটা মেয়ে পড়ত তার গলার স্বর ঠিক উর্মীর মতোই, মেয়েটার নাম ছিল মায়া। ক্লাস এইট পর্যন্ত ধামইরহাট একসঙ্গে লেখাপড়া করেছে তারপর থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই। মায়ার পুরো নাম ছিল মৌসুমি আক্তার মায়া। আর উর্মীর নাম আফসানা বেগম উর্মী। শুধুমাত্র কণ্ঠস্বর পরিচিত বলে মনে হচ্ছে, শুভ্র একবার উর্মীর দিকে তাকাল কিন্তু কোনকিছু বলল না।

 

দুই

          সৌরভ আর শুভ্র দু’ভাই। ছোট সংসার, সৌরভ তার বউ সুরভী আর ছোট্ট একটি ছেলে, নাম প্রান্তিক। সৌরভ একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে, সে-ই সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়ে যায় আর ফিরে আসে একেবারে রাতে। সারাদিন সুরভীর কেটে যায় প্রান্তিকের সঙ্গে কথা বলে আর টি.ভি দেখে। এতদিন শুভ্র বেকার ছিল। বাইরে কোন কাজ না থাকলে সে প্রান্তিক আর সুরভীকে সঙ্গ দিত। আজ শুভ্র নতুন চাকরিতে জয়েন করতে গেছে। বিকেল পাঁচটার পর থেকে সুরভী শুভ্রর জন্য অপেক্ষা করছিল।

শুভ্রর বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা।

শুভ্রকে দেখে সুরভী জিজ্ঞেস করল, কি রে ফার্স্ট চাকরিতে জয়েন করেই তো শুরু করলি একেবারে ম্যারাথন চাকরি। যেন সৌরভের যোগ্য ছোট ভাই।

ভাবী প্রথম দিন চাকরি করে আসলাম কি তুমি ভালো ভালো নাস্তা রেডি করে রাখবে, তা না করে তুমি খোঁটা দিয়ে কথা বলতে শুরু করলে, এটা কি ঠিক?

সে কথা আর তোকে বলতে হবে না, তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয় দেখবি কত সুন্দর সুন্দর নাস্তা তৈরি করে রেখেছি।

শুভ্র হাত-মুখ ধুয়ে এসে বসল, ভাবী সত্যি সত্যিই তো তুমি আমার জন্য ঠিক আমার পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করেছ।

থ্যাঙ্কস ভাবী, ইউ আর সো নাইস।

শুভ্র নাস্তা খেতে খেতে বলতে শুরু করল। ভাবী তোমাকে একটা কথা বলব কিন্তু তার আগে তোমাকে বলতে হবে এনিয়ে তুমি আমাকে কোন ধরণের কটাক্ষ করতে পারবে না এবং কাউকে বলতেও পারবে না।

তুই আর কি বলবি নতুন কোন মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে? এ তো আর নতুন কথা না, তোর প্রেম তো আবার চৈতালি হাওয়ার মতো কখন কোনদিকে যায় তার কোন ঠিক নেই। আর এক মেয়েকে তো তোর বেশিদিন ভালো লাগে না। বল নতুন মেয়েটার কথা, শুনি।

কিছু বলার আগে তুমি এমন কিছু কথা শোনালে যেন বলার আগ্রহটাই নষ্ট হয়ে গেল।

না না আমি তোর আগ্রহ নষ্ট করিনি, আমি তোর ভাবী সারাদিন একা একা থাকি তোর সঙ্গেই একটু-আধটু ইয়ার্কি করি সেটুকু থেকে তুই আমাকে বঞ্চিত করিস না ভাই।

সত্যি বলছ তো?

হ্যাঁ।

আমার সঙ্গে একটা মেয়ে জয়েন করেছে। মেয়েটার নাম উর্মী, নামটা খুব সুন্দর না?

হ্যাঁ সুন্দরই তো।

মেয়েটার কণ্ঠস্বর আমার কাছে খুব পরিচিত বলে মনে হলো।

কেন হঠাৎ করে মেয়েটার শুধু কণ্ঠস্বর তোর কাছে পরিচিত মনে হলো আর মেয়েটাকে বোধ হয় তোর পরিচিত মনে হয়নি?

আরে পরিচিত মনে হবে কি করে? মেয়েটা তো এসেছে বোরকা পরে শুধু বোরকা বললে ভুল হবে সে এমন একটা বোরকা পরে এসেছে যে শুধু তার চোখ দু’টা দেখা যায়। আর হাতের দিকে তাকালে বোঝা যায় উর্মীর গায়ের রংটা।

কেমন হবে গায়ের রং?

খুব ফর্সা।

তাহলে এ পর্যন্ত অগ্রগতি।

আপাতত।

কি কথা হলো?

আমি ওর গ্রামের এড্রেসটা জানার চেষ্টা করলাম। ওরে বাবা বলল, এ প্রশ্নটা করা নাকি আমার ঠিক হয়নি। মেয়েটার চোখের শাসন আছে, ইচ্ছা করলেই বেশি কথা বলা যায় না।

চোখের শাসন থাকা ভালো, নাহলে তো আবার তোর মুখ থেকে কথার খই ফুটত।

তবে উর্মীর কণ্ঠস্বর আমার এখনো মনে পড়ছে। আমার এক বান্ধবী ছিল নাম মায়া, আমরা ধামইরহাটে থাকার সময় একসঙ্গে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি। কিন্তু মায়া উর্মী হবে কেন? আবার কণ্ঠস্বর আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

আচ্ছা আপাতত এর চেয়ে বেশি না ভাবলেও চলবে, তুই প্রান্তিককে নিয়ে একটু বস আমি আবার রান্না করবো।

 

উর্মীর রুম মেট হেমা ফুল নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

সে রুমে ঢুকতেই হেমা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাল।

উর্মী জিজ্ঞেস করল, কীরে ফুল কীসের?

তুই আজ প্রথম চাকরিতে জয়েন করেছিস তোকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে হবে না?

থ্যাঙ্কস হেমা।

হেমা বলল, কি রে তোর মন খারাপ কেন? কোন সমস্যা?

না রে, কোন সমস্যা নেই।

তুই কাপড় চেঞ্জ কর, একসঙ্গে চা খাব।

রাতে উর্মী বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই তার চোখে ঘুম এলো না। একটা কথা বার বার করে তার মনে খচখচ করে দাগ কাটল। একই সঙ্গে পাশাপাশি ডেস্কে চাকরি করে সে শুভ্রর কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে কিভাবে? আবার কখনো মনে হলো চিনলেই বা অসুবিধা কি আমার তো কোন দোষ নেই তবে শুভ্র আমাকে খারাপ বলবে কেন?

উর্মী কাত ফিরে শুইল। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু না তার চোখে ঘুম নেই বার বার করে তার হারানো দিনের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল।

মায়া আর মামুনদের বাড়ি পাশাপাশি। কবে তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল মনে নেই। মায়ার মনে হয় জন্ম থেকেই সে যেন মামুনকে দেখছিল। মায়া মধ্য বিত্ত পরিবারের মেয়ে দুই বোন এর মধ্যে মায়া সবার বড়। বাবা মোস্তাফিজ সাহেব মধ্যবিত্ত কৃষক। এক সময় দিগন্ত বিস্তৃত জমি, পুকুর, বাগান, গোলাভরা ধান ছিল, আজকাল গোলায় ধান রাখা হয় না কিন্তু ধানের গোলাটা যেন বংশের ঐতিহ্য বহন করছে। আগে গোয়াল ভরা গরু ছিল এখন শুধু দু’টা গাভী আছে আর বলদের স্থান দখল করেছে পাওয়ার টিলার। আগে বাড়ির মেয়েরা কোথাও আত্মীয়তা করতে গেলে গরুর গাড়িতে চড়ে যেত এখন মাইক্রোবাস ছাড়া কোথাও আত্মীয়তা করতে যায় না। সমস্ত কিছুতেই যেন এখনো আভিজাত্য আর বিলাসিতাটা রয়েই গেছে।

মামুন নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে, বাবা-মা’র আদরের সন্তান। বাবা প্রান্তিক চাষি, সারাদিন মাঠে কাজ করে, বর্গা নেওয়া জমিতে যে ফসল পায় তা দিয়ে কোন রকমে দিন কেটে যায়। মামুনদের সংসারে প্রায় সব সময় টানাটানি থাকে। ইচ্ছা করলেই মামুন সামর্থ্যের অভাবে বাবা-মা’র কাছে কিছু চাইতে পারে না। ভালো টিচারের কাছে প্রাইভেট কোচিং পড়তে পারে না। ক্লাসে যা বুঝে নিজে নিজে তা-ই আয়ত্ত করে। মামুনের বাবা-মা অনেক কষ্টে তার লেখাপড়ার খরচ বহন করে।

মামুন আর মায়া শৈশব থেকে একসঙ্গে লেখাপড়া করেছিল। তাদের গ্রাম থেকে প্রাইমারি স্কুল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, প্রাইমারি স্কুলে যেতে মামুনকে মায়াদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে হতো। সেই যে শৈশব থেকে দু’জনে একসঙ্গে স্কুল যাওয়া শুরু করেছিল কোনদিন যেন কেউ একা স্কুলে যায়নি। শৈশব থেকে মায়া স্কুল যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে বাড়ির সামনে বসে থাকত, মামুন তাদের বাড়ির কাছাকাছি এলে দু’জনে একসঙ্গে স্কুল যেত। কোনদিন পথিমধ্যে বৃষ্টি এলে দু’জনে একই ছাতার নীচে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাড়ি ফিরত।

এভাবে ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস সেভেনে ওঠার পর একদিন মায়া স্কুল ড্রেস পরে বাড়ির বাইরে মামুনের জন্য অপেক্ষা করছিল। মায়ার মা তাকে ভিতরে ডেকে বলেছিল, এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকিস না মা, আমি বুয়াকে বলছি মামুন এলে তোকে ডেকে দিবে।

তারপর থেকে স্কুলের সময় হলে মায়া স্কুল ড্রেস পরে বাড়িতে বসে থাকত মামুন তাদের বাড়ির কাছাকাছি এলে বুয়া মায়াকে ডেকে দিত।

এভাবে আরও দু’বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। মায়া আর মামুন তখন ক্লাস নাইনে উঠেছিল। ক’দিন পর ক্লাস নাইনের রেজিস্ট্রেশন হবে। আর রেজিস্ট্রেশনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই মায়া অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। তার মনের কথাটা যেন মামুন আগেই বুঝতে পেরেছিল। শুধু সেদিন না মামুন যেন মায়ার মুখ দেখেই অনেককিছু বুঝতে পারত।

মামুন বলেছিল, এই মায়া চিন্তিত কেন রে?

মামুন সামনে রেজিস্ট্রেশন, সায়েন্সে পড়ব নাকি আর্টসে পড়ব বুঝতে পাচ্ছি না, মনে হয় আমার সায়েন্সে পড়া ঠিক হবে না।

কেন?

কারণ ইলেকট্রিক ম্যাথ খুব কঠিন সাবজেক্ট, শুধু ইলেকট্রিক ম্যাথ না ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্রিসহ সায়েন্সের সবগুলো সাবজেক্টই আমার কাছে কঠিন মনে হয়।

ভালোভাবে লেখাপড়া করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

মামুন তুই আমাকে হেল্প করবি?

আমিও তো তোর সঙ্গে পড়ি আমি আবার তোকে কিভাবে হেল্প করবো? তারচেয়ে তুই বরং ভালো কোচিং সেন্টারে কোচিং কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।

স্যাররা তো কোচিং-এ অনেকজনকে একসঙ্গে পড়ায় আমি তো সবার সঙ্গে কুলাতে পারি না।

তাহলে বাড়িতে প্রাইভেট টিচারের কাছে পড়, তোদের তো টাকার অভাব নেই, টিচার বাড়িতে গিয়ে তোকে পড়িয়ে আসবে।

মামুন জানিস এর আগে আমি এক স্যারের কাছে পড়তাম, স্যার পড়াতে এসে শুধু সময়ের হিসাব করতো। আমি বুঝতে পারলাম কি না সেটা বুঝতে চায় না।

হ্যাঁ একজন স্যার তো আসলে কয়েক বাড়িতে প্রাইভেট পড়ায়, সেজন্য বেশি সময় দিতে পারে না।

মামুন আমি কোচিং করছি কিন্তু তারপরও আমার যদি কোন সাবজেক্ট বুঝতে অসুবিধা হয় তবে তুই আমাকে হেল্প করবি নোট দিয়ে, সাজেশন দিয়ে এবং মাঝে মাঝে পড়া বুঝিয়ে দিয়ে, তাহলে আমি সায়েন্সে পড়ব আর না হয় আমি সায়েন্সে পড়ব না।

তাহলে তুই এক কাজ কর, বুঝতে বেশি অসুবিধা হলে তুই আর্টসে পড়।

মায়া প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল, তুই এমন কথা বলতে পারলি? এতদিন একসঙ্গে লেখাপড়া করলাম আর এখন তুই সায়েন্স পড়বি আর আমি আর্টস পড়ব?

তবে?

আমিও সায়েন্স পড়ব, তুই আমাকে হেল্প করবি, করবি না?

করবো।

তিন সত্যি বল।

মামুন অদ্ভুত ভঙ্গীতে তাকিয়ে বলেছিল, জি ম্যাডাম, তিন সত্যি।

মামুনের সেই অদ্ভুত ভঙ্গীটা উর্মীর আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই একদিনের একটা চাহনি আর এক খণ্ড হাসি যেন পিছনের ফেলে আসা সমস্ত স্মৃতিতে নতুন মাত্রা যুগিয়েছিল। সেদিনই প্রথম উর্মী জীবনের নতুন স্বাদ পেয়েছিল। সেটাই ছিল কারো চোখে চোখ রেখে প্রথম কথা বলা। আসলে কাউকে ভালোলাগার জন্য বুঝি একবার এক মুহূর্তের দৃষ্টি বিনিময়ই যথেষ্ট আবার কারো সঙ্গে ভাবের মিল না হলে একসঙ্গে যুগের পর যুগ বসবাস করা অর্থহীন, গত কয়েকবছরের ঘটনাগুলো উর্মীকে যতটা না নাড়া দিত একবারের দৃষ্টি বিনিময়ই তার চেয়ে বেশি হৃদয়ে দাগ কেটেছিল।

 

তিন

 

          কয়েকদিন পরের কথা। এ’কদিন শুভ্রর খুব কাজের চাপ গেছে তারপরও শুভ্র মাঝে মাঝে দু’য়েক কথা বলেছে উর্মীর কাছ থেকে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করেছে কিন্তু উর্মী কোনভাবেই তার পরিচয় বেরিয়ে পড়ে এমন সব প্রশ্নের উত্তর সে কৌশলে এড়িয়ে যায়।

একটা কথাই বার বার করে শুভ্রর মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে উর্মী কি আসলে মায়া নাকি অন্য কেউ? উর্মী মায়াই হোক আর উর্মীই হোক সে তার পরিচয় লুকাতে চাইবে কেন? কারো জীবনে কোন দুর্ঘটনা না ঘটলে বা কোন কলঙ্ক না থাকলে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট আলোতেও কেউ তার পরিচয় লুকাতে চাইবে কেন? উর্মী সম্পাদকের পূর্ব পরিচিত, শুধু সম্পাদকের পরিচিতই নয় সে জামান সাহেবেরও পরিচিত বলে শুভ্রর মনে হয়েছে, তবে কি উর্মী সম্পাদকের খুব কাছের মানুষ এবং তার পরিচয় প্রকাশ করা সম্পাদকের নিষেধ আছে তাই সে কোনভাবেই তার পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছে না। শুভ্র বার বার করে মন থেকে উর্মীর বিষয়ে কৌতূহলী না হওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনভাবেই পারছে না।

শুভ্রর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে মোবাইল রিসিভ করে বলল, কি রে চন্দ্রা কি মনে করে?

কী মনে করে আবার? চাকরির পর তো একবারও আমার খবর নিলি না। তুই চাকরি পেয়ে আমাকে ভুলে যেতে পারিস কিন্তু আমি আবার সহজে কাউকে ভুলতে পারি না। আচ্ছা বল তো তোর হয়েছে কি? নাকি তুই আবার কোন মেয়ের চৈতালি প্রেমে পড়ে গেছিস?

এই তোকে না কতদিন বলেছি আমাকে চৈতালি প্রেমিক বলবি না।

হাজার বার বলব তুই তো আসলে চৈতালি প্রেমিক। আজ একজনের প্রেমে পড়বি সেই প্রেম টিকবে খুব বেশি হলে পনেরো দিন তারপর আবার নতুন করে কাউকে মনে মনে ভালোবাসবি আজ পর্যন্ত তো কাউকে ভালোবাসার কথা বলতেই পারলি না। আপার কাছে শুনলাম তুই নাকি আবার কোন বোরকাওয়ালীর প্রেমে পড়েছিস?

এক্সাক্টলি, এখনো মনে মনেই আছে তবে এবারও মনে হয় মনের কথাটা বলার মতো সাহস হবে না।

আচ্ছা তোকে আর সাহস করে বলতে হবে না, তোর জন্য এবার আমি মাঠে নামছি।

এতদিন তো নিজেই ক্যান্ডিডেট ছিলি, যখন তুই বুক্ড হয়ে গেলি তখন মনে করলাম বোধ হয় বাঁচা গেল, এখন আবার কাকে নিয়ে মাঠে নেমেছিস?

আমি তোর অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তুই পারমিশন দিলে আমি এখুনি চলে আসব তখন দেখবি।

চন্দ্রা এই কাজটা না করলে হয় না, তুই তো জানিস কোন অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে কথা বললে আমি খুব আন ইজি ফিল করি, আমার পা দু’টা কাঁপে, শরীরটা শিথিল হয়ে যায়, মুখ শুকিয়ে যায়।

সেজন্যই তো তোকে ইজি করা দরকার, আচ্ছা ঠিক আছে তুই অফিসে কাজ কর, এখন তো সাড়ে চারটা বাজে আর আধ ঘণ্টা পর তো অফিস শেষ হবে আমি পাঁচটা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে তোর অফিসে ঢুকব, বলেই চন্দ্রা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল।

শুভ্র কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল। এই তো ক’দিন আগে উর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় হলো, একরকম মনে মনে উর্মীকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে এখন উর্মী যদি চন্দ্রা এবং তার সাথে আর একটা মেয়েকে দেখে তবে তো…

না আর ভাবতে পারছে না শুভ্র, আসলে চন্দ্রা মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করে বসে।

চন্দ্রা পাঁচটা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে এলো সঙ্গে একটি মেয়ে।

শুভ্র বলল, তুই একটু বস আমি হাতের কাজটা শেষ করে তোর সঙ্গে কথা বলছি।

ওকে বসলাম।

উর্মী আপন মনে কাজ করছিল। শুভ্র আরও কিছুক্ষণ কাজ করল। তারপর কম্পিউটার শাট ডাউন দিয়ে বলল, হ্যাঁ বল, কি খবর?

আসলাম তোর সঙ্গে দেখা করতে, তোকে বাসায় আসতে বললে তো বলবি ব্যস্ত। তাছাড়া আরও একটা কাজ আছে, আমার সঙ্গে যে মেয়েটাকে দেখছিস ওর নাম নদী, আমার কাজিন।

নদী সালাম দিল।

চন্দ্রা বলল, নদী এবার ইকনোমিকস-এ অনার্স পাস করেছে।

শুভ্র বলল, উর্মী এ হচ্ছে চন্দ্রা আমার বিয়াইন মানে আমার ভাবীর কাজিন। আর চন্দ্রা ও হচ্ছে উর্মী আমরা এক সঙ্গে কাজ করি।

চন্দ্রা উর্মীকে সালাম দিয়ে বলল, আপনার কথা আপার মুখে শুনেছি।

শুভ্র এটা নিশ্চয়ই তোমার কাজ, তুমি তোমার ভাবীকে আমার কথা বলেছ?

শুভ্র কোন কথা বলল না।

উর্মী জিজ্ঞেস করল, আপনি কি করেন?

ডিগ্রী পাস করেছি, এখন গৃহিণী।

উর্মী বলল, শুভ্র আর আপনার সম্পর্কটা বেশ রোমান্টিক।

আপনি বলছেন রোমান্টিক। আপনি এখনো শুভ্রকে চিনেননি তাই বলছেন। ও আসলে ইট-কাঠের মতো নিরস মানুষ। আমি যদি কোনদিন মোবাইল না করি তবে ও কোনদিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে না। এমনকি বিশেষ বিশেষ দিন যেমন: বার্থ ডে, বাংলা বা ইংরেজি নববর্ষ, ভ্যালেন্টাইনস ডে, ফ্রেন্স শিপ ডে’তেও একটা এস.এম.এস পাঠিয়ে উইস করবে না।

আসলে মনের মতো কাউকে পাইনি বলে বিশেষ দিনগুলোতে কাউকে উইস করার অভ্যাসটা গড়ে উঠেনি।

দেখলেন আপা কি বলল, কি রকম হার্টলেস হলে কেউ এমন কথা মুখের ওপর বলতে পারে।

উর্মী বলল, আপনাদের দু’জনের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে আপনাদের সম্পর্কটা আসলে খুব মধুর তাই এবিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করবো না।

শুভ্র বলল, ধারণাটা আসলে ঠিক না। আমি তো বললাম মনের মতো কাউকে পাইনি বলে বিশেষ দিনগুলোতে কাউকে উইস করার অভ্যাস গড়ে উঠেনি। যদি কাউকে পাই তবে সবাই দেখবে আমি পাথরে ফুল ফুটাব।

চন্দ্রা বলল, তো স্যার আর কি আপনার কোন কাজ আছে?

না কাজ শেষ। অফিস আওয়ারও শেষ এবার উঠব।

চন্দ্রা আর নদী উঠে দাঁড়াল।

চন্দ্রা বলল, চলুন না উর্মী আপা একসঙ্গে কিছু খাব, শুভ্রর চাকরির খাওয়াটা আজ সবাই মিলে একসঙ্গে খাব।

উর্মী মনে মনে বলল, এটাও আমাকে দেখার জন্য শুভ্রর কোন চালাকি না তো?

কি ভাবছেন? চন্দ্রা জিজ্ঞেস করল।

না কিছু না, আসলে আমার একটু তাড়া আছে, তাছাড়া আমি বাইরের কোন খাবার খাই না তো।

চন্দ্রা মন খারাপ করল, সে একটু শুষ্ক হাসি হেসে বলল, ওকে নাইস টু মিট ইউ, বলে চন্দ্রা হ্যান্ডশ্যাক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল।

উর্মী হ্যান্ডশ্যাক করে বলল, সেম টু ইউ।

লিফট দিয়ে সবাই নামল।

লিফট থেকে বেরিয়ে চন্দ্রা বলল, ভালো কোন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে কিছু খাব।

চাইনিজ রেস্টুরেন্টে কেন? শুভ্র জিজ্ঞেস করল।

এটা তোর চাকরির খাওয়া।

চাকরি বা অন্য যে কোন শুভ কাজের খাওয়া হয় সাধারণত মিষ্টি জাতীয় খাবার, তুই আবার চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কথা বলছিস কেন?

এখন থিওরি পাল্টে গেছে বুঝছিস? আজকাল স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ মিষ্টি জাতীয় খাবার এভয়েড করছে।

শুভ্রর অফিসের অদূরে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। চন্দ্রা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকল।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বল নদী?

নদী কিছু বলল না। সে মাথা নত করে ভিতরে ঢুকল।

কোণায় একটি নিরিবিলি চার সিটের টেবিলে সবাই বসল।

টেবিলের ওপর আগে থেকেই একটা প্রাইজ লিস্ট ছিল।

শুভ্র প্রাইজ লিস্টটা নদীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ম্যানু ঠিক করার ব্যাপারে নদীর মতামতকেই প্রাধান্য দেয়া উচিৎ।

প্লিজ ভাইয়া আমাকে মাফ করবেন। আমি ছোট মানুষ এটা বরং আপনি ঠিক করলেই ভালো হয়।

চন্দ্রা বলল, না তুই ঠিক করবি, আর না বলিস না।

নদী ম্যানু ঠিক করে দিল।

কিছুক্ষণের মধ্যে বয় খাবার নিয়ে এলো।

চন্দ্রা শুভ্রর প্লে­টে খাবার তুলে দিচ্ছিল এমন সময় তার মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

চন্দ্রা মোবাইল রিসিভ করে বলল, হ্যাঁ বল।

তুমি কোথায় বলতো?

কেন তোমাকে বলছিলাম না আমি নদীসহ শুভ্রর সঙ্গে দেখা করতে যাব।

এখন কোথায়?

রেস্টুরেন্টে।

কোন রেস্টুরেন্টে?

বরাবরই আমরা যে রেস্টুরেন্টে আসি।

আচ্ছা ঠিক আছে। শুভ্র আছে কথা বলবে?

দাও।

শুভ্র মোবাইল হাতে নিয়ে বলতে শুরু করল, কি দুলাভাই কেমন আছেন?

এই বাঁদর আমি আবার তোর দুলাভাই হলাম কবে থেকে?

কেন আমার তাহইতো বোনকে বিয়ে করলে আমার দুলাভাই হবেন না।

খুব আনন্দে আছিস মনে হয়?

হ্যাঁ আনন্দে তো থাকবই, আপনারা দু’জন যেখানে বসে প্রথম দেখা করেছিলেন আমি সেখানে বসে চন্দ্রার সঙ্গে চাইনিজ খাচ্ছি। কি হিংসা হচ্ছে?

খা বেশি করে খা, চন্দ্রার সঙ্গে নদী গেছে, স্যুপ খেতে খেতে নদীতে সাঁতার কাটতে শিখ, কাজে লাগবে।

আচ্ছা ঠিক আছে।

শুভ্র মোবাইলটা চন্দ্রাকে দিল।

চন্দ্রা মোবাইল হাতে নিতে গিয়ে শুভ্রর চোখে চোখ পড়ল।

শুভ্র মুচকি হেসে বলল, চন্দ্রা আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে।

এখন আর সুন্দর লেগে লাভ কি? যখন সুন্দর লাগা উচিৎ ছিল তখন তো আমাকে পেত্নীর মতো লাগত। এখন নদীকে একটু সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা কর।

তুই নদীর কথা বলছিস? নদী তো খুব সুন্দর মেয়ে। শিক্ষিত, সুন্দরী, স্মার্ট, সুন্দর বচন ভঙ্গী, মার্জিত ব্যবহার, অপূর্ব সুন্দর একটা মেয়ে। ও একদিন আদর্শ মা হবে। নেপোলিয়ন বলেছেন না তোমরা আমাকে একজন মা দাও আমি একটা সুন্দর জাতি উপহার দিব। আমাদের নদী হলো একজন সে রকমই মা ঠিক নেপোলিয়ন যেমন চেয়েছিলেন।

বাহ্‌ খুব সুন্দর করে বললি তো। তুই না বলিস নতুন অপরিচিত মেয়ে দেখলে তোর মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। পা কাঁপে, জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে আসে এখন তো দেখছি একেবারে মিথ্যা কথা বরং নতুন মেয়ে দেখলে তোর মুখ দিয়ে কথার খই ফুটে।

শুভ্র বলল, সেটা তো নতুন মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময়। নদী তো অনেক আগে এসেছে, তাছাড়া নদীর সঙ্গে আমার আজকেই প্রথম পরিচয় হলো বটে কিন্তু ও তো আসলে নতুন না তোর কাজিন কাজেই ওকে আমার কোন সংকোচ নেই।

তাহলে কি আপা দুলাভাইকে বলব?

কি বলবি?

নদীকে তোর পছন্দ হয়েছে?

চন্দ্রা, ভালো লাগা, পছন্দ হওয়া আর বিয়ে করা এক বিষয় না। নদী এখনো স্টুডেন্ট ও এখনই বিয়ে করবে কেন? আরও পড়ালেখা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে তারপর বিয়ে করবে।

কিন্তু পারিবারিকভাবে ওর বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে।

শুভ্র বলল, চন্দ্রা আমি তোকে পরে জানাব।

নদী কিছু বলেনি নীরবে মাথা নত করে খাচ্ছিল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গিয়েছিল।

শুভ্র আবার পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য বলল, চন্দ্রা আমি একটু নদীর সঙ্গে কথা বলি?

অবশ্যই তোরা দু’জন কথা বল আমি না হয় পাশের টেবিলে বসছি?

না তা লাগবে না। তেমন গোপনীয় কিছু না। তুইও বস।

না তোরা গল্প কর আমি পাশেই আছি।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, নদী তোমরা ক’ভাই-বোন?

আমি একাই, আমার আর কোন ভাই-বোন নেই।

এই মনে কর আমি যদি তোমাকে পছন্দ করি আর তুমি যদি আমাকে পছন্দ না করো তবে তো আমাদের বিয়েটা ঠিক হবে না, তাই না?

নদী মাথা নেড়ে সায় দিল।

নদী আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে?

নদী আবার মাথা নেড়ে জানাল তার পছন্দ হয়েছে।

নদী বিয়ে জীবনের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এত তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। একটু ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

নদী কিছু বলল না।

আচ্ছা নদী তাহই সাহেব কী করেন?

ব্যবসা।

ঢাকায় তোমাদের বাড়ি আছে?

জি।

তাহই সাহেব নিশ্চয়ই বড় ব্যবসায়ী?

নদী মাথা নেড়ে সায় দিল।

শুভ্র বলল, নদী আমি খুব সামান্য বেতনের একটা চাকরি করি, যা দিয়ে আমাদের দু’জনের সংসার চালানোই কঠিন হবে, তুমি ধনী লোকের মেয়ে, আমার সঙ্গে বিয়ে হলে তুমি সুখী হবে না।

নদী কিছু বলল না।

তুমি খুব ভালোভাবে ভেবে দেখ, আমিও ভেবে দেখি তারপর না হয় ডিসিশন হবে।

নদী মৃদু কণ্ঠে বলল, আপনি কি আপনার মোবাইল নাম্বারটা আমাকে দিবেন?

শুভ্র তার মোবাইল নাম্বার নদীকে বলল।

চার

                   উর্মীর অ্যালবামে তার স্টুডেন্ট লাইফে তোলা অনেক ছবি আছে। ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষার আগের তোলা কয়েকটা ছবিতে শুভ্রর ছবি আছে। উর্মী শুভ্রর ছবিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। মামুন প্রথম থেকেই ক্লাসে ফার্স্ট হতো আর শুভ্র সেকেন্ড হতো। এটা যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়েছিল। দু’জনের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা কম্পিটিশন ছিল। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার জন্য শুভ্র খুব লেখাপড়া করতো কিন্তু কোনদিন মামুনকে হারাতে পারেনি।

শুধু যে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে দু’জনের মধ্যে কম্পিটিশন ছিল তা হয়ত না। মায়াকে ভালোবাসার জন্য দু’জনের মধ্যে একটা সুপ্ত কম্পিটিশন কাজ করতো। মামুন আর মায়া এক সঙ্গে স্কুল যাতায়াত করতো তাতে শুভ্র জেলাস ফিল করতো। একদিন মামুনের জ্বর হয়েছিল তাই সেদিন সে স্কুলে আসেনি। মায়ার যেন সেদিন কোথাও মন বসেনি, সে ক্লাসে আনমনা হয়ে বসেছিল, ক্লাসের সময়গুলো তার কাছে দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছিল। সব সময় মনে হচ্ছিল কি যেন আজ অসম্পন্ন আছে। মামুন স্কুলে এলে তারা যে সব সময় কথা বলতো তা না। ক্লাসে দু’একবার চোখে চোখ পড়ত, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু’জনে দু’য়েক কথা বলতো, কখনো মায়া কোন না কোন অজুহাতে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতো কিংবা মামুন ক্লাসে ঢোকার আগে ইচ্ছা করেই কমন রুমের সামনে গিয়ে একবার মায়ার দিকে তাকাত। মায়া একটা মুচকি হাসত।

মায়া এবং মামুনের এসব আচরণ শুভ্র ফলো করতো এবং সুযোগ পেলেই খোঁটা মেরে কথা বলতো। সেদিন মামুন না আসার কারণে মায়ার ক্লাসে অমনোযোগিতা এবং কমন রুম থেকে বের না হওয়াটাও শুভ্র’র দৃষ্টি এড়াতে দিতে পারেনি। প্রায় দিনই ক্লাস চলাকালীন মায়া আর মামুন পরস্পরের দিকে তাকানোর সময় শুভ্রর মায়ার চোখে চোখ পড়ত। সে একটা দুষ্টামির হাসি হাসত।

সেদিন ক্লাস থেকে বের হয়ে মায়া কমনরুমে যাচ্ছিল।

বারান্দা দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার সময় শুভ্র একটা মুচকি হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল, কী রে মন খারাপ কেন?

মায়া থমকে দাঁড়াল, আমার মন খারাপ থাকলে তোর বুঝি খুব মায়া হয়?

ততক্ষণে সব মেয়েরাই কমন রুমে চলে গেছে ছেলেরাও সামনে এগিয়ে গেছে।

তুই তো বুকড হয়ে আছিস তাই তুই সেটা বুঝবি না। যদি ফ্রি থাকতিস তবে বুঝতে পারতিস?

সেটাই যদি বুঝিস তবে সব সময় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকিস কেন?

ভালো লাগে তাই।

এভাবে আর তাকাবি না কারো দিকে বেশি তাকাতে ইচ্ছা করলে তুইও বুকড হয়ে যা তখন সব সময় তার দিকে তাকিয়ে থাকিস।

বুকড তো হতেই চাই।

তুই নিজে ম্যানেজ করে নিতে পারছিস না? নাকি আমি কাউকে ম্যানেজ করে দিব?

তুই নিজে যখন বুকড হয়ে গেছিস তখন আর কাউকে ম্যানেজ করে দিতে হবে না।

সরি শুভ্র তোর জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আহ্‌, চুক, চুক, চুক।

তখন শুভ্র ছোট ছিল, কেবল দু’একটা গোঁফ গজাতে শুরু করেছে। সেদিনের ছোট্ট বালক শুভ্র আজকের তার পাশের ডেস্কে বসা তার কলিগ (Col-league)| উর্মী প্রথম দেখাতেই শুভ্রকে চিনতে পেরেছে, শুভ্রও তার কণ্ঠস্বর শোনার পর তার দিকে তাকিয়ে আছে, হয়ত শুভ্ররও তাকে পরিচিত মনে হয়েছিল। শুভ্র উর্মীর কাছ থেকে বিভিন্নভাবে তার পরিচয় জানতে চেয়েছে কিন্তু উর্মী কৌশলে তার পরিচয় গোপন করেছে।

 

উর্মী খেয়াল করেছে শুভ্র কখনো একটু সুযোগ পেলেই তার সাথে কথা বলে উর্মীও সুযোগ পেলেই শুভ্রর সঙ্গে কথা বলে। পাশাপাশি ডেস্কে কাজ করতে করতে দু’জনের মধ্যে যেন একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে উঠেছে। অনেক সময় উর্মী কোন কাজ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে না পারলে শুভ্রর সহযোগিতা নেয়, শুভ্রও কোন কাজ ফাইনাল করার আগে ইয়ার্কি করে বলে, ম্যাডাম একটু দেখুন না কাজটা কেমন হয়েছে?

ম্যাডাম বলাতে উর্মী কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। শুভ্রর কাজ দেখে ভালো হলে কখনো প্রশংসা করে আবার ভালো না হলে কৌশলে বলে, শুভ্র আর একটু চেষ্টা করো তুমি আরও ভালো করতে পারবে।

একদিন দু’জনের হাতে কোন কাজ ছিল না। অনেকক্ষণ দু’জনে গল্প করল।

কথা প্রসঙ্গে উর্মী জিজ্ঞেস করেছিল, শুভ্র তোমার চন্দ্রা আর নদীর খবর কী? কতদূর এগিয়েছ?

অগ্রগতি তুমি যেটুকু দেখেছ সেটুকুই। আসলে চন্দ্রা আর আমার ভাবী জানে আমাকে বিয়ে দেয়া অনেক কঠিন কাজ তারপরও তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কেন? তোমাকে বিয়ে দিতে এত কষ্ট করতে হবে কেন? বিয়ে করে ফেল।

প্রথমত: ভালো কনে পাচ্ছি না, দ্বিতীয়ত: শুধুমাত্র আমার বেতন দিয়ে আমার নিজের চলছে কিন্তু আরেকজনের দায়িত্ব পালন করার মতো সাহস করতে পারছি না।

তাহলে কোন চাকরিজীবী মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেল।

শুভ্র মুচকি হেসে বলল, উর্মী তুমি কিন্তু আমার একেবারে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে ফেলেছ? এটা কিন্তু তুমি নিজেই পছন্দ করো না।

শুভ্র আমরা একসঙ্গে অনেকদিন থেকে কাজ করছি আমাদের মধ্যে একটা ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে উঠেছে না? এখন তো একটু-আধটু ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করতেই পারি।

উর্মী অনেকদিন একসঙ্গে কাজ করলেই আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে উঠে না। আমাদের দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক আসলে দু’জন বাস যাত্রীর মতো। এই যেমন মনে করো তুমি আর আমি একই বাসের সিটে যাচ্ছি অথচ কেউ কারো না, বাস থেকে নামলাম তারপর দু’জন দু’দিকে চলে গেলাম কেউ কাউকে চিনি না। ঠিক আমাদের বেলায় দেখ আমরা দু’জনে একসঙ্গে কাজ করি, কাজ শেষে লিফট পর্যন্ত একসঙ্গে যাই তারপর যে যার মতো চলে যাই। আর সময়ের কথা বলছ কারো সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠার জন্য সময় কোন ফ্যাক্টর না। এক পলকের দৃষ্টি বিনিময় দু’জনকে আপন করতে পারে আবার সারাজীবনের একসঙ্গে বসবাসও মনের মধ্যে তেমন প্রভাব নাও ফেলতে পারে।

উর্মী বলেছিল, শুভ্র তুমি কি আমার কোন আচরণে মাইন্ড করেছ?

তোমার ওপর আমার মাইন্ড করার মতো রিলেশন গড়ে উঠেনি। এতদূরের কারো ওপর আসলে মাইন্ড করা যায় না।

উর্মী আপন মনে বলেছিল, শুভ্র তুমি মাইন্ড করলেও আসলে আমার কিছু করার নেই।

শুভ্র আবার বলতে শুরু করল, আমারই বেড ল্যাক, তোমার স্থানে যদি আমার একজন ছেলে কলিগ থাকত তবে আমরা কাজের ক্লান্তিতে মন খুলে কথা বলতে পারতাম। কাজ শেষে বাইরে আড্ডা দিতে পারতাম। কিন্তু তুমি তো মেয়ে, মেয়েদের আলাদা একটা অহঙ্কার আছে, বেশিরভাগ মেয়েই নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারওপর তুমি আবার বড় বস এর কাছের মানুষ।

উর্মী কোন কথা বলেনি, একবার চোখ মুছেছিল।

শুভ্র বলল, সরি উর্মী কথায় কথায় তোমাকে অনেক কথা বলা হয়ে গেল। পাঁচটা বাজে চলো বের হই।

উর্মী বলল, শুভ্র তোমার কাছে আমার মোবাইল নাম্বার আছে?

দিয়েছ কোনদিন?

মোবাইলে সেইভ করে নাও প্লি­জ।

উর্মী তার মোবাইল নাম্বারটা বলল।

শুভ্র মোবাইল নাম্বার সেইভ করে নেওয়ার পর জিজ্ঞেস করল, আমার মোবাইল নাম্বার তো তোমাকে দিয়েছি।

উর্মী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, দিয়েছ।

তারপর থেকে মাঝে মাঝে দু’জনের মোবাইলে কথা হতো।

 

উর্মী অ্যালবামের একটা পাতা উল্টাল।

মামুন আর মায়ার খুব ক্লোজ ছবি। একবার মামুন আর মায়া স্কুল ফাঁকি দিয়ে জয়পুরহাট গিয়েছিল। সেখানে একটা স্টুডিওতে কম্বাইণ্ড ছবি তুলেছিল। আজ ছবিটার দিকে তাকাতেই উর্মীর মনে সেদিনের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল।

ধামইরহাট-জয়পুরহাট রাস্তা থেকে বাঁদিকে যে রাস্তাটা উত্তর দিকে চলে গেছে সেই রাস্তার পাশেই শিশু উদ্যান। গেট দিয়ে ঢুকতেই সরু রাস্তার দু’পাশে সারি সারি ফুল গাছ, ডানে একটা পুকুর, পুকুরে কয়েকটা ছোট নৌকায় চড়ে অনেকেই ভেসে বেড়াচ্ছিল। মামুন আর মায়াও নৌকায় ভেসে বেড়াল, নৌকা তো নয় যেন সুখের তরী, স্বপ্ন আর বাস্তব জগতের ঘর বাঁধার দোদুল্যমান এক তরী। মামুন নৌকা চালাতে চালাতে বার বার মায়ার ওপর পানি ছিটিয়ে দিচ্ছিল। পুকুরের পূর্ব পাড়ে কৃত্রিম পাহাড়, পাহাড়ের পাশে কৃত্রিম প্রাণীজগৎ, দু’জনে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটু আড়াল পেয়েই মামুন মায়াকে অন্তরঙ্গভাবে কাছে টেনে নিল, মায়া কিছু বলেনি, মামুনের স্পর্শে সে যেন স্বর্গের সুখ পেয়েছিল।

শিশু উদ্যান থেকে বেরিয়ে দু’জনে শহরে একটা মোবাইল ফোনের দোকানে ঢুকেছিল।

মামুন জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ মোবাইল ফোনের দোকানে কেন?

একটা মোবাইল সেট কিনব।

তোর মোবাইল আছে না?

আমার তো আছে কিন্তু তোর মোবাইল না থাকলে আমি কথা বলব কার সাথে?

কেন আমি ছাড়া কি তোর মোবাইলে কথা বলার মতো আর কেউ নেই?

না, তুই ছাড়া তো আমার আর কারো সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই।

কিন্তু আমি যে তোর দেওয়া মোবাইল নিব না।

মায়া প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল, দেখ মামুন তুই আর কোন কথা বাড়ালে আমি কিন্তু দোকানেই কান্না শুরু করবো। তখন লোক জমা হবে, তোকে সবাই খারাপ বলবে।

মামুন আর কোন কথা বলেনি।

মোবাইল কেনার পর মামুন একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, মায়া একবার ঘড়ির দিকে দেখেছিস? সময় কত?

মায়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ চলো কিন্তু কিছু খাব না?

হ্যাঁ অবশ্যই, চলো, বলে দু’জনে রেললাইনের পাশে একটা হোটেলে ঢুকল।

জয়পুরহাট রেলক্রস থেকে দক্ষিণ দিকে যে রাস্তাটা রেলস্টেশনের দিকে গেছে সেই রাস্তা দিয়ে সামনের দিকে কিছুদূর যেতেই রাস্তার দু’পাশে কয়েকটা হোটেল। ডানপাশের একটা হোটেল বাইরে থেকে বেশ চাকচিক্য দেখে দু’জনে সেই হোটেলটির ভিতরে ঢুকেছিল। হোটেলের নাম রুচিতা।

হ্যাঁ হোটেলটা বেশ সুন্দর তো, সম্পূর্ণ হোটেলের ওয়াল এবং ফ্লোরে লাক্সারিয়াস টাইলস বসানো। টেবিলগুলো বেশ সুন্দরভাবে সাজানো, টেবিলের ওপর টেবিল ক্লথগুলো বেশ দামি এবং উন্নতমানের। চার ব্লেডওয়ালা সিলিং ফ্যানগুলো লাক্সারিয়াস, বেশ সুন্দর, হোটেলের ডান প্রান্তে পাশাপাশি কয়েকটা কেবিনে পর্দা লাগানো ছিল। নামের সঙ্গে হোটেলের পরিপাটির বেশ মিল আছে।

দু’জনে একটা কেবিনে ঢুকল।

খেতে খেতে মামুন জিজ্ঞেস করল, মায়া একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

বল।

তুই মোবাইল কেনার মতো এত টাকা পেলি কোথায়?

মায়া হাসল, শুনলে তুই বলবি চোরের ওপর বাটপারি।

মানে?

মানে হলো তুই তো জানিস আমার ছোট বোন লতার খরচের হাতটা একটু বেশি, বাবার পকেট থেকে কিংবা মায়ের কাছ থেকে ধান চুরি করে টাকা জোগাড় করে শুধু দামি দামি জামা কাপড় কিনবে। বাবা এটা জানতে পেরে ধান মাড়াইয়ের সময় ধান পাহারা দেওয়ার দায়িত্বটা আমাকে দিয়েছিল।

মামুন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তারপর।

তারপর আর কী, লতা বিক্রি করতো দিনে দুই মন ধান, আমি বেচতে শুরু করলাম এক মন করে, তাতে বাবার কিছুটা সেইভ হলো আর আমার কপাল খুলে গেল।

তারমানে তুই চুরি করা টাকা দিয়ে আমাকে মোবাইল কিনে দিলি?

এটাকে তুই চুরি বলছিস কেন? প্রেমের জন্য মানুষ জীবন দিতে পারে আর আমি তো একজন সচ্ছল মানুষের ধানের গোলা থেকে কয়েক মন ধান সরিয়ে প্রেমিককে প্রেজেন্ট করলাম।

তুই জীবন দিতে পারবি?

হ্যাঁ।

উর্মীর চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি মামুনের ছবিটার ওপর গড়িয়ে পড়ল।

          পাঁচ

 

সৌরভ অফিসের কাজে চট্টগ্রাম গিয়েছিল আর শুভ্রর অফিস বন্ধ ছিল, অফিস বন্ধ থাকলেও শুভ্র বাসায় থাকলে কোন না কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। গভীর রাত পর্যন্ত কম্পিউটারে কাজ করে, কোনদিন রাত একটার আগে ঘুমিয়েছে সুরভীর কয়েক বছরের বিবাহিত জীবনে চোখে পড়েনি। সুরভী ঠিক শুভ্রর উল্টা, বেশ আরামপ্রিয় একটু সুযোগ পেলেই দিনের বেলাতেও ঘুমায়।

সুরভী শুভ্রর প্লেটে ভাত তুলে দিচ্ছিল।

শুভ্র বলল, ভাবী এতগুলো ভাত দিলে কেন? আমি কি গরু নাকি এতগুলো ভাত খাব?

তুই গরু হলে তো আমি খুব খুশি হতাম, বলদ হলে আরও খুশি হতাম, তোকে দিয়ে হালচাষ করাতাম। তুই তো সব সময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকিস, কাজেই গরু হলে তোকে দিয়ে খুব কাজ করানো যেত রে, আহ্‌ চুক চুক্‌ চুক্‌।

ভাবী।

হ্যাঁ তুই তো গরু না, গাধা। তাই তোকে কোন কাজেও লাগাতে পারছি না। এখন ভাত খেয়ে একটু ঘুমা।

ঘুমাবো মানে? আমাকে কোন দিন দিনের বেলায় ঘুমাতে দেখেছ নাকি?

কোনদিন দেখিনি আজ দেখতে চাচ্ছি, কাজ আর চিন্তা করতে করতে তুই কেমন যেন রুক্ষ্ণ হয়ে যাচ্ছিস।

ভাবী কি ব্যাপার বলতো, আজ তুমি আমাকে কেন জানি…, কোন মতলব নেই তো?

বেশি কথা বলিস না যা বলছি তাই করো, বড়দের সব কথার কারণ খুঁজতে হয় না।

তুমি আবার আমার বড় হলে নাকি, তুমি তো আমার চেয়ে এক বছরের জুনিয়র, ভাইর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তাই তোমাকে ভাবী বলতে হচ্ছে, আর তুমি বলছ কি না আমার বড়, বলে মুচকি হেসে তার রুমে গেল।

 

শুভ্রর ঘুম ভাঙ্গল প্রান্তিকের ডাকাডাকিতে। সে প্রান্তিককে কোলে তুলে নিয়ে বলল, কি বাপজান?

কাক্কু আম্মু তোমাকে ডাকছে?

কেন?

আম্মু না শাড়ি পরেছে আমাকেও সুন্দর সুন্দর জামা পরিয়ে দিয়েছে এই দেখ আমার জামাটা সুন্দর, না?

হ্যাঁ খুব সু্‌ন্দর তো।

কোথায় যাবে? তোমার আম্মু কিছু বলেছে?

না, তুমি ওঠো তো।

আচ্ছা তুমি যাও আমি আসছি।

পাশের রুম থেকে সুরভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, শুভ্র ওঠ তো, তাড়াতাড়ি চল।

শুভ্র বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল, কী ব্যাপার ভাবী তুমি ঘুমাতে পাঠালে আবার তুমি ডেকে তুললে?

কাপড় পর তো চল আমার সঙ্গে।

কোথায়?

কোন প্রশ্ন করবি না, অথর্ব কোথাকার?

একবার বললে গাধা, এখন বললে অথর্ব?

তা না তো কী? বয়স তো প্রায় ত্রিশ ছুঁই ছুঁই করছে অথচ এখনো বিয়ে করতে পারলি না। নিজে নিজে মেয়ে দেখে বলবি আমি অমুক মেয়েকে পছন্দ করি তোমরা বিয়ের আয়োজন করো তা না করে কনে দেখার কাজটাও আমাদের করতে হবে?

আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল তুমি নতুন কোন কনে দেখাতে নিয়ে যাবে।

হ্যাঁ তোর প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব আছে না?

বেশ তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করো।

সুরভী আপন মনে বলতে শুরু করল, এক ভাই এক বোন, বাবার মীরপুরে দু’টা বাড়ি আছে।

ভাবী এ পর্যন্ত যতগুলো মেয়ে দেখলে সবারই বাড়ি-গাড়ি আছে, বিত্তবান বাবার একমাত্র মেয়ে। এতদিন তোমার কথা শুনে আমার মনে হয়েছে তুমি মেয়েটা সুন্দর কি না? ভবিষ্যতে ভালো গৃহিণী হবে কি না? একজন আদর্শ মা হবে কি না? তার চেয়ে মেয়ের বাবার বাড়ি-গাড়ি আছে কি না এটাই দেখ। আমি বিয়ে করবো কাকে মেয়েকে নাকি মেয়ের বাবার বাড়ি-গাড়িকে? আসলে কথা হলো একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করতে হবে।

তো তুই বল ভালো মেয়ের সংজ্ঞা কি?

ভালো মেয়ে মানে দেখতে সুন্দর হতে হবে, যেন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সবার দৃষ্টি কাড়ে, অন্য কোন মেয়েকে দেখে আমার দৃষ্টি সেদিকে চলে না যায়, ভালো কেমিস্ট হতে হবে যেন ভালো রাঁধুনি হতে পারে, শিক্ষিত হতে হবে যেন একজন আদর্শ মা হতে পারে?

কী বললি? অন্য কোন মেয়েকে দেখে সেদিকে দৃষ্টি না যায়? পুরুষের জাত, নিজের বউ বিশ্ব-সুন্দরী হলেও অন্য মেয়েকে ভালো লাগবে। পুরুষ মানুষের প্রেমিকাকে ভালো লাগে আবার সেই প্রেমিকা যখন বউ হবে তখন আর ভালো লাগবে না, বিয়ের পর ভালো লাগে বউ ছাড়া দুনিয়ার সব মেয়েকে।

শুভ্র দুষ্টামির হাসি হেসে বলল, কী ব্যাপার ভাবী? ভাইয়ার বেলায়ও কি তাই?

তোর ভাইয়ার কথা থাক তুই তোর কথা বল।

আমার তো কোন কথা নেই, তোমরা সবাই তো বউ দেখছ, পছন্দ হলে বিয়ে করবো।

এবারে যে মেয়েটার সম্বন্ধ এসেছে মেয়েটার বাবাই শুধু বিত্তবান না, মেয়েটাও শিক্ষিত, একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে, অপূর্ব সুন্দরী এবং শান্ত-শিষ্ট। আর কি চাই বল?

ভাবী বিয়ের আগে সব মেয়েরাই শান্ত-শিষ্ট থাকে, ঘোমটায় মুখ ঢেকে এমন একটা ভাব দেখায় যে ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানে না। তারপর কয়েকদিন যেতে না যেতেই মেয়েদের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। স্বামীদের শাসন করতে শুরু করে।

দেখ উল্টা-পাল্টা কথা বলবি না, আমাকে তো তোর ভাই শান্ত-শিষ্ট দেখে বিয়ে করেছে আমি কি তোর ভাইকে শাসন করছি?

শাসনের কৌশলটা আসলে একেকজনের একেক রকম, বোকা মেয়েরা স্বামীকে শাসন করে ঢাক ঢোল পিটিয়ে আর চালাক মেয়েরা শাসন করে বেডরুমে, অন্তরঙ্গ মুহূর্তে, বলে শুভ্র মুচকি হাসল।

কিন্তু রুপা বোকাও না চালাকও না।

ও তাহলে তোমার গুণবতী মেয়েটার নাম রুপা?

হ্যাঁ।

আচ্ছা ভাবী আজকের এই প্রোগ্রামটা বাদ দেওয়া যায় না?

না।

ভাবী তার চেয়ে চলো আমি তোমাকে আর প্রান্তিককে অন্য কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাই?

না আমি আজকেই যেতে চেয়েছি, চল আর কোন কথা বলবি না।

 

তিনজনই একটা সি.এন.জি’তে চেপে বসল।

সুরভী আগে এ বাসায় আরও এসেছে। তাই পথ চিনতে অসুবিধা হলো না। সুরভীর নির্দেশ মতো সি.এন.জি একেবারে রুপাদের বাসার সামনে এসে দাঁড়াল।

দুই ইউনিটের একটি চারতলা বাসার দ্বিতীয় তলায় দুই ইউনিটকে এক ইউনিটে রূপান্তর করে সেখানে রুপারা থাকে। বাসার অন্যান্য ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেয়া হয়েছে।

সুরভী কলিং বেল টিপ দিতেই একজন চল্লি­শর্ধো মহিলা দরজা খুলে দিল, এসো মা।

সবাই ভদ্রমহিলার পিছনে পিছনে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসল।

শুভ্র একবার সমস্ত রুমটায় চোখ বুলালো। ড্রয়িং রুমটা বেশ বড় আকারের, কর্নারে একটা বড় আকারের একুরিয়ামে বিভিন্ন প্রজাতির রং বেরংয়ের মাছ খেলা করছে। সম্প্রতি দেয়ালে ডিসটেম্পার করা হয়েছে, সিলিংয়ে লাক্সারিয়ার্স সিলিং ফ্যান ঘুরছে রুমের অন্যান্য আসবাবপত্রেও আভিজাত্যের ছাপ আছে।

সুরভী জিজ্ঞেস করল, কী রে কী দেখছিস?

ভাবী তুমি যা দেখার জন্য নিয়ে এসেছ তা তো একবার ভালো করে দেখি।

কিছুক্ষণ পর একটা মেয়ে নাস্তার ট্রে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকে সালাম দিল।

সুরভী বলল, রুপা তুমি বস, আমি নাস্তা তুলে দিচ্ছি।

রুপা একটা সোফায় বসল।

সুরভী পরিচয় করে দিল, রুপা ও হচ্ছে আমার দেবর শুভ্র, আর শুভ্র ও হচ্ছে রুপা আমার খালাত বোন।

রুপা আবার সালাম দিল।

কিছুক্ষণ সবাই নীরব।

সুরভী শুভ্রকে বলল, কথা বল, চুপ করে আছিস কেন? নাকি আবার মুখ শিথিল হয়ে আসছে?

ভাবী, তুমি কথা বলো।

আমি কী বলব? আমি তো সব জানি।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, রুপা তুমি কি লেখাপড়া শেষ করেছ?

জি আমি এম.বি.এ করে একটা প্রাইভেট ফার্মে জব করছি।

তোমরা কয় ভাই-বোন?

এক ভাই এক বোন, আমি বড়।

তোমার কি আমার বিষয়ে কিছু জানার আছে?

রুপা মাথা বাঁকিয়ে জানাল তার জানার কিছু নেই।

শুভ্র আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

চা-নাস্তা শেষ করে সুরভী আর রুপা ভিতরে চলে গেল।

বাসায় ফিরেই সুরভীর প্রশ্ন, কি রে কেমন লাগল? ভালো না?

অবশ্যই সুন্দর, তুমি কি আমার জন্য এখনো খারাপ কাউকে দেখেছ?

তারপরও তো তোর বিয়ে দিতে পারলাম না।

আচ্ছা ভাবী তুমি আমার একটা ধাঁ ধাঁ’র উত্তর দিবে?

বল।

রোগীকে সুস্থ করার জন্য সবচেয়ে কার বেশি সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন?

সুরভী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, এটা তো কোনদিন চিন্তা করিনি।

আমি বলি শোন, রোগীকে সুস্থ করে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন রোগীর।

বুঝলাম না।

বুঝলে না? ডাক্তার, নার্স যতই চেষ্টা করুক না কেন রোগী যদি সুস্থ হওয়ার জন্য সহযোগিতা না করে তবে ডাক্তার, নার্স সবার চেষ্টা বিফলে যাবে।

তারমানে তুই নিজেই—

এমন সময় শুভ্রর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

ভাবী আমি একটু আসছি বলে শুভ্র মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো উর্মী।

তারপর মোবাইলে কথা বলতে বলতে তার রুমে চলে গেল।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, উর্মী কেমন আছ?

এই তো আছি কোন রকমে, তুমি?

ভালো নেই, ভাবী আমাকে নিয়ে যা শুরু করেছে তুমি চিন্তাই করতে পারবে না। এতদিন ভাবীর কাজিন নদীকে নিয়ে কথা চলল আজ আবার নতুন এক কনে দেখাতে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। একটার পর একটা কনে দেখতে দেখতে আমি একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি।

এত হাঁপিয়ে উঠার কি আছে? বিয়ে করে ফেললেই তো পার?

পছন্দ মতো মেয়ে পাচ্ছি না।

কেন আজ যে দেখতে গিয়েছিলে মেয়েটা ভালো না?

হ্যাঁ ভালো কিন্তু আমার পছন্দ না।

মেয়েটা চাকরি করে না?

করে।

তুমিও তো চাকরিজীবী মেয়েই খুঁজছিলে?

হ্যাঁ।

তাহলে আর দেরি কেন? মেয়েটা ভালো, চাকরি করে তবে আর কী চাও?

মেয়ের বাবা খুব ধনী মানুষ।

তাহলে তো ভালো, রাজকন্যার সঙ্গে রাজপ্রাসাদও পাবে।

সমস্যা তো রাজপ্রাসাদটাই। যে মেয়ে রাজপ্রাসাদে থেকে অভ্যস্ত সে তো আমার ঘরে থাকতেই চাইবে না।

শুভ্র এত ভাবলে হবে না, সবকিছু ভেবে চিন্তে করতে হবে এটাই শেষ কথা না। জীবনে অনেক কাজ খুব ভেবে চিন্তে করলেও ভুল হতে পারে আবার কোন কোন কাজ আবেগে অন্ধ হয়ে করলেও ভালো হতে পারে। ওসব বাদ দাও তো, তোমার ভাই-ভাবী সবাই যখন এত করে ধরেছে বিয়ে করে ফেল তো, অনেকদিন থেকে বিয়ে খাওয়া হয় না।

হ্যাঁ আমিও তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একজনকে পছন্দ তাকে হঠাৎ করে বিয়ে করে ঘরে তুলব।

বেশ তো।

কিন্তু মেয়েটাকে সাহস করে বলতে পারছি না, বলতো কী করি?

সাহস করে বলে ফেল।

আচ্ছা উর্মী তোমাকে যদি কোন ছেলে হঠাৎ করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়?

দিবে না।

যদি দেয়।

আমাকে দেখলে যে কেউ মুখ ফিরিয়ে নিবে।

তবু যদি কেউ বলে ফেলে?

যখন বলবে তখন দেখা যাবে।

শুভ্র মনে মনে কিছুটা আশ্বস্ত হলো।

উর্মী সারাদিন কী করলে?

কিছু না।

কিছু না মানে সারাদিন ঘরে বসে কাটালে?

হ্যাঁ।

কোথাও বেড়াতে যেতে পারতে?

কে নিয়ে যাবে?

শুভ্র মনে মনে বলল, আমাকে বললে না কেন? আমি নিয়ে যেতাম। তারপর বলল, এরপর কোনদিন ছুটি পেলে আমি তোমাকে বেড়াতে নিয়ে যাব।

অপর পাশ থেকে উর্মীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না।

যাবে তো?

তবুও উর্মীর কোন সাড়া এলো না।

সুরভী জোরে ডাক দিল, এই শুভ্র কী হলো?

উর্মী ভাবী ডাকছে আমি এখন রাখি।

আচ্ছা।

শুভ্র সুরভীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সুরভী গম্ভীর মুখ তুলে বলল, নিশ্চয়ই ঐ বোরকাওয়ালী মোবাইল করেছিল?

ভাবী এভাবে বলতে হয় না, ওর নাম উর্মী।

আচ্ছা ঠিক আছে তোর যদি উর্মীকেই পছন্দ তবে আমাদের বল। আমরা বিয়ের আয়োজন করি।

ভাবী উর্মী আর আমি একসঙ্গে চাকরি করি এর চেয়ে বেশি কিছু না। উর্মীর কণ্ঠস্বর এক্সাক্টলি মায়ার কণ্ঠস্বরের মতো। আমি মোটামুটি নিশ্চিত মায়া আর উর্মী একজনই তবে কেন জানি সে আমার কাছে তার পরিচয় লুকাচ্ছে।

বলে ফেল সবকিছু।

ভাবী মেয়েটার দৃষ্টিটা ভয়ঙ্কর। আমি ওকে কিছু বলতে গিয়েই যেন থমকে যাই।

আমাকে ওর গার্জিয়ানদের ঠিকানা দে আমি যোগাযোগ করি।

আচ্ছা ভাবী তোমরা আমাকে একটু ভাববার সময় দাও। আমি খুব শর্ট টাইমের মধ্যে তোমাদের জানাব।

 

ছয়

 

উর্মীর ইন্টারকম বেজে উঠল।

সে রিসিভ করল, ভাই।

উর্মী তুমি একটু আমার চেম্বারে আসো তো।

জি ভাই।

উর্মী চেয়ার থেকে উঠল।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, কে উর্মী?

এডিটর ভাই।

শুভ্র আর কোন কথা বলল না। সে তার কাজে মনোযোগ দিল।

কিছুক্ষণ পর উর্মী এসে তার চেয়ারে বসে তার কাজে মনোযোগ দিল।

দু’জনের কোন কথা নেই। একটানা অনেকক্ষণ কাজ করার পর উর্মী প্রথম কথা বলল, শুভ্র কথা বলছ না কেন?

শুভ্র যেমনভাবে কাজ করছিল তেমনিভাবে বলল, কাজ করছি।

তোমার হাতে কি অনেক কাজ?

হুঁ।

আমার হাতে আর কোন কাজ নেই, আমি কি তোমাকে হেল্প করবো?

না আর আধঘণ্টার মধ্যে সব কাজ শেষ হবে।

উর্মী তার চেয়ারে বসে রইল।

শুভ্র খেয়াল করেছে আজ উর্মী তার দিকে বার বার করে তাকাচ্ছে।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, উর্মী তুমি যাবে না?

তোমার কাজ শেষ হোক, তারপর একসঙ্গে যাব।

লিফট পর্যন্ত?

না।

শুভ্র মুচকি হেসে বলল, গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত?

উর্মীর ইন্টারকম বেজে উঠল।

সে রিসিভ করে বলল, আসতে বলুন?

একটা মেয়ে উর্মীর টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল।

উর্মী বলল, হেমা বস।

শুভ্র হাতের কাজ শেষ করে কম্পিউটার শাট ডাউন দিয়ে উর্মীর দিকে চেয়ার ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, উর্মী আমার কাজ শেষ।

উর্মী বলল, শুভ্র তোমাকে পরিচয় করে দিই, ও হচ্ছে হেমা, আমার রুম মেট আর হেমা ও শুভ্র ওর কথা তো তোকে  বলেছি।

শুভ্র হেমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কী করেন?

আমি একটা মোবাইল কোম্পানিতে জব করছি।

আপনার গ্রামের বাড়ি?

নওগাঁ।

নওগাঁ কোথায়?

ধামইরহাট।

দু’জনের বাড়িই কি ধামইরহাট?

হেমা মাথা বাঁকিয়ে সায় দিল।

উর্মী হেমাকে থামতে ইশারা করল।

শুভ্র বুঝতে পারল উর্মী হেমাকে তার পরিচয় বলতে নিষেধ করছে। উর্মী আর মায়া যে একজনই এই সন্দেহটা তার মধ্যে যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল এবং সে আরও নিশ্চিত হলো।

শুভ্র বলল, উর্মী তাহলে আজকের মতো উঠি।

হেমা বলল, যাচ্ছেন কোথায়? আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন না?

কোথায়?

কেন মেলায়? উর্মী বলেনি আপনাকে?

উর্মী বলল, আসলে তুমি তো কেবল কাজ শেষ করলে তাই বলিনি, চলো আমাদের সঙ্গে।

শুভ্র উর্মীর দিকে তাকিয়ে বলল, উর্মী আমাকে বাদ দিলে হয় না?

প্লিজ শুভ্র।

বেশ চলো।

বাণিজ্য মেলা বেশ জমে উঠেছে। টিকেটের জন্য পুরুষ এবং মহিলা আলাদা লাইন অনেকদূর পর্যন্ত লম্বা অনেকক্ষণ শুভ্রকে পুরুষের টিকেট কাউন্টারে এবং হেমাকে মহিলা টিকেট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো।

টিকেট নিয়ে তিনজনই ভিতরে ঢুকল। সারিবদ্ধভাবে সাজানো দোকান-পাট, ঝলমলে আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সামগ্রীর দোকান।

হেমা আর উর্মী সামনে এবং শুভ্র পিছনে পিছনে হাঁটছে।

হেমা একটা কসমেটিক্স এর দোকানে ঢুকল। তার পিছনে পিছনে উর্মী আর শুভ্রও ঢুকল।

হেমা এবং উর্মী একটা একটা করে অনেককিছু কিনল।

তারপর আবার সবাই হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে এগিয়ে একটা কাপড়ের দোকানে ঢুকে বলল, উর্মী একটা থ্রি-পিস এর কাপড় চয়েস করে দাও তো?

উর্মী জিজ্ঞেস করল, কার জন্য?

তুমি শুধু পছন্দ করে দাও। হেমা আপনিও দেখুন তো।

হেমা জিজ্ঞেস করল, কার জন্য?

শুভ্র বলল, মায়ার জন্য।

উর্মী শুভ্রর মুখের দিকে তাকাল। তার বুক কেঁপে উঠল, শুভ্র কি তাহলে কনফার্ম হয়েছে যে আমিই মায়া?

উর্মী জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বলতো মেয়েটার গায়ের রং কী রকম?

ফর্সা।

আর।

লম্বা ঠিক তোমার মতো।

উর্মী বলল, মানুষের মতো মানুষ আছে?

না।

তবে।

শুভ্র কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, তোমাকে পছন্দ করতে বলেছি তুমি পছন্দ করবে।

উর্মী আর কোন কথা বলল না।

একটা থ্রি-পিস কিনে তারা দোকান থেকে বের হলো।

এমন সময় শুভ্রর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে রিসিভ করে বলল, হ্যালো ভাবী।

কী রে এখনো বাসায় ফিরলি না, একবার রিং করে তো বলতে পারতিস।

সরি ভাবী।

আচ্ছা এত হৈ চৈ কেন? মনে হয় মেলায় গেছিস?

হ্যাঁ।

আমাদের নিয়ে গেলি না। নাকি সঙ্গে কোন গার্ল ফ্রেন্ড আছে?

শুভ্র কোন কথা বলল না।

ঠিক আছে আগে বাসায় আয় তারপর কথা হবে।

প্লিজ ভাবী রাগ করো না। আরেকদিন তোমাকে আর প্রান্তিককে নিয়ে আসব।

আচ্ছা ঠিক আছে রাখি এখন।

মোবাইল রেখে শুভ্র মুচকি হাসল।

হেমা বলল, কী আপনার ভাবী জেনে ফেলল?

কোন অসুবিধা নেই, মাঝে মাঝে খোঁটা দিবে আর কী?

সবাই হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল।

হেমা বলল, দাঁড়ালেন কেন? চলুন বের হই।

খুব খিদে লেগেছে, কিছু খাব না?

হেমা বলল, না, একসঙ্গে বের হই তারপর আপনি বাইরে কিছু খাবেন।

উর্মী বলল, হেমা চল।

শুভ্র মনে মনে খুশি হলো, উর্মী বোধ হয় আজ খাবে, উর্মীকে দেখার তার অনেকদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে।

সবাই রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকল।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, উর্মী কী খাবে?

উর্মী মাথা বাঁকিয়ে জানাল সে কিছু খাবে না।

মুহূর্তেই শুভ্র গম্ভীর হয়ে গেল, তবে হোটেলে ঢুকতে বললে কেন?

তুমি খাবে বলেই তো আমরা-

তোমরা খাও শুভ্র আমি তোমাকে বলেছি না আমাকে কিছু খেতে বলবে না। তুমি আর হেমা খাও।

শুভ্র আর কোন রিকোয়েস্ট করল না।

হেমা আর শুভ্র নাস্তা শেষ করে কফি খাচ্ছিল।

উর্মী একটা টুকরা কাগজ শুভ্রকে দিল, হেমাকে ভালোভাবে দেখ, তাকে তোমার কেমন লাগল কাল অফিসে শুনব। তোমার ওর বিষয়ে কিছু জানার থাকলে এখনি জেনে নাও।

শুভ্র কাগজটা পড়ে একটু হেসে পকেটে রাখল।

শপিংয়ের ব্যাগগুলো হেমার কাছে ছিল।

শুভ্র কফি শেষ করে বলল, হেমা আমি জানি উর্মী কোন ব্যক্তিগত কথা পছন্দ করে না কিন্তু আমরা একসঙ্গে কাজ করতে করতে একেবারে আইসোলেটেড হতে পারি না। তাই চলতে চলতে একসময় ব্যক্তিগত কথা বেরিয়ে আসে।

বলুন।

আমার বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিল সেই সুবাদে আমার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে এবং আমি অনেক স্কুলে লেখাপড়া করেছি। ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত ধামইরহাট সোফিয়া পাইলট স্কুলে লেখাপড়া করেছি। আমার এক বান্ধবী ছিল নাম মায়া। আমি তাকে মনে মনে খুব পছন্দ করতাম কিন্তু আমার যেভাবে বলা উচিৎ ছিল সেভাবে সাহস করে বলতে পারিনি। তারপর হঠাৎ একদিন বাবা বদলি হলো আমরা সেখান থেকে চলে আসলাম। সবাই বলে প্রথম প্রেমের দাগ কোনদিন মন থেকে মুছে যায় না। কিন্তু আমি তো মায়াকে কোনদিন আমার ভালোবাসার কথা বলতেই পারিনি তারপরও তার নাম আর মুখচ্ছবিটা আমি যেন আজ পর্যন্ত মুছে ফেলতে পারিনি।

কিন্তু আপনি তো মায়াকে ভালোবাসেননি।

ভালোবাসিনি তো বলিনি, বলতে পারেন ভালোবেসেছিলাম সাহস করে সুন্দরভাবে বলতে পারিনি।

ভেরি ইন্টারেস্টিং তো।

ভেরি ইন্টারেস্টিং না ভেরি ট্রাজেডি।

একটা কথা কি জানেন?

কি।

মায়ার আর উর্মীর কণ্ঠস্বরটাও হুবহু একই রকম। উর্মীর কথায় আমি মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হই। কোন দিন না জানি উর্মীকেই মায়া বলে ডাকি। উর্মী আজকের অন্তত এই সময়টুকু তোমাকে মায়া বলে ডাকি।

উর্মী মাথা নেড়ে সায় দিল। তার দু’চোখ পানিতে ছলছল করে উঠল, তার বুক চিরে একটা কথা বের হয়ে আসতে চাইল আমি, আমিই সেই মায়া শুভ্র, শুধু আজকের সময়টুকু না তুমি ইচ্ছা করলে সব সময় আমাকে মায়া বলে ডাকবে কিন্তু সে অনেক কষ্টে নিজেকে চেপে রাখল।

শুভ্র থ্রি-পিসটা উর্মীর হাতে তুলে দিয়ে বলল, মায়া এটা তোমার জন্য প্লিজ টেক ইট।

উর্মী চোখ মুছে বলল, থ্যাঙ্কস, আসলে আমারই ভাগ্য খারাপ, উর্মী না হয়ে মায়া হলে আমি তোমার মতো একজন ভালো বন্ধু পেতাম।

হেমা আস্তে আস্তে হাত তালি দিল।

 

সাত

শুভ্র বাসায় ঢোকার আগে গেটে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম মুখ গম্ভীর করল।

সুরভী শুভ্রর চালাকি বুঝে। কখন শুভ্র বেশি হাসিখুশি ভাব দেখায়, কখন গম্ভীর ভাব দেখায়, কখন বেশি কথা বলে এসব তার অনেক দিনের চেনা। সে দরজা খুলে দিয়েই শুভ্রর গম্ভীর মুখ দেখে বলল, থাক আর মুখ ভার করে মনের কষ্ট দেখাতে হবে না। আমি বুঝছি তোর মনে কোন কষ্ট নেই এখন আমি যেন কিছু বলতে না পারি সেজন্য মুখ ভার করে আছিস? ওসব বাদ দে তুই হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয় আমি নাস্তা তৈরি করে নিয়ে আসছি।

শুভ্র আর গম্ভীর হয়ে থাকতে পারল না। সে হেসে ফেলল, ভাবী তুমি আসলে।

সুরভী কোন কথা বলল না। সে রান্নাঘরে চলে গেল।

শুভ্র ফ্রেশ হয়ে এসে চেয়ারে বসল।

সুরভী নাস্তার প্লে­ট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নে নাস্তা খা।

শুভ্র বলল, থ্যাঙ্ক ইউ ভাবী।

থাক আর থ্যাঙ্কস দিতে হবে না। তোর হাতে যে একটা প্যাকেট দেখলাম ওটাতে কী?

ও ভাবী প্রান্তিকের জন্য একটা খেলনা।

দিন দিন সব ভুলে যাচ্ছিস, আগে কোথাও থেকে কোন প্যাকেট নিয়ে আসলে আমার হাতে দিতিস, আর আজ সেটা মনে নেই। তোকে আজ কেন জানি খুব অসংযত দেখাচ্ছে?

কী রকম?

প্রতিদিন তুই বাসায় ফিরে আগে প্রান্তিককে কোলে নিয়ে আদর করতিস, আজ সেটাও ভুলে গেছিস।

সরি ভাবী, প্রান্তিক কোথায়?

প্রান্তিক আশেপাশে নেই, সে শুভ্রর ওপর রাগ করে তার রুমের পাশের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

শুভ্র প্রান্তিক, প্রান্তিক করে ডাকতে ডাকতে বেলকনিতে গেল।

প্রান্তিক বলল, আমি তোমার কাছে যাব না, তুমি পঁচা।

শুভ্র প্রান্তিককে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে ডাইনিং-এ এলো।

প্রান্তিকের তখনো রাগ কমেনি।

সে কোল থেকে নেমে বলল, তুমি পঁচা, আমি তোমাকে আজ থেকে পঁচা বলে ডাকব, পঁচা আঙ্কেল, পঁচা আঙ্কল।

শুভ্র বলল, ছিঃ বাপজান এভাবে বলতে হয় না।

তাহলে তুমি আজ আমাকে কোলে নিলে না কেন?

সরি বাপজান আমার ভুল হয়ে গেছে, এমন ভুল আর কখনো হবে না।

ঠিক তো?

ঠিক।

প্রান্তিক শাসনের সুরে বলল, মনে থাকে যেন।

শুভ্র বলল, ভাবী দেখেছ আমাকে কীভাবে শাসন করছে?

এতক্ষণ তো ও শাসন করল, এখন আমি শাসন করবো।

বেশ তো তুমি শাসন করলে আমার খুব ভালো লাগবে, নারীর শাসনের মধ্যে একটা মাধুর্য আছে, আনন্দ আছে।

তাও বুঝে ফেলছিস।

শুভ্র বলল, হ্যাঁ এখন শাসন কর, আমি আবার কী দোষ করেছি?

কী দোষ করিসনি তাই বল?

বলছি তো আমি কোন দোষ করিনি।

তুই যদি উর্মীকে ভালোবাসিস তবে এতদিন বলিসনি কেন? কেন আমরা অযথা তোর বিয়ের জন্য কনে খুঁজছি?

ভাবী উর্মীর সঙ্গে আমার ভালোবাসাবাসির সম্পর্ক না, আমরা একসঙ্গে কাজ করি এই।

বুঝি না তোর মতি গতি।

 

হেমা একটা মোবাইল কোম্পানিতে কাজ করে। তার ডিউটি চক্রাকারে পরিবর্তিত হয়। আজ রাত আটটা থেকে তার ডিউটি শুরু হবে। তাই সে মেলা থেকে ফিরে তাড়াহুড়া করে ডিউটিতে চলে গেছে ফিরবে সেই রাত দু’টার পর। যেদিন হেমার ডিউটি থাকে না সেদিন উর্মীর ভালোভাবে সময় কেটে যায় আর যেদিন হেমার নাইট ডিউটি থাকে সেদিন রাতে উর্মীর নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ, অসহায় মনে হয় এবং তার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

উর্মী ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই তার ঘুম আসছে না। সে অনেকক্ষণ দু’চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু ঘুম তো নয় যেন অতীতের স্মৃতিগুলো মাথার মধ্যে ভিড় করছে।

তখন মায়া মামুন ছাড়া অন্য কারো কথা কল্পনাও করতে পারতো না। তার এক বন্ধু ছিল, ছেলেটা খুব আবেগপ্রবণ ছিল। সে যে মেয়েটাকে ভালোবাসতো সে মেয়েটার নাম হাতে আলপিন দিয়ে খোদাই করে লিখে রেখেছিল। অনেকদিন তার হাতে ঘা ছিল এটা দেখে মায়াও মামুনের নাম তার হাতে খোদাই করে লিখেছিল।

তার কয়েকদিন পরই একদিন মামুন আর মায়া পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মামুনের চোখ পড়েছিল মায়ার খোদাই করা হাতের দিকে।

মামুন যেন আঁতকে উঠেছিল, মায়া তোর হাতে ঘা হয়েছে নাকি?

না।

মামুন মায়ার হাতটা টেনে ধরে বলেছিল, এ কী করেছিস তুই?

কিছু না। আসলে তুই তো বলেছিস তুই আমার জন্য জীবন দিতে পারবি আমি তো আগে একথা বলতে পারিনি। তাই তোর নামটা হাতে লিখে রাখলাম। যখনই তোর কথা মনে পড়বে তখনই হাতের দিকে তাকিয়ে দেখব।

মামুন জিজ্ঞেস করেছিল, তুই আমাকে এত ভালোবাসিস?

হ্যাঁ ক্লাসে তো তোর চেয়ে ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি, ভালোবাসার পরীক্ষায় যেন তোর চেয়ে ভালো করতে পারি।

মামুন মৃদু হেসে বলেছিল, দেখ পারিস নাকি?

না, পারেনি, সত্যি সত্যি ভালোবাসার পরীক্ষাতেও মায়া মামুনকে হারাতে পারেনি।

মামুন প্রায়ই বলত, মায়া তোর জন্য আমি সব করতে পারব।

সব করতে মানে?

সব করতে মানে মরতেও ভয় পাব না।

এসব মুখের কথা, সবাই তাই বলে।

মুখের কথা তো বটেই, যদি কোনদিন প্রমাণ করার সুযোগ হয় তবে করবো।

মায়া মামুনের চোখে চোখ রেখেছিল, মামুনের চোখে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়।

 

কয়েকদিন পরের কথা।

সকালবেলা মায়া মামুনকে মোবাইল করে তার পছন্দের শার্ট পরে আসতে বলেছিল।

মামুন বলেছিল, তুই আমাকে ধামইরহাট আসতে বলছিস কেন? তারওপর আবার তোর পছন্দের শার্ট?

আমি আসতে বলেছি তুই আসবি, আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না তো।

তুই বললে তো আমি আসবই কিন্তু কেন?

আজ ছবি তুলব।

একদিন তো ছবি তুলেছি হঠাৎ করে আবার ছবি তুলতে চাচ্ছিস কেন?

এমনিই একটা স্মৃতি রাখার জন্য।

ক’টায় আসব?

ঠিক বেলা এগারটায়, স্টুডিওতে।

কোন স্টুডিওতে?

আমি মোবাইলে জানিয়ে দিব।

ওকে।

সেদিন মায়া আপন মনে অনেকক্ষণ ধরে সেজেছিল। তার পছন্দের কাপড়-চোপড় পরার পর খোঁপায় ফুল পরেছিল, পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল, ভ্রু প্লাগ করেছিল। তারপর স্টুডিওতে গিয়ে মামুনকে মোবাইল করে সেখানে আসতে বলেছিল।

কয়েক মুহূর্ত দু’জনে পরস্পরের দিকে তাকিয়েছিল।

মায়া জিজ্ঞেস করেছিল, কী হচ্ছে? মনে হয় আগে কোনদিন দেখিস নি?

আমারও তো একই প্রশ্ন।

আসলে আজ আমরা দু’জনে দু’জনকে নতুন করে দেখছি।

আগে মায়া এবং মামুন কয়েকটা সিঙ্গেল ছবি তুলেছিল, তারপর কয়েকটা কম্বাইন্ড ছবি।

ছবিগুলো ডেলিভারি নেওয়ার পর থেকে মায়া প্রতিদিন রাতে ছবিগুলো হাতে নিয়ে মামুনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ত।

মায়া তখনো কলেজে ভর্তি হয়নি, সে তার খালার বাড়ি জয়পুরহাট বেড়াতে গিয়েছিল। আগের দিন তার খালার বাড়ি থেকে খালাসহ আসার পরদিন ধামইরহাট গিয়েছিল সেখান থেকে ফিরে মায়া তার মায়ের মুখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠেছিল, মা কিছু হয়েছে?

কিছু হয়েছে মানে? কী হয়নি?

মা খুলে বল, প্লিজ।

তুই কি লেখাপড়া করতে যাস নাকি মামুনের সঙ্গে প্রেম করতে যাস?

মায়া চমকে উঠেছিল, মা।

হ্যাঁ।

মা কেউ কিছু বলেছে?

কেউ বলবে কেন? তোর বাবা কারো কান কথায় বিশ্বাস করে না।

তবে?

তোর বিছানার ওপর তোর আর মামুনের ছবি পেয়েছে।

মায়া বুকে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিল, মা।

তোর বাবা তোর ওপর ক্ষেপে গেছে আজ রাতে তোর সঙ্গে কথা বলবে।

মায়ার দু’চোখ পানিতে ভরে গিয়েছিল। মায়া জানে তার বাবা খুব রাগী মানুষ, কোন বিষয়ে একটা ডিসিশন নিলে সেটা হাজার চেষ্টা করেও কেউ ফিরাতে পারবে না।

রাতে মোস্তাফিজ সাহেব বাসায় ফিরেই মায়া মায়া বলে ডাক দিলেন।

তার বাবা ভয়ঙ্কর ভঙ্গীতে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন, মা একটু দূরে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মা হয়ত তার বাবার কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরেছিল।

মায়া মাথা নত করে ভয়ে ভয়ে তার বাবার কাছে গিয়েছিল।

মায়া তোকে আমরা লেখাপড়া করতে পাঠিয়েছি আর তুই লেখাপড়া করতে গিয়ে মামুনের সঙ্গে প্রেম করছিস, না?

মায়া কোন কথা বলেনি।

মোস্তাফিজ সাহেব আরো হাজারগুণ রেগে গিয়েছিলেন, এখন কথা বলছিস না কেন? ছবিটা আমার হাতে পড়েছে তাই আমি আগেই জানতে পেরেছি। এই ছবি তুলতে যাওয়ার মানে তোরা অনেকদূর এগিয়ে গেছিস।

মায়া তবুও কোন কথা বলেনি।

এই কথা যদি ফাঁস হয়ে যায় তবে আমি সমাজে মুখ দেখাব কি করে? সবাই রং চং দিয়ে বলবে মোস্তাফিজ সাহেবের মেয়ে একটা ফকিরের বাচ্চার সঙ্গে ফষ্টি-নষ্টি করছে, তখন আমার মান-সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বল কথা বলছিস না কেন? কথা বল?

মায়া তবুও কোন কথা বলেনি।

ঠিক আছে তোকে আর কোন কথা বলতে হবে না। আমার সিদ্ধান্ত হলো তোকে কলেজে ভর্তি হতে হবে না।

মায়া রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিল, বাবা।

হ্যাঁ, তোকে লেখাপড়া করে জজ-ব্যারিস্টার হতে হবে না।

মায়া চুপ করে বসেছিল।

হ্যাঁ এটাই আমার সিদ্ধান্ত তোকে আর লেখাপড়া করতে হবে না, এমনকি বাড়িরও বাহির হতে হবে না। যদি তুই আমার কথা না শুনিস তবে আমি ঐ ফকিরের বাচ্চারও বারোটা বাজিয়ে দিব। আমি ছেলে দেখছি আগামী সাতদিনের মধ্যে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করবো।

মায়ার খালা রুনা রুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল, কি হয়েছে দুলাভাই? এত চেঁচামেচি কিসের?

সেটা তোর আপাকে জিজ্ঞেস কর?

রুনা জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে আপা?

মায়ার মা সবকিছু তাকে খুলে বলেছিল।

সবকিছু শুনে রুনা বলেছিল, দুলাভাই তুমি হঠাৎ রেগে যাচ্ছ কেন? এটা রেগে যাওয়ার মতো কোন সিরিয়াস বিষয় না।

সিরিয়াস বিষয় না মানে? আমার মেয়ে আমার বংশের মান-মর্যাদা বিলিয়ে দিয়ে একটা ফকিরের বাচ্চার সঙ্গে ফষ্টি-নষ্টি করে বেড়াবে আর তুই বলছিস সিরিয়াস বিষয় না।

না, সিরিয়াস বিষয় না। এটা এখন সামান্য ব্যাপার।

তোদের কাছে সামান্য ব্যাপার হতে পারে আমার কাছে এটা অনেক বড় ব্যাপার, এখানে আমার মান-সম্মান জড়িত। তুই তো জানিস প্রেস্টিজ ইস্যুতে আমি কখনো আপোষ করি না।

দুলাভাই তুমি মাথা ঠাণ্ডা করো তো। মেয়ে কার সঙ্গে একটু ঘুরে বেড়িয়েছে সেজন্য লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিয়ে দিতে হবে, সমাধানটা খুব সুন্দর হলো না? মাথা ব্যথা করলে মাথাটাই কেটে ফেলতে হবে?

রুনা মোস্তাফিজ সাহেবের একমাত্র শ্যালিকা। মোস্তাফিজ সাহেবের যখন বিয়ে হয় তখন রুনা হাই স্কুলে পড়ত। তিনি তাকে খুব স্নেহ করতেন। রুনা মোস্তাফিজ সাহেবের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় মোস্তাফিজ সাহেব গম্ভীর শান্ত গলায় বলেছিলেন, তবে কি করতে বলছিস?

আমি বলি মায়া লেখাপড়া করবে তবে এখানে না, জয়পুরহাটে।

মানে?

হ্যাঁ আমি মায়াকে জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি করে দিব।

ও থাকবে কোথায়?

হোস্টেলে।

তাতে কি ওদের আলাদা করা যাবে?

যাবে না কেন? জয়পুরহাট থেকে মায়া তো প্রতিদিন ঐ ছেলের সঙ্গে দেখা করতে পারছে না। মায়া অনেক বড় হবে, চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, অনেক বড় বংশের ভালো প্রতিষ্ঠিত ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ে হবে।

মায়ার মা কানভাঙা গলায় বলেছিল, আমি তোমার কাছে কোনদিন কিছু চাইনি, তোমার যে কোন সিদ্ধান্ত আমি বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছি, আজ আমি তোমাকে অনুরোধ করছি তুমি মায়ার লেখাপড়াটা বন্ধ করে দিওনা।

মোস্তাফিজ সাহেব কোন কথা বলেননি।

মায়ার মা আবার বলতে শুরু করেছিল, আমার লেখাপড়া করার খুব ইচ্ছা ছিল কিন্তু দাদীর নাতি জামাই দেখার অজুহাতে বাবা আমাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছে, আমার ছোটভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় উকিল বানিয়েছে, রুনা মাস্টার্স পাস করে একটা বেসরকারি কলেজে চাকরি করছে। আমি লেখাপড়া করতে পারলে আমিও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম। তোমাকে আমার অনুরোধ তুমি মায়ার লেখাপড়াটা বন্ধ করে দিও না।

ঠিক আছে তাহলে মায়াকে একটা কথা দিতে হবে সে আর কোনদিন মামুনের সঙ্গে মেলামেশা করবে না, ভালোভাবে লেখাপড়া করবে।

মায়া অষ্ফুট স্বরে বলেছিল, ঠিক আছে বাবা।

 

আট

জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজের হোস্টেলে থেকে মায়ার লেখাপড়া ভালোই চলছিল। সারাদিন ক্লাস, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে মামুনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলা। মায়া তার বাবাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি, তাদের ভালোবাসার কাছে বাবাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির পরাজয় হয়েছিল। সেজন্য মায়ার মাঝে মাঝে আশঙ্কা হতো কোনদিন যদি তার বাবা মামুনের সঙ্গে তার মেলামেশার কথা জেনে ফেলে তবে তার আর লেখাপড়া করা হবে না, তার মা’র স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে, তার খালার বড় করে কথা বলার মুখ নষ্ট হবে। তারপরও মায়া নিজেকে সামলাতে পারেনি। সুযোগ পেলেই মামুন জয়পুরহাটে আসতো, সেদিন সকালবেলা মায়া হোস্টেল থেকে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পড়ত। দু’জনে মুক্ত আকাশে পাখির মতো ঘুরে বেড়াত কোনদিন পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, কোনদিন বগুড়ার মহাস্থানগড়, কোনদিন দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী।

একদিন মায়া অনেকক্ষণ থেকে তার এক বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার মোবাইলে বার বার করে মামুনের কল আসছিল।

মায়া তার বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলা শেষ করে মামুনের মোবাইলের রিং করল।

মোবাইল রিসিভ করেই মামুন রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করল, মায়া তুই এত রাতে কার সঙ্গে কথা বলছিলি?

আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে।

এতরাতে তোর বান্ধবীর সঙ্গে কী কথা থাকতে পারে?

সাজেশনের বিষয় কথা বলছিলাম।

মায়া তুই আমাকে মিথ্যা কথা বললি।

না আমি তোকে কোনদিন মিথ্যা কথা বলিনি, এখনো মিথ্যা কথা বলিনি, সারাজীবন মিথ্যা কথা বলব না।

তাহলে তোর সেই বান্ধবীর মোবাইল নাম্বারটা আমাকে দে।

না ওর নাম্বার আমি তোকে দিব না।

ঠিক আছে আমি কাল জয়পুরহাট আসছি, বলেই মামুন মোবাইল রেখে দিল।

মামুন খুব আবেগপ্রবণ ছিল। মায়াকে মোবাইল না করেই সে সত্যি সত্যি পরদিন জয়পুরহাট এসে তার হোস্টেলের গেটে দাঁড়িয়ে মোবাইল করল।

মায়া মোবাইল রিসিভ করে জিজ্ঞেস করল, মামুন তুই কোথায়?

আমি তোর হোস্টেলের গেটে।

হঠাৎ করে চলে আসলি, আমার যে এখন কোচিং আছে।

আজ তোকে কোচিং করতে হবে না।

ঠিক আছে তুই যখন বলছিস তো আজ তোর জন্য কোচিং এ যাব না, তুই একটু গেটে দাঁড়া, আমি আসছি।

কিছুক্ষণ পর মায়া বের হয়ে এলো।

মামুনের দু’চোখ যেন জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেল, যেন যে কোন মুহূর্তে চোক দিয়ে রক্ত বের হবে।

কেউ কোন কথা বলেনি। কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর দু’জনে একটা রিক্সায় উঠল।

তারপর হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিল তাদের সেই অতি পরিচিত শিশু উদ্যানে।

মামুন মায়ার মোবাইলটা হাতে নিয়ে তার মোবাইলের কল রেকর্ড দেখে বলল, গত রাতে তোর মোবাইল রাত বারোটা পনেরো মিনিট থেকে বারোটা পঞ্চাশ মিনিট পর্যন্ত ব্যস্ত ছিল। অথচ কল রেকর্ডে এই সময়ের মধ্যে কোন ডায়ালড কল কিংবা রিসিভ কল নেই, তারমানে তুই নাম্বারটা ডিলিট করে দিয়েছিস।

তুই বিশ্বাস কর মামুন আমার বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তুই বিশ্বাস কর তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই। কী করলে তুই বিশ্বাস করবি আমাকে বল, আমি তোর যে কোন শর্ত মেনে নিব। আসলে নাম্বারটা কীভাবে যে ডিলিট হয়ে গেছে তা আমি নিজেও জানিনা। তবে একটা মোবাইল থেকে আমার মোবাইল নাম্বারে বিভিন্ন ধরনের ম্যাসেজ আসছে, ঘন ঘন কল আসছে, নাম্বারটা আমি চিনি না। তুই আমার ম্যাসেজ ইনবক্সে দেখ।

মামুন মায়ার মোবাইলের ইনবক্স দেখে বলল, তুই এই নাম্বারটা চিনিস না?

না।

তুই কোনদিন রেসপন্স করিসনি তো?

না।

ঠিক আছে, কারো সঙ্গে ঝগড়া বাধানোর দরকার নেই। চল তোকে এখনি মোবাইলের সিমকার্ডটা চেঞ্জ করে দিই।

মায়া বলল, মামুন এত ছোটখাটো কারণে সিমকার্ড চেঞ্জ করবো?

হ্যাঁ, একটা সিমকার্ড দাম আর কত?

ঠিক আছে তুই যখন বলছিস তবে চল এখনি একটা সিমকার্ড কিনে ফেলি।

চল।

দু’জনে একটা মোবাইলের দোকানে গিয়ে একটা সিমকার্ড কিনে দোকান থেকে বরে হয়ে একটা হোটেলে ঢুকল।

মায়া জিজ্ঞেস করল, মামুন তুই আমাকে এত ভালোবাসিস? মোবাইলটা একটু ব্যস্ত দেখলেই তোর মনে হয় কেউ বুঝি আমাকে নিয়ে গেল? সেজন্য একেবারে ধামইরহাট থেকে ছুটে এসে–

হ্যাঁ, আমি তোকে খুব ভালোবাসি মায়া, আমি তোর মোবাইলটা ব্যস্ত দেখলেই সহ্য করতে পারিনা।

আর এমন কখনো হবে না মামুন, তবে আমার ওপর তোর বিশ্বাস  রাখতে হ  বে বিশ্বাস ছাড়া কোনদিন ভালোবাসা টিকবে না মামুন।

আমি তোকে বিশ্বাস করি মায়া তবে তুই যেন কোনদিন আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করিস না।

মামুন মায়াকে বিশ্বাস করেছিল। আগের মতোই প্রতিদিন ক্লাস আর ক্লাসের ফাঁকে অথবা রাতে পড়া শেষে মোবাইলে চুটিয়ে আড্ডা দিত।

একদিন সকালবেলা লতা মোবাইল করে জানাল তার মায়ের মৃত্যুর সংবাদ।

তার রুমমেট এবং পাশের রুমের  মেয়রা তাড়াতাড়ি রুমে এসে সংবাদ জানার পর তাড়াতাড়ি মায়ার কাপড়-চোপড় গুছিয়ে দিল। তারপর মায়া জয়পুরহাট থেকে গিয়েছিল  তাদের বাড়ি।

মা মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর মায়া হোস্টেলে ফিরল। প্রথম প্রথম তার মা’র কথা খুব মনে পড়ত। তারপর ধীরে ধীরে মায়া মা হারানোর শোক কাটিয়ে উঠেছিল এমনসময় আরো এক দুঃসংবাদ পেয়ে যেন মায়ার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।

একদিন সন্ধ্যায় লতা মোবাইল করল।

মায়া মোবাইল রিসিভ করতেই মায়ার কানে ভেসে এসেছিল লতার কানভাঙা কণ্ঠস্বর

মায়া জিজ্ঞেস করল, কী রে কাঁদছিস কেন?

মায়া বাবা বিয়ে করেছে।

হঠাৎ করেই মায়া বুকে চরম একটা ধাক্কা খেল, সে অষ্ফুটস্বরে বলল, বাবা বিয়ে করেছে?

মায়া জোরে কান্না করে হোস্টেলের মেয়েদের কাছে তার বাবাকে ছোট করেনি। সমস্ত কষ্ট বুকে জমিয়ে রেখে বোবা হয়ে গিয়েছিল।

কিছুদিন পর মায়া ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল।

বাড়িতে ঢুকতেই লতা গেটের সামনে মায়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল।

বাড়ির ভিতরে ঢুকে আঙ্গিনায় তার চোখে পড়েছিল এক অপরিচিতা মহিলাকে।

লতা পরিচয় করে দিল, মায়া আমাদের ছোট মা।

ছোট মা’র চোখে চোখ পড়তেই মায়ার বুক কেঁপে উঠল।

সে সালাম দিল।

তার ছোট মা সালামের জবাব দিয়ে মায়ার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, কেমন আছ মা?

মায়া কোন কথা বলতে পারেনি, তার গণ্ডদেশ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়েছিল।

তার ছোটমা মায়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলেছিল, তুমি হাত-মুখ ধুয়ে আসো মা আমি তোমার খাবারের ব্যবস্থা করছি।

ভাত খেতে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট মা হাত পাখা দিয়ে বাতাস করে দিচ্ছিল। খাওয়া শেষে মায়াকে ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা বলেছিল, মা আমি বুঝতে পাচ্ছি তোমাদের দু’বোনের হয়ত আমাকে মা বলে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু যেদিন আমার তোমার বাবার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে সেদিনই আমি তোমাদের মেয়ে বলে মেনে নিয়েছি। যতদিন বাঁচবো ততদিন তোমাদের মেয়ে বলেই জানবো, তোমাদের কোন অমঙ্গল চিন্তা করার আগে আমার যেন মৃত্যু হয়।

মায়া কিছু বলেনি।

ছোট মা আবার বলতে শুরু  করেছিল, তুমি কারো কান কথায় বিশ্বাস করবে না মা। তুমি যদি আমার সম্পর্কে কারো কাছে কিছু শোন তবে সোজাসুজি আমাকে জিজ্ঞেস করবে।

বাবার সঙ্গে মায়ার সম্পর্ক কোনদিনও বন্ধুত্বসুলভ ছিল না, বরাবরই মায়ার কাছে বাবা নামক একটা ভীতি  ছিল। মোস্তাফিজ সাহেব মায়া কিংবা লতার সঙ্গে খুব একটা কথা বলতেন না। এবারও তাই হলো মায়া জয়পুরহাট যাবার আগের দিন রাতে বাবার সঙ্গে বলতে গেল।

মোস্তাফিজ সাহেব গম্ভীরস্বরে বললেন, তোমার লেখাপড়া ভালো চলছে তো?

জি বাবা।

কত টাকা লাগবে?

তিন হাজার।

মায়ার ছোটমা’র নাম মিথিলা।

মায়া তার বাবার কাছে টাকা চাওয়ার পর মোস্তাফিজ সাহেব মিথিলা বলে ডাক দিয়েছিলেন।

মিথিলা পাশেই দাঁড়িয়েছিল।

মোস্তাফিজ সাহেব বললেন, তিন হাজার টাকা দাও তো।

মিথিলা মোস্তাফিজ সাহেবের হাতে তিন হাজার টাকা এনে দিল।

মোস্তাফিজ সাহেব মিথিলার হাত থেকে টাকা নিয়ে মায়ার হাতে দিলেন।

মায়া অবাক হয়ে গিয়েছিল।

মায়া শৈশব থেকে দেখেছে তার বাবা কোনদিন তার মাকে টাকা রাখতে দেয়নি, কোনদিন তার মা’র টাকার প্রয়োজন হলে চেয়ে নিত, বাড়ির কোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনদিন তার মায়ের কোন কথাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব  দেয়নি। অথচ তার সেই বাবা সামান্য ক’দিনে বাইশ-তেইশ বছর বয়সের তার ছোট মা’র অনুগত স্বামীতে পরিণত হয়েছে।

সেদিন বাবার প্রতি মায়ার মন ঘৃণায় মন ভরে গিয়েছিল।

সেদিন রাতে মায়ার কেন জানি খুব ভয় করছিল। সে তার রুমে  ঘুমাতে গিয়ে ভয় পাচ্ছিল, তাই মায়া আর লতা দু’জনে লতার রুমে  ঘুমিয়েছিল। রাতে মায়া একটা দুঃস্বপ্ন দেখে লতাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।

 

লতার ঘুম ভেঙ্গে গেল, কী রে?

মায়া ভয়ে কাঁপছিল, লতা সাপ।

কোথায় সাপ?

লতা লাইট জ্বালিয়ে দিল, না কিছু নেই তো।

মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, লতা আমাকে এক গ্লাস পানি দে তো।

পরদিন সকালবেলা মায়া জয়পুরহাট গিয়েছিল কিন্তু মায়া আর আগের মতো মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করতে পারছিল না। প্রায় দিনই লতা মোবাইল করে তার ছোট মা’র তাকে নির্যাতনের কথা জানাত।

মায়া লতাকে সবকিছু তার বাবাকে জানাতে পরামর্শ দিচ্ছিল। লতাও সবকিছু তার বাবাকে বলতো কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না তারা দু’বোন মিলে তার বাবাকে মিথিলার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বিশ্বাস করাতে পারছিল না।

এতদিন লতার ওপর মিথিলার অত্যাচারের কথা মায়াকে ব্যথিত করতো কিন্তু দূর থেকে তার কিছু করার ছিল না সে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাত দূরে থাকার জন্য।

মায়ার এইচ.এস.সি পরীক্ষা চলছিল একদিন সন্ধ্যায় তার বাবা মোবাইল করল, মায়া তো অবাক। তার বাবা তো তাকে কোনদিন মোবাইল করে না। সে নিজে মোবাইল করলে দু’য়েক কথা বলে তাড়াতাড়ি মোবাইল রেখে দেয় যেন শেষ করতে পারলেই বাঁচে।

মায়া মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো বাবা।

হ্যাঁ মা কেমন আছিস?

মায়া আরো অবাক হয়ে গেল, বাবার এত স্নেহ সুলভ কথা।

সে জবাব দিল, জি বাবা ভালো আছি, তুমি?

হ্যাঁ মা ভালো, মা তোর পরীক্ষা যেন কবে শেষ?

আগামী রবিবার।

তাহলে তুই কি সেদিনই বিকেলে আসবি? নাকি সোমবার?

আমি সোমবার আসব বাবা।

ঠিক আছে মা ভালোভাবে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি আসিস।

আচ্ছা বাবা।

মায়ার মাথায় যেন নতুন চিন্তা ভর করল। বাবা পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে তো কোনদিন মোবাইল করেনি, কোনদিন মোবাইল করে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার কথাও বলেনি, বাবার নতুন কোন মতলব নেই তো। থাকতেও পারে বাবার মতলব তো আর বাবার চিন্তা শক্তি না, মিথিলার কোন কুবুদ্ধি।

বাবার সঙ্গে কথা বলা শেষ করে সে লতাকে মোবাইল করল, লতা।

কী রে? কী খবর?

মায়া তার সঙ্গে বাবার মোবাইলে কথা হওয়ার কথা বলে জিজ্ঞেস করল, লতা তুই কিছু জানিস বাবা হঠাৎ করে এভাবে বদলে গেল কেন?

লতা বলল, না তো আমি তো কিছু জানি না।

মায়া নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, মানুষ পরিবর্তনশীল হঠাৎ করে বাবা বদলে যেতেও তো পারে।

মায়া পরীক্ষা দিয়ে গ্রামে ফিরেছিল কিন্তু লতা বাড়িতে ছিল না।

সে তার বাড়ির কাজের মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, এই লতা কই রে?

আপা লতা কই যেন গেছে জানি না তো।

মায়া লতাকে মোবাইল করল, না লতার মোবাইল বন্ধ।

মায়া ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ল।

তার পরদিন সে তার বাবার পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিল, স্বয়ং তার বাবার মুখেই।

অত্যন্ত স্নেহ সুলভ ভঙ্গীতে মোস্তাফিজ সাহেব বললেন, মা অনেকদিন থেকে আমরা তোর বিয়ের জন্য ছেলে খুঁজছিলাম, ভালো বংশের শিক্ষিত এক ছেলে পাওয়া গেছে, আলাপ-আলোচনা চলছে, শীঘ্রই বিয়ে।

মায়া যেন বুকে  প্রচণ্ড আঘাত পেল। তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তার বুক চিরে অষ্ফুটস্বরে একটা আর্তনাদ বের হলো, বাবা।

মায়া তার ঘরে এসে তার মোবাইলটা খুঁজল, না কোথাও তার মোবাইলটা নেই। সে বুঝতে পেরেছিল তার  মোবাইলটা লুকিয়ে রাখাও পরিকল্পিত।

তারপর একটানা কয়েকদিন মায়াকে বাসা থেকে বের হতে দেয়া হয়নি। তাদের বাড়ি বিশাল উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল দ্বারা বেষ্টিত। শুধু বাউন্ডারি ওয়ালটাই উঁচু নয় তারচেয়ে উঁচু এবং অপ্রতিরোধ্য তাদের বংশ মর্যাদা এবং আভিজাত্য। মানুষ হিমালয় বিজয় করেছে কিন্তু তাদের বংশের কোন ছেলেমেয়ে তাদের আভিজাত্য পরাজিত করতে পারেনি। আভিজাত্যর অহঙ্কার অনেকের হৃদয় ভেঙ্গেছে কিন্তু কেউ এই আভিজাত্যর দেয়াল ভাঙ্গতে পারেনি।

যেদিন তার বাবা প্রথম মায়াকে ঘরে বন্দি রেখে বাইরে দরজায় তালা দিয়েছিল সেদিনই সে বুঝতে পেরেছিল তার এ ঘরের বাইরে বের হওয়া হবে একেবারে কনে সেজে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়া কোন ছেলের সঙ্গে। মায়া সব সময় তার ঘরে বসে মামুনের কথা ভাবত কিন্তু সমস্ত ভাবনাগুলো যেন এলোমেলো করে দিত একটা অচেনা প্রতিচ্ছবি। একদিন মায়া দুঃস্বপ্নের মধ্যে চিৎকার করে উঠল, না, না আমি মামুনকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না। মামুন ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে দিলে আমি আত্মহত্যা করবো।

দরজা খুলে তার বাবা তার ঘরে ঢুকল, মায়া, কী হয়েছে মা?

মায়া কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল, বাবা আমি মামুনকে ছাড়া বাঁচবো না, তুমি অন্য কারো সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিলে আমি আত্মহত্যা করবো।

মোস্তাফিজ সাহেব মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ছিঃ মা এভাবে বলতে হয় না, আমাদের পরিবারের কোন ছেলে মেয়ে গার্জিয়ানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করে না।

গার্জিয়ানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করে না এমন না বাবা আসলে তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের মতামতকে কোন গুরুত্ব দাও না। তুমি দেখ বাবা আমি কিন্তু সবার মতো মনের মধ্যে মামুনের ছবি নিয়ে অন্য কারো সঙ্গে সংসার করবো না। তোমাদের বংশের আভিজাত্য আমি ধুলোয় মিশিয়ে দিব। তোমরা লজ্জায় মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারবে না। তা যদি না পারি তবে আমি আত্মহত্যা করবো।

মোস্তাফিজ সাহেব আর কোন কথা বলেননি, নীরবে মাথা নত করে তার ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

 

কয়েকদিন পরের কথা।

একদিন সন্ধ্যায় মায়া তার রুমে বসেছিল। পাশেই ড্রয়িং রুম থেকে অনেকগুলো লোকের কথা ভেসে আসছিল। মায়ার মনে হয়েছিল তার বিয়ের আয়োজন চলছে।

সত্যি সত্যি তার বিয়েরই আয়োজন চলছিল। মায়া দরজা খোলার চেষ্টা করল, হ্যাঁ দরজাটা খুলে গিয়েছিল। কী জানি হয়ত কেউ দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে।

মায়া দরজায় উঁকি মারতে ঘটককে তার চোখে পড়ল।

মোস্তাফিজ সাহেব মায়াকে দেখে রেগে গিয়েছিলেন, মায়া তুই তোর ঘরে যা, এসব তোর শোনার দরকার নেই।

মায়া মুখে কিছু বলেনি অনেক কষ্টে একটা শুষ্ক হাসি হেসে মনে মনে বলেছিল, বাবা আমার বিয়ে আর আমারই শোনার দরকার নেই।

মায়া তার রুমে এসে খুব মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল।

ঘটক এক এক করে পাত্র পক্ষের দাবির কথা বলছিল আর সবাই শুনছিল।

সবকিছু শুনে মায়ার এক চাচা বলেছিল, তারমানে পাঁচ লাখ টাকা ডিমান্ড?

মোস্তাফিজ সাহেব বলেছিলেন, ঠিক আছে ঘটক সাহেব আমরা দু’য়েকদিনে আপনাকে আমাদের মতামত জানাব।

মায়ার ছোট চাচা মুরাদ মায়াকে খুব স্নেহ করতো।

সে বলেছিল, ভাইজান আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম?

তুই আবার কী বলবি?

ভাইজান মায়া মামুনকে ভালোবাসে, ছেলেটা বুদ্ধিমান ওকে সাপোর্ট দিলে একদিন অনেক বড় হবে। আমাদের মায়ার মনেও কোন কষ্ট থাকবে না।

মোস্তাফিজ সাহেব ধমক দিয়েছিলেন।

মুরাদ মোস্তাফিজ সাহেবের ধমকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল, ধমক দিও না ভাইজান, এই একই কারণে আমরা আমাদের এক বোনকে হারিয়েছি, তোমাদের মধ্যে যদি এরকম স্বৈরাচারী না থাকত, তোমরা যদি তাকে জোর করে তার পছন্দের ছেলের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে অন্য ছেলের হাতে তুলে না দিতে তবে সে আত্মহত্যা করতো না। মায়ার ক্ষেত্রেও আমি তাই দেখছি আমরা যদি তাকে জোর করে বিয়ে দিই আর সেও যদি আত্মহত্যা করে তবে এ বংশের কোন মেয়েকে আর কেউ বিয়ে করতে চাইবে না।

মোস্তাফিজ সাহেব বলেছিলেন, ওসব বাজে কথা বলবি না।

না আমি বলছিলাম আমাদের বয়স হয়েছে আর কয়েক বছর পর হয়ত আমরা চলে যাব কিন্তু মায়ার জীবন কেবল শুরু সে যাকে নিয়ে সারাজীবন কাটাবে সেটা আমাদের চেয়ে তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা না হয় ওর জন্য এটুকু সেক্রিফাইজ করলাম।

তাই বলে একটা ফকিরের বাচ্চার সঙ্গে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিব।

ভাইজান যে ছেলেটার সঙ্গে মায়ার বিয়ের কথাবার্তা চলছে সেই ছেলেটাও তো বেকার, হতে পারে ধনী মানুষের ছেলে কিন্তু নিজে বেকার হলে আর বুদ্ধিমান না হলে সে তার বাবার সম্পত্তি রক্ষা করতে পারবে না। মামুন বুদ্ধিমান ছেলে পাঁচ লাখ টাকা ঐ ধনী মানুষের ছেলেকে ডিমান্ড না দিয়ে মামুনকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। তুমি বিষয়টা একটু ভেবে দেখ ভাইজান?

চুপ, বাজে কথা বলে আমার মাথাটা নষ্ট করবি না। ঠিক আছে তোরা যখন ব্যাপারটা পছন্দ করছিস না তখন আমিও আর তোদের ডাকব না। আমার মেয়ে আমাকেই বিয়ে দিতে হবে।

পরদিন লতা তার মামার বাড়ি থেকে এলো।

মোস্তাফিজ সাহেব লতাকে শাসিয়ে বললেন, লতা মায়ার দিকে খেয়াল রাখিস, ও যেন কোন অঘটন না ঘটাতে না পারে, যদি কোন অঘটন ঘটে যায় তবে তুইও রেহাই পাবি না।

মায়ার বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল বেশ ধুম ধাম করে। মায়া তার বান্ধবীদের সঙ্গে তার রুমে বসে ছিল। মায়ার সঙ্গে তার ছোট মা’র এক ভাগ্নি এসেছিল, নাম নাসরিন। সে মায়ার সঙ্গে একরকম গায়ে পড়ে বন্ধুত্ব পেতেছিল। আসলে বন্ধুত্ব পাতানোর চালাকিটা ছিল তার ছোট মা’র। কারণ তার ছোট মা চাচ্ছিল মায়া আর লতার বিয়েটা হয়ে গেলে সংসারের পুরো কর্তৃত্বই তার হস্তগত হয়।

নাসরিন তার খালার নির্দেশে মায়াকে সঙ্গ দেওয়ার নামে পাহারা দিচ্ছিল।

মায়া লক্ষ্য করল। তার নানা বাড়ির তেমন কেউ আসেনি। তার চাচা-ফুপু যারা এসেছিল তারা মায়ার কাছ থেকে দূরে দূরে ছিল। কেমন যেন একটা সেপারেশন। সবাই দায়সারা গোছের কথা বলছিল। কেমন যেন একটা দায়িত্ব এড়ানোর পায়তারা।

তবে বাড়িতে যে কাজের কিংবা আনন্দ-ফুর্তি করার লোকের অভাব ছিল এমন না। তার নানা-বাড়ির সন্তান দখল করেছিল তার ছোট-মা’র বাবার বাড়ির লোকজন। মায়ার তার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল, সে আপন মনে কেঁদে উঠছিল, মা তোমার স্বপ্ন আজ চিরদিনের জন্য ভেঙ্গে যাচ্ছে তুমি কি দেখতে পাচ্ছ? মা তুমি আমাকে হেল্প করো মা। আমি আর পারছি না।

ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বর এসেছে, বর এসেছে বলে দৌড়ে এলো।

কিছুক্ষণ পর মায়াকে তার শ্বশুরবাড়ির বিয়ের কাপড়-চোপড় পরানো হলো।

আরো কিছুক্ষণ পর কাজি সাহেব খাতা নিয়ে এলো। ততক্ষণে মায়া জ্ঞান হারিয়েছিল।

যখন মায়ার জ্ঞান ফিরল। তখন সে একটি প্রাইভেট কারে অপরিচিত যুবকের পাশে কনে সেজে বসেছিল। মায়ার বুক ফেটে শুধু কান্না বেরিয়ে এলো।

 

উর্মীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো কে বলছেন প্লিজ?

এই আমি হেমা গেটটা খুলে দে।

উর্মী তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গিয়ে গেট খুলে দিল।

হেমা রুমে ঢুকে ব্যাগটা বিছানার উপর রেখে জিজ্ঞেস করল, এই তোর কি হয়েছে রে? তোকে কতবার রিং দিলাম, ঘুমিয়েছিলি নাকি? আমার মোবাইল নাম্বার সেভ করা আছে আর তুই আমাকে চিনতে পারছিস না মানে?

হ্যাঁ একটু ঘুম এসেছিল।

হেমা উর্মীর মুখ উঁচু করে ধরে বলল, কই ঘুমাসনি তো, নিশ্চয়ই তুই কিছু চিন্তা করছিলি।

উর্মী কিছু বলল না।

 

নয়

 

সাইফুল সাহেব একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। একজন সিনসিয়ার এ্যাকাউন্টেন্ট হিসাবে ডিপার্টমেন্টে তার সুনাম ছিল। তিনি চাকরিতে যেমন হিসেবী ছিলেন তেমনি ব্যক্তি জীবনেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন এবং সবার প্রতি বেশ দায়িত্ববান। তারপরও একটা না পাওয়া তাকে সারাজীবন ব্যথিত করেছে। সারাজীবনের সমস্ত হিসেব সুক্ষ্ণভাবে করেও তিনি জীবনের শুরুতে ভুল করা অংকের হিসাব-নিকাশটা মিলাতে পারেননি। মাঝে মাঝেই হিসেবের গড়মিলটা তাকে ব্যথিত করে। তিনি কাউকে কিছু বলতে পারেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কৈশোরের কোন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি খুঁজে বেড়ানোকে হাস্যকর মনে হলেও সাইফুল সাহেব কাউকে না বলে যেন এখনো সেই স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান।

তার জীবনের এই বেদনা থেকে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাই তিনি তার ছেলে সৌরভের বিয়ের ব্যাপারে তার ইচ্ছাকে কোন যুক্তি তর্ক ছাড়াই কনগ্রাচুলেশন জানিয়েছিলেন। তার দু’ছেলে সৌরভ এবং শুভ্র। সৌরভ এম.বি.এ করে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছে। সাইফুল সাহেবের সঙ্গে দু’ছেলের সম্পর্কই অত্যন্ত বন্ধুত্বসুলভ। সৌরভ লেখাপড়া শেষ করে চাকরিতে যোগদানের পর ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিল, শুভ্র সৌরভের কয়েকদিন আগে বাড়িতে এসেছিল। ঈদের ছুটি শেষে দু’জনে ঢাকা যাবার আগের দিন সাইফুল সাহেব দু’জনকে নিয়ে বসেছিলেন। এটা যেন তাদের অনেকদিনের অভ্যাস। সাইফুল সাহেবের স্ত্রী বেঁচে থাকতেও যে কোন সিদ্ধান্তের জন্য সবাই একসঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা হতো, তাদের বাড়িটা যেন গণতন্ত্রের চর্চা কেন্দ্র।

সাইফুল সাহেব সৌরভকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি রে চাকরি তো হলো এবার দেখেশুনে একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেল?

সৌরভ কিছু বলেনি।

শুভ্র বলেছিল, বাবা দেখাশুনা আর করতে হবে না, বউ দেখার কাজটা ভাইয়া নিজেই করেছে আমিও অবশ্য দেখেছি।

সাইফুল সাহেব বলেছিলেন, তবে তো অনেক কাজ এগিয়েই আছে, তবে নাম ঠিকানা বল। বিয়ের ব্যবস্থা করি।

বাবা তুমি আমাকে কয়েকদিন সময় দাও, আমি তোমাকে সবকিছু জানাব।

মেয়েটির নাম সুরভী। নামের সঙ্গে তার সৌন্দর্যের এত মিল যে তা নতুন করে বর্ণনা গুরুত্বহীন। শুধু সৌন্দর্যই নয় ছাত্রী হিসেবেও সে ছিল মেধাবী। সুরভীর অনার্স পরীক্ষার পর উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিয়ে হয়। সুরভী তার বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান, বাবা বড় ব্যবসায়ী। কলাবাগানে পাঁচতলা বাড়ি আছে, সাভার ই.পি.জেড-এ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে। সুরভীর নামে বনশ্রীতে তিন কাঠার একটা প্ল­ট আছে কিন্তু এতকিছুর পরেও সুরভীর আচার-ব্যবহারে কোন অহঙ্কার নেই। সে সাইফুল সাহেবকে খুব শ্রদ্ধা করে। সাইফুল সাহেবও সুরভীকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন। শুধু তাই নয় সুরভী সাইফুল সাহেবের কাছে বেশ খোলামেলা। সব কথা যেন অনায়াসে বলে ফেলে।

সাইফুল সাহেবের পাশের সিটে বসা ছেলেটি কয়েকবার ডাক দিল, চাচা অনেকক্ষণ থেকে আপনার মোবাইল বাজছে।

সাইফুল সাহেব রিসিভ করলেন, হ্যালো বউ মা।

অপর পাশ থেকে সুরভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, আব্বা আপনি এখন কোথায়?

সাইফুল সাহেব একবার সামনে এবং পাশে তাকিয়ে বললেন, বউ মা সামনে যমুনা ব্রিজ দেখতে পাচ্ছি।

আব্বা আমি অনেকক্ষণ থেকে আপনাকে রিং দিচ্ছি, ঘুমিয়েছিলেন মনে হয়?

হ্যাঁ বউ মা।

আব্বা সাবধানে আসবেন, আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিব, আপনি কিন্তু কাউন্টার থেকে কোথাও যাবেন না।

ঠিক আছে বউ মা।

বাস ততক্ষণে যমুনা ব্রিজে উঠেছে। সাইফুল সাহেব ব্রিজের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর বুকটা গর্বে ভরে গেল, তিনি আপন মনে বললেন আমরা বাঙ্গালী, আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারি, আমরা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করতে পারি, আমরা যমুনা ব্রিজের মতো দীর্ঘ ব্রিজ নির্মাণ করতে পারি।

যমুনা ব্রিজ অতিক্রম করার পর তিনি আবার হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

সৌরভ গাড়ি কেনার পর সাইফুল সাহেবের সুপারিশে তাদের গ্রামের এক ছেলেকে ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছে।

ড্রাইভারের নাম, কুদ্দুস।

সাইফুল সাহেব বাস থেকে নামতেই কুদ্দুস সামনে এসে দাঁড়াল, চাচা আস্‌সালামুয়ালায়কুম।

কুদ্দুস কেমন আছ?

জি চাচা ভালো আছি, আপনি?

এই আছি আর কী কোনমতো।

চাচা আপনার লাগেজ?

সাইফুল সাহেব পকেট থেকে একটা স্টিকার দিয়ে বললেন, এই নাও স্টিকার, লকারে ব্যাগ আছে।

কুদ্দুস ব্যাগ নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

সাইফুল সাহেব কুদ্দুসের পিছনে পিছনে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন।

প্রায় আধ ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি বাসায় পৌঁছাল।

প্রান্তিক বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল।

কলিং বেল বাজানোর আগেই সে দরজা খুলে দিয়ে বলল, দাদু।

সাইফুল সাহেব প্রান্তিককে কোলে নিয়ে বললেন, দাদু কেমন আছ?

ভালো।

সুরভী সামনে এসে সালাম দিল।

সাইফুল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ বউ মা?

ভালো আব্বা, আপনি?

প্রান্তিক বলল, দাদু তো ভালোই আছে।

সুরভী বলল, তুই কীভাবে বুঝলি তোর দাদু ভালো আছে?

ভালো না থাকলে কি দাদু পাবনা থেকে ঢাকা আসতে পারতো?

চুপ ইঁচড়ে পাকা কোথাকার? এভাবে কথা বলতে হয়?

সুরভী সাইফুল সাহেবকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকে বলল, বসুন আব্বা, আপনি হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন আমি চা দিচ্ছি, প্রান্তিক তুই দাদুর সঙ্গে গল্প কর।

সুরভী রান্নাঘরে গিয়ে শুভ্রকে মোবাইল করল, হ্যালো শুভ্র।

ভাবী বলো।

তুই জানিস না আজ আব্বা আসবে?

হ্যাঁ জানি তো।

আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসবি না?

ভাবী বাবা কি পৌঁছেছে?

হ্যাঁ।

ভাবী আমার তো আসতে দেরি হচ্ছে, তুমি মোবাইলটা একটু বাবাকে দাও তো আমি কথা বলি।

আমি রান্নাঘরে তুই তোর মোবাইল থেকে কথা বল। আর যদি কারো সাথে জরুরী কোন কাজ থাকে তবে থাক দেরিতে আসলেও আব্বা কিছু মনে করবে না।

ভাবী তুমি কিন্তু আমার ওপর অন্যায় করছ, এখনো আমার অফিস আওয়ার শেষ হতে এক ঘণ্টা বাকী আছে, আচ্ছা আমি বাবার মোবাইলে রিং দিচ্ছি।

সুরভীর সঙ্গে কথা বলা শেষ করে শুভ্র তার বাবাকে মোবাইল করল, হ্যালো বাবা।

কী রে কেমন আছিস?

জি বাবা ভালো, বাবা তোমার শরীরটা ভালো তো?

এই কোনভাবে দিন চলে যাচ্ছে।

বাবা আমার অফিস শেষ হতে একটু দেরি আছে, অফিস আওয়ার শেষ হলেই আমি চলে আসব।

না, না এত তাড়াহুড়া করার কিছু নেই, তোর কাজ শেষ হলে আসিস, প্রান্তিক আছে, সুরভী আছে আমার এখন গল্প করতে করতে সময় কেটে যাবে।

আচ্ছা বাবা ঠিক আছে।

উর্মী এতক্ষণ কাজ করতে করতে শুভ্রর কথা শুনছিল এবার কম্পিউটার থেকে মুখ তুলে বলল, শুভ্র তোমার বাবা এসেছে?

হ্যাঁ।

তোমার হাতে বেশি কাজ থাকলে আমাকে কিছু কাজ দাও, আমি করে দিব।

না বাবা বলেছে হাতের কাজ সেরে যেতে। বাবা সরকারি চাকরি করতো, চাকরি জীবনে খুব সিনসিয়ার ছিল। কাজেই আমি বাসায় যেতে দেরি হলেও কোন মাইন্ড করবে না।

কিছুক্ষণ দু’জনে কাজ করল। তারপর কাজ শেষ করে কম্পিউটার শাট ডাউন দিল।

উর্মী জিজ্ঞেস করল, চলে যাবে?

তুমিও চলো না উর্মী আমার সঙ্গে।

কি বলছ তুমি?

কেন? কোন অসুবিধা নেই। তুমি গেলে বাবা খুশি হবে। তুমি তো জানো না বাবার সঙ্গে আমার কি রকম সম্পর্ক? একেবারে কোন ধরনের লুকোচুরি নেই।

আচ্ছা শুভ্র তুমি তোমার বাবাকে খুব রেসপেক্ট করো তাই না?

হ্যাঁ, এটা আবার নতুন কি? সব ছেলে মেয়েরাই তাদের বাবা-মা’কে রেসপেক্ট করে।

উর্মীর দু’চোখ ছলছল করে উঠল।

সে আপন মনে বলল, শুভ্র আমি যদি তোমার মতো আমার বাবাকে রেসপেক্ট করতে পারতাম?

শুভ্র উঠে দাঁড়াল, উর্মী চলো উঠি।

তুমি যাও শুভ্র আমি একটু পরে যাব।

কেন?

প্লিজ শুভ্র, ডন্ট মাইন্ড।

ওকে থ্যাঙ্কস, বলে শুভ্র চলে গেল।

 

রাতে খাওয়ার পর সাইফুল সাহেব কথা তুললেন, বউ মা তুমি বোধ হয় শুনেছ আমরা যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পরিবারের সব সদস্য বসে আলোচনা করি, অনেকদিন থেকে তেমন কোন ইমপোর্টেন্ট বিষয় সামনে আসেনি তাই কোনদিন আমাদের আলোচনা তুমি দেখনি।

সুরভী কিছু বলল না।

সাইফুল সাহেব প্রান্তিককে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, এখন অবশ্য প্রান্তিকও আমাদের পরিবারের সদস্য, তাহলে এখন আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা কত হলো দাদু ভাই?

প্রান্তিক সবার দিকে আঙ্গুল তুলে তুলে গুণে বলল, দাদু এক, আব্বু দুই, চাচ্চু তিন, আম্মু চার আর আমি পাঁচ।

হ্যাঁ ঠিক বলেছিস এখন আমরা সদস্য সংখ্যা পাঁচ জন, বেজোড় সংখ্যা হয়েই ভালো হলো, জোড় সংখ্যা হলে তো আবার টস করতে হতো।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, আবার কি বিষয় বাবা?

কি বিষয় মানে? সৌরভের প্রতি যাবতীয় দায়িত্ব শেষ করেছি, এখন তোর বিয়েটা দিতে পারলে আমার সব দায়িত্ব শেষ হয়।

সুরভী কৌতূহলী হলো, হ্যাঁ আব্বা আমরাও আসলে অনেকদিন থেকে ওর বিয়ের জন্য চেষ্টা করছি, আগে বলতো চাকরি হয়নি, এখন চাকরি হওয়ার পর ওর মেয়েই পছন্দ হচ্ছে না, আমার এক কাজিন ছিল নাম নদী, মেয়েটা খুব সুন্দর, একেবারে শান্ত যেমন নাম নদী তেমনি নদীর মতোই শান্ত। কি রে সুন্দর না?

শুভ্র বলল, হ্যাঁ সুন্দর তো বটেই।

তবে কি হলো? অনেকদিন থেকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছে এই তো ক’দিন আগে বিয়ে হয়ে গেল।

তারপর আর মেয়ে দেখনি? সাইফুল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

দেখেছিলাম আব্বা, শুভ্র প্রায়ই বলতো বিয়ে করে খাওয়াব কি? একজনের আয় দিয়ে কি ভালোভাবে সংসার চলে? তাই একটা চাকরিজীবী মেয়ে দেখেছিলাম। ওকেও শুভ্রর পছন্দ না? শেষ পর্যন্ত দেখবেন আব্বা ওর কপালে ভালো বউ জুটবে না।

শুভ্র বলল, আমার বেশি ভালো বউ লাগবে না।

এই তো ক’দিন আগে বললি তোর বউ লাগবে সুন্দর, যেন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ঝিলিক দিয়ে যায়, আজ আবার বলছিস তোর বেশি ভালো বউ লাগবে না। তারমানে এর মধ্যেই তোর কাউকে পছন্দ হয়েছে?

হ্যাঁ।

তবে বল।

আমাকে কিছুদিন সময় দাও বাবা।

প্রান্তিক জিজ্ঞেস করল, কিছুদিন মানে কতদিন চাচ্চু?

শুভ্র বলল, কিছুদিন মানে সাতদিন হতে পারে, পনেরো দিন হতে পারে আবার—-

প্রান্তিক মন খারাপ করল।

সুরভী বলল, কি হলো প্রান্তিক? মন খারাপ করলি কেন?

তারমানে চাচ্চুর বিয়ে হচ্ছে না। সেই যে আন্টির বিয়ে হয়েছে কতদিন হলো তখন থেকে আর বিয়ে হয় না।

সৌরভ, বউ মা, প্রান্তিক তাহলে শুভ্রকে কিছুদিন সময় দেয়া হোক।

প্রান্তিক পণ্ডিতের মতো বলল, দেয়া যেতে পারে।

সৌরভ তার বেড রুমে গেল।

শুভ্রও তার রুমে গেল।

সাইফুল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, বউ মা শুভ্র কাকে পছন্দ করে তা কি বলেছে?

আব্বা সে এক সিনেমার মতো ব্যাপার সেপার।

কি রকম?

আপনার নাকি তখন ধামইরহাটে পোস্টিং ছিল। তখন ওর সঙ্গে একটা মেয়ে পড়ত নাম ছিল মায়া সেই মেয়েটাকে ওর তখন পছন্দ ছিল কিন্তু কোনদিন সেভাবে বলতে পারেনি। এখন প্রথম দিন চাকরিতে জয়েন করার সময় ওর সঙ্গে এক মেয়ে চাকরিতে জয়েন করেছে নাম উর্মী সেই মেয়েটা নাকি ঠিক মায়ার মতো।

নাকি কেন মেয়েটাকে দেখেনি?

মেয়েটা সব সময় বোরকা পরে থাকে কিন্তু গলার স্বর একেবারে মায়ার মতো এবং ও নাকি কনফার্ম যে উর্মীই মায়া।

ধামইরহাটে তো আমার অনেক পরিচিত লোক আছে, আমি না হয় খবর নিয়ে দেখি। আমাকে বলবে না বোকাটা, এমনিতে তো আমাকে সব কথাই বলে আর এই কথাটাই বলতে পারছে না?

আব্বা মেয়েটা তো এখনো স্বীকারই করছে না যে সে-ই মায়া।

খুব জটিল ব্যাপার, ওতো কয়েকদিন সময় চাইল, দেখি ও কি করে?

 

দশ

 

শুভ্র মোবাইল করলে যেন ছাড়তেই চায় না। সব সময় উর্মী কোন না কোন কাজের অজুহাত দেখিয়ে মোবাইল রাখে। তার যেন সব সময় একই কথা। শুধু শৈশবের স্মৃতি মায়া আর উর্মী। উর্মীকে ভালোবাসার কথাটা সে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। উর্মীও বুঝতে পেরেছে। উর্মী বার বার করে তার ব্যর্থতার কথা বলেছে কিন্তু সে যেন বুঝতেই চায় না। উর্মী আর শুভ্রর ব্যাপারটা হেমা জানে। হেমা প্রায়ই বলে শুভ্র এত করে যখন বলছে তখন বিয়ে করলেই তো পারিস?

কিন্তু উর্মীর ধারণা তার ঘটনাবহুল জীবন জানা এবং তার অগ্নিদগ্ধ মুখ দেখার পর শুভ্র আর তাকে বিয়ে করতে চাইবে না।

হেমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, শুভ্র উর্মীকে কতটুকু ভালোবাসে তার একটা পরীক্ষা হওয়া দরকার।

হেমা বলল, এই উর্মী শুভ্রর ভালোবাসা নিয়ে তোর যদি কোন সন্দেহ থাকে তবে না হয় একবার পরীক্ষা করে দেখি।

কিভাবে?

আমার গলার কণ্ঠস্বরতো শুভ্র চিনে, না হলে কাজটা আমাকে দিয়েই হতো। তাহলে নকশীকে দিয়ে একটা অফার দেই, দেখি টোপ গিলে না কি?

উর্মী কিছু বলল না।

নকশী উর্মীদের পাশের রুমে থাকে, বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে। খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারে।

হেমা নকশীকে তাদের রুমে ডেকে নিয়ে এলো, এই নকশী তোকে আমি একটা কাজ দিব, খুব এট্রাক্টিভ কাজ, করবি?

আগে বল আপা।

একটা ছেলের ভালোবাসা পরীক্ষা করতে হবে।

ছেলেটা কে?

ছেলেটাকে তোর চেনা লাগবে না, তবে একটা শর্ত?

কি?

তুই যেন আবার ছেলেটার প্রেমে পড়ে না যাস।

আপা আমার ওপর বিশ্বাস না থাকলে থাক আমাকে বলারই প্রয়োজন নেই।

আচ্ছা ঠিক আছে তোকে বিশ্বাস করলাম, বলে হেমা শুভ্রর পরিচয় এবং উর্মীর সাথে শুভ্রর রিলেশনের কথা বলল।

নকশী খুশি হলো, খুব ইন্টারেস্টিং তো। কাজটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

তবে শুরু করে দে।

আপা বিষয়টা তোমরা আমার ওপর ছেড়ে দাও।

তবু তুই আমাদের তোর প্লানের কথা বল।

আপা এখন রাত এগারোটা বাজে আর এক ঘণ্টা পর ফ্রেন্ডশিপ ডে, আমি প্রথম ফ্রেন্ডশিপ ডে’র শুভেচ্ছা দিয়ে কাজ শুরু করবো।

তাহলে তুই না হয় আমাদের রুমেই থাক, স্টার্টিংটা আমরাও এনজয় করি।

ওকে, বলে নকশী তার মোবাইলে ম্যাসেজ লিখতে শুরু করল।

Feelings are many but words are few,

Clouds are dark but sky is blue,

Love is paper life is glue,

Every things are false but friendship is true.

Happy friendship day.

Nokshi.

এস.এম.এসটা সেন্ড করে সবাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কিন্তু অপর পাশ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে নকশী একটা মিস কল দিল।

না তবুও কোন সাড়া পেল না।

নকশী আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করল, উর্মী আপা ভাইয়া কি তাড়াতাড়ি ঘুমায় নাকি?

না, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে।

নকশী একবার ঘড়ি দেখে বলল, রাত সাড়ে বারোটা বাজে সে নিজে নিজে বলল, কোন ছেলে মানুষ কোন মেয়ের কাছ থেকে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য এস.এম.এস পেয়েও অ্যানসার দেয় না এটা তো আশ্চর্যজনক!

উর্মী বলল, আশ্চর্যজনক মানে ছেলেরা কি শুধু মেয়েদের মোবাইল নাম্বার পেলেই কল করে নাকি?

এক্সাক্টলি, শুধু নাম্বার পেলেই হয়।

তুই ক’জনকে পরীক্ষা করেছিস?

আমি কাউকে পরীক্ষা করবো কেন? এমনিতেই আমি মোবাইলের অত্যাচারে বাঁচি না আবার নতুন করে পরীক্ষা করতে যাব নাকি, তোমরা বললে তাই কাজটা হাতে নিলাম, তবে শুভ্র ভাই মনে হয় বিশ্বাস করতে পারেনি।

কি বিশ্বাস করতে পারেনি?

মনে করতে পারে কোন ছেলে তার সঙ্গে ইয়ার্কি করছে।

নকশী রিং করল।

হ্যাঁ একবার রিং হতেই রিসিভ, হ্যালো।

নকশী লাউড স্পিকার দিল, Happy Friendship Day.

অপর পাশ থেকে শুভ্রর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, Happy Friendship Day.

আমার নাম নকশী।

আমি তো আপনাকে চিনি না।

কারো সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করতে হলে কি আগে থেকেই চেনা থাকতে হবে এমন কোন কথা আছে নাকি?

না তা নেই তবে আমার ফ্রেন্ড আছে।

নকশী হেমার দিকে তাকাল।

হেমা ঈশারা করল, চালিয়ে যাও।

তাতে অসুবিধা কি? ফ্রেন্ড তো একাধিক থাকতেই পারে?

হ্যাঁ তা পারে তবে এমুহূর্তে আমি প্রয়োজন মনে করছি না।

আপনি কি গান-টান করেন নাকি?

মানে?

মানে সঙ্গীত চর্চা করেন নাকি?

না।

তাহলে কবিতা আবৃত্তি?

না।

তাহলে তো গলার স্বর এত সুন্দর হওয়ার কথা না।

দেখুন আমার গলার স্বর আসলে সুন্দর না, আপনি বাড়িয়ে বলছেন।

মোটেই না।

দেখুন আমি কিন্তু মানুষ ভালো না, মেয়েদের জন্য তো মোটেই নিরাপদ না। আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলাও আপনার ঠিক হচ্ছে না। শেষে যদি আমার গলার স্বর শুনে আমার প্রেমে পড়ে যান আর আমি সুযোগ বুঝে আপনার কোন ক্ষতি করি।

ফ্রেন্ডশিপ হলো প্রেমের আগের ধাপ, মানেটা ঠিক এই রকম সব প্রেমে ফ্রেন্ডশিপ আছে কিন্তু সব ফ্রেন্ডশিপে প্রেম নেই। ফ্রেন্ডশিপ করার যখন প্রস্তাব দিয়েছি এর পরের ধাপ প্রেম, কাজেই সে প্রস্তাবও তো দিতেই পারি। আর ক্ষতির কথা ভাবছেন নিজেকে রক্ষা করার মতো শক্তি এবং সাহস দু’টোই আমার আছে।

দেখুন ফ্রেন্ডশিপ আর প্রেমের তফাত আমি জানি না, কোনদিন জানতে চেষ্টাও করিনি। তবে আপনি এত রাতে আমাকে মোবাইল করায় আমি খুব বিরক্ত বোধ করছি।

আজ ফ্রেন্ডশিপ ডে অনেক আশা করে আপনাকে এস.এম.এস পাঠিয়েছি। আপনি আমাকে নিরাশ করলেন কিন্তু আমার বিশ্বাস আপনি আমাকে দেখলে আমার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করতেন এমনকি হয়ত প্রেম বা বিয়ে করার প্রস্তাবটাও আপনার কাছ থেকেই আসতো, বলে নকশী মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল।

উর্মী নকশীর দিকে তাকিয়ে রইল।

হেমা বলল, নকশী রেজাল্ট ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে না।

নিশ্চয়ই রেজাল্ট পজিটিভ হবে, ছেলে মানুষ মেয়ের মোবাইল নাম্বারপেয়ে মিস কল দিবে না এটা কি হয়? আজ হয়ত কোন কারণে নেগেটিভ এ্যাটিচূড দেখাল কাল ঠিকই মোবাইল করবে।

 

এগারো

 

নিত্য দিনের মতো শুভ্র কাজ করছিল। একের পর কাজ যেন শেষ নেই। শুভ্র একটা কাজ শেষ করে চেয়ারটা উর্মীর দিকে ঘুরিয়ে নিল। এমন সময় শুভ্রর মোবাইলে একটা এস.এম.এস ঢুকল।

শুভ্র এস.এম.এসটা পড়ে মুচকি হাসল।

উর্মী জিজ্ঞেস করল, কে এস.এম.এস পাঠিয়েছে?

যন্ত্রণার কথা আর বলো না।

কেন? কিসের যন্ত্রণা?

কাল থেকে একটা মেয়ে আমার পিছু লেগেছে।

পিছু লেগেছে মানে?

মানে আমার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করবে।

বেশ তো, আনন্দের কথা, করে ফেলুন।

কী বলো তুমি?

হ্যাঁ অবশ্যই করবে। তুমি দেখেছ মেয়েটাকে?

না।

মেয়েটা ঢাকায় থাকে?

হ্যাঁ।

দেখা করো, কথা বলো।

যার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করবো না, তার সঙ্গে কথা বলব কেন? দেখা করবো কেন?

আরে বাবা অসুবিধা কী?

অসুবিধা আছে, এখন বলছে ফ্রেন্ডশিপ করবে, ক’দিন পর বলবে আমি তোমাকে ভালোবাসি, তারপর বিয়ে করতে চাইবে।

হ্যাঁ সবই তো ঠিক। তুমিও তো মেয়ে দেখছ, সেরকম যদি হয়েই যায় তবে তো খুব ভালো।

তোমার মাথা খারাপ? আমি যাকে ভালোবাসি সেই-ই আমার বন্ধু, সেই-ই আমার প্রেম, সে-ই আমার সব।

মেয়েটা কি লিখেছে? আমাকে দেখানো যাবে?

হ্যাঁ অবশ্যই।

না, তোমার মোবাইলের ইনবক্স আমি দেখব না, তুমি পড়ে শোনাও।

আগে গতকালকের এস.এম.এসটা শোন, বলে শুভ্র গত কালকের ম্যাসেজটা পড়ে শোনাল।

শুনে উর্মী বলল, ম্যাসেজটা খুব সুন্দর তো।

শুভ্র হেসে বলল, আমি কালকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের মধ্যে ডিফারেন্স কি?

তাই আজ আবার ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের ডিফারেন্স লিখে পাঠিয়েছে।

Love & friend are walking village.

love falls into a hole, why?

Because love is blind.

Friend also jumps inside, why?

because a friend will do anything for friendship.

Nokshi

মেয়েটা তো খুব সুন্দরভাবে ম্যাসেজ লিখতে পারে।

হ্যাঁ তাই তো দেখছি।

শুভ্রর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে রিসিভ করল, হ্যালো।

হ্যাঁ একটা এস.এম.এস পাঠিয়েছি, পেয়েছেন নিশ্চয়ই।

হ্যাঁ পেয়েছি।

রিপ্লাই দিবেন না।

দেখুন আমি এখন খুব ব্যস্ত, প্লিজ আমাকে বিরক্ত করবেন না।

এখন ব্যস্ত আছেন তাহলে রাতে রিং দিব।

না রিং করলে খুশি হবো, বলে শুভ্র মোবাইল রেখে দিল।

উর্মী জিজ্ঞেস করল, কে?

ঐ ম্যাসেজওয়ালী।

রেসপন্স করো।

উর্মী আসলে আমি এ ব্যাপারে তোমার কাছ থেকে পরামর্শ চাচ্ছি না, বলে শুভ্র তার কাজে মনোযোগ দিল।

উর্মী বুঝতে পারল শুভ্র তার কথায় মাইন্ড করেছে সেও তার কাজে মনোযোগ দিল।

সারাদিন আর দু’জনে খুব একটা কথা হলো না। বিকেলবেলা দু’জনে অফিস থেকে বেরুবে এমন সময় উর্মীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

উর্মী মোবাইলের মনিটরে আশার নাম দেখে তার বুক কেঁপে উঠল। সাধারণত কোন জরুরী প্রয়োজন ছাড়া আশা মোবাইল করে না।

উর্মী কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ল, কোন দুঃসংবাদ নেই তো?

সে শুভ্রকে বলল, শুভ্র তুমি একটু বস প্লি­জ, আমি কথা সেরে নিই।

আচ্ছা।

উর্মী মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো আপা।

উর্মী তোমার কোন খবর নেই কেন? অনেকদিন থেকে মোবাইল করো না।

আপা আসলে অফিসের কাজে প্রায়ই ব্যস্ত থাকি তো, সরি আপা।

না সরি বলার প্রয়োজন নেই, ব্যস্ত থাকাই ভালো, না হলে তো আবার মন খারাপ হবে।

আপা আপনি কী মনে করে?

কিছু মনে করে না, আসলে সব সময় তোমার খবর নিতে চাই কিন্তু সময় করতে পারি না।

আমিও আপনাকে খুব মিস করি আপা, আসলে আপনি এগিয়ে না আসলে আমি কোথায় খড়-কুটার মতো ভেসে যেতাম।

শুভ্র উর্মীর কথায় মনোযোগ দিল। সে আপন মনে বলল, মানে?

উর্মী আবার বলতে শুরু করল, একবার আসুন না আপা আমার হোস্টেলে? আমি খুব খুশি হব, আপনি তো জানেন আপনি ছাড়া আমার খবর নেওয়ার মতো কেউ নেই।

হ্যাঁ তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই তো আসব, তুমি কখন হোস্টেলে ফিরবে?

আধঘণ্টার মধ্যে।

আচ্ছা আমি আসছি।

আপা কোন দুঃসংবাদ নেই তো?

না।

উর্মী চোখ মুছল।

শুভ্র যেন আবারও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেল, উর্মীর আপা মানে? উর্মী যদি মায়া হয়ে থাকে তবে তো ওর কোন বড় বোন ছিল না, ওর বাবা-মা ছিল, ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের মেয়ে, ঢাকায় ওদের অনেকে আছে। উঃ অসহ্য শুভ্রর চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ।

উর্মী বলল, সরি শুভ্র তোমার দেরি করে ফেললাম।

তোমার আপা মোবাইল করেছিল?

হ্যাঁ।

তোমার হোস্টেলে আসবে?

হ্যাঁ।

তোমার আপা আছে সেটা তো কোনদিন বলনি?

উর্মী যেন কিছুটা বিব্রত বোধ করল, সেরকম প্রসঙ্গ কোনদিন আসেনি তো তাই বলিনি।

সরি উর্মী তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলে ফেললাম।

উর্মী হোস্টেলে পৌঁছার আগেই আশা পৌঁছে গেছে।

উর্মী গেট দিয়ে ঢুকতেই আশা রিসিপশন থেকে বেরিয়ে এলো।

আমার রুমে আসেন আপা।

আশা উর্মীর পিছনে পিছনে তার রুমে গেল।

আশা হেমার বিছানায় বসল, কেমন আছ উর্মী?

জি আপা ভালো।

বাড়ি থেকে তোমার বাবা মোবাইল করেছিল।

উর্মী কোন আগ্রহ দেখাল না।

বলল তুমি নাকি অনেকদিন থেকে লতাকেও মোবাইল করো না। লতা তোমার আগের নাম্বারে মোবাইল করে তোমাকে পায়না। তুমি সিম কার্ড পাল্টিয়েছ নাকি যদি সিম কার্ড পাল্টিয়ে থাক তবে তোমার নতুন মোবাইল নাম্বার চাচ্ছিল।

আপা আমি লতাকে মোবাইল নাম্বার দিয়েছি, ওর সঙ্গে প্রায় কথা হয় কিন্তু আমি ওকে আমার নাম্বার দিতে নিষেধ করেছি। আপনি কখনো আমার মোবাইল নাম্বার দিবেন না আপা।

না আমি তোমার মোবাইল নাম্বার দিইনি।

থ্যাঙ্কস আপা।

আচ্ছা এখন তোমার খবর বল।

এমনি ভালো আছি আপা তবে..

তবে কী বলো?

আপা আমরা একসঙ্গে চাকরি করি ছেলেটার নাম শুভ্র, বলে উর্মী একটু থামল।

থামলে কেন? বলো?

উর্মী শুভ্রর সঙ্গে পরিচয় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা বলল।

আশা সবকিছু শুনে বলল, ছোটবেলা তোমাকে ভালোবাসতো, সেজন্য তোমার প্রতি তার উইকনেস আছে কিন্তু যখন তোমাকে দেখবে, সবকিছু শুনবে তখন তার মোহ কেটে যাবে।

উর্মী কিছু বলল না।

আশা আবার বলতে শুরু করল, আগে ভালোভাবে ভেবে দেখ, জীবনটা একদিনের জন্য না।

আমিও তাই ভাবছি আপা।

আসলে তুমি এখন অনেক বড় হয়েছ। নিজের ডিসিশন নিজে নিতে পারবে তবে তাড়াহুড়া করবে না।

থ্যাঙ্কস আপা।

দু’জনে আরো অনেক গল্প হলো। উর্মী আশাকে কফি বানিয়ে খাওয়াল। তারপর আশা বিদায় নিল।

বারো

 

উর্মী এ্যালবামের একটা ছবি উল্টাল। তার বিয়ের ছবি। ছবির উপর বড় বড় করে লিখা আছে শুভ বিবাহ। উর্মী একটা শুষ্ক হাসি হেসে আপন মনে বলল, আসলে বিবাহ’র আগে শুভ কথাটা যে কে বসিয়েছে তা কেউ খোঁজাখুঁজি করেনি, হবে হয়ত কোন ভাগ্যবান কিংবা ভাগ্যবতী যে জীবনে বিয়েই করেনি বা যার জীবনে বিয়েটা শুভ হয়েছিল কিন্তু তেমন ভাগ্য ক’জনের?

উর্মী আরেকটা ছবি উল্টাল। তার বাসর রাতের ছবি। বাসর রাত তার জীবনের সবচেয়ে কলঙ্কিত রাত। এ রাতের কথা মনে পড়লে আজও তার হৃদয় ভেঙ্গে যায়। মায়া বুকের মধ্যে মামুনের ছবি নিয়ে বউ সেজে রাসেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। রাসেল ঘরে ঢুকেছিল। মায়া বউ সেজে বসে আছে আর রাসেল তার থুতনি উঁচু করে ধরে আছে। উর্মীর আজও মনে পড়ে যে মুহূর্তে ছবিটা তোলা হয়েছে সে মুহূর্তে রাসেল বলেছিল তুমি খুব সুন্দর, আমি খুব ভাগ্যবান যে তোমার মতো বউ পেয়েছি।

হয়ত রাসেলের কথাগুলো ছিল মায়াকে খুশি করার জন্য কিংবা বাসর রাতে এমন কথা বলতে হয় তাই বলেছিল।

মায়ার খুব ভয় হচ্ছিল, যেন কাঁপছিল।

রাসেল জিজ্ঞেস করেছিল, মায়া কী হয়েছে? কাঁপছ কেন?

আমার খুব ভয় করছে।

কেন? আমি কি বাঘ না ভল্লুক?

মায়া মনে মনে বলেছিল, তুমি বাঘ, ভল্লুক না, তুমি কসাই। বাঘ কিংবা ভল্লুক হলে একেবারে খেয়ে ফেলত আমি মরে গিয়ে বাঁচতাম কিন্তু তুমি কসাই, তুমি আমাকে জবাই করবে, নিজের পছন্দ মতো করে সারাজীবন আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে।

রাসেল মায়ার ঘোমটা তুলে জিজ্ঞেস করল, মায়া আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে?

মায়া মনে মনে বলল, আমার পছন্দ-অপছন্দে কী যায় আসে? তুমি আমাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছ আমি তোমার বউ। আমার পছন্দ-অপছন্দের কথা তোমার জানা উচিৎ ছিল বিয়ের আগে। এখন তোমাকে আমার পছন্দ না হলেই বা তুমি কী করবে?

মায়া মুখে কিছু বলেনি।

রাসেল মায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। মায়া বলেছিল, আজ না প্লিজ।

রাসেল বলেছিল, কেন?

মায়ার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছিল, আমার খুব ভয় করছে।

রাসেল বলেছিল, না কোন ভয় নেই।

রাসেল মায়ার কোন কথাই শোনেনি। বিয়ের প্রথম রাতেই মায়া তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে রাসেলের কাছে সমর্পণ করেছিল। জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় রাতটি মায়ার জন্য ছিল কলঙ্কের এবং বেদনার রাত।

মায়ার জীবনে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। তার সব সময় মামুনের কথা মনে পড়ত, সে মুখ ভার করে বসে থাকত। তার এই মুখ গম্ভীর করে বসে থাকাকে সবাই খুব অস্বাভাবিক মনে করতো, তার শাশুড়ি বলতো, নতুন বউ, ছোট মেয়ে সব সময় বাবা-মা’র কথা মনে পড়ে।

কয়েকদিন পর বাবার বাড়ি থেকে লতা, তার চাচাত ভাই-বোন এবং আরো অনেকে তাকে এবং নতুন জামাইকে নিয়ে গিয়েছিল। লতার মুখ দেখে মায়ার মুখ একটা অজানা আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল, অনেকদিন থেকে একের পর এক শুধু দুঃসংবাদ, আবার নতুন কোন দুঃসংবাদ নেই তো।

মায়া লতাকে জিজ্ঞেস করেছিল, লতা কী হয়েছে রে? নতুন কোন খারাপ খবর আছে নাকি?

লতা মাথা বাঁকিয়ে না সূচক জবাব দিয়েছিল।

কিন্তু মায়ার আশঙ্কা কাটেনি। তার সব সময় মনে হচ্ছিল লতা হয়ত তার কাছে কিছু লুকাচ্ছিল।

বাবার বাড়িতে ফিরে রাতে খাবার-দাবার শেষ করে মায়া লতাকে জিজ্ঞেস করেছিল, লতা মামুন কি তোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল?

মায়া কোন জবাব দেয়নি তার দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

মায়া উত্তেজিত হয়ে বলেছিল, লতা লুকাচ্ছিস কেন? আমাকে সত্যি করে বল তো কী হয়েছে?

লতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিল, মায়া মামুন ভাই আর নেই।

মায়া অষ্ফুটস্বরে বলল, নেই মানে?

তোর বিয়ের কথা শুনে মামুন ভাই একসঙ্গে অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়েছিল, তারপর সেই যে ঘুমিয়েছে আর ঘুম ভাঙ্গেনি।

মায়া হাউ মাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

লতা তাড়াতাড়ি করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে মায়ার মুখে রুমাল চেপে ধরল, মায়া চুপ কর। দুলাভাই শুনলে কী মনে করবে?

মায়া কাঁদছিল আর আপন মনে বিড় বিড় করে বলেই চলছিল, শুধু নিজে চলে গেলি, আমাকে নিয়ে গেলি না কেন মামুন? তোর স্মৃতি আমার বুকে রেখে আমি কীভাবে বাঁচবো? তুই আমাকে এমন শাস্তি দিলি। তুই বলতিস আমার জন্য তুই সব করতে পারবি, আমি মনে করতাম এটা তোর আবেগের কথা, শেষ পর্যন্ত তুই তোর কথা রাখলি, আমি এখন কী করবো মামুন?

মায়ার বিবেক যেন তাকে ধিক্কার দিয়েছিল, তুমি কী করবে মানে তুমি তো স্বামী সংসার নিয়ে সুখেই আছ, তোমার আবার চিন্তা কী?

লতা মায়ার চোখ মুছে দিয়েছিল, মায়া চুপ কর, কেঁদে আর কী হবে? সবাই জানলে আরও কেলেঙ্কারি হবে, এমনি বাবা আমাদের বিদায় করতে পারলে বাঁচে, মামুন তোকে হারিয়ে জীবন দিয়েছে একথা সবাই জানলে কথাটা একদিন দুলাভাই এবং তোর শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়-স্বজনদের কানে যাবে, তোর ঘর ভাঙবে। প্লিজ মায়া চুপ কর।

সে যাত্রায় রাসেল কিছু জানতে পারেনি কিন্তু ধীরে ধীরে কানাকানি করতে করতে একদিন রাসেল কথাটা জেনে ফেলেছিল।

খুব শান্ত এবং গম্ভীর কণ্ঠে একদিন মায়াকে জিজ্ঞেস করল, মায়া তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে?

রাসেলকে মায়া কখনো এত শান্ত এবং গম্ভীর দেখেনি সে কিছুটা অবাক হলো, রাসেল তোমার কী হয়েছে? আমাকে বলতো?

হ্যাঁ বলবই তো।

বেশ বলো।

মায়া মামুন কি তোমাকে ভালোবাসতো?

হ্যাঁ।

তুমি।

আমিও।

তবে আমাকে বিয়ে করলে কেন?

আমার কপালে তুমিই ছিলে তাই।

মায়া মামুন আত্মহত্যা করেছে, তুমি নিশ্চয়ই জানো?

জানি।

তুমি কি এখনো মামুনকে ভালোবাসো?

মায়া রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, সে তো মরে গেছে, সে এখন সমস্ত কিছুর অতীত, থাক না ওর কথা, তুমি কিছু মনে করো না প্লিজ।

রাসেল কিছু বলেনি।

মায়া বলেছিল, তুমি আমার স্বামী, আমার আর কেউ নেই, আমি আর কাউকে নিয়ে ভাবতে চাই না। প্লিজ তুমি আমাকে ভুল বুঝ না।

রাসেল মায়াকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল, মায়া তুমি খুব ভালো মেয়ে। আমি কিচ্ছু মনে করিনি মায়া বিয়ের আগে সবারই পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে, সেটা মন থেকে মুছে ফেলতে হয়।

আমি তোমার মতো একজন স্বামী পেয়েছি, তুমিই আমার মন থেকে মামুনের স্মৃতি মুছে দিতে পারবে।

রাসেলের সঙ্গে মায়ার দিন বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছিল।

বিয়ের আগে মায়া শুনেছিল, রাসেল ব্যবসা করে কিন্তু বিয়ের পর মায়া কোনদিন রাসেলকে কোথায় যেতে দেখেনি, রাসেল প্রতিদিন দেরিতে ঘুম থেকে উঠে তারপর বাড়ির পাশে ছোট বাজারে আড্ডা দিয়ে এসে দুপুরে ভাত খায় তারপর একটা লম্বা ঘুম, বিকেলবেলা আবার কোনদিন বাজার করতে যেত, কোনদিন ঘুরে বেড়াত। মায়ার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, রাসেল কিসের ব্যবসা করে?

একদিন মায়া রাসেলকে জিজ্ঞেস করল, রাসেল তোমার ব্যবসা কেমন চলছে?

রাসেল চমকে উঠল, ওহ ব্যবসা? ভালো না।

কেন?

আসলে ব্যবসাটা নিয়ে একটা সমস্যা হয়েছে।

কী সমস্যা?

আসলে আগে ভালোই চলছিল, হঠাৎ করে একটা কাজে ব্যবসার কিছু ক্যাশ ঘাটতি হয়েছে।

আবার চালু করো।

আবার চালু করতে টাকা লাগবে।

টাকার ব্যবস্থা করো?

কী ব্যবস্থা করবো?

আমি নতুন, আমি তো তোমাদের বাড়ির কিছু জানি না, যেমন করেই হোক তোমার ব্যবসাটা আবার শুরু করা দরকার।

হ্যাঁ সেটা তো বুঝছি কিন্তু টাকা না হলে তো ব্যবসাটা শুরু করা যাচ্ছে না।

আমাদের বিয়ের সময় তো তোমার মোটর সাইকেল ডিমান্ড হয়েছিল তুমি তো মোটর সাইকেল না নিয়ে টাকা নিলে, ফ্রিজ, কালার টি.ভি সবকিছু তোমাদের আগে থেকেই আছে সেগুলোরও তো টাকা নিলে এতগুলো টাকা কী করলে?

লোন ছিল, লোন শোধ করতে সব টাকা শেষ হয়ে গেছে।

মায়ার দু’চোখ পানিতে ভিজে গেল, রাসেল আমাদের গ্রামের সবাই জানে তুমি ধনী লোকের ছেলে, বড় ব্যবসা করো। এখন সবাই যদি জানে তোমার ব্যবসা ভালো চলছে না, তুমি হাত-পা গুটিয়ে বসে আছ তবে সবার কাছে আমি কী জবাব দিব?

রাসেল বলেছিল, তুমি কিছু ভেবো না মায়া সব ঠিক হয়ে যাবে।

মায়া কিছু বলেনি।

রাসেলের বড় বোন রেহানার পাশের বাড়িতে চাচাত ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রেহানা সবার বড়, রাসেল মেজো, সবার ছোট বোন সোহানা। রাসেলের বয়স যখন দশ বছর তখন তার বাবা মারা যায়, তখন থেকে তার মা আর রেহানা সংসার চালিয়েছে তাই মা তার তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে যেন রেহানাকে বেশি স্নেহ করে। আর সে সুযোগে রেহানা খুব ছোট-খাট কারণে বাবার বাড়িতে চলে আসে এবং বাবার বাড়ির সব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে। মায়া শুনেছিল রাসেলের বিয়ের জন্য রেহানা অসংখ্য মেয়ে দেখেছিল কিন্তু কোথাও কনে পছন্দ হয়নি। আদৌ মায়াকে পছন্দ হয়েছিল কি না তা জানা যায়নি, মায়াকে পছন্দ হওয়ার কারণ হতে পারে যৌতুকের পরিমাণ।

মায়ার বিয়ের পর রেহানার বাবার বাড়িতে আসা আরো বেড়ে গিয়েছিল। পাশেই শ্বশুরবাড়ি হওয়ায় সে অপ্রত্যাশিতভাবে সব সময় বাবার বাড়িতে এসে যেন বাবার সংসার দেখাশুনা করতো, মায়া কিভাবে চলবে, শাশুড়িকে কীভাবে সম্মান করবে, রাসেল কিভাবে বউকে শাসন করবে এসবের প্রেসক্রিপশন দিয়ে যেত। তবে আগে যেন মায়ার প্রতি তার এক ধরনের স্নেহ কাজ করতো। কিন্তু বিয়ের কয়েকমাস পর থেকে রেহানার ব্যবহার যেন বদলে গেল। বাবার বাড়িতে এলে মায়ার সঙ্গে খুব একটা কথা বলতো না। তার মা’র সঙ্গে কথা বলতো, রাসেলকে আড়ালে ডেকে নিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলতো মায়া বুঝতে পারতো তার কথাই হয় কিন্তু মায়া মুখ ফুটে কিছু বলতো না।

একদিন বিকেলবেলা রেহানা মায়ার রুমে ঢুকল।

তখন রাসেল বাড়িতে ছিল না।

মায়া কিছুটা অবাক হয়ে গেল, আপনি?

হ্যাঁ, অবাক হয়েছ মনে হয়।

না ঠিক তা না, আসলে আপনি কোনদিন আমার ঘরে আসেন না তো।

হ্যাঁ তোমার সঙ্গে একটা বিষয়ে আলাপ করতে আসলাম।

আলাপ, আমার সঙ্গে?

হ্যাঁ কেন? তোমার সঙ্গে আলাপ করতে হবে না, তুমি এ বাড়ির বউ না?

মায়া একটা ঢোক গিলে বলল, না মানে।

রেহানা বলল, মায়া তুমি তো দেখছ রাসেলের ব্যবসায় অনেক টাকা ক্ষতি হয়েছে এখন ব্যবসা একেবারে অচল, আহারে কাজের ছেলে একেবারে বেকার হয়ে বসে আছে। মা’র সংসারে বউ নিয়ে বসে বসে খাচ্ছে।

তার কাছে তার স্বামীর দুর্নাম করায় মায়া যেন একবার প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, বসে বসে কেন আপা ও তো সারাদিন হাল গৃহস্থী দেখাশুনা করছে।

কিন্তু মায়া কিছু বলল না।

রেহানা আবার বলতে শুরু করল, মায়া আমি বলছিলাম কি, রাসেল যদি আবার ব্যবসা করে তবে তোমাদের সংসারে দিন দিন উন্নতি হবে।

মায়া বলল, বেশ তো আপা আপনি যখন বলছেন তবে ব্যবসা করবে।

ব্যবসা করবে বললেই হবে? টাকা লাগবে না।

মায়া রেহানার কথা বুঝতে পাচ্ছিল না। সে রেহানার মুখের দিকে তাকিয়েছিল।

রেহানা বলল, মায়া আমি বলছিলাম কি তুমি যদি তাহই সাহেবের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা আনতে পারতে তবে রাসেল তার ব্যবসাটা আবার শুরু করতে পারত, ওর ব্যবসার হাত খুব ভালো। ক’দিনেই ধানের ব্যবসা করে অনেক টাকা রোজগার করেছিল। হঠাৎ ব্যবসায় একটা মার খেয়ে একেবারে বেকার হয়ে পড়েছে।

মায়ার কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল। রেহানার কথা শুনে মায়ার বুক কেঁপে উঠল, আপনি কী বলছেন আপা?

হ্যাঁ তোমাদের তো বাড়ির অবস্থা ভালো এ আবার বেশি কী? তোমার স্বামী বেকার এটা দেখা তোমার দায়িত্ব না, তুমি যদি টাকা নিয়ে আসতে পার তবে সে আবার ব্যবসা শুরু করবে তখন তো তোমাদেরই ভালো। রাসেল ব্যবসা করে তো আর আমাদের খাওয়াবে না। তোমাদের সংসারেই কাজে লাগবে। তুমি না হয় একবার তোমার বাবার বাড়ি যাও, তাহই সাহেবকে সবকিছু বুঝিয়ে বললে তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন, মেয়ে-জামাইয়ের ভালো কে না চায়?

মায়া কিছু বলেনি।

রেহানা বলেছিল, কিছু বলছ না কেন মায়া?

কী বলব আপা?

আমি বলছি তুমি না হয় সময় করে একবার তোমাদের বাড়িতে যাও।

মায়া মৃদু কণ্ঠে বলল, আমি পারব না আপা।

কেন পারবে না? রাসেলের বিপদের সময় তুমি পাশে দাঁড়াবে না?

রাসেল কোন বিপদে পড়লে আমি অবশ্যই ওর পাশে দাঁড়াব আপা কিন্তু তাই বলে ডিমান্ডের টাকার জন্য বাবার কাছে যেতে পারব না।

ডিমান্ডের টাকা বলছ কেন? জামাই বিপদে পড়েছে শ্বশুর নিশ্চয়ই দেখবে?

বাবা খুব প্রতিশ্রুতিবান মানুষ, আমার বিয়েতে বাবার যত ডিমান্ড দেওয়ার কথা ছিল বাবা দিয়ে দিয়েছে এখন আবার  টাকার জন্য আমি বাবার কাছে যেতে পারব না আপা।

আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছিলাম, তুমি ভেবে দেখ, বলে রেহানা মুখ ভার করে চলে গিয়েছিল।

 

তেরো

সেদিন চলে গেলেও কয়েকদিন পর রেহানা আবার এলো। আবার সেই একই সুরে কথা তবে পরের বার শুধু মাত্র রেহানাই নয় তার শাশুড়িও রেহানার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ।

সেদিন রাতে মায়া রাসেলের কাছে অনুনয় বিনয় করল, রাসেল তুমি তো আমাদের বাড়ির অবস্থা জানো, মা বেঁচে নেই, সৎ মায়ের সংসারে আমি আর লতা একরকম উচ্ছিষ্ট হয়ে বেঁচে আছি। বাবা সৎ মায়ের আঁচলে বন্দি, সবকিছু মিলিয়ে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসা আমার পক্ষে সম্ভব না রাসেল। তুমি বুঝতে চেষ্টা করো প্লিজ।

রাসেলও তার মা-বোনের পক্ষ নিল, মায়া তুমি তো আমার অবস্থা দেখছ, আপা আর মা যা বলছে তা তো আমাদের ভালো’র জন্য বলছে, আসলে আমাদের জমিজমা কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু কৃষিকাজের টাকা দিয়ে সংসার চালাতে গেলে খুব গরীব হালে চলতে হবে। তাই ব্যবসা ছাড়া উপায় কী বলো?

তারমানে তুমিও তোমার মা-বোনের সাথে সুর মিলিয়েছ। আমার সমস্যাটা তুমি একবারও বুঝলে না। আমি কীভাবে বাবাকে বলব, তুমিই বল রাসেল? বলতে বলতে মায়ার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

রাসেল মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তুমি কাল একবার যাও মায়া আব্বাকে বুঝিয়ে বল, আব্বা নিশ্চয়ই তোমার কথা না করবে না।

মায়া অবাক দৃষ্টিতে রাসেলের দিকে তাকিয়েছিল, রাসেল তুমিও?

হ্যাঁ মায়া তুমি যদি তোমাদের বাড়ি থেকে লাখ পাঁচেক টাকা নিয়ে আসতে পার তবে আমার ব্যবসাটা জমে উঠবে, খুব ভালোভাবে আমাদের দিন কেটে যাবে।

মায়ার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে আর রাসেলকে আর কিছু বোঝাতে চেষ্টা করেনি।

পরদিন বিকেলবেলা মায়া তার বাবার বাড়ি গেল।

মোস্তাফিজ সাহেব বাড়িতে ছিলেন না।

সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে মায়াকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, মায়া তুই হঠাৎ করে?

মায়া কিছু বলেনি।

মোস্তাফিজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, জামাই আসেনি?

না বাবা।

কোন সমস্যা?

বাবা তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে?

বলো।

মিথিলা মায়া আর  তার বাবার গল্প করার কথা শুনে বারান্দা থেকে ঘরে দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মোস্তাফিজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, বলো, কী হয়েছে?

বাবা কয়েকদিন থেকে রেহানা আপা, আমার শাশুড়ি, তোমার জামাই আমাকে আসতে বলছে কিন্তু আমি আসতে চাইনি বাবা কারণ ওরা যা বলছে আমি তা তোমাকে বলতে চাইনি।

কী কথা বলো?

বাবা ওরা তোমার কাছে টাকা চাচ্ছে।

জামাইর ব্যবসা ভালো চলছে না?

বাবা আমিও শুনেছিলাম তোমার জামাই ব্যবসা করে কিন্তু কোনদিন আমি তোমার জামাইর ব্যবসা করতে দেখিনি।

তবে?

বাবা তুমি আমাকে একটা বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছ, বলতে বলতে মায়া তার বাবার বুকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

মোস্তাফিজ সাহেব মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুই আর কাঁদিস না মা, আমি দেখছি কী করা যায়?

ঘরের ভিতর থেকে মিথিলা বের হয়ে এলো, তুমি আর কী দেখবে? মেয়ে বড় হয়েছে, অনেক টাকা ডিমান্ড দিয়ে বিয়ে দিয়েছ, বার বার কি কেউ ডিমান্ড দেয়?

মায়া তার মা বেঁচে থাকতে দেখেছে এমনভাবে তার মা তার বাবার কথার মাঝে কথা বললে মোস্তাফিজ সাহেব ধমক দিতেন কিন্তু সেদিন তিনি কিছু বলেননি।

মায়া তার বাবার কাছ থেকে ফিরে এলো।

মায়াকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে রেহানা তার মা আর রাসেল মায়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।

মায়া শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার দিন রাতেই রেহানা এলো।

রাতে খাবার পর রেহানা মায়ার ঘরে ঢুকল, মায়া কী ব্যাপার কিছু বললে না যে?

মায়া কিছু বলেনি।

মায়া তাহই কী বলল?

মায়া তবুও কিছু বলেনি।

কবে টাকা দিবে কিছু বলেছে?

না আপা।

তবে কী বলেছে?

বলেছে বার বার করে কি কেউ মেয়েকে ডিমান্ড দেয়?

তাহলে টাকা দিবে না?

এমনসময় রাসেল ঘরে ঢুকল।

রেহানা বলল, এই রাসেল তোর বউ কি বলছে শুনেছিস?

রাসেল গম্ভীর কণ্ঠে বলল, শুনেছি।

বিয়ের আগে তো শুনেছিলাম তো শ্বশুর খুব ধনী মানুষ, খুব বড় মনের মানুষ, বংশের ঐতিহ্য আছে এখন তো দেখছি মেয়ের সুখের জন্য সামান্য ক’টা টাকার মায়া কাটাতে পারছে না।

মায়া বলল, পাঁচ লাখ টাকা সামান্য ক’টাকা না আপা অনেক টাকা।

দেখছিস রাসেল, দেখছিস, কত বড় কথা, টাকা দিতে পারবে না আবার মুখে মুখে কথা।

রাসেল চুপ করে ছিল।

রাসেল তুই তোর বউকে বুঝিয়ে দেখ, সহজে টাকা আদায় না হলে কিভাবে টাকা আদায় করতে হয় তা আমি জানি। খুব সহজে আমি বাঁকা আঙ্গুলে ঘি তুলতে চাই না, বলে রেহানা চলে গিয়েছিল।

রাতে বিছানায় রাসেল মায়াকে অনেক বুঝিয়েছে, মায়া তুমি ভেবে দেখ, আপা খুব সিরিয়াস, আব্বা টাকা না দিলে আপা যে কী করবে তা আমি কল্পনাই করতে পারছি না।

রাসেলের কথা শুনে মায়া রেগে গেল, রাসেল আমি তোমার বউ, তুমি আমাকে সত্যি করে বলতো তুমি কি বাবার কাছ থেকে আরো যৌতুক চাও?

রাসেল কিছু বলল না।

আমি তোমাকে সত্যি কথা বলছি। তুমি তো জানো আমাদের সংসারের হাল এখন সৎ মায়ের হাতে। বাবা সৎ মায়ের ওপর কোন কথা বলে না। আমার সামনে সৎ মা বলেছে মেয়েকে কি কেউ বার বার করে যৌতুক দেয়? জানি না আড়ালে আরো কত কী বলেছে? যদি আমার মা বেঁচে থাকত তবে হয়ত বাবাকে রাজি করা যেত। তুমি সবকিছু বুঝতে চেষ্টা করো, বলতে বলতে মায়ার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এলো।

পরদিন থেকে মায়ার ওপর শুরু হলো নির্যাতন। যে রেহানা আগে সব সময় তার প্রশংসা করতো সে সব সময় মায়ার সামান্য দোষত্রুটিগুলোকে বড় করে দেখতে শুরু করল। যে শাশুড়ি মায়াকে সব সময় মা বলে সম্বোধন করতো সেই শাশুড়ি তার সম্বোধন পরিবর্তন করল। কথায় কথায় ছোট লোকের বাচ্চা বলে গালি দিতে শুরু করল। মায়া নীরবে ঘরে বসে কাঁদত। তখন মায়ার খুব মায়ের কথা মনে পড়ত তার মা বেঁচে থাকলে হয়ত বাবাকে রাজি করে রাসেলকে কিছু টাকা দিয়ে তাকে এই অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতো। শাশুড়ি ননদের অত্যাচার, স্বামীর নীরব সম্মতি মায়াকে মামুনের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। একদিন ঘুমের ঘরে মায়া স্বপ্নে মামুন দেখতে পেয়ে তাকে সবকথা খুলে বলল কিন্তু মামুন কিছু বলেনি। সেদিন মায়া অবাক হয়ে গিয়েছিল অন্য সময় হলে মামুন রেগে যেত যে তার মায়াকে নির্যাতন করতে পারে মামুন তাকে খুন করে ফেলত। কিন্তু মামুন চুপ করে থাকায় মায়া অবাক হলো, মায়া চিৎকার করে বলল, মামুন তুই কিছু বল, ওরা আমাকে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে, ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে, তুই আমাকে নিয়ে যা মামুন, আমি তোর সঙ্গে যাব, বলতে বলতে মায়া চিৎকার করে উঠল।

মায়ার চিৎকার শুনে রাসেল ঘুম থেকে বিছানায় উঠে বসল, মায়া কী হয়েছে?

না একটা স্বপ্ন দেখছিলাম।

রাসেল চিৎকার করে উঠল, মায়া তুমি কার সঙ্গে যেতে চাচ্ছিলে।

মায়া বলেছিল, কী যে দেখেছি মনে নেই।

মায়া এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

সেদিন বিকেলবেলা মায়া তার ঘর থেকে বের হতেই তার চোখে পড়ল রাসেল, রেহানা আর তার শাশুড়ি বারান্দায় বসে তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে গল্প করছে। মায়া আবার তার ঘরে ঢুকে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করল। না সে কিছু শুনতে পায়নি তবে কথা যে তাকে নিয়ে হচ্ছিল সে বিষয়ে মায়া নিশ্চিত হয়েছে। মায়ার বুক যেন এক নতুন আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।

রাতে খাবারের পর রেহানা আর তার মা মায়াকে ডেকে বসাল সঙ্গে রাসেলও ছিল, বউমা এভাবে তো আর চলছে না।

কীভাবে মা?

এই যে রাসেল সারাদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে?

আমি কী করবো মা?

রেহানা বলল, কী করবে মানে? এত করে তোমাকে বুঝালাম তারপরও তুমি বুঝনি?

আমি তো বাবার বাড়ি গিয়েছিলাম আপা।

গিয়েছিলে কিন্তু টাকা আনতে পারলে কই, আসলে তো খালি হাতে।

মায়ার শাশুড়ি বলল, বউমা বিয়ের পর মেয়েদের শ্বশুরবাড়ির দিকে খেয়াল রাখতে হয়, কীসে স্বামীর উন্নতি হয় সেদিকে দেখতে হয়, তুমি তো দেখছি এখনো বাপের বাড়ির মায়া কাটাতে পারছ না, এভাবে হয় না বউমা।

আমিও তো চেষ্টা করেছি মা, বাবা টাকা না দিলে আমি কী করবো? আর এমন তো না যে বাবা যে টাকা দিতে চেয়েছিল সে টাকা বাকী রেখেছে, আমি বাবার ওপর জোর করবো কী করে?

রেহানা মায়ার কথায় প্রচণ্ড রেগে গেল, তুমি বাবার ওপর জোর করবে কী করে? আমরা তোমার ওপর জোর করছি না তো তাই তুমি বাবার ওপর জোর করতে পারছ না, যখন আমরা তোমার ওপর জোর করবো তখন ঠিকই তুমি তোমার বাবার ওপর জোর করতে পারবে।

রেহানা রাসেলকে বলল, রাসেল তোর বউকে আমি সময় দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম সবকিছু খুব সহজে সমাধান হবে, এখন শুনে দেখ তো বউ কী বলছে?

রাসেল জিজ্ঞেস করেছিল, কী বলছে?

বলছে ও ওর বাবার ওপর জোর করতে পারবে না। আমার প্রশ্ন হলো জোর করতে হবে কেন? বিয়ের আগে তো শুনছিলাম বিরাট ধনী মানুষ, এখন মেয়ে-জামাইয়ের সুখের জন্য তারা এটুকু করতে পারবে না?

মায়া বলল, বিয়ের আগে তো আমিও শুনেছিলাম বনেদী পরিবারের ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে, ছেলের বড় ব্যবসা আছে, ভেবেছিলাম বাবা মোটর সাইকেল ডিমান্ড দিবে, আমি স্বামীর মোটর সাইকেলে চড়ে বাবার বাড়ি যেতে পারব। ঐতিহ্যবাহী পরিবারের বউ হিসেবে সবার কাছে মূল্যায়ন পাব। এখন তো দেখি, সব মিথ্যা। ছেলের বংশের ঐতিহ্য যা ছিল তা এখন অতীত, ঐহিত্যগত কারণে নামের শেষে একটা টাইটেল আছে মাত্র, বংশের অহঙ্কার আছে আর কিছু নেই। জামাইয়ের ব্যবসার সুবিধার জন্য বাবা মোটর সাইকেল ডিমান্ড দিতে চেয়েছিল, আপনারা মোটর সাইকেল না নিয়ে টাকা নিলেন। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে ছেলের ব্যবসাই নেই তবে আবার ব্যবসার সুবিধার জন্য মোটর সাইকেল কেন? এখন তো দেখি ছেলে বেকার।

রেহানা গর্জে উঠল, মায়া অনেক হয়েছে, আমাদের বংশ বুনিয়াদ নিয়ে তোমার কথা বলার কোন অধিকার নেই, তোমার বাবা-মা মনে হয় বড়দের মুখে মুখে কথা বলা শিখিয়েছে? সামান্য ভদ্রতাটুকুও শিখায়নি? এখন দেখছি আমরা একটা অভদ্র ঘরে আত্মীয়তা করেছি। রাসেল তুই কী দেখছিস? তুই সামনে থাকতেই আমাদের মুখের ওপর তোর বউ এমন কথা বলবে আর তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি? বউয়ের কাছে মাথা বিক্রি করেছিস নাকি?

রাসেল দাঁত কড়মড় করল মুখে কিছু বলল না।

রাসেল আমি তোর মা হিসেবে বলছি, তুই আগামীকাল বউকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দে, যেদিন পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে আসতে পারবে সেদিন যেন আসে তার আগে ওর জন্য এ বাড়ির দরজা বন্ধ।

মায়া কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

রাসেল জোর করে মায়াকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল।

মায়া রাসেলকে অনেক অনুনয় বিনয় করল, প্লিজ রাসেল তুমি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিও না। আমি বাবাকে গিয়ে কী বলব? আবার আমাদের বাড়িতে আছে দজ্জালের মতো সৎ মা। আমি কোথায় যাব রাসেল? তুমি আমার স্বামী, তুমি ছাড়া আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তুমি আমার ওপর এমন অবিচার করো না, প্লিজ।

রাসেল সেদিন রাতে মায়ার সঙ্গে কোন কথা বলল না।

পরদিন সকালবেলা রাসেল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রেহানা আর তার মা এক রকম জোর করে মায়াকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।

উর্মীর গণ্ডদেশ বেয়ে কয়েকফোটা পানি এ্যালবামের উপর পড়ল।

হঠাৎ করে হেমা রুমে ঢুকল, কী রে তোর চোখে পানি কেন?

উর্মী এ্যালবামটা লুকানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না।

হেমা এ্যালবামটা উর্মীর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, উর্মী তুই আমার রুমমেট, আমি এভাবে তিলে তিলে তোকে মরতে দিতে পারি না।

প্লিজ হেমা এ্যালবামটা আমাকে দে, আমার আর কী আছে বল? এই যে এ্যালবামের ছবিগুলো আর মনের মধ্যে স্মৃতিগুলো এই তো সব, এটুকু আমার কাছ থেকে কেড়ে নিস না।

কে বলে তোর কিছু নেই, জীবিকার জন্য তোর একটা ভালো চাকরি আছে, আশা আপার মতো একজন নিবেদিত প্রাণ বোন আছে, আমি আছি, শুভ্রর মতো তোর একজন খুব ভালো বন্ধু আছে, আর কী চাই বল?

উর্মী কেঁদে ফেলল, তুই ঠিকই বলেছিস হেমা আমার সব আছে।

 

চৌদ্দ

সেদিন রাতে উর্মী লতাকে মোবাইল করল।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর মোবাইল রিসিভ হলো, হ্যালো।

উর্মী ছোট বাচ্চার কণ্ঠস্বর শুনে জিজ্ঞেস করল, কে তুমি?

এটা লতার মোবাইল না?

হ্যাঁ, লতা আপুকে চাচ্ছেন, লতা আপু ভাত খাচ্ছে।

আচ্ছা আমি পরে রিং করবো।

উর্মী চিনতে পেরেছে মোবাইল রিসিভ করেছে তারই সৎ মা’র ছেলে। উর্মীর মনটা বেদনায় ভরে গেল।

আজকের যে ছেলেটি মোবাইল রিসিভ করেছে সে তখন মাতৃগর্ভে ছিল। কয়েকদিন আগে আলট্রাসনোগ্রাম করে সবাই কনফার্ম হয়েছিল মিথিলার গর্ভে পুত্র সন্তান দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর একথা জানার পরই মোস্তাফিজ সাহেব যেন তার প্রতি আরও বেশি যত্নবান এবং তার অনুগত হয়ে পড়েছিলেন।

মায়া বাড়িতে ঢুকেই তার বাবাকে সবকিছু খুলে বলল কিন্তু মোস্তাফিজ সাহেব কিছু বলবার আগেই মিথিলা বলল, তুমি হাতটা একটু ছোট করো, এখন আর শুধু দু’মেয়ে নেই যে বিয়ে দিলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে, যা কিছু করো আমার ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে করো।

মায়া অবাক হয়ে গেল। মেয়ের সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে আর বাবা আছে তার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। মোস্তাফিজ সাহেবের উচিৎ ছিল মায়ার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে সমাধানের ব্যবস্থা করা কিন্তু তিনি উল্টা মায়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, দেখ মা, আমার সংসারের অবস্থা যে খুব ভালো তা না, আগে তোরা দু’বোন ছিলি এখন তোর আরো একজন ভাই আসছে তার ভবিষ্যতের জন্যও তো কিছু রেখে যেতে হবে তাছাড়া লতার বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে, পাত্র পেলে ওরও বিয়ে দিব, একসঙ্গে এতগুলো ঝামেলা আমি কী করে সামলাব বল?

তাহলে আমি কী করবো বাবা?

মিথিলা যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল, তুমি কী করবে সেটা তুমি জানো, আমার মা বলতো বিয়ে হওয়ার পর মেয়েদের আর বাপের বাড়িতে কোন অধিকার থাকে না, তাকে তখন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়, দেবর-ননদ থাকতে পারে তারা দু’য়েক কথা বলতেই পারে, শ্বশুর-শাশুড়ি সংসারের গার্জিয়ান তারা একটু-আধটু শাসন করতেই পারে এসব মেনে নিয়েই সংসার করতে হয়। জামাইর হয়ত এখন ব্যবসা একটু মন্দা যাচ্ছে সেজন্য কিছু টাকার জন্য তোমাকে বলেছে, সেটা তুমি ম্যানেজ করে চলতে পার না, স্বামী, দেবর-ননদ কী বলল আর তুমি সোজা বাপের কাছে চলে আসলে টাকা নিতে, বাপের দিকটা একবারও দেখলে না?

বাবা আমি তোমার বড় মেয়ে আমাকে তুমি খুব স্নেহ করতে, তুমি হঠাৎ করে কেন এমন হয়ে গেলে বাবা? তোমাকে চিনতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা?

মোস্তাফিজ সাহেব কিছু বললেন না।

মিথিলা আবার বলতে শুরু করল, তোমার বাবা আর তোমার জন্য কী করবে? বিয়ের পর মেয়েদের জন্য বাবা-মা’র আর কিছু করার থাকে না। মায়া তুমি ডিমান্ডের জন্য আর কোনদিন এ বাড়িতে আসো না, মেয়ে-জামাই আসবে আমরা আপ্যায়ন করবো কিন্তু তুমি আর কোনদিন ডিমান্ডের জন্য এ বাড়িতে আসো না।

মায়া রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, বাবা তোমারও কি একই কথা?

মোস্তাফিজ সাহেব চুপ করে রইলেন।

তুমিও জেনে রাখ বাবা, আমি আর কোনদিন ডিমান্ডের জন্য তোমার কাছে আসব না। শ্বশুরবাড়িতে যদি ডিমান্ডের জন্য বিন্দুমাত্র নির্যাতিত হই তবে আমি আত্মহত্যা করবো এবং আমার মৃত্যুর জন্য শুধু তুমি দায়ী থাকবে, বলে মায়া বাপের বাড়ি থেকে চলে এলো।

পিছন থেকে মিথিলা বলল, একথা সবাই বলে দুনিয়াতে যত মানুষ আত্মহত্যা করতে চায় সবাই যদি আত্মহত্যা করতো তবে পৃথিবীতে মানুষ কমে যেত।

 

মায়া বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে ফিরবার কিছুক্ষণ পরেই রেহানা বাড়িতে ঢুকল। অবস্থাটা এমন ছিল যেন সবাই মায়ার বাপের বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসার অপেক্ষায় ছিল।

মায়া সোজা তার ঘরে গিয়ে ঢুকল।

কয়েক মিনিট পরেই তার শাশুড়ি ডাক দিয়েছিল, বউ মা, বাইরে আসো।

তার শাশুড়ির ডাকে মায়ার বুক কেঁপে উঠল। সে ধীর পদে সামনে গিয়ে অপরাধীর মতো দাঁড়াল।

বউমা টাকা নিয়ে এসেছ?

মায়া মৃদু কণ্ঠে বলল, না মা।

রেহানা বলল, তবে তুমি আসলে কেন?

মায়া কোন কথা বলল না।

তার শাশুড়ি রাগান্বিত কন্ঠে বলেছিল, কথা বলছ না কেন?

কী বলব মা?

রেহানা আবার বলল, টাকা নিয়ে আসতে পারনি তবে তুমি আসলে কেন?

আমি কোথায় যাব আপা? বাবা বিয়ে দিয়ে সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি নিয়েছেন, বাবার বাড়ির দিকে ফিরে তাকাবার আর কোন অধিকার নেই। এখন স্বামীর ঘরই আমার ঘর, মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আমি কোথাও যাব না আপা।

মায়ার শাশুড়ি বলল, তবে মরে গেলেই তো পার, তুমিও মুক্তি পাও, আমরাও বেঁচে যাই।

আপনিও একথা বললেন মা, আমি কি সবার কাছে বোঝা হয়ে গেছি? ঠিক আছে মা আপনারা সবাই যখন আমার মৃত্যু চাচ্ছেন আমি মরেই যাব। আপনারা আবার অনেক টাকা যৌতুক নিয়ে আপনাদের ছেলেকে বিয়ে দিবেন, আমার বাবাও আমার অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে, আমি মরে গিয়ে সবাইকে মুক্তি দিব, কান্না ভাঙ্গা গলায় কথাগুলো বলতে বলতে মায়া তার ঘরে গেল।

রাসেল রাতে বাড়িতে ফিরল গম্ভীর কালো মুখ নিয়ে। মায়া রাসেলের মুখের দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

মায়া জিজ্ঞেস করল, তোমার কী হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

রাসেল কিছু বলেনি।

মায়া আবার জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে আমাকে বলো প্লিজ?

কী হয়েছে সেটা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? মনে হচ্ছে তুমি কিছুই জানো না?

আমি টাকা আনতে পারিনি বলে তুমি আমার উপর রাগ করছ? তুমি বিশ্বাস করো আমি চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি। শেষ পর্যন্ত আমি বাবার ওপর একরকম রাগ করে চলে এসেছি, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর কোনদিন বাবার বাড়িতে যাব না।

রাগ করে চলে না এসে থেকে গেলেও তো পারতে, তাতে করে তোমার বাবা টাকা দিতে বাধ্য হতো।

তা করবো কেন? বাবা তো একবার ডিমান্ড দিয়ে আমাকে বিয়ে দিয়েছে আবার টাকার জন্য বাবার বাড়িতে পড়ে থাকব কেন? টাকার জন্য যদি মরতে হয় তবে স্বামীর বাড়িতে মরবো, বাবার বাড়িতে পঁচে মরবো না।

স্বামীর বাড়িতে মরে আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে? আমাকে হুমকি দেখাচ্ছ, আমি কোনকিছুতেই ভয় পাই না তুমি মরবে তোমার জীবন নিয়ে যাবে।

তারমানে তুমিও আমাকে মরার পরামর্শ দিচ্ছ?

না পরামর্শ দিচ্ছি না, তুমি আমাকে ভয় দেখালে তাই বললাম।

শেষ পর্যন্ত আমার তোমার মতামত জানার ইচ্ছা ছিল, এখন জানা হলো।স্বামী হিসাবে মৃত্যুর আগে আমার তোমার কাছ থেকে মাফ নেওয়া প্রয়োজন, বলে মায়া রাসেলের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে বলল, আর কোনদিন যদি তোমার সাথে দেখা না হয় তবে তুমি আমাকে মাফ করে দিও।

 

আমাবস্যার রাত, চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার। রাসেল আগে সারারাত মায়াকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো, আজ মায়ার বিপরীত দিকে মুখ করে কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। রাসেলের কাছে মায়ার নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হলো। শুধু রাসেলের কাছে নয়, তার শাশুড়ি, ননদ, সৎ মা এবং বাবার কাছেও তার নিজেকে বোঝা বলে মনে হলো। আজ যদি মামুন বেঁচে থাকত তবে মায়া সবকিছু ছেড়ে মামুনের কাছে চলে যেত, মামুন তাকে বুকে তুলে নিত। মায়ার আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। তার পৃথিবী এখন অনেকটা সঙ্কুচিত।

সে বিছানা থেকে উঠল। মায়া একদিন পেপারে পড়েছে এক গৃহবধূর ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে  আত্মহত্যা করার ঘটনা। সে নিজেও তার একটা ওড়না ফ্যানের সঙ্গে পেঁচানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। সে মনে করার চেষ্টা করল ঘরের কোথাও ইঁদুর মারার ঔষধ আছে কী না? না ঘরে ইঁদুর মারার ঔষধ নেই। মায়া খুব দুশ্চিন্তায় পড়ল, সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আপন মনে বলল, নিজে নিজেই মরবো তাতেও এত ঝামেলা। সে কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল তারপর বিছানা থেকে উঠে তার টেবিলের উপর থেকে একটা দিয়াশলাই দিয়ে তার শাড়ির কোনায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

 

পনেরো

          হাসপাতালের বেড এ অনেকক্ষণ মনে করার পর মায়ার ধীরে ধীরে কিছু কিছু কথা মনে পড়ল। তার জ্ঞান ফিরার কথা শুনে তার বাবা হাসপাতালের বারান্দা থেকে ছুটে এলেন, মা এখন ভালো লাগছে?

মায়া কোন কথা বলল না, তার বাবা’র দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

মোস্তাফিজ সাহেব বললেন, একটু কথা বলো মা।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে মনে করার চেষ্টা করল। ধীরে ধীরে তার সব কথা মনে পড়ল।

সে চিৎকার করে বলল, আমি বাঁচতে চাইনি, আমি মরতে চেয়েছিলাম, আমাকে হাসপাতালে এনেছে কে?

আমি এনেছি মা।

কেন? আমি বেঁচে থাকতে তো একবারও ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ দাওনি, মরে যাবার সময় আমাকে ফিরিয়ে আনলে কেন? আমি মরে গেলে তো তুমি বেঁচে যাও। তুমি মিথিলার কাছে চলে যাও।

এভাবে পাগলামি করিস না মা, মানুষ খারাপ বলবে। সব ঠিক হয়ে যাবে, রাসেল, ওর বোন, ওর মা সবাই এখন জেল হাজতে।

কেন জেল হাজতে কেন? ওদের কী দোষ?

কী দোষ মানে? ওরাই তো তোকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল।

না ওরা আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চায়নি, আমি নিজে, হ্যাঁ, হ্যাঁ নিজে আমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলাম। তবে তুমি, মিথিলা এবং ওরা আমাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছিলে।

আমি? তুই কি বলছিস মা?

আমি ঠিকই বলছি বাবা রাসেল আমাকে বিয়ে করেনি, তোমার টাকাকে বিয়ে করেছিল, তাই তুমি যখন আবার টাকা দিতে চাওনি তখন রাসেলের কাছে আমি অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছিলাম। রাসেলের হৃদয়ে আমার ভালোবাসা ছিল না। সে আমাকে কোনদিন ভালোবাসেনি। আমাকে ভালোবেসেছিল মামুন যে আমার জন্য জীবন দিয়েছে। তার সঙ্গে তুমি আমাকে বিয়ে দাওনি। আমার আজকের এ অবস্থার জন্য সবার আগে দায়ী তুমি, তারপর রাসেল এবং তার মা-বোন।

মোস্তাফিজ সাহেব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ওসব এখন থাক মা আগে তুই সুস্থ হয়ে ওঠ তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।

মায়া চোখ মুছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, আমাকে তোমার সুস্থ করে তুলতে হবে না বাবা, আমি যদি এমনিতেই সুস্থ হয়ে উঠি তবে বেঁচে থাকব আর না হয় মরে যাব, আমি কাউকে চাই না, আমি একাই বেঁচে থাকব সিস্টার, আমি একাই–

একজন নার্স সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

মায়া বলল, সিস্টার আমি একটু একা থাকতে চাই, প্লিজ আপনি আমাকে একা থাকতে দিন।

সিস্টার মোস্তাফিজ সাহেবকে বেরিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করল।

মোস্তাফিজ সাহেব বেরিয়ে গেলেন কিন্তু তিনি বেরিয়ে যাবার পর একজন অপরিচিত মহিলা তার কেবিনে ঢুকল।

মায়া জিজ্ঞেস করল, আপনি?

আমার নাম আশা, আমি একজন ডাক্তার।

আপনি ডাক্তার কিন্তু আপনি তো ডাক্তারের পোশাক পরেন নি?

আমি ডাক্তার তবে এই হাসপাতালের না? আমি একটা এন.জি.ও’র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, আমরা নির্যাতিত নারীদের  পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করি।

মায়া শ্রদ্ধার সুরে বলল, আপনি বসুন আপা।

মায়া তার জীবনের ঘটে যাওয়া কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল, প্লিজ আমাকে আর বাবা’র কাছে পাঠাবেন না আপা।

তবে কোথায় যাবে?

আমি জানি না, শুধু জানি যার একটা জিদের জন্য আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল তার কাছে আমি আর কোনদিন ফিরে যাব না, বাবার বাড়িতেও না, স্বামীর বাড়িতেও না বাকী জীবন আমি নিজের মতো করে বাঁচতে চাই আপা।

মায়া তোমার স্বামী, শাশুড়ি এবং ননদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, আমরা আইনগত সহায়তা দিচ্ছি। সেখানে তোমার যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আর বাবার বাড়ির কথা বলছ তুমি না যেতে চাইলে যাবে না। তাহলে আমি আমাদের লিগ্যাল এ্যাডভাইজার এর সঙ্গে কথা বলি আইনগত কোন বাধা না থাকলে আমরা তোমাকে সব রকমের সাপোর্ট দিব।

তাই করুন আপা।

মায়া যতদিন হাসপাতালে ছিল ততদিন প্রায় আশা তার সঙ্গে একবার করে দেখা করতো।

দীর্ঘদিন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকার পর হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাওয়ার দিন মায়ার বাবা, লতাসহ আরো অনেক আত্মীয় এসেছিল। লতা মায়ার দগ্ধ, বিকৃত মুখ দেখে মায়ার গলা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

মায়া লতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, লতা আমার জন্য চিন্তা করিস না, আশা আপা আছে আমার একটা ব্যবস্থা হবে, তুই ভালো থাকিস, মা আমাকে লেখাপড়া শিখিয়ে অনেক বড় করতে চেয়েছিল, আমি পারিনি তুই মায়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার চেষ্টা করিস।

আপা–।

তুমি যা চাইবে তাই হবে মায়া, তোমার বাবা আছে, আমাদের অর্গানাইজেশনের লিগ্যাল এ্যাডভাইজার আছে, আমি আছি। তোমার জন্য যেটা ভালো হয় সেটাই হবে।

না আপা আমার জন্য যেটা ভালো সেটা আপনারা ভাবলেই হবে না, আমি আর কারো ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই না। আমি নিজের ভালোটা এবার নিজেই ভাববো।

বেশ তো, বলো তুমি কী চাও?

আপা আমি আর কোনদিন গ্রামে ফিরে যাব না।

মোস্তাফিজ সাহেব বললেন, যাবি না মা তুই ঢাকাতেই থাকবি, আমি তোকে ঢাকায় রেখে লেখাপড়া শিখাবো।

কিন্তু আমি যে তোমার কোন টাকা নিব না।

তুই কী বলছিস মা?

আপা আমি যদি নিজের মতো করে বাঁচতে চাই তবে কি আপনি আমাকে হেল্প করবেন?

হ্যাঁ কিন্তু তোমার বাবা’র সম্মতি লাগবে।

আমি আমার জীবন থেকে সবার নাম বাদ দিয়ে নতুন করে বাঁচতে চাই আপা।

মোস্তাফিজ সাহেব বললেন, বাবা’র নাম কি কখনো জীবন থেকে মুছে ফেলা যায়?

আমি একা বাঁচতে চাই আপা, আমি আমার সব পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে আলাদা থাকতে চাই।

আশা বলল, সরি মোস্তাফিজ সাহেব আপনারা নিজেরাই তো দেখছেন, ও কোনভাবেই আপনাদের কাছে যেতে চাচ্ছে না। আপনারাই বলুন কী করলে ভালো হয় তবে আমরা ওর ওপর কোন চাপ দিব না।

সেদিনই মায়া চলে এলো আশার সঙ্গে নির্যাতিত নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

পুনর্বাসন কেন্দ্রে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। সেখানে আরো কয়েকজন ছিল, সবার সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখের কথা বলতে বলতে সময় কেটে যেত। তারপরও মায়ার সব সময় মনে হতো এটা একটা জীবন হলো, বসে বসে খাওয়া?

একদিন সে আশাকে জিজ্ঞেস করল, আপা আমাকে আর কতদিন এখানে থাকতে হবে?

তুমি যতদিন থাকতে চাও?

আপা আমি যদি লেখাপড়া করতে চাই?

করবে, অবশ্যই করবে, তুমি নিজের পায়ে না দাঁড়ান পর্যন্ত আমাদের অর্গানাইজেশন তোমার সমস্ত খরচ বহন করবে।

তারপর আশার উদ্যোগেই মায়া একটা কলেজে অনার্স ভর্তি হয়ে একটা মহিলা হোস্টেলে সিট নিল।

উর্মীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে মোবাইল রিসিভ করে লতার সঙ্গে কথা বলল।

তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে নিল, দেখি তো শুভ্র জেগে আছে নাকি?

উর্মী শুভ্রর মোবাইলে একটা মিস কল দিল।

সঙ্গে সঙ্গে শুভ্র কল ব্যাক করল, কী ব্যাপার উর্মী? এত রাতে? কোন সমস্যা?

না সমস্যা না, সরি আমি আসলে দেখলাম তুমি জেগে আছ নাকি?

তাও ভালো এত রাতে তুমি যে আমাকে স্মরণ করেছ?

এভাবে বলছ কেন? আমি কি তোমাকে রিং করতে পারি না?

পারো তবে করো না তো।

আচ্ছা কী করছিলে এত রাতে?

তুমি তো জানো না আমি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকি।

কেন?

কোনদিন বই পড়ি, কোনদিন ইন্টারনেট ব্রাউজ করি।

ইন্টারনেটেও কোন মেয়ে খুঁজে পেলে না?

ইন্টারনেটে কেন? মেয়ে তো সরাসরি খুঁজে পেয়েছি, শুধু বলতে সাহস পাচ্ছি না।

বলে ফেল।

হ্যাঁ খুব শীঘ্রই বলব।

 

ষোল

সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কৃতজ্ঞতায় উর্মীর দু’চোখ সজল হয়ে উঠল। আশা উর্মীকে নিয়ে হোস্টেলের মালিক মারিয়ার কাছে সমস্ত ঘটনা বলে তার প্রতি বিশেষ সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করেছিল। মারিয়া প্রথম প্রথম প্রতিদিন উর্মীর খোঁজখবর নিত তার ভালো-মন্দগুলি বিশেষভাবে খেয়াল রাখত।

শৈশবে উর্মী খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ছিল। খুব বেশি কথা বলতো, সব সময় হাত আর মুখ যেন নড়তে থাকত। কোন গাছে পেয়ারা, বরই, আম আছে তা সে নিজেই গাছ থেকে তুলে খেত। যাকে বলে গেছো মেয়ে কিন্তু তার জীবনে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর থেকে তার জীবন যেন স্থবির হয়ে গেছে। তার চঞ্চলতা, উচ্ছলতা, তারুণ্য সমস্ত কিছু যেন নিভে গেছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা এবং হোস্টেলে ওঠার পর সে যেন হিসেব করে কথা বলছে এটা হোস্টেলের কারো কারো কাছে দৃষ্টি কটু বলে মনে হয়েছিল। তার এই কম কথা বলার আচরণকে কেউ কেউ তার অহমিকা বলে মনে করতো।

একদিন উর্মী রিসিপশনে বসে পেপার পড়ছিল। পাশেই দু’জন মেয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। তাদের একজন উর্মীর পরিচিত নাম শোভা খুব সম্ভব তেজগাঁ কলেজে পড়ত। মেয়েটির সঙ্গে উর্মীর আগে দু’য়েকবার কথা হয়েছে।

উর্মীকে দেখে শোভার পাশে বসা মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, কে রে মেয়েটা?

২০৫ বি নাম্বার রুমে উঠেছে, স্টুডেন্ট।

কারো সঙ্গে কথা বলে না যে, খুব অহঙ্কারী নাকি?

কী জানি আমার সঙ্গে দু’য়েকবার কথা হয়েছে, তবে বোরকা পরা অবস্থায়।

এখানে তো আমরা সবাই মেয়ে তারপরও এত পর্দা, নাকি অন্য কোন ব্যাপার আছে?

অন্য কী ব্যাপার থাকতে পারে?

এটা ঢাকা শহর কত ব্যাপার থাকতে পারে? হয়ত কেউ চিনে ফেললে কোন সমস্যা হতে পারে আর না হয় দেখতে খুব বিশ্রী টাইপের তাই নিজেকে সব সময় আড়াল করে রাখতে চায়।

আবার খুব সুন্দরও তো হতে পারে, সুন্দরী মেয়েদের আবার অহঙ্কার বেশি হয়।

সুন্দরী মেয়েরা অহঙ্কারী হয় তবে সুন্দরী হলে তো আর নিজের মুখ ঢাকতো না। সবাইকে দেখাত।

তুই ঠিকই বলেছিস, হয়ত দেখতে খুব বিশ্রী তাই নিজেকে লুকাচ্ছে।

উর্মী আর একমুহূর্তও রিসিপশনে বসে থাকেনি। তার রুমে এসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল।

 

আগে কোনদিন উর্মী জানত না যে হোস্টেলে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা আছে।

সেদিনই সন্ধ্যাবেলা বুয়া বলে গেল রাত আটটায় অফিসে কাউন্সিলিং।

উর্মী কিছু বুঝতে পারেনি, কাউন্সিলিং আবার কী?

সে অফিসে ঢুকেছিল আটটা বাজার পাঁচটা মিনিট আগে, ততক্ষণে কয়েকজন মেয়ে অফিসে পৌঁছে গিয়েছিল।

মারিয়া উর্মীকে বলেছিল, উর্মী তুমি আমার পাশে বসো।

উর্মী তার পাশে বসল।

উর্মী একবার তাকিয়ে দেখল অনেক মেয়ে এসেছে তাদের মধ্যে শোভা এবং সেই মেয়েটি আছে।

মারিয়া ঠিক আটটার সময় কাউন্সিলিং শুরু করল, স্নেহের মেয়েরা তোমরা সবাই এই হোস্টেলের সদস্য, আমি কখনো নিজেকে এই হোস্টেলের মালিক ভাবিনা, আমি সব সময় মনে করি আমিও তোমাদের মতো একজন সদস্য শুধু কাজটা ভিন্ন। আমার কাজ তোমাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো দেখা, তোমাদের পরস্পরের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে তার সমাধান করা। সদস্য হিসেবে তোমাদের প্রত্যেকের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার আছে এবং একজনের অধিকারের প্রতি অন্যজনের কটাক্ষ বা কোন ধরণের ঈর্ষা পোষণ করার অধিকার নেই, বলে সে শোভা আর সেই মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী বলো শোভা, মাহবুবা?

উর্মী বুঝতে পারল শোভার পাশের মেয়েটির নাম মাহবুবা।

দু’জনে মাথা বাঁকিয়ে সায় দিল।

উর্মী তখনো বুঝতে পারেনি, আসলে কার জন্য আজকের কাউন্সিলিং?

মারিয়া শোভাকে বলল, মাহবুবা আজ তুমি আর শোভা উর্মীকে নিয়ে কী কথা বলছিলে?

দু’জনে পরস্পরের দিকে তাকাল, কিছু না তো।

মারিয়া গম্ভীর স্বরে বলল, মিথ্যা কথা বলবে না।

মাহবুবা উর্মীর দিকে তাকাল।

মারিয়া বলল, ওর দিকে তাকাচ্ছ কেন? ও তো আমাকে কিছু বলেনি, আমি তোমাদের কাছাকাছি থেকে নিজ কানে শুনেছি। তোমরা উর্মীর চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে কথা বলতে পার না।

শোভা আর মাহবুবা মাথা নত করে অপরাধীর মতো বসে রইল।

তোমরা জানো উর্মী আমাদের পরিবারের সবচেয়ে নতুন সদস্য, আমাদের সকলের উচিৎ ওকে স্নেহ করা। তাছাড়া উর্মীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব স্নেহ করি এবং আমার নিজের ছোট বোনের মতো আদর করি। তোমরা আমার পরিবারের অনেক পুরাতন সদস্য তাই আমি তোমাদের একবার সুযোগ দিচ্ছি তোমরা যদি উর্মীর কাছে ভুল স্বীকার করো তবে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে আর কোন ব্যবস্থা নিব না।

সরি আপা আমাদের ভুল হয়ে গেছে।

আমাকে না উর্মীকে বলো।

শোভা এবং মাহবুবা দু’জনে বলল, সরি উর্মী।

উর্মীর দু’চোখ সজল হয়ে উঠল।

উর্মীর বিষয়ে কেউ কোন কথা বললে আমি তাকে হোস্টেলে রাখব না এ কথাটা তোমরা সব সময় মনে রাখবে। তোমরা সবাই আরও একটা কথা মনে রাখবে আমি শুধুমাত্র বাণিজ্যিকভাবে এই হোস্টেল করিনি। তোমরা সবাই খেয়াল করেছ কারো বাড়ি থেকে টাকা আসতে দেরি হলে আমি কোন খারাপ আচরণ করি না। তোমাদের প্রতি আমার স্নেহ আছে, ভালোবাসা আছে, সহানুভূতি আছে। আমি আশা করি তোমরা আমার এই স্নেহ, ভালোবাসাকে কখনো দুর্বলতা মনে করবে না। তোমরা সবাই নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে কাউন্সিলিং-এ উপস্থিত হয়েছ সেজন্য তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।

উর্মীর প্রথম রুম মেট ছিল ঈশিতা। সে উর্মীর চেয়ে তিন বছরের সিনিয়র। সে উর্মীকে খুব স্নেহ করতো প্রায় চার বছর একসঙ্গে থাকার পর সে ভার্সিটির হল-এ সিট পেয়ে চলে যায়। তারপর আসে হেমা। উর্মী প্রথমে হেমাকে তার গ্রামের ঠিকানা বলেনি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে একই রুমে থাকতে থাকতে একদিন উর্মী সবকিছু হেমাকে বলেছে। অবশ্য হেমা উর্মীর বিষয় কোনদিন কাউকে কিছু বলেনি। হেমা তখন একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত আর উর্মীও একটি কম্পিউটার কোর্স করছিল। উর্মী কম্পিউটার কোর্স করে একটি পত্রিকায় জয়েন করেছে আর হেমা একটি মোবাইল কোম্পানিতে জয়েন করেছে।

উর্মী মোবাইলটা হাতে নিতেই তার মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল, হেমা মিস কল দিয়েছে।

সে দরজা খুলে দিল।

হেমা উর্মীকে দেখে চমকে উঠল, কি রে ঘুমাসনি?

উর্মী কিছু বলল না।

কেন? ঘুমাসনি কেন? কী হয়েছে?

উর্মী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, কিছু হয়নি।

কিছু হয়নি মানে? নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে?

কিছু হয়নি রে এমনিতেই মনটা খারাপ।

আজ কি তোর শুভ্রর সঙ্গে কথা হয়েছে?

হ্যাঁ।

কী বলল?

কিছু না, আসলে শুভ্র খুব ভালো, আমার খুব ভালো বন্ধু।

শুধুই বন্ধু নাকি আরো বেশি কিছু?

সে তো বেশি কিছু হতেই চায়।

তবে।

আমি কারো করুণার পাত্র হতে চাই না রে।

আচ্ছা বুঝছি অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমা।

না ঘুম আসছে না, তুই ঘুমাবি?

কেন কিছু বলবি?

হেমা তোর কি শুভ্রকে পছন্দ হয়েছে?

উর্মী শুভ্রকে আমার পছন্দ হয়েছে কি না তারচেয়ে শুভ্র আমাকে পছন্দ করেছে কি না সেটা বেশি জরুরী।

হ্যাঁ তুই অবশ্য ঠিকই বলেছিস।

 

সতেরো

 

শুভ্র বাসায় ফিরল মলিন মুখে। বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তিকের কাছে গেল।

শুভ্র কোন কথা বলল না। সে তার রুমে চলে গেল। তার কম্পিউটারে একটা রবীন্দ্র সংগীত চালু করে দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে নানান কথা ভাবতে লাগল, আসলে কি মায়া আর উর্মী এক না? আমি মায়াকে ভালোবাসতাম, উর্মীকে আমি ভালোবাসি না কিন্তু ক’দিন আগে জানলাম উর্মীর বড় বোন আছে। সেদিন থেকে একটা দুশ্চিন্তা আমি মাথা থেকে সরাতে পারছি না। উর্মী যদি মায়া না হয় তবে আমি এতদিন সময় নষ্ট করলাম কি জন্য? আমি উর্মীর পরিচয় নিয়ে অনেকদিন কথা বলেছি কিন্তু সে কোনদিন স্পষ্ট করে বলেনি যে সে মায়া না। এত রহস্য কেন? আসলে উর্মী একটা রহস্যময়ী মেয়ে।

প্রান্তিক মন খারাপ করে বলল, আম্মু আমি চাচ্চুর কাছে গেলাম চাচ্চু একটা কথাও বলল না।

শুভ্র তো এমন করে না। প্রান্তিক, প্রান্তিক বলে ডাকতে ডাকতে বাসায় ঢুকে সবাই একসঙ্গে বসে চা খাই। তারপর প্রান্তিককে নিয়ে তার রুমে গিয়ে কম্পিউটারে বসে। আজ আবার এমন আচরণ করল কেন?

সুরভী শুভ্র শুভ্র বলে ডাকতে ডাকতে তার রুমে গিয়ে তার কপালে হাত দিয়ে বলল, জ্বর টর হয়নি তো?

না ভাবী।

তবে এই অসময়ে শুয়ে আছিস কেন?

শুভ্র কোন কথা বলল না।

সুরভী বলল, চুপ করে শুয়ে আছিস কেন? এমন কি কথা যে আমাকে বলা যাবে না।

ভাবী আজ উর্মীকে তার এক আপার সঙ্গে কথা বলতে শুনলাম।

হ্যাঁ তাতে কি হয়েছে?

তাতে কী হয়েছে মানে? উর্মীর কথা শুনে বুঝলাম সে খুব অসহায়, আপা ছাড়া  তার খোঁজ খবর নেবার আর কেউ নেই কিন্তু মায়ার কোন বড় বোন ছিল না, সে ছিল প্রতিষ্ঠিত পরিবারের মেয়ে, ঢাকা শহরে তার খবর নেওয়ার লোকের অভাব ছিল না।

তুই এক কাজ কর, উর্মীর পার্সোনাল ফাইল দেখ।

ইম্পসিবল, উর্মী এডিটরের খুব কাছের মানুষ, প্রায় এডিটর উর্মীকে ডেকে পাঠায়। কোন কারণে যদি তথ্য ফাঁস হয়ে যায় যে আমি উর্মীর পার্সোনাল ফাইল দেখার চেষ্টা করেছি তবে আমার চাকরিটাই চলে যেতে পারে।

তাহলে উর্মীর কাছ থেকে জানতে চা সে আসলে মায়া কী না? স্পষ্ট করে জানতে চাবি কিংবা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তাকে দেখতে চাবি।

জানি না এটা সম্ভব কি না?

তবে কি সেই ছোটবেলার কোন মেয়েকে একবার দেখেছিস তাকেই বিয়ে করতে হবে। সে ছাড়া দুনিয়াতে আর কোন সুন্দর, শিক্ষিত মেয়ে নেই। আজকাল ছেলেমেয়েরা কতজনের সঙ্গে প্রেম করছে আবার হাসতে হাসতে বিদায়ও করে দিচ্ছে আর তুই একটা মেয়ে ছাড়া আর কাউকে চোখেই দেখিস না। আব্বা বলে গেছে দু’য়েক মাসের মধ্যে তোর ডিসিশন জানাতে। এখন আয় চা খাবি।

 

নকশী প্রথমে উর্মীর প্রতি শুভ্রর ভালোবাসা পরীক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছিল। পরীক্ষা করতে গিয়ে উর্মীর কাছ থেকে শুভ্রর প্রশংসা শুনতে শুনতে আর শুভ্রর ব্যক্তিত্ব দেখে নকশী অনেকটা অবাক হয়েছে। নকশী কাউকে আগ বাড়িয়ে এস.এম.এস দেওয়া তো দূরের কথা কাউকে কোনদিন একটা মিস কলও দেয়নি। তারপরও কেমন করে যেন তার মোবাইল নাম্বার কিছুদিন পর পর অনেক ছেলের হাতে চলে যায়। হয়ত রিচার্জ করার সময় কেউ নাম্বার টুকে নেয় কিংবা এমনিতেই কল দিয়ে মেয়ে কণ্ঠের কথা শুনে সুযোগ পেলেই দিন-রাত উত্যক্ত করতে থাকে, ফ্রেন্ডশিপ কিংবা প্রেমের প্রস্তাবও দেয় আবার কোন বখাটে ছেলে আজবাজে এস.এম.এস পাঠিয়ে দেয়। নকশী শুভ্রর বেলায় ব্যতিক্রম পেল।

নকশীর ইচ্ছা হলো একবার শুভ্রর সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু এটাও কি সম্ভব? শুভ্র তো তার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না তার সঙ্গে দেখা করা কি কম কথা? আসলে শুভ্রকে এভাবে তার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষা করা ঠিক হয়নি। শুভ্র যদি তার ডাকে সাড়া দিত তবে একটা ভদ্র ছেলে তার কলিগ-এর কাছে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যেত, না নকশী আর শুভ্রকে পরীক্ষা করবে না। আজ রাতে তো শুভ্রকে মোবাইল করার কথা, সেই সন্ধ্যা থেকেই নকশী শুভ্রকে মিস করছিল কিন্তু শুভ্র বিরক্ত বোধ করতে পারে তাই মোবাইল করেনি। আসলে শুভ্র কি নিজেকে খুব বড় ভাবে?

নকশী শুভ্রকে মোবাইল করল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে শুভ্রর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, বলুন।

নকশী জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বিরক্তবোধ করছেন?

না বিরক্ত বোধ করবো কেন?

না সকালবেলা বলেছিলেন আমি রিং না করলেই আপনি খুশি হবেন তারপরও আমি রিং করেছি বলে।

না বলুন আমি বিরক্ত হচ্ছি না।

কেমন আছেন আপনি?

ভালো, আপনি?

ভালো।

কি করছিলেন?

আপনার কথা ভাবছিলাম।

আমার কথা ভাবছিলেন মানে?

কেন আমি কি আপনার কথা ভাবতে পারিনা।

আপনার কথা শুনে খুব খুশি হলাম, তা হঠাৎ করে আমার কথা ভাবতে শুরু করলেন কেন?

আপনি আমার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করতে চাচ্ছেন, আমাকে সুন্দর সুন্দর ম্যাসেজ পাঠাচ্ছেন। তাতে আমিও ইন্সপায়ার্ড হচ্ছি।

রিয়্যালি?

কিন্তু একটা কথা কি জানেন?

কী কথা?

আপনি আমাকে সুন্দর সুন্দর এস.এম.এস পাঠাচ্ছেন, মোবাইল করছেন আর আমি আপনাকে এভয়েড করছি, আমার মনে হয় এটা আমার ঠিক হচ্ছে না। আসলে তার আগে আমাদের ভালোভাবে পরিচয়টা হওয়া উচিৎ।

আমি নকশী, এবার হোম ইকনোমিকস থেকে নিউট্রিশন এন্ড চাইল্ড হেলথ-এ অনার্স পাস করে এখন একটা এন.জি.ও’তে কাজ করছি। আমাদের গ্রামের বাড়ি রাজশাহী, রাজশাহী শহরে বাবার ব্যবসা আছে, উপশহরে আমাদের বাড়ি। আমরা এক ভাই-এক বোন। আমি বড়।

শুভ্র বলল, আপনি তো বোধ হয় আমাকে চিনেন?

চিনি না তা না আবার যে ভালোভাবে চিনি তাও না।

কেন? আপনি আমার মোবাইল নাম্বারযার কাছে পেয়েছেন তার কাছে নিশ্চয়ই আমার পরিচয়ও পেয়েছেন,ও ভালো কথা আপনি আমার মোবাইল নাম্বার কার কাছ থেকে পেয়েছেন বলুন তো?

সেকথা না হয় সাক্ষাতে বলব, এখন আপনার পরিচয়টা একবার আপনার মুখ থেকে শুনি।

আমি শুভ্র, ঢাকা ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছি কিন্তু সে বিষয়ে চাকরি পাইনি তারপর কম্পিউটার কোর্স করে এখন একটা পত্রিকা অফিসে কাজ করছি। বাবা রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী। আমাদের গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলার আতাইকুলা উপজেলায়। আমরা দু’ভাই আমি ছোট। বড় ভাইও এম.বি.এ করে এখন একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। ভাই, ভাবী আমার ভাতিজা প্রান্তিক আর আমি, এই চারজনকে নিয়ে আমাদের সংসার। আরেকজন শীঘ্রই আসবে।

মানে?

মানে আমি বিয়ে করবো না? আমার জন্য ভাই-ভাবী এবং আমার অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনরা মেয়ে দেখছেন।

আপনার কোন পছন্দ নেই?

সে এক অদ্ভুত ব্যাপার।

কি রকম?

শুভ্র মায়ার সঙ্গে তার লেখাপড়া থেকে শুরু করে চাকরি জীবনে আবার পরিচয় হওয়ার কথা বলল।

আপনি চিনতে পারছেন না?

আরে চিনতে পারব কি করে? সে তো সব সময় বোরকা পরে থাকে। যেন তেন বোরকা না একেবারে নাক ঢাকা বোরকা তারপর আবার চোখে চশমা। চেনার কোন উপায় নেই।

স্ট্রেঞ্জ!

আপনি মেয়েটাকে বলেননি যে আপনি মায়া কি না?

অনেকবার কৌশলে বুঝাতে চেয়েছি কিন্তু সে একথা বললেই এড়িয়ে যায়। মেয়েটা খুব মিস্ট্রিয়াস।

আসলে মানুষের জীবনে বিয়ে একবারই হয় এটা খুব দেখেশুনে, ভেবেচিন্তে করতে হয় কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি এখনো সেই আবেগ ধরে রেখেছেন এটা ভালো তবে আবেগের বশে বিয়ে করা ঠিক না। অবশ্য বিষয়টা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত।

না আমি তার জন্য আর সময় নষ্ট করতে চাচ্ছি না।

খুব আনন্দের কথা। তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলুন, আমাকে দাওয়াত দিতে ভুল করবেন না কিন্তু।

কনেটা তো আপনিও হতে পারেন?

আপনি তো আমাকে দেখলেনই না, তাতেই আমাকে বিয়ে করবেন?

দেখিনি কিন্তু দেখব, আপনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন না?

নকশী একটু হাসল, তারপর মনে মনে বলল, মেঘ না চইতেই জল।

নকশীর কোন সাড়া না পেয়ে শুভ্র বলল, কি কথা বলছেন না যে?

হ্যাঁ অবশ্যই কিন্তু কবে কোথায়?

যে কোন দিন, কোন রেস্টুরেন্টে?

ওকে।

নকশী মোবাইল রেখে দিল।

নকশীর দরজায় নক করার শব্দে সে দরজা খুলে দিল, হেমা আপা।

হ্যাঁ তুই ঘুমাসনি?

না।

নকশী তাড়াতাড়ি তার মোবাইলের কল রেকর্ড থেকে শুভ্রর নাম ডিলিট করে দিল।

কার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বললি?

আমার এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে।

কোন ফ্রেন্ডের সঙ্গে?

নকশী আপা বলে মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝালো এটা তার জিজ্ঞেস করা ঠিক হয়নি।

হেমা বলল, সরি নকশী তোর ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলা আমার ঠিক হয়নি, তুই ঘুমা।

হেমা নকশীর রুম থেকে বের হয়ে তার নিজের রুমে গেল।

উর্মী তখন মলিন মুখে বিছানায় শুয়ে ছিল।

হেমা উর্মীর বিছানার কোণায় গিয়ে বসল।

উর্মী জিজ্ঞেস করল, কি রে কার সঙ্গে কথা বলছিল?

হেমা কিছু বলল না, তবে তার মুখ দেখে বোঝা গেল সে শুভ্রর সঙ্গেই কথা বলছিল।

হেমা বলল, উর্মী আমাদের নকশীকে দিয়ে শুভ্রর ভালোবাসা পরীক্ষা করতে দেয়া ঠিক হয়নি। আমাদের বয়স হয়েছে কিন্তু কাজটা হয়েছে অত্যন্ত ইমমেচূর্ড-এর মতো। আসলে ভালোবাসায় তৃতীয় পক্ষ থাকা ঠিক নয়। বেশিরভাগ সময় তৃতীয় পক্ষ নিজেই কোন পক্ষের স্থান দখল করে।

উর্মীর চোখ থেকে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে চোখ মুছে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, শুভ্ররই বা দোষ কিসের? ওতো অনেকদিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছে, ওরা যদি পরস্পরকে ভালোবাসে, বিয়ে করে তবে তো ভালো শুভ্রকে বিয়ে করতে না পারি ইন্ডাইরেক্টলি ওর তো উপকারে আসলাম।

 

আঠারো

 

শুভ্র সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এক সঙ্গে তার মাথায় অনেকগুলো চিন্তা ভিড় করছে। বাবা, ভাই-ভাবী সবার ইচ্ছা সে বিয়ে করে ঘরে বউ নিয়ে আসুক। যাওয়ার আগে সাইফুল সাহেব বার বার করে শুভ্রকে বিয়ে করার জন্য বলে গেছেন। সুরভী এবং তার পক্ষের আত্মীয় স্বজনরা প্রায়ই একটার পর একটা সম্বন্ধ নিয়ে আসছে আর শুভ্র বিভিন্নভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে আর কতদিন? বয়সও তো কম হলো না। মায়াই হোক আর উর্মীই হোক তার সঙ্গে পরিচয় না হলে এতদিন হয়ত শুভ্র বিয়ে করেই ফেলত। বলা যায় পথিমধ্যে উর্মী বিঘ্ন ঘটাল। এখন উর্মী আসলে মায়া কি না তা নিশ্চিত হওয়ার পরই শুভ্র সিদ্ধান্ত নিবে।

এমনি একটা সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে হঠাৎ করে নকশী তার মাঝে জড়িয়ে পড়ল।

নকশী প্রগ্রেসিভ, কথাবার্তায় আধুনিকতা আছে, মনের দিক থেকে বড় বলেই শুভ্রর মনে হয়, মোবাইলে কথা বলেই যেন সে শুভ্রকে আপন করে নিয়েছে এটা হয়ত তার উদারতা আর উর্মী রহস্যময়, নকশী কয়েকবার মোবাইলে কথা বলে তাকে যতটা আপন করে নিয়েছে উর্মী দীর্ঘদিন তার পাশাপাশি ডেস্কে কাজ করেও তার সামান্যতম স্থানও দখল করে নিতে পারেনি। নকশীর সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে শুভ্রর খুব কাছের মানুষ মনে হয় আর উর্মীর সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে শুভ্রর অন্য গ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হয়। তারপরও শুভ্র শুধুমাত্র তাকে মায়া মনে করে অনেকদিন অপেক্ষা করেছে আর সে অপেক্ষা করতে চায় না। আবার মায়া উর্মী কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায় না।

শুভ্রর মোবাইল রাতে ঘুমানোর সময় রিংগার অফ করা থাকে। পরদিন সকালবেলা সে তার মোবাইলের কল রেকর্ড দেখে।

আজ সকালবেলা মোবাইলের কল রেকর্ড দেখতে গিয়ে শুভ্র তার মোবাইলের এস.এম.এস এর ইন বক্সে একটা ম্যাসেজ পেল।

নকশী লিখেছে

One stone is enough to break glass,

One sentence is enough to break heart,

One second is enough to fall in love,

One friend is enough to makes happy life.

Nokshi.

এস.এম.এসটা সেন্ড করেছে রাত তিনটায় এস.এম.এসটা পড়ে শুভ্র আপন মনে একটু হাসল, বাঃ সুন্দর লিখেছে তো।

শুভ্র একবার মোবাইলের ঘড়িতে সময় দেখল, সকাল সাতটা বাজে।

এত সকালে নকশীকে মোবাইল করবে? সে তো রাত তিনটার পর ঘুমিয়েছে, তবুও এমন সুন্দর একটা এস.এম.এস পাবার পর অন্তত: তাকে একবার থ্যাঙ্কস জানানো উচিৎ।

শুভ্র মোবাইল করল।

একবার রিং হতেই নকশী মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো, হাউ আর ইউ?

হ্যাঁ ভালো, আপনি?

ভালো।

আপনার সুন্দর একটা এস.এম.এস পেয়েছি, থ্যাঙ্কস এ লট।

আমি এখন সেই এক সেকেন্ড সময়ের জন্য ওয়েট করছি।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, নকশী আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

বলুন।

আপনার এস.এম.এসগুলো খুব সুন্দর।

একথা আপনি আগেও বলেছেন।

হ্যাঁ বলেছি, এখন একটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে এই এস.এম.এসগুলো কি আপনার মনের কথা?

অবশ্যই, আপনি একটা কথা মনে রাখবেন, আমি কখনো মুখে একটা আর মনে আরেকটা এভাবে কোন কাজ করতে পারিনা। মুখে যা বলি সেটাই আমার মনের কথা। আমি তো আপনার কাছ থেকে সেই এক মিনিট সময় চাচ্ছি, তারপরই আপনি বুঝতে পারবেন, আমার চোখের দিকে তাকালেই আপনার কাছে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে।

তাই নাকি?

আসুন না আজ একবার?

কোথায়? কখন?

আপনি বলুন?

আপনার অফিস শেষ ক’টায়?

পাঁচটায়, আপনার?

আমারও তো অফিস শেষ পাঁচটায়?

আপনার অফিস কোথায়?

ফার্মগেট।

শুভ্র বলল, তাহলে আপনি ছ’টায় চলে আসুন, বসুন্ধরা সিটি’তে।

ওকে।

 

উর্মী আগে অফিসে পৌঁছেছে। সে মাথা নত করেই শুভ্রর দু’য়েকটা কথার জবাব দিয়েছে।

শুভ্রর হাতেও কাজের চাপ তাই সেও আজ খুব কম কথা বলেছে তবে আজ শুভ্রর মনটা ভালো। প্রতিদিন উর্মীর সঙ্গে তার কথা বলার যে কৌতূহল থাকত আজ আর তেমন নেই। তবু অভ্যাসবশত: অনেকক্ষণ কাজ করার পর উর্মীর দিকে চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিয়ে একটা নিঃশ্বাস টেনে বলল, উর্মী আজ তোমার হাতে কাজ বেশি নাকি?

উর্মী শুভ্রর দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল, উর্মী তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি কি অসুস্থ?

না।

তোমার চোখ দু’টা তো বেশ লাল, কোন অসুখ করেছে নিশ্চয়ই।

না আমার কিচ্ছু হয়নি।

তবে তোমার চোখ লাল কেন?

বলছি তো আমার কিচ্ছু হয়নি।

উর্মী আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছ?

উর্মী বিরক্তির সুরে বলল, শুভ্র তুমি কিন্তু আমাকে নিয়ে বেশি ভাবো, এটা অট লুকিং দেখায়। অফিসে তো আরো অনেকে আছে তাদের নিয়ে তো কোনদিন ভাবো না, কাউকে তো কোনদিন ভালো-মন্দ জিজ্ঞেসও করো না, আমি মেয়ে দেখে আমাকে করুণা দেখাও। আমি তোমার এমন কে যে আমার সবকিছু তোমাকে বলতে হবে? আমি তো অনেক কিছু লুকাতেই পারি, প্রাইভেসি বলে একটা কথা আছে আর আমরা একসঙ্গে কাজ করলেও আমাদের দু’জনের মধ্যে অনেক লিমিটেশন আছে, ইচ্ছা করলেই তুমি লিমিট এক্সিড করে আমার প্রাইভেসি ব্রেক করতে পার না।

সরি উর্মী আমি তোমার কাছ থেকে এ রকম উত্তর আশা করিনি। আসলে তুমি খুব মিস্ট্রিয়াস, সবকিছু নিয়ে রহস্য সৃষ্টি কর। সহজ হতে চেষ্টা কর, সবার সঙ্গে খোলামেলা হতে চেষ্টা কর, ভালো লাগবে তবে আমার মনে হয় তোমার সাইক্রিয়াটিক দেখানো উচিৎ।

তারমানে আমি এবনরমাল?

না এবনরমাল না, তবে নরমালও না।

দেখ তোমাকে রেগে যাবার মতো আমি কিছু বলিনি অথচ তুমি রেগে গেলে, আসলে তুমি সব সময় নিজেকে খুব বড় ভাবো আর মনে করো দুনিয়ার সমস্ত পুরুষ তোমার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সবাই তোমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে, পুরুষ মানুষ সম্পর্কে তোমার ধারণা ঠিক না।

আমি বোরকা পরি সেজন্য তুমি আমাকে এভাবে বলছ, তুমি জানো আমি পুরুষ মানুষকে হিংস্র মনে করি নাকি শ্রদ্ধা করি? আমি যে পুরুষ মানুষকে কত শ্রদ্ধা করি তা যদি তুমি জানতে তবে বুঝতে? আর কেন বোরকা পরি তা যদি তুমি জানতে তবে এভাবে মন্তব্য করতে পারতে না।

তবে সবকিছু বলছ না কেন?

কী বলব?

কে তুমি মায়া না উর্মী?

আমি যদি মায়া না হয়ে উর্মী হই এবং তুমি আমার কোনদিনও পরিচিত ছিলে না।

তবে আমি তোমাকে আর কোনদিন তোমার ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবো না।

আমি যদি মায়া হই?

তবে একদিন আমি যাকে মনে মনে ভালোবেসেছিলাম তাকে আজ প্রকাশ্যে ভালোবাসবো তাকে বিয়ে করে বউ বানাবো।

কিন্তু আমি মায়া একথা জানার পরও তুমি যদি বিয়ে করতে না চাও?

অসম্ভব।

শুভ্র আমি মায়া নাকি উর্মী সেটা তুমিই আবিষ্কার করবে। তবে আমাকে আবিষ্কারের পর তুমি কি করবে সে দায়িত্ব তোমার, আমার বিশ্বাস আমি যদি মায়াও হই তবুও তুমি আমাকে বিয়ে করবে না। যা হোক তোমার সন্দেহটা দূর করা দরকার। প্রথম চাকরির দিন থেকে তুমি বিষয়টা বিভিন্নভাবে জানতে চেষ্টা করেছ। আমাকে আর ক’দিন সময় দাও প্লি­জ।

ওকে।

শুভ্র আমার মনটা ভালো নেই তাই তোমার ওপর রাগ করেছি, প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবে না।

শুভ্র আর কোন কথা বাড়াল না। সে আবার তার কাজে মনোযোগ দিল।

আজ কাজের চাপ একটু বেশি ছিল। শুভ্র তাড়াহুড়া করছিল।

নকশী মোবাইল করল ঠিক পাঁচটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে।

শুভ্র মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো।

স্যার আপনার কি অফিস শেষ হয়েছে?

শুভ্র আমতা আমতা করে বলল, না এই আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি ফ্রি হবো।

আমি রওয়ানা হলাম।

শুভ্র বাধা দিয়ে বলল, প্লিজ একটু সময় দিন, আমি বের হয়ে আপনাকে রিং দিব।

আচ্ছা ঠিক আছে।

শুভ্র মোবাইল রাখার পর উর্মী জিজ্ঞেস করল, তোমার কি আজ বাইরে কোন কাজ আছে?

না, ঠিক কাজ না।

তোমার যদি কোন তাড়া থাকে আর কাজের চাপ বেশি থাকে তবে আমি তোমাকে হেল্প করি?

নো থ্যাঙ্কস।

উনিশ

 

নকশী বসুন্ধরা সিটিতে ঢুকেই ঘড়ির দিকে তাকাল। কারো জন্য অপেক্ষা করতে সে খুব বিরক্ত বোধ করে, গেট দিয়ে ঢুকতেই একটা ছেলে তার চোখে পড়ল। ছেলেটা বেশ সুন্দর, হ্যান্ডস্যাম কিন্তু হেমা এবং উর্মীর মুখ থেকে সে শুভ্রর চেহারার যে বর্ণনা শুনেছে তাতে এই ছেলেটার কোন মিল নেই, তবু সে শুভ্রর মোবাইলে রিং দিল, শুভ্র আপনি কোথায়?

এই তো কেবল অফিস থেকে বের হলাম।

আচ্ছা আপনাকে আমি কিভাবে চিনব বলুন তো।

আমি লম্বা, গায়ের রং ফর্সা, নেভি ব্লু শার্ট আর এস কালারের প্যান্ট পরে আছি। আমি আপনাকে আমি কীভাবে চিনব?

আমি এখন নীচে দাঁড়িয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। সবাই আমার দিকে যেন কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে। আমি এখানে থাকব না, আমি একটা ফার্স্ট ফুডের দোকানে বসে আপনাকে সেই দোকানের ঠিকানা বলব আপনি সেখানে চলে আসবেন। আর হ্যাঁ আমি মেরুন কালারের জর্জেট কাপড়ের থ্রি-পিস পরে আছি, আমার হাতে একটা জিনিস থাকবে যা দেখলেই আপনি আমাকে চিনবেন যে আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি। তাছাড়া দু’জনের হাতেই তো মোবাইল আছে। আপনার আর কতক্ষণ সময় লাগবে? বলুন তো?

এই দশ মিনিট।

আচ্ছা ঠিক আছে।

নকশী লিফট দিয়ে সোজা উপরে উঠে গেল। একবার সমস্ত ফ্লোরটা ঘুরে দেখল, তারপর একটা ফার্স্ট ফুডের দোকানে ঢুকতেই চোখে পড়ল জোড়ায় জোড়ায় তরুণ-তরুণীরা গল্প করছে, কেউ বা খাচ্ছে। কেউ তার প্রিয় মানুষটির চোখে চোখ রেখে কথা বলছে আর কেউ বা লুকোচুরি করে কথা বলছে। আসলে যে চোখে স্বপ্ন থাকে সে চোখ বোধ হয় সহজে চেনা যায় আর যে চোখে ছলনায় থাকে সে চোখ চেনা যায় না, সে চোখ কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস পায় না।

নকশী হাঁটতে হাঁটতে শেষ দিকের একটা দোকানে সামনের দিকে মুখ করে বসল। নকশী মনে মনে ভাবছিল, কিভাবে প্রথম কথা বলতে শুরু করবে, কি বলবে আর সেই বা কি কথার কি জবাব দিবে? অবশ্য নকশীর মধ্যে তেমন জড়তা নেই খুব সহজে কথা বলতে পারে কিন্তু আজকের পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন।

শুভ্র দেখতে কেমন? সুন্দর তো? সে বলেছে তার গায়ের রং ফর্সা কিন্তু এট্রাক্টটিভ তো? অনেক ফর্সা মানুষ আবার ফ্যাকাসে হয়, কিছুটা রুগী রুগী টাইপের, শুভ্র সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারে তো?

একটা ছেলে আসছে, লম্বা, ফর্সা, এট্রাক্টিভ। এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে, মনে হয় কাউকে খুঁজছে। নকশীর বুকটা ধক ধক করছে, এ যেন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। মনে হলো যেন এই শুভ্র, তাকেই খুঁজছে।

নকশী শুভ্রর মোবাইল রিং দিল।

হ্যাঁ, ছেলেটার মোবাইলটা বেজে উঠল।

নকশী ডাক দিল, হ্যালো শুভ্র।

শুভ্র এগিয়ে এলো।

পরস্পরের চোখে চোখ পড়ল।

প্রথম দৃষ্টি বিনিময়েই নকশী যেন শুভ্রর মাঝে হারিয়ে গেল। সে অষ্ফুটস্বরে বলল, প্লিজ বসুন।

শুভ্র বিনয়ের সঙ্গে বলল, সরি আপনাকে অনেকক্ষণ আমার জন্য ওয়েট করতে হলো।

আমি কিছু মনে করিনি।

আসলে একটু কাজের চাপ বেশি ছিল তাই আসতে দেরি হলো, তাছাড়া আমি সাধারণত সময়ের ব্যাপারে হের-ফের করি না।

শুভ্র এত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, বলুন আপনি কেমন আছেন?

ভালো, আপনি?

হ্যাঁ ভালো।

আসলে আমাদের পরিচয়টা অদ্ভুতভাবে হয়েছিল তাই না? কিছুটা নাটকের মতো।

হ্যাঁ শুধু প্রথম পরিচয়টাই না, আজকেরটাও।

নকশী মুচকি হেসে বলল, টেকনোলজির সুবাদে আজকাল মোবাইলে প্রেম, বিয়ে সবকিছুই হচ্ছে। আমার পরিচিত এক মেয়ের মোবাইলে প্রথমে পরিচয় হয়েছিল, তারপর প্রেম, বিয়ে। এখন বেশ সুন্দর সংসার করছে।

নকশীর হাসিটা খুব সুন্দর, হাসবার সময় গালে টোল পড়ে, অপর পাশে চিবুকে একটা কালো তিল আছে যা তার সৌন্দর্যকে সহস্রগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শুভ্রর একবার বলতে ইচ্ছা করল, সে নকশীকে বলবে আপনার হাসিটা খুব সুন্দর।

নকশী জিজ্ঞেস করল, কী ভাবছেন?

কিছু না।

আপনি কিন্তু চালাকি করছেন, আসলে আপনি কিছু ভাবছেন, আপনি কয়েক মুহূর্ত এ জগতে ছিলেন না।

হ্যাঁ বলুন।

কী বলছিলাম বলুন তো?

ঐ যে প্রযুক্তির সুবাদ।

হ্যাঁ ছেলেটা বন্ধু চাই লিখে টাকায় তার মোবাইল নাম্বার লিখে দিয়েছিল, সেই নাম্বার দেখে মেয়েটা মোবাইল করেছে তারপর দেখা সাক্ষাত, প্রেম, শেষ পর্যন্ত বিয়ে।

একেই বলে প্রযুক্তির সুবাদ।

নকশী বলল, কী খাবেন বলুন?

আপনি নিউট্রিশন এন্ড চাইল্ড হেলথ নিয়ে লেখাপড়া করেছেন, কাজেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আপনার পছন্দই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নকশী মুচকি হেসে প্রাইজ লিস্টটা নিয়ে চলে যাচ্ছিল, শুভ্র বলল, আপনি যাচ্ছেন কেন? আপনি বসুন আমি যাচ্ছি।

নকশী শুভ্রর কথা না শোনার ভান করে চলে গেল।

কয়েক মিনিটের মধ্যে নকশী ট্রেতে করে খাবার নিয়ে এলো।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, আপনি আনতে গেলেন কেন?

কেন অসুবিধা কী?

শুভ্র মনে মনে হাসল।

নকশী বলল, আমি মেয়ে বলে।

শুভ্র মনে মনে বলল, কি ব্যাপার আমার মনের কথা নকশী বুঝল কীভাবে?

নকশী বলল, আপনি হয়ত মনে করছেন আমি আপনার মনের কথা বুঝতে পারলাম কীভাবে?

এক্সাক্টলি।

আমার এক কলিগ আছে ওর কাছ থেকে একটা গল্প শোনার পর থেকে এই বিষয়টা আমি অনুমান করছি।

কী গল্প?

আমার এক কলিগ অনেকদিন পর তার স্কুল জীবনের এক বান্ধবীকে খুঁজে পেল। দু’জনে দেখা হলো, কয়েকদিন কথাবার্তাও হলো। মেয়েটা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে, অনেক টাকা বেতন পায় আর আমার কলিগটা বেশি বেতন পায় না। যাহোক একদিন আমার কলিগকে তার বান্ধবী রিকোয়েস্ট করল, সোনারগাঁও বেড়াতে যাবে, অবশ্য তাদের রিলেশনটা ছিল খুব আন্তরিকতাপূর্ণ এবং বিশ্বস্ত।

ব্যাস একদিন দু’জনে চলে গেল, সোনারগাঁও।

তারপর।

সারাদিন দু’জনে সোনারগাঁও ঘুরে বেড়াল, সারাদিন যত খরচ হলো সব আমার কলিগই দিল।

হ্যাঁ তাতে কি? শুভ্র জিজ্ঞেস করল।

অবশ্যই অনেক কিছু।

যেমন।

সমস্ত বিল তার বন্ধুকে দিতে না দিয়ে সেই ভদ্র মহিলার কিছু খরচ শেয়ার করা উচিৎ ছিল।

তা ছিল বটে, তবে বিষয়টা বেশি মাইন্ড করার মতো নয়।

অবশ্যই মাইন্ড করার মতো, আমার কলিগও চাকরি করে আর ভদ্র মহিলাও চাকরি করে। আসলে সোনারগাঁও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছাটা ছিল তার বান্ধবীর। তাই সমস্ত খরচ আমার কলিগ-এর ওপর না চাপিয়ে তারও শেয়ার করা উচিৎ ছিল। কিন্তু সে মেয়ে হিসেবে সুবিধা নিয়েছে। সে মনে করেছে তার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে আমার কলিগ নিজেকে ধন্য মনে করেছে। আমার কলিগ বেচারা খুব সহজ-সরল। সে কষ্ট হলেও কিছু বলেনি শুধু মনের কষ্টটা আমাদের কাছে প্রকাশ করেছে।

শুভ্র মৃদু হাসল।

নকশী বলল, আমার মনে হয় বন্ধুত্ব হওয়া উচিৎ সমান সমান। একজন সামনে এগিয়ে আসবে আর অন্যজন রেসপন্স করবে না তা হয় না।

শুভ্র বলল, নকশী আপনার শেষ কথাটা কিন্তু আমাকে মিন করলেন।

নকশী থমকে গেল।

সরি আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আসলে আপনাকে মিন করিনি।

ওকে, এখন বলুন আপনার কথা।

দু’জনে অনেকক্ষণ গল্প করল। নকশী শৈশব থেকে তার জীবনের সমস্ত কথা বলল, তার কথা বলার মধ্যে যেন কোন জড়তা নেই, কোন রহস্য নেই। সে সবকিছু বলল অনায়াসে।

শুভ্রও তার জীবনের সমস্ত কথা বলল, উর্মীর রহস্যজনক আচরণের কথা বলল।

নকশী ট্রে থেকে একটা প্লেট বাড়িয়ে দিল, নিন এটা খান আপনার খুব ভালো লাগবে।

শুভ্র বলল, আচ্ছা নকশী একটা কথা সত্য করে বলুন তো।

আমি মিথ্যা কথা বলি না।

সরি, আচ্ছা বলুন।

আপনি আমার মোবাইল নাম্বার পেলেন কীভাবে?

এটা আপনাকে বলা যাবে না, তবে প্রথমে আমার উদ্দেশ্য ছিল আপনাকে পরীক্ষা করা কিন্তু পরীক্ষা শেষ করার আগে আমি নিজেই ফেঁসে গেছি।

ফেঁসে গেছি মানে?

ওতো মানে আপনার না বুঝলেও চলবে।

আমি যতটুকু জানি আপনি বিয়ে করার জন্য কনে দেখছেন।

হ্যাঁ।

কনে পাওয়া গেছে?

অনেকগুলো কনে পাওয়া গেছে তবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

কেন?

কাউকে পছন্দ হচ্ছে না।

দু’জনে হাসল।

এখন পর্যন্ত না।

শুভ্র মৃদু হাসল।

নাস্তা শেষ হলো, শুভ্র চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে দু’কাপ কফি নিয়ে এলো।

কফি খেতে খেতে নকশী বলল, শুভ্র আপনার সঙ্গে কথার পর থেকে আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল আজ দেখা হলো, কথা হলো ইচ্ছা করেই হোক আর মুখ ফসকেই হোক একটা কথা আমি বলে ফেলেছি কারো সঙ্গে কোন রিলেশন ডেভলাপ করার দায়িত্ব আসলে উভয় পক্ষের সেদিক থেকে আমি মনে হয় অনেকদূর এগিয়েছি এবং আমার ইচ্ছার কথা আপনাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি এখন বাকী দায়িত্ব আপনার।

শুভ্র বলল, আমি বুঝতে পেরেছি নকশী, আপনি খুব ভালো মেয়ে, খুব ভালো।

নাইস টু মিট ইউ, শুভ্র, বলে নকশী হ্যান্ড শ্যাক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল।

শুভ্র হ্যান্ড শ্যাক করার সময় নকশীর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, আপনার এস.এম.এস-এর এক সেকেন্ড এনজয় করেছেন তো?

নকশী শুভ্রর চোখে চোখ রাখল, হ্যাঁ, আপনি?

 

বিশ

উর্মী আর কাউকে ভালোবাসার কথা চিন্তা করতে চায় না।

শুভ্র উর্মীকে ভালোবাসে তার কৈশোরের বান্ধবী মায়া হিসেবে, যাকে সে সুন্দর, লাবণ্যময়, আবেগপ্রবণ, গেছো মেয়ে বলে জানে। কিন্তু আজ উর্মী আর মায়া নেই, তার মুখ দগ্ধ, বিকৃত, আবেগ নেই, যেন দৃষ্টি স্থির।

শুভ্র মায়ার জীবনের পরবর্তী কিছুই জানে না। সে যদি জানে তার মায়ার মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে গেছে, সে যদি জানে মায়ার বিয়ে হয়েছিল অনেকদিন কোন এক যুবকের সঙ্গে সংসার করে জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নিজেকে আড়াল করার জন্য নিজের নামটা পর্যন্ত অ্যাফিডেভিট করে পরিবর্তন করে উর্মী নাম ধারণ করেছে, সে যদি জানে মায়া একটা কলঙ্কিত মেয়ে তবে সে কি তাকে বিয়ে করতে চাইবে? আবার সবকিছু জানার পরও সে যদি উর্মীকে বিয়ে করতে চায় তবে কি উর্মী তাকে বিয়ে করবে? এমনি অসংখ্য চিন্তা উর্মীর মনের মধ্যে ভিড় করল।

সেদিন মায়া তার ছোট চাচার মোবাইল থেকে মামুনের মোবাইলে রিং দিয়েছিল, হ্যালো মামুন।

মামুনের আবেগপ্রবণ কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিল, মায়া, কী খবর?

মামুন আমি বাড়িতে বন্দি হয়ে আছি, আমাকে বাবা জোর করে বিয়ে দিতে চাচ্ছে, আমি কোনভাবে কাউকে বিয়ে করবো না, তোকে ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করবো না মামুন, তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না মামুন।

আমিও তোকে ছাড়া বাঁচবো না মায়া, আমার কাছ থেকে তোকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না মায়া। কেউ যদি তোকে নিয়ে যেতে চায় তবে আমার লাশের উপর দিয়ে তোকে নিয়ে যেতে হবে।

তুই যদি মরে যাস তবে আমাকে নিয়ে যাস। আমরা একসঙ্গে মরবো কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবো না।

তুই চেষ্টা কর মায়া তুই কোনভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে আমরা পালিয়ে যাব, অনেকদূরে পালিয়ে যাব যেখান থেকে কেউ আমাদের ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

কেউ আমাকে দেখে ফেলবে মামুন তুই রেডি থাকিস, আমি তোর কাছে আসলে যেন আমরা পালিয়ে যেতে পারি, এখন রাখি মামুন ভালো থাকিস।

তুইও ভালো থাকিস জান।

সেদিনের কথাই মামুনের সঙ্গে মায়ার শেষ কথা।

মায়ার বয়স সবেমাত্র পনেরো একথা সবার জানা ছিল, বাল্য বিবাহ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, যৌতুক সমাজের অভিশাপ এসব কথা মায়া শুনেছিল অনেক বিশিষ্টজনের কাছ থেকে। তার বিয়েতে অনেক বিশিষ্ট জন দাওয়াতে অংশগ্রহণ করেছিলেন মায়ার যতদূর মনে পড়েছিল সেদিনের দাওয়াতে অনেক অতিথিকে সে দেখেছিল উপজেলা থেকে রেলি নিয়ে নারী নির্যাতন, যৌতুক এবং বাল্য বিবাহ বিরোধী রেলি নিয়ে। অথচ তার বিয়েতে তারা সবকিছু জেনে-শুনেও কেউ এমন একটা আইন এবং সমাজবিরোধী কাজের প্রতিবাদ করেনি।

মায়া বার বার করে জ্ঞান হারাচ্ছিল। কেউ কেউ বলছিল বাপের আদরের মেয়ে তো তাই এমন হচ্ছে, বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কেউ একবার মায়ার মুখ থেকে কিছু শুনতে চায়নি।

কখন বিয়ে কবুল হয়েছে মায়ার মনে নেই।

একবার মায়া জ্ঞান ফিরে দেখতে পেয়েছিল তার পাশে বরবেশে এক অপরিচিত এক যুবক, তারপর সে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।

 

উর্মী চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তার ঘুম আসছে না। অনেকক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করার পর সমস্ত শরীরটা ক্রমশ: শিথিল হয়ে এলো।

নিজের অজান্তেই সে বিড় বিড় করে বলে চলল, শুধু নিজে চলে গেলি আমাকে নিয়ে গেলি না কেন মামুন? যার জন্য তোর লাশের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে আমাকে বাসর রাত কাটাতে হলো এখন সেও আমার নেই, তোর কথা মনে পড়লে আমি বেঁচে থাকার প্রেরণা পাই, রাসেলের কথা মনে পড়লে আমার শরীর শিউরে উঠে, ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠে।

তবুও আমার মনের মধ্যে একটাই সান্ত্বনা যে রাসেল, রেহানা ও তার মা’র জেল হয়েছে। তারা তাদের অপরাধের শাস্তি  পেয়েছে কিন্তু আমি কি অপরাধ করেছিলাম যে আমাকে শাস্তি পেতে হচ্ছে। জীবনের আরো অনেক পথ বাকী, এত দীর্ঘ পথ আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো মামুন, এতগুলো কলঙ্ক নিয়ে আমি কার করুণার পাত্র হয়ে বাঁচবো? আমার এখন কেউ নেই। আমার পাশের বেডে হেমা ছাড়া দুনিয়াতে আর কেউ নেই। এমন নিঃসঙ্গ হয়ে কি মানুষ চলতে পারে? আমি আর পারছি না মামুন তুই আমাকে নিয়ে যা।

হেমা বিছানা থেকে উঠে উর্মীকে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিয়ে বলল, উর্মী, এই উর্মী।

উর্মী বিছানায় উঠে বসল।

কী রে কী হয়েছে? স্বপ্ন দেখছিলি?

উর্মী কিছু বলল না।

হেমা বলল, খুব টেনশনে আছিস? ঔষধ খেয়েছিস?

ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আছে শুধু রাতে একটা করে। একটা তো খেয়েছি কিন্তু তবুও ঘুম আসছে না,আরেকটা খাই, ঘুম না হলে তো আবার বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ব।

হেমা আবার শুয়ে পড়ল।

উর্মী আরো একটা ঘুমের ঔষধ খেয়ে শুয়ে পড়ল।

হঠাৎ করে তার কৌতূহল হলো, দেখি তো শুভ্রর মোবাইল বন্ধ নাকি?

উর্মী শুভ্রর মোবাইলে রিং দিল, শুভ্রর মোবাইল ব্যস্ত।

শুভ্র এত রাতে কার সঙ্গে কথা বলছে? বলতেই পারে আমার জন্য শুভ্র অনেক সময় নষ্ট করেছে, আমি রহস্য সৃষ্টি করে দিনের পর দিন ওর সময় নষ্ট করেছি। আসলে আমার আরো আগে ওকে সবকিছু স্পষ্ট করে বলা উচিৎ ছিল। সরি শুভ্র আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে মুক্তি দিব।

 

নকশীর প্রত্যেকটা এস.এম.এস শুভ্রকে অবাক করেছে। নকশী লিখেছে:

It feels good when some body miss you,

It feels better when somebody love you,

But it feels best when somebody never forget you.

Nokshi.

 

এস.এম.এসটা পড়েই শুভ্র নকশীকে রিং দিল, হ্যালো নকশী।

বলুন এস.এম.এসটা কেমন হয়েছে?

খুব ভালো আসলে আপনি এত সুন্দর করে এস.এম.এস লিখতে পারেন?

দেখুন আমার পাঠানো এস.এম.এসগুলো শুধুমাত্র এস.এম.এস না ওগুলো আমার মনের কথা।

হ্যাঁ তা বুঝছি।

তবে আপনি তো এখনো আমার পাঠানো কোন এস.এম.এস এর রিপ্লাই দিলেন না?

আমি আসলে আপনার মতো সুন্দর করে এস.এম.এস লিখতে পারি না।

মনের ভাব প্রকাশের জন্য সুন্দর ভাষা জানার প্রয়োজন নেই, সুন্দর করে এস.এম.এস পাঠানোরও প্রয়োজন নেই, মুখেও তো একবার বলতে পারেন?

কী বলব?

কী বলবেন তাও জানেন না? আচ্ছা ঠিক আছে আমি এখন থেকে আপনাকে এস.এম.এস এর মাধ্যমে প্রশ্ন করবো আপনি শুধু উত্তর দিবেন, দিবেন না?

উত্তর আমার জানা থাকলে দিব।

আমি একটা এস.এম.এস পাঠাচ্ছি আপনি কিন্তু উত্তর দিবেন।

রাতেই দিতে হবে।

হ্যাঁ, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে পাঠাচ্ছি আপনার উত্তর দিতে খুব বেশি হলে এক মিনিট লাগবে।

আচ্ছা ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিন।

শুভ্র মোবাইল রেখে আবার ইন্টারনেটে ব্রাউজ করছিল।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে শুভ্রর মোবাইলে একটা এস.এম.এস ঢুকল।

Meanings of some color,

Yellow for special friend,

White for peace,

Orange for luck,

Black for hate,

Red for love,

Pink for likeness,

So I choose Yellow for you.

What color you choose for me?

শুভ্র রিপ্লাই দিল, Pink.

 

একুশ

 

সুরভী বিয়ের পর থেকে দেখছে শুভ্র সবার আগে বিছানা থেকে উঠে। সবাই বিছানা থেকে উঠে দেখে শুভ্র কাপড়-চোপড় পরে বাইরে যাওয়ার জন্য রেডি। আজ সকালবেলা বিছানা থেকে উঠতে দেখে সুরভী কয়েকবার দরজা নক করল।

কয়েকবার দরজা নক করার পর শুভ্র’র সাড়া মিলল, কে প্রান্তিক?

এই কীরে?

ভাবী আসছি।

শুভ্র নাস্তার টেবিলে এলো আরো আধ ঘণ্টা পর। ততক্ষণে সৌরভ অফিসে চলে গেছে।

শুভ্র চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ভাবী ভাইয়া চলে গেছে নাকি?

হ্যাঁ নাস্তার টেবিলে তোর জন্য কিছুক্ষণ ওয়েট করল, তুই আসতে দেরি করছিস দেখে চলে গেছে।

কিছু বলেছে নাকি?

না, তুই আসতে দেরি হচ্ছে দেখে একটু হাসল।

হাসল মানে?

হাসল মানে তোর মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা দেখছে তাই।

এতক্ষণ শুভ্র মাথা নিচু করেই কথা বলছিল এবার মাথা তুলতেই সুরভী যেন চমকে উঠল, কী রে তোর চোখ লাল কেন? ভালো ঘুম হয়নি?

শুভ্র কিছু বলল না।

সুরভী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন? কোন সমস্যা?

হ্যাঁ সমস্যা তো বটেই।

সমস্যাটা কি অফিসিয়াল?

অফিসিয়াল না।

তবে?

হৃদয়ঘটিত।

তাহলে তো আনন্দের সমস্যা, আচ্ছা তোর উর্মী না মায়া নাকি নাম মেয়েটার, ওকে তুই দেখেছিস? সে আসলে তোর ছোটবেলার বান্ধবী নাকি অন্য কেউ কনফার্ম হয়েছিস?

না ভাবী এখনো কনফার্ম হয়নি তবে আমি শীঘ্রই কনফার্ম হবো তারপর একটা সিদ্ধান্ত- নিব।

শুভ্র একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আজ দেরি হয়ে গেল, আবার ট্রাফিক জ্যামে না পড়লেই হয়।

উর্মী বার বার করে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। আসলে উর্মীও শুভ্রকে ভালোবেসে ফেলেছে কিন্তু একথা সে শুভ্রকে বলতে চায় না, কোনদিন তাকে মুখ দেখাতেও চায় না, তার একলা চলার পথে, এক বুক কষ্টের সাথে সে শুভ্রকে জড়াতে চায় না কিন্তু শুভ্রকে তার সব সময় মনে পড়ে।

প্রতিদিন শুভ্র আগে অফিসে আসে, উর্মী পরে আসে। এমনকি কোনদিন ট্রাফিক জ্যামের অজুহাতেও দেরি হয়নি। শুভ্রর কিছু কিছু অভ্যাস আছে খুব ভালো, তার মধ্যে একটা হলো সব সময় নেগেটিভ হিসেব করে চলা। শুভ্রর এই অভ্যাসটাও উর্মীর খুব পছন্দ।

একদিন উর্মী জিজ্ঞেস করেছিল, শুভ্র তুমি সব সময় নেগেটিভ হিসেব করে চলো কেন?

কারণ তাতে যে কোন বিপদ এড়িয়ে চলা যায় এবং খুব সহজে সব কিছু মেনে নেওয়া যায়।

যেমন?

এই ধর তুমি মিরপুর থেকে ফার্মগেট আসবে। তুমি যদি মনে মনে হিসেব করো রাস্তায় এক ঘণ্টা জ্যামে পড়তে পার তবে তুমি এক ঘণ্টা আগে রওয়ানা দিবে তাতে করে তুমি ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে। আবার রিলেশনের ক্ষেত্রে তুমি যদি হিসেব করো যাকে তুমি পছন্দ করো বা যার ভালোর জন্য কোন কিছু সেক্রিফাইজ করছ সে একদিন তোমাকে কষ্ট দিবে তবে তুমি আগে থেকেই আঘাত পাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবে তবে সে তোমাকে আঘাত দিলেও কম কষ্ট পাবে।

কিন্তু এত বাস্তববাদী, হিসেবী মানুষটার আজ দেরি হচ্ছে কেন? রাস্তায় কোন সমস্যা হয়নি তো? আজকাল তো প্রায়ই নানান রকম অঘটন ঘটছে।

উর্মী একবার তার মোবাইলে সময় দেখল, এক ঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেছে।

উর্মী শুভ্রর মোবাইলে রিং দিল।

শুভ্র মোবাইল রিসিভ করল না।

কয়েক মিনিটের মধ্যে এক রকম ঝটিকার মতো চলে এলো, উর্মী আমাকে কেউ খুঁজছিল নাকি?

না কেউ খুঁজেনি, কোন সমস্যা নেই।

শুভ্র চেয়ারে বসতে বসতে বলল, যাক বাবা বাঁচা গেল।

শুভ্র তোমার তো কোনদিন অফিসে আসতে দেরি হয় না?

হ্যাঁ আসলে আজ ঘুম থেকে উঠতেই দেরি হয়েছে তাই।

আজ ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হয়েছে, তারমানে সবকিছুতেই ব্যতিক্রম?

শুভ্র কিছু বলল না।

শুভ্র তোমার চোখ লাল কেন? রাতে ভালো ঘুম হয়নি মনে হয়?

হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরেছ।

হঠাৎ এরকম?

শুভ্র বলল, উর্মী কেবল অফিসে আসলাম, আজ কাজ শেষে তোমাকে সব বলব।

উর্মী মুখে কিছু বলল না, তার মনে অসংখ্য চিন্তা ভিড় করল, আমি বুঝতে পেরেছি শুভ্র, তুমি আসলে আমার বিকল্প কাউকে খুঁজে পেয়েছ। তোমারই বা দোষ কীসের? তুমি তো অনেকদিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছ। আরও আগে তোমাকে আমার সবকিছু বলা উচিৎ ছিল। আমাকে তোমার মায়া ভেবে দিনের পর দিন সময় নষ্ট করেছ, তুমি যখন সবকিছু জানবে তখন কী করবে? আমি মায়া নাকি উর্মী? আমি তোমার ছোটবেলার সেই লাবণ্যময়, চঞ্চল, গেছো মেয়ে মায়া নাকি অগ্নি দগ্ধ, বিকৃত মুখের উর্মী? তুমি ভাবছ আমাকে চিনতে পারার পর তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? তোমার সিদ্ধান-হীনতা কেটে যাবে? আসলে তোমার সমস্যা আরও বাড়বে, আমি জানি তুমি আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসো, কনে হিসেবে পছন্দের তালিকায় আমিই প্রথম কিন্তু যখন তুমি দেখবে আমি তোমার মায়া, তবে সেই মায়া না অন্য মায়া? তখন তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে না কিংবা তুমি রাজি হলেও তোমার গার্জিয়ানরা তা মেনে নিবে না, তখন কি করবে? এমনি অসংখ্য চিন্তা মাথায় নিয়ে উর্মী কোনরকমে কাজ করছিল।

শুভ্র উর্মীর সঙ্গে কথা বলা শেষ করে কাজে মনোযোগ দিয়েছিল।

শুভ্র যখন কাজ করে তখন খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করে, যেন কাজের মধ্যে ডুবে যায়। তারপর একটানা অনেকক্ষণ কাজ করে উর্মীর দিকে চেয়ার ঘুরিয়ে নিয়ে দু’য়েক কথা বলে আজও অনেকক্ষণ কাজ করার পর চেয়ার ঘুরিয়ে নিতেই শুভ্রর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

শুভ্র মোবাইলের স্ক্রিনে নকশীর নাম দেখে একবার উর্মীর দিকে তাকাল।

উর্মী একবার শুভ্রর দিকে তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে বাইরে গেল।

শুভ্র মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো।

কেমন আছেন আপনি?

ভালো, আপনি?

হ্যাঁ ভালো হঠাৎ কী মনে করে?

মনে পড়ল তো তাই।

হ্যাঁ আমারও আপনার কথা মনে পড়ছিল।

শুভ্র আপনার কিন্তু আমার কথা মনে পড়েনি, আপনি আমাকে খুশি করার জন্য বললেন। এ্যানিওয়ে এখন অফিস আওয়ার, আপনি মনে হয় ব্যস্ত আছেন এরপর আমাকে মনে পড়লে রিং দিবেন আর যদি আপনি রিং না করেন তবে বুঝব আমাকে আপনার মনে পড়েনি।

আমি এমনিতেই প্রতিদিন পরীক্ষা দিচ্ছি আপনি আবার নতুন পরীক্ষায় ফেললেন?

আমি আশা করি আপনি পাস করবেন?

ওকে, বাই।

কাজ শেষ করে উর্মী শুভ্রকে জিজ্ঞেস করল, শুভ্র তোমার হাতে কি আরও অনেক কাজ আছে? আমি তোমাকে হেল্প করবো?

না, আর দশ মিনিট।

উর্মী বসে রইল।

শুভ্র কাজ শেষ করে বলল, উর্মী তুমি তো জানো আমার গার্জিয়ানরা আমাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছে, তাদের প্রত্যাশাটা অবশ্য অযৌক্তিক না। আমি লেখাপড়া শেষ করেছি, চাকরি করছি, বিয়ের বয়স হয়েছে, এখন বিয়ে করতে হবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের কোন পছন্দ নেই আমি যে কাউকে পছন্দ করলেও তারা তাকেই বউ হিসেবে মেনে নিতে রাজি আছে কিন্তু সমস্যা হলো আমাকে নিয়ে, আমি তাদেরকে না পারছি আমার পছন্দের কথা জানাতে না পারছি তাদের ওপর ভরসা রাখতে। আমি একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আছি, তুমি আমাকে এ বিষয়ে হেল্প করতে পার?

আমি জানি শুভ্র আমার জন্য তোমার ডিসিশনটা হেঙ্গিং হয়ে আছে, আমি তোমাকে হেল্প করতে চাই তবে এভাবে অফিসে বসে আমি তোমার সাথে আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।

তবে।

অন্য কোথাও।

শুভ্র উৎসাহিত হয়ে বলল, যেমন ঢাকার বাইরে, ফ্যান্টসি কিংডম, নন্দন পার্ক কিংবা ন্যাশনাল পার্কে?

হ্যাঁ ন্যাশনাল পার্কে।

কাল তো আমাদের অফিস বন্ধ আছে, চলো কালকেই যাই।

ঠিক আছে।

 

বাইশ

শুভ্র বাসায় ফিরল মুখ ভরা হাসি নিয়ে। আগে সবসময় সে এমনভাবেই বাসায় ফিরত মাঝখানে তার ওপর দিয়ে যে দুশ্চিন্তা বয়ে যাচ্ছিল তা যেন ফুটে উঠত। আজ হাসিমুখে বাসায় ফিরতে দেখে সুরভীও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল।

সে জিজ্ঞেস করল, কী রে হঠাৎ করে তোর মনটা ভালো হয়ে গেল মনে হয়? এমন কী ঘটেছে যে মনটা ভালো হয়ে গেল?

ভাবী তোমাকে বলেছিলাম না উর্মীর কথা।

হ্যাঁ কী হয়েছে উর্মীর?

না আমি আসলে আইডেন্টিফাই করতে পারছিলাম না সে আসলে ‍উর্মী নাকি মায়া?

আইডেন্টিফাই করতে পেরেছিস?

না এখনো করতে পারিনি তবে কাল করতে পারব।

কীভাবে?

উর্মীকে সবকিছু বলেছি, আমার বিয়ে, কনে সিলেক্ট এবং কনে সিলেক্ট করতে তার আইডেন্টি কনফার্ম হওয়া এসব, সবকিছু শুনে সে আমাকে সবকিছু বলার জন্য কাল সময় দিতে চেয়েছে।

কোথায় যাবি?

ন্যাশনাল পার্কে।

হ্যাঁ তোর কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগল, আজ বেশি রাত জাগবি না, আজকাল তো তুই আবার অনেক রাত পর্যন্ত- মোবাইলে কথা বলছিস। জানি না নতুন কাউকে নিয়ে ভাবছিস নাকি?

ভাবী তুমি ঠিকই বলেছ, আমি আরেকজনকে নিয়ে ভাবছি কিন্তু উর্মী মায়া কি না কনফার্ম হওয়ার পর। কারণ মায়াকে আমি মনে মনে ভালোবাসতাম মায়া আর উর্মী যদি একজনই হয় তবে তো খুব ভালো আর যদি উর্মী মায়া না হয় তবে এখন যাকে নিয়ে ভাবছি তাকেই বিয়ে করবো। আসলে একটা কথা কি জানো তোমরা সবাই যেমন দেরি করতে চাচ্ছ না তেমনি আমিও খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান- নিতে চাচ্ছি।

যাক অনেকদিন পর কাল একটা সুসংবাদ তোর কাছ থেকে আশা করছি।

শুভ্রর কিছু ভালো লাগছে না, একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, একটা সিদ্ধান্তহীনতা, পাওয়া-না পাওয়া সমস্ত কিছু আজ যেন তার সামনে পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালকেই তাকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। কে আসবে তার জীবনে মায়া নাকি নকশী? অনেকের কাছে শুনেছে যারা তাদের ভালোবাসার মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পায় তাদের পরস্পরের নিকট থেকে প্রত্যাশা বেশি থাকে, সামান্য অপ্রাপ্তিকে অনেক বড় করে দেখে এবং পরস্পরকে দোষারোপ করে আর যারা পায় না তারা না পাওয়ার বেদনায় সারাজীবন ব্যর্থতায় ভুগে তারা মনে করে তাকে ছাড়া যেন তার জীবন অতৃপ্তই রয়ে গেল। জীবন যেন এক জটিল অংক, একটু ভুল হলেই সবকিছু গড়মিল হয়ে যাবে।

শুভ্র আজ রাতে কম্পিউটারে বসেনি। খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে।

ঘুমাবার ব্যর্থ চেষ্টা।

না, ঘুম আসছে না।

মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

নকশী মোবাইল করেছে।

নকশীকে মোবাইল করার কথা শুভ্রর মনে ছিল কিন্তু করেনি। নকশী তাকে পরীক্ষার কথা বলেছিল তাও শুভ্রর মনে ছিল কিন্তু কেন করল না। শুভ্রর নিজেকে অপরাধী মনে হলো। সাধারণত এমন হয় না, প্রতিশ্রুতি রক্ষার বেলায় শুভ্র খুব সহজে ফেইল করেনা। তার মনের মধ্যে একটা অপরাধ বোধ কাজ করল।

শুভ্র মোবাইল রিসিভ করল না।

রিং শেষ হবার পর নকশীর মোবাইলে রিং দিল।

নকশী রিসিভ করেছে, হ্যালো, কেমন আছেন?

হ্যাঁ ভালো, আপনি?

ভালো, আমি কিন্তু পরীক্ষা করলাম আমার পরীক্ষায় আপনি পাস করতে পারেননি।

সরি নকশী আসলে আপনার কথা আমার খুব মনে পড়ছিল কিন্তু কি করবো বলুন খুব ব্যস্ত ছিলাম।

না কোন এ্যাপোলজি দরকার নেই।

মাইন্ড করেছেন?

আসলে আমাকে রিং করার আপনার সময়ের অভাব ছিল না, আন্তরিকতার অভাব ছিল। আপনার কোন দোষ নেই আমি এখনো আপনার হৃদয় ছুঁতে পারিনি। এই ব্যর্থতা আমার।

দেখুন বিষয়টা এভাবে নিবেন না। সরি আর এমন হবে না।

কিন্তু আমি যে আর কোনদিন আপনাকে রিং করবো না।

কেন?

দেখুন আমি আপনাকে প্রতিদিন রিং করেছি, ম্যাসেজ পাঠিয়েছি, আমি আপনাকে নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছি, আপনি একটুও হাত বাড়ান নি। এটা ঠিক না কারো সঙ্গে রিলেশন হওয়া চাই ফিফটি ফিফটি, দু’জনকে সমান তালে আগাতে হয়। আমি আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে আপনিও আমার দিকে হাত বাড়াবেন এটাই হওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু আপনি হাত বাড়াননি আমি ভিখারির মতো বার বার করে আপনার কাছে একটু সময় চেয়েছি। আপনি আমাকে চরমভাবে অবহেলা করেছেন। আপনার মতো আমাকে কেউ অবহেলা করেনি, ধীরে ধীরে নকশীর গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।

শুভ্র বিনয়ের সঙ্গে বলল, নকশী প্লিজ বিশ্বাস করুন, আমি আসলে খুব বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে আছি, আশা করছি শীঘ্রই সবকিছু কাটিয়ে উঠব।

শুভ্র বাবা আমাকে খুব স্নেহ করে, কোনদিন যে কোন বিষয়ে বাবা আমাকে গলা উঁচু করে কথা বলেনি। একবার বাবা আমার ওপর খুব রাগ করেছিল, আমি সেদিন রাতে ভাত খাইনি, পরদিন আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বাবা আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল। তারপর থেকে বাবা আর কোনদিন আমাকে কিছু বলেনি। আমি অনার্স পাস করার পর বাবা আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু আমি বলেছিলাম আমি আগে লেখাপড়া শেষ করবো তারপর বিয়ে করবো। আপনি বিশ্বাস করুন বাবা আমাকে রিপিট করেনি। অথচ আমি সেই নকশী একটু সময়ের জন্য, একবার মোবাইলে কথা বলার জন্য আপনার কাছে ধর্না দিচ্ছি। মিঃ শুভ্র জানিনা কেন আমি আপনার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি?

শুভ্র বলল, নকশী আপনি আমাকে আর একদিন সময় দিন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

মিঃ শুভ্র আমি বাবা-মা’র আদরের মেয়ে, জীবনে কোনদিন আমার গায়ে ফুলের আঁচড় পর্যন্ত পড়েনি, বাবার কাছে কোনদিন আমি কিছু চেয়ে পাইনি এমন ঘটনা ঘটেনি। বাবা খুব বাস-ববাদী মানুষ, বাবা একটা কথা প্রায়ই বলে, মা এত বড় একটা জীবন, সারাজীবন তো আর এমনভাবে যাবে না। জীবনে ঝড় আসবে, জীবনকে এলোমেলো করে দিবে, সবকিছু ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তারপরও বাঁচতে হবে, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে। মিঃ শুভ্র আমি ভাবতাম আমি তো লেখাপড়া করছি, লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করবো, বিয়ে করবো, সংসার করবো, ব্যাস এই তো শেষ। কিন্তু এখন দেখছি বাবার  জীবনের প্রতি অভিজ্ঞতা অনেক আর আমার জীবনে কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না কিন্তু আমি খামখেয়ালি করে জীবনে একটা ঝড় ডেকে নিয়ে আসলাম।

শুভ্র বলল, নকশী আপনি ধৈর্য ধরুন প্লিজ।

মিঃ শুভ্র আমি আর কোনদিন আপনাকে মোবাইল করবো না, কোনদিন এস.এম.এসও পাঠাব না। তবে আপনার জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা থাকবে যখন ইচ্ছা মোবাইল করবেন। চলে আসবেন আমার কাছে আমি আপনাকে অবহেলা করবো না। আমি আপনাকে শিখাব কিভাবে মানুষকে আপন করতে হয়, কীভাবে মানুষকে হৃদয়ে স্থান দিতে হয়। রাখি আপনি খুব ভালো থাকুন, বলতে বলতে নকশীর কানভাঙা গলার স্বর ভেসে এলো।

হ্যালো, হ্যালো, না নকশী লাইন কেটে দিয়েছে।

শুভ্র আবার নকশীর মোবাইলে রিং দিল, হ্যালো নকশী, কি হলো?

না নকশী মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে।

 

তেইশ

জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। একটা ডালে দু’টা পাখি বসেছিল, ঠিক যেন মুখোমুখি। শুভ্র পায়ের শব্দে পাখি দু’টা উড়ে গেল সমান্তরালভাবে। পাখি দু’টা দিগন্তে হারিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত উর্মী তাকিয়ে রইল। উর্মীর বার বার মনে হলো তারা কি শেষ পর্যন্ত কখনো মিলবে না। এমনভাবে চরে যাবে রেল লাইনের মতো সমান্তরালভাবে। পাখিদের মধ্যেও কি মান-অভিমান হয়? কেউ কারো সঙ্গে কথা না বলে চলে যায়?

শুভ্র উর্মীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, উর্মী।

উর্মীর যেন ধ্যান ভাঙ্গল, ও হ্যাঁ।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, উর্মী কি ভাবছিলে?

দু’টা পাখি একটা ডালে বসেছিল। তোমার পায়ের শব্দে উড়ে চলে গেল। দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল কিন্তু মিলল না। হয়ত এতক্ষণে দু’জন দু’দিকে চলে গেছে?

আবার মিলও তো হতে পারে।

উর্মী প্রসঙ্গ পাল্টাল, শুভ্র তোমার সঙ্গে একটা ছেলে পড়ত, নাম মামুন, তোমার মনে আছে?

হ্যাঁ, ওতো খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল।

শুভ্র তুমি ধামইরহাট থেকে চলে আসার পর আর কোনদিন ধামইরহাটের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করনি, না?

না।

করা কি উচিৎ ছিল না?

শুভ্র কোন কথা বলল না।

শুভ্র তুমি কি মায়াকে ভালবাসতে?

হ্যাঁ।

কিন’ মায়া মামুনকে ভালোবাসতো, মামুনও মায়াকে ভালবাসতো।

শুভ্র উর্মীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, উর্মী।

উর্মীর যেন ধ্যান ভাঙ্গল, ও হ্যাঁ।

শুভ্র জিজ্ঞেস করল, উর্মী কি ভাবছিলে?

দু’টা পাখি একটা ডালে বসেছিল। তোমার পায়ের শব্দে উড়ে চলে গেল। দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল কিন্তু মিলল না। হয়ত এতক্ষণে দু’জন দু’দিকে চলে গেছে?

আবার মিলও তো হতে পারে।

উর্মী প্রসঙ্গ পাল্টাল, শুভ্র তোমার সঙ্গে একটা ছেলে পড়ত, নাম মামুন, তোমার মনে আছে?

হ্যাঁ, ওতো খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল।

শুভ্র তুমি ধামইরহাট থেকে চলে আসার পর আর কোনদিন ধামইরহাটের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করোনি, না?

না।

করা কি উচিৎ ছিল না?

শুভ্র কোন কথা বলল না।

শুভ্র তুমি কি মায়াকে ভালোবাসতে?

হ্যাঁ।

কিন্তু মায়া মামুনকে ভালোবাসতো, মামুনও মায়াকে ভালোবাসতো।

উর্মী আমি আসলে জানতে চাই তুমি মায়া কি না? যদিও আমি অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি তুমি মায়া।

আর কি কি নিশ্চিত হয়েছ?

আমার আর কিছু নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

তুমি কি শুধু মায়া নামটাকে বিয়ে করতে চাও?

এভাবে বলছ কেন? আমি মায়াকে পেলে বিয়ে করবো না কেন?

শুভ্র এত আবেগপ্রবণ হলে চলে না। আগে সবকিছু জানো, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো তারপর সিদ্ধান্ত নিও। বিয়ে তো আর একদিন বা দু’দিনের ব্যাপার না, সারাজীবনের ব্যাপার।

শুভ্র যেন থমকে গেল, মায়া!

হ্যাঁ শুভ্র আমি মায়া, তবে তুমি যে হাসি খুশি, আবেগপ্রবণ, লাবণ্যময় মেয়েকে দেখেছ আমি সেই মায়া না।

তবে।

শুভ্র আমি মামুনকে ভালোবাসতাম, খুব ভালোবাসতাম, তখন ছোট ছিলাম তো আবেগটাও ছিল বেশি, আমি হাতে দাগ কেটে মামুনের নাম লিখেছিলাম, বলে মায়া বোরকা থেকে তার হাত বের করল।

শুভ্র কিছু বলল না।

মায়া আবার বলতে শুরু করল, মামুনও আমাকে তার প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতো, আমাদের দু’জনের মধ্যে ক্লাসে যেমন ফার্স্ট হওয়ার কম্পিটিশন ছিল তেমনি কে কাকে বেশি ভালোবাসে তারও একটা কম্পিটিশন ছিল। কিন্তু আমি মামুনকে কোনদিন হারাতে পারিনি।

তাই নাকি?

ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমার যে পরাজয় হয়েছে তাতে আমার মরে যাওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু আমি জীবনের মায়া ত্যাগ করতে পারিনি, আর যখন জীবনের মায়া ত্যাগ করেছিলাম তখন মরতে গিয়েও মরতে পারিনি।

হেরে গেলে কেউ মরে যায় নাকি?

শুভ্র তুমি আসলে জানো না, আমি মামুনের নাম লিখেছিলাম হাতে দাগ কেটে আর মামুন দাগ কেটেছিল তার মনে। তাই ভালোবাসার ক্ষেত্রেও সে আমাকে হারিয়ে দিয়েছে।

তারপর।

উর্মী একে একে মামুনের সঙ্গে তার ভালোবাসার থেকে শুরু করে বিয়ের আয়োজন পর্যন- সমস- ঘটনা খুলে বলল। তারপর বলল, শুভ্র সারাজীবন যাকে নিয়ে সংসার করবো তাকে না পেয়ে আমাকে সংসার করতে হবে অজানা একজনকে নিয়ে একথা মনে করতে করতে আমার হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছিল তখন আমি বার বার করে জ্ঞান হরিয়ে ফেলছিলাম।

তারপর-

উর্মী তার বিয়ের পর থেকে শুরু করে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন- সমস- ঘটনা খুলে বলতে বলতে চোখ মুছল।

শুভ্রর দু’চোখ পানিতে ছলছল করে উঠল, তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেল।

উর্মী কান্না ভাঙ্গা গলায় বলল, শুভ্র তুমি আমার হাতে যে দাগ দেখছ, এই দাগ মামুনকে আমার ভালোবাসার দাগ, আমার মনের মধ্যে যে দাগ আছে সেটা মামুনকে হারানোর দাগ আর আমার দগ্ধ, বিকৃত মুখে যে দাগ দেখছ এটা প্রতিপত্তি আর আভিজাত্যের দেয়ালে বন্দি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে বসবাসকারী নির্যাতিত, বঞ্চিত নারীদের হৃদয়ের দাগ, বলে উর্মী তার মুখ থেকে বোরকা খুলে ফেলল।

সমাপ্ত

 

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*