স্বপ্ন

পার্কের গেট দিয়ে ঢুকতেই দু’জনের হাত এক হয়ে গেল, তারপর হাঁটতে হাঁটতে একটি গাছের নীচে গিয়ে বসল। মাহমুদ মুক্তির হাতে হালকা চাপ দিয়ে বলল, তোমার কি আমাদের প্রথম পরিচয়ের কথা মনে পড়ে?

তুমি বার বার করে আমার দিকে তাকাচ্ছিলে, কথা বলার সাহস পাচ্ছিলে না।

তবুও শেষ পর্যন্ত তো আমিই সাহস করে কথা বলেছিলাম, মাহমুদ বলল।

এখনও মনে আছে কি? কী বলেছিলে? মুক্তি বলল।

আমি বলেছিলাম, দেখ দু’জনে একই সঙ্গে পড়ি, একই ক্লাস রুমে ক্লাস করি, যতদূর জেনেছি তোমার বাড়িও পঞ্চগড় অথচ কেউ কারো সঙ্গে কথা বলি না এমনটি হতে পারে না। আমি মনে করি আমাদের পরিচয় থাকা প্রয়োজন।

মুক্তি বলল, আমি প্রথম বলেছিলাম অবশ্যই। তুমি বলেছিলে, আমি মাহমুদ।

আমি বলেছিলাম, আমি মুক্তি।

তারপর আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার বাড়ি কোথায়? তুমি বলেছিলে, ইসলামবাগ, পঞ্চগড়, মাহমুদ বলল।

মুক্তি বলল, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার বাড়ি কোথায়? তুমি বলেছিলে, আমার বাড়ি তেঁতুলিয়া।

এমনভাবে আমরা হয়ত অনেকক্ষণ গল্প করে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বেরসিক ক্লাসের বেল আমাদের গল্পের মাঝে ছন্দ পতন ঘটালো।

তাই বলে ছন্দ তো আর থেমে থাকেনি। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের জীবন যেন সর্বদাই ছন্দময়। মাহমুদ আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল।

মুক্তি মাহমুদের হাতের মধ্যে থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, কিন্তু জনাব ছন্দময় জীবন বুঝি আর বেশি দিন থাকছে না।

কেন?

কেন আবার এতদিন একসঙ্গে লেখা-পড়া করতাম তাই দু’জনে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছি এখন তো লেখাপড়া শেষ আমার সবসময় মনে হয় হয়ত সময় এলো দু’জনের বন্ধন ছিন্ন হবার।

মুক্তি তুমি অযথা চিন্তা করছ আমরা কি এখনই পড়ালেখা শেষ করবো? আমার ইচ্ছা এফ.সি.পি.এস করা।

তা না হয় করলে কিন্তু শেষ তো আছেই নাকি বলো?

মুক্তি তুমি কি এখনই বিয়ে করতে চাচ্ছ?

মুক্তি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিতেই মাহমুদ বলল, আমি এফ. সি. পি. এস করে আসি, প্লিজ এটুকু সময় দাও।

মুক্তি হেসে বলল, তুমি যখন বলছ, তবে তাই হবে, কিন্তু আমি ততদিন কী করবো?

তুমি বি.সি.এস দিবে, তুমি ভালো ছাত্রী, আমার বিশ্বাস তুমি অবশ্যই বি.সি.এস-এ টিকবে। চাকরি হলে চাকরি করবে। ততদিনে আমি এফ.সি.পি.এস করে এলেই ধুমধাম করে বিয়ে হবে।

মুক্তি মৃদু কণ্ঠে বলল, তুমি যত তাড়াতাড়ি বললে তত তাড়াতাড়ি সবকিছু হয়ে যাচ্ছে না, নিজের উপর আমার বিশ্বাস আছে বি.স.এস পরীক্ষায় আমি টিকবই এবং আমার চাকরি হবে। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে কত দিন থাকতে হবে সে কথা কী ভেবেছ?

মাহমুদ সান্ত্বনার সুরে বলল, মুক্তি তুমিও জানো আজকাল স্প্যাশালিস্ট ডাক্তার ছাড়া শুধু মাত্র সরকারি চাকরি করে বেশি কিছু করা যায় না।

সবই বুঝি, তারপরও সময়টাই শুধু আমার কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। কতদিন তোমার সঙ্গে দেখা হবে না। দীর্ঘ দিন অনেক অপেক্ষার পর যেদিন আমি ফিরে আসব সেদিন একেবারে খাঁটি বাঙালী রীতিতে তোমাদের বাড়িতে ঘটক পাঠিয়ে দেব। ঘটকের মাধ্যমে আলাপ আলোচনার পর আমাদের বিয়ে হবে। আমি সম্পূর্ণ অপরিচিতের মতো মুখে রুমাল ঢেকে তোমার সামনে উপস্থিত হবো আর তুমিও লাল টুকটুকে শাড়ি পরে ঘোমটায় মুখ ঢেকে রাখবে। মাথা থেকে ঘোমটা সরাতেই তুমি লজ্জায় রাঙা হয়ে যাবে।

মুক্তি মাহমুদের মুখে হাত দিয়ে বলল, ব্যাস ব্যাস আর বলতে হবে না। বিয়ের আগেই তোমার মুখে কিছু আটকাচ্ছে না, বিয়ের পর বুঝি মুখে লাগাম দিতে হবে।

তুমি বুঝি এখন থেকে মুখে টেপ লাগিয়ে দিতে চাচ্ছ?

প্রয়োজনে  তাই দেব। এখন চলো, মুক্তি বলল।

মাহমুদ বিনয়ের সাথে বলল, প্লিজ চলো একবার পার্কটা ঘুরে দেখি।

এখানে তো অনেকদিন এসেছি, এটা আবার নতুন কী?

ছাত্র জীবন শেষ হলো, দু’দিন পর তো মেডিক্যাল কলেজ ছেড়ে চলে যাচ্ছি, হয়ত আমরা দু’জন আর কোন দিন এমনভাবে এখানে আসব না। তাই জীবনের স্মৃতি বিজড়িত এই পার্কটা একবার ঘুরে দেখি, বলে মাহমুদ মুক্তি হাত ধরে সামনে পা বাড়াল।

 

দুই

 

কাসেম সাহেব রংপুর মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলের ওয়েটিং রুমে বসে ছিলেন। হোস্টেলের ওয়েটিং রুমে বসে কাসেম সাহেবর আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর আগের কথা মনে পড়ল মাহমুদ তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ত। খুব ছোট বেলা থেকে সে বেশ চঞ্চল আর কৌতূহলী ছিল। একদিন দুপুরে কাসেম সাহেব উঠানে বসেছিলেন। কাসেম সাহেবে ঘাড়ে দু’হাত রেখে মাহমুদ জিজ্ঞেস করল, বাবা দাদু মারা গেছে কেন?

পিতার মৃত্যুর শোক তখনো কাসেম সাহেবের মন থেকে মুছে যায়নি এমন সময় মাহমুদ এমন একটি প্রশ্ন করায় কাসেম সাহেবের চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি বেরিয়ে ছিল তবুও অবোধ শিশুর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পারেন নি, তিনি বললেন, অসুখ হয়েছিল বাবা।

মাহমুদ বিজ্ঞ লোকের মতো বলল, তুমি ডাক্তার দেখাতে পারোনি?

কাসেম সাহেব চোখ মুছে বলেছিলেন শহর ছাড়া গ্রামে তো ডাক্তার নেই বাবা আর তোর দাদুকে তো শহরে নিয়ে যাবার সময়ই পেলাম না।

বাবা বড় ডাক্তার গ্রামে থাকে না কেন? তুমি দেখ আমি বড় ডাক্তার হবো, গ্রামে থাকব, আমি কাউকে মরতে দিব না, মাহমুদ সরল চিত্তে বলেছিল।

কাসেম সাহেব মাহমুদকে কোলে নিয়ে তার কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, দোয়া করি বাবা তুই যেন বড় ডাক্তার হতে পারিস।

মাহমুদের ডাক্তার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর কাসেম সাহেবের আশীর্বাদ আল্লাহ্‌ কবুল করেছেন। মাহমুদ রংপুর মেডিক্যাল কলেজে এম.বি.বি.এস ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে আর কিছু দিন পরেই পাস করবে। গ্রামের যেসব রোগীরা অর্থাভাবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হত তারাও গ্রামে বসে উন্নত চিকিৎসা পাবে। মুখে মুখে মাহমুদের সুনাম এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। এমনভাবে নানা কথা ভাবতে ভাবতে কাসেম সাহেব আনমনা হয়ে পড়েছিলেন। এমনসময় মাহমুদ ওয়েটিং রুমে ঢুকল, বাবা তুমি, কখন এলে?

কাসেম সাহেব চমকে উঠলেন, এইতো বাবা একটু আগে।

চলো বাবা ভিতরে চলো বলে মাহমুদ কাসেম সাহেবকে তার রুমে নিয়ে গেল। একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বলল, বসো বাবা, মা কেমন আছে?

কাসেম সাহেব চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ক’দিন থেকে তোর কোন খবর পাচ্ছিনা, তোর মা সবসময় তোর কথা বলছে।

বাবা আমি না বলেছি আমার জন্য কোন চিন্তা করবে না। প্রেশারটা চেক করিয়েছ?

করিয়েছি, প্রেশারটা একটু বেড়েছে।

ঔষধ খাওয়াচ্ছ না?

ঔষধ তো খাচ্ছে, কিন্তু একদিন ঔষধ না খেলে তো আবার বেড়ে যাচ্ছে।

নিয়মিত ঔষধ খেতে হবে আর খাওয়া-দাওয়া যেভাবে বলেছি যেমন তেল জাতীয় খাবার খাওয়াতে যাবে না, নিয়মিত হাঁটতে হবে আর কোন দুশ্চিন্তা করা যাবে না।

তুই একবার বাড়িতে চল বাবা, তোর মাকে বলে আসবি।

হ্যাঁ বাবা আমারও তো পরীক্ষা শেষ আগামী শুক্রবার বাড়ি যাব।

কাসেম সাহেবের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি আনন্দে গদ গদ হয়ে বললেন, ঠিক আছে বাবা, তুই এলে তোর সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসিস, এলাকার গরীব রোগী দেখার জন্য তুই প্রস্তুতি নিয়ে আসিস ।

মাহমুদ আমতা আমতা করে বলল, বাবা দেড়টা বাজে চলো ভাত খেয়ে আসি।

মাহমুদ কাসেম সাহেবসহ তার রুম থেকে বের হয়ে মেডিক্যাল মোড়ের একটা হোটেলে ঢুকল। কাসেম সাহেব ভাত খেতে খেতে অনেক গল্প করলেন। শুধু তাই নয়, মাহমুদের বিয়ে, মাহমুদের শৈশবের কথাও স্মরণ করে দিলেন। কাসেম সাহেব খাওয়া শেষ করে চা খেতে খেতে বললেন, আর হ্যাঁ তোর সঙ্গে যে জোয়ারদার সাহেবের মেয়েটা পড়ত, কী যেন নাম?

বাবা ওর নাম মুক্তি।

হ্যাঁ মুক্তি খুব ভালো মেয়ে, তোর সঙ্গে কথা হয় নিশ্চয়ই।

মাহমুদ মাথা নত করে বলল, জি বাবা।

ওর পরীক্ষা তো শেষ হয়েছে, আমাদের বাড়িতে না হয় নিয়ে আসিস তোর মা দেখলে খুব খুশি হবে। আর হ্যাঁ তোর সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসিস বলে কাসেম সাহেব হোটেল থেকে বের হলেন। মাহমুদও তার বাবার সঙ্গে মেডিক্যাল মোড়ে গিয়ে তার বাবাকে বাসে তুলে দিল।

 

তিন

কাসেম সাহেব বাড়ি ফিরে মাহমুদের গ্রামে আসার কথা বলতেই মোর্শেদার দু’চোখ সজল হয়ে উঠল। ছেলের আসার খবরে যেন বাড়িতে এক রকম ধুম পড়ে গেল। সেদিন বিকেল বেলা কাসেম সাহেব শালবাহান হাটে ঢোল পিটিয়ে মাহমুদের রোগী দেখার খবরটি এলাকার লোক জনকে জানিয়ে দিলেন। সামনে হাটের ইজারাদারের চৌকিদার একটি টিনের বাক্স বাজিয়ে যাচ্ছিল পিছনে পিছনে কাসেম সাহেব সাহেবের বাড়ির কাজের লোকটি বলতে বলতে যাচ্ছিল আগামী শুক্রবার বিকেল বেলা এবং শনিবার কাসেম মাস্টার সাহেবের ছেলে ডাক্তার মাহমুদ তাঁর নিজস্ব বাড়িতে রোগী দেখবেন। আপনি নিজে অথবা আপনার কোন আত্নীয় স্বজন যদি অসুস্থ থাকেন তবে উক্ত সময়ে মাস্টার সাহেবের বাড়িতে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।

এমনভাবে হাট ঢুলী সমস্ত ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করছিল আর কাসেম সাহেব পিছনে পিছনে হাঁটছিলেন। পথিমধ্যে কাসেম সাহেবের এক বন্ধু জহিরুল জোরে ডাক দিলেন, এই কাসেম কী খবর?

এই তোরা গোটা হাটে ঢোল দে আমি আসছি, বলে কাসেম সাহেব তাঁর বন্ধুর কাছে চলে গেলেন, শুক্রবার ছেলেটা আসবে, ভাবলাম এলাকার কিছু রোগী দেখুক।

এটা তো খুব ভালো কথা। কাসেম চল দু’বন্ধু এক সঙ্গে দু’কাপ চা খাই। কতদিন এক সঙ্গে একদণ্ড বসে গল্প করতে পারিনা।

এই তোরা যা আমি আসছি, বলে কাসেম সাহেব তাঁর বন্ধুসহ চায়ের দোকানে ঢুকলেন।

দোকানে তখন খরিদদারদের অনেক ভিড়। কাসেম সাহেবকে ভিতরে ঢুকতে দেখে কয়েকজন বেঞ্চে সিট ছেড়ে দিল। কাসেম সাহেব একটা বেঞ্চে বসে সবাইকে বসার জন্য অনুরোধ করলেন।

কাসেম সাহেবকে শরিফুল জিজ্ঞেস করল, মাস্টার সাহেব আপনার ছেলে নাকি ডাক্তার হইছে। কী রকম ডাক্তার? শালবাহান বাজারের যে মফিজুল ডাক্তার আছে ওর মতো?

শরিফুলের পাশে বসা একজন বলল, এই তুই কী বলিস স্যারের ছেলে অনেক বড় ডাক্তার, কী বলে যেন এম.বি.বি.এস ডাক্তার হইছে।

এবার বুঝছিস, কাসেম সাহেব বললেন।

শরিফুল আবার বলল, মাস্টার সাহেব আমার ছেলেটা অনেকদিন থেকে অসুস্থ, ভাবছি আপনার ছেলেকে একবার দেখাব।

অবশ্যই দেখাবে।

শরিফুল আমতা আমতা  করে বলল, ভিজিট যে কত?

কাসেম সাহেব প্রচণ্ড রেগে ধমকের সুরে বললেন, আমি কি ভিজিটের কথা বলেছি? টাকা রোজগারের জন্য কি আমি ছেলেকে ডাক্তারি পড়িয়েছি? আমি ছেলেকে ডাক্তারি পড়িয়েছি মানুষের সেবা করার জন্য, এলাকার গরীব দুঃখী মানুষের কাছ থেকে টাকা রোজগারের জন্য নয়।

জহিরুল এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন এবার শরিফুলের উপর তিনিও রেগে গেলেন, শরিফুল তোরা বড় বেশি বুঝিস, এতদিনও তোরা মাস্টারকে চিনলি না

শরিফুল নিজের সিট থেকে নেমে কাসেম সাহেবের হাত ধরে বলল, মাস্টার সাহেব আমার ভুল হয়েছে। আমাকে মাফ করে দেন।

কাসেম সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, চা খেয়েছিস? বস।

শরিফুল সিটে গিয়ে বসলে কাসেম সাহেব দোকানদারকে বললেন, এই শরিফুলকে চা দে তো।

কাসেম সাহেব ঘন ঘন কয়েকবার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চা শেষ করে বললেন, শরিফুল তোর ছেলেকে নিয়ে আসিস, এই জহিরুল চল উঠি।

তারপর কাসেম সাহেব হোটেল থেকে বের হলেন।

 

চার

 

সেদিন সকাল বেলা বিছানা ছেড়েই মাহমুদের মা মোর্শেদা বেগম মাহমুদের থাকার ঘরটি কাজের মেয়েকে দিয়ে ভালোভাবে ঝাড়ু দিলেন। তারপর বিছানা বালিশ সাজিয়ে মাহমুদের জন্য রান্নার কাজে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পরও মাহমুদ না আসায় মা মোর্শেদা খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়লেন। মোর্শেদা কাসেম সাহেবকে বললেন, যাও তো একবার বের হয়ে দেখতো, ছেলেটার আসতে দেরি হচ্ছে কেন?

কাসেম সাহেব বাড়ি থেকে বের হতেই রিক্সা অদূরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। কাসেম সাহেব চোখে চশমা লাগিয়ে দেখলেন। হ্যাঁ মাহমুদই তো। তারপর তিনি জোরে বললেন, কই গো তোমার ছেলে এসেছে।

মাহমুদ রিক্সা বিদায় দিয়ে তার বাবার কাছে এসে সালাম দিতেই কাসেম সাহেব সালামের জবাব দিয়ে বললেন, দেরি কেন বাবা? পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো?

না বাবা পথে কোন অসুবিধা হয়নি, বলতে বলতে মাহমুদ তার বাবার পিছু পিছু বাড়িতে ঢুকল।

মোর্শেদা মাহমুদের কাছে এসে দাঁড়ালেন, বাবা পথে পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো? সকালে কী খেয়েছিস? মুখটা একেবারে শুকিয়ে গেছে।

কোন অসুবিধা হয়নি মা। সকালে খুব ভালোভাবে নাস্তা খেয়ে বেরিয়েছি আর মুখ শুকিয়ে যাবার কথা বলছ একথা তুমি সব সময় বলো, বলতে বলতে মাহমুদ তার ঘরে গিয়ে ঢুকল।

বাবা তুই হাত মুখ ধুয়ে নে আমি খাবারের ব্যবস্থা করছি বলে কাসেম সাহেব ও মোর্শেদা চলে গেলেন। মাহমুদ হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এসে ঢুকল। এমন সময় মোর্শেদা জোরে ডাক দিলেন, মাহমুদ খেতে আয়।

উঠানে পাতানো টেবিলে মাহমুদ আর তার বাবা মুখোমুখি খেতে বসেছে মাহমুদের মা খাবার পরিবেশন করছেন। খাবার টেবিলে বসে মাহমুদের মনে হয় তার মা ঠিক আগের মতোই তার পছন্দের খাবার রান্না করেছে। মাহমুদ টেবিলে রাখা সবক’টি ঢাকনা খুলে দেখল। তারপর মৃদু হেসে বলল, মা তুমি এত কিছু রান্না করেছ?

তুই এতদিন পর আসবি আর আমি তোর পছন্দের খাবার তৈরি করবো না, তাই কী হয়? তুই এখন বুঝবি না যেদিন ছেলে-মেয়ের বাবা হবি সেদিন বুঝবি বাবা-মা’র কষ্ট, বলতে বলতে মোর্শেদার চোখ সজল হয়ে উঠল। কাসেম সাহেব এতক্ষণ মাথা নিচু করে খাবার খাচ্ছিল এবার মুখ তুলে মোর্শেদার দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললেন, তুমি চুপ কর কথায় কথায় শুধু চোখের পানি ফেল না।

এমন সময় শরিফুল তার ছেলেকে কোলে নিয়ে আঙ্গিনায় এসে দাঁড়াল কাসেম পিছনে তাকাতেই শরিফুলকে দেখে বললেন, শরিফুল একটু বস।

জি মাস্টার সাহেব বলে শরিফুল বাইরে চলে গেল। এবার মোর্শেদা রাগের সুরে বললেন, এতদিন পর ছেলেটা এলো আর তুমি হাটে ঢোল দিয়ে ছেলেটার শান্তি নষ্ট করলে।

মাহমুদ মুখ তুলে বলল, কী হয়েছে মা?

তোর বাবাকে বল।

কী হয়েছে বাবা?

ডাক্তারি পাস করে তুই এসেছিস এলাকার অনেক গরীব দুঃখী মানুষ যারা টাকার অভাবে শহরে গিয়ে বড় ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারে না তাদের সুবিধার জন্য গতকাল হাটে ঢোল দিয়ে তোর আসার কথা জানিয়ে দিয়েছি।

শুধু কি তাই? তুই নাকি রুগী দেখবি? খাওয়ার পরে কি একটু বিশ্রাম নিবি, এখন…

মাহমুদ তার মায়ের কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, মা তুমি একটু থামো তো. আমি দুপুরে খাবার পর কখনো বিশ্রাম নেই না।

তারপর মাহমুদ খাওয়া শেষ করে বৈঠক খানায় শরিফুলের ছেলেকে দেখল। ছেলেটির বয়স পাঁচ কিংবা ছয় বছর হবে। কিন্তু সে তুলনায় শারীরিক বৃদ্ধি অত্যন্ত কম এবং পেট তুলনামূলকভাবে বড়। মাহমুদ ছেলেটির পেট টিপে দেখল, চোখের পাতা দেখল। তারপর শরিফুলকে জিজ্ঞেস করল, বাচ্চাকে কৃমির ঔষধ খাওয়াইছেন কখনো?

হুজুরে পড়া পানি দিছে তাই কয়েকদিন খাওয়াইলাম।

মাহমুদ ঈষৎ রাগান্বিত স্বরে বলল, আপনার বাচ্চার পেটে কৃমি হয়েছে ঔষধ লিখে দিলাম, সেরে যাবে ইনশাল্লাহ।

 

পাঁচ

জোয়ারদার সাহেবের বিশাল স্টক বিজনেস চাতাল, হাড়ীভাসায় দিগন্ত বিস্তীর্ণ জমি। কোন কিছুর অভাব নেই। বেশ হাসি-খুশি, অতি সহজ মানুষ দিন রাত ব্যস্ত থাকেন নিজের ব্যবসা আর জমি জিরাত নিয়ে। জোয়ারদার সাহেবের স্ত্রী হাসিনা বানু আরো সহজ-সরল, সর্বদাই মিষ্টি হেসে কথা বলেন। সারাদিন ব্যস্ত থাকেন স্বামী-সন্তানদের খাবারের আয়োজন আর সংসার গুছানোর কাজ নিয়ে। বেশ সুখের সংসার তাদের। বড় মেয়ে মুক্তি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে সদ্য এম.বি.বি.এস পাস করে বাসায় ফিরেছে। তাই জোয়ারদার সাহেব আর হাসিনার আনন্দের সীমা নেই। মুক্তি বাসায় আসার পর জোয়ারদার সাহেব বাজার থেকে মিষ্টি আনিয়েছেন এবং বাসায় যত লোকজন আসছে সবাইকে মিষ্টি মুখ করে তার আনন্দের সংবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। মুক্তির ছোটবোন তৃপ্তি ঠিক মুক্তির উল্টা, মুক্তি যেমন শান্তশিষ্ট, ভদ্র, মার্জিত, বুদ্ধিমতী, তৃপ্তি তেমনি চঞ্চল, অহঙ্কারী, উশৃঙ্খল এবং পড়াশুনায় অমনোযোগী। তৃপ্তি পর পর দুইবার ফেল করার পর অনেক কষ্টে এ বছর এস.এস.সি পাস করে, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইন্সটিটিউটে এইচ.এস.সিতে ভর্তি হয়েছে। পড়াশুনায় তেমন মনোযোগ নেই কলেজের নাম করে বেশির ভাগ দিনই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেয়। আর কতজনকে যে টেলিফোন নাম্বার দেয় তার ঠিক নেই। দিন রাত শুধু তার ফোন আসতেই থাকে।

অনেকক্ষণ থেকে টেলিফোন বেজেই চলছে তৃপ্তি তখনো বাসায় ফিরেনি অগত্যা মুক্তি রিসিভার তুলে বলল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে ছেলে কণ্ঠের ধ্বনি ভেসে এলো, হ্যালো নীলা।

না ভাই এখানে তো নীলা নামে কেউ থাকেনা, রং নাম্বার, বলে মুক্তি রিসিভার রেখে দিল।

মুক্তি রিসিভার রেখে দিতেই আবার রিং বেজে উঠল। মুক্তি আবার রিসিভার তুলল। আবার একই কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো ছেলেটি টেলিফোন নাম্বারটি বলল।

মুক্তি বলল, হ্যাঁ নাম্বার তো ঠিকই আছে। কিন্তু এখানে তো নীলা নামে কেউ থাকে না। আপনি কে বলছেন ভাই প্লিজ।

আমার নাম সুমন বলেই ছেলেটি লাইনটি কেটে দিল।

মুক্তি রিসিভার রেখে দিল। কিছুক্ষণ পর তৃপ্তি বাসায় ফিরলে মুক্তি জিজ্ঞেস করল, তৃপ্তি সুমন নামে একটা ছেলে ফোন করেছিল।

কী বলেছে আপা?

নীলা নামে কাউকে খুঁজছিল, আশ্চর্য নাম্বারও মিলে গেছে, আমি বললাম নীলা নামে তো এখানে কেউ থাকে না।

তৃপ্তির চোখে-মুখে রহস্য ফুটে উঠল, সে কোনরকমে পালিয়ে গেল।

মুক্তির মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলো তবে কি তৃপ্তিই নীলা নামের ছদ্ম নাম ধারণ করে প্রেম করছে। কয়েকবার টেলিফোন এসেছিল। গতকাল নিশা নামে আরো একজন মেয়েকে খুঁজেছে। তৃপ্তি শেষ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক ছেলের সঙ্গে প্রেম করছে। এতদূর অধঃপতন ছিঃ তৃপ্তি, ছিঃ ঘৃণায় মুক্তির মন ভরে গেল।

কিছুক্ষণ পর আবার টেলিফোনের রিং একবার বেজেই অফ হয়ে গেল। মুক্তি একরকম কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে আড়ি পেতে তৃপ্তির কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে রইল।

তৃপ্তি টেলিফোনে ডায়াল করে রিসিভার কয়েক মুহূর্ত কানের কাছে ধরে রাখল। তারপর বলল, হ্যালো সুমন, টেলিফোন করেছিলে। তোমাকে না বলেছি টেলিফোন করবে না, শুধু একটা রিং হলেই লাইন কেটে দিবে আমি রিং ব্যাক করবো বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তৃপ্তি এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে বলল, সুমন আপা এসেছে, এ’কদিন আর রিং করবে না। আমি কাল আসছি কলেজে দেখা হবে বলে তৃপ্তি টেলিফোন রেখে দিল। তৃপ্তি টেলিফোন রেখে দেওয়ার পর মুক্তি রুমে প্রবেশ করে বলল, তৃপ্তি।

জি আপা।

একসঙ্গে কয়জনের সঙ্গে প্রেম করিস রে?

আপা।

হ্যাঁ এর আগে একবার নিশা নামে একজনকে খুঁজছিল, এখন আবার নীলা নামে একজনকে খুঁজল, আর তুই তো কথা বললি, নীলা নাম দিয়ে শেষ পর্যন্ত তুই ..

তৃপ্তি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মুক্তি ঘৃণার স্বরে বলল, ছিঃ তৃপ্তি, বাবা ব্যস্ত মানুষ আর মা একেবারে সাদাসিধে তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তুই তাদের মাথা হেঁট করার কাজে নেমেছিস।

তৃপ্তি রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য এক পা এক পা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল মুক্তি সেদিকে খেয়াল না করে বলেই যাচ্ছিল, এক সঙ্গে তিনজনের সঙ্গে প্রেম করিস তারপর যখন দু’জনের সঙ্গে প্রতারণা করবি তখন অন্যরা যদি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে? তারা যদি তোর এই সুন্দর মুখের উপর এসিড ছুঁড়ে মারে? তখন কী হবে? এক সময় মুক্তি তাকিয়ে দেখল তৃপ্তি নেই তারপর নিজের ক্রোধ মনের মধ্যে চেপে রইল।

 

ছয়

কাসেম সাহেব মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর সেই স্বপ্নের বাগানে এসে দাঁড়ালেন। মাহমুদ জিজ্ঞেস করল, তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন বাবা?

আমি জানি তুই একথা জিজ্ঞেস করবি। তবে শোন আমার বাবা যেদিন বিনা চিকিৎসায় মারা যায় সেদিনই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি মাঝিপাড়ায় একটা ক্লিনিক করবো, তোর বয়স যখন পাঁচ/ছয় বছর তখন তুই কী হবি জিজ্ঞেস করতেই তুই বলতিস আমি ডাক্তার হবো। তোর শিশু মুখের নিষ্পাপ কথা শুনে আমি ক্লিনিক করার সিদ্ধান্তে আরো উৎসাহিত হই। কিন্তু বাবা আমার তো এখনো লেখাপড়া শেষ হয়নি।

কাসেম সাহেব চমকে উঠলেন, লেখাপড়া শেষ হয়নি মানে?

হ্যাঁ বাবা আজকাল তো কোন বিষয়ে স্প্যাশালিস্ট না হলে ভালো ডাক্তার হওয়া যায় না, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এফ.সি.পি.এস করবো।

করবি, কিন্তু তারপর তো শেষ নাকি?

হুঁম।

তখন ক্লিনিক করবি। দেখছিস না এখানকার খেটে খাওয়া অশিক্ষিত মানুষগুলোর চিকিৎসা সম্পর্কে এখনও কত গোঁড়ামি? এখনো পেটে কৃমি হলে ঝাড় ফুক দিয়ে সারানোর চেষ্টা করে। আসলে এখানে একটা ক্লিনিক হওয়া খুব জরুরী।

চল আমার বাগানটা একবার ঘুরে দেখি।

হুঁম বাবা চলো, বলে মাহমুদ তার বাবার সঙ্গে সমস্ত বাগানটা ঘুরে দেখল, তারপর বাড়িতে ফিরল।

কাসেম সাহেব মোর্শেদা বলে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে ঢুকলেন। মোর্শেদা কাসেম সাহেবের সামনে এসে বললেন, কী হলো এত জোরে জোরে ডাকছ কেন?

মোর্শেদা আমি দেখতে পাচ্ছি আমার স্বপ্ন, আমার চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে, আমি দেখতে পাচ্ছি আমার বাগানের দশ হাজার গাছ মানে কমপক্ষে তিন কোটি টাকা, তিন কোটি টাকা দিয়ে দিয়ে আমি মাঝিপাড়ায় একটা অত্যাধুনিক ক্লিনিক তৈরি করেছি। আর আমাদের মাহমুদ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে এলাকার মানুষের চিকিৎসা করছে, দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসার জন্য মানুষ মাঝিপাড়ার মতো অজো পাড়ায় ছুটে আসছে। সবার মুখে মুখে থাকবে কাসেম মাস্টার আর তার ছেলের প্রশংসা, তখন আমার বুকটা গর্বে ভরে যাবে।

তুমি এভাবে হাটে বাজারে ঢোল দিওনা তো শেষে লোকজন তোমাকে পাগল বলবে, সবসময় শুধু ক্লিনিক ক্লিনিক করে পাগলামি করবে আর ছেলে লেখাপড়া করে সারাজীবন কাটিয়ে দিবে, ছেলের বিয়ে দিতে হবে না, আমাদের বয়স হলো আর ক’বছর পর তুমি রিটায়ার্ড করবে, আমার স্বাস্থ্য দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছে আমাদের বুঝি দাদা-দাদী হওয়ার সাধ নেই?

মায়ের কথা শুনতে শুনতে মাহমুদ মাথা নত করে নিজের ঘরে চলে গেল।

মোর্শেদা কাসেম সাহেবকে উঠানে একটা মোড়া বসতে দিয়ে এবং নিজে মুখোমুখি একটি মোড়াতে বসে জিজ্ঞেস করলেন, কী গল্প করলে ছেলের সঙ্গে?

হু, যা বুঝলাম তাতে মনে হয় ওর বিয়ে করতে আরো অনেক দেরি আছে।

আরও কতদিন দেরি, তোমার মনে নেই ওর বয়স কত বছর হলো?

হ্যাঁ সবই তো বুঝলাম, তোমার ছেলে আরও লেখা-পড়া করবে। আগে তো মনে করতাম এম.বি.বি.এস ডাক্তারই মনে হয় সবচেয়ে বড় ডাক্তার এখন শুনছি কোন বিষয়ে স্প্যাশালিস্ট না হলে নাকি তাকে ভালো ডাক্তার বলে না। তাই তোমার ছেলেও বলছে এখন এফ.সি.পি.এস পাস করবে।

মোর্শেদা কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললেন, তোমার সব কথা বলতে পারলে আর আমার একটা দায়িত্ব পালন করতে পারলে না, শেষ পর্যন্ত কথাটা আমাকেই বলতে হবে, বলে মোর্শেদা মাহমুদকে ডাকলেন।

 

সাত

ঢাকা পৌঁছেই মাহমুদ উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে গমনের জন্য কাগজ-পত্র প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাহমুদের এক সিনিয়র ভাইয়ের সহযোগিতায় ইংল্যান্ডে এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম সংগ্রহ করল, ফরম পূরণ করে পাঠানোর পর থেকে মাহমুদ পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। আজকাল মুক্তির সঙ্গে মাহমুদের খুব একটা দেখা হয় না। মুক্তি ঢাকায় তার মামার বাসায় উঠেছে। সেখানে থেকে একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরিতে যোগদান করেছে তারপর আছে বি.সি.এস পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে মুক্তি নিজেও খুব ব্যস্ত। সেদিন ক্লিনিকে মুক্তির ডিউটি ছিল না তাই মুক্তি মাহমুদকে কোন কিছু না জানিয়েই হঠাৎ করে মাহমুদের মেসে চলে গেল।

মাহমুদ তখন তার বিদেশে যাবার কাগজ-পত্র গুছাচ্ছিল। মুক্তিকে দেখে তাড়াহুড়া করে কাগজপত্র ট্রাংকের মধ্যে রেখে বলল, মুক্তি হঠাৎ করে কোন কিছু না বলেই?

হ্যাঁ কয়েকদিন থেকে তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না, ভাবলাম একবার তোমার সঙ্গে দেখা করে আসি।

তোমার ক্লিনিক, বি.সি.এস পরীক্ষার প্রস্তুতি সবকিছু নিয়ে তুমিও তো আজকাল খুব ব্যস্ত।

আমার ব্যস্ততার আর এক সপ্তাহ, যদি বি.সি.এস পরীক্ষায় পাস করি তবে সরকারি চাকরিতে যোগদান আর না হয় বেসরকারি ক্লিনিকেই। আমার তো আর এফ.সি.পি.এস বা পি.এইচ.ডি করে দেশের বিখ্যাত ডাক্তার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই।

মুক্তি এভাবে বলছ কেন? আমি স্প্যাশালিস্ট ডাক্তার হই তা কি তুমি চাও না?

তোমার সার্থকতা আমি চাব না? তোমার সফলতায় আমিই সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হবো। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।

মাহমুদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী কথা?

মাহমুদ তোমার মনে আছে আমাদের প্রথম পরিচয়ের পর থেকে তোমার স্মৃতি আমি মুহূর্তের জন্য মুছে ফেলতে পারিনি, এই পাঁচ বছরের মধ্যে আমার একটানা সাতদিন আলাদা থাকিনি, দু’একদিন দেখা না হলে আমি কেমন উদাসীন হয়ে যেতাম। অথচ তোমাকে ছেড়ে এখন কয়েক বছর থাকতে হবে, বলতে বলতে মুক্তির গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গেল।

মাহমুদ সান্ত্বনার সুরে বলল, মুক্তি তুমি ভেঙ্গে পড়ছ কেন? আমি লেখাপড়া করতে যাচ্ছি। তুমি দেখ আমি ঠিক একদিন লেখাপড়া শেষ করে আবার তোমার কাছে চলে আসব।

তোমার কথাই যেন সত্য হয় মাহমুদ আমার এখন শুধু অপেক্ষার পালা, মুক্তি বলল।

মাহমুদ প্রতিবাদ করে বলল, শুধু তোমার অপেক্ষার পালা নয় মুক্তি আমাদের দু’জনের অপেক্ষার পালা।

এমনসময় মাহমুদের রুম মেট রুমে ঢুকে মাহমুদের হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল, মাহমুদ তোর চিঠি খুব সম্ভব বিদেশ থেকে এসেছে, মুক্তি কখন এলে? মাহমুদ চা-পানি কিছু-

কিছু লাগবে না ভাই আমি এখনি চলে যাব, মুক্তি বলল।

না তুমি বসো আমি বরং আসছি বলে সে চলে গেল। মাহমুদের চিঠি পড়তে পড়তে মাহমুদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল তার এতদিনের পরিশ্রম, আশা-আকাঙ্ক্ষা সব বুঝি ধূলিসাৎ হয়ে গেল, মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেল। সে জিজ্ঞেস করল, কী হলো মাহমুদ? খারাপ কিছু?

মাহমুদ চেয়ারে ধপাস করে বসে বলল, মুক্তি আমার বুঝি আর বিদেশ যাওয়া হচ্ছে না।

কেন?

মুক্তি এ কথাটা তুমি নেই বা জানলে।

জানব না কেন? আমার এমন কি বিষয় আছে যা তুমি জানো না আর তোমার এমন কি বিষয় আছে যা আমি জানি না।

তুমি সবই জানো, মাহমুদ বলল।

সবই যদি জানি তবে তোমার বিদেশ যাওয়া হবে না তার কারণটা আমি জানব না কেন?

মাহমুদ একটা নিঃশ্বাস টেনে বলল, মুক্তি আমার বিদেশ যাবার জন্য প্রথমে বাবার কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা চেয়েছিলাম সে টাকায় হচ্ছে না, তুমিও জানো বাবা একজন স্কুল মাস্টার তার পক্ষে আরো দুই লক্ষ টাকা সংগ্রহ করা কষ্টকর। তবুও বলতে হবে তাছাড়া তো এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।

মাহমুদ তোমাকে একটা অনুরোধ করবো, আগে বলো রাখবে কি না? বলে মুক্তি হাত বাড়িয়ে দিল।

মাহমুদ মুক্তির হাতে হাত রেখে বলল, রাখব।

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম তখন বাবা আমার দশ বছর মেয়াদি একটা একাউন্ট করেছিল। আমি যখন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলাম, তখন থেকে সেটা আমি চালিয়েছি। গত মাসে দশ বছর পূর্ণ হয়েছে এবং আমি এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা পেয়েছি। আমি সেখান থেকে তোমাকে পুরো টাকাটাই দিতে চাই। বাকী আশি হাজার টাকার জন্য বাবাকে চিঠি লিখি। তুমি তো জানো বাবাকে চিঠি লিখলেই আমার কাছে টাকা পাঠিয়ে দিবে।

মাহমুদ বলল, না মুক্তি তোমার কাছ থেকে আমি টাকা নিতে পারব না।

টাকার জন্য তোমার লেখাপড়া করা হবে না আর আমার টাকা দিয়ে আমি বিলাসিতা করবো তা কী করে হয়? তারচেয়ে আমার টাকা যদি আমার ভালোবাসার নামে উৎস্বর্গ করতে পারি তবে সে যেমন আমার কপাল তেমনি আমার টাকারও ভাগ্য।

মুক্তি আমি যেমন তোমার একটা অনুরোধ রেখেছি তেমনি তোমাকেও আমার একটা অনুরোধ রাখতে হবে।

বলো।

তুমি টাকার জন্য বাড়িতে চিঠি লিখতে পারবে না।

মুক্তি তৃপ্তির সাথে বলল, বেশ তাই হবে কিন্তু টাকার অভাবে যেন তোমার বিদেশ যাওয়া বন্ধ না হয়।

 

আট

মাহমুদের চিঠি পাবার পর থেকেই কাসেম সাহেব টাকার জন্য অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনভাবে টাকা জোগাড় করতে পারলেন না। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে কাসেম সাহেব তাঁর হারাদিঘীর দু’বিঘা জমি বিক্রয় করে মাহমুদের বিদেশ যাবার টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

সেদিন সকালবেলা কাসেম সাহেব ভজনপুর বাজারে গেলেন, তাঁর এক প্রাক্তন ছাত্র শাহিরুল পাথরের ব্যবসা করে অনেক টাকা পয়সার মালিক হয়েছেন। এ এলাকায় কেউ জমি বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিলে একবার তার দ্বারস্থ হয়। কাসেম সাহেবও ভজনপুর বাজারে গিয়ে শাহিরুলের অফিসে গেলেন। শাহিরুল কাসেম সাহেবকে দেখে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বললেন, স্যার আপনি? আমাকে ডেকে পাঠালেই তো আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতাম।

শাহিরুল ব্যস্ত হবার দরকার নেই বাবা, তুমি বসো।

শাহিরুল চেয়ারে বসে সজোরে ডাক দিলেন, দিপু, দিপু।

পনের/ষোল বছর বয়সের হাল্কা পাতলা গড়নের একটা ছেলে অফিসে ঢুকে বলল, আমাকে ডেকেছেন ভাইজান?

হ্যাঁ, হোটেল থেকে বড় রসগোল্লা আর চা নিয়ে আয়।

দিপু চলে গেলে শাহিরুল বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার বলুন আমার কাছে হঠাৎ কী মনে করে?

কাসেম সাহেব বললেন, শাহিরুল তোমার কাছে আসার আগে আমার সমস্যাটা নিয়ে দু’একজনের সঙ্গে আলাপ করলাম, সবাই তোমার কথাই বলল।

কী বলল স্যার?

কাসেম সাহেব বললেন, তুমি তো জানো আমার ছেলে মাহমুদ ডাক্তারি পাস করেছে।

জি স্যার।

পরশুদিন মাহমুদের চিঠি পেলাম। ও এফ.সি.পি.এস করতে বিদেশ যাচ্ছে তাই এক সঙ্গে অনেক টাকা প্রয়োজন আগে যা টাকা চেয়েছিল আমি পাঠিয়ে দিয়েছি আজ আবার চিঠি পেলাম আরো আশি হাজার টাকা লাগবে। চিঠি পাবার পর টাকা জোগাড় করার অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু তুমি তো জানো আমি মাস্টার মানুষ মাসে যা বেতন পাই তা সংসার চালাতেই চলে যায়। মাহমুদের জন্য আশি হাজার টাকা জোগাড় করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই হারাদিঘীর আমার দু’বিঘা জমি বিক্রির জন্য দু’একজনের সঙ্গে আলাপ করলাম সবাই তোমার কাছে আসতে বলল।

এমন সময় দিপু মিষ্টির প্লেট টেবিলে রাখতেই শাহিরুল বলল, স্যার নিন মিষ্টি খান।

কাসেম সাহেব মিষ্টি খেতে খেতে বললেন, শাহিরুল কিছু বলো।

আপনি কোন চিন্তা করবেন না স্যার, কখন টাকা লাগবে বলুন?

আসলে আমি টাকাটা পাঠিয়ে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত হতে পারি।

শাহিরুল জিজ্ঞেস করল, টাকা কীভাবে পাঠাবেন স্যার?

মাহমুদ একটা একাউন্ট নাম্বার দিয়েছে সেই একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে বলেছে।

শাহিরুল তার ড্রয়ার থেকে চেক বই বের করে একটা আশি হাজার টাকার চেক লিখে দিয়ে বললেন, স্যার এই নিন।

কাসেম সাহেব চেক হাতে নিয়ে হতবাক হয়ে গেলেন, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, শাহিরুল জমির দাম কত? কবে রেজিস্ট্রি করে নিচ্ছ? এসব কিছু ঠিক না করেই টাকা দিয়ে দিলে?

স্যার আমি আসলে জমি কিনি না। জমির নীচের পাথর কিনি, পাথর তোলা হলে যার জমি তাকে ছেড়ে দেই। অন্যান্যদের সঙ্গে একটা লেখাপড়ার বন্দোবস্ত থাকে কিন্তু আপনি আমার স্যার, জীবনে আপনাকে কোনদিন মিথ্যা কথা বলতে শুনিনি তাই আপনার সঙ্গে কোন চুক্তির প্রয়োজন নেই। জমিটা দেখিয়ে দিবেন, আমি পাথর তুলে নিব।

কাসেম সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, শাহিরুল ভাবতে পারিনি এত সহজে আমি টাকা পাব তুমি আমাকে নিশ্চিন্ত করলে, দোয়া করি আল্লাহ যেন তোমার মনস্কামনা পূরণ করুন।

আমার আজও মনে পড়ে স্যার, ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত আপনি আমাকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর সে কারণেই হয়ত আমি এস.এস.সি পাস করতে পেরেছি, তারপর যদি আপনার মতো আরেকজন শিক্ষক পেতাম তবে হয়ত আরো বেশি লেখাপড়া শিখতে পারতাম। টাকার অভাবে এস.এস.সি পাসের পর লেখাপড়া করতে পারিনি। আপনার ঋণের কথা আমি ভুলিনি স্যার। আল্লাহ যেন আপনার দোয়া কবুল করেন।

কাসেম সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, শাহিরুল তুমি যখন পাথর তুলবে তখন আমাকে খবর দিও আমি জমিটা দেখিয়ে দিব।

জি স্যার ঠিক আছে বলে শাহিরুল হ্যান্ড শ্যাক করল।

কাসেম সাহেব শাহিরুলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

 

নয়

বিদেশ যাবার কথা মাহমুদ প্রথম যেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেদিন থেকেই তার মনে কৌতূহল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা সবসময় ভিড় করছিল। কিন্তু বিদেশ গমনের সমস্ত প্রস্তুতি যেদিন শেষ হলো এবং দিনক্ষণ নির্ধারিত হলো সেদিন মুক্তির জন্য মাহমুদের মন বেদনায় ভরে গেল। সমস্ত আয়োজন শেষে মাহমুদের মনে হলো উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ না গেলেই কি নয়? জীবনের উদ্দেশ্য কী শুধু সফলতা? মানুষের প্রেম, ভালোবাসা কি মূল্যহীন? যে মেয়েটি দীর্ঘদিন তার কাছাকাছি থেকে তার সুখে হাসল আর কষ্ট সমান ভাগে ভাগ করে নিল, নিজের কষ্টে সঞ্চিত অর্থ তার উচ্চ শিক্ষার জন্য উৎসর্গ করল তার ভালোবাসার কি কোনই মূল্য নেই?

মাহমুদের বিদেশ যাবার সময় নির্ধারিত হওয়ার পর থেকে মুক্তি একরকম ভেঙ্গে পড়ল। মাহমুদ তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র স্বপ্ন পুরুষ। জীবনে কোনদিন সে মাহমুদ ছাড়া অন্য কোন পুরুষের কথা কল্পনাও করেনি। আজ কেন জানি তার বার বার মনে হলো, এতদিন মাহমুদ তার ভালোবাসায় আবদ্ধ ছিল আজ সে যেন খাঁচা ভেঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো মনে হলো মাহমুদ সহজ-সরল ছেলে তার ভালোবাসার বন্ধন সে কোন দিন ছিন্ন করবে না।

এমনভাবে উভয়ের মধ্যে নানান চিন্তা ভাবনা ভিড় করতে করতে মাহমুদর বিদেশ যাবার দিন ঘনিয়ে এলো। যেদিন মাহমুদ বিদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে সেদিন বিকেল বেলা বিমান বন্দরে মাহমুদকে বিদায় জানানোর জন্য মুক্তি মাহমুদের বাসায় গেল।

মুক্তি চেয়ারে বসতে বসতে বলল, তোমার ফ্লাইট তো আটটায় তাইনা?

হুঁম।

মুক্তি রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, কাপড়-চোপড় সব গুছানো হয়েছে? প্রয়োজনীয় কাগজপত্র?

এখনও কিছুই হয়নি।

মুক্তি লম্বা, দীর্ঘাঙ্গী, সুঠাম দেহের অধিকারিণী, গায়ের রং শ্যামলা অথচ আকর্ষণীয় তার উপর মুক্তি আজ মেরুন রংয়ের শাড়ি পরেছে, কপালে বড় একটা টিপ সব কিছু মিলিয়ে সে যেন আজ পৃথিবীর সমস্ত রূপ নিয়ে মাহমুদের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। মুক্তি সর্বদাই হাস্যজ্জ্বল থাকে। হাজার দুশ্চিন্তাও তার হাস্যজ্জ্বল মুখে বিন্দু মাত্র মেঘের ছায়া ফেলতে পারে না, অথচ আজ দরজা খুলে দিয়েই মুক্তির চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখে মাহমুদ কিছুটা অবাক হলো, মুক্তি তোমার এ অবস্থা?

মুক্তি ব্যাগটা চেয়ারের উপর রেখে নিজেই আলনা থেকে একটা একটা করে কাপড় গুছিয়ে ব্রিফকেস-এ পুরে দিল। তারপর চোখ মুছতে মুছতে মাহমুদকে জিজ্ঞেস করল, তোমার পাসপোর্ট, ভিসা, ইউনিভার্সিটির কাগজ-পত্র, টিকেট?

মাহমুদ সমস্ত কাগজ-পত্র একবার চেক করে নিয়ে মুক্তির দিকে তাকিয়ে বলল, মুক্তি তুমি কাঁদছ?

মুক্তি তার চোখের জল সামাল দিতে পারল না। গণ্ডদেশ বেয়ে অজস্র ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ল। মাহমুদ মুক্তির চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল, মুক্তি আমি তো লেখাপড়া করতে যাচ্ছি, আমার যাওয়া আসার মাঝখানে শুধু কিছু দিনের অপেক্ষা।

তুমি কিছুদিন বলছ? এতদিন আমরা দু’জন খুব কাছাকাছি ছিলাম। বছরগুলো যেন মুহূর্ত মনে হয়েছে এখন অপেক্ষার পালা একেকটি মিনিটও আমার কাছে বছর বলে মনে হবে।

শুধু কি তোমার কাছে? আমার কাছে বুঝি সময়গুলো খুব তাড়াতাড়ি যা? আর হ্যাঁ তোমার জন্য একটা সুখবর আছে, মাহমুদ বলল।

সুখবর? আমার জন্য?

হ্যাঁ শুধু তোমার জন্য নয়, আমাদের জন্য।

বলো তাড়াতাড়ি। মাহমুদ বলতে শুরু করল, আমি কয়েকদিন আগে বাড়ি গিয়েছিলাম তুমি তো জানো বাবা-মা আমার সঙ্গে খুব খোলামেলা আলাপ  করে। তারাই প্রথম বিয়ের কথা বলেছে তাই সুযোগ বুঝে দু’জনকে আমিও তোমার কথা বলেছি, বাবাতো তোমাকে আগে থেকেই চিনে তবুও তোমার ছবি দিয়ে এসেছি, বাবা তো তোমার ছবি দেখে তোমাকে চিনে ফেলেছে বলল, এই মেয়েটিকে তো আমি দেখেছি একদিন আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ইসলামবাগের জোয়ারদার সাহেবের মেয়ে না? অনেক কথা হয়েছে, খুব সুন্দর, লক্ষ্মী মেয়ে, তুমি দেশে ফিরলেই বিয়ে, বলে মাহমুদ মুক্তির শাড়ির আঁচল ঘোমটা বানিয়ে তার মাথায় দিয়ে বলল, তুমি যেন আজ বিয়ের সাজে সেজেছ, খুব সুন্দর মানিয়েছে তোমাকে।

মুক্তি লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে গেল। মাহমুদ বলল, মুক্তি কাবিন নামার স্বাক্ষর দু’টো হলো আইনের বন্ধন, গায়ে হলুদ, বিয়ে বাড়ির অন্যান্য আনুষঙ্গিকতা হলো সামাজিকতা আসল বিয়ে হলো দু’জনের মনের সম্পর্ক। সেদিক থেকে আমাদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। তবু আজ তুমি বিয়ের সাজে সেজেছ তাই বলে আঙ্গুল থেকে আংটি খুলে মুক্তির আঙ্গুলে পরিয়ে দিয়ে বলল, এই আংটিটা তোমাকে দিলাম। আজ থেকে আমাদের সম্পর্ক আরো পাকা পোক্ত হলো। আইন আর সামাজিকতার যে আনুষ্ঠানিকতাটুকু বাকী থাকল সেটা ফিরে এসেই সেরে ফেলব।

মুক্তি অস্ফুষ্ট স্বরে বলল, মাহমুদ।

মুক্তি আমাদের সময় প্রায় শেষ এখন বেরুতে হবে। তুমি একটু বসো আমি একটা ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে আসি বলে মাহমুদ চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে এসে বুয়াকে চাবিটা দিয়ে মুক্তিকে বলল, মুক্তি চলো।

দুজনে বেরিয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্যাক্সি ক্যাব জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছাল। গাড়ি থেকে নেমে ওয়েটিং রুমে বসে অনেক গল্প করল। এক সময় মাইকে বিমান ছাড়ার ঘোষণা হলো মাহমুদ মুক্তিকে বলল, মুক্তি এবার আমার যাবার পালা।

মুক্তি বলল, গিয়েই চিঠি দিও।

আচ্ছা বলে মাহমুদ চলে গেল। মুক্তি অনেকক্ষণ ওয়েটিং রুমে বসে থাকল। বিমান উড্ডয়ন করার পর অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত বিমানের দিকে তাকিয়ে রইল।

 

দশ

কয়েকদিন পর মাহমুদের চিঠি এলো। মাহমুদ তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, লেখা পড়ার পরিবেশ, থাকা খাওয়ার বিবরণ সব কিছু জানিয়ে চিঠি লিখেছে। কাসেম সাহেব মাহমুদের চিঠি পড়ে একটি তৃপ্তির নিঃশ্বাস টানলেন। তারপর কলিং বেল এ টিপ দিতেই স্কুলের পিয়ন হাকিম এসে দাঁড়াল, আমাকে ডেকেছেন স্যার?

হ্যাঁ ক্লাস টেন এর মার্কস সীটের ফাইলটা বের কর তো।

হাকিম স্টিল আলমারি থেকে ফাইলটা বের করে কাসেম সাহেবকে দিল। কাসেম সাহেব অনেকক্ষণ ফাইলে চোখ রাখলেন তারপর হাকিমকে বললেন, ক্লাস টেন এর ইংরেজি খাতাগুলো বের কর।

হাকিম স্টিল আলমারি থেকে একটা খাতার বান্ডিল বের করে দিল।

কাসেম সাহেব অনেকক্ষণ যাবত খাতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, হামিদ সাহেবকে আমার সালাম দাও।

হাকিম চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পর হামিদ সাহেব রুমে প্রবেশ করে বললেন, আমাকে ডেকেছেন স্যার?

কাসেম সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, হুঁম।

হামিদ সাহেব চেয়ারে বসলে কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, হামিদ সাহেব আমি কয়েকজন ছাত্রের খাতা দেখলাম তারা ইংরেজিতে খুব কম মার্কস পেয়েছে। আপনি কি আজকাল ছাত্রদের ভালো পড়াননা নাকি?

না স্যার আমি সবসময় ভালো পড়াই, তাছাড়া আপনি তো প্রায়ই ক্লাস চলাকালীন আমার ক্লাস নেওয়া দেখেছেন।

আচ্ছা হামিদ সাহেব ক্লাস টেন এর ফার্স্ট বয় ইংলিশ ফার্স্ট এবং সেকেন্ড পার্ট মিলে মাত্র একশ মার্কস পেয়েছে, আমার প্রশ্ন হলো যে ছেলে সকল বিষয়ে নাইনটি পার্সেন্ট এর বেশি মার্কস পায় ইংলিশে সেই ছেলে ফিফটি পার্সেন্ট মার্কস পায় কী করে? তারমানে সে ইংলিশ ভালো জানে না?

 

হামিদ সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, জি স্যার ছেলেটি ইংলিশে একেবারে কাঁচা।

কাসেম সাহেব  আর সহ্য করতে পারলেন না। একটা খাতা মেলে ধরে বললেন, দেখুন তো এটা ক্লাস টেন এর ফার্স্ট বয় এর খাতা এক’শ মার্কস এর নির্ভুল উত্তর দেওয়ার পরও আপনি তাকে দিয়েছেন পঞ্চাশ মার্কস আর পনের, সতের, পঁচিশ এবং পঁয়ত্রিশ রোল নাম্বার এর ছাত্রদের লেখায় অজস্র ভুল থাকার পরও আপনি দিয়েছেন নাইনটি পার্সেন্ট মার্কস, কেন?

হামিদ সাহেব কোন কথা না বলে নীরবে বসে রইলেন। কাসেম সাহেব উত্তেজিত হয়ে বললেন, তার মানে কী? যারা আপনার কাছে প্রাইভেট পড়তে যায় তাদেরকে আপনি বেশি মার্কস দেন আর যারা আপনার বাসায় প্রাইভেট পড়তে যায় না তাদেরকে কম মার্কস দেন। এতই যদি টাকার প্রয়োজন তবে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় এসেছেন কেন? ব্যবসা করতেন, দু’দিনেই লক্ষপতি বনে যেতেন। আমি প্রথম বারের মতো আপনাকে সতর্ক করে দিলাম আপনি টিউশনি করবেন না, ক্লাসে যদি কোন ছাত্র ভালোভাবে বুঝতে না পারে তবে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে আপনাকে তা মেক আপ করতে হবে, ক্লাসে পড়িয়ে যদি ছাত্ররা পড়া বুঝতে না পারে তবে টিউশনি পড়ে তা বুঝতে পারে কীভাবে? আমি যদি কোনদিন শুনি আপনি আবার টিউশনি পড়াচ্ছেন তবে আমি আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব।

কাসেম সাহেব সাধারণত উত্তেজিত হন না আজ তাঁর উচ্চ স্বরে কথা শুনে কয়েকজন শিক্ষক কাসেম সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করলেন। কাসেম সাহেবের রাগ দেখে কেউ কিছু বলার সাহস করতে পারলেন না। কাসেম সাহেব নিজেই বলতে শুরু করলেন, এই যে, ফরিদ সাহেব, কিবরিয়া সাহেব আপনারাও শুনুন, এই স্কুলের সকল শিক্ষকের দায়িত্ব হলো যিনি যে বিষয়ে পড়ান সে বিষয়ে ছাত্রদের দক্ষ করে তোলা, যদি ক্লাসের নির্ধারিত সময়ে সেটা সম্ভব না হয় তবে স্কুল চালুর আগে অথবা পরে আর না হয় ছুটির দিনে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে ছাত্রদের দক্ষ করে তুলবেন। ছাত্ররা ক্লাসে ভালো লেখাপড়া করে না, ক্লাসের সময় কম এসব অজুহাত দেখিয়ে প্রাইভেট টিউশনি করার অজুহাত খুঁজবেন না।

শিক্ষকের পিছনের সারিতে দাঁড়ানো একজন শিক্ষক কিবরিয়া সাহেব বললেন, এটা অন্যায়, সামান্য ক’টাকা বেতনের-

কাসেম সাহেব শুনতে পেয়ে বললেন, কী বললেন আপনি? ক্লাসে ঠিকমত না পড়িয়ে কৌশলে টাকার বিনিময়ে টিউশনি পড়ানো যাবে না এটা অন্যায় আদেশ? শিক্ষকতা করেন অথচ ন্যায়-অন্যায় বুঝেন না? বেতনের কথা বলছেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে বেতনের উল্লেখ দেখে এবং শর্ত মেনে আপনারা চাকরিতে জয়েন করেছেন। এখন যদি বেতনে না পোষায় তবে চলে যাবেন। তবুও আপনারা স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবেন না। প্লিজ আপনারা এবার আসুন।

সবাই বের হয়ে গেলেন।

 

এগার

মাহমুদকে বিমান বন্দর থেকে বিদায় জানিয়ে আসার পর থেকে মুক্তির সমস্ত উচ্ছলতা, তারুণ্য যেন নিভে গেছে। বেশির ভাগ সময় মাহমুদের স্মৃতিগুলো তার মনের মধ্যে ভেসে উঠে, মাহমুদকে দেখার জন্য মন ছটফট করে। মাহমুদের সঙ্গে মুক্তির আইনগত কিংবা সামাজিক কোন সম্পর্ক নেই, তাই মাহমুদের কথা যে কাউকে বলতে পারে না। কলেজ জীবনের দু’একজন বন্ধু-বান্ধবী যারা মাহমুদের সঙ্গে মুক্তির সম্পর্কের কথা জানতো তারা লেখাপড়া শেষ করার পর কেউ সরকারি  ক্লিনিকে চাকরি নিয়েছে, কেউ বা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ গেছে। তাদের অনেকের সঙ্গে মুক্তির যোগাযোগ নেই। তাই মন খুলে হৃদয়ের বোঝা হালকা কারও কোন উপায় নেই।

সেদিন বিকেল বেলা মুক্তি ক্লিনিকে ডিউটি শেষ করে তার চেম্বারে বসেছিল এমন সময় মুক্তির সিনিয়র ডাক্তার ডা: সালাম মুক্তি মুক্তি বলে ডাকতে ডাকতে চেম্বারে ঢুকে পড়লেন। মুক্তি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, আপা আপনি?

তোমার চেম্বারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম পর্দার ফাঁক দিয়ে যাচ্ছিলাম আমার চোখে পড়ল তুমি আনমনা হয়ে কী যেন   ভাবছ, দরজার পর্দা সরিয়ে দেখলাম তুমি টেরই পেলে না। শেষ পর্যন্ত তোমার ধ্যান ভাঙ্গাতে দু’বার তোমার নাম ধরে ডাকলাম আর তুমি চমকে উঠলে, কী ব্যাপার মুক্তি? কোন প্রবলেম?

মুক্তি স‡¼vP করে বলল, কিছু না আপা।

ও ভালো কথা, তুমি থাকছ কোথায়?

আমার মামার বাসায়।

সেখানে আর কে কে থাকেন?

মামা-মামী আর আমি।

মুক্তি আমার মনে হচ্ছে তুমি কোন বিষয়ে টেনশনে আছ, কারো সঙ্গে শেয়ার কর হালকা হয়ে যাবে।

মুক্তি অস্ফুষ্ট স্বরে বলল, আপা।

সালমা বললেন, দেখ মুক্তি তুমি যদি কিছু মনে না কর তবে আমকে বলতে পার, মনের মধ্যে কষ্ট বেশি দিন পুষে রাখতে হয় না। আমরা পেশায় ডাক্তার প্রতি মুহূর্তে মানুষের জীবন নিয়ে কাজ, কাজে অমনোযোগী হলে একেবারে চলে না।

আপা আপনার কি সময় হবে?

সালমা একবার ঘড়ির দিকে বললেন, বেশ তা বলো।

মুক্তি মাহমুদের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে বিমান বন্দরে বিদায় জানানো পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সালমা সব কিছু শুনে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় ক্লিনিকের ম্যানেজার একটা চিঠি এনে মুক্তির হাতে দিতেই মুক্তির সমস্ত দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। তার মুখের কালো মেঘ মুহূর্তেই সরে গেল।

সালমা মুচকি হেসে বললেন, নিশ্চয় মাহমুদের চিঠি?

মুক্তি মৃদু হেসে নীরবে বসে রইল।

তুমি চিঠি পড় আমি এখন আসি, বলে সালমা চলে গেলেন।

মাহমুদ আগে কোনদিন মুক্তিকে চিঠি লিখেনি। তাই মাহমুদের ভাষার দক্ষতা সম্পর্কে মুক্তির ধারণা ছিল না। আজ মাহমুদের চিঠি পড়ে বুঝতে পারল মাহমুদ শুধু ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট আর বিশ্বস্ত বন্ধুই নয় তার ভিতরে সাহিত্যের রসও আছে। মুক্তি গভীর মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়ল। মাহমুদ লিখেছে-

মুক্তি,

শুভেচ্ছা নিও। স্প্যাশালিস্ট ডাক্তার হওয়া, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যে স্বপ্ন পূরণের জন্য আমি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছি বিদেশের মাটিতে পা দিয়েই আমার সে মোহ কেটে গেছে। প্রবাসে বসে প্রতি মুহূর্তে তোমার কথা মনে পড়ছে, সবসময় তোমার অনুপস্থিতি আমাকে বিচলিত করছে। কলেজ জীবনের স্মৃতিগুলো মনের মধ্যে ভিড় করছে, অনেক সময় মনে হয় সবকিছু ছেড়ে তোমার কাছে ফিরে যাই কিন্তু তাতে তোমার কষ্টে সঞ্চিত অর্থ আর তোমার হৃদয়ের একান্ত বাসনাকে অপমানিত করা হবে ভেবে ফিরে যেতে পারি না। তোমাকে অপমান করা এমন কি সামান্যতম অমর্যাদা করার দুঃসাহস আমার নেই। তোমার উদারতা, তোমার ত্যাগ আমার এগিয়ে চলার প্রেরণা। চিঠি পেয়ে আমাকে ফোন করবে।

ইতি-

তোমার মাহমুদ

 

মুক্তি চিঠি পড়া শেষ করে মাহমুদকে মোবাইল করার জন্য ক্লিনিক থেকে বের হলো। ক্লিনিকের কাছে ফোন-ফ্যাক্সের দোকান, মুক্তি দোকানে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, ইংল্যান্ডে মোবাইল করা যাবে?

দোকানদার বলল, জি আপা?

কত টাকা মিনিট?

দোকানদার ল্যামিনেটিং করা একটা রেইট চার্ট মুক্তির হাতে দিল। মুক্তি কল রেইট পড়ে দেখে একটা ছোট কাগজে মোবাইল নাম্বারটা লিখে দিয়ে বলল, এই নাম্বারটি লাগিয়ে দিন তো প্লিজ।

দোকানদার রিং করে বলল, আপা নিন রিং হচ্ছে বলে রিসিভারটা মুক্তির হাতে দিল, মুক্তি মোবাইল ফোনটা নিয়ে ছোট কেবিনে ঢুকল। কেবিনটি রঙ্গিন গ্লাস বেষ্টিত দরজার উপরের অংশ গ্লাস এমনভাবে লাগানো আছে যে, বাইরে থেকে দোকানদার গ্রাহককে দেখতে পায় কিন্তু বাইরে থেকে কথা শোনা যায় না।

মুক্তি হ্যালো বলতেই অপর পাশ থেকে মাহমুদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো।

মুক্তি আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলল, মাহমুদ তুমি কেমন আছ?

হ্যাঁ মুক্তি ভালো আছি, তুমি?

ভালো আছি, মুক্তি বলল।

মুক্তি তোমার বি.সি.এস পরীক্ষা হয়েছে।

না আগামী শুক্রবার, তুমি আমার জন্য দোয়া করবে যেন চাকরি হয়ে যায়। তোমার ক্লাস চালু হয়েছে? খাওয়া-দাওয়ার কী অবস্থা? মুক্তি জিজ্ঞেস করল।

মুক্তি একসঙ্গে দু’টা প্রশ্ন করলে কোনটা প্রশ্নের আগে উত্তর দিব? আগের প্রশ্নের উত্তর আগে দিই, ক্লাস চালু হয়েছে, খাওয়া-দাওয়ার অবস্থা ভালো তবে সব বিদেশি খাবার, এখানে দেশি খাবার খুব একটা পাওয়া যায় না। শুনেছি এখানে নাকি বাংলাদেশী হোটেল আছে, অনেক বাঙালী আছে, আমার এখনো কোন বাঙালীর সঙ্গে পরিচয় হয় নি।

তুমি ভালোভাবে থেকো, স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ম নিও, তুমি তো স্বাস্থ্যের প্রতি একেবারে উদাসীন। সময়মতো খাবে, ঘুমাবে।

মাহমুদ ঠাট্টা করে বলল, আর কী কী করতে হবে? দাও না প্রেসক্রিপশন করে।

মুক্তি হেসে ফেলল। তারপর দু’জনে মোবাইলে আরো অনেকক্ষণ কথা বলল। কথা যেন শেষ হতেই চায়না, মুক্তির  মোবাইল ছেড়ে দিতেই ইচ্ছা করছিল না। কথা বলতে বলতে মুক্তি একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মোবাইল সেট নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।

 

বার

ইতোমধ্যে মুক্তির বি.সি.এস পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। মুক্তি তার চাকরি হবার খবর সেদিনই মাহমুদকে মোবাইলে জানিয়ে দিয়েছে। মুক্তির পোস্টিং হয়েছে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে। মাহমুদের বাবার সঙ্গে মুক্তির আগেই পরিচয় হয়েছে। কাসেম সাহেব মুক্তিকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন। মুক্তি কাসেম সাহেবকে মামা বলে সম্বোধন করে।

পোস্টিং অর্ডারটা হাতে পেয়েই মুক্তিই মনের মধ্যে কাসেম সাহেব ছবি ভেসে উঠল। সেই সাথে মুক্তির মনে একটি দুষ্টুমি ভর করল। মুক্তি সিদ্ধান্ত নিল পঞ্চগড় জয়েন করে মামাকে সঙ্গে নিয়ে ফোন করে মাহমুদকে অবাক করে দিবে। যেমন কথা তেমনই কাজ মুক্তি প্রথম দিন মাহমুদের ফোন নাম্বার পাবার পর থেকে প্রায়ই মাহমুদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলত কিন্তু পোস্টিং অর্ডার পাবার পর মাহমুদের সঙ্গে একেবারে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।

মুক্তি পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে জয়েন করে কয়েকদিন ডিউটি করার পর একদিন অফ ডিউটিতে সকাল বেলা মাহমুদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া যাবার বাস প্রায় সব সময় পাওয়া যায়। মুক্তি বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে তেঁতুলিয়ার বাসে উঠল। প্রায় বিশ মিনিট পর বাস ভজনপুর বাজার অতিক্রম করল। মুক্তির মনে হলো হয়ত মাঝিপাড়া আর বেশি দুরে নয়। তাই বাসের হেলপারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল মাঝিপাড়া সামনের স্টপেজেই। মুক্তি বাস থেকে নামবার জন্য প্রস্তুত নিল। দশ মিনিট পর পরের স্টপেজে মুক্তি বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে একটি দোকানে জিজ্ঞেস করল, এই যে ভাই কাসেম স্যারের বাড়িটা কোন দিকে?

দোকানদার রাস্তার মোড়ে দাঁড়ান একজন রিকশাওয়ালাকে ডেকে বলল, এই আপাকে কাসেম স্যারের বাসায় নিয়ে যা তো, দুই টাকা ভাড়া নিস বেশি নিস না আবার।

জি আচ্ছা বলে রিকশাওয়ালা মুক্তিকে বলল, উঠেন আপা।

মুক্তি রিক্সায় উঠল। মোড় থেকে রিক্সা উত্তর দিকে ছুটে চলল। কিছুদূর যেতেই মুক্তির চোখে পড়ল একটি মাইল পোষ্টে লিখা শালবাহান পাঁচ কিলোমিটার। আরো কয়েক মিনিট চলার পর রিক্সা একটি বাড়ির সামনে এসে দঁড়াল। মুক্তি রিক্সা থেকে নামতেই রিকশাওয়ালা স্যার বাসায় আছেন না কি? বলতে বলতে ভিতরে চলে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যে কাসেম সাহেব বেরিয়ে এসে বললেন, মা তুমি এত সকালে কোথা থেকে? কী ভাবে এলে? চল চল ভিতরে চল।

কাসেম সাহেব মুক্তিকে বসতে দিয়ে বললেন, বসো মা, আমি মাস্টার মানুষ বাসায় সোফা নেই, তোমাকে কষ্ট করে এই শক্ত চেয়ারেই বসতে হবে।

মামা এমন শক্ত চেয়ারে বসেই আমি ডাক্তার হয়েছি, কাজেই সংকোচের কোন প্রয়োজন নেই।

ঠিক আছে মা আর বলতে হবে না, তুমি বসো আমি তোমার মামীকে চা-নাস্তা দিতে বলি, কাসেম সাহেব চলে গেলেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে মোর্শেদা ঘরে ঢুকলেন। তার সঙ্গে কাজের বুয়া একটি ট্রেতে নাস্তা নিয়ে ঢুকল।

মুক্তি দাঁড়িয়ে সালাম দিল। মোর্শেদা সালামের জবাব দিতেই কাসেম সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন, মুক্তি তোমার মামী, মোর্শেদা এ হলো মুক্তি, মাহমুদের সঙ্গে এম.বি.বি.এস পাস করেছে।

তুমি বসো মা, তোমার মামার সঙ্গে গল্প কর আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি বলে মোর্শেদা চলে গেলেন।

কাসেম সাহেব বললেন, নাও মা খাও।

তারপর দু’জনের নাস্তা খাওয়া শেষ হতেই বুয়া চা নিয়ে রুমে ঢুকল। কাসেম সাহেব চায়ের কাপে চুমু দিয়ে বললেন, এবার বলতো মা হঠাৎ কোথা থেকে কী মনে করে এলে?

মামা আমার চাকরি হয়েছে, পোস্টিং পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে। গত সপ্তাহে হাসপাতালে জয়েন করেছি প্রথম কয়েকদিন গুছিয়ে নিতে সময় লাগল। আজ ভাবলাম আপনাদের সঙ্গে দেখা করবো, তাই চলে এলাম।

কাসেম সাহেব খুশিতে গদ গদ হয়ে বললেন, খুব ভালো করেছ মা, আমি খুব খুশি হয়েছি। তুমি এসেছ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে আর বেশি দেরি নেই মা।

মামা আপনার স্বপ্ন?

সে অনেক কথা তুমি ক্লান্ত হয়ে এসেছ, বিশ্রাম নাও, তোমার মামীর সঙ্গে গল্প কর বলে কাসেম সাহেব কই গো বলে ডাক দিতেই মোর্শেদা সামনে এসে দাঁড়ালেন। কাসেম সাহেব বললেন, তুমি রান্নার আয়োজন কর আমি মাছ ধরার জন্য কাউকে পুকুরে নামিয়ে দিচ্ছি।

কাসেম সাহেব চলে যাবার পর মুক্তি মোর্শেদার সঙ্গে রান্না ঘরে চলে গেল।

মোর্শেদা খুব সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মুক্তিকে আপন করে নিলেন। তিনি রান্নার ফাঁকে ফাঁকে মুক্তির সঙ্গে সব কিছু গল্প করলেন, সমস্ত বাসা ঘুরে দেখালেন, রান্না শেষে মাহমুদের ছোট বেলার ছবি বের করে দেখালেন।

মুক্তি কাসেম সাহেব আর মোর্শেদার সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম শেষে বিকেলে পঞ্চগড় ফিরার কথা বলতেই কাসেম সাহেব বললেন, আজকের দিনটা থেকে গেলে হয় না মা?

না মামা আমার আবার ডিউটি আছে।

তবে চলো মা তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

মুক্তি মোর্শেদাকে সালাম দিয়ে বিদায় নিল। বাসা থেকে বের হয়ে কাসেম সাহেব একটা রিক্সা ডেকে পাঠালেন। তারপর দু’জনে রিক্সায় উঠে কাসেম সাহেব বললেন, ও ভালো কথা তোমার কি কয়েক দিনের মধ্যে মাহমুদের সঙ্গে কথা হয়েছে?

মুক্তি লজ্জায় মাথা নত করে বলল, না মামা।

পঞ্চগড় আসার পর একদিনও কথা হয়নি?

না মামা, ভাবছি ওকে একটা সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়?

কাসেম সাহেব বললেন, আমাকে যেমন বোকা বানিয়েছ তেমন?

ঠিক তাই, আচ্ছা মামা এখানে কি কোন ফোন-ফ্যাক্সের দোকান আছে?

হ্যাঁ ভজনপুর তো অনেক ফোন ফোন আছে, কাসেম সাহেব  বললেন।

এমনভাবে গল্প করতে করতে রিক্সা ভজনপুর বাজারে এসে দাঁড়াল। কাসেম সাহেব রিক্সা থেকে নেমে বললেন, নাম মুক্তি।

মুক্তি রিক্সা থেকে নেমে কাসেম সাহেবের সঙ্গে একটি দোকানে ঢুকলেন। কাসেম সাহেব দোকানে ঢুকতেই শাহিরুল দাঁড়িয়ে সালাম দিল।

কাসেম সাহেব বললেন, বসো বাবা, তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। মুক্তি মাহমুদের সঙ্গে ডাক্তারি পড়ত, চাকরি হয়েছে, পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে পোস্টিং। মুক্তি এ হচ্ছে আমার ছাত্র শাহিরুল বিশিষ্ট পাথর, বালি ব্যবসায়ী।

বসেন স্যার, আপা বসেন বলে শাহিরুল দিপু বলে একটা ডাক দিতেই দিপু এসে দাঁড়াল।

শাহিরুল বলল, দিপু যা দোকান থেকে ভালো মিষ্টি আর চা নিয়ে আয়।

দিপু চলে গেল শাহিরুল বলল, বলুন স্যার।

না কোন কাজে নয়। আমরা মাহমুদের কাছে ফোন করবো, মোবাইলের দোকানে তো বসার তেমন একটা চেয়ার টেবিল নেই। তাই তোমার এখানে এলাম তুমি পাশের দোকান থেকে ছেলেটাকে মোবাইলটা নিয়ে আসতে বলতো।

এমন সময় দিপু চা মিষ্টি নিয়ে এলো। শাহিরুল দিপুকে বলল. দিপু ফরিদকে মোবাইলটা নিয়ে দোকানে আসতে বলতো, আমার কথা বলিস।

কিছুক্ষণের মধ্যে ফরিদ মোবাইল নিয়ে ঘরে ঢুকল।

কাসেম সাহেব বললেন, আমরা ইংল্যান্ডে কথা বলব, কত করে মিনিট?

ফরিদ কিছু বলার আগেই শাহিরুল বলল, আপনি কথা বলেন স্যার দামে কিছু হবে না।

কাসেম সাহেব মুক্তিকে ঈশারা করে বললেন, মুক্তি কথা বলো।

মুক্তি মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে রিং করল। অপর পাশ থেকে মাহমুদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো।

হ্যালো মাহমুদ, আমি মুক্তি।

তুমি! এতদিন যোগাযোগ করলে না কেন?

তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে।

কী সারপ্রাইজ?

কথা বলো, কথা বললেই বুঝতে পারবে, বলে মুক্তি কাসেম সাহেবের হাতে মোবাইল সেট দিল।

কাসেম সাহেব মোবাইল হাতে নিয়ে বলল, হ্যালো মাহমুদ।

আব্বা তুমি কোথা থেকে? এক সঙ্গে হলে কীভাবে?

মুক্তির পোস্টিং পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে, কয়েকদিন আগে জয়েন করেছে, আজ সকালে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল।

আব্বা তুমি ভালো আছ? মা ভালো আছে?

হ্যাঁ আমরা সবাই ভালো আছি, তুই কেমন আছিস? পড়ালেখা কেমন চলছে?

বাবা আমি ভালো আছি পড়ালেখা ঠিকমতো চলছে তোমরা আমার জন্য চিন্তা করবে না। আচ্ছা ঠিক আছে, এই মোবাইল নাম্বারটা শেভ করে রাখ এখানে মোবাইল করে শাহিরুলকে চাইবি, শাহিরুলকে কোন ম্যাসেজ দিলে সে আমাকে ডেকে দিবে।

জি বাবা।

এখন মুক্তির সঙ্গে কথা বল, বলে কাসেম সাহেব মুক্তিকে মোবাইল দিলেন।

মুক্তি মোবাইল হাতে নিয়ে বলল, হ্যালো।

হ্যাঁ মুক্তি তুমি আসলে-

তোমাকে সারপ্রাইজ দিব বলে এতদিন মোবাইল করিনি।

যাহোক এখন থেকে আমাদের বাড়িতে যাবে, বাবা মার খবর নিবে আর সব সময় যোগাযোগ রাখবে। তুমি যোগাযোগ করনি সেজন্য কয়েকদিন থেকে আমি খুব টেনশনে ছিলাম। আর এ রকম করবে না।

আচ্ছা এখন রাখি, বলে মুক্তি মোবাইল রেখে দিল।

কথা বলা শেষে মুক্তি বাসে উঠে পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।

 

তের

মুক্তি ডাক্তারি পাস করে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে জয়েন করার পর জোয়ারদার সাহেব মুক্তিকে বিয়ে দেবার উদ্যোগ নিলেন কিন্তু বিয়ের কথা বলতেই মুক্তি এড়িয়ে যায়। এমনভাবে মুক্তির বিয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তৃপ্তির ও বিয়ের বয়স হলো। জোয়ারদার সাহেব মুক্তির বিয়ে নিয়ে ভাবেন না। কারণ মুক্তি পেশায় ডাক্তার তার জন্য সুপাত্রের অভাব হবে না। কিন্তু জোয়ারদার সাহেব না ভাবলেও সমাজে ভাববার লোকের অভাব নেই। যেদিন থেকে তৃপ্তির বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ জিজ্ঞেস করেছে, বড় মেয়ের বিয়ের আগেই ছোট মেয়ের বিয়ে দিবেন?

জোয়ারদার সাহেব না জানার ভান করে এড়িয়ে যান।

সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই যখন ঘুমাতে যাচ্ছিল তখন জোয়ারদার সাহেব মুক্তির ঘরে প্রবেশ করলেন। বাবাকে হঠাৎ তার ঘরে ঢুকতে দেখে মুক্তি ও তৃপ্তি দু’জনে অবাক হলো। তৃপ্তি জিজ্ঞেস করল, বাবা তুমি? বসো বলে একটা চেয়ার টেনে দিল।

জোয়ারদার সাহেব চেয়ারে বসে বললেন, মা মুক্তি তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

বলো বাবা, মুক্তি বলল।

তুই তো জানিস বিভিন্ন জায়গা থেকে তৃপ্তির বিয়ের জন্য সম্বন্ধ আসছে, এ নিয়ে প্রতিবেশীরা বেশ কানাকানি করছে।

মুক্তি বলল, কানাকানি করবে কেন বাবা?

তুইও জানিস আমাদের সমাজে নিন্দুকের অভাব নেই, অনেকেই বড় মেয়ের বিয়ে না দিয়ে ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়াতে বিভিন্ন ধরণের কথা বলছে।

যার যখন ইচ্ছা তখন বিয়ে করবে তাতে সমাজের কী? ভালো ঘর-বর পেলে তুমি তৃপ্তির বিয়ে দাও বাবা।

জোয়ারদার সাহেব আর কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

মুক্তি বিছানায় শুয়ে বলল, তৃপ্তি আমি ঘুমাব, লাইটটা অফ করে দে।

তৃপ্তি লাইট অফ করে দিয়ে শুয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ কারও মুখে কোন কথা নেই। কারও চোখে ঘুম নেই।

তৃপ্তি প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করে মৃদু কণ্ঠে ডাক দিল, আপা।

বল?

আপা মাহমুদ ভাই ফিরবে কবে?

আরো কমপক্ষে দু’বছর।

তারমানে দু’বছরের আগে তোমার বিয়ে হচ্ছে না।

মুক্তি চুপ করে রইল। তৃপ্তিও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আচ্ছা আপা তুমি মাহমুদ ভাইকে কয়েকদিনের জন্য আসতে বলো না?

কেন?

মাহমুদ ভাই এলে তোমার কাবিন নামাটা হয়ে যেত, বাবাও দুশ্চিন্তামুক্ত হতো বলে তৃপ্তি লাইট জ্বালিয়ে খাটের কোনে বসে মুক্তির চুলে আঙ্গুল নেড়ে দিয়ে বলল, আপা তোমার আগে যদি আমার বিয়ে হয় তবে সমাজে বাবার মুখ থাকবে না, লোকজন তোমার বিষয়ে আজে-বাজে কথা বলবে, বলতে বলতে তৃপ্তির কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

মুক্তি শাসনের সুরে বলল, তৃপ্তি তুই যা তো, আমাকে ঘুমাতে দে।

মুক্তি তৃপ্তির একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, তৃপ্তি তুই এখন যা, ঘুমা, আমি আগামীকাল মাহমুদের সঙ্গে কথা বলব। আসলে আমার জন্য তোর বিয়ে হবে না তা হয় না রে। তুই যা এখন ঘুমা।

তৃপ্তি মুক্তির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চোখ মুছে তার নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল।

সারারত মুক্তির কানে অবিরত তৃপ্তির কথা গুলো ভাসছিল, আপা তোমার বিয়ের আগে আমার বিয়ে হলে লোকজন আজে-বাজে কথা বলবে।

সত্যিই তো বয়স হয়েছে, চাকরি করে, বিয়ে না করার আরতো কোন অজুহাত থাকতে পারে না। তৃপ্তিরও পড়ালেখায় মনোযোগ নেই বলতে গেলে সে যেন বিয়ের অপেক্ষায় দিন গুনছে। তার বিয়েটাও খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে কিন্তু বড় মেয়ের বিয়ে হওয়ার আগে ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়া অপরাধ না হলেও সমাজে বড় মেয়ের সতীত্ব, নৈতিকতা, শারীরিক যোগ্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে।

মুক্তি মাহমুদকে তার মনের কথাগুলো কীভাবে বলবে তা আগে মনে মনে সাজিয়ে নিল। তারপর রিক্সায় চেপে বাজারে গিয়ে একটি মোবাইল ফোনের দোকানে ঢুকল।

ইতোমধ্যে আরও কয়েকবার এই দোকান থেকে মোবাইল করায় দোকানদার মুক্তির আগে থেকেই পরিচিত ছিল।

মুক্তি দোকানে ঢুকতেই দোকানদার বলল, আপা মোবাইল করবেন?

দোকানদার মোবাইলটা মুক্তির হাতে দিয়ে কেবিনের দিকে ঈশারা করে বলল, ভিতরে যান প্লিজ।

মুক্তি মোবাইল নিয়ে কেবিনে ঢুকল। মোবাইলে রিং করতেই অপর পাশ থেকে মাহমুদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো।

মুক্তি বলল, হ্যালো আমি মুক্তি।

হ্যাঁ কেমন আছ?

ভালো, তুমি ভালো আছ?

হ্যাঁ।

পড়ালেখা ভালো চলছে?

হ্যাঁ সবই ঠিক আছে? কিন্তু সবসময় শুধু তোমার কথা মনে পড়ছে।

বেশ তো চলে এসো কয়েকদিনের জন্য, মুক্তি বলল।

হ্যাঁ ভাবছি।

শুধু কি আমার কথা ভাবছ? আর কিছু ভাবছ না?

আর কী ভাববো?

আমি আসলে তোমাকে কথাটা বলতে চাইনি।

সঙ্কোচ করছ কেন? বলো?

তুমি তো তৃপ্তিকে চেনো।

কোন তৃপ্তি?

আমার ছোট বোন তৃপ্তি।

হ্যাঁ এবার চিনতে পেরেছি, তুমি একবার পরিচয় করে দিয়েছিলে, বলো কী হয়েছে?

ওর বিয়ের কথাবার্তা চলছে।

বেশ তো।

আমি তৃপ্তির চেয়ে বড় না?

হ্যাঁ সে তো জানি।

মাহমুদ তুমি তো জানো, বড় বোনের বিয়ে হওয়ার আগে ছোট বোনের বিয়ে হওয়া আমদের সমাজে অশোভনীয়।

তারমানে তুমি আমাদের বিয়ের কথা বলছ?

আমি বুঝতে পারছি না আমার পক্ষে এখন দেশে যাওয়া সম্ভব হবে কিনা?

প্লিজ মাহমুদ তুমি সময় করে চলে এসো, আমাদের জন্য তৃপ্তির সুন্দর জীবনটা-

মাহমুদ মুক্তির কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, মুক্তি তুমি ভেবো না, আমি খুব তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করে ফেলব।

মুক্তির চোখে মুখে একটা তৃপ্তির আভা ফুটে উঠল, আমি জানতাম মাহমুদ তুমি আমাকে নিশ্চিন্ত করবে।

হ্যাঁ তুমি তৃপ্তিকে বলবে, ও যেন চিন্তা না করে, খুব শীঘ্রই আমরা ওর পথ পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আর তুমিও বউ সেজে আমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাক।

আমি তো তুমি বলবার আগে থেকেই বউ সেজে বসে আছি এখন শুধু তুমি আসার অপেক্ষা।

বিয়েটা খুব শীঘ্রই হচ্ছে তুমি নিশ্চিন্তে তোমার চাকরি কর আচ্ছা, ভালো থাক,

তুমিও।

মুক্তি মোবাইল অফ করে কেবিন থেকে বের হলো।

 

চৌদ্দ

অবশেষে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কাসেম সাহেব তাঁর এক বন্ধু এক দূর সম্পর্কীয় শ্যালক রিয়াজুল সাহেবকে নিয়ে মুক্তিদের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। শুধু কী বিয়ের প্রস্তাব একেবারে বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে। কাসেম সাহেবের সঙ্গে মুক্তির একাধিকবার কথা হলেও বিয়ের দিনক্ষণ নির্ধারণের দিন কনেকে বউ সাজিয়ে না দেখলে যেন অপূর্ণ থেকেই যায়। তাই কাসেম সাহেব তার ভাবী বিহাই সাহেবকে মুক্তিকে দেখানোর কথা বলার কয়েক মিনিটের মধ্যে মুক্তি কনে সেজে এসে সবাইকে সালাম দিল। কাসেম সাহেব সালামের জবাব দিয়ে বললেন, বসো মা।

মুক্তি বসলে রিয়াজুল সাহেব মুক্তিকে আরো অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন, দুলাভাই আপনি কিছু জিজ্ঞেস করুন?

কাসেম সাহেব বললেন, আমি কি জিজ্ঞেস করবো? আমি তো আগে থেকে সব কিছু জানি। মা আমার একেবারেই লক্ষ্মী মেয়ে।

জি দুলাভাই আমাদের মাহমুদের পছন্দ আছে, বলে তিনি একটু থামলেন তারপর বললেন, তুমি যাও মা।

মুক্তি উঠে ভিতরে চলে গেল। কাসেম সাহেব প্রথম কথা তুললেন, বিহাই সাহেব।

জোয়ারদার সাহেব বললেন একটু বসুন, মা তৃপ্তি তোর হাবিব চাচাকে আসতে বলতো।

কিছুক্ষণের মধ্যে হাবিব প্রবেশ করে সালাম দিতেই জোয়ারদার সাহেব সালামর জবাব দিয়ে কাসেম সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, বিহাই সাহেব আমার ছোট ভাই হাবিব আর হাবিব আমাদের হবু বিহাই।

কাসেম সাহেব বললেন, বিহাই সাহেব মুক্তি হয়ত আপনাকে বলেছে তবুও আমার একবার বলা প্রয়োজন, মাহমুদ আগামী মাসের সাত তারিখে আসছে, ছুটি মাত্র এক সপ্তাহ  কাজেই বুঝতেই পাচ্ছেন।

হাবিব বললেন, ভাইজান লেনদেন এর আলাপ-

কাসেম সাহেব রাগান্বিত স্বরে বললেন, ছোট বিহাই কিছু মনে করবেন না। বিয়ের মতো একটা পবিত্র কাজে লেনদেন এর কথা তুলতে হয় না। বিয়ের পবিত্রতা নষ্ট হয়।

হাবিব বললেন, বুঝেছি আপনাদের কোন ডিমান্ড নেই, মানে আমরা যা খুশি হয়ে দিব তাই।

কাসেম সাহেব হাবিবের কথার প্রতিবাদ করে বললেন, না আপনারা খুশি হয়েও কিছু দিবেন না, আপনারা কিছু না দিলেই আমি খুশি হবো।

জোয়ারদার সাহেব বললেন, বিহাই সাহেব দেনমোহর ছাড়া অন্যান্য ছোট-খাট বিষয়ে পরেও ঠিক করা যেত কিন্তু আপনি যখন আলাপ তুলেছেন তখন আলাপ করাই ভালো।

এতক্ষণ রিয়াজুল সাহেব নীরবে সবকিছু শুনছিলেন এবার বললেন, বিহাই সাহেব এসব সামান্য ব্যাপারে বিয়ের দিনেও আলাপ করা যাবে।

কাসেম সাহেব ধমকের সুরে বললেন, তুই চুপ কর, যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলিস না। দেনমোহর সামান্য ব্যাপার নয়। দেন মোহর বিয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছোট বিহাই আপনি বলুন, আপনারা কত টাকা দেনমোহর চান?

বিহাই সাহেব সাধারণত বিয়েতে যা ডিমান্ড হয় তার দ্বিগুণ দেন মোহর হয়।

আর যে বিয়েতে ডিমান্ড হয় না? কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

হাবিব বললেন, সাধারণত ডিমান্ড ছাড়া কোন বিয়ে হয় না তো তাই ডিমান্ড ছাড়া দেনমোহর কত হবে এটা আমার ঠিক জানা নেই।

কাসেম সাহেব বললেন, ছোট বিহাই ডিমান্ড বা যৌতুক যাই-ই হোক না কেন আমাদের ধর্ম অনুযায়ী হারাম আর দেন মোহর সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক পবিত্র কাজেই পবিত্র সম্পর্কের সঙ্গে হারামের সম্পর্ক জুড়ে দেয়া বিয়ের বৈধতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। আসলে বিয়ের সঙ্গে দেনমোহরের সম্পর্ক সামর্থ্যের। মাহমুদের সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে আপনারা বলুন দেনমোহর কত করা যায়?

জোয়ারদার সাহেব বললেন, বিহাই সাহেব আপনি একটা বলে দেন।

কাসেম সাহেব একবার সবার মুখের দিকে তাকালেন তারপর বললেন, ত্রিশ হাজার টাকা।

সবাই সমস্বরে আলহামদুলিল্লাহ বললেন।

 

পনের

বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। দু’দিন পরেই মুক্তির এতদিনের আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। যেদিন কাসেম সাহেব মুক্তিদের বাড়িতে বিয়ের সমস্ত কথাবর্তা সম্পন্ন করেছেন সেদিন থেকে মুক্তি মনে মনে অসংখ্যবার বাসর ঘর সাজিয়েছ, অনেকবার তার এতবছর ধরে সাজানো কথাগুলো সাজিয়েছে। কিন্তু আজ পত্রিকায় চোখ পড়তেই মুক্তি বুকে প্রচণ্ড আঘাত পেল। মুহূর্তেই তার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হলো। মুক্তি সঙ্গে সঙ্গে মাহমুদকে মোবাইল করল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে মাহমুদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো।

হ্যালো মাহমুদ, আমি মুক্তি তোমার মোবাইলে যে নাম্বারটা উঠেছে এটা আমার মোবাইল নাম্বার, আমি আগের সিমটা চেঞ্জ করে আই.এস.ডি সিমটা নিয়েছি। শোন একটা দুঃসংবাদ আছে।

কী দুঃসংবাদ?

বাংলাদেশে তো তিন দিনের হরতাল, তুমি ঢাকা থেকে আসবে কীভাবে?

ঢাকা থেকে না হয় কোনভাবে যাব আগে খবর নেই ফ্লাইট যাবে কী না?

মুক্তি অস্ফুট স্বরে বলল, মাহমুদ।

হ্যাঁ মুক্তি আমি এখন রাখছি সব কিছু জেনে তোমাকে রিং দেব।

আচ্ছা, বলে মুক্তি মোবাইল রেখে দিল।

মুক্তির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। এত কিছুর আয়োজন, প্রতিবেশীদের কাছে সে মুখ দেখাবে কী করে? যদিও এতে মুক্তির কোন দোষ নেই তারপরও মানুষের মুখে তো আর হাত দিয়ে রাখা যায় না। এমনি নানা কথা ভাবতে ভাবতে মুক্তির চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। এমন সময় তৃপ্তি ঘরে প্রবেশ করেই চমকে উঠল, আপা তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কী হয়েছে?

মুক্তি চোখের পানি মুছতে মুছতে পেপারটা তৃপ্তির দিকে বাড়িয়ে দিল। তৃপ্তিও পেপার পড়ে যেন থমকে গেল। তার মুখ থেকে কোন কথা বের হলো না, তৃপ্তি ধীর পদে বের হয়ে গেল।

মুক্তি কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠতেই মোবাইলের রিং বেজে উঠল। মুক্তি মোবাইল রিসিভ করে বলল, হ্যালো মাহমুদ কী খবর?

মুক্তি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আমার যাওয়া হচ্ছে না তবে-

মুক্তি কৌতূহলী হয়ে বলল, তবে কী? বলো মাহমুদ?

মাহমুদ বলল, টেলিফোনে বিয়ে।

মুক্তি বিস্ময়ের সাথে বলল, কিন্তু সেটা তো সিনেমা নাটকে-

শুধু সিনেমা নাটকে কেন? এই তো ক’দিন আগে আমার রুম মেট টেলিফোনে বিয়ে করল, সেই তো আমাকে পরামর্শ দিল।

সেটা পাশ্চ্যত্যে হতে পারে, কিন্তু এটা বাংলাদেশ এখানে টেলিফোনে বিয়ে-

আমার রুম মেট তো বাংলাদেশী, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাস করেছে। সেতো একরকম ইচ্ছা করেই টেলিফোনে বিয়ে করেছে, তুমি কোন রকম টেনশন করিও না সবাইকে বলো, সবাই যদি টেলিফোনের বিয়েতে মত দেয় তবে দিন তারিখ ঠিকই আছে, তা যদি না হয় তবে দিন পিছাতে হবে। দেখ সবাই কী বলে?

মুক্তি মোবাইল বন্ধ করে প্রথমে তৃপ্তির সঙ্গে আলাপ করল। সব কিছু শুনে তৃপ্তি নিজে সম্মতি দিল এবং তার বাব-মা’সহ সবাইকে টেলিফোনে বিয়ে সম্পন্ন করার সম্মতির জন্য অনুরোধ করল। এমন অদ্ভুত চিন্তার জন্য অনেক হাস্য রসের সৃষ্টি হলো কেউ কেউ বিয়ের দিন তারিখ পরিবর্তন করে চিরাচরিত সামাজিক প্রথা অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন করার পক্ষে মত দিল আবার অনেকে প্রযুক্তির সুবাদে টেলিফোনে বিয়ের পক্ষে মতামত দিল।

 

ষোল

বরযাত্রীদের আসতে দেরি দেখে কনে পক্ষের লোক জন বার বার পথের দিকে তাকাচ্ছিল এমন সময় বরযাত্রীদের একটি দল দেখে উৎসুক লোকেরা সামনে এসে দাঁড়াল জোয়ারদার সাহেব সালাম দিলেন, আসলামুআলায়কুম বিহাই সাহেব।

ওয়ালেকুম আসসালাম, বলে কাসেম সাহেব জোয়ারদার সাহেবের সঙ্গে ভিতরে চলে গেলেন বর যাত্রীদেরও তাদের জন্য  নির্ধারিত স্থানে গিয়ে বসল।

বিয়ের সমস্ত আয়োজন ঠিক ঠিকভাবে চলছে। বরকে ঘিরে শ্যালিকাদের তামাশা, গেট সাজানো, হাত ধোয়াসহ সমস্ত লোকাচার কেমন জানি ঢাকা পড়ে গেল। তারপরও বিয়ে বাড়িতে আনন্দ আর কৌতূহলের সীমা নেই, টেলিফোন কিংবা মোবাইলে ইতোপূর্বে এই এলাকায় কোন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই বিষয়টি উপভোগ করার জন্য প্রতিবেশীদের ভিড়ও ছিল প্রচণ্ড।

সৌভাগ্যক্রমে মুক্তির এক চাচা ঢাকায় তার এক বন্ধুর বোনের টেলিফোনে বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনিই অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করলেন। কাজি সাহেব তার রেজিস্টারে বর কনে উভয়ের নাম ঠিকানা লিখা শেষ করে জানতে চাইলেন, দেন মোহর কত?

কাসেম সাহবে বললেন, ত্রিশ হাজার টাকা।

কাজি সাহেব আশ্চর্যজনকভাবে বললেন, মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন, নগদ কত?

কাসেম সাহেব পকেট থেকে ত্রিশ হাজার টাকা বের করে জোয়ারদার সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন, বিহাই সাহেব এই নিন দেন মোহরের টাকা।

জোয়ারদার সাহেব টাকা নিলেন, তার দু’চোখ তখন আনন্দাশ্রুতে ছল ছল করছে।

কাজি সাহেব বললেন, সম্পূর্ণ নগদ?

হুঁম।

কাসেম সাহেবের শ্যালক রিয়াজুল সাহেব এতক্ষণ বসে ছিলেন, এবার বললেন, এটা দুলাভাইর বাড়াবাড়ি। দেনমোহর কেউ নগদ দেয়?

কথাটা কাসেম সাহেবের কানে পৌঁছামাত্র তিনি প্রচণ্ড রেগে বললেন, রিয়াজুল কী বললি?

রিয়াজুল সাহেব মোটেই ভয় পেলেন না, তিনি বললেন, ঠিকই তো, দেন মোহর কি কেউ নগদ দেয়?

দেয় না, এটা ঠিক নয়, দেন মোহর মেয়ের পাওনা এটা শুধু কাগজে কলমে থাকবে আর তাকে টাকা দেওয়া হবে না সারা জীবন একটা মেয়ের সঙ্গে সংসার করার পর তার পাওনা টাকা না দিয়ে মাফ চাওয়াটা ঠিক না।

পিছন থেকে কেউ কেউ বলল, সত্যিই তো।

কাজি সাহেব কাবিন নামার অবশিষ্ট ফাঁকা লাইনগুলো পূরণ করে মাহমুদের সম্মতির জন্য টেলিফোন সেটের ফ্লাস সুইচ দিয়ে টেলিফোন করলেন, হ্যালো।

অপর প্রান্ত থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো আপনি কে বলছেন প্লিজ?

আমি মাহমুদ?

কাজি সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনার পুরো নাম বলুন।

আমার পুরো  নাম মাহমুদুর রহমান মাহমুদ।

কাজি সাহেব, কাসেম সাহেবও স্বাক্ষীগণের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কণ্ঠস্বর চিনতে পেরেছেন?

স্বাক্ষীগণ ও কাসেম সাহেব বললেন, হুঁম।

তারপর কাজি সাহেব বর-কনে উভয়ের নাম ঠিকানা দেনমোহর সবকিছুর বিবরণ বলে জিজ্ঞেস করলেন, বলুন কবুল।

টেলিফোনে মাহমুদের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো, কবুল।

এমনভাবে তিনবার শোনার পর কাজি সাহেব মুক্তির সম্মতি নিলেন তারপর সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে তাঁর কাজ সম্পন্ন করলেন।

 

সতের

সেদিন স্কুল শেষে কাসেম সাহেব তাঁর অফিস কক্ষে বসে ছাত্রদের হাজিরা খাতায় চোখ বুলাচ্ছিলেন, এমন সময় অফিসের সামনে মোটর সাইকেল থামার শব্দ শুনে হাকিমকে জিজ্ঞেস করলেন, কে এলো হাকিম?

হাকিম জবাব দিল, সভাপতি সাহেব স্যার।

ফ্লাক্সটা নিয়ে যাও, বাজার থেকে চা নিয়ে এসো।

সভাপতি সাহেব অফিস কক্ষে প্রবেশ করতেই কাসেম সাহেবকে সালাম দিয়ে চেয়ারে বসলেন।

সাহেব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো ব্যস্ত মানুষ, বলো কী মনে করে?

সভাপতি সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, স্যার আসলে কথাটা কী করে যে বলি?

কাসেম সাহেব হঠাৎ থমকে গেলেন, কেন? কী হয়েছে?

স্যার আমার কাছে স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক গিয়েছিলেন, আমি প্রথমে ভাবছিলাম হয়ত স্কুলে কোন অনুষ্ঠান আছে তাই আপনি তাদেরকে পাঠিয়েছেন আমার কাছে। কিন্তু সব শুনে আমার একটু খারাপ লাগল।

কী হয়েছে ফিরোজ, তুমি কী শুনলে?

ফিরোজ সাহেব বলতে শুরু করলেন, স্যার শিক্ষকরা আমার কাছে অভিযোগে করলেন আপনি নাকি তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন? চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন? আমি অবশ্য বিশ্বাস করিনি, আমি বললাম, আমি তো ছোট বেলা থেকেই স্যারকে কাউকে গালি গালাজ করতে শুনিনি।

তাঁরা বললেন, বিশ্বাস না হয় মিটিং ডাকুন।

কাসেম সাহবে বললেন, কেন তাদের গালিগালাজ করেছি সে কথা  বলেনি?

তা অবশ্য বলেনি?

তবে আমি সব বলি কাসেম সাহেব বলতে শুরু করলেন, আমি কিছু দিন থেকে লক্ষ্য করছি কয়েকজন শিক্ষক প্রায় দিনই ক্লাস শুরু হওয়ার পরে স্কুলে আসেন আর বিকেল বেলা তাড়াহুড়া করে বাড়ি চলে যান। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা ঐ বিষয়গুলোতে খারাপ রেজাল্ট করছিল, পরে জানলাম তারা নাকি সকাল বিকাল বাসায় টিউশনি পড়ান। একজন শিক্ষক বাসায় দুই ব্যাচ টিউশনি করার পর তাদের আর স্কুলে পড়ানোর এনার্জি থাকে না এমনি করে তারা স্কুলটাকে দিন দিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো করে তুলছে, এখানেই শেষ নয় গত পরীক্ষায় রেজাল্ট বের হবার পর দেখলাম যে সব ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে কিছুই জানে না তারাও পরীক্ষার খাতায় অনেক মার্কস পেয়েছে আর ক্লাসে যারা খুবই ভালো পড়াশুনা করে তারা খুব কম মার্কস পেয়েছে। যেসব খাতায় আমার সন্দেহ ছিল সেসব খাতা বের করে দেখলাম যে সব ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকদের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যায় তাদেরকে সেই শিক্ষক ভুল উত্তরের মার্কস দিয়েছেন আর যেসব ছাত্র তাদের কাছে পড়তে যায় না তাদেরকে সঠিক উত্তরেরও কম মার্কস দিয়েছেন। আমি তো অবাক, শিক্ষক হয়ে এমন কাজ তাঁরা করতে পারলেন? বলতে বলতে কাসেম সাহেবের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এলো।

এমনসময় হাকিম চা নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে টেবিলে বিস্কুট আর চা দিল। ফিরোজ সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, স্যার আমি বুঝতে পেরেছি তাঁরা আমার কাছে তাঁদের দোষ গোপন করেছেন।

বাবা তুমি আমার ছাত্র এই দাবি নিয়ে নয়, তুমি এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, রাজনৈতিক দলের বড় নেতা হিসাবে এই স্কুলের দিকে খেয়াল রাখার জন্য অনুরোধ করছি। আশা করি তুমি আমার অনুরোধ রাখবে। আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন। স্যার আমি যেন অনেক বড় নেতা হতে পারি, এই স্কুলের জন্য ভালো কিছু করতে পারি।

কাসেম সাহেব চা শেষ করে বললেন, আজাদ স্যার এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি রিটায়ার্ড করার পর আমি যখন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন তিনি এই স্কুলের সুনাম রক্ষাসহ শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন, আমিও স্যারের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি, আমার চাকরি আর পাঁচ বছর আছে, তোমাদের সহযোগিতা পেলে স্যারকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেই রিটায়ার্ড করতে পারি।

আপনি কিছু ভাববেন না স্যার, তারা যেহেতু একটা আবেদন করেছে, তাই আপনি আগামী সপ্তাহে একটা মিটিং ডাকুন, সব ঠিক হয়ে যাবে, বলে ফিরোজ সাহেব হ্যান্ডশ্যাক করে বিদায় নিলেন।

ফিরোজ সাহবে চলে যাওয়ার পর কাসেম সাহবে অফিস বন্ধ করে বাসায় চলে গেলেন। বাসায় ঢুকতেই মুক্তি সালাম দিল। কাসেম সাহেব মুক্তিকে দেখে চমকে উঠলেন, মা তুমি?

হ্যাঁ বাবা চলে এলাম।

খুব ভালো করেছ মা কিন্তু তোমার মুখ শুকনো কেন? কোন সমস্যা? বলতে বলতে কাসেম সাহেব ও মুক্তি দু’জনে বারান্দায় উঠে চেয়ারে বসলেন।

কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, বউমা কখন এসেছ? কী খেয়েছ?

বাবা আমি এই কিছুক্ষণ আগে এসেছি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

হ্যাঁ এখন বলো মা, কী হয়েছে? কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

মুক্তি শুষ্ক কণ্ঠে বলল, কিছু হয়নি বাবা।

না, কিছু তো নিশ্চয়ই হয়েছে, তোমার মুখ শুকনো আমি কখনও দেখিনি, তুমি এমন মেয়েই নও, মাহমুদের সঙ্গে দু’একদিনে কথা হয়েছে?

মুক্তি মাথা বাকিয়ে জানাল, না।

বুঝেছি তোমার মনটা আজ খারাপ, চলো তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাই, তোমার খুব ভালো লাগবে।

 

আঠার

কাসেম সাহেব হাঁটতে হাঁটতে তার বাগানের দিকে এগিয়ে চললেন। মুক্তি কিছুই বুঝল না, শুধু কাসেম সাহেবের পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল। বাগানের কাছে এসে কাসেম সাহেব দাঁড়িয়ে মুক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, বউমা এখানে তোমাকে কেন নিয়ে এসেছি জানো?

না বাবা।

এই বাগানটা দেখছ না?

জি।

এই বাগানটার সব গাছ বিক্রি করে এখানে একটা ক্লিনিক বানাবো।

মুক্তি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ক্লিনিক বানাবেন এখানে?

কেন? অবাক হচ্ছ কেন?

বাবা এখানকার ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসবে কারা?

কেন আমার এলাকার লোকেরা? যারা চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, জ্ঞানের অভাবে অপুষ্টি আর অন্ধত্বে ভুগে।

কিন্তু একটা ক্লিনিক করতে অনেক টাকা প্রয়োজন আর অনেক টাকা ইনভেস্ট করে এখানে যা আয় হবে সেই আয় লাভজনক হবে না।

ক্লিনিকের সঙ্গে লাভ লোকসানর প্রশ্ন নয় মা, ক্লিনিকের সঙ্গে সম্পর্ক সেবার। এই যে তুমি লেখাপড়া শিখে ডাক্তার হয়েছ, মাহমুদ ডাক্তারি পাস করে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য বিদেশ গেছে এতকিছু কি শুধু টাকা রোজগারের জন্য? এদেশের মানুষের কাছে কি তোমাদের কোন ঋণ নেই? এই যে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ সচেতনতার অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে, কুসংস্কারের কারণে এখনও ঝাড় ফুঁক দিয়ে অসুখ সারানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। উন্নত চিকিৎসার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, এদের জন্য কি তোমাদের কিছু করার নেই?

বাবা।

হ্যাঁ মা এখানে ক্লিনিক করার জন্য মাহমুদ কে আমি ডাক্তারি পড়িয়েছি। তার সঙ্গে তোমাকে পেলাম আমার স্বপ্নগুলো বাস্তবের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মাহমুদ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে দেশে ফিরবে, এখানে একটা অত্যাধুনিক ক্লিনিক হবে তোমাদের ক্লিনিকের সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। শহরের রোগীরা সুচিকিৎসার জন্য এখানে আসবে। আসবে না কেন? মানুষ সেবা চায়, আর বড় বড় শহরে যেসব ক্লিনিক আছে, সেসব ক্লিনিকের চেয়ে তোমরা যদি বেশি সেবা দিতে পার তবে শহরের রোগীরাও অবশ্যই এই পাড়া গাঁয়ে আসবে।

কিন্তু বাবা একটা অত্যাধুনিক ক্লিনিক করা তো অনেক টাকার প্রয়োজন।

টাকার চিন্তা আমি করিনা মা, এই বাগানের গাছ আর বিশ বিঘা জমির পাথর বিক্রি করলেই হয়ত একটা অত্যাধুনিক ক্লিনিক হবে, তাছাড়া আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার ছাত্ররা। আমার অনেক ছাত্র আছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা যাদের কাছে হাত পাতলে কোন কিছুর অভাব হবে না।

আমিও আপনার সঙ্গে আছি বাবা, দোয়া করি আল্লাহ যেন আপনার মনস্কামনা পূর্ণ করেন।

তুমি আমাকে আশ্বস্থ করলে মা, আমি কাল থেকেই ক্লিনিকের কাজে লেগে যাব। এইবার ক্লিনিকের জন্য সরকারি অনুমোদন, ভবনের জন্য নক্সা এসব করতে হবে, সময় লাগবে তো, তুমি আমাকে প্রাথমিকভাবে ক্লিনিক চালু করার জন্য একটা অ্যাপারেটাসের এস্টিমেট করে দিবে, কেমন।

এমনভাবে গল্প করতে করতে সূর্য রক্তিম আভা নিয়ে অস্তমিত হতে যাচ্ছে, পাখীরা দূর-দূরান্ত থেকে বাগানে নিজের নীড়ে ফিরছে। কাসেম সাহবে বললেন, চলো মা বাসায় যাই।

চলুন বাবা।

 

উনিশ

ম্যানেজিং কমিটির মিটিং শুরু হয়েছে। কাসেম সাহেব বিষয়টি যত সহজ মনে করেছিলেন আসলে তত সহজ নয়। যে শিক্ষকগণ এতদিন কাসেম সাহেবের দিকে মুখ তুলে কথা বলার সাহস পেতেন না সেই শিক্ষকগণও আজ কাসেম সাহেবের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকানোর মতো দুঃসাহস করছে। কমিটির সদস্যগণের মুখের দিকে তাকিয়ে কাসেম সাহেবের মনে হলো সবাই যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাঁর আর বুঝতে বাকী রইল না যে, অন্যায় ও অসত্যের পক্ষে অধিকাংশ সদস্য দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেছে।

কমিটির সদস্য শহিদুল সাহেব অভিযোগকারী একজন শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাস্টার সাহেব ঘটনাটা খুলে বলুন তো শুনি কী হয়েছে?

হামিদ সাহেব বলতে শুরু করলেন, হেড স্যার আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। আমি নাকি ছাত্রদের খাতায় সঠিকভাবে নাম্বার দিইনি।

কাসেম সাহেব হাকিমকে বললেন, হাকিম খাতাগুলো বের কর তো।

হাকিম খাতাগুলো স্টিল আলমারি থেকে বের করে টেবিলের উপর রাখতেই কাসেম সাহেব বললেন, দেখুন আপনারা সবাই দেখুন।

শহিদুল সাহেব বললেন, খাতায় মার্ক দেওয়া বিভিন্ন জনের বেলায় বিভিন্ন রকম হতেই পারে তাই বলে একজন শিক্ষক হয়ে আরেকজন শিক্ষককে গালিগালাজ?

হামিদ সাহেব বললেন, আরও বলেছেন এই স্কুলে চাকরি করলে নাকি টিউশনি করা যাবে না। আপনি বলুন সভাপতি সাহেব আপনি তো সবই জানেন আমরা যা বেতন পাই তা দিয়ে কি সংসার চলে? আমরা মাসে যা বাড়ি ভাড়া পাই তা দিয়ে একটা বাড়ি ভাড়া তো দূরের কথা, একটা চৌকিও একমাস ভাড়া পাওয়া যাবে না, আমরা যা চিকিৎসা ভাতা পাই তা দিয়ে ঔষধের দাম তো দূরের কথা একজন ডাক্তারকে একবার দেখানোর ভিজিটও হয় না, মাঝে মাঝে বেতন হয়না বলে দু’একজন শিক্ষক প্রায় মাসে সুদ খোরদের কাছে বেতনের চেক বিক্রি করে দেন। তাই আমরা টিউশনি করি, ছাত্রদের পড়িয়ে টাকা নেই আর তিনি বলেন, টিউশনি করতে পারবেন না, চাকরি করতে না পারলে চাকরি ছেড়ে দেন।

শহিদুল সাহেব বললেন, এটা আপনার অন্যায় মাস্টার সাহেব, ভালো রেজাল্টের জন্য ছাত্রদের কথা চিন্তা করে হামিদ সাহেব টিউশনি পড়ান নিজের স্কুলের ছাত্রদের, এতে তো খারাপ কিছু নেই।

কাসেম সাহেব রেগে গেলেন, অবশ্যই খারাপ কিছু আছে, শিক্ষকরা চিরকালই অবহেলিত, শিক্ষকতার বেতন দিয়ে সামাজিকভাবে বসবাস করা কঠিন, তারপরও শিক্ষকতা মহান পেশা, তাই এই পেশায় থেকে মিথ্যা বলা যায় না, নৈতিকতা বিরোধী কাজ করা যায় না, কারও সঙ্গে প্রতারণা করা যায় না। একজন শিক্ষক যদি ছাত্রকে সঠিকভাবে পাঠদান না করে তবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়। কিন্তু একজন শিক্ষক যখন বাসায় ক্লাসরুম তৈরি করে স্কুলে আসার আগে দুই ব্যাচ টিউশনি পড়ান তখন স্বাভাবিকভাবেই তার স্কুলে আসতে দেরি হয় এবং তার ক্লাস নেওয়ার এনার্জি কমে যায়। আবার বিকেল বেলা টিউশনি করার জন্য দ্রুত স্কুল ত্যাগ করেন। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়ায় পিছিয়ে যায়, ক্লাসে পড়া ফাঁকি দিয়ে পরোক্ষভাবে টিউশনিতে যেতে বাধ্য করা হয়, যা অপরাধ।

হামিদ সাহেব বললেন, আপনি একজন প্রবীণ শিক্ষক হয়ে এ কথা আপনার অবশ্যই জানা উচিৎ যে, আধ ঘণ্টার ক্লাসে আসলে সব ছাত্রদের পড়া আদায় করা সম্ভব না।

দেখুন ছাত্রকে পাঠদান করা আপনার দায়িত্ব, আপনার দায়িত্ব যদি আপনি আধ ঘণ্টায় পালন করতে না পারেন তবে স্কুল টাইমের আগে বা পরে কভার করবেন। কিন্তু টিউশনি ছাড়তে হবে, আমি যতদিন হেড মাস্টার আছি ততদিন আপনাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে, ছাত্রদের রেজাল্ট ভালো করতে হবে এর কোন ব্যতিক্রম ঘটলে আমি ব্যবস্থা নিব।

শহিদুল সাহেব বললেন, দেখলেন সভাপতি সাহেব, দেখলেন হেড মাস্টার সাহেব কী বললেন।

ফিরোজ সাহেব এতক্ষণ চুপ করে সবকিছু শুনলেন তারপর বললেন, হামিদ সাহেব আমি চাই আপনারা ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে ভালোভাবে পড়াবেন যেন এলাকার গরীব ছেলে-মেয়েদের ভালো লেখাপড়ার জন্য টিউশনি পড়তে না হয় এবং স্কুলের সুনাম অক্ষুণ্ণ থাকে। আমি স্যারকেও বলছি আপনি শুধু একজন শিক্ষক নন একজন প্রশাসকও বটে। আপনাকে যেমন ভালো পড়াতে হবে, পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করতে হবে তেমনি শিক্ষকদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক হতে হবে আন্তরিক এবং যুগপোযুগী হয়ে। শিক্ষকের মধ্যে যদি দলাদলি থাকে তবে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। সভা আজকের মতো মুলতবি ঘোষণা করা হলো, বলে সভাপতি সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন।

সভা শেষে সবাই চলে গেলে কাসেম সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইলেন। তার মাথায় এখন অনেক চিন্তা ঘুরপাক করছে। তিনি বুঝতে পাচ্ছেন তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, তিনি হেডমাস্টার থাকায় স্কুলটিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানানোর হীন উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না। কমিটির সদস্য, শিক্ষক প্রতিনিধিসহ সকলের কাছে তার গ্রহণ যোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে, ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে পরস্পরের হাতে হাত মিলিয়েছে অথচ কাসেম সাহেবের কোন দোষ নেই। তবু এই যে এতক্ষণ শুধুমাত্র কয়েকজন শিক্ষিত সচেতন মানুষের ব্যক্তি স্বার্থের কারণে ন্যায় ও সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে? আর সভাপতি সাহেব তার ছাত্র হলেও যুগোপযোগী হতে বললেন তারই যা অর্থ কী?

 

বিশ

প্রায় একমাস আগে মাহমুদ মুক্তিকে একটা মোবাইল সেট পাঠিয়েছে যে সেটটির মাধ্যমে মোবাইলে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল সেটের ছোট্ট মনিটরে পরস্পরের ছবি ভেসে উঠে মনে হয় একজন আরেকজনকে খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছে, মোবাইল সেটটি হাতে পেয়েই মুক্তিও মাহমুদকে মোবাইল করেছিল। কিন্তু মোবাইলের ছোট্ট মনিটরে চোখ পড়তেই যার ছবি ভেসে উঠেছিল তা দেখে শুধু মুক্তি নয় কোন বাঙ্গালী নারীই স্থির থাকতে পারে না, মুক্তির বুকে যেন শেলের আঘাত লেগেছিল। সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি মোবাইল অফ করেছিল। তারপর মাহমুদ অনেকদিন মুক্তিকে মোবাইল করেছিল কিন্তু মুক্তি মোবাইল রিসিভ করে নি।

আজ ডিউটি ছিল না সকাল থেকে মুক্তি নাস্তা খেয়ে পেপার পড়ছিল এমন সময় মোবাইলে রিং বেজে উঠল। মোবাইলের মনিটরে মাহমুদের নাম ও ছবি ভেসে উঠল। অনেকক্ষণ মুক্তি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। কখনও মনে হলো আর কোন দিন মাহমুদের মোবাইল রিসিভ করবে না আবার একবার মনে হয় হাজার হলেও মাহমুদ তার স্বামী তার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের নয় আইনের, সামাজিকতার ও পরকালের। অনেকক্ষণ ভেবে মুক্তি মোবাইল রিসি করল, হ্যালো।

মুক্তি তুমি আমার মোবাইল রিসিভ করছ না কেন? মাহমুদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

মুক্তি রাগান্বিত স্বরে বলল, কেন তোমার কি মোবাইলে কথা বলার বন্ধুর অভাব হলো?

এভাবে কথা বলছ কেন?

এমনভাবে বলছ মনে হয় কিছুই বুঝতে পাচ্ছ না।

মুক্তি!

হ্যাঁ তুমি আমার কাছে মোবাইল সেট পাঠালে মনিটরের সামনে বসে মুখোমুখি কথা বলবে বলে কিন্তু তোমার মোবাইল সেট পাবার সঙ্গে সঙ্গে সেজে গুঁজে আমি তোমাকে মোবাইল করলাম কিন্তু আমি তোমাকে না দেখে এক বিদেশিনীর ছবি দেখলাম, তুমি বলো এজন্যই কি তুমি আমাকে অত্যাধুনিক মোবাইল সেট দিয়েছ?

মুক্তি অনেক হয়েছে, আর না। তুমি কোন কিছু না জেনে আমাকে ভুল বুঝছ, তুমি জানো যে মেয়েটি মোবাইল রিসিভ করেছিল সে কে? তবে শোন সে হলো আমার বন্ধু জহিরের বউ। এখানে আসার পর কয়েক মাসের মধ্যে জহির মেয়েটির প্রেমে পড়ে যায় এবং ওরা দু’জনে বিয়ে করেছে।

মুক্তির মুখে তৃপ্তির একটা স্পষ্ট আভা ফুটে উঠল। মুক্তি বিনয়ের সাথে বলল, সরি মাহমুদ।

মুক্তি আমাদের সম্পর্ক কি এতই ঠুনকো? কত বছর এক সঙ্গে মেলামেশা করলাম তাতে আমাদের আত্মার সম্পর্ক এক হয়ে গেছে তারপর আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক লুকোচুরি খেলার মতো নয়, আর তুমি এত সহজে আমাকে ভুল বুঝলে?

বললাম তো আমার ভুল হয়েছে।

ভুল বুঝতে পেরেছ ঠিক আছে, কিন্তু আমার প্রতি তোমার বিশ্বাসের-

মুক্তি বিনীতভাবে বলল, মাহমুদ তৃপ্তির বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে হয়ত খুব শীঘ্রই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হবে বাবা তোমাকে মোবাইল করবে তুমি এসো প্লিজ।

কেন? এই তো আমি তোমার মুখোমুখি বসে কথা বলছি, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ না? এখান থেকেই না হয় তৃপ্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দোয়া করবো। কিন্তু তৃপ্তির বিয়ের জন্য তুমি এত করে বলছ, তৃপ্তি তো আমাকে কোনদিন মোবাইল করল না।

মুক্তি মৃদু হেসে বলল, তৃপ্তির সঙ্গে কথা বলবে, একটু লাইনে থাক বলে মুক্তি জোরে ডাক দিল, তৃপ্তি।

তৃপ্তি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মুক্তির সামনে এসে দাঁড়াল। মুক্তি তৃপ্তিকে মোবাইল সেট দিয়ে বলল, তোর দুলাভাইর সঙ্গে কথা বল।

তৃপ্তি মোবাইল সেট হাতে নিয়ে বলল, হ্যালো দুলাভাই।

কিরে তৃপ্তি তুই তো খুব সুন্দর হয়েছিস শুনলাম তোর বিয়ের কথাবার্তা চলছে, কার সঙ্গে? যে ক’জন ছেলের সঙ্গে খাতির ছিল তাদের একজনের সঙ্গে নাকি নতুন কারও সঙ্গে?

তৃপ্তি মুচকি হেসে বলল, দুলাভাই!

এই হাসি দিয়েই কি-

তৃপ্তি বাধা দিয়ে বলল, দুলাভাই আসছেন তো?

আসব না মানে আমাকে ছাড়া তুই বিয়ে বসবি?

না দুলাভাই আমি আপনার অনুপস্থিতিতে বিয়েতে বসব না।

তোর সঙ্গে অনেক কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তোর আপা আবার মাইন্ড করতে পারে। এখন তোর আপাকে দে।

তৃপ্তি মুক্তিকে মোবাইল সেট দিতেই মুক্তি বলল, হ্যালো।

মুক্তি আগামী মাসের ফার্স্ট উইকে আমার ছুটি আছে সে সময় বিয়ের তারিখ ঠিক করলে আমার যাওয়া সহজ হবে।

তুমি নিশ্চিন্ত করলে মাহমুদ, আমি বাবাকে বলব, তোমার সুবিধা  তো সময়েই বিয়ের তারিখ ঠিক করা হবে, বলে মুক্তি মোবাইল সেট অফ করল।

 

একুশ

কাসেম সাহেবের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। এই স্কুলকে ঘিরেই তার সবকিছু। তিনি বেশির ভাগ সময় স্কুলে কাটান, সবসময় স্কুল নিয়ে ভাবেন। তিনি কখনও ভাবতেও পারেননি এই স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষকই তার ছত্র হয়ে ব্যক্তি স্বার্থের কারণে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে। কিন্তু তারা কাসেম সাহেবের কল্পনাকে অতিক্রম করেছে।

সেদিন রাত্রে হঠাৎ করে কাসেম সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। মাথায় আজ যেন সব এলোমেলো চিন্তা ঘুরপাক করছে। তিনি  অনেকক্ষণ দুশ্চিন্তায় বিছানায় ছটফট করলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে ঘুমাবার চেষ্টা করলেন। এক সময় দু’চোখে ঘুম নেমে এলো। স্বপ্নের ঘোরে কাসেম সাহেব দেখলেন ফিরোজ সাহেবের ড্রয়িং রুমে কমিটির সব সদস্য আর শিক্ষক প্রতিনিধিগণ একত্রিত হয়েছে। হামিদ সাহেব বললেন, চেয়ারম্যান সাহেব আপনি বলুন, আমি টিউশনি করার জন্য কত টাকা খরচ করে বাসায় একটা রুম এক্সটেনশন করলাম এখন যদি টিউশনি করতে না পারি তবে আমার কী হবে?

কিবরিয়া সাহেব বললেন, আপনারাই বলুন অনেক স্কুলের মাস্টার ঠিকমতো স্কুলেই যায়না। সবার শেষে গিয়ে সবার আগে বাসায় ফিরে যায়। স্কুলের ডিউটি ঠিকমতো করে না। আর আমরা ঠিকভাবে ডিউটি পালন করি তার উপর উনি বলেন স্কুল টাইমের পর ছাত্রদের ক্লাস নিতে। এটা কি বাংলাদেশ? না কী অন্য কোন দেশ? কোন কোন শিক্ষক আসল ডিউটি পালন করবে না আর আমরা অতিরিক্ত ডিউটি করবো? চাকরি করছি দেখে কি মাথা বিক্রি করছি যে হেড মাস্টারের কথায় উঠবস করতে হবে?

কমিটির সদস্য শহিদুল সাহেব বললেন, আরে বাবা নিয়ম তো সব জায়গায় আছে তাই বলে এক’শ ভাগ নিয়ম কি কেউ মেনে চলতে পারে? হামিদ, কিবরিয়া এরা তো আমাদেরই ছেলে এরা যদি টিউশনি করে কিছু ইনকাম করতে পারে তো দোষ কি? কাসেম সাহেব আসলে বেশি বুঝেন, বেশি সততা দেখান। অন্য স্কুলে হেড মাস্টার আছে না? তারা সবকিছু ম্যানেজ করে চাকরি করছে না?

কমিটির আরেকজন সদস্য বললেন, উনি কি ম্যানেজ করে চলার মানুষ। অন্য স্কুলের হেড মাস্টাররা যে কোন মূল্যে কমিটির সদস্যদের ম্যানেজ করেন। আমরা টাকা পয়সা খরচ করে কমিটির সদস্য হলাম কি লাভ হয়েছে আমাদের? অথচ অন্যান্য স্কুলের কমিটির সদস্যরা বিভিন্নভাবে বেনিফিটেড হয়, আর আমরা?

হায়াত সাহেব বললেন, সভাপতি সাহেব আপনি কিছু বলুন।

ফিরোজ সাহেব এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন এবার বললেন, দেখুন আমি আপনাদের দেয়া ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছি, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়েছি কাজেই আমি সব সময় আপনাদের মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেব, আপনারা সবাই মিলে যা বলবেন আমি তাই করবো। এ বিষয়ে একদিন মিটিং হয়েছে সেদিন কোন ডিসিশন হয় নি আজ আবার হঠাৎ করে স্যারকে একই বিষয়ে শোকজ করা ঠিক হবে না। স্যারের বিরুদ্ধে যদি নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পাওয়া যায় তবে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

তাহলে এ যাত্রায় আপনি হেড মাস্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন না, আমরা তাহলে এখন আসি বলে হায়াত সাহেব বললেন, হামিদ সাহেব এ যাত্রায় আপনার হেড মাস্টার হওয়া হলো না। আপনি হেড মাস্টারকে ফলো করুন এবার একটা অভিযোগ পেলেই হয় বলে হায়াত সাহেব বিকট শব্দ করে হেসে উঠলেন। তখনি কাসেম সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি আবার বিছানায় ছটফট করে উঠলেন।

 

বাইশ

অবশেষে তৃপ্তির পছন্দের এক ছেলের সঙ্গে বিয়ের দিন নির্ধারিত হয়েছে। বেশ ধুমধাম বিয়ের আয়োজনও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। বিদেশ থেকে মাহমুদও ইতোমধ্যে এসে পৌঁছেছে। মুক্তি, তৃপ্তি আর মাহমুদ সবাই মিলে সব সময় বিয়ের কেনাকাটা, ডেকোরেশন, সবকিছু মিলে যেন বাসায় আনন্দের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। গ্রামের বাড়ি থেকে তৃপ্তির চাচাতো ভাই- বোন দিনাজপুর থেকে তার মামা-মামী, মামাতো ভাই-বোন সবাই এসেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত অতিথিদের বিভিন্ন ধরনের আচার-অনুষ্ঠান সবকিছুকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। তৃপ্তি পিঁড়ির উপর বসেছিল, একে একে সবাই তার গায়ে হলুদ দিচ্ছিল একেকজনের একেক ধরনের রসিকতা আর হলুদ মাখামাখির মধ্যদিয়ে রাত গভীর হলো। তৃপ্তির এক মামাতো বোন তৃপ্তিকে পিঁড়ি থেকে তার ঘরে নিয়ে গেল। তারপর কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

মুক্তির ডাকে তৃপ্তির ঘুম ভাঙ্গল। দরজা খুলে দিয়েই তৃপ্তি একরকম হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে আপা?

তোর টেলিফোন।

কে?

তোর সাহেব, তাড়াতাড়ি যা।

তৃপ্তি একরকম দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন রিসিভ করল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে কৌশিকের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, তৃপ্তি।

তৃপ্তি চমকে উঠল, হুঁম বলো।

তুমি কি সাগরকে চেনো?

তৃপ্তি পাল্টা প্রশ্ন করল, কোন সাগরের কথা বলছ?

তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, নামটা প্রথম শুনলে।

ও, তুমি মসজিদ পাড়ার সাগরের কথা বলছ।

তুমি সাগরকে ভালোবাসতে?

এসব তুমি কী বলছ কৌশিক?

হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি এটা জানা আমার খুব জরুরী।

তৃপ্তি বলল, সাগর আমার সঙ্গে পড়ত কিন্তু আমি তো ওকে ভালোবাসি না।

তুমি কি জানো সাগর ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে?

কিন্তু সাগরের আত্মহত্যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?

সম্পর্ক আছে, সাগরের বেডরুম থেকে পুলিশ আমাদের বিয়ের কার্ড আর সাগরের সঙ্গে তোমার কম্বাইন্ড ছবি উদ্ধার করেছে এরপরও কি তুমি অস্বীকার করবে?

তৃপ্তি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, কৌশিক।

হ্যাঁ তৃপ্তি আজকের পেপার পড়ে দেখ, সাগরের আত্মহত্যার সঙ্গে তোমাকে জড়িয়ে খবর বেরিয়েছে। ছিঃ তৃপ্তি, ছিঃ তুমি একটা মিথ্যাবাদী, ছলনাময়ী, কলঙ্কিনী। তোমার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই, তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

তৃপ্তি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, কৌশিক তুমি আমার কথা শোন, প্লিজ!

কিন্তু ততক্ষণে কৌশিক রিসিভার রেখে দিয়েছে। তৃপ্তির হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল। তৃপ্তির অসংযত অবস্থা দেখে মুক্তি তৃপ্তিকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, কী রে তৃপ্তি? কী হলো?

তৃপ্তি মুক্তির বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

অনেকক্ষণ পর তৃপ্তির কান্না থামলে মুক্তি জিজ্ঞেস করল, তৃপ্তি ঘটনাটা কী রে?

তৃপ্তি চোখের পানি মুছে নিজেকে সংবরণ করে বলতে শুরু করল, আপা সাগর আর আমি এক সঙ্গে পড়তাম। শুধু এক সঙ্গে পড়তাম বললে ভুল হবে। আমরা দু’জনে খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। সাগর একদিন আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল আমি বলেছিলাম, এক সঙ্গে পড়ছি, চলাফেরা করছি, বন্ধুত্ব করছি এনজয় করছি এর সঙ্গে ভালোবাসা-বাসির কী সম্পর্ক? সাগর কৌশিকের খালাত ভাই, তাই কৌশিকের বিয়ের কার্ডে আমার ঠিকানা পেয়েই আমাকে ফোন করে বলেছিল, তৃপ্তি তুমি আমাকে ছেড়ে অন্য কারও হবে এটা আমি হতে দেব না, আমি বেঁচে থাকতে তুমি কারো হতে পারবে না। যদি কারো হতেই চাও তবে আমার মৃত্যুর পর তুমি যে কারো হও তাতে আমার কিছু আসে না, আমি মরে গিয়ে তোমার পথ পরিষ্কার করে দেব, তুমি আমার লাশের উপর দিয়ে অন্য কারও কাছে যেও। আমি ভেবেছিলাম এরকম তো কতজনই বলে। কিন্তু ও যে সত্যি সত্যিই আমার জন্য জীবন দিতে পারে সেটা আমি ধারণা করতে পারিনি।

তৃপ্তি তোকে আমি একদিন বলেছিলাম সব বিষয়ে হেয়ালিপনা ভালো না, জীবনের কিছু কিছু বিষয়ে সিরিয়াস হতে হয়। তুই আমার কথায় কান দিসনি। যাক আর ভেবে লাভ নেই। এখন একটু সংযমী হও সব ঠিক হয়ে যাবে, বলতে বলতে মুক্তি তৃপ্তিকে তার রুমে নিয়ে গেল।

 

তেইশ

বিয়ের আগে মাহমুদ আর মুক্তি অনেক ঘুরে বেড়িয়েছে। ছাত্র জীবনের ৫/৬ বছরে তারা সুযোগ পেলেই মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু বিয়ের পর এই প্রথম তারা দু’জনে বের হলো। মাহমুদ পঞ্চগড় এসেই একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করেছে। সেই গাড়িতে বের হলো রওশনপুর আনন্দধারা আর চা বাগান দেখার উদ্দেশ্যে। মাঝিপাড়া থেকে উত্তর দিকে সরু পাকা রাস্তা দিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার যাবার পর শালবাহান যাবার কয়েক মিটার আগে ডানদিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে সেই রাস্তা বরাবর প্রায় এক কিলোমিটার যাবার পর আনন্দধারা পার্ক শুরু হয়েছে। প্রথমে পার্ক, পার্ক পার হয়ে যাবার পর আনন্দ ধারার বিলাস বহুল অত্যাধুনিক, অভিজাত কটেজ শুরু হয়েছে। গাড়ি গেটে দাঁড়াতেই ইউনিফর্ম পরা সিকিউরিটি স্যালুট দিয়ে মাহমুদের পরিচয় জানতে চাইল। মাহমুদ তার পরিচয় দেওয়ার পর সিকিউরিটি ভিতরে চলে গেল এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে গেট খুলে দিল। গেটের অদূরে রিসিপশন, রিসিপশন থেকে এক ভদ্র লোক বেরিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিলেন, আমি মোঃ আব্দুল হাই, এ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আনন্দধারা।

মাহমুদ তার নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, হাই সাহেব আমরা একটু ঘুরে দেখব।

হাই সাহেব বিনীতভাবে সম্মতি দিলেন। মাহমুদ ও মুক্তি গা ঘেঁষে হেটে চলল। ফুটপাথের দু’পাশে পরিকল্পিতভাবে লাগান সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির ফুল গাছ। ফুটপাথের শেষ প্রান্তে শুরু হয়েছে কটেজ। পরপর কয়েকটি কটেজ কোনভাবে একটি কটেজে উঠলেই ওভার ব্রিজের উপর দিয়ে সবক’টি কটেজে যাওয়া যায়। নীচ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী ডাহুক। নক্সার মতো করে ব্লক দিয়ে ডিজাইন করে ক্ষুদ্র ডাহুক নদীর পাড় ভাঙ্গা ঠেকান হয়েছে। ওভার ব্রিজের রেলিং কারুকার্য খচিত নক্সা সজ্জিত। ডাহুক নির্মিত ওভার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকালে চোখে পড়ে বন্ধুর ভূমিতে সবুজ চা বাগান, উপরে বিশাল আকাশ, নীচ দিয়ে নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে ডাহুকের স্বচ্ছ পানি। মাহমুদ ও মুক্তি ওভার ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেট সংলগ্ন প্রথম কটেজের মেঝেতে এসে উঠল। কটেজের সামনে একটি বকুল গাছ, গাছের সঙ্গে ঝুলান একটি সাইন বোর্ড, গাছের পরিচিতি এবং গাছের নীচে বসা অবস্থায় বাঁশী বাজান একটি রাখালে মূর্তি যেন প্রকৃতিকেও হার মানিয়েছে, কটেজটি ড্রয়িং রুম হিসেবে অতিথিদের ব্যবহারের জন্য, তাই কটেজের বারান্দায় অত্যাধুনিক ডিজাইনের সোফাসেট, মাহমুদের চোখে পড়ল একটি বৈদ্যুতিক চুল্লি। সব কিছু মিলিয়ে আনন্দধারা এলেই বুঝা যায় অত্যন্ত উন্নত রুচি সম্পন্ন, আর্কিটেক্ট আর ধনাঢ্য মানুষের আভিজাত্য ও অর্থের সমন্বয় ঘটান হয়েছে আনন্দধারা নির্মাণে। মাহমুদ আর মুক্তি দু’জনে আনন্দ ধারা দেখা শেষ করে  উত্তর দিকে চলে গেল চা বাগান দেখতে। দু’জনে ডাহুক নদীর তীরে একটি গাছের নীচে বসল।

কিছুক্ষণ দু’জনে বসে রইল। মাহমুদ প্রথমে নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, মুক্তি কিছু বলো।

কী বলব?

কেন যখন বিদেশে ছিলাম তখন তো বলতে আমাকে বলার তোমার অনেক কথা আছে, মোবাইলে কথা বলতে বলতে-

মুক্তি মাহমুদের কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, হ্যাঁ যখন তুমি দূরে ছিলে তখন মনে হতো তোমাকে কাছে পেলে কত কথাই না বলব, কিন্তু তুমি যেদিন এলে যেন আমার সব কথা এলোমেলো হয়ে গেল।

তোমার সবকিছু হলো, একবার তৃপ্তির কথা ভেবে দেখ, ওর সবকিছু এলোমেলো হলো এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মধ্য দিয়ে। কয়েকদিনের মধ্যেই ওর প্রাণ শক্তি যেন একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেছে, ওর মুখের দিকে তাকালেই কষ্ট হয়।

মুক্তি বলল, এরকম একটা আশঙ্কা আমি আগে থেকেই করেছিলাম।

মাহমুদ জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ করে তোমার এমন আশঙ্কা হলো কেন?

তোমাকে ওর সবকিছু বলাই হয়নি, তৃপ্তি আসলে একসঙ্গে কয়েক জন ছেলে সঙ্গে খোলা-মেলাভাবে চলাফেরা করত। কারও সাথে তার নিজের নামে আবার কারও সঙ্গে ছদ্ম নামে। সাগর ছেলেটা ওর সহজ মেলামেশাকে ভালোবাসা বলে বিশ্বাস করে সরল মনে ভালোবেসেছিল। সাগরের ভালোবাসা ছিল নির্ভেজাল, মুক্তির মেলামেশা ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ, সাগর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে তার ভালোবাসার গভীরতা, যা আজকালকার দিনে দুর্লভ। তৃপ্তিও পেয়েছে তার হেয়ালিপনা ও নিষ্ঠুর রসিকতার শিক্ষা।

মাহমুদ মুক্তিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল, এভাবে বলতে হয় না মুক্তি, হাজার হলেও নিজের বোনতো। যা হবার তা হয়েছে এবার ওর জন্য নতুন করে ভাবতে হবে।

মুক্তি জিজ্ঞেস করল, কবে যাচ্ছ? কবে পড়া শেষ করে আসছ?

আগামী শুক্রবার আমার ছুটি শেষ, তার আগে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। ফিরে আসার কথা বলছ- আর প্রায় দু’বছর।

এমনি করে মুক্তি আর মাহমুদ অনেকক্ষণ গল্প করে কাটিয়ে দিল।

 

চব্বিশ

কাসেম সাহেবের পক্ষে চাকরি করা ক্রমে ক্রমে কষ্টকর হয়ে পড়ছে। আজকাল কিবরিয়া সাহেব এবং হামিদ সাহেব প্রায়ই দেরিতে ক্লাসে আসে এবং সবার আগে স্কুল ত্যাগ করে। এ সুযোগে তাদের সঙ্গে আরো দু’একজন শিক্ষক যোগ দিয়েছে। স্কুলে শিক্ষকদের মধ্যে একটা শীতল রাজনীতি ও বিভক্তি শুরু হয়েছে, পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে।

একদিন বিকেল বেলা ফিরোজ সাহেব স্কুলের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য মিটিং ডাকতে বললেন। নির্ধারিত সময়ে মিটিং শুরু হলো। মিটিং এর শুরুতে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা পড়ার বিষয় এবং স্কুলের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলো। তারপর বিবিধ আলোচনায় কমিটির সদস্য হায়াত সাহেব বললেন, মাস্টার সাহেব আমরা অনেকদিন থেকে স্কুলের আয়-ব্যয়ের কোন হিসাব দেখি না আজ একটু খাতাপত্রগুলো বের করুন তো দেখি।

কাসেম সাহেবের ধারনাই সত্য হলো। তিনি আগেই ভেবেছিলেন মিটিং এ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তা না হলে এতদিন কেউ স্কুলের হিসাব দেখতে না চাইলেও তিনি নিজেই কমিটির সকল সদস্যকে হিসাব দেখাতেন। কাসেম সাহেবের উপর সকলের ছিল অন্ধ বিশ্বাস। তিনি তাদের সেই বিশ্বাসকে কোনদিন অমর্যাদা করেন নি। এখন যে তার উপর কোন বিশ্বাস নেই এমন নয়, নিছক ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য কাসেম সাহেবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কাসেম সাহেব সবকিছু বুঝতে পেরেও মুখে কিছুই বললেন না।

তিনি হাকিমকে বললেন, হাকিম কাওছার সাহেবকে খাতাপত্র নিয়ে আসতে বলো তো।

কয়েক মিনিটের মধ্যে স্কুলের একাউন্টেন্ট কাওছার সাহেব কয়েকটি রেজিস্টার খাতা নিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। হায়াত সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কাওছার সাহেব গত মিটিং এর পর যে সব খরচ হয়েছে একবার পড়ুন দেখি।

কাওছার সাহেব প্রত্যেকটি হিসাব পড়ছিলেন এমনসময় হায়াত সাহেব বললেন, থামুন তো। আর একবার বিস্তারিত হিসাবটা পড়ুন।

কাওছার সাহেব বিল্ডিং নির্মাণ কাজের হিসাবটা, আবার পড়তে শুরু করলেন। তার পড়া শেষ হবার পর হায়াত সাহেব বললেন, সভাপতি সাহেব কিছু বুঝলেন।

শহিদুল সাহেব বললেন, বিল্ডিং নির্মাণ কাজের হিসাবে কিছু গড়মিল আছে।

মুহূর্তের মধ্যে কাসেম সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন, আপনার আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন? আমি মিথ্যা কথা বলে স্কুলের টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছি?

শহিদুল সাহেব বললেন, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার কিংবার টিচার্স রিপ্রেজেন্টটেটিভ স্কুলের আয়-ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন।

কাসেম সাহেব ভেবেছিলেন কমিটির সভাপতি ফিরোজ তার ছাত্র সে হয়ত তার স্যারের অপমানের প্রতিবাদ করবে। কিন্তু তার অদ্ভুত রকমের নীরবতায় কাসেম সাহেব ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, সভাপতি সাহেব আপনি কিছু বলুন, আপনি তো সবই জানেন।

হায়াত সাহেব মুখ বিকৃত করে বললেন, শুধু সভাপতি জানলে হবে না, আমরা কমিটির সদস্য কিবরিয়া সাহেব, হামিদ সাহেব এরা টিচার্স রিপ্রেজেন্টেটিভ তাদের কাছেও আপনি জবাব দিতে বাধ্য।

হামিদ সাহেব মুখ বিকৃত করে বললেন, উনি আবার আমাদের কি বলবেন? আমরা উনার একরকম চাকরের মতো। আমাদের অনিয়ম উনার চোখে-পড়ে আর উনি যে স্কুলটা লুটেপুটে খাচ্ছেন সে বিষয়ে কারো কিছু বলার নেই।

সভাপতি সাহেব ধমকের সুরে বললেন, হামিদ সাহেব, ভদ্রভাবে কথা বলুন, দুর্নীতি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আপনি একথা বলতে পারেন না।

শহিদুল সাহেব বললেন, সভাপতি সাহেব সবাই যখন বলছে তখন আমার মনে হয় আমাদের একবার তদন্ত করে দেখা উচিৎ।

সভাপতি সাহেব বললেন, কমিটির দু’জন মেম্বার আর একজন শিক্ষক প্রতিনিধির সমন্বয়ে কন্সট্রাকশন কাজের হিসাব দেখার জন্য একটি সাব-কমিটি গঠন করা উচিৎ। কমিটির সদস্য শহিদুল সাহেবকে সাব-কমিটির আহবায়ক এবং হায়াত সাহেব ও হামিদ সাহেবকে সদস্য করে একটি সাব-কমিটি গঠন করে কন্সট্রাকশন কাজ তদন্ত করে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত হলো, আজকের মতো সভা এ পর্যন্ত সমাপ্তি ঘোষণা হলো।

মিটিং শেষে সবাই চলে যাবার পর কাসেম সাহেব সমস্ত কাগজ-পত্র বের করে দেখলেন তারপর কাওছার সাহেবকে বললেন, কাওছার সাহেব শুধু কি আমি টাকা খরচ করেছি? সিমেন্ট, বালু, ইট, লেবার খরচ এসব আপনি করেছেন, স্কুলের শিক্ষক এবং হাকিম সবাই খরচ করেছেন। আমি শুধু ওভার অল সুপারভিশন করেছি মাত্র। তবে আবার আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে কেন?

কাওছার সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, স্যার কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?

হুঁম বলুন।

আমার মনে হয় সবাই কেন এমন করেছে তা আপনি বুঝতে পেরেছেন?

হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন, আমি শীঘ্রই আমার ডিসিশন জানিয়ে দেব, বলে কাসেম সাহেব একটু থামলেন তারপর বললেন, কাওছার সাহেব সাব-কমিটির সদস্যরা যেভাবে সহযোগিতা চায় সেভাবে সহযোগিতা করবেন তাঁরা যেন কোনভাবেই আমাদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ না আনতে পারেন। আমি আজকের মতো বাড়ি গেলাম, বলে কাসেম সাহেব স্কুল থেকে বের হলেন।

 

পঁচিশ

সাগরের মৃত্যুর কয়েক মাস হলো এতদিনে সাগরের দেহাবশেষ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে সাগরের স্মৃতিগুলো ততই তৃপ্তির মন আঁকড়ে ধরছে। একদিন বিকেলে তৃপ্তি মুক্তিসহ বেড়াতে গিয়েছিল স্বপ্নবিথী পার্কে। তৃপ্তি প্রথমে যেতে চায়নি মুক্তি এক রকম জোর করে বলেছিল, চলনা আমারও ভালো লাগছে না, একটু ঘুরে আসি। তারপর মুক্তির অনুরোধে তৃপ্তি গিয়েছিল কিন্তু এখানেও শান্তি নেই, পার্কের গেট দিয়ে ঢুকতেই তৃপ্তির মনে সাগরের ছবি ভেসে উঠল। প্রায় বছর খানেক আগে তৃপ্তি তার আরও কয়েকজন বান্ধবীসহ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এই পার্কে এসেছিল। তাদের পার্কের দিকে আসতে দেখে সাগর ও তার কয়েকজন বন্ধু পিছু নিয়েছিল। সাগরকে দেখে তৃপ্তি প্রথমে বিরক্ত হয়েছিল কিন্তু পরক্ষণেই সাগরের সরল আর অকৃত্রিম মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারেনি। সাগর দল ছুট হয়ে এগিয়ে এসেছিল তারপর দু’জনে পার্কের সরু পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে এসে বসেছিল। স্বপ্ন বিথী পার্কের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট নদী, নদীটি খুব শান্ত, নীরবে বয়ে চলেছে বছরের পর বছর ধরে কিন্তু কোন দিকে কোন ভাঙ্গন নেই, সীমানার নেই কোন পরিবর্তন। আর তাই পার্কের কর্তৃপক্ষ নদীর পাড়ে সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছে গাছের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটি বেঞ্চে সাজান আছে সাগর ও তৃপ্তি দু’জনে একটি বেঞ্চে এসে বসেছিল। অনেকদিন থেকে সাগর তৃপ্তিকে অনুসরণ করায় তৃপ্তির মনে একটু সহানুভূতি জন্মেছিল। তৃপ্তি রাগের ভান করে বলেছিল, সাগর তোমাকে আমি কতবার বলেছি, তুমি এভাবে আমার পিছনে ঘুর ঘুর করবে না।

সাগর আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিল, তৃপ্তি আমি তোমাকে ভালোবাসি।

সে তো অনেক পুরাতন কথা আমি তো তোমাকে বলেছি ঐ সব ভালোবাসা-বাসির মধ্যে আমি নেই, নতুন কোন কথা থাকলে বলো?

তৃপ্তি তোমার কথাগুলোতে পুরাতন, প্লিজ নতুন কিছু বলো।

তৃপ্তি আর হাসি লুকাতে পারেনি হেসে বলেছিল, বাহ্‌ তুমি তো খুব ভালো কথা বলতে পার, আগে তো কোনদিন এভাবে কথা বলোনি।

তুমি তো কোনদিন আমাকে কথা বলতে দাওনি, আমি অনেকদিন তোমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তুমি আমাকে ফ্লোর দাওনি।

ঠিক আছে আজ ফ্লোর দিলাম, এখন থেকে কথা বলবে কিন্তু শর্ত একটাই কোন ভালোবাসা-বাসির কথা বলবে না, বন্ধু আছ, বন্ধুই থাকবে।

সাগর তৃপ্তির কথার মৃদু প্রতিবাদ করে বলেছিল, বন্ধু না হয় থাকলাম কিন্তু তারপর-

তৃপ্তি অগ্নিবিষ্ফোরিত চোখে তাকাতেই সাগর হাত জোড় করে অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। তার তাকানোর ভঙ্গিটা আজও তৃপ্তির চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। তারপর সাগরের সঙ্গে তৃপ্তিকে অনেক কথা হয়েছিল, একদিন কথা প্রসঙ্গে সাগর বলেছিল, যদি কোন দিন ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে হয় হবে আমি জীবন দিয়ে আমার ভালোবাসার প্রমাণ দিব।

এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে তৃপ্তির চোখ থেকে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মুক্তিকে বাগানে হাঁটতে দেখে তৃপ্তি বেঞ্চে এসে বসল। কখন যে মুক্তি তৃপ্তির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তৃপ্তি খেয়াল করে নি। মুক্তি তৃপ্তির কাঁধে হাত দিতেই তৃপ্তি চমকে উঠল, আপা।

মুক্তি হুঁম জিজ্ঞেস করল, কি রে তুই কাঁদছিস?

তৃপ্তি অশ্রু সংবরণ করে বলল, কিছু না আপা?

মুক্তি তৃপ্তির পাশে বসে তৃপ্তির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তৃপ্তি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে তো চলবে না।

তৃপ্তি বলল, আমি এখন কী করবো আপা? সবসময় আমার শুধু-

মুক্তি তৃপ্তির কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, তোর সব কিছু ভুলে যেতে হবে তৃপ্তি আমরা তোর চিন্তা ক্লিষ্ট মুখ দেখতে চাই না। তৃপ্তি তোকে আবার নতুন করে বাঁচতে হবে, তোকে আমরা সবাই আগের মতো হাসি-খুশি দেখতে চাই।

আপা।

মুক্তি সান্ত্বনার সুরে বলল, হ্যাঁ রে দুর্ভাগ্যক্রমে কত মেয়ে অল্প বয়সে বিধবা হয়, কত মেয়ে ডিভোর্স হয় তারপরও তো মানুষ বাঁচে আর তোর তো কিছুই হয়নি বিয়ের আগে এ রকম কোন ঘটনা ঘটতেই পারে, এগুলো মন থেকে মুছে ফেলতে হয়।

আপা তোমাকে আমি সবকিছু খোলামেলা বলি, কোনকিছুই লুকাই না। আপা তুমি বিশ্বাস কর আমি সাগরকে ভালোবাসতাম না একথা আমি ওকে অনেকবার বলেছি কিন্তু বিশ্বাস করাতে পারিনি। সাগর বেঁচে থাকলে হয়ত কোনদিন ওর কথা আমার মনেই পড়ত না। আসলে ওর নিখাদ প্রেম প্রত্যাখ্যান করায় ও জীবন দিয়ে আমার উপর প্রতিশোধ নিয়েছে।

এখন কি করবি বল? সাগর বেঁচে থাকলে হয়ত ভেবে দেখার সুযোগ ছিল কিন্তু এখন তো ওকে মন থেকে মুছে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই রে।

তৃপ্তি প্রশ্ন করল, আপা দুলাভাইর সঙ্গে তোমর বিয়ে না হলে তুমি পারতে তাকে ভুলে যেতে?

কিন্তু আমার বেলায় তো সে রকম হয়নি, তোর ক্ষেত্রে যখন এমন একটা ঘটনা ঘটেই গেছে তখন একটা দুর্ঘটনার কারণে তো আর জীবন নষ্ট করা যায় না, আমি তোকে একটা কথা বলি।

বলো আপা।

আর ক’দিন পরেই তোর দুলাভাই আসছে, আমিও বদলি নিয়ে ঢাকা যাব, তোর দুলাভাই ঢাকায় প্র্যাকটিস করবে তখন তোকে আমি ঢাকা নিয়ে যাব, তুই আমার কাছে থাকবি।

তৃপ্তি একটা শুষ্ক হাসি হেসে সায় দিল।

 

ছাব্বিশ

তৃপ্তির চাল চলনে আর চাঞ্চল্য নেই, চলা ফেরায় নেই কোন উচ্ছলতা। তার চোখের গোড়া কালো হয়ে গেছে। চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। মেজাজ হয়ে গেছে একেবারে খিটখিটে। আজকাল তৃপ্তি বাসার বাইরে তেমন একটা বের হয় না। একান্ত জরুরী কোন কাজে বের হলেও প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে। সর্বদাই পরিচিত মানুষ এড়িয়ে চলে। আগে যেসব বন্ধু দিনরাত টেলিফোন করত তাদের কেউ আর টেলিফোন করে না। ছদ্ম নামেও আর কেউ তৃপ্তিকে খুঁজে না। সারাদিন বাসায় বসে কাটিয়ে দেয় অনেক সময় তৃপ্তি একটা টেলিফোন পাবার প্রতীক্ষায় তীর্থের কাকের মতো বসে থাকে অথচ তৃপ্তির টেলিফোন আসে না। অনেক সময় তৃপ্তির নিজেকে খুব অসহায় এবং অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। সেদিন বিকেল বেলা তৃপ্তি বেলকনিতে বসে দূর দিগন্তে আনমনা হয়ে তাকিয়েছিল, এমন সময় টেলিফোনের রিং বেজে উঠল। প্রথমে বাজতে বাজতে একবার বন্ধ হয়ে গেল তৃপ্তি টেলিফোন রিসিভ করল না। আবার বেজে উঠল, তৃপ্তি বিরক্তির সঙ্গে টেলিফোন রিসিভ করল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে রানার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, তৃপ্তি আমি রানা।

জি ভাইয়া, কেমন আছেন?

হ্যাঁ আমি ভালো আছি, তুমি?

তৃপ্তি একটা নিঃশ্বাস টেনে বলল, এই আছি কোন মতো।

তিশার কাছে শুনলাম তুমি নাকি আজকাল ঘর থেকে বের হওনা? সারাদিন ঘরে বসে থাক? সে কারনেই নাকি একা থেকে থেকে তুমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছ?

ভাইয়া আপনি আমাকে নিয়ে ভাবেন জেনে খুব ভালো লাগছে, আজকাল কেউ তেমন একটা ফোন করে না, আপনি ছাড়া কেউ খবরও নেয় না।

তৃপ্তি তোমার আসলে একটা চেঞ্জ দরকার। একবার তিশাসহ ঢাকায় এসো, কয়েকদিন ঘুরে বেড়ালে হয়ত মনটা ফ্রেশ হবে।

দুলাভাই আর কয়েকদিন পর বিদেশ থেকে আসবে এবং আপাসহ ঢাকায় থাকবে, ভাবছি তখন ঢাকা যাব।

অপর পাশ থেকে রানার কণ্ঠ ভেসে এলো, তুমি ঢাকায় এলে আমাকে ফোন দিও।

জি ভাইয়া বলে তৃপ্তি রিসিভার রেখে দিল।

টেলিফোনে কথা বলা শেষ করে তৃপ্তি আবার বেলকনিতে গিয়ে বসল। তৃপ্তির মনে রানার সাথে প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত স্মৃতি ভেসে উঠল।

রানার সঙ্গে তৃপ্তির প্রথম পরিচয় হয়েছিল বাণিজ্য মেলায়। বিশালাকার ছাতার নিচে প্লাস্টিকের গোলাকার টেবিলের চার পাশে সাজান চেয়ার। তৃপ্তি আর তার বান্ধবী তিশা চেয়ারে বসে চটপটি খাচ্ছিল এমন সময় দু’জন ছেলে কাছাকাছি আসতেই তিশা প্রথম কথা বলল, রানা ভাই যে? কবে এসেছেন?

কাল এসেছি। আজ একবার তোকে খুঁজলাম, শুনলাম তুই বেড়াতে বেরিয়েছিস। এখানে দেখা হবে ভাবিনি।

বসুন রানা ভাই, বলে তিশা পাশের চেয়ারে সরে বসল। তারপর ফাঁকা দু’টি চেয়ারে বসার ঈশারা করল।

রানা চেয়ারে বসলে তার সঙ্গে ছেলেটিও বসল। তিশা দু’জনকে পরিচয় করিয়ে দিল, আমার ভাই রানা, আর ভাইয়ার বন্ধু মোস্তাক। তারপর তিশা তৃপ্তির দিকে তাকিয়ে বলল, রানা ভাই ও হচ্ছে-

তৃপ্তি তিশার কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলল, আমি স্নিগ্ধা, তিশার বান্ধবী।

তিশা তৃপ্তির দিকে তাকিয়ে হাসল।

রানা জিজ্ঞেস করল, আপনি কি তিশার সঙ্গে পড়েন?

হুঁম।

আমি ঢাকা ভার্সিটিতে এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে।

রানা তাদের দু’জনের জন্য চটপটির অর্ডার দিয়ে বলল, তিশা তো চটপটি খেয়েছিস আর কী খাবি? স্নিগ্ধা আপনি কী খাবেন বলুন?

তিশা বলল, ভাইয়া ও আমার বান্ধবী, আপনার চেয়ে অনেক ছোট ওকে তুমি বলবেন, কীরে তুই কী বলিস?

তৃপ্তি আমতা আমতা করে বলল, হুঁম।

তিশা কী খাবি বল? স্নিগ্ধা তুমি কী খাবে বলো?

আজ না ভাইয়া আরেকদিন বলে তৃপ্তি ও তিশা বিদায় নিল। কয়েকদিন পর তৃপ্তির সঙ্গে রানার আরও একবার দেখা হয়েছিল তিশাদের বাসায়, সেদিন অনেক কথা হয়েছিল। তিশা একরকম ইচ্ছা করেই রানাকে তৃপ্তির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল।

রানা কথা প্রসঙ্গে বিভিন্ন ভাবে প্রেম নিবেদন করেছিল, তৃপ্তি যেমন রানার প্রেমে সাড়া দেয়নি তেমনি প্রত্যাখ্যানও করেনি। রানা আর তৃপ্তি অনেকক্ষণ কথা বলার পর তিশা চা-নাস্তা নিয়ে ঢুকেছিল, কী খবর ভাইয়া? কিছু হলো?

তৃপ্তির মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে গিয়েছিল।

রানা নিরাশ হয়ে বলল, না কিছু হলো না, তোর বান্ধবীটি খুব বুদ্ধিমতী, না শুধু বুদ্ধিমতী বললে কমিয়ে বলা হবে, বরং চালাক বলাই ঠিক হবে।

তারপর চা খেতে খেতে আরও কিছুক্ষণ গল্প করার পর রানা চলে যাবার সময় মিষ্টি হেসে বলল, স্নিগ্ধা ভালো থেকো, তিশা আসি রে।

রানা চলে যাবার পর তৃপ্তি অভিমানের সুরে বলল, তিশা তুই কাজটা ভালো করিস নি।

তিশা কোন কিছু না বোঝার ভান করে বলল, কোন কাজটা।

এই যে, রানা ভাইর সঙ্গে আমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখা।

কেন ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলে তোর বুঝি ভালো লাগেনি? দাঁড়া এবার ফোন নাম্বার দিব তোর আসল নাম বলে দিব।

তৃপ্তি রাগান্বিত কণ্ঠে বলেছিল, দিস।

সত্যি বলব?

তৃপ্তি মৃদু হেসে চুপ করে নীরব সম্মতি জানিয়েছিল।

তখন থেকে রানা ঢাকা গিয়েও প্রায়ই তৃপ্তিকে ফোন করত। তখন থেকে রানা ঢাকা গিয়েও প্রায়ই তৃপ্তিকে ফোন করত। কয়েকদিন আগেও রানা একবার ফোন করেছিল। তিশার কাছে থেকে সব কিছু শুনে রানা তৃপ্তিকে প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছিল। আজ রানাকে তৃপ্তির খুব আপন মনে হলো।

 

সাতাশ

সেদিন মুক্তির ডিউটি ছিল না। সকাল বেলা বিছানা থেকে দেরিতে উঠেছে। বিছানা ছেড়ে উঠেই মুক্তির পেপার পড়ার অভ্যাস তার ওপর পেপারে মহিলাদের জন্য পাতাটির প্রতি মুক্তির বিশেষ দুর্বলতা আছে। সে যখন সোফায় বসে তার সেই প্রিয় পাতাটি গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ছিল। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল মুক্তি কিছুটা বিরক্তির সাথে সোফা থেকে উঠে দরজা খুলে দিয়েই চমকে উঠল, বাবা আপনি? এত সকালে? কোন কিছু না জানিয়ে? হঠাৎ!

মা তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আগে ভিতরে ঢুকতে দাও তারপর-

ওহ! হ্যাঁ আসুন প্লিজ, বলে মুক্তি ভিতরে ঢুকল এবং কাসেম সাহেব বাসার ভিতরে ঢুকলে মুক্তি দরজা বন্ধ করে দিল।

কাসেম সাহেব মুক্তির পিছনে পিছনে ড্রয়িং রুমে ঢুকে বললেন, বলো মা তুমি কেমন আছ? বিহাই-বিহাইন কোথায়?

মুক্তি সোফায় বসে বলল, জি বাবা ভালো, বাবা বাইরে গেছেন, মা রান্না ঘরে, আপনারা সবাই-

হুঁম মা সবাই ভালো আছি। আমি কয়েকদিন থেকে আসতে চাচ্ছিলাম কিন্তু আজ-কাল করে আসা হচ্ছিল না। আজ সকালে উঠে কোন কিছু না ভেবেই রওয়ানা দিলাম। ভাবলাম যাই মাকে একবার দেখে আসি।

খুব ভালো করেছেন বাবা, আজ আপনার স্কুল নেই?

ওহ্‌ তোমাকে তো একটা কথা বলাই হয়নি, আমি স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।

মুহূর্তেই মুক্তির গলা শুকিয়ে গেল, অজানা কৌতূহলে হতচকিত হয়ে বলল, কেন?

আসলে আমি তো অনেকদিন থেকে স্কুলে হেড মাস্টারের দায়িত্বে আছি। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, স্কুল ক্যাম্পাসসহ প্রতিটি চেয়ার টেবিলকে পর্যন্ত আমি খুব আপন ভেবেছিলাম। প্রত্যেকটি ছাত্র-ছাত্রীকে আমি নিজের ছেলে মেয়ে মনে করতাম। স্কুলে লেখাপড়ার গুনগত মান রক্ষার জন্য আমি কিছু নিয়ম চালু করেছিলাম। যেমন কোন ছাত্র-ছাত্রী ক্রমাগত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে কিংবা রেজাল্ট খারাপ করলে গার্জিয়ানকে অবহিত করা, বছরে কমপক্ষে একবার গার্জিয়ানদের মিটিং ডেকে লেখাপড়ার মান উন্নয়নের জন্য আলোচনা করা। ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসের পড়া ক্লাসে আদায় করা, কোন বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা দুর্বল হলে সে বিষয়ের শিক্ষককে জবাবদিহিতার পর্যায়ে এনে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, টিচারদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করে দুর্বল ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল আওয়ারের আগে কিংবা পরে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে সে বিষয়ে দক্ষ করে তোলা। কিন্তু আমার অন্যান্য নিয়মগুলো সবাই পালন করলেও প্রাইভেট টিউশনি করতে না দেয়ায় কয়েকজন শিক্ষক প্রতিবাদ করে এবং আমি তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করলে তারা তখন কমিটির সদস্যদের সাথে ষড়যন্ত্র করে আমাকে দুর্নীতিবাজ হিসাবে প্রমাণের অপচেষ্টা চালায়।

মুক্তি বলল, তারপর।

তারপর আর কী আমি যখন দেখলাম আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তখন কাউকে কিছু না বলে রিজাইন করে ফেললাম।

আব্বা আপনি চ্যালেঞ্জ না করে।

না মা আসলে সমস্যাটা আমি দুর্নীতি করেছি কিনা সেটা নয়, সমস্যাটা হলো কয়েকজন টিচার ক্লাসে ভালোভাবে না পড়িয়ে বাড়িতে প্রাইভেট টিউশনি করত, ফলে বিত্তশালী পরিবারের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া সবাই লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ত। আমি দেখলাম এমনিভাব চলতে চলতে একদিন দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা পিছিয়ে পড়বে লেখাপড়া সার্বজনীন না হয়ে কয়েকজন  ধনবান মানুষের ছেলে মেয়েদের মধ্যে সঙ্কুচিত থাকবে। এটা তো হতে পারে না। তাই আমি যখন টিউশনি পড়াতে বাধা দিলাম তখনই তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করল। তাদের সঙ্গে কমিটির দু’একজন সদস্য যারা স্কুল থেকে অবৈধ আয়ের পথ খুঁজছিল। তারাও শিক্ষকদের সাথে থেকে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করল।

তবে তো আপনি ভালোই করেছেন।

না মা ভালো করিনি বাধ্য হয়ে পালিয়ে এসেছি।

আপনি যে একদিন আমাকে বলেছিলেন সভাপতি সাহেব আপনার ছাত্র?

হ্যাঁ ফিরোজ, সে তো খুব ভালো ছেলে সে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আরো অনেক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের মতামতের দিকে খেয়াল রেখেই তাকে চলতে হয়। আমি একজন সামান্য স্কুল মাস্টার, আমার কথায় তো হাজার হাজার ভোট পাবে না কাজেই সে বরং তাদের দিকে গিয়েই ভালো করেছে, দোয়া করি সে যেন একদিন অনেক বড় নেতা হয়।

ওসব থাক বাবা আপনি বসুন।

কাসেম সাহেব বললেন, মা তোমাকে একটা কাজ দিয়েছিলাম যে।

কী কাজ বাবা?

কেন আমি যে তোমাকে একটা অত্যাধুনিক ক্লিনিকের অ্যাপারেটাস কেনার জন্য এস্টিমেট করতে বলেছিলাম।

বাবা আমার আসলে বেশ কয়েকদিন নাইট ডিউটি ছিল, শরীরটা তেমন ভালো ছিল না আপনি-

কাসেম সাহেব মুক্তির কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললেন, ঠিক আছে আমি আগামী সপ্তাহে ঢাকা যাব এর মধ্যে তুমি এস্টিমেটটা করে রেখ।

জি বাবা কিন্তু আপনি হঠাৎ ঢাকায় কী জন্য? মুক্তি জিজ্ঞেস করল।

আমার একজন ছাত্র আছে আর্কিটেক্ট আর একজন ছাত্র আছে ইঞ্জিনিয়ার ওরা দুজনে ঢাকায় একটা কনসাল্টিং ফার্ম করেছে। ভাবছি ক্লিনিকের মাস্টার প্লান এবং বিল্ডিং ডিজাইনের দায়িত্বটা ওদেরকেই দেব। তাছাড়া কয়েকজন ছাত্র আছে যারা অনেক বড় বড় চাকরি করে ক্লিনিকের কাজ শুরু করার আগে একবার ওদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চাই, বলে কাসেম সাহেব একটু থামলেন তারপর সোফা থেকে দাঁড়িয়ে বললেন, মা তুমি একটু বিয়াইন সাহেবকে ডেকে দাও।

কাসেম সাহেব তার বিয়াইন সাহেবের সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করলেন তারপর বিদায় নিলেন।

 

আঠাশ

কাসেম সাহেব গেটে দাঁড়িয়ে কার্ডের সঙ্গে ঠিকানা মিলিয়ে দেখলেন তারপর গেটে দাঁড়ান সিকিউরিটিকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি ফাউন্ডেশন কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এর অফিস?

হুঁম।

ফরহাদ সাহেব আছেন কি?

হুঁম আছেন।

যাও তো ফরহাদ সাহেবকে গিয়ে বলো তেঁতুলিয়া থেকে কাসেম মাস্টার এসেছে।

যান স্যার, সোজা গিয়ে ডানের রুমে যান। কাসেম সাহেব সিকিউরিটির কথামতো ডানে তাকিয়ে দেখলেন, ন্যামপ্লেটে লেখা আছে মোঃ ফরহাদ হোসেন, ম্যানেজিং ডিরেক্টর।

কাসেম সাহেব দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন। ফরহাদ সাহেব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, আসসালামু আলাইকুম স্যার, স্যার আপনি? বসুন প্লিজ।

কাসেম সাহেব চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, হ্যাঁ একেবারে সশরীরে তোমার সামনে, অবাক হবার কিছু নেই, বলে তিনি দেয়ালের উপর ও নীচে তাকিয়ে বললেন, ফরহাদ তুমি তো বেশ লাক্সারিয়াস অফিস করেছ, ঢাকা শহরে তাও আবার গুলশানের মতো জায়গায়।

ফরহাদ সাহেব লজ্জায় মাথা নত করে বললেন, স্যার সবই আপনার দোয়া।

কাসেম সাহেব আবার রুমের এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন, এমনসময় ফরহাদ সাহেব বললেন, আপনার দুপুরের খাওয়া হয়েছে স্যার?

হ্যাঁ দুপুরে ভাত খেয়েছি, তুমি ব্যস্ত হইও না।

তবে চা।

হ্যাঁ চা হতে পারে।

ফরহাদ সাহেব কলিং বেল এ টিপ দিতেই পিয়ন সামনে এসে দাঁড়াল, ফরহাদ সাহেব পিয়নকে চা আনতে বললেন। পিয়ন চলে যেতেই ফরহাদ সাহেব বললেন, স্যার আপনি আসবেন, আমি কখনো ভাবতেই পারিনি, সেই কবে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

তুমি যখন আমাকে কার্ড দিয়েছিলে তখন কিন্তু আমি বলেছিলাম একদিন যাব।

হ্যাঁ তা বলেছিলেন কিন্তু সে তো সবাই বলে, বলে ফরহাদ সাহেব আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন এমনসময় চা চলে আসায় তিনি বললেন, আচ্ছা যা হোক চা নিন স্যার, প্লিজ।

কাসেম সাহবে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, তোমার এখানে তো অনেক কর্মচারী কাজ করে?

হ্যাঁ ফিল্ড আর অফিস মিলে প্রায় পাঁচ’শ ইঞ্জিনিয়ার, বিশজন আর্কিটেক্ট, ক্লার্ক, টাইপিস্ট, কম্পিউটার অপারেটর, একাউন্ট্যান্ট সব মিলিয়ে প্রায় সাত’শ স্টাফ।

বাহ বেশ বড় ফার্ম করেছ তো আমার ছাত্র ঢাকার বুকে এতবড় ফার্ম করেছে, দেখে আমার বুক গর্বে  ভরে গেল, বলে কাসেম সাহেব চা শেষ করে বললেন, তো বাবা আমি তোমার কাছে একটা কাজে এসেছি।

ফরহাদ সাহেব কলিং বেল-এ টিপ দিতেই পিয়ন এসে দাঁড়াল। ফরহাদ সাহেব পিয়নকে বললেন, যাও তো ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলো।

পিয়ন চলে গেলে ফরহাদ সাহেব বললেন, কাজ ছাড়া যে আপনি আসেন নি সে কথা আমি খুব ভালোভাবে জানি। চলুন বাসায় গিয়ে গল্প করা যাবে, বলে ফরহাদ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠলেন।

কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাব?

কেন আমার বাসায়, বলে দু’জনে বেরিয়ে পড়লেন।

গাড়িতে বসে কাসেম সাহেব তাঁর ক্লিনিক করার সমস্ত পরিকল্পনার কথা একবার বলতে চাইলেন। কিন্তু ফরহাদ সাহেব আবারো বললেন, স্যার আগে বাসায় যাই, তারপর সব গল্প করা যাবে।

কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি একটি মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং এর সামনে এসে দাঁড়াল। ফরহাদ সাহেব নিজে গাড়ি থেকে নেমে কাসেম সাহেবকে নামতে বললেন, কাসেম সাহেব গাড়ি থেকে নেমে লিফটে উঠলেন। লিফট থেকে নেমেই বাম পাশের ফ্ল্যাটে ঢুকলেন। কলিং বেল টিপতেই পাঁচ/ছয় বছর বয়সের একটি ছেলে দরজা খুলে দিয়ে বলল, গুড আফটারনুন ডেডি।

ফরহাদ সাহেব গুড আফটারনুন বলে ছেলেটিকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,ডেডি হু ইজ হি?

ইয়োর গ্র্যান্ড ফাদার, বলে ফরহাদ সাহেব কাসেম সাহেবকে সোফায় বসার জন্য অনুরোধ করলেন।

কাসেম সাহেব ছেলেটিকে কাছে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী দাদাভাই?

ছেলেটি কাসেম সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল, আই ক্যান নট আন্ডারস্ট্যান্ড, প্লিজ টেল মি ইন ইংলিশ।

কাসেম সাহেব কিছুটা বিস্মিত হলেন তারপর সাকিবকে জিজ্ঞেস করলেন, হোয়াট ইজ ইয়োর ন্যাম? আই অ্যাম সাকিব,  বলে সাকিব ভিতরে চলে গেল।

কয়েক মিনিট পর সাকিব তার মায়ের হাত ধরে আবার ড্রয়িং রুমে ফিরে এলে ফরহাদ সাহেব তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কাসেম সাহেবের পরিচয় করে দিলেন, স্যার আমার স্ত্রী লাবনী, লাবনী আমার হাই স্কুল জীবনের হেড স্যার যার নাম তোমাকে অনেকবার বলেছি সেই কাসেম স্যার।

লাবনী সালাম দিয়ে ভিতরে চলে গেল কিছুক্ষণ পর নিজেই নাস্তা নিয়ে ভিতরে ঢুকল। তারপর কাসেম সাহেব ও ফরহাদ সাহেবকে নাস্তা দিয়ে সোফায় বসল।

ফরহাদ সাহেব নাস্তা খেতে খেতে বললেন, স্যার এখন বলুন।

কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ফরহাদ তোমরা কি সাকিবকে বাংলা শিখাওনি?

ফরহাদ সাহেব কাসেম সাহেবের কথার অর্থ বুঝলেন তিনি কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললেন, স্যার ওকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেছি তো।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কি কেউ বাংলায় কথা বলে না? তোমরা বাংলায় কথা বলো না?

ফরহাদ সাহেব মিস্টার সাকিব বলে ডাক দিতেই সাকিব কাছে এলো।

কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, মি: সাকিব ডু্‌ ইউ ওয়ান্ট টু স্যা এ্যন ইংলিশ রিদম প্লিজ?

সাকিব আবৃত্তি করল, হাম্পটি ডাম্পটি স্যট অন এ ওয়াল

হাম্পটি ডাম্পটি গ্রেট ফল

অল দ্যা কিংস হর্সেস এন্ড অল দ্যা কিংস ম্যান

কুড নট পুট হাম্পটি ডাম্পটি টুগেদার ওয়ান্স এগেইন।

সাকিবের কবিতা আবৃত্তি শেষ হলে কাসেম সাহেব সাকিবকে বললেন, মি: সাকিব ডু ইউ ওয়ান্ট টু স্যা এ বেঙ্গলি রিদম প্লিজ?

সাকিব বলল, নো আই ক্যান নট।

কাসেম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ফরহাদ তোমার ছেলেকে একেবারে বাংলা শেখাওনি, তারমানে সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি, তোমার ছেলে এই কবিতাটি কোনদিন জানবে না, বলে কাসেম সাহেব ফরহাদ সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন ফরহাদ সাহেব বিব্রত বোধ করছেন। তাই তিনি প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বললেন, যাহোক, তুমি আমার মাঝিপাড়ার বাগানটা দেখেছ না? পঞ্চগড় তেঁতুলিয়া হাইওয়ের পাশে।

জি স্যার দেখেছি।

ওখানে আমি একটা ক্লিনিক করতে চাই, তাই তোমার কাছে এসেছি বিল্ডিংয়ের প্লান, ডিজাইন করতে।

স্যার মাঝিপাড়ার মতো গ্রামে ক্লিনিক করতে চান? চলবে?

আচ্ছা ফরহাদ তুমি কি জানো, বাংলাবান্ধায় বছরে ক’জন পর্যটক যায়?

ফরহাদ সাহেব চুপ করে রইলেন।

আমরা বলি বাংলাবান্ধায় কিছুই নেই, অথচ শুধু জিরো পয়েন্ট দেখার জন্য সারাদেশ থেকে মানুষ দেখতে যায়, তবে মাঝিপাড়ায় একটি অত্যাধুনিক ক্লিনিক করলে মানুষ চিকিৎসা নিতে যাবে না কেন?

পাড়া গাঁয়ে ক্লিনিক প্রফিটেবল হবে?

তুমিও একই কথা বলছ? আসলে হাসপাতালের সঙ্গে সম্পর্ক সেবার, বাণিজ্যের নয় কিন্তু সেবার নামে ক্লিনিকে আজকাল যা হচ্ছে তাকে সেবা তো নয়ই বরং ব্যবসা বললেও ভুল হবে। সেবার নামে নিরীহ মানুষকে শোষণ করা ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের দেশে একজন ডাক্তার রোগীকে ২/১ মিনিট দেখেই প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করেন এবং রোগের বিস্তারিত বিবরণ, প্রপার ইনভেস্টিগেশন ও ডায়াগোনেস্টিক ছাড়াই প্রেসক্রিপশন দেন অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডায়াগনোসিস করে রোগীর আর্থিক ক্ষতি করেন। তাই আমি ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে ক্লিনিক করতে চাচ্ছি না। ক্লিনিকের আয়-ব্যয় সমান হলেই চলবে। যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় তবে ক্লিনিকের আরো উন্নতি হবে।

জি স্যার, আমি আপনার ইচ্ছার কথা বুঝতে পেরেছি। আপনার সদিচ্ছা, মনোবল এবং সামর্থ্য আছে আপনি সফল হবেন ইনশাল্লাহ। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাকে ক্লিনিকের প্লান ডিজাইন করে দিব। শুধু তাই নয় বিল্ডিং এর কাজ সুপারভিশনের জন্য একজন ইঞ্জিনিয়ার পোস্টিং দিব। আপনার ক্লিনিকের কন্সট্রাকশন কাজের কনসাল্টেন্সি এবং সুপারভিশন কস্ট আমি বহন করবো।

তোমার কথা শুনে আমি খুব খুশি  হলাম বাবা। আমার ছেলে মাহমুদ এম.বি.বি.এস পাস করে এফ.সি.পি.এস করার জন্য বিদেশে গেছে, আমার বউমা মুক্তি, এম.বি.বি.এস পাস করে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে চাকরি করছে। মাঝিপাড়ার ঐ বাগানটিতে বড় বড় কড়াই গাছের একটা বাগান আছে, হারাদিঘী গ্রামে ২০ একর জমি আছে ভাগ্যক্রমে ঐ জমির নীচে পাথর পাওয়া গেছে। টাকার চিন্তা আমি করি না। তুমি আমার মাঝিপাড়ার ঐ জমিটার উপর একটি ক্লিনিকের প্লান, ডিজাইন এবং এস্টিমেট করে দাও। তারপর বউমার কাছ থেকে কী কী এ্যাপারেটাস লাগবে তার একটা এস্টিমেট করে নিব। বাজেট ঠিক করার পর অনুমতি নিতে হবে, সামনে আমার অনেক কাজ, তুমি শুধু আমাকে — বলে কাসেম সাহেব উঠতে চাচ্ছিলেন এমন সময় ফরহাদ সাহেব বললেন, উঠছেন কেন স্যার?

কেন, আমার তো কাজ শেষ।

স্যার আপনি কী করে ভাবলেন এখন আপনাকে যেতে দিব। আমার ছেলে এই প্রথম আপনাকে পেয়েছে তাই একটু দূরে দূরে থাকছে, ভালোভাবে পরিচয় হলে দেখবেন আপনি ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, বলে ফরহাদ সাহেব সাকিবকে ডাকলেন, হ্যালো সাকিব।

সাকিব চলে এলো সঙ্গে লাবনীও। ফরহাদ সাহেব বললেন, লাবনী গেস্ট রুমে স্যারের থাকার ব্যবস্থা কর, সাকিব ইউ টক টু ইয়োর গ্র্যান্ড ফাদার, বলে ফরহাদ সাহেব ভিতরে চলে গেলেন।

কাসেম সাহেব স্নেহ মাখা কণ্ঠে ডাকলেন, মি: সাকিব প্লিজ কাম টু মি।

সাকিব কাসেম সাহেবের কোলে এসে বসল।

 

উনত্রিশ

কাসেম সাহেবের কথায় মাহমুদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, বাবা তুমি যেভাবেই বলো না কেন? তোমার সিদ্ধান্ত আমি কোনভাবে মেনে নিতে পারছি না।

মাহমুদের কথায় কাসেম সাহেব প্রচণ্ড আঘাত পেলেন, মুহূর্তেই তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। তাঁর সমস্ত স্বপ্ন যেন মুহূর্তে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। তাঁর দু’চোখ ছল ছল করে উঠল। তিনি রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, মাহমুদ তোকে আমি আগেই বলেছি আমার বাবা যখন বিনা চিকিৎসায় মারা যায় তখন তোর বয়স পাঁচ/ছয় বছর, তোকে তখন থেকে যতবারই আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছি তুই কী হবি? ততবারই বলেছিস ডাক্তার হবি। তারপর থেকে আমি তোর লেখাপড়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনেছি, তোর লেখাপড়া শেষ হলো, আমি ভেবেছিলাম তখনই ক্লিনিকের কাজে হাত দিব কিন্তু তুই লেখাপড়ার জন্য বিদেশ গেলি আমার অপেক্ষার দিন আরও বেড়ে গেল। তুই বিদেশ থেকে আসার পর আমি যেন আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেকদূর এগিয়ে গেলাম। এখন যা শুনলাম তারপর থেকে আর তোকে নিয়ে আমার স্বপ্ন দেখার কিছু থাকল না, বলতে বলতে কাসেম সাহেবের কণ্ঠস্বর বুজে গেল।

মাহমুদ বলল, বাবা তুমি একটু বাস্তববাদী হও।

বাস্তববাদী বলেই তো আমি শুধু স্বপ্নই দেখিনি, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মেধা, শ্রম এবং টাকা ইনভেস্ট করেছি।

তাতে কী? তুমি অনেক গাছ লাগিয়েছ যার মূল্য এখন অনেক টাকা ক্লিনিকে ইনভেস্ট না করে অন্য কোন লাভজনক খাতে ইনভেস্ট করতে পার আর লাভের টাকা দিয়ে একটা এতিমখানা বা ধর্মীয় কাজ করতে চাইলে মাদ্রাসা করে দিলেও পার। কাসেম সাহেব মাহমুদের কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললেন, আমি কী কাজ করলে ভালো হয় সে পরামর্শ আমি তোর কাছ থেকে চাচ্ছি না, এ্যানি ওয়ে আমি এ ব্যাপারে তোর সঙ্গে পরামর্শ করতে চাচ্ছি না। যা হোক তুই তাহলে এখন কী করতে চাচ্ছিস? বউমা তুমি চুপ করে আছ কেন?

মুক্তি মৃদু কণ্ঠে বলল, আমি কী বলব বাবা?

মাহমুদ বলল, বাবা আমি বিদেশ থেকে এফ.সি.পি.এস করে এসেছি এখন ঢাকায় কোন একটা ক্লিনিকে প্র্যাকটিস করবো তুমি দোয়া করিও আমি যেন-

কাসেম সাহেব মাহমুদের কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললেন, অফ কোর্স, তুই নিজে যেদিন বাবা হবি সেদিন বুঝবি বাবা-মা কখনো ছেলে-মেয়ের অমঙ্গল কামনা করেনা, আমিও তোর মঙ্গল কামনা করি আল্লাহ যেন তোর মনস্কামনা পূর্ণ করে বলে কাসেম সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে তার রুমে গেলেন।

কাসেম  সাহেবের চোখে ঘুম নেই। তার স্বপ্ন যেন আজ ভেঙ্গে গেল। কাসেম সাহেব অনেকদিন থেকে যেখানে সেখানে বলেছেন মাহমুদ ডাক্তার হবে, মাঝিপাড়ায় ক্লিনিক হবে, ছিন্নমূল মানুষ স্বল্প ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসা পাবে। কাল যখন সবাই জানবে কাসেম সাহেবের সমস্ত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে কাসেম সাহেব এতদিনে যা যা বলেছেন সে সবই মূল্যহীন। এমনি বিভিন্ন ধরনের কথা বার বার করে তাঁর মনে বিড় বিড় করছিল। তিনি বিছানায় ছটফট করছিলেন। পাশে মোর্শেদা শুয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমালেন হঠাৎ কাসেম সাহেবের পাশ ফিরানোর শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। মোর্শেদা মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ঘুমাওনি?

না

কেন?

হিসাব মিলাতে পারছি না।

এতো রাতে কিসের হিসাব?

সফলতা আর ব্যর্থতার হিসাব।

কী সব আজে-বাজে কথা ভাবছ? নিঃসন্দেহে তুমি একজন সফল মানুষ? তোমার কত ছাত্র ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সরকারি বড় বড় অফিসার, একজন শিক্ষক হিসাবে তুমি কত সফল, আর টাকার কথা নাই বা বললাম। সে হিসেব তো তুমি ভালো জানো।

কাসেম সাহেব বিছানা থেকে উঠে বেড সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে মোর্শেদার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, মোর্শেদা তুমি ঠিক বলছ, আমার ছাত্ররা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সরকারি বড় বড় অফিসার একথা মিথ্যা না, সেই সাথে আমার ছাত্ররা মিথ্যাবাদী, অর্থপিপাসু যারা ষড়যন্ত্র করে পরোক্ষভাবে আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছে, আমার ছেলে এবং আমার ছাত্র মানুষের সেবা করার নামে দু’হাতে টাকা রোজগার করছে।

দেখ ওসব না হলে এখনকার দিনে চলে না, ওরা কষ্ট করে লেখাপড়া শিখে বড় ডাক্তার হয়েছে কি মাঝি পাড়ার মতো অজোপাড়া গাঁয়ে পড়ে থাকার জন্য।

মোর্শেদা আবারো তুমি ঠিক কথা বললে না, মাঝিপাড়া এখন আর অজোপাড়া গাঁ না, এখানে ঢাকা থেকে বড় বড় শিল্পপতিরা চা বাগান, খাম্বা কারখানা, পোল্ট্রি ফার্ম, পিকনিক স্পট করছে, দিনে দিনে মাঝি পাড়া, শালবাহান, ভজনপুরের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে এখন মাঝিপাড়ায় আঁধার নামে না, পাখি ডাকে না, এরপরও তুমি মাঝিপাড়াকে গ্রাম বলো? আর হলোই বা গ্রাম নিজের গ্রাম, বাবার স্বপ্ন এসব কি মূল্যহীন? আচ্ছা মোর্শেদা আমাদের সময় ক্যাসাবিয়াংকা নামে একটা কবিতা ছিল, তাই না?

হ্যাঁ।

ঐ কবিতাটা এখন সিলেবাসে নেই, বাবার ফিরে আসার অপেক্ষা করতে করতে ছেলেটি অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেল, কিন্তু বাবার বিনানুমতিতে জাহাজ ত্যাগ করল না, সেই কবিতার যারা মনে প্রাণে শিখেছে তারা কখনো বাবার আদেশ উপেক্ষা করবে না। তারপর একটা কবিতা ছিল কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর মানুষের মাঝে স্বর্গ নরম মানুষেতে সুরাসুর। থ্রি কোয়েশ্চিন গল্পটা এসব এখন সিলেবাসে নেই। এখনকার লেখাপড়ায় দেশাত্মবোধ, মানবতাবোধ এসবের পরিবর্তে প্রযুক্তি নির্ভর অংশ বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। ফলে আমার উচ্চশিক্ষিত ছাত্ররা মিথ্যা কথা বলে, দেশের টাকা, দরিদ্র মানুষের টাকা নিয়ে রাতারাতি বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কাসেম মাস্টার একজন ব্যর্থ মাস্টার, একজন ব্যর্থ বাবা সে জন্য শুধু কাসেম মাস্টার একাই দায়ী নয়।

দেখ, মাহমুদ আমাদেরই ছেলে ওর ইচ্ছার কথা ভেবে না হয়-

হ্যাঁ সে তো বটেই।

মোর্শেদা মিনতির সুরে বললেন, এখন একটু ঘুমাও, নইলে তো আবার প্রেশারটা হাই হয়ে যাবে।

হ্যাঁ অবশ্যই, বলে কাসেম সহেব লাইট অফ করলেন।

 

বত্রিশ

আজকাল কাসেম সাহেব বাড়ি থেকে খুব একটা বের হন না। সারাদিন বাড়িতেই বসে কাটিয়ে দেন। তাঁর বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম দৈনিক পেপার পড়া। সকালবেলা হকার এসে যখন পেপার দিয়ে যায় তখন থেকে শুরু করে সারাদিন কখনো ঘরে বসে, কখনো আঙিনায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেপার পড়েন আর মোর্শেদার সঙ্গে গল্প করেন। কিংবা পেপারে ছাপানো কোন সংবাদ নিয়ে আলোচনা করেন। অনেক সময় মোর্শেদা বিরক্ত বোধ করেন, অনেক সময় মৃদু হেসে এড়িয়ে যান।

সেদিন কাসেম সাহেব আঙিনায় দাঁড়িয়ে পেপার পড়ছিলেন এমনসময় বাড়ির সামনে একটি জিপ গাড়ি এসে দাঁড়াল। কাসেম সাহেব নিজেই বাইরে এসে দাঁড়ালেন। গাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক নেমে সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। কাসেম সাহেব চিনতে না পারায় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভদ্রলোক আবার বললেন, চিনতে পারলেন না স্যার, আপনি আমাকে আদর করে লিটল বয় বলে ডাকতেন, একটু স্মরণ করার  চেষ্টা করুন।

কাসেম সাহেব স্মরণ করার চেষ্টা করলেন, লিটল বয়, লিটল বয় মানে তুমি লুৎফর রহমান না? লিটল বয়, এসো বাবা, ভিতরে এসো বলে ভিতরে নিয়ে গেলেন।

লুৎফর তুমি বসো আমি আসছি, বলে কাসেম  সাহেব ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, হ্যাঁ লুৎফর বলো তুমি কোথা থেকে এসেছ? কোথায় কী করছ?

স্যার আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, চাকরি করছি, এসেছিলাম আমাদের স্কুলে একটা অভিযোগের তদন্ত করতে।

কেন? কি হয়েছে স্কুলে?

স্যার আপনি হয়ত জানেন আমাদের স্কুলে সরকারি অনুদানে একটা নতুন বিল্ডিং হয়েছে।

হ্যাঁ এবার একটা ভালো বিল্ডিঙয়ে বসে ক্লাস করতে পারবে।

কথা তো সেরকমই ছিল কিন্তু তিন মাস আগে বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ হওয়ার পরও ছাত্ররা বিল্ডিংয়ে ক্লাস করতে পারছে না।

কেন?

নিয়ম অনুযায়ী বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর কন্ট্রাক্টর কর্তৃপক্ষের কাছে হ্যান্ড ওভার করার কথা, বিল্ডিং হ্যান্ড ওভার ছাড়া কন্ট্রাক্টরকে ডিপার্টমেন্ট বিল দিবে না। এ সুযোগ বর্তমান হেড স্যার কমিটির যোগ সাজসে হ্যান্ড ওভার নেওয়ার জন্য কন্ট্রাক্টরের কাছে থেকে টাকা দাবী করেছেন। কন্ট্রাক্টর হ্যান্ড ওভার গ্রহণ করার জন্য স্যারকে অনেক রিকোয়েস্ট করেছেন। কিন্তু টাকা ছাড়া স্যার হ্যান্ড ওভার না নেওয়ায় কন্ট্রাক্টর অভিযোগ করেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে স্যারের অভিযোগ তদন্ত করার দায়িত্ব পড়েছে আমার উপর।

কী দেখলে?

স্যার ঠিকই কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে টাকা দাবী করেছে।

হামিদ সাহেব সেটা স্বীকার করলেন? কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

না তিনি বললেন কাজের মান খারাপ হয়েছে তাই তিনি হ্যান্ড ওভার নেননি।

হতে পারে আজকাল ডেভলাপমেন্ট ওয়ার্কে ঘাপলা তো হচ্ছেই আর খারাপ কাজ তিনি বুঝে নেবেন কেন?

কিন্তু শিক্ষকের কাজ ছাত্র পড়ানো, কাজের ভালো মন্দ দেখার জন্য ইঞ্জিনিয়ার আছে। তিনি ইঞ্জিনিয়ার নন কাজের ভালো মন্দ তিনি বুঝেন না, অযথা তিনি বিল্ডিং হ্যান্ড ওভার না নিয়ে ছাত্রদেরকে উন্নত পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছেন। তাঁর পানিশমেন্ট হওয়া উচিৎ।

দেখ লুৎফর, হামিদ সাহেব তোমার স্যার তার যেন কোন ক্ষতি না হয়।

অপরাধীর শাস্তি পাওয়া উচিৎ, তা না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে। প্লিজ স্যার এ বিষয়ে আমাকে রিকোয়েস্ট করবেন না।

এমনসময বুয়া চা নাস্তা নিয়ে এলে লুৎফর সাহেব বললেন, বাই দ্যা বাই স্যার কী স্বেচ্ছায় রিজাইন করেছেন নাকি কোন চাপের মুখে-

না, না, কোন চাপের মুখে নয়। আমার বয়স হয়েছিল তাই ইচ্ছা করেই রিজাইন করেছি। তুমি ওসব বাদ দাও। তুমি আমার কথা শোন।

লুৎফর সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, জি স্যার বলুন।

তুমি তো শিক্ষা নিয়েই কাজ করছ, একটু দেখতো শিক্ষার গুনগত মান কোনভাবে উন্নত করতে পার কী না?

স্যার আসলে শিক্ষার মান এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত, এখন সব বিষয়ে বাস্তবমুখী শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা রাষ্ট্র, সমাজ, বিজ্ঞান, ম্যাথমেটিকস বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি শিখছে।

কিন্তু আজকাল ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়ায় নৈতিকতা বিষয়ে কম শিখছে।

কাসেম সাহেব বললেন, এ ব্যাপারে শুধুমাত্র ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ তারা তাদের শিক্ষকদের অনুসরণ করছে আর নৈতিকার অবক্ষয় হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যেও একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যখন ঘুষ দাবীর অভিযোগ প্রমাণিত হয় তখন সে শিক্ষকদের কাছে যারা শিখছে তারা এর চেয়ে ভালো কিছু শিখতে পারে না।

আগের দিনে কোন পাড়া, গ্রাম বা মহল্লায় একজন শিক্ষকের আদর্শ সবাই অনুসরণ করত, আজকাল আর তেমনটি চোখে পড়ে না। আসলে আগের দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সবাই একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান মনে করত।

এক্সাক্টলি তাই তুমি আমার মনের কথা বলছ।

আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক, সে কারণে আমরা ইচ্ছা করলেই সব কিছু করতে পারি না, আপনি আমাকে দোয়া করবেন স্যার, বলে লুৎফর সাহেব তাঁর একটা ভিজিটিং কার্ড কাসেম সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন, স্যার আমার কার্ড দিলাম ঢাকা গেলে অবশ্যই আসবেন।

লুৎফর সাহেব উঠে দাঁড়ালেন কাসেম সাহেবও দাঁড়িয়ে বললেন, দোয়া করি বাবা তুমি সফল হও।

 

একত্রিশ

ঢাকায় পৌঁছেই তৃপ্তি রানার সঙ্গে যোগাযোগ করল। তারপর থেকে প্রতিদিন পরস্পরের মধ্যে টেলিফোনে অনেকক্ষণ কথা হয়। রানা তার বড় ভাইয়ের বাসা থেকে ভার্সিটিতে লেখা পড়া করে। তার ভাই-ভাবী দু’জনেই চাকরি করে সে সুযোগ বেশির ভাগ দিনই রানা বাসা থেকে টেলিফোন করে। রানার সঙ্গে টেলিফোন করার ছাড়া দিনের বেশির ভাগ সময় তৃপ্তির খুব কষ্টে কাটে। সকাল বেলা আপা দুলাভাই বের হয়ে যাবার পর তৃপ্তি পেপার পড়ে তারপর টিভি সেটের সামনে বসে বিরক্তি সহকারে একটির পর একটি চ্যানেল টিপতে থাকে। তারপর রানার টেলিফোনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। রানা কোনদিন ফোন করে সকালে কোনদিন বিকেলে আবার কোনদিন তৃপ্তি অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর কাটিয়ে দেয় রানার টেলিফোনের অপেক্ষায় কিন্তু সেদিন রানা টেলিফোন করে না। তখন তৃপ্তির মন বেদনায় ভরে যায়। চার দেয়াল ছেড়ে আবার পঞ্চগড় ফিরে যাবার জন্য মন উতলা হয়ে উঠে। সেদিন বিকেল বেলা তৃপ্তি বেলকনিতে বসে রানার টেলিফোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। এমনসময় টেলিফোনের রিং বেজে উঠল। তৃপ্তি দ্রুত টেলিফোন রিসিভ করে বলল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে রানার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো তৃপ্তি।

হুঁম বলছি, আপনি কি আজ ভার্সিটিতে গিয়েছিলেন?

না, ক্লাস ছিল না তাই যাইনি।

ক্লাস ছিল না, নাকি ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছেন?

অপর পাশ থেকে রানার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, এখনই শাসন করতে চাচ্ছ নাকি?

বাঃ রে আমি আপনাকে শাসন করতে যাব কেন?

তৃপ্তি মৃদু হেসে বলল, না।

তাহলে রিসিভার রেখে দেই?

তৃপ্তি বিনয়ের সুরে বলল, রাখবেন না প্লিজ।

এখন বলো তুমি কী করছিলে?

তৃপ্তি বলল, আমার কী, সারাদিন শুধু একা একা ঘরে বসে থাকি, কাজের মধ্যে ঐ একটাই।

কী কাজ?

তৃপ্তি মৃদু হেসে বলল, কেন আপনার সাথে টেলিফোনে কথা বলা।

এ কথা কী সত্যি সত্যি বলছ নাকি কোন চালাকি আছে?

তৃপ্তি অভিমানের সুরে বলল, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? কীভাবে বিশ্বাস করবো? তুমি ঢাকায় আসার অনেকদিন হলো অথচ এখনও তোমাকে এক পলক দেখতে পেলাম না, এখনও তুমি আমাকে আপনি আপনি করছ কেন?

যেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে সেদিন না হয়-

সেদিন সম্পর্ক পাল্টাবে? তবে বেশ দেখা হচ্ছে কবে?

তৃপ্তি একটু ভেবে নিয়ে বলল, শীঘ্রই হবে। আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন।

হ্যাঁ তা না হয় করছি। কিন্তু আমার তো আর কয়েকদিন পরেই ফাইনাল পরীক্ষা, পরীক্ষা শেষ হলেই তো আমি পঞ্চগড় চলে যাব। তার আগে দেখা হবে তো?

অবশ্যই দু’একদিনের মধ্যেই আপনাকে জানাব। বলতেই কলিং বেল বেজে উঠল।

তৃপ্তি জোরে বলল, বুয়া দেখতো কে এলো? তারপর বলল, একটু লাইনে থাকুন তো দেখি কে এলো?

বুয়া গেট খুলে দিতেই মুক্তি বাসায় ঢুকল, তৃপ্তি মৃদু কণ্ঠে বলল, আপা এসেছে আমি এখন রাখি বলে রিসিভার রেখে দিল।

মুক্তি তার রুমে ঢুকে কাপড় ছেড়ে ড্রয়িং রুমে এসে বসল, তারপর স্নেহ মাখা কণ্ঠে বলল, তৃপ্তি এদিকে আয়।

তৃপ্তি ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় বসলে মুক্তি জিজ্ঞেস করল, কার ফোন এসেছিল?

রং নাম্বার আপা।

মুক্তি গম্ভীর স্বরে বলল, তৃপ্তি রং নাম্বার নয়।

তৃপ্তি থতমতও খেয়ে বলল, আপা।

মুক্তি তৃপ্তির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তৃপ্তি আবার কোন ভুল করছিস না তো?

আপা।

হ্যাঁ আমাকে বল।

তৃপ্তি রানার সঙ্গে তার পরিচয় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।

সবকিছু শুনে মুক্তি বলল, তুই যা বলছিস তা যদি সত্যি হয় তবে তো অসুবিধার কিছু নেই। তাছাড়া তোর যখন পছন্দ তখন বাবাও না করবে না।

তৃপ্তির মন কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল, সে মাথা নত করে কয়েক মুহূর্ত বসে রইল তারপর মৃদু হেসে বলল, আপা তোমাকে চা করে দিব? খাবে?

বেশ তো চা নিয়ে আয় আর হ্যাঁ তোর রানাকে আসতে বলিস আমি ওর সঙ্গে বলব।

তৃপ্তি বলল, জি আপা।

 

বত্রিশ

রানা এলো ঠিক সময়ে একেবারে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়। কলিং বেলের শব্দ শুনে বুয়া গেট খুলে দিতে গিয়ে ফিরে এসে বলল, আপা একা বেটা আইছে।

ঠিক আছে তুমি যাও আমি দেখছি বলে তৃপ্তি নিজে গেট খুলে দিতে গেল। গেট খুলে দিতেই পরস্পরের চোখে চোখ পড়ল। তৃপ্তি চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ভিতরে আসুন।

রানা ভিতরে ঢোকার পর তৃপ্তি গেট বন্ধ করে দিল। তারপর দু’জনে ড্রয়িং রুমে বসল। কিছুক্ষণ দু’জনে বসে রইল কারও মুখে কোন কথা নেই, শুধুমাত্র কয়েকবার চোখে চোখ রাখা হলো।

রানা প্রথমে জিজ্ঞেস করল, তৃপ্তি বাসায় আর কেউ নেই?

মানুষই তো তিনজন আপা দুলাভাই আর আমি। তারা নিজ নিজ কর্মস্থলে, আপা এসে পড়বে এখুনি।

আপনি বসুন, আমি চায়ের ব্যবস্থা করি বলে তৃপ্তি যাচ্ছিল রানা বাধা দিয়ে বলল, এখন কেন আপা এলে একবারে নাস্তা খাওয়া যাবে।

তৃপ্তি বসল তারপর মুচকি হেসে বলল, এখন আপনার কথা বলুন।

অবশ্যই বলব, তার আগে একটা কথা ছিল।

জি বলুন।

কথা ছিল যেদিন আমার সাথে দেখা হবে সেদিন সম্পর্কটা পাকাপাকি করবো।

তৃপ্তি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে মৃদু হেসে মাথা নত করল। রানা আবার জিজ্ঞেস করল, তৃপ্তি তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?

তোমার সন্দেহ আছে?

রানা হেসে ফেলল, তৃপ্তি তুমি আসলে সবই পার। এতো তাড়াতাড়ি সহজ হয়ে গেলে।

এমন সময় কলিং বেলের শব্দ শুনে বুয়া গেট খুলে দিল। মুক্তি বাসায় ঢুকে সোজা ড্রয়িং রুমে ঢুকল। রানা দাঁড়িয়ে সালাম দিল।

তৃপ্তি মুক্তির সঙ্গে রানার পরিচয় করিয়ে দিল। আপা ও হচ্ছে রানা যার কথা তোমাকে বলেছিলাম, তারপর রানার দিকে তাকিয়ে বলল, রানা আমার আপা মুক্তি।

মুক্তি কয়েক মুহূর্ত রানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইর। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার কথা তৃপ্তির মুখে অনেক শুনেছি, তোমাকেও আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। তোমার বাড়িটা যেন কোথায়?

ধাক্কামারা।

ধাক্কামারার রাজুকে চেনো?

জি রাজু আমার বড়ভাই?

হ্যাঁ এবার বুঝেছি রাজু আর আমি তো এক সঙ্গে পড়তাম, রাজু এখন কোথায়?

ভাইয়া ঢাকায় থাকে, আমি ভাইয়ার বাসায় থাকি।

কী করছে?

ভাইয়া ভাবী দু’জনে একটা বেসরকারি ফার্মে চাকরি করে।

তোমরা তো দু’ভাই না?

জি।

তোমার বাবা-মা বেঁচে আছেন তো?

হুঁম।

তোমার লেখাপড়া আর কতদিন?

আমি মাস্টার্স পরীক্ষা দিলাম।

তৃপ্তি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপা তুমি গল্প কর আমি নাস্তার ব্যবস্থা করি।

ঠিক আছে যাও।

তৃপ্তি চলে যাবার পর মুক্তি জিজ্ঞেস করল, এখন কী করবে ভাবছ?

চাকরি আমার ভালো লাগে না ভাবছি পঞ্চগড় গিয়ে একটা ব্যবসা করবো।

তৃপ্তির সঙ্গে তোমার কতদিনের পরিচয়?

তা প্রায় এক বছরের বেশি।

তারপর থেকে তুমি তৃপ্তির জীবনে ঘটে যাওয়া সব কিছু জানো?

জি আপা।

তুমি কি জানো তৃপ্তির বিয়ে ঠিক হয়েছিল?

রানা মাথা নত করে বলল, জানি।

সবকিছু জেনেও তুমি ওকে বিয়ে করবে?

রানা মাথা নেড়ে সায় দিল।

মুক্তির মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে বলল, তবে আমাকে রাজুর মোবাইল নাম্বার দাও। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করবো।

রানা তার পকেট থেকে এক টুকরা কাগজ বের করে রাজুর মোবাইল  নাম্বার লিখে দিল।

তৃপ্তি চা-নাস্তা নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকল।

মুক্তি তৃপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, তুইও বস আমাদের সঙ্গে।

তৃপ্তি মুক্তির পাশে বসে মৃদু হেসে বলল, আপা।

 

তেত্রিশ

গুলশানের বিলাসবহুল বাসভবনে মাহমুদ আর মুক্তির দিন খুব ভালোভাবে কেটে যাচ্ছিল। প্রতিদিন সকালবেলা মাহমুদ তার চেম্বারে যাবার সময় মুক্তিকে হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়, ডিউটি শেষে মুক্তি ট্যাক্সি ক্যাবে চলে আসে আর মাহমুদ বাসায় ফিরে একেবারে রাত দশটার পর। হাসপাতাল থেকে ফিরে রাত দশটা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় মুক্তি আর তৃপ্তি দু’বোন গল্প করে কাটিয়ে দেয় আবার মাহমুদ ফিরে এলে সবাই গল্পে মেতে উঠে।

ছুটির দিনে মুক্তি আর মাহমুদ বেরিয়ে পড়ে দূরে কোথাও এমনভাবে বেশ কয়েকমাস কেটে গেল। কিন্তু মুক্তি খেয়াল করেছে অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে মাহমুদের আচার আচরণেও ঘটেছে কিছু পরিবর্তন। কিছুদিন আগেও মাহমুদ প্র্যাকটিস শেষ করেই বাসায় ফিরে আসত কিন্তু ইদানীং আরো গভীর রাতে বাসায় ফিরে কোন কোন দিন রাতে খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। কোনদিন মুক্তির খবরা খবর নেয় আবার কোনদিন খবর না নিয়ে শুয়ে পড়ে তেমন একটা খোঁজ খবর রাখে না। বলতে গেলে মাহমুদ যেন অর্থ বিত্তের নেশায় তার অতীত, বাবা-মা এবং স্ত্রী সবকিছুই অবমূল্যায়ন করছে।

সেদিন বিকেল বেলা মুক্তি বেলকনিতে দাঁড়িয়েছিল। এমনসময় মোবাইলের রিং বেজে উঠল। মুক্তি মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো।

অপর পাশ থেকে কাসেম সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, বউমা তোমরা ভালো আছ?

মুক্তি সালাম দিয়ে বলল, জি বাবা আমরা ভালো আছি, আপনি, মা সবাই ভালো আছেন?

আমার শরীরটা খুব একটা ভালো নেই মা।

বলেন কী বাবা? প্রেশারটা চেক করিয়েছেন? অন্য কোন সমস্যা?

কী জানি বউমা, বুঝতে পারছি না, আচ্ছা বউমা মাহমুদ বোধহয় এখন খুব ব্যস্ত তাই না?

জি বাবা, অতো সকাল ন’টায় যায় আর রাত দশটায় বাসায় ফিরে তবু রোগীর ভিড় কমে না, বুঝেনই তো বাবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে এখন ওর বেশ সুনাম।

তা কতজন রোগী দেখে প্রতিদিন?

সংখ্যা তো তেমন ঠিক নেই তবে দেড়’শ জনের কম নয়।

কত করে ভিজিট নেয়? কাসেম সাহেবের কথায় তিক্ততার সুর ভেসে এলো।

পাঁচ’শ টাকা বাবা।

বউমা আমি তোমাকে মোবাইল করার আগে মাহমুদকে মোবাইল করেছিলাম। সে বোধ হয় খুব ব্যস্ত ছিল, তাই তোমাকে মোবাইল করলাম। তোমরা দু’জনে একদিনের জন্য হলেও চলে এসো বউমা।

আমারও খুব যেতে ইচ্ছে করে বাবা কিন্তু আপনার ছেলে আসলে সময় করতে পারে না তাই যাওয়া হয়ে উঠে না, এক কাজ করুন না আব্বা আম্মাসহ চলে আসুন কয়েকদিন ঢাকায় থেকে যাবেন।

ঢাকায় যাবার মতো আমার শারীরিক অবস্থা ভালো নেই মা। মাহমুদ এলে ওকে বলে তোমরা দু’জনে চলে এসো বউমা, এখন রাখি।

জি বাবা, বলে মুক্তি সালাম দিয়ে মোবাইল বন্ধ করল।

মাহমুদ বাসায় ফিরল তখন রাত দশটা অতিক্রম করেছে মাহমুদ বাসায় ফিরে এমন একটা ভাব দেখাল যে সে খুব ব্যস্ত সারাদিনে তার কাজ করার আগ্রহ থাকলেও বাসায় ফিরে যেন তার শরীর একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

মাহমুদ ঘুমের ভান করে বিছানায় শুয়ে ছিল, মুক্তি গায়ে আস্তে  টোকা দিয়ে বলল, ঘুমিয়েছ?

মাহমুদ বলল, কেন?

কথা ছিল।

আমি খুব ক্লান্ত এখন একটু ঘুমাতে দাও।

কিন্তু আমাকে যে বলতেই হবে।

মাহমুদ তেমনিভাবেই বলল, বলতে থাক।

মুক্তি বলল, বাবা মোবাইল করেছিল।

হ্যাঁ আমাকেও মোবাইল করেছিল।

তুমি কী বললে?

বললাম এখন আমি ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব, কিন্তু পরে আর কথা বলা হয়নি।

মুক্তি আশ্চর্যজনকভাবে জিজ্ঞেস করল, বাবা মোবাইল করেছে আর তোমার কথা বলা হয়নি?

কী বলেছে তাই বলো?

তুমি যা ব্যস্ততার আর ক্লান্তির ভান করছ তাতে মনে হচ্ছে তোমাকে বলে কোন লাভ হবে না। তবু আমাকে বলতে হবে বলে মুক্তি বলতে শুরু করল, বাবার শরীরটা ভালো নেই।

তুমি ঢাকায় আসতে বলোনি? এখানে চিকিৎসা করতাম তারপর সুস্থ হয়ে চলে যেত।

মুক্তি বলল, বলেছিলাম তিনি ঢাকা আসবেন না, দু’একদিনের জন্য হলেও আমাদের যেতে বলেছে। আমার মনে হয় আমাদের একবার যাওয়া উচিৎ।

তোমারও মাথা খারাপ হয়েছে? একদিন প্র্যাকটিস বন্ধ থাকলে আমার কত লস তুমি জানো না?

দেখ লাভ লোকসানের প্রশ্নটাই বড় নয়, বাবা যখন এতো করে বলছেন চলনা একবার ঘুরে আসি।

মুক্তি তুমি ইচ্ছা করলে যেতে পার আমি এখন ঘুমাবো প্লিজ আর কথা বলো না।

মুক্তির দু’চোখের পানি ছিটকে বেরিয়ে এলো। ইদানীং মাহমুদ বড় কৃত্রিম হয়ে গেছে, সবকিছুতেই যেন লাভ খুঁজছে, সব সময় কৃত্রিম ব্যস্ততা, কেন এমন হলো ভাবতে ভাবতে মুক্তির মন বেদনায় ভরে গেল।

 

চৌত্রিশ

কমিটির মিটিংয়ে আজ আর তেমন চাঞ্চল্য নেই। সবার চোখে মুখে একরকম আতংক বিরাজ করছে, কারো মুখে কোন কথা নেই যেন এক ধরনের আশঙ্কায় সবাই নীরব রয়েছে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফিরোজ সাহেব হামিদ সাহেবকে বললেন, হামিদ সাহেব বলুন।

হামিদ সাহেব মৃদু কণ্ঠে বললেন, দেখুন আপনারা সবই জানেন সবকিছু মিলিয়ে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি।  সভাপতি সাহেব যদি কিছু মনে না করেন তবে আপনি অনুষ্ঠান পরিচালনা করুন।

ফিরোজ সাহেব বলতে শুরু করলেন, আজকের আলোচ্য সূচীতে প্রথমেই আছে বিগত এস.এস.সি পরীক্ষার রেজাল্ট।  ইতোপূর্বে আমাদের স্কুলের রেজাল্ট ছিল জেলার শীর্ষে অথচ এবছর আমাদের স্কুল থেকে কোন ছাত্র-ছাত্রী পাস করেনি। মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার অনুযায়ী পর পর দু’বছর কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস না কররে বেতনের সরকারি অংশ বন্ধ হয়ে যাবে। কাজেই যেকোনো মূল্যে আগামী পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো করতে হবে। সে জন্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, এ বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন? বলে একজন সদস্যের প্রতি ইঙ্গিত করলেন।

তিনি কোন কিছু বলতে অস্বীকার করায় ফিরোজ সাহেব স্কুলের শিক্ষক প্রতিনিধি কিবরিয়া সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, কিবরিয়া সাহেব বলুন কীভাবে আগামী পরীক্ষায় স্কুলের রেজাল্ট ভালো হবে? আগে বলুন আমাদের স্কুলের রেজাল্ট জেলার শীর্ষে থেকে ফেল করার করণ কী?

কিবরিয়া সাহেব কোন কিছু না বলে মাথা নত করে বসে রইলেন।

ফিরোজ সাহেব বলতে শুরু করলেন, দেখুন কিছু মনে করবেন না, কাসেম স্যার ছিলেন স্কুলের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তিনি স্কুলে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হওয়ার জন্য প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করার জন্য কিন্তু সবচেয়ে বেশি আপনার স্বার্থে লাগল। আপনি ম্যানেজিং কমিটির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে কাসেম স্যারকে সরানোর জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করলেন।

এমন সময় কিবরিয়া সাহেব ফিরোজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে চাচ্ছিলেন, ফিরোজ সাহেব বাধা দিয়ে বললেন, আর হামিদ সাহেবও হেড মাস্টার হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন, আপনাদের সবার চক্রান্তের কাছে কাসেম সাহেব স্যার যেমন ছিলেন অসহায় তেমনি আমিও ছিলাম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। হামিদ সাহেব হেড মাস্টারের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে সন্দিহান ছিলাম। শেষ পর্যন্ত  আমার সন্দেহই সত্য হলো।

এবার হামিদ সাহেব মাথা উঁচু করে বললেন, স্কুলের এই দুরবস্থার জন্য শুধু আমি একাই দায়ী নই। ম্যানেজিং কমিটি যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমি সেভাবে স্কুল পরিচালনা করেছি। ভারপ্রাপ্ত হেড মাস্টার হওয়ার খায়েশ মিটাতে গিয়ে কমিটির সদস্যদের খুশি করার জন্য শিক্ষক হয়ে অনেক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছি, নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্কুল ফান্ডের টাকা কমিটির সদস্যকে ধার দিয়েছি। এসব অনিয়ম কি আমি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছি? আসলে বেসরকারি স্কুলের হেড মাস্টারের যেন হাত-পা বাঁধা, বাস্তবে কমিটির সদস্যরা যা বলেন তাই করতে হয় আবার যে কোন অভিযোগে কমিটি থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সব অপবাদ, সব অপরাধ মেনে নিয়ে বিদায় নিতে হয় হেড মাস্টারকে।

ফিরোজ সাহেব প্রতিবাদ করে বললেন, ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা যা বলবেন আপনি তাই করবেন না, স্কুলের জন্য ভালো না হলে আপনি কমিটিকে বুঝবেন, প্রয়োজনে প্রতিবাদ করবেন। কিন্তু আপনাকে তো কোন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে দেখিনি। কমিটিকে সন্ত্বোষ্ট করার জন্য সময় দিতে গিয়ে আপনি লেখাপড়ার মানের দিকে খেয়াল করেন নি। ফলে এ বছর এস.এস.সি পরীক্ষায় কোন ছাত্র-ছাত্রী পাস করল না। রাস্তাঘাটে লোকজন আমাকে স্কুলের রেজাল্ট নিয়ে প্রশ্ন করে, আমি কোন উত্তর দিতে পারি না।

আমি যতদিন ভারপ্রাপ্ত হেড মাস্টারের দায়িত্ব পালন করেছি ততদিন প্রশাসনিক কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলাম। লেখাপড়ার মান দেখার দায়িত্ব ছিল এ্যাসিষ্টেন্ট হেড মাস্টারের উপর, আজ তার কোন দোষ নেই। স্কুল হ্যান্ড ওভার নেওয়ার ব্যাপারে সকলেই মিলে মৌখিক সিদ্ধান্ত হলো, হ্যান্ড ওভার না নেওয়ার জন্য এখন তদন্তে সব দোষ পড়ল আমার উপর। তদন্ত রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে আমাকে সাসপেন্স করার সুপারিশ করা হয়েছে। আল্লাহই জানেন আমার কপালে কী আছে? বলতে বলতে হামিদ সাহেবের গলার স্বর বুজে এলো।

কমিটির সদস্য হায়াত সাহেব বললেন, সভাপতি সাহেব আমাদের স্কুল অনেক পিছিয়ে গেছে। আর সময় নষ্ট করা যায় না।

কমিটির অন্য একজন সদস্য  বললেন, সভাপতি সাহেব আপনার অভিজ্ঞতা অনেক আপনি বলুন এখন কী করলে ভালো হয়?

ফিরোজ সাহেব বললেন, আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবিনি এমন নয়। তবে আমার মনে হয় আমাদের স্কুলে একজন কাসেম স্যারের মতো অনেস্ট, দায়িত্ববান এবং নিবেদিত প্রাণ মানুষ প্রয়োজন। আহ্‌ স্যারের উপর আমরা কী অবিচারই না করেছি? কাসেম স্যার থাকলে আজ স্কুলের অবস্থা কী এমন হয়?

কমিটির একজন সদস্য বললেন, তবে আমরা না হয় সবাই মিলে একবার যাই স্যারকে গিয়ে রিকোয়েস্ট করি।

শহিদুল সাহেব বললেন, কিন্তু তিনি তো রিজাইন করেছেন।

ফিরোজ সাহেব বললেন, না আমি স্যারের রিজাইন লেটার একসেপ্ট করিনি।

হায়াত সাহেব বললেন, তবে এ কথাই থাকল, সবাই মিলে একদিন স্যারের কাছে যাই।

ফিরোজ সাহেব বললেন, সভা আজকের মতো এখানেই শেষ হলো।

 

পঁয়ত্রিশ

রাজু ছোটবেলা থেকে খুব সৌখিন প্রকৃতির, তার চলাফেরা ও চাল-চলনে এক ধরনের বিশেষত্ব ছিল তার চেহারা যেমন লম্বা, ফর্সা, ঢেউ খেলানো চুল তেমনি পোশাক পরিচ্ছদেও ছিল রুচি ও আভিজাত্য। সে সব সময় পারফিউম ব্যবহার করত ফলে সে যেখানে থাকত তার আশ-পাশের সুগন্ধি তার উপস্থিতি বলে দিত। সে সব সময় দল বেধে চলত ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা দিত, কোনদিন ক্লাস ফাঁকি দিয়েও আড্ডা দিত। তার সামনে দিয়ে মেয়েরা যখন হেঁটে যেত তখন রাজু প্রত্যেক মেয়েরই কোন না কোন খুঁত বের করত। কেউ লম্বা, কেউ খাটো, কেউ হ্যাংলা, কেউ মোটা কারো নাক লম্বা কারো নাক চাপা এমনি অসংখ্য ধরনের খুঁত বের করত। কলেজের যে মেয়েটি সবচেয়ে সুন্দর, যে মেয়েটিকে পাবার জন্য অনেক ছেলে স্বপ্ন দেখত সেই মেয়েটি ভালোবাসতো রাজুকে। কিন্তু রাজু তাকে কোনদিন পাত্তাই দেয়নি। কথা প্রসঙ্গে একদিন মুক্তি বলেছিল, কী রে আমার এতো সুন্দর বান্ধবীটাও তোর পছন্দ হলো না, দেখি তুই কোন হুর বিয়ে করিস?

রাজু বলেছিল, আমার বউ হবে হাজারে একটা। এক হাজার মেয়ের মধ্যে যে মেয়েটি হবে সবচেয়ে সুন্দর, স্মার্ট, মার্জিত এবং শিক্ষিত সেই হবে আমার বউ।

আজ রাজু তার বউসহ তৃপ্তিকে দেখতে আসার প্রোগ্রাম থাকায় মুক্তির রাজুর কথাগুলো মনে পড়ল। সেই সঙ্গে একটা সন্দেহ তার মনে বাসা বাধল, রাজু তার ছোট ভাইয়ের জন্য তৃপ্তিকে পছন্দ করবে তো?

বিকেল বেলা মুক্তি দামী শাড়ি গয়না ও কসমেটিকস দিয়ে নিজ হাতে তৃপ্তিকে সাজিয়ে তৃপ্তির মাথায় ঘোমটা পরিয়ে দিয়ে মাহমুদকে বলল, দেখতো তৃপ্তিকে কেমন লাগছে?

মাহমুদ তৃপ্তির থুতনি উঁচু করে ধরে গানের সুরে বলল, আরো আগে কেন কাছে এলে না ——— ।

তৃপ্তি লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে বলল, দুলাভাই।

পড়েনা চোখের পলক, এত সুন্দর মেয়ে দেখে কেউ কি অপছন্দ করতে পারে?

মুক্তি একটা শ্বাস ফেলে বলল, তোমার কথাই যেন হয়।

অবশেষে মাহমুদের কথাই সত্য হলো। রাজু তৃপ্তিকে দেখে মুগ্ধ হলো, সে তার স্ত্রী রিয়ার কানে ফিস ফিস করে বলল, তোমার পছন্দ হয়েছে?

রাজু রিয়ার কানে আস্তে আস্তে বললেও তার কথার উত্তরে রিয়া রানার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার ভাইয়ের পছন্দ আছে।

রাজু এবং রিয়ার মুখে তৃপ্তিকে তাদের পছন্দের কথা জানতে পেরে মুক্তির চোখে মুখে একটা তৃপ্তির আভা ফুটে উঠল। সে রাজুকে বলল, শুধু রানার কেন, রাজুর পছন্দও প্রশংসার যোগ্য। ভাবী যেমন শিক্ষিত তেমনি সুন্দর, দু’জনে মানিয়েছে ভালো, যাকে বলে সোনায় সোহাগা।

রাজু বলল, কেন বলেছিলাম না আমার বউ হবে হাজারে একটা, হয়েছে তো?

মুক্তি বলল, হাজারে একটা বলে ভাবীকে খাটো করছিস কেন? ভাবী তো অদ্বিতীয়।

রিয়া কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল, আজকের পাত্রী আমি নই, তৃপ্তি কিন্তু তুমি আর তোমার বান্ধবী যেভাবে আমার প্রশংসা করছ তাতে আসল প্রসঙ্গটা চাপা পড়ছে?

রাজু মৃদু হেসে বলল, মুক্তি, মাহমুদ সাহেব আমরা এক রকম এনগেজমেন্টের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। যদি আপত্তি না থাকে তবে-

আপত্তির কিছু নেই, বলে না শুভ কাজে দেরি করতে নেই, বলে মুক্তি মাহমুদের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কী বলো?

হ্যাঁ মিস্টার রাজু যখন চাচ্ছেন তবে আর দেরি কীসের?

রাজু রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, রিয়া।

রিয়া তার ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটি আংটি বের করে রাজুর হাতে দিচ্ছিল, রাজু আংটি না নিয়ে বলল,আমাকে কেন তুমি?

রিয়া একবার রানার দিকে তাকিয়ে বলল, কী রে সব কিছু ঠিক ঠাক?

রানা মৃদু হাসল।

তৃপ্তি দেখি তোমার হাতটা, বলে রিয়া তৃপ্তির হাতটা নিয়ে আঙ্গুলে আংটি পরিয়ে দিল।

তারপর সবাই এক সঙ্গে বলল, আলহামদুলিল্লাহ।

মুক্তি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ভাবী যদি অনুমতি দেন তবে তৃপ্তি একটু উঠবে।

রিয়া বলল, তৃপ্তি তুমি এবার এসো।

মুক্তি ও তৃপ্তি দু’জনে ভিতরে চলে গেল। কয়েক মিনিট পর তৃপ্তি সোফায় বসল।

রাজু বলল, আমরা বিয়ের সূচনা করলাম তবে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান পঞ্চগড়েই হওয়া উচিৎ মুক্তি তুমি কী বলো? মাহমুদ সাহেব আপনি কী বলেন?

মুক্তি ও মাহমুদ দু’জনেই বলল, অবশ্যই।

এমন সময় তৃপ্তি নাস্তার ট্রে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকল।

 

ছত্রিশ

কাসেম সাহেবের শারীরিক অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে, দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ি আর বাড়ির আশে পাশে ঘুরে বেড়ান, দূরে কোথাও যাবার বা আগের মতো কোন কাজ করার মনোবল পান না। সকালবেলা বিছানা থেকে উঠে কোন কিছু খেতে ইচ্ছে করে না, বেশির ভাগ সময় বমি বমি ভাব লেগেই থাকে। সবসময় ঘাড়ের রগ ব্যথা করে। কাসেম সাহেব একবার পঞ্চগড় গিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। ডাক্তার সব কিছু দেখে বললেন, হাই প্রেশার খাবার-দাবারের বিধি নিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

কাসেম সাহবে বললেন, বিধি নিষেধ তো সব মেনেই চলি।

হ্যাঁ ঠিকমতো মেনে চলবেন আর দু’একদিনের মধ্যে এন্ডোসকপি করে রিপোর্ট নিয়ে আসবেন।

কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু বাবা এন্ডোসকপি কোথায় করতে হয়?

ডাক্তার বললেন, এন্ডোসকপি তো এখানে নেই, আপনি দিনাজপুর অথবা রংপুর যান।

কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, বাবা আমার কী অসুখ হয়েছে? জটিল কিছু?

ডাক্তার সাহেব কাসেম সাহেবকে তাঁর সম্ভাব্য অসুখ এবং আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রেসক্রিপশন করে দিলেন। কাসেম সাহেবকে ডাক্তারের কাছে থেকে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই মোর্শেদর মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি উৎকণ্ঠার সাথে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে তোমার?

কাসেম সাহেব তাঁর ঘরে ঢুকলেন। মোর্শেদাও কাসেম সাহেবের সঙ্গে ঘরে ঢুকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলছ না কেন?

কাসেম সাহেব শুস্ক মুখে বললেন, ডাক্তারে ধারণা আমার ডিওডেনাল আলসার হয়েছে, তাই এন্ডোসকপি করতে বলেছ, দিনাজপুর অথবা রংপুর গিয়ে করতে হবে।

মোর্শেদার উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ডিওডেনাল আলসার কী? এন্ডোসকপি এমন কী টেস্ট যা পঞ্চগড়ে করা যায় না?

ডিওডেনাল আলসার হলো পাকস্থলীর ঘা, ডাক্তার বলেছে যদি সত্যিই ডিওডেনাল আলসার হয় তবে প্রাথমিক পর্যায়ে হলে ঔষধ খেলেই সারবে খারাপ হলে একটা  মাইনর অপারেশন করতে হবে।

তুমি মাহমুদ, বউমা ওদের সঙ্গে আলাপ করেছ?

আলাপ করবো কীভাবে? আজ তো সারাদিন মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। আমি শাহিরুলকে বলে এসেছি, নেটওয়ার্ক এলে, রাত দশটার দিকে ওদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলব।

আমি বলি কী চলো আমরা ঢাকা যাই, সেখানে থেকে তোমার চিকিৎসা শেষে ফিরে আসব। আমাদের তো খাওয়া-থাকার অসুবিধা নেই।

কাসেম সাহেব রেগে গেলেন, আমাদের না হয় ছেলের বাসা আছে আমরা সেখানে যাব আমার ছেলে আমাকে সুস্থ করে তুলবে, এই মাঝিপাড়ায় যাদের কেউ নেই, যাদের ছেলে ডাক্তার হতে পারেনি, তারা কোথায় যাবে? তারা যদি বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে পারে তো আমি পারব না কেন? আমার মৃত্যুর পর সবাই জানবে কাসেম মাস্টার মাঝিপাড়ায় একটি ক্লিনিক করার স্বপ্ন দেখেছিল এবং এলাকার গরীব দুঃখী মানুষকে ক্লিনিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু কাসেম মাস্টার যে প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি এটা হতে পারে না। আমার স্বপ্নটা যদি বিফলেই যায় তবে আর বেঁচে লাভ কী?

শাহিরুল মোবাইল নিয়ে এলো তখন রাত প্রায় দশটা বাজে, কাসেম সাহেব মোবাইল হাতে নিয়ে প্রথমে মাহমুদের মোবাইলে রিং করল কিন্তু বার বার রিং করেও মাহমুদ মোবাইল রিসিভ না করায় কাসেম সাহেবকে মুক্তির মোবাইলে রিং করলেন।

অপর পাশ থেকে মুক্তির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, হ্যালো।

কাসেম সাহেব বললেন, হ্যালো বউমা, তোমরা কেমন আছ?

জি আব্বা আমরা ভালো আছি, আপনারা কেমন আছেন?

বউমা আমার শরীরটা ভালো নেই, আজ পঞ্চগড় গিয়েছিলাম ডাক্তার দেখাতে।

ডাক্তার কী বলল?

ডাক্তার ধারণা করছে আমার ডিওডেনাল আলসার হয়েছে তাই এন্ডোসকপি করতে বলছে।

মুক্তির উৎকণ্ঠিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, বাবা আপনার সমস্যা কী?

কাসেম সাহেব বললেন, বউমা আমার কখনো খিদে লাগে না, সবসময় বমি বমি ভাব হয়, কিছু খেলে পেট জ্বালা করে।

বাবা আর দেরি না করে শীঘ্রই এন্ডোসকপি করে ফেলুন।

কাসেম সাহেবের মুখ শুকিয়ে গেল, বউমা তুমিও-

জি আব্বা আমরাও মনে হচ্ছে ডিওডেনাল আলসার হয়েছে, শীঘ্রই এন্ডোসকপি করুন, প্রয়োজন বোধে-

কাসেম সাহেব বললেন, না, না বউমা আমি অপারেশন করবো না।

আব্বা আমি সে কথা বলছি না, আপনি আম্মাসহ ঢাকায় চলে আসুন, একটু থামুন আব্বা কলিং বেল বাজল আপনার ছেলে এসেছে কথা বলুন।

তারপর মাহমুদের কণ্ঠ স্বর ভেসে এলো, বাবা কী হয়েছে?

কাসেম সাহেব বললেন, বাবা কয়েকদিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না, ডাক্তার সন্দেহ করছে আমার ডিওডেনাল আলসার হয়েছে।

তুমি ঢাকায় চলে এসো বাবা। তোমার বউমা আছে আমি আছি আমরা তোমাকে সুস্থ করে তুলব।

তোরা চলে আয় বাবা, আমি তোদের একবার দেখে-

বাবা আমি একজন স্প্যাশালিস্ট ডাক্তার এখানে আমাকে অনেক প্যাসেন্ট আছে আবেগের বশে আমি তো মাঝিপাড়ার মতো গ্রামে গিয়ে হাসপাতাল করার মতো পাগলামি করতে পারি না। তুমি এন্ডোসকপি কর তারপর তুমি যদি ঢাকা না আস তবে আমি টাকা পাঠিয়ে দেব অবস্থা বেশি খারাপ হলে সামান্য একটা অপারেশন করলেই তুমি ঠিক হয়ে যাবে। তুমি তোমার বউমার সঙ্গে কথা বলো।

মোবাইলে আবার মুক্তির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, জি বাবা বলুন।

মাহমুদের আচরণে কাসেম সাহেব মর্মাহত হলেন। একবার ইচ্ছা হলো মুক্তির সঙ্গে কথা না বলেই মোবাইল রেখে দিবে। পরক্ষণেই মনে করলেন মুক্তির তো কোন দোষ নেই। কাসেম সাহেবের গণ্ডদেশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি শিশু সুলভ ভঙ্গিতে কান্না ভাঙ্গা গলায় বললেন, বউমা আমি মনে হয় আর বাঁচব না, তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে, তুমি কি একবার আসবে?

অপর পাশ থেকে মুক্তির আর্দ্র কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, না না বাবা আমি আপনাকে মরতে দিব না, আমি আসছি, আমি আপনাকে সুস্থ করে তুলব, আমি আপনার স্বপ্ন সফল করবো বাবা।

কাসেম সাহেব মৃদু হেসে বললেন, শুনে খুব খুশি হলাম, দোয়া করি মা বেঁচে থাক, বলে কাসেম সাহেব মোবাইল বন্ধ করলেন, তার মনের মধ্যে তখন মাহমুদের ছোটবেলার ছবি ভেসে উঠল, বাবা আমি ডাক্তার হবো। আমি আর কাউকে মরতে দেব না।

 

সমাপ্ত

 

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*