ভ্যালেন্টাইন্‌স ডে

নিত্যদিনের মতো পলাশ কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল হঠাৎ আকাশটা মেঘে ঢেকে গেল। আরো প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিঞ্চুপুর গ্রাম। পলাশ সজোরে সাইকেল চালিয়ে বিঞ্চুপুর গ্রামের কাছে আসতেই প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। পলাশ কোন রকমে রাস্তার পাশে একটা বাড়ির টিনের চালার নীচে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণের মধ্যে জানালা খুলে একটি মেয়ে ডাক দিল, এই যে ভিতরে আসুন, দরাজ খোলা আছে তো।
পলাশ প্রথমে একটু ইতস্তত করল, তারপর সাইকেলটা তালা দিয়ে ভিতরে ঢুকল।
মা একটা তোয়ালে নিয়ে আসো তো, বলে মেয়েটি ডাক দিতেই মধ্য বয়সী এক মহিলা একটা তোয়ালে এনে পলাশের হাতে দিতে দিতে বলল, তুমি কে বাবা? তোমার বাড়ি কোথায়?
পলাশ কিছু বলার আগেই মেয়েটি জবাব দিল, মা উনি হচ্ছেন পলাশ ভাই, আমাদের কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র।
তুমি আমাকে চেনো?
হ্যাঁ আমাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানের দিন আপনি যে কাবিতা আবৃত্তি করলেন, এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান….।
তোমার নাম?
আমি সুমনা ফার্স্ট ইয়ার আর্টস, বলে সুমনা তার মায়ের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল, আমার মা।
তুই বক বক করবি নাকি বসতে দিবি, বলে মা সুমনাকে ধমক দিয়ে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বললেন, তুমি বসো বাবা।
পলাশ চেয়ারে বসল। সুমনা ও তার মা একটা চেয়ারে মুখোমুখি বসে সুমনার মা পলাশকে জিজ্ঞেস করল, তোমার বাড়ি কোন গ্রামে বাবা?
মির্জাপুর।
মির্জাপুর যেন চমকে উঠলেন তিনি, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, মির্জাপুর কার ছেলে তুমি?
আমার বাবার নাম মকবুল হোসেন।
তারমানে তোমার মায়ের নাম মরিয়ম, তোমাদের নানার বাড়ি জগতপুর?
আপনি চেনেন?
চিনবো না, তোমার মা আমার বান্ধবী, আমরা একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। তোমার মাকে আমার কথা বলবে। আর একদিন আমাদের বাড়িতে আসতে বলবে। বলে তিনি একটু থামলেন তারপর বললেন, তোমরা বসো, গল্প করো, আমি খাবারের ব্যবস্তা করি বলে তিনি চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ দু’জনে নিরবে বসে রইল তারপর একবার দৃষ্টি বিনিময় হতেই সুমনা বলল, সেদিন আপনার কবিতা আবৃত্তি শুনে আমার এক বান্ধবী তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
আর তোমার বুঝি আমার আবৃত্তি পছন্দ হয়নি।
সুমনা একটু মুচকি হেসে বলল, চলুন ভাত খাই। তারপর দু’জনে ডাইনিং রুমে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে বলল, খালা আম্মা আমি শুধু শুধু আপনাদের ডিস্টার্ব দিতে আসলাম।
সে কী বাবা এটা তো আমাদের দায়িত্ব।
খালু নেই।
তোমার খালু ব্যবসার কাজে ঢাকা গেছে।
সুমনা পাশে একটা চেয়ারে বসে খাবার তুলে দিচ্ছিল পলাশ একবার সুমনার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল, আমি কি গরু নাকি? তুমি দিতে দিতে থাকবে আর আমি খেতে থাকবো।
পেটে ক্ষিদে রেখে সঙ্কোচ করতে নেই।। তাছাড়া যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে থামার কোন লক্ষণ নেই। আজ বাড়ি যেতে পারবেন বলে তো মনে হয় না।
পলাশ একবার বাইরের দিকে তাকালো, কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে। চারদিক থেকে অন্ধকার হয়ে আসছে। ঘড়িতে তিনটা বাজার ঘণ্টা দিল। তারপর খাওয়া শেষ করে পলাশ বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করল। সুমনা পলাশকে সমস্ত বাড়ি ঘুরে দেখাল। তিনটি বেডরুম ড্রয়িং রুম দক্ষিণের বারান্দা। গ্রামের বাড়ি হলেও বাড়িটা বেশ সুন্দর।
বৃষ্টি যখন থামল তখন প্রায় গোধূলী লগ্ন। পলাশ খালা আম্মাকে সালাম জানিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় খালা আম্মা বার বার করে তার মাকে নিয়ে আসার জন্য বলতে লাগলেন। সুমনা একটু হেসে বলল, একবার যখন পথ ভুলে এসেছেন আবার যেন পথ ভুলে যাবেন না।

কয়েকদিন পলাশের সঙ্গে সুমনার দেখা নেই। একদিন পলাশ কলেজের বাংলা ক্লাশ শেষে বিজ্ঞান ভবনের দিকে যাচ্ছিল পথে সুমনার সঙ্গে তার এক বান্ধবী, সুমনাই পরিচয় করে দিল, সেতারা আমার বান্ধবী, ফার্স্ট ইয়ার আর্টস।
পলাশ নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিল। সেতারা বাধা দিয়ে বলল, আপনি পলাশ সেকেন্ড ইয়ার সায়েন্স।
আপনার কি এখন ক্লাশ আছে? সুমনা জিজ্ঞেস করল।
হুঁম, একটা।
তারপর-
তারপর আর নেই।
তাহলে আপনি ক্লাশ করে আসুন, বলে সেতারা অদূরে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল, ততক্ষণে আমরা ঐ গাছটার নীচে আছি।
আচ্ছা বলে পলাশ ক্লাশে চলে গেল।
পলাশ ক্লাশ শেষে গাছের নীচে গিয়ে বসল। ততক্ষণে সুমনা আর সেতারা চিনাবাদাম সামনে রেখে বসে আছে।
পলাশ জিজ্ঞেস করল, খাবার নিয়ে বসে আছ কেন?
সেতারা মুখ বিকৃত করে বলল, কী জানি ভাই? এত করে বললাম আমরা শুরু করি সুকান্ত বাবু এখুনি চলে আসবেন আর মাঠ তো শূন্য আছেই তাকে আর নতুন করে আসন ছেড়ে দেবার প্রয়োজন নেই।
সুমনা লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে একবার সেতারার দিকে রাগান্বিত চোখে তাকাল কিন্তু সেদিকে সেতারার খেয়াল নেই। সে আবার বলতে শুরু করল, তো সুকান্ত বাবু, শুধু কলেজের আসন শূন্য থাকলে তো হবে না, মনের স্থানও শূন্য থাকা চাই। কি আছে তো?
এবার সুমনা সেতারাকে ধমক দিয়ে বলল, তুই থামবি, নাকি আমি চলে যাব।
ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। নে বাদাম খা বলে সেতারা নীরবে বাদাম খেতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ সবাই নীরবে বসে রইল তারপর সুমনা জিজ্ঞেস করল, এ ক’দিন আপনি কলেজে আসেন নি?
এসেছিলাম, তবে ক্লাশের খুব চাপ ছিল। তাই একেবারে সময় পাইনি।
ক্লাশে না পেলেও বাড়িতে তো আসতে পারতেন নাকি আবার পথ ভুলে গেছেন? সুমনা অভিমানের সুরে বলল।
সেতারা শাসনের সুরে বলল, এই যে মিস্টার সরি বলুন, সরি বলুন।
পলাশ সেতারার দিকে তাকাতেই সেতারা চোখ মারল। পলাশ বিনীত সুরে বলল, সরি সুমনা এমন মিস আর হবে না।
সুমনা চোখ তুলে তাকাতেই চোখ পড়ল। পলাশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তারপর বলল, তবে আজকের মতো উঠি বলে পলাশ উঠে পড়ল।
সেতারা আঙ্গুল দেখিয়ে ধমকের সুরে বলল, এই যে সুকান্ত বাবু, আমি তো আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না।
সুমনা তোমার বান্ধবীকে বলো, সুকান্ত বাবুর কবিতা আবৃত্তি করেছি বলে আমি সুকান্ত বাবুর পায়ের যোগ্য নই, অধমের নাম পলাশ। আমার হৃদয়ের স্থান সুমনা নামের একটি মেয়েকে দিয়ে পূরণ হয়েছে। আর তোমার বান্ধবীটি কি শূন্য স্থান থাকলেই পুরণ করে নাকি? বলে পলাশ মৃদু হেসে বলল, আজকের মতো চলি, আবার দেখা হবে।
সোতারা সুমনাকে একটু ধাক্কা মেরে বলল, কী রে ভালোই তো রোমান্টিক বন্ধু পেয়েছিস।
এমনিভাবে প্রায় দিনই তারা ক্লাশের অবসর ঝালমুড়ি খেতে খেতে চুটিয়ে আড্ডা দিত। কোনদিন ক্লাশ শেষে দু’জনে গাছের নীচে বসে পরষ্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত। আবার কোনদিন একেবারে দেখা না হলে সুমনা জানালা খুলে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। পলাশকে দূর থেকে আসতে দেখে বারান্দায় এসে বসে থাকতো। পলাশকে থামিয়ে নিজে অথবা মাকে দিয়ে একরকম জোর করে বাড়িতে ডেকে এনে ভাত খাইয়ে দিত। কিন’ সুমনা একটানা কয়েকদিন পলাশকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে একেবারে অস্থির হয়ে উঠল। সোতারা সুমনার মনের অবস’া বুঝতে পেরে একদিন জিজ্ঞেস করল, এই সুমনা, তোর পলাশকে তো কয়েকদিন থেকে দেখছি না, মান-অভিমান চলছে নাকি?
সুমনা মলিন মুখে বলল, নারে কিছুই হয়নি, আবার কলেজেও আসছে না।
কোন অসুখ?
সেতারার বলা শেষ করার আগেই সুমনা তার মুখে হাত দিয়ে বলল, এমন অশুভ কথা বলিস না।
তবে কি করবি এখন? তোর ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে না?
সুমনা মাথা নেড়ে সায় দিল।
আমি বলি কী চল আমরা বিকেলে ওর বাড়িতে যাই।
হুঁম, বলে সুমনা সোতারার কথায় সায় দিল।
যেমনি কথা তেমনি কাজ। বিকেলবেলা সুমনা আর সেতারা যখন পলাশের বাড়িতে পৌঁছাল তখন সে বিছানায় শুয়ে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে আর খালা আম্মা পাশে বসে কপালে জলপট্টি দিচ্ছেন। ঘরে ঢুকেই দু’জনেই খালা আম্মাকে সালাম জানিয়ে সেতারা পরিচয় করিয়ে দিল, আমি সেতারার আর ও হচ্ছে সুমনা।
সুমনা আবার খালা আম্মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাচ্ছিল। খালা আম্মা সুমনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন। তারপর সুমনাকে পলাশের বিছানার পাশে বসিয়ে দিয়ে বললেন, তোমরা বসো মা আমি তোমাদের চায়ের ব্যবস্থা করি। বলে খালা আম্মা চলে গেলেন।
খালা আম্মা ঘরের বাইরে গেলে সুমনা পলাশের কপালে হাত দিয়ে মৃদু কণ্ঠে ডাক দিল, পলাশ।
পলাশ ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাল। ক’দিন থেকে তোমার এ অবস্থা?
আজ পাঁচদিন থেকে, বলে পলাশ সুমনার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, এ ক’দিন তোমার কথা খুব মনে পড়েছে সুমনা। কিন্তু কী করব তোমাকে খবর দেবার মতো কাছাকাছি কেউ নেই তো, তাই জানাতে পারিনি। তুমি ভালো আছ তাই না?
সুমনা পাশে তাকিয়ে দেখল ততক্ষণে সেতারা চলে গেছে, সুমনা কপালের জলপট্টি তুলে নিয়ে আর একটা কাপড় কপালে জড়িয়ে দিল। তারপর বলল ঔষধ খাচ্ছ তো।
হুঁম, ডাক্তার বলেছে জ্বর সারতে আরো দু’দিন লাগবে, তারপর কয়েকদিন রেস্ট নিয়ে ক্লাশে যাওয়া যাবে।
তোমার স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙ্গে গেছে, তোমার চোখের নীচে কালি পড়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো, কোন চিন্তা করবে না। বলতে বলতে সুমনার দু’চোখ পানিতে ভরে গেল।
এমনসময় সেতারা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, কীরে গল্প হলো? নাকি ডিসটার্ব করলাম?
সুমনা দু’চোখ মুছে বলল, দেখ সেতারা, ও কী রকম শুকিয়ে গেছে?
উনার শরীর শুকিয়েছে জ্বরে আর তোর শরীর তো শুকিয়েছে উনার চিন্তায়, নিজের চেহারাটা একবার আয়নায় দেখ তোর শরীরের অবস’া কেমন হয়েছে, বলে সেতারা পলাশের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, জনাব তাড়াতাড়ি সেরে উঠুন আপনার সাথে যে আরো একজনের শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে।
এসময় খালা আম্মা ডাক দিলেন, আসো মা চা রেডি।
সুমনা আর একবার কপালের জলপট্টি পরিবর্তন করে দিয়ে বলল, থাকো পলাশ, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
পলাশ সুমনার হাতে একটু মৃদু চাপ দিয়ে একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, ঠিক আছে।
পলাশ আর সুমনা এমনিভাবে আরো কাছাকাছি হলো একজনের সুখে অন্যজন আনন্দিত হলো, একজনের দুঃখে অন্যজনের চোখের পানি ঝরলো। পলাশ যখন এইচ.এস.সি পাস করে দিনাজপুর সরকারি কলেজে অনার্সে ভর্তি হলো তখন দু’জন দু’দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। তবুও তারা যাওয়া-আসার সময়টি ঠিকমতো মেনে চলে। ক্লান্ত দূপুরে কোন গাছের নীচে বসে আড্ডা দেওয়া আবার কখনোবা আকাশের দিকে তাকিয়ে কপোত-কপোতীর দ্বৈত চলা দেখে নিজেরাও ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর হওয়া। কখনো কোনদিন পলাশের সাথে দেখা না হলে সুমনা কলেজ থেকে ফিরেই জানালার পাশে বসে পথের দিকে চেয়ে থাকে। সুমনার চোখ দু’টো যেন পানিতে ভরে আসে, সহস্র রকমের অভিমান টেনে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
সুমনার বড় মামা রফিক সাহেবের নিজের কোন সন্তান-সন্ততি নেই তাই তিনি সুমনাকে নিজের মেয়ের মতো আদর করেন। তিনি বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে যখন জানলেন সুমনার এইচ.এস.সি ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে তখন তিনি সুমনাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য নাছোড় বান্দা হয়ে গেলেন। সুমনার একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি একরকম জোর করে সুমনাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। মামার বাড়িতে যাবার দু’য়েকদিনের মধ্যে পলাশকে দেখার জন্য সুমনার মন অসি’র হয়ে উঠল। সে বার বার করে মামাকে তার বাড়িতে রেখে আসার জন্য অনুনয় বিনয় করতে লাগল। অবশেষে সাত দিন পর মামা সুমনাকে তাদের বাড়িতে রেখে গেলেন। সুমনা বাড়িতে ফিরেই পলাশের সঙ্গে দেখা করার জন্য জানালা খুলে বসে রইল। অনেকক্ষণ পর দূর থেকে পলাশকে আসতে দেখে সুমনা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। প্রথম দেখায় সুমনা কিছু বলতে গিয়ে যেন জিহব্বা আড়ষ্ঠ হয়ে উঠল। পলাশের মুখের দিকে তাকিয়ে দু’চোখ ছলছল করে উঠল। নিজের অজান্তেই তার মুখ থেকে বের হলো, পলাশ একটু দাঁড়াও, ভিতের আসো, বলে সুমনা বারান্দার পকেট গেট খুলে দিল।
ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে পলাশ জিজ্ঞেস করল, খালু আব্বা, খালা আম্মা কেউ বাসায় নেই?
কেউ নেই ভিতরে চলে আসো, বলে সুমনা পলাশকে তার বেড রুমে নিয়ে গেল। দু’জনে পরষ্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সুমনাই প্রথমে নীরবতা ভঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ?
পলাশ অভিমানের সুরে বলল, না রাগ করব কেন? তোমার উপর কি আমার কোন অধিকার আছে?
দেখ আমি ইচ্ছা করে যেতে চাইনি, মামা এমনভাবে বাবা-মাকে বুঝালেন যে না গিয়ে আর উপায় থাকল না। বিশ্বাস করো আমারো এ কয়দিন খুব কষ্টে কেটেছে। আমি ঠিকমতো খেতে পারিনি, ঘুমাতে পারিনি, সবসময় শুধু তোমার কথা মনে পড়েছে। একটু বুঝতে চেষ্টা করো, প্লিজ বলতে বলতে সুমনার গণ্ডদেশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।
পলাশ সুমনার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল, সুমনা কয়েকদিন পর আজ তোমার সাথে দেখা হয়েছে এমন একটা আনন্দময় মুহূর্তকে চোখের পানিতে ভাসিয়ে দিও না, তোমার এ কয়দিনের জমিয়ে রাখা কথা বলো।
সুমনার চোখে-মুখে যেন একটা তৃপ্তির আভা ফুটে উঠল। পলাশের চোখে কিছুক্ষণ চোখ রাখল তারপর আশে-পাশে একবার তাকিয়ে পলাশের বুকে মুখ রাখল।
সুমনা পলাশের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পলাশ সুমনার মুখটি উঁচু করে নিজের মুখের কাছাকাছি এনে বলল, কিন’ এতবড় অপরাধ তো এমনি এমনি ক্ষমা করা যায় না, অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।
সুমনা পলাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ তো দাও কী শাস্তি দিবে?
যেমন একদিন আমাকে ছেড়ে একাই বেড়াতে গিয়েছ আর একদিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে গিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করো।
বলো কবে যেতে হবে? কোথায় যেতে হবে? আমি তো এক পায়ে রাজি।
তোমার জন্য আমার সময়ের অভাব নেই, বলো তোমার কবে সময় হবে?
সুমনা এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, বুধবার দিন বিকেল বেলা বাসায় এসো তারপর-
সুমনার কথা শেষ হবার আগেই পলাশ গানের সুরে গেয়ে উঠল, তার আর পর নেই, নেই কোন ঠিকানা।
হয়েছে, হয়েছে এখন ডাইনিং রুমে চলে আসো, ভাত খাও মুখটা একেবারে শুকিয়ে গেছে, বলে দু’জনে ডাইনিং রুমে গিয়ে ভাত খেতে বসল।
সারারাত ঘুমের মাঝে পলাশ চমকে উঠল। আগামীকাল সে সুমনাকে নিয়ে দিনাজপুরে যাবে যেখানে কেউ তাদের চিনবে না, কথা বলবার সময় পরিচিত লোকে দেখবার ভয় নেই। বিরল কলেজের মাঠে বসে আড্ডা দেয়ার সময় কোন কোনিদিন বন্ধুরা দূর থেকে তীর্যকভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো, কোনদিন কোন বন্ধু জোরে চিৎকার করে বলতো কীরে পলাশ? আবার কোনদিন বাড়ি ফেরার পথে দু’জনে বসে কথা বলার সময় পাশ দিয়ে কোন পরিচিত লোক অনাকাঙ্খিতভাবে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে ডিসটার্ব করতো কিংবা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। শহরে এরকমভাবে কেউ তাকায় না, সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। একজনের দিকে অন্যজনের তাকানোর সময় নেই। শহরে কিংবা রামসাগরে নির্ভয়ে, নিঃসঙ্কোচে মনের সব কথা উজাড় করে বলবে। কোথায় যাবে? কোথায় ঘুরে বেড়াবে? কী কী কিনবে? সুমনাকে কী দিবে সে?
তখন রাত তিনটা বাজে পলাশ বিছানা ছেড়ে উঠে তার টিউশনি করে জমানো টাকাগুলো গুনে দেখল আট’শ পঞ্চাশ টাকা আছে। পরদিন সকালবেলা পলাশ দিনাজপুর গিয়ে একটা জুয়েলার্সের দোকান থেকে একটা আংটি কিনল।
সুমনার গায়ের রং ধবধবে ফর্সা তার ওপর লাল রংয়ের কামিজ যেন দুধে আলতা মিশানো রংয়ে সেজেছে সুমনা আজ। পলাশের আজ অপূর্ব লাগছে সুমনাকে।
সুমনা বারান্দায় বসে পলাশের জন্য অপেক্ষা করছিল। পলাশকে দেখামাত্র পকেট গেট খুলে বের হয়ে এসে বলল, চলো।
পলাশ সুমনার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে পুরো শিশু পার্ক ঘুরে দেখানোর পর একটা গাছের নীচে এসে পরষ্পর গা ঘেঁষে বসল। তারপর পলাশ সুমনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সুমনা পলাশকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, এই কী হচ্ছে?
দেখছি। পলাশের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
আগে বুঝি কোনদিন দেখনি?
দেখেছি তবে তোমাকে যতই দেখছি ততই তোমার রুপে মুগ্ধ হচ্ছি। যতই তোমার সঙ্গে কথা বলছি ততই তোমার প্রেমে আবদ্ধ হচ্ছি। আমরা দু’জনে যেন এক শেকলে বন্দি হচ্ছি।
আমাদের দুজনের আত্মার সম্পর্ককে তুমি শেকল বলছ কেন? শেকল নয় বলতে হয় ভালোবাসার বন্ধন।
হ্যাঁ সুমনা তুমি ঠিকই বলেছ, আমাদের দু’জনার হৃদয় যেন আজ এক হয়ে মিশে গেছে। তাইতো আজকের দিনটিকে আমি আরো স্মরণীয় করে রাখতে চাই বলে পলাশ সুমনার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে পকেট থেকে আংটিটা বের করে সুমনার আঙ্গুলে পরিয়ে দিল।
সুমনা যেন চমকে উঠল। তুমি কী করলে পলাশ।
কেন?
কারণ আমাদের সামজিকতায় কোন অবিবাহিতা মেয়েকে কোন ছেলের কাছ থেকে কোন স্বর্ণের জিনিস পরলেই তার এনগেজমেন্ট হয়ে যায়। সুমনা বলল।
তবে তো ভালোই হলো, আজ তোমার সাথে আমার এনগেজমেন্ট হয়ে গেল, কেন আমাকে বিয়ে করতে তোমার কি কোন আপত্তি আছে?
না।
তবে তো ভালোই হলো। আজ থেকে তুমি আমার বউ।
সুমনা মুখ আংশিক বিকৃত করে বলল, বউ শুধু মুখে মুখে।
মুখে মুখে কেন আকাশ-বাতাস সাক্ষী রেখে আমি তোমাকে আংটি পরিয়ে বিয়ে করলাম বলে সুমনার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, বলো সত্যি কি না?
সুমনা পলাশের গায়ে এলিয়ে পড়ে সম্মতি জানাল।
তারপর দু’জনে বসে আরো অনেকক্ষণ গল্প করল। সুমনা নাগরদোলার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল, এই দেখো, দেখো।
কী?
দেখো একটা নাগরদোলায় ছোট্ট একটা মেয়ে কী সুন্দর আব্বু আম্মুর কোলে বসে আছে।
পলাশ সুমনার চোখে চোখ রেখে বলল, তোমারও বুঝি ঐ রকম একটা সুন্দর শিশুর মা হওয়ার ইচ্ছে করছে।
সুমনা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল তারপর নিজেই মৌনতা ভঙ্গ করে বলল, আমি নিজেও তোমার সঙ্গে মিশেছি, কতদিন গা ঘেঁষে বসেছি। কিন’ ক’দিন থেকে কেন জানি তোমার ষ্পর্শে নতুন কিছু অনুভব করছি, আমি যেন তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছি, ছোট একটা শিশুর মা হওয়ার স্বপ্ন দেখছি।
সুমনার কথা শুনতে শুনতে পলাশের দু’চোখ ছলছল করে উঠল। সুমনা যেন তারই মনের একান্ত গোপন কথাগুলো বলছে। পলাশ সুমনার কথা শোনার জন্য চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর ঘড়িতে পাঁচটা বাজার সঙ্কেত ধ্বনিত হতেই সুমনা চমকে উঠল, ওহ্‌ হ্যাঁ, চলো এবার যাওয়া যাক।
দু’জনে পার্ক থেকে বের হয়ে আবার রিক্সায় উঠল।
রিক্সা যখন গ্রামের দিকে রওয়ানা হলো তখন সন্ধ্যা নেমেছে শরতের আকাশে যেন মেঘের সাথে চাঁদের লুকোচুরি খেলা করছে পাশে কাশবন যেন রুপালী রংয়ে সেজেছে। মৃদু শীতল হাওয়া বইছে, চাঁদের আলো কখনো সুমনার মুখের ওপর কখনো পলাশের মুখের ওপর পড়ছে। পলাশ সুমনার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সুমনার একবার ফিরে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল।
একদিন পলাশ কলেজ থেকে ফিরছিল। সুমনার তখন একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তির ছাপ দেখে অজানা আশঙ্কায় পলাশের হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। পলাশের মুখ শুকিয়ে গেল। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে সুমনা? তোমার এ অবস্থা কেন?
সুমনা তার বইগুলো রেখে ঘাসের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। তারপর ইউনিফর্মের সাথে জড়ানো ওড়না দিয়ে দু’চোখ মুছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, পলাশ তোমাকে আমাকে নিয়ে নানা জনে নানান কথা বলছে। তাই বাবা বলেছে আমাকে নাকি বিয়ে দিয়ে দিবে।
সুমনার কথা পলাশের কানে যেন তীরের মতো বিদ্ধ হলো। হঠাৎ করে তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করল। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল, পলাশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।
পলাশ নিজেকে সামলে নিয়ে সুমনার দুশ্চিন্তাকে হাল্কা করার জন্য বলল, তবে বেশ তো, তোমার রাজপ্রাসাদের মতো ঘর হবে, রাজপুত্রের মতো বর হবে-
পলাশের কথা শেষ হতে না হতেই সুমনা সহস্রগুণ জ্বলে উঠল, চোখ দু’টো আবার ছলছল করে উঠল। সুমনা অভিমানের সুরে বলল, আমার ঘর হবে বর হবে আর আমি বুঝি তোমাকে ছেড়ে নাচতে নাচতে রাজপ্রাসাদের মহারাণী হতে চলে যাব।
পলাশ সুমনার চিবুক উঁচু করে ধরে বলল, সুমনা এমন যদি হয় তবে তুমি মহারাণী হওয়ার আগে আমি যেন মরে যাই।
লাল শাড়ি পরে রাঙ্গা বউ সাজবার আগে সাদা কাপড় পরে আমিও যেন কবরে যেতে পারি পলাশ। বলে সুমনা পলাশের বুকে মাথা রাখল।
সুমনার বাবা কাদের সাহেব ধনী লোক। বিষয়-সম্পত্তি, অর্থবিত্ত আর প্রাচূর্য্যের কোন অভাব নেই। কিন্তু সুমনার সঙ্গে পলাশের মতো হতদরিদ্র সবে মাত্র অনার্স পড়ুয়া ছাত্রের মেলামেশা তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারলেন না। তিনি পরিচিত আত্মীয়-স্বজনদের সুমনাকে বিয়ে দেবার জন্য পাত্র খুঁজবার কাজে লাগিয়ে দিলেন। সেইসাথে ঘোষণা দিলেন সুযোগ্য পাত্র পাওয়া গেলে তিনি যৌতুক দিতে কার্পণ্য করবেন না। পাত্র খোঁজাখুঁজি শুরু হলো এবং কয়েকদিনের মধ্যে উচ্চবিত্ত পরিবারের, বিশাল সম্পত্তির অধিকারী, পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান, সরকারি চাকুরিজীবী, সুদর্শন এবং স্মার্ট এক পাত্রের সন্ধান পাওয়া গেল। সবকিছু শুনে কাদের সাহেব খুশিতে আটখানা, তিনি ঘটককে জানিয়ে দিলেন, যে করেই হোক এই পাত্র তার চাই-ই।
ঘটক উভয় পক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিয়ের ব্যবস’া একেবারে পাকাপাকি করে ফেললেন। আগামী শুক্রবার পাত্র পক্ষের কয়েকজন মেয়ে দেখতে আসবেন, পছন্দ হলে সেদিনই বিয়ের দিন তারিখ নির্ধারণ করা হবে। কাদের সাহেব সেদিন সকালবেলা নাস্তার টেবিলে সুমনা কাছে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললেন, মা সুমনা তুই আমাদের একমাত্র মেয়ে, তোকে আমরা এমনভাবে মানুষ করেছি যে তোর গায়ে একটা ফুলের আঁচড় পর্যন্ত ষ্পর্শ করতে দিইনি-
তুমি এভাবে বলছ কেন বাবা?
তাহলে তোকে সব খুলেই বলি, আমরা কয়েকদিন থেকে তোর বিয়ের জন্য সম্বন্ধ খুঁজছিলাম, একটা ভালো ছেলে পাওয়া গেছে বলে তিনি ছেলের গুণের কথা, আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা সবকিছু বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলেন।
বাবার দু’য়েকটা কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সুমনার হৃদয়ে প্রচণ্ড আঘাত পেল। তার সমস্ত শরীর যে অবশ হয়ে গেল, দু’চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করল। তার হৃদয়ে পলাশের ছবি ভেসে উঠল। সুমনা তার জীবনে পলাশ ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবতে পারে না।
আমি এখন বিয়ের কথা ভাবছি না বাবা, আগে লেখাপড়া শেষ করি তারপর বিয়ে-
ছেলে চাকরি করে, ছোট পরিবার ইচ্ছা করলে তুই বিয়ের পরও লেখাপড়া করতে পারবি, কাদের সাহেব বললেন।
তা হয় না বাবা, আমি লেখাপড়া শেষ করার আগে বিয়ে করব না।
কাদের সাহেব মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিমুর্তি ধারণ করলেন, দু’চোখ মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন, আমি তোর কোন কথা শুনতে চাই না, তোর জন্য সমাজে আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে, আমি তোর বিয়েতে আর দেরি করতে চাই না, পাত্রপক্ষের সঙ্গে সব কথা পাকাপাকি, সামনের শুক্রবার তারা তোকে দেখতে আসবে, পছন্দ হলে দিন তারিখ ধার্য হবে।
বাবা আমার বিয়েতে কি আমার পছন্দ-অপছন্দের কোন মূল্য নেই।
তোর পছন্দ কি ঐ ভিখারী ছেলেটা?
তুমি যাকে ভিখারী বলছ তার সঙ্গে যে আমার হৃদয়ের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে বাবা, পলাশকে ছাড়া অন্য কাউকে আমি ভাবতে পারি না, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো হাতে তুলে দিয়ে তুমি আমার জীবনটা নষ্ট করো না বাবা। বলতে বলতে সুমনার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
সুমনা তুই ভালো করেই জানিস আমি কখনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি না, আর তোর ব্যাপারেও আমি যার সঙ্গে তোর বিয়ে ঠিক করেছি তার সঙ্গেই তোর বিয়ে দিব, বলে তিনি সুমনার হাত ধরে জোর করে তার শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে তালা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, আজ থেকে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তুই এখানেই থাকবি এবং আমি ছাড়া অন্য কেউ তোকে তালা খুলে দিতে পারবে না। বলে তিনি চাবি পকেটে ঢুকিয়ে চলে গেলেন।
বিয়ের আগে পলাশ শত চেষ্টা করেও সুমনার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। পলাশের বার বার মনে হয়েছে একবার সুমনার সঙ্গে দেখা করে বলবে, তুমি যদি তোমার বাবার পছন্দের ছেলেকেই বিয়ে করবে তবে আমার সঙ্গে অভিনয় করলে কেন? কেন বলেছিলে আমাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না? এখন তো দেখছি তুমি সত্যি সত্যি মহারাণী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে এক পা তুলে বসে আছ? আবার মনে হয় সুমনা আমাকে ছেড়ে যেতে পারে না। সুমনার বাবা-মা’র পছন্দের বর, দেশের সর্বোচ্চ্য বিদ্যাপীঠ থেকে এম.এ পাশ সরকারি চাকুরিজীবী। অন্যদিকে সুমনার একান্ত মনের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমি সবেমাত্র অনার্সের ছাত্র। সুমনার বাবা-মা হয়ত আমাদের ভালোবাসা ও পাত্রের যোগ্যতাকে তুলনা করে শেষ পর্যন্ত আমাদের ভালোবাসাকে পদদলিত করে জোর করে সুমনাকে বিয়েতে রাজি করেছে।
বিয়ের পরদিন সেতারার কাছে পলাশ সব জানতে পারল। বিয়ের কয়েকদিন আগে থেকেই সুমনাকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখেছে তার বাবা-মা অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু কিছুতেই তাকে রাজি করতে পারেনি। বিয়ের দিনেও ঘুমের মধ্যে সুমনা পলাশ, পলাশ বলে চমকে উঠেছে। বিয়ের আগেও কাঁদতে কাঁদতে বার বার অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। বিয়ের সাক্ষীগণ যখন সুমনা রাজি কীনা জানতে চায়, তখন সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। কাজি সাহেব যখন পাত্রের নাম ঠিকানা বলে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি রাজি আছেন তো? তখন বার বার জিজ্ঞেস করেও সাড়া মিলেনি, শেষে যে কণ্ঠে সাড়া মিলল সে কণ্ঠ যে সুমনার নয় তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারীকে তার মতামত ও ইচ্ছ-অনিচ্ছাকে পদদলিত করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোগ্যপণ্যের মতো তুলে দেওয়া হয়। যারা ধর্মের কথা বলে, সমাজকে পাপ ও অনাচার থেকে মুক্তির কথা বলে তারা কি একবার জানতে চেয়েছে এ বিয়েতে ছেলে-মেয়ে উভয়ের স্বতঃষ্ফুর্ত সম্মতি আছে কি না? বরং এ বিয়েতে মেয়ের মত নেই জেনে-শুনে তড়িঘড়ি করে বিয়ের পর্ব শেষ করে আল্লাহর শুকুরিয়া আদায় করতে করতে বিবাহ কার্য সম্পন্ন করল।
সুমনাকে নিয়ে গাড়িবহর যখন রাস্তার ধুলা উড়িয়ে যাচ্ছিল, তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে সুমনার কান্নার শব্দ যখন পলাশের কানে ভেসে আসছিল তখন তার মনে হচ্ছিল গাড়ির চাকাগুলো যেন রাস্তার ধুলিকণা নয়, তার বুকের পাঁজর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। ঢেউ যেমন নদীর তীরে সজোরে আঘাত করে আর নদীর পাড় যেমন নদীর বুকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিলীন হয়ে যায়, তেমনি পলাশের সমস্ত প্রাণশক্তি যেন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।
প্রায় মাসখানেক পরের কথা, সুমনার বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। বাড়িতে এসেই সুমনা একবার পলাশের বাড়িতে এসেছিল একথা পলাশের মা তাকে বলেছে। সুমনা বার বার পলাশের সঙ্গে দেখা করার জন্য চেষ্টা করেছে কিন্তু পলাশ তাকে পাশ কাটিয়ে চলেছে কারণ পলাশ তার সঙ্গে দেখা করতে চায় না। সুমনার জীবন থেকে একবারে সরে দাঁড়াতে চায়। সুমনার সঙ্গে আর কোনদিনও দেখা করতে চায় না। কিন’ সুমনাও নাছোড়বান্দা হয়ে পলাশকে আঁকড়ে ধরার জন্য বাবার বাড়ি থেকে ফিরে একটা চিঠি লিখল।
পলাশ
শুভেচ্ছা নিও। আমার ধারণা ছিল আমার বিয়ের কথা শুনে তুমি সকলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলবে সুমনা আমার স্ত্রী। তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে, বিশ্বাস না হয় তাকে একবার ডাকুন। তখন আমি সবার সামনে গিয়ে তোমার হাত ধরে চলে যেতাম, আমরা দু’জনে সুখের ঘর বাঁধতাম। কিন্তু তুমি এলে না। আমি প্রথম দিন থেকে দেখছি তুমি আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাস। আমার সুখের জন্য নিজের কষ্ট মেনে নিতে পারো, সকলের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিতে পারো না, এটা তোমার নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তাই সেদিন তুমি যে আঘাত পেয়েছ তাতে তোমার হৃদয় টুকরো হয়ে গেছে। তা তুমি নীরবে সহ্য করেছ আর হয়তবা শুধু আমাকে দোষারোপ করছ। কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো, যেদিন বাবা আমাকে বিয়ের কথা বলে এবং আমি বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে অস্বীকার করি সেদিন থেকেই বাবা আমাকে ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো আমার কোন উপায় ছিল না। এমন কী বিয়ের দিনেও আমি এক মুহূর্ত কারো চোখের আড়াল হতে পারিনি, পারলে হয়ত তোমার কাছে ছুটে আসতাম। তুমি বিশ্বাস করো, সেদিন যা কিছু ঘটেছে সবকিছুই আমার ইচ্ছা বিরুদ্ধে। আসলে আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীর মতামতকে বেশিরভাগ সময়ই উপেক্ষা করা হয়। বিয়ের মতো জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার পছন্দ-অপছন্দ মূল্যহীন। বরং একথা বলা যায় বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের মতামতকে সামান্য মূল্য না দিয়ে বিয়ের সমস্ত আয়োজন করে নিতান্তই সামাজিকতা রক্ষার জন্যই একবার জিজ্ঞেস করা হয়, যখন তার আর না বলার উপায় থাকে না কিংবা একান্ত আপন মানুষটিকে হারিয়ে অন্য একজানের হাতে ভোগ্যপণ্যের মতো তুলে দিয়ে দেবার কথা ভেবে যখন সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে আর সে অবস্থায় তাকে পাত্রস্থ করে দায়মোচন করা হয়।
একদিন তুমি ঠিকই বলেছিলে আমার ঘর হবে, বর হবে, আমি মহারাণী হবো। আসলে তোমার কথাই ঠিক হয়েছে। আমার ঘর হয়েছে, বর হয়েছে, আমার ঘরের মানুষ হয়েছে কিন্তু মনে মানুষ হয়নি। যার সাথে আমার মনের মিল ছিল তার সাথে মিলন হয়নি যার সাথে আমাকে জুড়ে দেয়া হয়েছে তার সাথে আমার মনে মিল নেই। শুধু কয়েকটা দোয়া মন্ত্র পড়ে আইন আর সামাজিকতার শেকলে বেঁধে দেয়া হয়েছে। আমার চিঠি পড়ে তোমার কী মনে হবে জানি না। আমার সবসময় তোমার কথা মনে পড়ছে। তাই তোমাকে চিঠি লিখলাম মনের ভার কিছুটা লাঘব করার জন্য। জানি তুমি আমার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টে আছ আর আমাকে বিশ্বাস ঘাতকিনী, প্রতারক, ছলনাময়ী বলে গালি দিচ্ছ। সম্ভব হলে আমাকে ক্ষমা করো। আমার ঠিকানা লিখে জানালাম যদি চিঠি লিখ তবে বুঝব তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ।

ইতি
তোমার সুমনা
সুমনার চিঠি পড়ে পলাশ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। যে সমুনা তাকে ছেড়ে বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করেছে ফলে এতদিন তার প্রতি যে ক্ষোভ ও ঘৃণার সঞ্চার হয়েছিল তা নিমিষেই নিভে গেল। পলাশ বার বার তার চিঠিটি পড়ল আর তার অতীতের স্মৃতিগুলি মনের আয়নায় ভেসে উঠল। পলাশ চিঠিটা সযত্নে রেখে দিল, আর মনে মনে চিঠির উত্তর লিখার জন্য প্রস্তুতি নিতে হলো। কী লিখবে সে সুমনাকে? সুমনা সবকিছু জানিয়ে তাকে চিঠি লিখেছে তাকে আঘাত করে চিঠি লিখা ঠিক হবে না। আবার একজন বিবাহিতা মেয়েকে চিঠি লিখে বা তাকে তার হারানো দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অতীতের ভালোবাসাকে জাগিয়ে তুলে দাম্পত্য কোলহ বাঁধিয়ে দেয়াও ঠিক হবে না, এমনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে কয়েকদিন কেটে গেল। অবশেষে পলাশ সিদ্ধান্ত নিল সুমনাকে সে ভালোবাসে, তার মঙ্গল চায়। মন দিয়ে সুমনাকে সে যতই ভালোবাসুক না কেন এ মুহূর্তে তাকে চরম আঘাত করতে হবে যেন সে আর কোনদিন চিঠি না লিখে, সে যেন পলাশকে ঘৃণা করে তবে স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা জন্মাবে তার দাম্পত্য জীবন সুখের হবে।
চিঠিটা পোস্ট করেই সুমনা উত্তরের অপেক্ষায় অধীর হয়ে দিন কাটাচ্ছিল আর মনে মনে ভাবছিল পলাশ চিঠি পেয়ে কী ভাববে? হয়ত আমার চিঠি না পড়েই রাগ করে ছুঁড়ে ফেলে দিবে কিংবা চিঠি পড়ে বলবে তুমি আমার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার জন্য চিঠি লিখেছ? জুতা মেরে গরু দান? না আমি যতদিন থেকে পলাশকে দেখছি সে আবেগ প্রবণ নয়, কঠোর বাস্তববাদী। হয়ত যত্ন করে চিঠিটা পড়ে তার মনের কষ্ট কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করবে। এমনি নানা চিন্তা মধ্যে একদিন ডাকপিয়ন এসে খামের উপর প্রেরকের ঠিকানাবিহীন একটা চিঠি সুমনাকে দিয়ে গেল। কিন্তু সুমনা হাতে লিখা দেখেই বুঝতে পারল চিঠিটা পলাশের। তাই পিয়নের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে দ্রুতবেগে নিজের ঘরে চলে গেল, তারপর যত্ন সহকারে চিঠিটা খুলে পড়ার পর তার সমস্ত ধারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো।
পলাশ লিখেছে
সুমনা
শুভেচ্ছা নিও। কয়েকদিন আগে তোমার একটা চিঠি পেয়েছি কিন’ উত্তর দিব কী না একথা ভাবতে ভাবতে কয়েকদিন কেটে গেছে। সুমনা আমি তোমাকে আগেও ভালোবাসতাম, এখনো ভালোবাসি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শুধু তোমাকে ভালোবাসবো। তোমার মতো সুন্দর মনের মেয়ে হয়ত কোনদিনও আমি পাবো না, এই দাগ কোনদিনও মুছবে না। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে তোমার কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। তুমি আমার প্রথম প্রেম। আমার স্বচ্ছ হৃদয়ে তুমিই প্রথম যে রং লাগিয়ে দিয়েছ তা কোনদিন মুছবে না। কিন্তু তোমার ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তুমি এখন অন্যের স্ত্রী। আর তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তোমার পিছনের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। তুমি আমাকে চিঠি লিখা তো দূরের কথা আমার কথা হৃদয়ে লালন করাও তোমার জন্য অনৈতিক। আমি তোমার হিতাকাঙ্খী হিসেবে তোমাকে কোন অনৈতিক কাজে আহবান করতে চাই না। আমার প্রতি তোমার সহানুভূতি ও ভালোবাসা চিরদিনের জন্য মুছে ফেলবে। আমার প্রথম ভালোবাসার জন্য আমার নিজের সুখ উৎসর্গ করলাম।
তুমি ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছ এবং আমি ক্ষমা করেছি কী না চিঠি লিখে জানাতে বলেছ। আমার ধারণা আমার চিঠি না পাওয়া পর্যন্ত তুমি অপরাধবোধে ভুগবে। তাই তোমাকে চিঠি লিখে জানালাম আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি এবং তোমার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক এই কামনা করেছি। আর তোমাকে ভালোবাসার দাবি নিয়ে বলছি আমাকে কোনদিন চিঠি লিখবে না, যদি লিখ তবুও আমি আর কোনদিন উত্তর দিব না। আমি মনে করি এই তোমার জন্য সুখ বয়ে আনবে। সুখে থাকো।

ইতি
পলাশ
সুমনা চিঠি পড়া শেষ করে কিছুক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। তারপর চিঠিটা বেশ যত্ন করে তার ব্রিফকেসে রেখে দিল।
আজ সুমনার বার বার করে সেতারার কথা মনে পড়ল। একদিন সেতারা বলেছিল, পুরুষ জাতটা খুবই স্বার্থপর, সুযোগ পেলে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে, তাদের কুমতলবে সাড়া না দিলে ধর্ষণ করবে বা এসিড ছুঁড়ে মারবে আবার তাদের প্রেমে সাড়া দিলে প্রতারণা করবে এটাই পুরুষের স্বভাব। আজ সেতারা কাছাকাছি থাকলে সুমনা চিঠিটা তার মুখের ওপর ছুঁড়ে মেরে বলতো, পুরুষ সম্পর্কে তোর ধারণা মিথ্যা, সব পুরুষই হিংস্র না, পুরুষ বাবা, ভাই, বন্ধু এই দেখ তার প্রমাণ।
সুমনার বিয়ের প্রায় দু’মাস অতিক্রান্ত হলেও এতদিন পলাশের ভালোবাসা তার হৃদয়ে সবসময় একটা শূন্যতা তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু আজ সুমনার শূন্য হৃদয় শ্রদ্ধায় ভরে গেল। সেই সঙ্গে আজ সুমনার চোখ খুলে গেল। চরম বাস্তবতা আজ তার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, পলাশের সঙ্গে তার হৃদয়ের সম্পর্ক, সেদিনের দু’টো স্বাক্ষর আর দু’বার কবুল বলার সঙ্গে সঙ্গে ছিন্ন হয়ে অন্য একজনের সঙ্গে আইনের শিকলে জড়িয়ে পড়েছে। পলাশের কথা মনে হলে একদিকে যেমন সুমনার হৃদয় ভেঙ্গে যায় অপরদিকে শ্রদ্ধায় ভরে যায়, গর্বে বুক ফুলে উঠে। সুমনার কাছে পলাশ শুধু পুরুষই নয়, মহাপুরুষ। অথচ বিত্ত-বৈষম্য তাদের দু’জনের ভালোবাসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, নিষ্ঠুর সমাজ তাদের ভালোবাসকে অস্বীকার করে দু’টি পবিত্র আত্মাকে পৃথক করেছে। দু’টি আত্মার কাঙ্খিত সম্পর্ক ছিন্ন করায় সমাজের কোন অপরাধ হয় না। কিন্তু আইনের শেকল ছিন্ন করলে সমাজের নিন্দুক মুখগুলো সমালোচনায় মেতে ওঠে।
কয়েকবছর পরের কথা। ততদিনে পলাশ লেখাপড়ার পর্ব শেষ করে ব্যবসার মাধ্যমে একের পর এক সাফল্যের ফলে ঢাকা শহরে প্রচুর টাকা-পয়সা গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছে। যে দারিদ্র্যের জন্য সে তার একান্ত মনের মানুষকে হারিয়েছে আজ আর তার সে দারিদ্র নেই। বলতে গেলে তার জীবনে প্রাচূর্য্যের অভাব নেই। কিন্তু সুমনার জন্য প্রায় সময়ই তার হৃদয়ে একটা শূন্যতা বিরাজ করছে।
পলাশের বাবা অনেক আগেই সুখ-দূঃখের অতীত হয়েছে। স্বামীর সামান্য ক’টা পেনশনের টাকায় তার মা তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছে। পলাশকে লেখাপড়া শিখাতে গিয়ে তার মা যে অমানুষিক কষ্ট করেছে সেকথা মনে হলে আজো পলাশের দু’চোখ ভরে পানি আসে। পলাশ একবার তার মাকে ঢাকা শহরে থাকার কথা বললেও তার মা রাজি হয়নি। পলাশ তাকে অনেক বুঝিয়েছে কিন’ তার একই কথা, যে ভিটেমাটিতে তোর বাবার স্মৃতি আছে সে ভিটেমাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না, তুই কমপক্ষে বছরে দু’বার এসে আমাকে দেখে যাবি। আর আমার শেষ ইচ্ছা একটা বিয়ে কর, আমি যেন নাতি-নাতনির মুখ দেখে যেতে পারি।
সেদিন পলাশ তার মাকে দেখতে এসে অপ্রত্যাশিতভাবে সুমনার মুখোমুখি হলো। পলাশ মা’র সঙ্গে গল্প করছিল এমনসময় সুমনার বাসার ভিতরে ঢুকে সালাম দিয়ে পলাশকে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ পলাশ?
সুমনাকে দেখামাত্র পলাশের হৃদয়ে ঝড় শুরু হলো। হারানো দিনের স্মৃতিগুলো হৃদয়ে ভেসে উঠল। সুমনার প্রশ্নের উত্তরে পলাশ হতবিহব্বল হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর কৃত্রিম ক্ষোভ প্রশমন করে বলল, বেশ ভালো।
তোরা বস আমি তোদের জন্য একটু চা নিয়ে আসি, বলে পলাশের মা চলে গেল।
না ভালো নেই, তুমি মোটেও ভালো নেই। ভালো থাকার অভিনয় করছ, আমার সামনে তোমার কষ্ট লুকিয়ে রাখার ভান করছ। জানোই তো আমি তোমার চোখ দেখে মনের কথা বলে দিতে পারি, আমার চোখে দিকে তাকাও? সুমনা কথাগুলো একরকম শাসনের সুরে বলল।
পলাশ সুমনার চোখের দিকে তাকাতেই দু’জনের চোখ জলে ছলছল করে উঠল। কয়েক মুহূর্ত পরষ্পর চোখে চোখ রাখল তারপর পলাশ স্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলল, তোমার ছেলেমেয়ে ক’জন যেন?
হঠাৎ একথা জানতে চাইছ কেন? কোনদিন তো একবার খবর নিলে না, বেঁচে আছি না মরে গেছি। সুমনা ক্রোধের সুরে বলল।
পলাশও রাগান্বিত স্বরে বলল, তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? রেগে যাবার কথা তো আমার কারণ তুমি আমাকে ভালোবেসে আরেকজনকে বিয়ে করেছ, যদি কোন দোষ হয় তো তুমি করেছ, আমি তো কোন দোষ করিনি।
কেন? সেতারা তোমাকে কিছু বলেনি?
হ্যাঁ বলেছে।
তবে আমার সঙ্গে দেখা করলে না কেন? চিঠি লিখলে না কেন? আমি তো তোমাকে চিঠি লিখেছিলাম আসতে বললে আমি তোমার কাছে চলে আসতাম। আমরা দু’জন ঘর বাঁধতাম। তারপরও আমি তোমার সবসময় খবর রেখেছি। তোমার সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক জড়িয়ে আছে, আর তার সঙ্গে আমার শুধু আইনের সম্পর্ক আছে, তুমি যদি এখনো বলো তবে আমি তোমার সঙ্গে আসবো, বলো একবার।
পলাশের ইচ্ছা হলো একবার তার সঙ্গে আসতে বলবে আবার পরক্ষণেই মনে হলো না তাতে সুমনার দাম্পত্য কোলহ হোক তা পলাশ কোনভাবেই চায় না। পলাশের নীরবতা দেখে সুমনা আবার বলতে শুরু করল, তো বিয়ে করছ না কেন?
আমি তো একজনকে বিয়ে করেছি, আর আবার কীসের বিয়ে?
কিন্তু তাকে তো তুমি ধরে রাখতে পারোনি, যে গেছে তাকে বাদ দাও আবার নতুন করে শুরু করো। সুমনা বলল।
দেখি চেষ্টা করবো।
চেষ্টা করবো নয়, বলো শীঘ্রই করবো। সুমনা জোর দিয়ে বলল। তারপর মিনতির সুরে বলল, তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো?
হ্যাঁ।
তবে আমার একটা কথা রাখতে হবে, আগে বলো রাখবে?
পলাশ কিছুই বলল না, নীরবে বসে রইল। তবুু সুমনা বলতে শুরু করল, তুমি বিয়ে না করা পর্যন্ত আমি যে পাপবোধে ভুগছি। আমার সবসময় মনে হয় আমি তোমার সুন্দর, সাজানো জীবনটা এলোমেলো করে দিলাম। প্লিজ পলাশ তুমি তাড়াতাড়ি একটা বিয়ে করে আমাকে মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও। শেষের দিকে সুমনার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
পলাশের চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। এমনসময় মা চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
দু’জনে নিজেকে সামলে নিয়ে সুমনা কষ্টের মাঝে হেসে বলল, হ্যাঁ খালা তোমার ছেলেকে বুঝি বিয়ে দিবে না।
হ্যাঁ মা, আমি প্রায়ই বলি বাবা একটা বিয়ে কর, সংসার কর কিন’ ও তো আমার কথা কানেই তোলে না, বলতে বলতে মা চোখ মুছল।
পলাশ তবুও চুপ করে রইল। সে নিজেও বুঝে তার বয়স চল্লিশ অতিক্রম করেছে। বিয়ের বয়স তার অনেক আগেই চলে গেছে। তার এত টাকা-পয়সা, বিত্ত-বৈভব, প্রাচূর্য্য তার মৃত্যুর পর সবকিছুই বেওয়ারিশ হয়ে যাবে। যে দারিদ্রের অভিশাপে সে তার একান্ত আপন মানুষটিকে হারিয়েছে তা আর ফিরে পাবার নয় কিন্তু তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এভাবে অতিক্রম করা এতদিন সে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করতো। আজ সুমনা তার চোখ খুলে দিয়েছে। সুমনার হৃদয়ে তার নামটা এখনো জ্বলজ্বল করছে সবসময় একটা অব্যক্ত বেদনা তার হৃদয় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে কিন্তু মুখে তার বহিঃপ্রকাশ নেই। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে স্বামী-সংসার নিয়ে হৃদয়ের যন্ত্রণাকে হাসিমুখে উড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েরা আসলে সবই পারে।
অবশেষে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সামাজিক কারণে পলাশ বিয়েতে রাজি হলো। কয়েকদিনের মধ্যে উপযুক্ত পাত্রী জুটল। পলাশের স্ত্রীর নাম মুক্তা। বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে, উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান না পাওয়ায় বয়সটা একটু বেশি। তা নিয়ে পলাশের কোন অনীহা নেই, তার নিজের বয়সই যখন বিয়ের বয়স অতিক্রম করেছে তখন স্ত্রীর বয়সের সমালোচনা করা অর্থহীন।
মুক্তা উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে সংসারের কোন কাজ সে জীবনে করেনি, নিজ হাতে এক কাপ চা তৈরি করেও খাবার অভ্যাস নেই। তবুও বিয়ের প্রথম দিকে সংসার ভালোই চলছিল। মুক্তা সবসময় টি.ভি, ভিসিটি, সিনেমা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। কিন্তু বিয়ের বছর খানেক অতিক্রম করতে না করতেই মুক্তা ক্রমাগত উশৃঙ্খল আচরণ শুরু করল। বিয়ের পূর্ব থেকেই মুক্তার ক্লাবে যাওয়া, ড্রিঙ্ক করা, বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার অভ্যাস ছিল। কিন্তু পলাশ বিয়ের আগে তা ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে পারেনি। বিয়ের পর যখন জানতে পারল তখন আর করার কিছু ছিল না। শুধু তাই নয় পলাশ তার বাসায় প্রায়ই পর পুরুষের উপসি’তি অনুভব করল। কিন্তু নিশ্চিৎ না হয়ে পলাশ মুক্তাকে কিছু বলতে চায় না। পলাশ বরাবরই সকালবেলা অফিসের কাজে বের হয়ে যায়। লাঞ্চ সেরে নেয় বাইরে, ফিরে আসে সেই সন্ধ্যায়। একদিন মুক্তাকে না জানিয়ে পলাশ বিকেলে বাসায় ফিরল। বাসায় ঢুকতেই একজন লোককে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে দেখে তার মাথায় রক্ত উঠে গেল। তার ধারণা মিথ্যা হলেই বুঝি তার ভালো লাগতো। কিন্তু তার সন্দেহ সত্য হওয়ায় স্ত্রীর উপর ঘৃণায় হৃদয়ে ভরে গেল।
পলাশ দরজায় কলিংবেল টিপ দিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর মুক্তা নিজেই দরজা খুলে দিল। তার এলোমেলো চুল, চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা আর ঘরের মধ্যে সিগারেটের উচ্ছিষ্টাংশ দেখে পলাশ অন্য পুরুষের উপসি’তি সম্পর্কে আরো নিশ্চিৎ হলো। সে মুক্তাকে জিজ্ঞেস করল, মুক্তা কে এসেছিল বাসায়?
মুক্তা থতমত খেয়ে বলল, কেউ না তো।
আমি যে একজনকে যেতে দেখলাম, বলে পলাশ একটু থামল তারপর সিগারেটের উচ্ছিষ্টাংশ হাতে নিয়ে বলল, তবে সিগারেট কে খেয়েছে?
মুক্তা আর লুকাতে পারল না, খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, হ্যাঁ আমার এক বন্ধু এসেছিল।
পলাশ ঘৃণার স্বরে বলল, ছিঃ তোমার বন্ধুরা তাহলে বাসা পর্যন্ত আসতে শুরু করেছে।
মুক্তা সহস্রগুণ জ্বলে উঠে বলল, কেন আমার বন্ধুরা আমার বাসায় আসতে পারে না?
মুক্তার কথা শুনামাত্র পলাশ মুক্তার গালে একটা ঠাস করে চড় মেরে বলল, আমার তো কোন মেয়ে বন্ধু এ বাসায় আসে না। তুমি স্ত্রী হয়ে আমার বাসায় বসে অন্য পুরুষের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা করবে আর বলবে তারা তোমার বন্ধু।
তুমি আমাকে মারলে? জানো আমাকে দৈহিক নির্যাতনের অপরাধে আমি তোমাকে জেলে পাঠাতে পারি, এবারের মতো ছেড়ে দিলাম। আবার কোনদিন আমার গায়ে হাত তুললে আমিও তোমাকে ছাড়বো না। আর একটা কথা জেনে রাখো আমি গেঁয়ো মেয়ে নই যে তোমার কথায় উঠাবসা করবো? আমি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবো, যে ঘরে আমি থাকবো সে ঘরে আমার বন্ধুদের আসার অধিকার আছে। তুমি আমার স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করলে ভালো হবে না বলছি। বলে মুক্তা পাশের ঘরে চলে গেল।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে মামলা করার কথা শুনে পলাশের চোখ কপালে উঠল। সত্যিই তো কোন পুরুষ যদি নারী নির্যাতন করে তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ বিশেষ আইনে বিচার হবে। সে আইন কার্যকর করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপর বিশেষ দায়িত্ব আছে। কিন্তু কোন নারী যদি কোন পুরুষকে নির্যাতন করে তবে সংশ্লিষ্ট মহিলার বিচারের জন্য কোন আইন আছে কি না পলাশের জানা নেই। পলাশের ভয় সত্যি সত্যি মুক্তা যদি তার বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেয় তবে প্রচণ্ড বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হবে সেই সঙ্গে তার মান-সম্মান ভুলুণ্ঠিত হবে।
বছর দু’য়েক পরের কথা ততদিনে তাদের ঘর জুড়ে একটা ফুটফুটে মেয়ে এসেছে। পলাশ মনে মনে তার নাম আগেই সি’র করে রেখেছে। সুমনার নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে পলাশ তার নাম রেখেছে সুরভী। পলাশের ধারণা ছিল সুরভীর জন্মের পর মুক্তা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে ক্লাব, ড্রিঙ্ক, বয়ফ্রেন্ড অপেক্ষা মাতৃত্ববোধ তার কাছে বড় হবে এবং সে পুরোপুরি সংসারী হবে। কিন’ বাস্তবে তা কোনভাবেই সম্ভব হলো না। ক্লাবে যাতায়াত, ড্রিঙ্ক করা এবং বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ক্রমাগত বেড়েই চলল। সুরভীর প্রতি তার বিন্দুমাত্র খেয়ল নেই। কাজের বুয়াই তাকে সবসময় দেখাশোনা করে।
আজকাল মুক্তা প্রায়ই গভীর রাতে বাড়ি ফেরে, প্রতিদিন কোন না কোন বয়ফ্রেন্ড তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যায় অর্ধমাতাল কিংবা মাতাল অবস্থায়, কোনরকমে টলতে টলতে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নিজের স্ত্রীর পরপুরুষের সঙ্গে মেলামেশা দেখে পলাশের অনেক বার তাকে ডিভোর্স দেওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। কিন্তু তাতে তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সকলের কাছে উম্মোচন হয়ে যাবে। বন্ধু-বান্ধবদের কাছে তার সম্মানহানি হবে। এই ভেবে পলাশ দাঁতে দাঁত চেপে এমন অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেছে। সুরভীর জন্মের পর মুক্তাকে ডিভোর্স করা আরো জটিল হয়ে পড়েছে। এতদিন পলাশ মান-সম্মানের কথা ভেবে মুক্তাকে ডিভোর্স করেনি, সুরভী জন্মগ্রহণ করাতে এখন তার জীবনের কথা ভেবে পলাশ মুক্তাকে ডিভোর্স করার কথা ছেড়ে দিয়ে মায়ের স্নেহ আর বাপের আদর দিয়ে লালন-পালন করতে থাকল।
সুরভীর বয়স তখন তিন বছর। একদিন সুরভী প্রচণ্ড জ্বরে প্রলাপ বকছে। কখনো মা মা বলে চিৎকার করছে, চোখ দু’টো যেন লাল রক্ত জমাট বেধেছে। পলাশ অফিস থেকে ফিরে নিজেই কাপড় ভিজিয়ে কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। সুরভীর কষ্ট দেখে পলাশের মন যেন আর ধৈর্য ধরছে না, তার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে।
তখন রাত একটা বাজে, গাড়ি বারান্দার নীচে গাড়ি থামার শব্দ দেখে পলাশ জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল মুক্তার একজন বয়ফ্রেন্ড তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল। মুক্তা টলতে টলতে কোন রকমে ঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। পলাশ আর নিজেকে সামাল দিতে পারল না ক্রোধে তার শরীর রি রি করে উঠল। কোন রকমে কৃত্রিম ক্রোধ প্রতিরোধ করে বলল, এই বুঝি তোমার ফেরার সময় হলো?
মুক্তা জড়ানো গলায় বলল, কিছু বলছ?
হ্যাঁ আমি জানতে চাচ্ছি এখন রাত একটা বাজে কোন ভদ্রলোকের বউ হিসাবে না হোক, কোন মা তার তিন বছরের অসুস্থ কন্যাকে ফেলে রেখে এত রাত পর্যন্ত বাইরে থেকে ড্রিঙ্ক করে বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে বাসায় ফিরে?
কেন? তুমি তো মেয়েকে দেখছই? আর হ্যাঁ আমার বয়ফ্রেন্ডের সম্পর্কে কোন কথা বলবে না বুঝলে, নইলে ভালো হবে না কিন্তু-
কেন কী করবে তুমি? আমার স্ত্রী হয়ে আমাকে দাম্পত্য সুখ থেকে বঞ্চিত করে, ছোট্ট তিন বছরের মেয়েকে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত করে তুমি অন্য পুরুষের হাত ধরে চলতে পারো না। সমাজে আমার একটা মান-সম্মান আছে।
মুক্তা কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, তোমার মান-সম্মান আছে আর আমার নেই। আমার কি স্বাধীনভাব চলাফেরার অধিকার নেই?
পলাশ উত্তেজিত হয়ে বলল, না নেই, কারণ তুমি এখনো স্বাধীনতার মানে বুঝ না। ধর্ম, নৈতিকতা, শালীনতাবোধ, মান-সম্মান বিলিয়ে দৌযার নাম স্বাধীনতা নয় উশৃঙ্খলতা। আর তুমি আমার স্ত্রী হওয়াতে তোমার উশৃঙ্খলতাকে মেনে নিতে পারি না। কারণ তুমি আমার স্ত্রী হওয়াতে তোমার উশৃঙ্খলতার কারণে লোকজনের কাছে আমার মান-সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে এভাবে চলতে পারে না।
মুক্তা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, তবে আমাকে ডিভোর্স করো।
হ্যাঁ প্রয়োজনবোধে তাই করবো। বলে পলাশ সুরভীর কপালে জলপট্টি দিতে লাগল।
পলাশকে আর মুক্তাকে ডিভোর্স দিতে হলো না। পরদিন সকালবেলা মুক্তা সেই-ই যে বের হয়েছে তারপর আর কোনদিন ফিরে আসেনি। অনেকদিন পর পলাশ জানতে পেরেছে মুক্তা তার এক বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে কানাডা চলে গেছে।
তখন থেকে পলাশ সুরভীকে মায়ের স্নেহ আর বাপের আদর দিয়ে মানুষ করেছে। সুরভী এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। পলাশ যেমন তাকে আদর করে সুরভীও তেমনি শ্রদ্ধা করে। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবকিছুতেই যেন তারা বাপ মেয়ে মিলে শেয়ার করে। পৃথিবীতে তাদের যেন আর কেউ নেই। সুরভী তার বাবার জীবনের কষ্টের সব কথা জানে, এও জানে যে তার বাবা জীবনে কোনদিন সুখের মুখ দেখেনি। তাই সে তার বাবার দিকে খুব বেশি খেয়াল রাখে।
সেদিন রাতে পলাশের একেবারে ঘুম আসছিল না। নিঃসঙ্গতা বার বার তাকে তার জীবনের অতীতকে স্মরণ করে দিচ্ছিল। বিশেষ করে সুমনার কথা তার বার বার মনে পড়ছিল। সেই-ই যে বিশ বছর আগে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তারপর আর সুমনার সঙ্গে তার কোন যোগাযোগ নেই। হয়ত এতদিনে সুমনার ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। সুমনা কি তার কথা মনে রেখেছে? নাকি তার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলেছে? পুরানা স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থেকে কি লাভ? তবু আজ কেন জানি সুমনার কথা তার মনে পড়ছে। পলাশ সুমনার চিঠিটি বের করে কয়েকবার পড়ল। চিঠিটা পড়তে পড়তে কয়েকফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। পেঙ্গুইন কালি দিয়ে লেখা চিঠির লেখাগুলো যেন কাগজের ওপর পুড়ে বসেছে এমনিভাবে সুমনার হৃদয়েও কি তার স্মৃতির দাগ পুড়ে বসে গেছে। আবার কখনো মুক্তার কথা মনে পড়ল। আজ তার মনে দু’জন নারীর একটা তুলানামূলক চিত্র ফুটে উঠল। নারী সতীত্বের জন্য অগ্নি পরীক্ষা দিতে পারে বা জীবন দিতে পারে আবার গায়ের জামা বদলের মতো নিত্য নিত্য প্রেমিক পাল্টাতে পারে। নারী ফুলের মতো সৌরভ বিলাতে পারে আবার পঁচা ফুলের মতো দুর্গন্ধ ছড়াতে পারে। নারীর মন দেবতাও না বুঝে এ যেন রহস্যময়, বড়ই জটিল এর মর্মভেদ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার।
নিত্য দিনের মতো সুরভী টেবিলে নাস্তা তৈরি করে বাবাকে ডাকতে গেল। কিন’ এ কি? সকাল আটটা বাজে তখনো বাবার দরজা বন্ধ দেখে সুরভী অনেক ডাকাডাকি পর সে দরজা খুলে দিল
এ কি বাবা তোমার চেহারা? বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল সুরভী তারপর একটু থেমে বলল, যাও তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসো টেবিলে নাস্তা রেডি।
আজ যেন পলাশের মুখে রুচি নেই। নাস্তার টেবিলে বসে অনেকক্ষণ ধরে নাস্তা খাবার চেষ্টা করল। কোন কিছু খেতে না পেরে টেবিল ছেড়ে ড্রয়িং রুমে বসে পেপার পড়তে শুরু করল। সুমনা বাবার এ অবস্থা দেখে ড্রয়িং রুমে এসে বাবার গা ঘেঁষে বসল। তারপর মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, বাবা তোমার কি মন খারাপ?
না রে মা। বাবা সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।
সুরভী শাসনের সুরে বলল, বাবা আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী তারপর তোমার মেয়ে জন্ম থেকেই তোমাকে দেখছি, তোমার মুখ দেখে মনের খবর বরে দিতে পারি। আজ রাতে তোমার একেবারে ঘুম হয়নি মনটাও ভীষণ খারাপ, তাই না?
পলাশের চোখের সামনে সুমনার ছবি ভেসে উঠল। সুমনাও এমনি করেই শাসনের সুরে কথা বলতো। সুমনার সঙ্গে সুরভীর কোন সম্পর্ক নেই বটে কিন্তু সুরভীর সবকিছু যেন সুমনার মতোই হয়েছে। সুরভীর চাল-চলন কথাবার্তা সবকিছুই যেন সুমনার মতো। তাই সুরভীকে দেখলেই যেন পলাশের সুমনার কথা মনে পড়ে।
পলাশকে চুপ করে থাকতে দেখে সুরভী আবার বলতে শুরু করল, বুঝেছি নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ। চলো তোমার মনটা যখন খারাপ তখন এক জায়গা থেকে ঘুরে আসি। তোমার ভালো লাগবে।
আমার অফিস যেতে হবে না?
সুরভী শাসনের সুরে বলল, তুমি কারো চাকরি করো না যে একাদিন অফিস না গেলেই চাকরি চলে যাবে। আগে তো জীবন তারপর না অফিস, জীবনই যদি না বাঁচে তবে অফিস করে কী করবে। আমি অফিসে টেলিফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি তুমি আজ অফিস যাবে না।
কোথায় যাবে মা?
বাবা তোমার না স্মরণ শক্তি একেবারে কমে গেছে। তোমার বুঝি মনে নেই আজ চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইনস্‌ ডে।
আমাদের সময় তো এই দিনটি পালিত হতো না মা, আমরা সেসময় রোমাঞ্চকর দিনগুলি স্মরণীয় করে রাখতাম, সে দিনটি হতো বিভিন্ন জনের বেলায় বিভিন্ন। কিন্তু আজকাল আবার সবার জন্য একটা কমন দিন হয়েছে সেটা তো জানা ছিল না।
হ্যাঁ বাবা, চলো আজ টি.এস.সি’তে মেলা বসবে।
ভালোবাসার আবার মেলা হয় নাকি, এটা তো যার যার মনে ব্যাপার, ভালোবাসা লালন করতে হয় মনের মধ্যে, এটা মেলায় দেখার জিনিসও না, কেনার জিনিসও না আর বিক্রির জিনিসও না।
সুরভী আবার শাসনের সুরে বলল, বাবা আর একটা কথাও বলবে না, তুমি বসো আমি তৈরি হয়ে আসছি। বলে সুরভী তার রুমে চলে গেল।
গাড়ি শাহবাগ মোড়ে আসতেই টি.এ.সি থেকে কবিতা আবৃত্তির শব্দ কানে ভেসে এলো। টি.এস.সি’র মোড়ে ফুটপাথে সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে কাপলদের ভিড়। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, মধ্যবয়সী পুরুষ-মহিলা, সব বয়সী প্রেমিক-প্রেমিকা আজকের মেলায় অংশগ্রহণ করছে। কেউ ফুচকা খাচ্ছে, কেউ চানাচুর, চটপটি, ঝালমুড়ি নিয়ে ব্যস্ত কেউবা পরষ্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে বিগত দিনের স্মৃতিগুলি আবার উপভোগ করছে। আবার কোথাও দু’য়েকজন খাপছাড়া মানুষ যে নেই এমন নয়, কোথাও কোথাও দু’য়েকজন মধ্যবয়সী মানুষও চোখে পড়ল। কেউবা নিঃসঙ্গ হয়ে দুরে থেকে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি শুনছে। কারো চোখে-মুখে হতাশা আর সীমাহীন বেদনা ও ক্লান্তির ছাপ। পলাশ মনে মনে ভাবছে, হয়ত তারই মতো হবে কোন ব্যর্থ প্রেমিক। টি.এস.সি দিয়ে পলাশ সুরভীর হাত ধরে সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে ঢুকল। তার হৃদয়ে যেন ত্রিশ বছর আগের সুমনার স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে। পলাশের দুচোখ পানিতে ভরে গেল। সুরভীর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে পলাশের চোখে পড়ল আগত এক রমণীর মুখচ্ছবি, সেই-ই পরিচিত পথ চলা। পলাশ চোখ থেকে চশমা খুলে পরিস্কার করল, তার চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। টি.এস.সি থেকে তখন ভেসে আসছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা-
’’তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই-তবু,
গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই-তুমি
আজো এই পৃথিবীতে রয়ে গেছ।
কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ
বহুদিন থেকে শান্তি নেই।’’

সমাপ্ত

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*