প্রিয়ন্তী

প্রিয়ন্তীর সঙ্গে সুশান্তর বিয়ে হয়েছে তিনবার। একই বর-কনে তিনবার বিয়ের বিষয়টি অনেকের মনে কৌতূহলের সৃষ্টি করল, কারো অবিশ্বাস্য মনে হলো, কারো কারো মনে হাস্য রসের সৃষ্টি করল, কারো কারো হৃদয়কে আহত করল।  কিন্তু একই বর-কনের মধ্যে তিনবার বিয়ে হবে কেন? এই কেন-এর উত্তর দিতে গেলে সমাজের যে অসঙ্গতি ফুটে উঠবে তা অনেকের বিবেককে দংশন করবে আর পরের ঘটনাগুলো মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে।

প্রিয়ন্তী, প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী তখন রাজশাহী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এ-প্লাস পেয়ে এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি পাস করেছে। ক্লাসের লেখাপড়ার বাইরে সে প্রচুর বই পড়ে। ইংরেজি সাহিত্য, বাংলা উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প এমনকি যে কোন একটা বই হাতের কাছে পেলেই সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে। বলা যায় প্রিয়ন্তী একজন জ্ঞান পিপাসু মেয়ে। ক্লাসের মাঝে একটু অবসর পেলে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা যখন কলেজের মাঠে গোল হয়ে বসে চিনাবাদাম খায়, কেউ কেউ তাদের ভালোবাসার মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলে, প্রিয়ন্তী তখন লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ে। তার চালচলন সবকিছুই একেবারে ব্যতিক্রম।

প্রথম বর্ষে প্রিয়ন্তী ভালো রেজাল্ট করেছে। প্রিয়ন্তী এত ভালো রেজাল্ট করবে আশা করেনি, তাই তার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গেছে, সে আরো ভালো রেজাল্ট করার জন্য আরো বেশি করে লেখাপড়া শুরু করেছে। আজকাল সে কলেজের ক্লাস শেষ করেই মেসে ফিরে না, লাইব্রেরিতেই সময় কাটায়। কলেজ চালু থাকলে তার দু’টো ঠিকানা, ক্লাস আর লাইব্রেরি, কলেজ বন্ধ থাকলে মেস।

একদিন প্রিয়ন্তী ক্লাসের ফাঁকে লাইব্রেরিতে বসে একটা বই পড়ছিল। বই পড়া তো নয় যেন ধ্যানে মগ্ন থাকা।  প্রিয়ন্তীর ক্লাসফ্রেন্ড সুশান্ত, সেও ভালো ছাত্র তবে প্রিয়ন্তীর মতো নয়। প্রথম কয়েকদিন ক্লাস করার পর একদিন প্রিয়ন্তীর সঙ্গে সুশান্তর দৃষ্টি বিনিময় হলো। প্রিয়ন্তী লক্ষ্য করেছে সুশান্ত তার সঙ্গে কথা বলার অজুহাত খুঁজে। প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে গিয়েও যেন থেমে যায়। প্রিয়ন্তীরও প্রায় মনে হয় সুশান্ত যেন তার চেনা, কোথায় যেন দেখেছে কিন্তু মনে পড়ে না।

সেদিন প্রিয়ন্তী ক্লাসের ফাঁকে লাইব্রেরিতে একটা বই পড়ছিল। সুশান্ত একটা বই খোঁজার অজুহাতে প্রিয়ন্তী যেখানে বসে বই পড়ছিল ঠিক তার কাছের একটা বই ইচ্ছা করে রেক থেকে ফেলে দিল।

প্রিয়ন্তী বই থেকে মুখ তুলে তাকাল। সুশান্তর গায়ের রং শ্যামলা, লম্বা, নামের সঙ্গে আচরণের একটা অদ্ভুত মিল আছে। তার চেহারায় সরলতার ছাপ আছে যা সহজে কারো মধ্যে পাওয়া যা না। কখনো সুযোগ পেলে প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে থাকে, কখনো প্রিয়ন্তীর চোখে চোখ পড়লে সুশান্ত আগে চোখ নামায়।

প্রিয়ন্তীর চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল কিন্তু সে কিছু বলল না।

সুশান্ত সরি প্রিয়ন্তী বলে বইটা তুলে রাখল। তার ধারণা ছিল প্রিয়ন্তী হয়ত কিছু বলবে আর সে অজুহাতে সুশান্ত তার সঙ্গে কথা বলবে কিন্তু প্রিয়ন্তী কিছু না বলায় সুশান্ত কিছুটা নিরাশ হলো।

আজ সুশান্ত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে করেই হোক আজ সে প্রিয়ন্তীর সঙ্গে কথা বলবেই। সে বইটা তুলে রেখে প্রিয়ন্তীর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল, প্রিয়ন্তী।

প্রিয়ন্তী কিছু বলল না।

সুশান্ত মনে মনে বলল, কী আনকালচার্ড মেয়ে রে বাবা, আমি কথা বললাম আর সে কোন কথাই বলল না। সে যেমন ছিল তেমন করেই বইয়ে মনোযোগ দিল।

সুশান্ত একটু নড়েচড়ে বসল।

না, প্রিয়ন্তীর কোন কথা নেই।

সুশান্ত প্রিয়ন্তী, প্রিয়ন্তী বলে দু’বার ডাক দিল।

তারপরও কোন কথা নেই।

সুশান্ত আপন মনে আস্তে আস্তে বলল, প্রিয়ন্তী কি কানে শোনে না নাকি? ক্লাসে তো কোনদিন এমন মনে হয়নি?

প্রিয়ন্তী বইটা বন্ধ করে রেখে বলল, একটা বই পড়ছিলাম, খুব ইন্টারেস্টিং তো।

আমি তিনবার ডাক দিয়েছি।

শুনেছি।

কথা বললি না যে! খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলি বুঝি?

হ্যাঁ, আমি কোন কাজ করলে খুব মনোযোগ দিয়ে করি আর কোন কাজ না করলে তার ধারের কাছেও যাই না।

সুশান্ত কিছু বলল না।

সুশান্ত কেমন আছিস?

ভালো, তুই?

ভালো আছি।

প্রিয়ন্তী একটা খবর শুনেছিস?

কী খবর?

আজ আর ক্লাস হবে না।

কেন?

স্যার অসুস্থ।

ও আমি পরের ক্লাসটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তাহলে তো আজ আর থেকে লাভ নেই, বলে প্রিয়ন্তী চেয়ার থেকে উঠল।

সুশান্ত মিষ্টি হাসি হেসে বলল, আমি বুঝি তোকে বলে ভুল করলাম।

কেন?

এই যে তুই উঠছিস, আমি যদি কিছু না বলতাম তবে তুই আরো কিছুক্ষণ লাইব্রেরিতে বসতিস।

হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক, প্রিয়ন্তী একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার বসল।

প্রিয়ন্তী সুশান্তর দিকে তাকাতেই সুশান্ত হাসল।

সুশান্তর হাসিটা অদ্ভুত। একেবারে সহজ-সরল, নিষ্পাপ একটা হাসি। আজ প্রিয়ন্তীর মনের মধ্যে যেন সুশান্তর ছবিটা গেঁথে গেল, সুশান্ত তুই কি হোস্টেলে থাকিস?

না একটা মেসে।

হোস্টেলে সিট পাসনি?

না, অবশ্য কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে পেতাম।

দিলে ভালো করতিস।

রাজনীতিতে যোগ দিলে মিছিলে যেতে হবে।

যাবি।

তুই যেতে বলছিস?

বাঃ আমি যেতে বললে তুই যাবি?

সুশান্ত খুব সরলভাবে বলল, হ্যাঁ।

সুশান্ত এটা কিন্তু ঠিক না, আমি যেতে বললেই তুই যাবি?

সুশান্ত কিছু বলতে গিয়ে যেন আটকে গেল। হয়ত বলতে চেয়েছিল, তোকে আমার ভালো লাগে তাই কিন্তু প্রিয়ন্তীর গম্ভীর শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলো না।

দুই

 

ব্রজেন্দ্র নাথ ঠাকুর, নামটা বেশ বড় আর উচ্চারণটা আরো কঠিন, তাই সবাই সংক্ষেপে তাকে বজ ঠাকুর বলে ডাকে। বয়স আশি ছুঁই ছুঁই করছে কিন্তু শরীরের গড়ন ভালো হওয়ায় বয়স বোঝা যায় না। শৈশবে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে এটা তার জন্য যেন একটা গর্বের বিষয়। বজ ঠাকুর সব সময় সাধু ভাষায় কথা বলে এটাও যেন তার একটা অহংকার। কথায় কথায় সে নিজে নিজে বলে, আমি হইলাম গিয়া সেই আমলের পঞ্চম শ্রেণী পাস। আগে শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কেউ আমার সহিত কথা বলিতে পারিতো না, ইদানীং কেউ কেউ চলিত ভাষায় কথা বলে তবুও কথা বলার মধ্যে হাজার গণ্ডা ভুল। আরে নিজের মায়ের ভাষাটাই যদি ঠিক মতো বলিতে না পারিলে তবে আর শিখিলে কী? আর গীতা পাঠ? গীতা পাঠ, পূজা অর্চনা পালন করিবার মতো ঠাকুর তো এই অঞ্চলে দ্বিতীয়টি নেই।

বজ ঠাকুর চল্লিশ বছর যাবত পূজা মণ্ডপে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে আসছে। আগের দিনে কেউ কোন সৎপরামর্শের জন্য বজ ঠাকুরের শরণাপন্ন হতো, এখন শিক্ষার হার বেড়েছে, উচ্চ শিক্ষাও বেড়েছে তাই বজ ঠাকুরের কদর কিছুটা কমেছে তবে সনাতন রীতি-নীতির বিষয়ের এখনো বজ ঠাকুরই শ্রেষ্ঠ।

বাসন্তী বয়স যখন পনেরো কিংবা ষোল তখন দীপক চক্রবর্তীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সমস্ত সনাতনআনুষ্ঠানিকতা পালন করে বজ ঠাকুর। সেইসূত্রে বজ ঠাকুর শেফালি আর দীপকের সংসারে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করে। দীপক সেটা বুঝতে পেরেও মেনে নেয়।

দীপক চক্রবর্তীর দু’মেয়ে। বড় মেয়ে অঞ্জনা চক্রবর্তী পড়াশোনায় ভালো, দেখতেও অপূর্ব সুন্দরী। নবম শ্রেণীতে লেখাপড়া করার সময় থেকে বিয়ের জন্য সম্বন্ধ আসতে থাকে, প্রথম থেকেই দীপক বাবুর ইচ্ছা দু’মেয়েকেই লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবে। অঞ্জনার এস.এস.সি পরীক্ষার ফলাফলও ভালো আর সে কারণেই বিয়ের সম্বন্ধ আরো বেশি করে আসতে শুরু করল।

একবার সম্বন্ধ এলো পার্বতীপুর থেকে। পাত্র এম.এস.সি পাস করে একটা বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করে। দেখতে শুনতে ভালো, ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে। পাত্রের বাবার প্রায় এক’শ বিঘা আবাদি জমি আছে, যা তার দু’ছেলের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হলে পাত্রের ভাগে পরবে পঞ্চাশ বিঘা জমি। এমন পাত্র পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার তারওপর বর্ণ অনুযায়ী পাত্র পাওয়া তো আরো কঠিন।

সবকিছু শুনে দীপক বাবু কিছুটা নমনীয় হলো। বাসন্তী সামান্য আপত্তি থাকলেও পাত্রের যোগ্যতা, বিষয় সম্পত্তি আর পারিবারিক ঐতিহ্যের কাছে সেও নীরব সমর্থন দিল। অঞ্জনা একবার আপত্তি তুলতেই বজ ঠাকুর রাম, রাম বলে তাকে তিরস্কার করল।

বজ ঠাকুর আরো বলল, কলি যুগ দীপক বুঝিলে, আগের দিনে মেয়েদের বিবাহ হইয়াছে কোনদিন জানিতেও চাহে নাই পাত্র কী করে? কোথায় বাড়ি? পাত্রের গায়ের রং কী রকম? আর আজকাল কী না বিয়েতে মেয়ের সম্মতি লইতে হইবে রাম, রাম, রাম।

দীপক বলল, না ঠাকুর মশাই অঞ্জনা বলছিল ও আরো লেখাপড়া করবে।

লেখাপড়া করিবে তো ভালো কথা, শিক্ষিত পরিবার, জামাই বাবু নিজেও কলেজের অধ্যাপক, অঞ্জনার লেখাপড়ার কোন অসুবিধা হইবে না। জামাই বাবু নিজের আগ্রহে অঞ্জনাকে লেখাপড়া শিখাইবে।

দীপক বাবু অঞ্জনার বিয়ে দিল অনেক টাকা পণ দিয়ে এবং খুব ধুমধাম করে।

দীপক চক্রবর্তীর ছোট মেয়ে প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী। রাজশাহী কলেজে লেখাপড়া করে। অঞ্জনার মতো প্রিয়ন্তীও এস.এস.সি পাস করার আগে থেকেই তার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে থাকে কিন্তু দীপক বাবুর একই কথা, অঞ্জনার বিয়ে দিয়েছি, আশা করেছিলাম বিয়ের পর জামাই তাকে লেখাপড়া শেখাবে কিন্তু তা আর হলো না। আসলে বিয়ের পর মেয়েদের আর লেখাপড়া হয় না।

প্রিয়ন্তীও তার সিদ্ধান্তে অনড়, আগে লেখাপড়া শেষ করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, তারপর বিয়ে।

 

সেদিন লাইব্রেরিতে কথা বলার পর থেকে সুশান্ত একটু সুযোগ পেলেই প্রিয়ন্তীর সঙ্গে কথা বলতো, সুশান্ত যেমন প্রিয়ন্তীকে ভালোবেসেছে প্রিয়ন্তীও তেমনি মনে মনে সুশান্তকে ভালোবেসেছে। তারপর থেকে কলেজ ছুটি হলেই দু’জনে  বেরিয়ে পড়ে যেন মুক্ত বিহঙ্গের মতো।

আজ কলেজ বন্ধ, গতকাল প্রিয়ন্তীর সঙ্গে সুশান্তর কথা হয়েছে। আজ সকালবেলা দু’জনে একসঙ্গে বের হবে। সুশান্ত সকাল থেকে প্রিয়ন্তীর মোবাইলে রিং দিচ্ছে কিন্তু প্রিয়ন্তীর মোবাইল বন্ধ। প্রিয়ন্তীকে না পেয়ে সুশান্ত প্রিয়ন্তীর রুমমেট-এর মোবাইলে রিং করল কিন্তু না তার মোবাইলও বন্ধ। সুশান্ত কিছুটা বিরক্ত বোধ করল। তারপর সে প্রিয়ন্তীর মেসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।

সুশান্তর মেস থেকে প্রিয়ন্তীর মেসে যেতে সাহেব বাজার মোড় অতিক্রম করতে হয়। প্রিয়ন্তীর ওপর রাগ থাকা সত্ত্বেও সে সাহেব বাজার মোড়ের একটা দোকান থেকে ফুল কিনলো। তারপর প্রিয়ন্তীর মেসের গেট-এ গিয়ে দাঁড়ালো।

মেসে একজন সার্বক্ষণিক গার্ড নিয়োজিত থাকে। সে গম্ভীর কণ্ঠে সুশান্তকে জিজ্ঞেস করল, কাকে চাই?

প্রিয়ন্তীকে।

মোবাইল করো।

মোবাইল বন্ধ, একটু ডেকে দিন না প্লিজ!

কী বলতে হবে?

বলবেন সুশান্ত এসেছে।

ঠিক তো?

মানে!

মানে এখানে তো সুশান্ত অশান্ত সবাই আসে, তুমি সুশান্ত ঠিক তো?

সুশান্ত হেসে উঠল, একেবারে ঠিক।

গার্ড ভিতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর প্রিয়ন্তী বেরিয়ে এলো। প্রিয়ন্তী আজ লাল জর্জেটের কামিজ পরেছে। এমনিতেই প্রিয়ন্তীর গায়ের রং ধবধবে ফর্সা তারওপর লাল রংয়ের কামিজ যেন ফর্সা গালের ওপর আলতার প্রলেপ দিয়েছে। প্রিয়ন্তী কামিজের সঙ্গে ম্যাচিং করে কপালে একটা বড় আকারের টিপ দিয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে প্রিয়ন্তী যেন আজ অপূর্ব সাজে সেজেছে।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর দিকে কয়েক-মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।

আজ প্রিয়ন্তী চোখ সরিয়ে নিল, কখন এলি সুশান্ত।

এই তো কয়েক-মিনিট হলো, তোর মোবাইলে-

প্রিয়ন্তী সুশান্তকে ইশারা করে থামতে বলে হাত এগিয়ে দেখিয়ে বলল, চল।

দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় এসে একটা রিক্সায় উঠল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবি?

চল পার্কে যাই।

চল।

কয়েক মিনিটের মধ্যে দু’জনে পার্কের গেটে এসে নামল। গেট পেরিয়ে অনেকদূর ভিতরে ঢুকে গেল।

দু’জনে একটা গাছের নিচে বসল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, এখন বল, মেসের সামনে কী বলতে চাচ্ছিলি?

আমি সকাল থেকে তোর মোবাইলে রিং দিচ্ছিলাম কিন্তু মোবাইল বন্ধ।

আমার মোবাইলে বেশিক্ষণ চার্জ থাকে না, কম দামি মোবাইল তো।

একটা বেশি দামি মোবাইল কিনে ফেল।

টাকা পাবো কোথায়?

আমি দিব।

তুই দিলেই আমি নিবো?

কেন? অসুবিধা কী?

সুশান্তর অতি আগ্রহের জবাবে প্রিয়ন্তী একবার রাগান্বিত চোখে সুশান্তর দিকে তাকাল। সুশান্ত আর কিছু বলল না একরকম অপরাধীর মতো সংকুচিত হলো।

কিছুক্ষণ দু’জনে নীরব তারপর সুশান্ত আবার বলতে শুরু করল, তোর মোবাইল বন্ধ পেয়ে তোর রুমমেট-এর মোবাইলে রিং দিলাম কিন্তু ওর মোবাইলও বন্ধ।

ও সিম কার্ড পাল্টিয়েছে।

মেয়েদের এই একটা দোষ, ক’দিন পর পর সিম কার্ড পাল্টায়।

পাল্টায় কি আর সাধে? ক’দিন যেতে না যেতেই নাম্বারসব ছেলেদের হাতে হাতে চলে যায়। দিন রাত বিরক্ত করে, মিস কল দেয়, আজে বাজে কথা বলে, এ্যডাল্ট এম.এম.এস পাঠায়।

তোরা সে সুযোগ দিস কেন?

সুযোগ দিই মানে? মোবাইল রিচার্জ করতে গেলে সেখান থেকেই নাম্বার নিয়ে শুরু হয় বিরক্ত করা।

ছেলেরা আসলে তোদের বিরক্ত করে নাকি তোরা বিরক্ত হতে আনন্দ পাস।

মানে?

না কোন কোন মেয়ে তো চায় দিন রাত তার মোবাইলে কল আসুক, তা না হলে কোন মেয়ে যদি একবার কোন ছেলেকে তাকে মোবাইল করতে নিষেধ করে বা আগ্রহ পাওয়ার মতো কোন সাড়া না দেয় তবে মোবাইল করবে কেন?

প্রিয়ন্তী সুশান্তর কথার কোন জবাব দিল না। সে দূরে তাকিয়ে রইল। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে খুব ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে, ছেলেটা মেয়েটার কাঁধে হাত দিয়েছে আর মেয়েটা ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সুশান্ত অনেকক্ষণ যাবত প্রিয়ন্তীর দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কী দেখছিস?

প্রিয়ন্তী কিছুটা লজ্জা পেল, না কিছু না।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, সুশান্ত তুই আমাকে খুব ভালোবাসিস, না?

হ্যাঁ।

আচ্ছা তুই আমাকে একটা সত্য কথা বলতো, সেদিন হঠাৎ করে তুই লাইব্রেরিতে গিয়েছিলি নাকি আগে থেকেই আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছিলি?

সুশান্ত লজ্জা পেল, প্রিয়ন্তী।

আচ্ছা থাক আর বলব না।

না তা তো হয় না, কারণ তুই আমার অনেকক্ষণ থেকে ইন্টার্ভিউ নিচ্ছিস আমাকে অন্তত: একটা প্রশ্নের উত্তর দে।

বল?

তুই কি আমাকে ভালোবাসিস?

প্রিয়ন্তী এ কথার উত্তরে কিছু বলল না। সুশান্তর চোখে চোখ রাখল। আজ সুশান্ত চোখ নামালো না, কয়েক সেকেন্ড পর প্রিয়ন্তী একটা মুচকি হাসি হেসে বলল, আমার উত্তর পেয়েছিস?

সুশান্ত না বোঝার ভান করে বলল, না।

সব প্রশ্নের উত্তর মুখে দিতে হয় না, অনেক প্রশ্নের উত্তর অনুভব করতে হয়।

আমি চোখের ভাষা বুঝি না, হৃদয়ের ভাষা বুঝি না, অনুভব করতেও পারি না।

সুশান্ত আমি তোর সরলতায় গর্ব বোধ করি আর তুই আমার সঙ্গে চালাকি করছিস?

সুশান্তর সেই সরল হাসি, আমি সরল না বোকা, তাই কিছু বুঝিনা।

বুঝিস না, না? বলে প্রিয়ন্তী সুশান্তর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, আমি তোকে ভালোবাসি সুশান্ত, তোকে ছাড়া আমি কাউকে কোনদিন কল্পনাও করতে পারি না। যেকথা তোর আগে বলা উচিত ছিল সেকথা আমি বললাম, তুই তো একটা ভীতু।

সুশান্ত যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল, সে প্রিয়ন্তীর চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তার কপালে চুমু দিল, প্রিয়ন্তী আমিও তোকে ছাড়া কোনদিন কাউকে কল্পনা করতে পারি না।

দু’জনে আরো কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর সুশান্ত বলল, প্রিয়ন্তী চল নদীর ধারে একটু বেড়িয়ে আসি?

চল।

দু’জনে পার্কের পাশেই পদ্মার ধারে গেল। তখন একটু একটু বাতাস বইছে। নদীতে ছোট ছোট নৌকাগুলো যেন মাঝে মাঝে ঢেউয়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। পদ্মার পাড়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঢেউ আছড়ে পড়ছে। আর সেই সুমধুর ছন্দময় শব্দ সুশান্তকে যেন শিহরিত করছে।

দু’জনে একটা বেঞ্চে বসল।

পদ্মার পাড় থেকে দু’জন ফিরছে তখন সন্ধ্যা হতে আর বেশি দেরি নেই। সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে নিয়ে একটা হোটেলে ঢুকল।

প্রিয়ন্তী কিছু বলল না।

সুশান্ত নাস্তার অর্ডার দিল।

প্রিয়ন্তী তো দেখে অবাক, এত নাস্তা খাবো কী করে?

আজকের দিনটা আমার জন্য একটু কষ্ট কর।

কিন্তু বিকেলবেলা এত বেশি নাস্তা খেলে তো রাত্রে ভাত খেতে পারবো না।

খাবি না।

আচ্ছা সুশান্ত একটা কথা তো জানাই হলো না, তোদের গ্রামের বাড়ি যেন কোথায়?

দিনাজপুর, ফুলবাড়ী উপজেলায়।

আমার বাড়ি তো তুই জানিস?

হ্যাঁ, দিনাজপুর, বিরামপুর উপজেলায়।

একেবারে প্রতিবেশী উপজেলায়, তাই তো আমার মনে হয় তোকে কোথায় যেন দেখেছি।

হবে হয়ত কোনদিন ট্রেনে বা রাস্তায়।

আগে বলিসনি কেন?

বলার সুযোগ পাইনি, মনে করেছিলাম তুই আবার কখন কি মনে করিস?

না, কিচ্ছু মনে করতাম না।

প্রিয়ন্তী আর কিছু বলল না, সে খেতে শুরু করল। নাস্তা শেষে কোল্ড ড্রিঙ্কস এর পাইপে মুখ লাগিয়ে প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা সুশান্ত তোরা ক’ভাই বোন?

আমরা দুই ভাই।

তুই?

আমি ছোট।

তোর বড় ভাই বিয়ে করেছে?

হ্যাঁ।

তোর বউদি কি দেখতে খুব সুন্দর?

সুশান্ত একটা হাসি হাসল, প্রিয়ন্তী সে হাসির কোন অর্থ বুঝল না। সে না বুঝেই বলল, আমি তাদের সঙ্গে মানাবো তো?

আমি তোকে ভালোবাসি, তুই কার চেয়ে কম সুন্দরী সেটা আমার কাছে কোন বিষয় না, তুই আমার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী, সবচেয়ে আপন। তোকে যদি কেউ পছন্দ না করে তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না, আমি তোকে ভালোবেসেছি, আমি তোকে বিয়ে করব, তোকে পাওয়ার জন্য আমি সবকিছু ছাড়তে রাজি আছি।

প্রিয়ন্তী সুশান্তর দিকে তাকিয়ে রইল তার কথায় কোন জড়তা নেই, কোন কৃত্রিমতা নেই। একেবারে স্বাভাবিক, যেন খাঁটি অন্তরের কথা। সুশান্তর কথা শেষ হলেও প্রিয়ন্তী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, কী দেখছিস?

প্রিয়ন্তী সুশান্তকে একটু ধাক্কা দিয়ে মুচকি হাসি হাসলো, আমি তোকে ভালোবাসি এবং বিশ্বাস করি কিন্তু সুশান্ত তোকে যদি কোন দিন কোন সাহসী কাজ করতে হয় তবে তুই সাহস করতে পারবি কি না সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর হাতে একটা চাপ মেরে তার থুতনি উঁচু করে ধরে বলল, আমাকে তোর সন্দেহ হয়, না? আমি কোন সাহসী কাজ করতে পারবো না। যখন সময় হবে তখন দেখিস, আমি সাহসী কি না?

প্রিয়ন্তী সুশান্তর চোখে চোখ রাখল। তার চোখে কোন লজ্জা নেই, কোন চতুরতা নেই। তার চিরাচরিত সরলতায় প্রিয়ন্তীর বুক গর্বে ভরে গেল।

 

তিন

 

অঞ্জনার মেয়ে হয়েছে, খবরটা শোনার পর থেকে দীপক বাবুর বাড়িতে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করেছে, দীপক বাবু আত্মীয়-স্বজনদের সবাইকে মোবাইল করে আনন্দের খবর জানাতে শুরু করল। অঞ্জনার মেয়ে হওয়ার খবর শুনে প্রিয়ন্তীও খুব আনন্দ পেল। সে মনে মনে নানান কিছু ভাবতে শুরু করল। তার চোখের সামনে একটা অস্পষ্ট শিশুর ছবি ভেসে উঠল। তার আর অপেক্ষা সইছে না।  প্রিয়ন্তীকে যখন তার বাবা মোবাইল করে তখন রাত প্রায় দশটা বাজে, সে তার বাবাকে জানিয়ে দিল, বাবা আমি কাল সকালের তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনে আসছি, তোমরা আমাকে ছেড়ে দিদির বাড়িতে যেও না কিন্তু।

সে কি মা তুই কিভাবে ভাবলি যে আমরা তোকে ছাড়া অঞ্জনার বাড়িতে যাবো, তুই চলে আয়, তারপর এখান থেকে কাল সন্ধ্যার ট্রেনে অঞ্জনার বাড়িতে যাবো।

প্রিয়ন্তী আগামীকাল বিরামপুর যাবার খবরটা সঙ্গে সঙ্গে সুশান্তকে জানালো, সুশান্ত আমি কাল সকালের তিতুমীর এক্সপ্রেসে বিরামপুর যাচ্ছি। মনে হয় কয়েকদিন থাকবো।

হঠাৎ করে বিরামপুর কেন?

বাবা মোবাইল করেছে, দিদির মেয়ে হয়েছে, কাল সন্ধ্যার ট্রেনে আমরা দিদির বাড়িতে যাবো।

তুই দু’য়েকদিন থেকে চলে আসিস।

সুশান্ত তুই বুঝতেই পাচ্ছিস, দিদির মেয়ে হয়েছে, মেয়ে দেখতে বাবা-মা যাবে, ঠাকুরগাঁও থেকে আমার মাসী পার্বতীপুর আসবে। আসতে তো দেরি হতেই পারে।

সুশান্তর ধীর, শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, প্রিয়ন্তী তুই না থাকলে আমার খুব খারাপ লাগে, এমনিতেই দিনে কয়েকবার মোবাইলে কথা না বললে আমার মুড অফ হয়ে যায়। পর পর দু’দিন দেখা না হলে যেন মনের মধ্যে একটা অপরিপূর্ণতা থেকে যায়। আর তুই বিরামপুর অনেক দিন থাকলে-

সুশান্ত শুধু তোর না, তোকে ছেড়ে থাকতে আমারো খুব খারাপ লাগবে। আমি সুযোগ পেলেই তোকে ফোন করব, আমি তোকে বুঝতে দিব না যে আমি রাজশাহী নেই।

আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস ভালো কথা কিন্তু হঠাৎ করে যেন ভুলে যাস না, আর আমি কাল সকালে তোকে ট্রেনে তুলে দিতে যাবো।

থ্যাঙ্ক ইউ সুশান্ত, আমিও তোকে একথা বলতে চাচ্ছিলাম, তুই একেবারে আমার মনের কথা বলেছিস।

 

পরদিন সকালবেলা সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে ট্রেনে তুলে দিতে এলো। ট্রেন ছাড়তে কিছুক্ষণ দেরি। রাজশাহী স্টেশনের প্লাটফরমের একটা বেঞ্চে বসে দু’জনে কিছুক্ষণ গল্প করল। সুশান্তর বার বার একটাই কথা, প্রিয়ন্তী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসিস।

এ কথার উত্তরে প্রিয়ন্তী সুশান্তর চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, শুধু তোর কষ্ট হবে? আমার কষ্ট হবে না, না? একটা কথা তোকে বার বার বলতে হবে, বলে প্রিয়ন্তী হেসে ফেলল।

সুশান্তও হাসল, তবে চিরাচরিত সহজ সরল হাসি না, একটা কষ্ট মিশানো শুষ্ক হাসি।

কিছুক্ষণ পর ট্রেন প্লাটফরমে দাঁড়ালো। প্রিয়ন্তীর ব্যাগ ট্রেনে তুলে দিতে দিতে দু’জনের চোখ ছলছল করে উঠল। ট্রেন দৃষ্টিসীমা অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রিয়ন্তী বার বার করে সুশান্তর দিকে তাকাতে লাগল কিন্তু সুশান্ত হাত নেড়ে বিদায় জানালো না, সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

 

অঞ্জনার মেয়ে হওয়ার খবর শুনে বজ ঠাকুর খুশি হয়েছে তবে কথা বার্তায় মনে হলো ছেলে হলে সে আরো বেশি খুশি হতো। দীপক বাবুর কাছ থেকে কথাটা শোনার পর বজ ঠাকুর বলল, প্রথম বাচ্চা মেয়ে হইল!

দীপক বাবু বজ ঠাকুরের কথায় কিছুটা রাগ করল, ঠাকুর মশাই কিছু মনে করবেন না, অঞ্জনার মেয়ে হবে নাকি ছেলে হবে এটা নির্ধারণ করবে ভগবান, এখানে কারো হাত নেই। অঞ্জনার মেয়েই হোক আর ছেলেই হোক আমরা সবাই খুশি হয়েছি।

বজ ঠাকুর তার কথা ফিরিয়ে নিল, তা তুমি ঠিকই বলিয়াছ দীপক। তোমরা যাইবে কবে?

সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজকেই যাবো।

তা বেশ ভালো, বেশ ভালো, যাইবার আগে একবার ঠাকুর ঘরে আসিও।

হ্যাঁ আসবো।

প্রিয়ন্তী ট্রেনে ওঠার পর বাসন্তী একবার মোবাইল করে প্রিয়ন্তী ট্রেনে উঠেছে কি না জেনে নিয়েছে তারপর থেকে দীপক বাবু বার বার করে মোবাইল করে প্রিয়ন্তীর অবস্থানের খোঁজখবর নিচ্ছে। প্রিয়ন্তীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল, হ্যালো বাবা।

মা তুই এখন কোথায়?

বাবা আমি এখন শান্তাহার, এত তাড়া কেন বাবা? আমি তো আসছিই।

একটু আগে অঞ্জনা মোবাইলে জিজ্ঞেস করল, আমরা রওয়ানা দিয়েছি কি না?

বাবা তুমি না বলেছ সন্ধ্যার ট্রেনে যাবে।

হ্যাঁ তা বলেছিলাম কিন্তু তোর মা আর ধৈর্য ধরছে না, খালি তাড়াহুড়া করছে।

প্রিয়ন্তী জানে আসলে তার মা ধৈর্য হারায়নি তার বাবাই অসহিঞ্চু হয়ে পড়েছে।

প্রিয়ন্তী বলল, একটু ধৈর্য ধরো বাবা, আমি তো আসছিই, প্রিয়ন্তীর কথায় বিরক্তি ফুটে ওঠার মতো হলেও আসলে সে মনে মনে খুশি হলো, সে আপন মনে বলল, আমার বাবা যেমন আমাকে ভালোবাসে সবার বাবা কি তাদের মেয়েদের এত বেশি ভালোবাসে?

মা তাহলে একটা কাজ করি, আমরা বিরামপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষা করি, তোর আর ট্রেন থেকে নামার প্রয়োজন নেই আমরা ট্রেনে তোকে খুঁজে নিবো।

ঠিক আছে বাবা।

 

সুশান্তর একটা মানসিক রোগ আছে যে কোন কাজ পরদিন সকালে করার জন্য সময় নির্ধারণ করা থাকলে সারারাত তার মাথায় একটাই চিন্তা কাজ করে কখন রাত শেষ হবে আর কখন সে তার কাজ শেষ করবে। গতকাল প্রিয়ন্তী কথার সময় তাকে ট্রেনে উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে তাই তার রাতে ভালো ঘুম হয়নি। আজ কলেজে ক্লাস নেই, সকালবেলা প্রিয়ন্তীকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে এসে সুশান্ত বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু চোখে ঘুম নেই, একটু করে ঘুমের ভাব আসতেই প্রিয়ন্তীর কথা মনে পড়ছে আর তার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে।

ট্রেন রাজশাহী থেকে বিরামপুর পৌঁছাতে সুশান্ত তিন বার ফোন করেছে। পার্বতীপুর সবার সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে প্রিয়ন্তী একটু আড়ালে গিয়ে সুশান্তকে মোবাইল করে তার পৌঁছার খবর দিল, সেই সঙ্গে বলল, সুশান্ত আমি তো কখনো গ্রামের বাড়ি, কখনো দিদির বাড়িতে থাকবো। আমিই মাঝে মাঝে তোকে মোবাইল করব।

মোবাইলে সুশান্তর একটা বাষ্প নিরুদ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ঠিক আছে তুই যখন আমাকে-

প্রিয়ন্তী সুশান্তর কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল, সুশান্ত তুই বুঝতে চেষ্টা কর, আমি যদি বাবা-মা বা দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গে থাকি আর তুই বার বার করে মোবাইল করিস তবে কি কাজটা ঠিক হবে?

সুশান্ত কোন কথা বলল না।

সুশান্ত আমি সুযোগ পেলেই তোকে মোবাইল করব, তুই দেখিস আমার ভুল হবে না। তুই বুঝছিস না কেন আমারো তো সব সময় তোর কথা মনে পড়ে?

ঠিক আছে, আমি আর তোকে মোবাইল করব না, সুশান্তর কণ্ঠে অভিমানের সুর ভেসে এলো।

প্লিজ সুশান্ত ডন্ট মাইন্ড।

 

চার

 

অঞ্জনার মেয়েটি খুব সুন্দর হয়েছে, যেন স্রষ্টার নিজ হাতে তৈরি। দীপক বাবু, বাসন্তী মেয়েটিকে কোলে নেবারও অনেকক্ষণ পর প্রিয়ন্তী যখন কোলে নিল ততক্ষণে জামাই বাবু কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

জামাই বাবুকে শুনিয়ে প্রিয়ন্তী বলল, বাচ্চা তো খুব সুন্দর হয়েছে জামাই বাবু।

হবে না, আমার বাচ্চা, আমাদের রক্তের মধ্যে আভিজাত্য আছে। তুই দেখিস আমার মেয়েও একদিন অনেক বড় হবে।

আমিও তাই আশীর্বাদ করি।

ততক্ষণে দীপক বাবু আর বাসন্তী চলে গেছে। প্রিয়ন্তী আর জামাই বাবুর কাছে বিদ্যুৎ এসে দাঁড়ালো, আমাকে দাও।

জামাই বাবুর ছোট ভাই বিদ্যুৎ চক্রবর্তী এ বছর বি.এ পাস করেছে। আপাতত: কৃষিকাজ দেখাশোনা করছে, ভবিষ্যতে চাকরির প্রত্যাশায় বই-পুস্তক এখনো ছেড়ে দেয়নি। বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির দরখাস্ত করছে। তার আশা বি.এ পাস করেই একদিন সে বড় অফিসার হবে। তবে চেহারায় জামাই বাবুর মতোই রাজকীয়।

প্রিয়ন্তী খেয়াল করেছে বিদ্যুৎকে বাচ্চাটাকে দেওয়ার সময় ইচ্ছা করেই প্রিয়ন্তীর হাত স্পর্শ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, সরি।

প্রিয়ন্তী রেগে গেল। সে চোখ মুখ লাল করে নিতান্ত ভদ্রতা বশত: বলল, না, ঠিক আছে। কিন্তু সে বুঝতে পারল বিদ্যুৎ অনিচ্ছাকৃত নয় ইচ্ছাকৃতই তার হাত স্পর্শ করেছে। সে মনে মনে বলল, মিঃ বিদ্যুৎ আপনি হয়ত জানেন না, মেয়েরা গায়ে জড়ালেই বুঝতে পারে সাপ না লতা।

জামাই বাবু তাদের কথা বলতে দেখে চলে গেছে।

তুমি যেন এবার কোন ইয়ারে?

অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে।

তাহলে তো আর বেশিদিন নেই।

তারমানে?

পরে শুনবে?

আপনি বলুন এখনই শুনি।

বিদ্যুৎ ইতস্তত: করল, প্রিয়ন্তী আর কোন আগ্রহ দেখাল না।

কয়েকদিন কেটে গেল। প্রিয়ন্তী খেয়াল করেছে বিদ্যুৎ প্রায় সব সময় কাছাকাছি থেকে তাকে অনুসরণ করে। বেশিরভাগ সময় তার সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করে, ইতোমধ্যে মোটর সাইকেলে করে দিনাজপুর কিংবা স্বপ্নপুরী বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে। বিষয়টি সবাই দেখলেও সবাই যেন বিদ্যুৎকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু প্রিয়ন্তী কাউকে কিছু বলেনি সে এই অবস্থার শেষ দেখতে চায়।

অবশেষে প্রিয়ন্তী যেদিন পার্বতীপুর থেকে তাদের গ্রামের বাড়ি ফিরবে সেদিন প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ পেল। অঞ্জনা আর জামাই বাবু প্রিয়ন্তীকে তাদের ঘরে ডাকল। প্রিয়ন্তী প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না।

জামাই বাবুই প্রথমে কথা তুলল, প্রিয়ন্তী কথাটা তোকে আরো আগে বলা উচিত ছিল কিন্তু আজকাল, আজকাল করে বলা হয়নি।

কী কথা জামাই বাবু?

আমাদের বিদ্যুৎ আছে না, ওর সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যাপারে আমরা একটা চিন্তা-ভাবনা করেছি। বাবা-মা সবার সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাঁরাও এ বিয়েতে রাজি আছে।

প্রিয়ন্তী যেন আকাশ থেকে পড়ল, বিদ্যুৎ দা’র সঙ্গে বিয়ে আমার!

অঞ্জনা বলল, হ্যাঁ, তোর সঙ্গে ঠাকুরপোর বিয়ে হলে খুব ভালো হবে, চেহারা দেখিস না একেবারে রাজপুত্রের মতো। আমরা দু’বোন এক সঙ্গে থাকবো।

প্রিয়ন্তী এক মুহূর্ত ভেবে নিল তারপর বলল, দিদি আমার তো এখনো লেখাপড়াই শেষ হয়নি। আগে লেখাপড়া শেষ করি তারপর না হয় বিয়ের কথা হবে।

জামাই বাবু বলল, ওর বিয়ের জন্য কনে দেখা হচ্ছে তো, অনেক পণের প্রস্তাব আসছে কখন আবার বিয়ে হয়ে যায়, তাই আমি বলছিলাম আগে তোর সঙ্গে বিয়েটা হয়ে যেত তারপর তুই আবার পড়াশোনা করতিস?

হ্যাঁ তোর জামাই বাবু তো ঠিকই বলেছে, অঞ্জনা জামাই বাবুর কথাকে সমর্থন করল।

প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে বলল, না দিদি আমি আগে লেখাপড়া শেষ করব, তারপর বিয়ে।

অঞ্জনা বলল, সবার সঙ্গে কথাবার্তা এক রকম পাকাপাকিই ছিল, ভেবেছিলাম তুই রাজি হবি। না তুই রাজি হলি না, এরকম ধনী পরিবারের রাজপুত্রের মতো ছেলের জন্য কি মেয়ের অভাব হবে?

প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, আমিও তো তাই মনে করি দিদি, দাদার জন্য ভালো মেয়ের অভাব হবে না। আর তুমিও একজন নতুন জা পাবে।

থাক, থাক তোকে আর বলতে হবে না। দেখি কত বড় ঘরে তোর বিয়ে হয়?

প্রিয়ন্তী অঞ্জনার কথার কোন প্রতিবাদ করেনি, ধীর পদে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

 

পার্বতীপুর থেকে ফিরে রাতেই প্রিয়ন্তী সুশান্তকে ফোন করল, হ্যালো সুশান্ত।

প্রিয়ন্তী তুই কেমন আছিস? সুশান্তর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।

ভালো নেই রে।

কেন? কোন অসুখ করেছে?

আরে মরলে তো বেঁচেই যেতাম, তারচেয়ে অনেক বড় সমস্যা।

আমাকে বল।

অনেক বড় সমস্যা ফোন বলা যাবে না, কাল এসে আমি তোকে বলব, তুই ভালো আছিস?

ভালো নেই, তুই নেই সব সময় আমার শুধু তোর কথা মনে পড়ছিল, আমি এ ক’দিন নানান আজেবাজে স্বপ্ন দেখছি।

আজে-বাজে না, তুই সব ঠিক স্বপ্ন দেখেছিস?

প্রিয়ন্তী তুই কবে আসছিস?

আগামীকাল সকালের ট্রেনে।

আমি তোকে নিতে স্টেশনে আসবো?

আসিস।

পরদিন সকালের ট্রেনে প্রিয়ন্তী রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। ট্রেন যখন বিরামপুর ছেড়েছে তখন সুশান্ত ফোন করেছে, হ্যালো প্রিয়ন্তী।

হ্যাঁ সুশান্ত বল।

সুশান্ত মোবাইলে ট্রেনের শব্দ পেল তারপরও জিজ্ঞেস করল, ট্রেনে উঠেছিস তো, না?

হ্যাঁ।

এখন কোথায়?

বিরামপুর, কেবল ট্রেন ছাড়লো।

প্রিয়ন্তীর চোখের সামনে বার বার করে সুশান্তর ছবিটা ভেসে উঠছে। সুশান্ত গ্রাম্য উচ্চ বিত্ত পরিবারের ছেলে, দুই ভাই’র মধ্যে সে ছোট। বাড়িতে অনেক জমি-জমা আছে। প্রতিমাসে বাড়ি থেকে অনেক টাকা আসে কিন্তু তারপরও সুশান্ত টিউশনি করে। জিজ্ঞেস করলে বলে, টিউশনি করলে বিদ্যাচর্চা থাকে। লেখাপড়া শেষ করে যেভাবেই হোক তাকে একটা চাকরি জোগাড় করতে হবে আর চাকরি জোগাড় করতে চাইলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তো পড়তেই হবে সঙ্গে দু’য়েকটা টিউশনি করলে পড়ানোর প্রয়োজন নিজেকেও লেখাপড়া করতে হয়।

সুশান্ত সহজ-সরল, প্রিয়ন্তীর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস, প্রিয়ন্তী যদি কোন মিথ্যা কথাও বলে তবুও সে কোন প্রতিবাদ ছাড়াই বিশ্বাস করে। কোন কারণে প্রিয়ন্তী রাগ করলে সে অবোধ ছেলের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

সুশান্তর সামর্থ্যও আছে, সাধও আছে। প্রায়ই প্রিয়ন্তীসহ বেড়াতে যায়। যেদিন বাড়ি থেকে টাকা আসে বা টিউশনির টাকা পায় সেদিন দুজনে কোন ভালো একটা রেস্টুরেন্টে বসে খাবার খায়, আড্ডা দেয়। প্রিয়ন্তীকে কসমেটিক্সের দোকানে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের কসমেটিক্স কিনে দেয়। অনেক সময় প্রিয়ন্তী রেগে যায়, তখন সুশান্ত বলে, তুই রেগে গেলে আমার খুব ভালো লাগে, বুঝলি?

সুশান্তর মনটা উদার, মনের মধ্যে অহংকার বলে কিছু নেই, খুব সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারে। যে কারো বিপদে নিজের বিপদ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে প্রিয়ন্তীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সুশান্ত মোবাইল করেছে, প্রিয়ন্তী রিসিভ করল, হ্যালো সুশান্ত।

প্রিয়ন্তী তুই কোথায়?

নাটোর পার হলাম, আর বেশি সময় লাগবে না।

আমি স্টেশনে এসেছি, তুই ট্রেন থেকে নেমে আমাকে দেখতে পাবি।

এত আগে এসেছিস কেন?

ভাবলাম ট্রেন যদি আগে আসে।

প্রিয়ন্তী মনে মনে হাসলো, সুশান্ত জীবনে কোনদিন দেখেছিস, ট্রেন কখনো আগে আসে?

তাছাড়া সময় কাটছিল না, তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে, তাই আগে এলাম।

তাহলে আর কী করবি? বসে বসে ভগবানের নাম জপ কর।

 

পাঁচ

 

রাজশাহী রেল স্টেশন থেকে রিক্সায় দুজনে প্রিয়ন্তীর মেস পর্যন্ত এলো কিন্তু প্রিয়ন্তীর মুখে কোন কথা নেই। গম্ভীর মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। চোখ দু’টো টলমল করছে, বার বার করে সুশান্তর মুখের দিকে তাকাচ্ছে, তার মন বলছে সুশান্তকে এখনি সবকিছু বলবে কিন্তু মুখ আড়ষ্ট হয়ে আসছে।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর মনের অবস্থা বুঝে জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কী হয়েছে?

সুশান্ত তোর সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।

বল।

এখন না, বিকেলে নিরিবিলি কোথাও বসে বলব।

সুশান্তর মুখ শুকিয়ে গেল, খারাপ কিছু নয় তো।

খারাপ তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মনটা শক্ত করতে হবে।

প্রিয়ন্তী এখনি বল না, আমার খুব ভয় করছে।

প্রিয়ন্তী গম্ভীর গলায় বলল, ছেলেমানুষ এত ভয় পেলে কি চলে?

ততক্ষণে রিক্সা প্রিয়ন্তীর মেসের গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রিয়ন্তী রিক্সা থামতে বলল, আমি নেমে যাচ্ছি তুই বিকেল পাঁচটায় গেটে এসে আমাকে মিস কল দিস।

আচ্ছা ঠিক আছে।

 

বিকেলে দুজনে বের হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কোথায় যাবি?

তোকে বলেছি না, নিরিবিলি কোন জায়গায়।

এত কী কথা যে নিরিবিলি জায়গা দরকার?

খুব জরুরী না হলে তো তোকে এভাবে বলতাম না সুশান্ত।

তাহলে ভদ্রা পার্কে চল।

তাই চল।

সুশান্ত বলল, এই রিক্সা ভদ্রা পার্কে যাও।

অন্যদিন হলে রিক্সায় বসে প্রিয়ন্তী অনেক কথা বলতো, তার যেন কথার শেষ নেই। কথার মাঝে মাঝে একটু করে হাসতো। তার মুখে সব সময় হাসি লেগেই থাকে, যাকে বলে সদা হাস্য মুখ ইংরেজিতে স্মাইলিং ফেস কিন্তু আজ সেই হাস্যজ্জ্বল মুখের ওপর একটা গাঢ় কালো মেঘ ঢেকে দিয়েছে। সুশান্ত যতদিন থেকে প্রিয়ন্তীর সঙ্গে মেলামেশা করছে ততদিনে সে একবারও প্রিয়ন্তীকে আজকের মতো চিন্তিত দেখেনি তাই আজ প্রিয়ন্তীর এই অস্বাভাবিক আচরণ তাকে চিন্তিত করে তুলল। সে বার বার প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল কিন্তু প্রিয়ন্তী অনড়।

রিক্সা ভদ্রা পার্কের গেটে এসে দাঁড়ালো।

দুজনে রিক্সা থেকে নেমে ভিতরে ঢুকলও। পার্কে উত্তর দিকটায় গাছপালা একটু ঘন, সবাই নিরিবিলি কথা বলার জন্য পার্কের এই উত্তর দিকটাকেই বেছে নেয়। সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী দুজনে পার্কের গেট দিয়ে ঢুকে উত্তর দিকে গিয়ে ঘাসের ওপর বসল।

কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই। প্রিয়ন্তী কথাটা সুশান্তর কাছে কিভাবে উপস্থাপন করবে ভাবছিল।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কী হয়েছে?

প্রিয়ন্তী শুষ্ক হাসি হেসে বলল, না, তেমন কিছু না।

তাহলে তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? আমাকে বল?

আসলে তোকে বললে তুই কি মনে করবি বুঝতে পাচ্ছি না।

প্রিয়ন্তী মনে হয় তোর সঙ্গে আমার কেবল আজকেই পরিচয় হলো যে কিছু বলতে গিয়ে সংকোচ করছিস। কোন সংকোচ না করে বলে ফেল, যদি কোন সমস্যা হয় দুজনে সমাধান করতে হবে।

থ্যাঙ্ক ইউ সুশান্ত, আমি তোর কাছে এমন একটা কথাই আশা করছিলাম।

কী হয়েছে এখন বল তো?

প্রিয়ন্তী পার্বতীপুর তার দিদির ঠাকুরপো বিদ্যুতের কথা সুশান্তকে বলল।

সুশান্ত সবকিছু শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে রইল। তার মুখে কোন কথা নেই, তার হৃৎপিণ্ড যেন দ্রুত গতিতে চলছে, তার হৃৎপিণ্ডের ধড়াস ধড়াস শব্দ প্রিয়ন্তীকে আতঙ্কিত করে তুলল।

সুশান্ত বলল, তুই কি বিদ্যুতকে বিয়ে করবি?

প্রিয়ন্তী রেগে গেল, তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, তুই এমন কথা বলতে পারলি? তুই জানিস না তোকে ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করব না।

সরি প্রিয়ন্তী, তাহলে এখন কী করবি?

প্রিয়ন্তী আরো রেগে গেল, এখন কী করতে হবে তাও আমাকে বলে দিতে হবে, এজন্য অনেকদিন আগেই আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যদি কোনদিন কোন সাহসী ভূমিকা নিতে হয় তবে নিতে পারবি কি না?

পারবো, আমাকে কী করতে হবে তুই বল?

আমাকে বিয়ে করতে হবে।

করব।

তাহলে আয়োজন কর।

আমাদের বাড়িতে বলব।

না, বাড়িতে বললে কোন পক্ষই বিয়েতে রাজি হবে না।

কেন? আমি বিয়ে করতে চাইলে তারা রাজি হবে না কেন?

সুশান্ত এত সরল হলে চলে না, তুই বাড়িতে বললে পণের কথা জিজ্ঞেস করবে আর পণ পাবি না বলে তোকে আমাকে বিয়ে করতে দিবে না।

তাহলে এক কাজ করি, আমি আজকের রাতটা ভেবে দেখি, আমার বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করি তারপর যা হয় কাল করব।

সব বন্ধুদের সঙ্গে ঢাক ঢোল পিটিয়ে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই, তোর খুব ঘনিষ্ঠ দু’য়েকজন বন্ধুকে বললেই হবে।

আচ্ছা।

কী করলি আমাকে রাতেই জানাবি?

ঠিক আছে।

 

রাতেই মোবাইলে সব কথা হলো।  সবকিছু শুনে প্রিয়ন্তী খুশি হলো, সুশান্ত এতদিনে তোর বুদ্ধি খুলেছে। সিদ্ধান্ত হলো পরদিন প্রিয়ন্তী তার দু’বান্ধবী আর সুশান্ত তার দু’বন্ধুকে নিয়ে মন্দিরে যাবে, সেখানে তাদের বিয়ে হবে। তাদের বিয়ের ব্যাপারটা আপাতত: গোপন থাকবে কিন্তু একটা ব্যাপার প্রিয়ন্তীর মাথায় ঢুকল না। মাথায় সিঁদুর পরলে বিয়ের ব্যাপারটা গোপন থাকবে কী করে?

মন্দির থেকে ফেরার পর সিঁদুর মুছে ফেলবি।

প্রিয়ন্তী বুকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল, সিঁদুর মুছে ফেলবো, হিন্দু মেয়েদের সিঁদুরই সব। আমরা দুজনে যে পুরো সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছি তা তো শুধু সিঁদুরের জন্যই, আর সিঁদুরটাই মুছে ফেলবো!

আচ্ছা ঠিক আছে তুই যখন চাচ্ছিস না তখন না হয় সিঁদুর পরবি না।

তা কি করে হয় তুই আমাকে বিয়ে করবি আর সিঁদুর পরাবি না।

সুশান্ত বলল, প্রিয়ন্তী আগে মন্দিরে যাই, বিষয়টা ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ করি তারপর না হয় সিদ্ধান্ত হবে।

তবে খেয়াল রাখিস সুশান্ত তোর পরিয়ে দেয়া সিঁদুর আমি মুছতে পারবো না।

সিঁদুর পরানো নিয়ে সুশান্ত আর প্রিয়ন্তীর মধ্যে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল তা কেটে গেল। সুশান্তর এক বন্ধু ঠাকুরকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে বিনয়ের সঙ্গে কি যেন বলল, কিন্তু ঠাকুর তার কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন। এখন তো কার্তিক মাস হিন্দু ধর্মে সংস্কার বলে অনেক কিছু আছে, সবকিছুকে অবহেলা করলে সমাজের অমঙ্গল হবে।

পরে অবশ্য ঠাকুর বিয়ে পড়ালেন ঠিকই কিন্তু বললেন, আগামী মাসে আরেকবার এসো আমি বিয়ে পড়িয়ে দিব।

এই বিয়ের না থাকলো কোন সামাজিক স্বীকৃতি, না থাকলো কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি উভয়ে পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রীর মর্যাদায় আসন দিলেও প্রিয়ন্তীর চলাফেরা থাকলো ঠিক আগের মতোই শাঁখা সিঁদুর ছাড়া অবিবাহিত মেয়ের মতোই। দুজনে বসবাস করতে লাগল ঠিক আগের মতোই, সুশান্ত তার মেসে আর প্রিয়ন্তী তার মেসে।

সুশান্তর সঙ্গে প্রিয়ন্তীর দ্বিতীয়বার বিয়ের ঘটনাটা অন্যরকম আইন সম্মত কিন্তু তাতেও সমাজের স্বীকৃতি নেই। সমাজের স্বীকৃতি যেন একেবারে সংস্কারে বাঁধা। সমাজে মানুষের অধিকারের চেয়ে সংস্কারের মূল্য অনেক বেশি।

 

ছয়

 

তিন ভাই বোনের মধ্যে প্রিয়ন্তী সবার ছোট। প্রিয়ন্তীর একমাত্র ভাই অরুণ চক্রবর্তী লেখাপড়ায় তেমন ভালো ছিল না। তাই বাবা দীপক চক্রবর্তী তাকে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার পর নিজের ব্যবসার কাছে লাগিয়ে দিয়েছে। অরুণ লেখাপড়ায় ভালো না হলেও ব্যবসায় অতি অল্প বয়সে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অরুণের সহযোগিতায় দীপকের ব্যবসায় উত্তরোত্তর উন্নতি হতে শুরু হয়েছে।

দীপকের একান্ত ইচ্ছা ছিল ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে শিক্ষিত করে তুলবে কিন্তু অঞ্জনার বিয়ে আর অরুণ পড়াশোনায় মনোযোগী না হওয়ায় দু’জনের লেখাপড়ায় দ্রুত সমাপ্তি ঘটেছে। তাই দীপকের একান্ত ইচ্ছা প্রিয়ন্তীকে লেখাপড়া শিখিয়ে অনেক বড় করে তুলবে।

প্রিয়ন্তীর গায়ের রং ফর্সা যেন দুধে আলতা, মুখের গড়ন সুন্দর, চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত ঝুলানো, যেন বাতাসে দোল খায়, ভদ্র, কথাবার্তায় কোন জড়তা নেই, সর্বদাই হাস্য মুখ। তার সৌন্দর্য আর গুণাবলী যেন শত মেয়ের মধ্যেও দৃষ্টি কাড়ে, তার এই সৌন্দ্যের্যের জন্য দীপক বাবুকে মাঝে মাঝে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। কলেজ যাওয়া আসার পথে যে কেউ প্রিয়ন্তীকে দেখলেই দীপক বাবুর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়, কেউ কেউ বলে মেয়ে মানুষ বয়স কম থাকতেই বিয়ে দেয়া ভালো পরে বয়স বেশি হলে সবাই ধাড়ী মেয়ে বলে, বিয়ে দেয়া কঠিন হবে। দীপক বাবু প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে অনেক বড় অফিসার বানাবার স্বপ্ন দেখে। দেখতে সুন্দর বলে প্রিয়ন্তীকেও অনেক বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। প্রিয়ন্তী তার মোবাইল নাম্বার খুব সহজে কাউকে দেয় না তারপরও মোবাইল রিচার্জ করার সময় বা যে কোনভাবে কেউ তার নাম্বার পেলে ঘন ঘন মোবাইল করে, কেউ বা প্রেম করার প্রস্তাব দেয় আবার কেউ কেউ সরাসরি বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। প্রিয়ন্তী এসব প্রস্তাব খুব মার্জিতভাবে এড়িয়ে যায়।

অন্য সবার মতো প্রিয়ন্তী সুশান্তর ভালোবাসার প্রস্তাব এড়িয়ে যেতে পারেনি। প্রথম দেখায় সুশান্ত যেন তার মনের মধ্যে একটা অন্য ধরণের রোমাঞ্চকর অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল তখন সে তাকে না করতে পারেনি। তারপর দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠে, যা শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত গড়ায়। রাষ্ট্রীয় কিংবা সমাজ ব্যবস্থায় তাদের বিয়ে স্বীকৃত হোক বা না হোক তারা দুজনে পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রীর আসনে স্থান করে দিয়েছে। প্রিয়ন্তীর কোন কিছু খেতে গেলেই সুশান্তর কথা মনে পড়ে কিন্তু এ বাড়িতে তাদের লুকিয়ে বিয়ের কথা বলার সুযোগ নেই। বাবা-মা প্রিয়ন্তীর লেখাপড়া বন্ধ করে দিবে, ঘরে বন্ধ রেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের পছন্দ করা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবে।

আজ যেন বিকেলটা হচ্ছেই না। দুপুরের সূর্যটা কেমন যেন মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

প্রিয়ন্তী সকালবেলা তার পছন্দের কয়েকটা খাবারের কথা তার মাকে বলেছে। সে নিজেও রান্নার কাজে তার মাকে সহযোগিতা করছে।

তার মা একবার জিজ্ঞেস করল, তোর আবার হঠাৎ করে কী হলো? তুই তো কোনদিন খাবার-দাবারের ব্যাপারে কিছু বলতিস না, এবার পূজায় আবার এতকিছু বলছিস কেন?

প্রিয়ন্তী বলল, মা আমি এখন কলেজে পড়ছি আমার বন্ধু-বান্ধব অনেককেই ইনভাইট করেছি, কেউ কেউ আসতেও তো পারে?

ঠিক আছে মা, তোর যা যা ইচ্ছা তৈরি কর।

প্রিয়ন্তী মনে মনে বলল, আমার বন্ধু-বান্ধব বলতে তো একজনই মা, ঐ একজনকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করলে আমার আর কিছু লাগবে না।

 

সুশান্ত মোটর সাইকেল নিয়ে পূজা মণ্ডপে এলো বিকেল তিনটায়। পূজা মণ্ডপের কাছে স্ট্যান্ড করেই প্রিয়ন্তীকে মোবাইল করল।

প্রিয়ন্তী মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো সুশান্ত তুই কোথায়?

আমি তো তোদের পূজা মণ্ডপের কাছে।

দাঁড়া আমি আসছি।

প্রিয়ন্তী এক রকম দৌড়ে মণ্ডপের কাছে এলো, সুশান্ত।

প্রিয়ন্তী কেমন আছিস?

ভালো, তুই?

ভালো।

আয় ভিতরে আয়, বলে প্রিয়ন্তী এগিয়ে চলল।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর পিছনে পিছনে বাড়ির ভিতরে গেল।

প্রিয়ন্তী তার মা’র সঙ্গে সুশান্তর পরিচয় করে দিল।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর মাকে প্রণাম করল।

প্রিয়ন্তীর মা সুশান্তর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করল, দীর্ঘজীবী হও বাবা।

সুশান্ত মাথা নত করে সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

প্রিয়ন্তীর মা বলল, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন বাবা? বসো।

সুশান্ত চেয়ারে বসল।

প্রিয়ন্তীর মা জিজ্ঞেস করল, তোমার বাড়ি কোথায় বাবা?

সুশান্ত তার গ্রামের নাম বলল।

ঐ গ্রামের শঙ্কর ঠাকুর মশাইকে তুমি চেনো?

হ্যাঁ, আমাদের বাড়ি একই পাড়ায়।

তোমার বাবার নাম কী?

মহেশ দত্ত।

প্রিয়ন্তীর মা হঠাৎ করেই মুখ কালো করল, তোমরা বসো বাবা, আমি জলখাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি, বলে সে চলে গেল।

সুশান্ত কয়েক মুহূর্ত প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, কী রে কতগুলো মণ্ডপ ঘুরলি?

কই আর ঘুরলাম?

কই ঘুরলাম মানে? তুই কি ঘরে বসে থাকার মতো ছেলে?

হ্যাঁ আমি ঘরে বসে থাকার মতো ছেলে না, গ্রামের বাড়ি এলে দাদার মোটর সাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা করি, তবে এবারে ঘুরিনি।

কেন?

সুশান্ত প্রিয়ন্তী বলে থেমে গেল তার মুখ আড়ষ্ট হয়ে গেল।

প্রিয়ন্তী বলল, কী রে বল, থামলি কেন?

সুশান্ত মৃদু কণ্ঠে বলল, প্রিয়ন্তী চল না কাল এক সঙ্গে পূজা দেখি, আমি সেজন্য বউদিকে বলে দাদার কাছ থেকে মোটর সাইকেলটা নিয়েছি।

প্রিয়ন্তী বলল, সুশান্ত তোর মাথা খারাপ হয়েছে, বাবা আমাকে তোর সঙ্গে মোটর সাইকেলে যেতে দিবে?

তুই কি বলে যাবি নাকি?

সরি সুশান্ত বাবার কাছে আমি কিছু লুকাই না।

সুশান্ত আর কিছু বলল না। কোন কিছু বলতে গিয়ে সে যেন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ল। সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

সুশান্ত তুই বস আমি খাবার নিয়ে আসছি, বলে প্রিয়ন্তী চলে যাচ্ছিল সুশান্ত বলল, প্রিয়ন্তী তুই একটু বস না, তাড়াতাড়ি বিদায় করতে চাচ্ছিস কেন?

না বিদায় করতে চাইব কেন? খেতে খেতে গল্প করব, খাওয়ার পরও গল্প করব।

প্রিয়ন্তীকে আর উঠতে হলো না। কিছুক্ষণ পর প্রিয়ন্তীর মা কাজের মেয়েকে দিয়ে জলখাবার পাঠিয়ে দিল।

খেতে খেতে দু’জনে অনেকক্ষণ গল্প করল। তারপর একবার সুশান্ত একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, প্রিয়ন্তী তুই তাহলে কাল কখন আসছিস?

তোকে মোবাইলে জানিয়ে দিব। বাবাকে বলতে হবে তো।

যেতে দিবে তো আবার?

এমনিতেই দিত না, পূজা বলে যেতে দিবে।

আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে উঠি।

 

সাত

 

আজ বিজয়া দশমী। সকাল থেকে সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে কয়েকবার মোবাইল করেছে, কি রে কখন আসছিস? নাকি আমি গিয়ে নিয়ে আসবো?

না রে আমাকে নিতে আসতে হবে না। আমি নিজেই যেতে পারবো।

বিকেলবেলা প্রিয়ন্তী বাবাকে পূজা দেখার কথা বলে বের হলো। প্রিয়ন্তীদের বাড়ি থেকে সুশান্তদের বাড়ি আলাদা আলাদা উপজেলায় দূরত্ব বেশ কয়েক কিলোমিটার। বাড়ির অদূরে রাস্তায় যেতেই একটা রিক্সা ভ্যান পেয়ে প্রিয়ন্তী উঠে বসল। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রিয়ন্তী সুশান্তদের বাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছে গেল।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর সামনে এসে দাঁড়ালো, প্রিয়ন্তী ভিতরে আয় বউদি তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

তারমানে তুই আমার সম্পর্কে বউদিকে কিছু বলেছিস?

হ্যাঁ বউদিকে বলেছি প্রিয়ন্তী নামে আমার এক বন্ধু আছে।

বউদি কী বলেছে?

তোকে দেখতে চেয়েছে, আমাকে কয়েকবার করে বলল, ঠাকুরপো মেয়েটার হেঁটে আসতে কষ্ট হবে তো, যাও না মোটর সাইকেলটা নিয়ে।

তুই কী বললি?

আমি বললাম, মেয়েটা একটু গোঁড়া টাইপের সে আমার মোটর সাইকেলে উঠবে না।

প্রিয়ন্তী মনে মনে বলল, যে মেয়ে একাই বরের সঙ্গে গিয়ে মন্দিরে বিয়ের মন্ত্র পড়তে পারে সে আর গোঁড়া!

কথা বলতে বলতে প্রিয়ন্তী সুশান্তর সঙ্গে তাদের বাড়ির ভিতরে গেল।

বউদি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সুশান্তর সঙ্গে প্রিয়ন্তীকে ঢুকতে দেখে সামনে এগিয়ে এলো।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে পরিচয় করে দিল, বউদি এ হচ্ছে প্রিয়ন্তী আমরা এক সঙ্গে পড়ি আর প্রিয়ন্তী আমার বউদি, বাসন্তী।

প্রিয়ন্তী বাসন্তীকে প্রণাম করল।

বাসন্তী প্রিয়ন্তীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ঠাকুরপো তোমার পছন্দ আছে, আগে থেকেই তুমি প্রিয়ন্তীর খুব প্রশংসা করতে, কাল যখন দুর্গা দেখতে যাওয়ার জন্য মোটর সাইকেল চাইলে তখন মনে হলো তুমি বুঝি দুর্গা দেখতে যাচ্ছ কিন্তু আজ দেখি তুমি শুধু দুর্গা দেখে আসোনি একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ। মা এদিকে এসে একবার দেখে যান ঠাকুরপো একেবারে সাক্ষাৎ দুর্গা নিয়ে এসেছে।

প্রিয়ন্তী লজ্জায় সংকুচিত হয়ে গেল।

প্রিয়ন্তী বসো, ঠাকুরপো তুমি বসো, গল্প করো আমি খাবার নিয়ে আসছি, বলে বাসন্তী চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর সুশান্তর মা এলো। সেও প্রিয়ন্তীর খুব প্রশংসা করল। কথায় কথায় বলল, তুমি বুঝি লেখাপড়ায় খুব ভালো মা, আমার গাধাটাকে তো কোনদিন লেখাপড়া করতে দেখি না।

প্রিয়ন্তী কিছু বলল না, সুশান্ত বলল, প্রিয়ন্তী তুই বল আমি কি লেখাপড়া করি না?

প্রিয়ন্তী বলল, না মাসী ও তো কলেজে ভালো লেখাপড়া করে।

সুশান্তর এক প্রতিবেশী বউদি আছে, সে তাকে খুব স্নেহ করে কিন্তু তার স্নেহের মাঝে যেন এক ধরণের মাধুর্য আছে। সবকথা উল্টা করে বলে সুশান্তকে ক্ষেপানোর জন্য কথা বলে। সে কাছে এলো, আপনাদের মুখে এতক্ষণ যা শুনলাম তাতে তো মনে হচ্ছিল এ বাড়িতে স্বয়ং দুর্গা এসেছে, এখন যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে দুর্গার রূপ সম্পর্কে ঠাকুরপোর কোন ধারণাই নেই।

সুশান্ত বলল, দুর্গা না হোক তোমার চেয়ে তো ভালো। তোমাকে দেখলে তো বউদি পরিচয় দিতে-

কী এত বড় কথা? আজ তোমার দাদা আসুক তারপর বলব, বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।

সুশান্ত মুখ কালো করে বসে রইল। সুশান্তর মা রাগান্বিত চোখে তার সেই প্রতিবেশী বউদির দিকে তাকিয়েই বিষয়টা হালকা করার জন্য একরকম হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, বউমা তোমরা বউদি আর ঠাকুরপো মিলে বাড়িতে যত ইয়ার্কিই করো না তাতে কিছু যায় আসে না কিন্তু প্রিয়ন্তী আজই প্রথম এ বাড়িতে এলো ওর সামনে কি সব কথা বলা দরকার আছে?

প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, না মাসীমা আমি কিছু মনে করিনি। আসলে বউদির সঙ্গে সুশান্তর সম্পর্কটা খুব ভালো তাই ইয়ার্কি-ফাজলামিটা একটু বেশি হয়।

ও প্রিয়ন্তী, তুমি ছোট মানুষ-

বউদির কথা শেষ হওয়ার আগেই সুশান্তর মা রাগান্বিত চোখে তাকাল।

বউদি বলল, আপনি কিছু মনে করবেন না, মেয়েটা একদিন এ বাড়ির বউ হবে ওকে তো সবকিছু বলতে হবে আমরা সবাই মিলে এ বাড়িতে এবং পাশের বাড়িতে কেমন একটা আনন্দময় সময় উপভোগ করি তাও তো জানতে হবে।

সুশান্তর মা চেয়ার থেকে উঠল, বউমা তুমি আমার সঙ্গে এসো তো, মেয়েটা অনেকদূর থেকে এসেছে আগে কিছু খেতে দিই, শুকনা মুখে চিড়া ভিজালে তো চলবে না। না হলে সেও আবার তোমাকে ছেড়ে কথা বলবে না।

না মা তা বলবে না প্রিয়ন্তী খুব শান্ত-শিষ্ট মেয়ে, দেখেন না তার মুখের ওপর একটা কেমন সাদাসিধে প্রকৃতির ছাপ আছে। তা সুশান্ত তোমাকে পটিয়েছে ভালোই, না হলে তোমার মতো একটা সুন্দর, শান্ত-শিষ্ট, বুদ্ধিমতী মেয়ে সুশান্তর মতো একটা ছেলের প্রেমে পড়বে কেন? ভগবানের এই এক নিষ্ঠুরতা, সুন্দর ছেলেরা পাবে অসুন্দর মেয়ে আর খুব ভালো মেয়েরা পাবে খারাপ স্বামী।

সুশান্তর মা আবার বলল, এসো তো বউমা।

সুশান্তর মা আর তার প্রতিবেশী বউদি চলে গেল।

প্রিয়ন্তী সুশান্তকে বলল, তোর এই বউদি বুঝি তোর সঙ্গে খুব ইয়ার্কি করে।

সুশান্ত একটা ঢোক গিলে বলল, হ্যাঁ, একটু বেশি কথাও বলে।

তবে বউদি কিন্তু অনেক ইয়ার্কি-ফাজলামির মধ্যে একটা সত্য কথা বলে ফেলেছে।

সুশান্তর বুক কেঁপে উঠল। সে চুপ করে রইল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, এই সুশান্ত কী ভাবছিস?

না ভাবছি বউদির কোন কথাটা তুই সত্য বলে মনে করছিস?

আরেকদিন বলব।

বউদি খাবার নিয়ে এসে টেবিলে খাবারের ট্রে রাখতে রাখতে বলল, সুশান্ত আমাকে বলে ওর দাদার কাছ থেকে মোটর সাইকেল নিয়ে গেল, আমি মনে করেছিলাম তুমি ওর সঙ্গে মোটর সাইকেলে চলে আসবে।

না বাবাকে বলা হয়নি তো, তাই কাল আসতে পারিনি।

হ্যাঁ মেয়েদের আবার অনেক কিছু মেনে চলতে হয়, এখন বাবার অনুমতি নিতে হচ্ছে, এরপর ঠাকুরপো’র অনুমতি নিতে হবে, তারপর ছেলে বড় হলে ছেলেদের অনুমতি নিতে হবে। সারাজীবনই যেন শিকলে বাঁধা।

বাঁধা বলছেন কেন বউদি এটাই তো সমাজের নিয়ম, তাছাড়া মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপার তো আছেই।

সেই প্রতিবেশী বউদি আবার এলো, তবে তোমার নিরাপত্তার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো, এই গ্রামে এমন কেউ নেই যে আমাদের ঠাকুরপো’র বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে, ওর হাড় গুঁড়া করে দিবে।

প্রিয়ন্তী অভিমানের সুরে বলল, কারো হাড় কোনদিন গুড়া করেছে নাকি বউদি?

না করেনি তবে ও কারো হাড় গুড়া করতে পারে এই ভীতিটা সবার মনে আছে। তুমি বোধ হয় জানো না বোকারা একবার খেপলে তাকে আর থামানো যায় না।

বউদি এটা কিন্তু আপনি অন্যায় বললেন, সুশান্ত বোকা না, শান্তশিষ্ট।

বাঃ, বাঃ এত তাড়াতাড়ি তো বেশ ভালোবাসা জম্মেছে।

বউদি বলল, সে চিন্তা তোমার নেই প্রিয়ন্তী কারণ সে কোনদিন তোমার হাড় গুঁড়া করবে না তবে কারো কারো হাড় গুঁড়া করার মতো তো কাউকে চাই।

তোমরা বসো আমার একটু কাজ আছে, বলে প্রতিবেশী বউদি চলে গেল।

বউদি পাশে থেকে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল, তুমি কিছু মনে করো না প্রিয়ন্তী ও সব সময় সুশান্তর সঙ্গে একটু খোঁচা মেরে কথা বলে তো। অভ্যাসটাই এরকম।

প্রিয়ন্তী মৃদু হেসে বলল, না আমি কিছু মনে করিনি বউদি।

তোমরা বসো, গল্প করো, আমি চা নিয়ে আসছি, বলে বউদি চলে গেল।

সুশান্ত বলতে শুরু করল, বউদির বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো তো তাই একটু অহংকারী। আসলে বউদি আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না কারণ আমি কোন দোষ পেলে মুখের ওপর স্পষ্ট করে বলি।

সুশান্ত স্পষ্ট কথা বলা ভালো কিন্তু অনেক সময় স্পষ্ট কথা বিপদ ডেকে আনে।

বউদি চা নিয়ে এলো।

তুমি কীভাবে এসেছ প্রিয়ন্তী?

ভ্যানে।

কেন তুমি ঠাকুরপো’কে মোবাইল করলে তো পারতে?

প্রিয়ন্তী কিছু বলল না।

সুশান্তর মুখে যেন একটা আনন্দের আভা ফুটে উঠল।

বউদি বলল, সুশান্ত তুমি কিন্তু প্রিয়ন্তীকে নামিয়ে দিয়ে এসো।

সুশান্ত বলল, ঠিক আছে।

 

প্রিয়ন্তী সুশান্তর মোটর সাইকেলে উঠল। সে মাত্র ক’দিন আগে মোটর সাইকেল চালাতে শিখেছে, কখনো মোটর সাইকেল যাচ্ছে দ্রুত গতিতে আবার কখনো হঠাৎ ব্রেক কষছে। তারওপর প্রিয়ন্তীর মতো সুন্দর মেয়েকে মোটর সাইকেলে চড়াতে পেরে সে যেন নিজেকে নায়ক ভাবতে শুরু করেছে। কিছুদূর যাওয়ার পর সুশান্ত বলল, প্রিয়ন্তী চল না কয়েকটা পূজা মণ্ডপ ঘুরে দেখি?

রাত হয়ে যাবে না তো?

না রাত হবে কেন? আমি তোকে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়িতে রেখে আসবো।

প্রিয়ন্তী আর কিছু বলল না।

সুশান্ত আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। দ্রুত গতিতে মোটর সাইকেল চালাতে লাগল। প্রিয়ন্তী একবার বলল, সুশান্ত একটু আস্তে চালা।

তুই আমার ওপর ভরসা রাখ, কিছু হবে না।

দু’জনে কয়েকটা পূজা মণ্ডপ দেখার পর সুশান্ত যখন মোটর সাইকেল নিয়ে প্রিয়ন্তীর বাড়ির কাছে পৌঁছাল তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। রাস্তার মোড়ে এসে প্রিয়ন্তী বলল, তুই যা সুশান্ত আমি এটুকু রাস্তা একাই যেতে পারবো।

আমি তোকে বাড়িতে দিয়ে আসি?

প্রিয়ন্তী কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল, সুশান্ত আমি গতকাল তোকে কী বলেছিলাম?

ঠিক আছে প্রিয়ন্তী তুই বাড়িতে পৌঁছে আমাকে রিং দিস।

তুই মোটর সাইকেলে থাকতে আমি তোকে রিং দিব না সুশান্ত, তুই বাড়িতে গিয়ে আমাকে রিং দিস, তুই কিন্তু ভালো মোটর সাইকেল চালাতে পারিস না, সাবধানে যাবি।

আচ্ছা।

 

আট

 

দুর্গা পূজা শেষ হয়েছে। এবার দুজনেরই রাজশাহী ফেরার পালা। আগামীকাল বরেন্দ্র এক্সপ্রেসে সুশান্ত উঠবে  ফুলবাড়ি আর প্রিয়ন্তী বিরামপুর একই স্টেশনে উঠলে আবার কথাটা দুজনেরই গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারে। তারপর দুজনে এক সঙ্গে গল্প করতে করতে রাজশাহী পৌঁছাবে। প্রিয়ন্তীদের বাড়ির অদূরে একটা সুপারি বাগান আছে, সেই বাগানের এক কোণায় একটা সিমেন্ট কংক্রিটের বেঞ্চ বানানো হয়েছে অনেক আগে, যখন এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি তখন গরমের দিনে অনেকেই বসে আড্ডা দিত। আজকাল আর কেউ তেমন একটা বসে না। গতকাল প্রিয়ন্তী সেই বেঞ্চের ওপর বসে সুশান্তর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলল। যেন কথার শেষ নেই।

বিজয়া দশমীর দিন বজ ঠাকুর সুশান্তর সঙ্গে কথা বলেছিল, তুমি কে বাবা?

আমার নাম সুশান্ত।

সুশান্ত কি? নামের শেষে একটা পদবি আছে না?

সুশান্ত দত্ত।

বজ ঠাকুর মুখ আংশিক বিকৃত করল, ও তাহাই বলো, তোমার বাড়ি কোন গ্রামে?

সুশান্ত তার গ্রামের নাম বলল।

প্রিয়ন্তী তোমার কে হয়?

আমার ফ্রেন্ড, আমরা একসঙ্গে পড়ি।

ও তাহাই বলো, বলে বজ ঠাকুর ফিসফিস করে চাপাস্বরে কী যেন বলতে বলতে চলে গিয়েছিল।

প্রিয়ন্তী সুশান্তর সঙ্গে কথা বলে বাড়িতে ঢুকবে এমন সময় ঠাকুর ঘরের কাছে বজ ঠাকুরের দেখা। হয়ত বজ ঠাকুর প্রিয়ন্তীর সঙ্গে কথা বলার জন্যই দূর থেকে দেখছিল। প্রিয়ন্তী কাছে যেতেই তাকে ডাক দিল, প্রিয়ন্তী।

প্রিয়ন্তী দাঁড়ালো, বলুন ঠাকুর মশাই।

তুমি এখন বড় হইয়াছ, অনেক বেশি লেখাপড়া শিখিয়াছ তোমাকে নতুন করিয়া কিছু বলিতে হইবে এমন জ্ঞান আমার নাই। তবুও একটা কথা না বলিলেই নয়।

কী ঠাকুর মশাই?

এতক্ষণ কাহার সহিত কথা বলিলে মা?

প্রিয়ন্তীর সমস্ত শরীর রাগে রি রি করে উঠল, সে অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে বলল, আমার এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে।

তা বেশ, তা বেশ। আজকাল এই মোবাইল নামক যন্ত্রটা আসিয়া পৃথিবীতে অনাচার আরো বাড়িয়া গিয়াছে, সেইদিন তোমার সহিত একটা ছেলে আসিয়াছিল, নামটা কি যেন, সুশান্ত দত্ত।

আমার ফ্রেন্ড।

রাজশাহীতে থাকে, না?

হ্যাঁ আমরা একসঙ্গে পড়ি।

আমি ছেলেটিকে চিনি, তাহার বাবা-মা’সহ গুষ্ঠি সুদ্ধ চিনি। তাহাদের বংশে তেমন খারাপ কেউ নেই। আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে যতটুকু জানি মন্দ না। কিন্তু হিন্দু ধর্মে গোত্র-বর্ণ বলিয়া একটা কথা আছে, তোমরা হইলে চক্রবর্তী, জাতে বামুন আর সুশান্ত দত্ত কী তাহা তো তুমি বুঝিতেই পাইতেছ।

প্রিয়ন্তীর বুক ধক করে উঠল, সে প্রচণ্ড রেগেও গেল, ঠাকুর মশাই দয়া করে আপনি আর এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলবেন না।

বজ ঠাকুর রাম, রাম বলতে বলতে মন্দিরের দিকে গেল।

বজ ঠাকুরের প্রশ্নবাণ এ পর্যন্ত শেষ হলেই ভালো হতো কিন্তু না, কথাটা এ পর্যন্তই থেমে থাকলো না। তার প্রশ্নবাণের প্রতিফলন ঘটল তার বাবা-মা’র গম্ভীর কালো মুখের প্রতিচ্ছবিতে। প্রিয়ন্তী রওয়ানা দেওয়ার জন্য কাপড়-চোপড় পরে যখন তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল তখন বাবা তার হাতে টাকা দিল একটা কথাও বলল না। অন্যান্য বার বাবা তাকে সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে নানান কথা বলতো।

প্রিয়ন্তী বলল, বাবা তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?

না।

তার না বলার ভঙ্গীতে বোঝা গেল তার মনের মধ্যে প্রচণ্ড রাগ আর ক্ষোভের মেঘ জমাট বেঁধেছে। এই গাঢ়, কালো জমাট মেঘ দূরীভূত না করে তার চলে যাওয়া ঠিক হবে না। সে তার বাবার পাশে বসল, বাবা কী হয়েছে? আমাকে বলোতো?

দীপক বাবু বলল, আমি তোকে রাজশাহীতে লেখাপড়া করতে পাঠিয়েছি কিন্তু এখন আমার আশংকা হচ্ছে তুই লেখাপড়া শেষ করতে পারবি কি না।

বাবা বজ ঠাকুর তোমাকে কিছু বলেছে?

শুধু বজ ঠাকুর বলবে কেন? আমি নিজে কি কিছু বুঝি না? সেজন্য একবার তোর বিয়ে দিতে চাইলাম, না তুই বিয়ে করবি না। ভালো কথা বিয়ে করবি না লেখাপড়া করবি কিন্তু এখন যা দেখছি তোর বিয়ে করতে না চাওয়ার কারণটা অন্য।

প্রিয়ন্তীর বড় মুখ করে কথা বলার কিছু নেই। সে মাথা নত করে বসে রইল।

দীপক বাবু বলল, তোর ইচ্ছা তুই লেখাপড়া শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হবি, আমারো ইচ্ছা তাই কিন্তু কোনদিন যদি এর ব্যতিক্রম ঘটে তবে আর আমার সামনে এসে দাঁড়াবি না।

প্রিয়ন্তী জানে তার বাবার ইচ্ছার ব্যতিক্রমটা কী? সে তার বাবাকে চিনে, খুব সহজ-সরল কিন্তু কোন বিষয়ে একবার বাঁকা হলে তাকে আর সোজা করার মতো কেউ নেই। প্রিয়ন্তী বুঝতে পারল সুশান্ত আর তার সম্পর্ককে বাবা কোনভাবেই মেনে নিবে না। এমনকি কোনদিন বাবার সামনে এসে সেকথা বলাও যাবে না। আবার সুশান্তকে সে ঠাকুর সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছে, সিঁথিতে সিঁদুর নেই মনের সিঁদুরটা যেন তাকে বাবা-মা’র স্নেহ ভালোবাসা, পুরোহিতের নীতিবাক্য, সমাজের অনাচার জ্ঞান সমস্ত কিছু থেকে আলাদা করেছে।

প্রিয়ন্তী আর কথা বাড়ালো না। সে বাবার পা ছুঁয়ে বলল, আমার জন্য আশীর্বাদ করো বাবা।

সবাই তখন বাইরে রিক্সা ভ্যানের ওপর তার ব্যাগ চাপিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। মা’র চোখের পানি গণ্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। দীপক বাবুর একটা চাপা অশ্রু নিরুদ্ধ কণ্ঠে বুক চিরে বেরিয়ে এলো, ভালো থাকিস মা।

স্টেশনে এসে বেশিক্ষণ দেরি করতে হলো না। কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন এলো। ট্রেন পুরোদমে না থামতেই প্রিয়ন্তীর চোখে পড়ল একটা লাল শার্ট পরা হাত কাকে যেন ইশারায় ডাকছে। ট্রেন আরো কাছাকাছি আসতেই প্রিয়ন্তী সুশান্তকে না দেখেই অনুমান করল, এ যেন সুশান্তরই হাত, তাকেই ডাকছে। হ্যাঁ সুশান্তই তাকে ডাকছে। ট্রেন থামতেই প্রিয়ন্তী ট্রেনে উঠে সুশান্তর পাশে বসল।

প্রিয়ন্তী কেমন আছিস?

প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, ভালো।

কিন্তু সুশান্ত খেয়াল করল প্রিয়ন্তীর গণ্ডদেশ দিয়ে বেয়ে পড়া পানির আভা তখনো শুকায় নি। দু’চোখ তখনো ছলছল করছে।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কী হয়েছে?

প্রিয়ন্তী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, এখন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করিস না সুশান্ত, আমার মনটা ভালো নেই। আগে রাজশাহী যাই, কাল তোকে সবকিছু বলব।

সুশান্ত আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

 

নয়

 

দীপক চক্রবর্তীর সঙ্গে তার প্রতিবেশী যতীন বাবুর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। যার বহিঃপ্রকাশ নেই, দুই পরিবারের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের কারণ সকলের জানাও নয়। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। দুজনের লোক দেখানো সখ্যতাও আছে কিন্তু দ্বন্দ্বটা কীসের তা কেউ কোনদিন কাউকে মুখ ফুটে বলে না। দারিদ্রের দ্বন্দ্বকে ঝগড়া বলে যা মানুষের মুখে মুখে মুখরোচক কথার খই ফোটায় কিন্তু ধনীর দ্বন্দ্বের কথা সংকোচের সঙ্গে উচ্চারণ করতে মানুষ ইতস্তত করে।

এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কথা বজ ঠাকুর জানতো কী না তা দুজনের কেউ-ই জানে না। পুরোহিত হিসেবে, ধর্মগুরু হিসেবে বজ ঠাকুরের প্রতি দীপক বাবুর শ্রদ্ধার কমতি নেই কিন্তু বার বার করে তার পারিবারিক সম্মান নিয়ে বজ ঠাকুরের আচরণ দীপক বাবুর মনে তার প্রতি একটা ঘৃণা সৃষ্টি করেছে।

সেদিন পথিমধ্যে বজ ঠাকুরের সঙ্গে যতীন বাবুর সাক্ষাৎ হলো। সাক্ষাৎটা ঘটনাক্রমে নয়, বজ ঠাকুর এক রকম ইচ্ছা করে যতীনের সঙ্গে দেখা করল, যতীন তোমাকে মনে মনে খুঁজিতেছিলাম।

কেন ঠাকুর মশাই?

রাম, রাম কী যে কলিযুগ আসিলো। আমি বাপু তোমাকে কথাটা বলিতে চাহি নাই কিন্তু কী করিব সমাজে একটা কলঙ্ক রটিয়া যাইলে তো আর জাত বলিতে কিছু থাকিবে না। তুমি কিছু মনে করিও না, আমি গোটা সমাজের মঙ্গল চাই বলিয়াই শুধু তোমাকে বলিতেছি।

আজ্ঞে ঠাকুর মশাই, বলুন।

ব্যাপারটা তোমার না, তবু তোমাকেই বলিতেছি।

আজ্ঞে বলুন।

বজ ঠাকুর একবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল, দীপকের মেয়ে প্রিয়ন্তী একটা নিচু জাতের ছেলের সহিত যেইভাবে ঢলাঢলি করিতেছে, ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ। এইভাবে অনাচার করিলে সমাজ রসাতলে যাইবে। তোমার সঙ্গে বাপু দীপকের ভালো সম্পর্ক তুমি ইশারা ইঙ্গিতে একটু বুঝাইয়া বলিও। বিষয়টা এখনো তেমন কেউ জানে না, জানিলে সমাজের কাছে আমি যে কী জবাব দিব ভগবানই জানেন।

আচ্ছা ঠাকুর মশাই দীপকের সঙ্গে দেখা হলে আমি বলব।

যতীন বাবুর সঙ্গে বজ ঠাকুরের একথার কয়েকদিন গত হলো সে মনে করেছিল যতীন বাবু বিষয়টা দীপক বাবুর সঙ্গে আলোচনা করে ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলবে কিন্তু তার কোনটাই ঘটতে না দেখে একদিন বজ ঠাকুর নিজেই দীপক বাবুর সঙ্গে কথা বলল।

দীপক হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। ঠাকুর হাতের ইশারায় ডাকল, এই যে দীপক কোথাও যাইতেছ নাকি?

আজ্ঞে ঠাকুর মশাই।

কয়েকদিন ধরিয়া একটা কথা তোমাকে বলিব বলিব ভাবিতেছিলাম কিন্তু তোমাকে সেইভাবে দেখাও পাইনা আর কথাটা বলাও হয় না।

কী কথা বলে ফেলুন?

দীপক বাবু বজ ঠাকুরকে কৈশোর থেকে চিনে সে যখন কিছু বলবে বলে ভাবছে তখন নিশ্চয়ই সেটা ভালো কিছু না। হয়ত আবার কোন সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ করার কথা বলবে। তার তো মন্দিরে পূজা দেওয়া আর সমাজকে অনাচার থেকে বিরত রাখা ছাড়া কোন কাজ নেই।

তোমার মনে হয় তাড়া আছে, তাহা হইলে থাকুক আরেকদিন বলিব।

না, বলার সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন তখন বলে ফেলাই ভালো।

আমি তোমাদের ভালো চাই বলিয়া বলিতেছি।

দীপক বাবু রাগান্বিত স্বরে বলল, হ্যাঁ আপনি আমার ভালো চান বলেই তো বলবেন। তবে তাড়াতাড়ি বলুন আমার আবার কাজের তাড়া আছে।

বিষয়টা না বলিলেই নয় বলিয়া বলিতেছি, কথাটা ধীরে ধীরে সবার কানে চলিয়া যাইলে তো ভীষণ একটা খারাপ কাজ হইবে।

ঠাকুর মশাই কী কথা বলে ফেলুন?

আমি বলিতেছিলাম তোমার মেয়ে প্রিয়ন্তীর কথা।

কী হয়েছে প্রিয়ন্তীর?

দীপক বাবু বজ ঠাকুরের কাছ থেকে কোন পরামর্শ চায়নি তবুও ঠাকুর তার সংসারের বিভিন্ন বিষয়ে উপযাচক হয়ে পরামর্শ দেয়। দীপক তার পরামর্শ শ্রবণ করে কিন্তু যা করে তা নিজের বুদ্ধিতেই, তুমি বাপু এক কাজ করো?

কী কাজ?

ভালো সম্বন্ধ পাইলে প্রিয়ন্তীর বিবাহ দিয়ে দাও।

ঠাকুরের অযাচিত পরামর্শে দীপক বাবুর সমস্ত গা জ্বলে উঠল, ঠাকুর মশাই আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিব কী না সেটা আমি বুঝব, আপনার এতটা চিন্তা না করলেও চলবে। সমাজের যেন কোন অনাচার না হয় সেটাও আমি দেখব।

তুমি দেখিলে তো হইবে না বাপু, সমাজের অনাচার দেখার দায়িত্ব সবার। তবে এই যাত্রায় কথাটা যেন কেউ না জানে বা কেউ কেউ জানিলেও আমি সেটা মানাইয়া লইব।

দীপক বাবু কোন কথা বলল না। তার বুকের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে গেল। মনে মনে সে প্রিয়ন্তীর ওপর প্রচণ্ড রেগে গেল। কিছুক্ষণ পর তার ছেলে অরুণ দোকানে এলে সে বাড়িতে চলে গেল, যাওয়ার সময় বলে গেল সে আজ আর দোকানে আসবে না।

দীপক বাবু কোনদিন বিকেলবেলা বাড়িতে আসে না। সাধারণত অনেক রাতে বাড়িতে আসে, বাড়িতে ঢোকার সময় অরুণের মা, অরুণের মা বলে ডাকতে ডাকতে ভিতরে ঢুকে, আজ সন্ধ্যা বাতি জ্বালানোর আগেই অরুণের নাম ধরে না ডেকে গম্ভীর কালো মুখ নিয়ে সোজা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল।

বাসন্তী অনেক বছর যাবত সংসার করছে, সে খুব সহজে দীপক বাবুকে রাগ করতে কিংবা ভেঙ্গে পড়তে কিংবা মুখ ভার করতে দেখেনি আজ তার চোখে মুখে এক অস্বাভাবিকতা দেখে সে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

বাসন্তী একবার মোবাইলটা দাও তো।

বাসন্তী দীপক বাবুকে মোবাইলটা দিল।

দীপক মোবাইলটা হাতে নিয়ে প্রিয়ন্তীকে মোবাইল করল। কিন্তু প্রিয়ন্তীর মোবাইল ব্যস্ত আর ব্যস্ত। দীপক বাবু প্রচণ্ড রেগে গেল।

অনেকক্ষণ পর প্রিয়ন্তীর মোবাইলের ব্যস্ততা শেষ হলো।

প্রিয়ন্তী মোবাইল রিসিভ করল, হ্যালো বাবা।

কার সঙ্গে কথা বলছিলি এতক্ষণ?

বাবার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, ভয়ংকর, তার বাবার রক্তাক্ত চোখ দু’টো যেন প্রিয়ন্তীর চোখের সামনে ভেসে উঠল, বাবা।

আমি জানতে চাচ্ছি তুই এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা বলছিলি?

আমার এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে।

ফ্রেন্ড, ফ্রেন্ড করেই তুই আমাকে ডুবাবি। তোকে আমি লেখাপড়া করতে পাঠিয়েছি, বন্ধুত্ব করতে নয়। তোর নামে আজ এক অভিযোগ, কাল এক অভিযোগ, এসব শুনতে শুনতে আমার কখনো কখনো মনে হচ্ছে তোর লেখাপড়া বাদ দিয়ে তোকে বিয়ে দিয়ে দিই।

প্রিয়ন্তীর কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। সে ভীত কণ্ঠে বলল, বাবা কী হয়েছে?

বাসন্তী কাছেই দাঁড়িয়েছিল, সে চাপাস্বরে বলল, চুপ করো, মেয়েকে মানুষ এভাবে কথা বলে? তারওপর আবার মোবাইলে।

বাসন্তী কথা শুনে দীপক বাবু একটু ক্ষান্ত হলো, থাক মোবাইলে সব বলছি না, তবে তুই যদি লেখাপড়া করতে চাস তবে তোকে ঐ ছোট জাতের ছেলেটার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।

বাবা।

হ্যাঁ, কথাটা মনে রাখবি আর যদি কোনদিন কথাটা আমার কানে আসে তবে কোনদিন আর আমার বাড়ির দিকে মুখ করে তাকাবি না। সোজা ঐ দত্তের বেটার সঙ্গেই চলে যাবি। আর হ্যাঁ মোবাইল প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্য, বলে দীপক বাবু প্রিয়ন্তীকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই রেখে দিল।

 

সেদিন বাবার সঙ্গে কথা বলার পর প্রিয়ন্তী অনেকটা সাবধান হয়ে গিয়েছিল। সুশান্তর সঙ্গে খুব সহজে দেখা করতো না। তার এক বান্ধবীর মোবাইলে সুশান্ত মোবাইল করতো, প্রিয়ন্তী নিজের মোবাইলকে সব সময় ফ্রি রাখতো। কিন্তু তাতেও রক্ষা হলো না একদিন প্রিয়ন্তীর জামাই বাবু রাজশাহী এলো। শহরে কাজ সেরে সে এলো প্রিয়ন্তীর মেসে।

গার্ডের মাধ্যমে প্রিয়ন্তীকে খবর দিতেই সুশান্ত এসে দাঁড়ালো। তার সঙ্গে জামাইবাবুর পরিচয় নেই, খুব সম্ভব তার সঙ্গে প্রিয়ন্তীর কথা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে, আর গার্ড প্রিয়ন্তীকে খবর দিতে গেল এইমাত্র।

কিছুক্ষণ পর প্রিয়ন্তী এলো।

প্রিয়ন্তীকে দেখে সুশান্ত বলল, প্রিয়ন্তী তাড়াতাড়ি চল দেরি হয়ে গেল।

প্রিয়ন্তী ইশারা করল কিন্তু সুশান্ত বুঝতে পারল না।

স্বাভাবিকভাবে প্রিয়ন্তী জামাইবাবুকে কখনো প্রণাম করে না, নমস্কার দেয় কিন্তু আজ সুশান্তকে জামাইবাবুর গুরুত্ব বোঝাবার জন্য প্রণাম করল।

জামাইবাবু প্রিয়ন্তীর চালাকি বুঝতে পেরেছে সে দেখেও কিছু বলল না। তার মনে সন্দেহ হলো এই ছেলেই নিশ্চয়ই প্রিয়ন্তীর সেই ফ্রেন্ড।

সুশান্ত আর জামাইবাবুকে এক সঙ্গে দেখে তার বুক শুকিয়ে গেল।

প্রিয়ন্তী এই ছেলেটির নাম সুশান্ত?

প্রিয়ন্তী সুশান্তকে আবার ইশারা করল কিন্তু সুশান্ত তার দিকে না তাকিয়েই সে বলল, হ্যাঁ।

তুমি সুশান্তর সঙ্গে কোথাও যাবে নাকি?

প্রিয়ন্তী থতমত খেলো, হ্যাঁ স্যারের কাছে কোচিং আছে।

সুশান্ত কিছু বলল না।

প্রিয়ন্তী জামাইবাবুর কাছ থেকে বাড়ির খোঁজখবর নিয়ে চলে গেল।

জামাইবাবু চলে যাবার পর প্রিয়ন্তী সুশান্তকে বলল, সুশান্ত তোর এতটুকু বোঝা উচিত ছিল। এখন বুঝতে পারলি কে এসেছিল?

সরি প্রিয়ন্তী।

সরি বললেই যদি সব হয়ে যেত তবে তো ভালোই হতো। এখন কী যে হবে ভগবানই জানেন।

 

দশ

 

ইতোমধ্যে যতীন বাবু একদিন পরোক্ষভাবে প্রিয়ন্তীর কথা দীপক বাবুকে বলেছে। দীপক বাবু মনে মনে প্রিয়ন্তীর ওপর রেগে গেলেও যতীন বাবুর কথাকে না শোনার ভান করে পাশ কাটিয়েছে।

দুর্গা পূজায় সুশান্তর সঙ্গে প্রিয়ন্তীর মেলামেশা, যতীন বাবুর কথা, বজ ঠাকুরের কান ভারী করা সবকিছু মিলিয়ে দীপক বাবু প্রিয়ন্তীর ওপর খুব রাগান্বিত ছিল। তারওপর জামাইবাবুর কথা যেন ভস্মে ঘি ঢাললো। জামাইবাবু প্রিয়ন্তীর কথা আরো হাজারগুণ বাড়িয়ে যখন দীপক বাবুকে বলল, তখন প্রিয়ন্তীর ওপর তার রাগ আরো সহস্রগুণ বেড়ে গেল।

বজ ঠাকুরসহ আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই তাকে প্রিয়ন্তীর লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কিন্তু শত রাগেও প্রিয়ন্তীকে উচ্চ শিক্ষিত করার স্বপ্নটাকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি তাই কোনভাবে প্রিয়ন্তীর বিয়ের কথাও ভাবেনি। আজ নিজের জামাই যখন বলল তখন সে কিছুক্ষণ মাথা নত করে বসে রইল।

জামাইকে সে বিশ্বাস করে, সব সময় স্নেহের সঙ্গে কথা বলে। আজ প্রিয়ন্তী সম্পর্কে সে যা বলল তাতে দীপক বাবুর অবিশ্বাস নেই। প্রিয়ন্তী লেখাপড়ায় ভালো তাতে কোন সন্দেহ নেই, হয়ত পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করবে সেটাও মোটামুটি নিশ্চিত কিন্তু লেখাপড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে বিয়ে করবে না এই বিশ্বাসটা দিনে দিনে ক্ষীণ হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর দীপক বাবু যখন মাথা তুলল তখন তার চোখ দু’টো লাল, গণ্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের আভা স্পষ্ট। তার মুখচ্ছবিতে যেন সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ঝড়ের চিহ্ন। জামাই সত্যই বলেছে, তার কথার প্রতিবাদ করার ইচ্ছাও দীপক বাবুর নেই। প্রিয়ন্তীকে নিয়ে দেখা স্বপ্নটা আজ স্মৃতি থেকে মুহূর্তে মুছে গেল।

দীপক বাবু মাথা তুলে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, তুমি আমার জামাই, অরুণ ছেলে তোমাদের দু’জনের যা ইচ্ছা হয় করো।

অরুণ বলল, বাবা আমরা আসলে প্রিয়ন্তীর লেখাপড়া বন্ধ করার কথা বলছি না, আজকাল মেয়েরা লেখাপড়া শিখে অনেক বড় অফিসার হচ্ছে, আমাদের সবার ইচ্ছা ছিল সেও একদিন অনেক বড় অফিসার হবে কিন্তু প্রিয়ন্তীর ওপর কি আর আমাদের মান-সম্মান ছেড়ে দেওয়া যায়?

কিন্তু প্রিয়ন্তী যদি রাজি না হয়?

সবাই মিলে তাকে বোঝাতে হবে।

বোঝাও।

বাবা তাহলে প্রিয়ন্তীকে আসতে বলি।

দীপক বাবু মাথা বাঁকিয়ে সায় দিল।

 

সেদিনের পর থেকে প্রিয়ন্তীর চিন্তার অন্ত নেই। জামাইবাবু সুশান্তকে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছে, আবার দুজনে একসঙ্গে বের হবে একথাও জেনে গেছে। প্রথমত: সে জটিল প্রকৃতির মানুষ, দ্বিতীয়ত: তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে প্রিয়ন্তীর বিয়ে দেওয়ার জন্য তার ইচ্ছাও অনেক বেশি। এতদিন প্রিয়ন্তী তার লেখাপড়ার কথা বলে বিয়ের কথা এড়িয়ে গেছে। অবশ্য তার বিয়ে করার কথা এড়িয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ভিত্তি ছিল তার বাবা। বাবা ঠিক থাকলে তার আর কাউকে ভয় পাবার কোন কারণ নেই।

প্রিয়ন্তী একবার মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকাল, রাত দশটা বাজে।

তার মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

তার দিদি মোবাইল করেছে, হ্যালো প্রিয়ন্তী।

হ্যাঁ দিদি বলো।

ভালো আছিস?

হ্যাঁ, তোমরা সবাই ভালো আছ।

না, আমরা ভালো নেই, বাবার অসুখ, আমি এসেছি তুইও কাল সকালেই চলে আয়।

দিদির কণ্ঠস্বরে তার বাবার অসুখ বলে প্রিয়ন্তীর মনে হলো না। তার কণ্ঠস্বরে কোন অস্বাভাবিকতা নেই, একেবারে স্বাভাবিক কণ্ঠ।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, কী অসুখ দিদি?

বাবার অসুখ, আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছি, তোকে আসতে বলছি, তুই বুঝছিস না। আমি কি ডাক্তার নাকি, কী অসুখ আবার তোকে বলতে হবে। আগে আয়, তারপর দেখবি।

ঠিক আছে দিদি, বলে প্রিয়ন্তী মোবাইল রেখে দিল।

বাবার অসুখ শুনে প্রিয়ন্তীর যেমন ভেঙ্গে পড়ার কথা ছিল সে রকম কিছু হলো না। আবার বাবার অসুখ শুনে চুপ করে থাকতেও চায় না। ক্ষণিকের মধ্যেই যেন তার ঘাড়ের রগ দু’টো ব্যথা শুরু করল। সে জানে যে কোন দুশ্চিন্তায় তার রক্তের চাপ বেড়ে যায় আজো তাই হয়েছে। তার মনে হচ্ছে বাবার অসুখের নাম করে বিয়ে দেওয়ার জন্য এটা একটা কৌশল মাত্র।

প্রিয়ন্তী সুশান্তকে মোবাইল করল, হ্যালো সুশান্ত।

প্রিয়ন্তী বল।

প্রিয়ন্তী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, সুশান্ত দিদি মোবাইল করেছিল, বাবা নাকি অসুস্থ?

আমি কাল সকালে তোকে তুলে দিয়ে আসছি, তুই বাড়ি যা।

কিন্তু আমার মনে হচ্ছে বাবা অসুস্থ না।

তবে?

সুশান্ত আগেও আমাকে একবার বিয়ে দিতে চেয়েছে কিন্তু আমি বিয়ে করিনি। অবশ্য তখন আমার মনোবল ছিল। কিন্তু এবার আমরা দুর্গা পূজায় একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতে বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেছে। তারওপর সেদিন জামাইবাবু তোকে আমার মেসে অপেক্ষা করতে দেখেছে। হয়ত সে রকম কোন চেষ্টা আবারো হচ্ছে।

তাহলে কী করবি? বাড়ি যাবি না?

বাবার অসুখ শুনেও বাড়ি না গেলে হয়?

তাহলে সবাই যদি তোকে বিয়ে দিতে চায়?

চাইলেই বিয়ে দিতে পারবে? তুই আমার ওপর বিশ্বাস রাখ, আমি সোজা তোর কাছে চলে আসবো।

হ্যাঁ, অবশ্যই আসবি।

তারচেয়ে আমি বলি তুই সিঁদুর পরে যা, তাহলে কেউ আর বিয়ের কথা বলতে পারবে না।

না সুশান্ত তুই আমার ওপর বিশ্বাস রাখ, প্রিয়ন্তীর শেষের কথাগুলোতে তার দৃঢ় মনোবল ফুটে উঠল।

প্রিয়ন্তীর চোখে ঘুম নেই। অনেক আজে-বাজে স্বপ্নের মাঝে বার বার করে তার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। সে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করছে। প্রিয়ন্তীর মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এসেছে, সে রিসিভ করল, হ্যালো নমস্কার।

নমস্কার, আপনি কি প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী বলছেন? নারী কণ্ঠের আওয়াজ, কণ্ঠস্বরে বেশ বিনয় আছে।

হ্যাঁ বলুন।

আমার নাম বর্ণালী। আমি অনেক কষ্টে আপনার মোবাইল নাম্বার যোগাড় করেছি।

বলুন আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?

বিদ্যুতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আমি ওকে খুব ভালোবাসি, এক সময় ও আমাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু এখন শুনছি আপনার সঙ্গে নাকি ওর বিয়ে।

আমার বিয়ে, আমি তো কিছু জানি না।

শুনলাম বিয়ের কথাবার্তা নাকি এক রকম পাকাপাকি হয়েছে, শুভ দিনক্ষণ দেখে একটা তারিখও নির্ধারিত হয়েছে।

বর্ণালী আমি আসলে কিছু জানি না, আপনার মুখ থেকে বিদ্যুতের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা শুনলাম। যাক আপনি আমাকে জানিয়ে খুব ভালো করেছেন, না হলে হয়ত আমাকে অনেক ঝামেলায় পড়তে হতো।

বর্ণালী মিনতির সুরে বলল, দিদি আমাকে কথা দিন আমার বিদ্যুতকে আপনি কেড়ে নিবেন না?

আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি আপনার বিদ্যুৎকে বিয়ে করব না। আপনি আমারো উপকার করলেন। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।

রাখি দিদি, ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।

মোবাইল রেখে দিয়ে যেন প্রিয়ন্তী হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলতে লাগল। কয়েক মিনিট পর সে সুশান্তকে মোবাইল করল।

সুশান্ত রিসিভ করল, হ্যালো প্রিয়ন্তী ঘুমাস নি?

না।

কেন?

সুশান্ত একটা ঘটনা ঘটে গেছে।

কী ঘটনা?

প্রিয়ন্তী বর্ণালীর মোবাইল করার কথা বলে বলল, সুশান্ত তোকে আমার জন্য অনেক ঝড় সামাল দিতে হবে।

দিব।

চল আমরা কালকে এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে করি।

কিন্তু আমি তো এত সব বিষয় জানি না।

জানিস না এখন জানতে হবে।

আচ্ছা ঠিক আছে, আমি দেখছি, তুই কিচ্ছু ভাবিস না।

তুই সব ম্যানেজ করতে পারবি?

পারতে হবে, যে কোন মূল্যে আমাকে পারতে হবে। আমি তোকে হারাতে পারবো না প্রিয়ন্তী।

আমিও।

 

এগারো

 

কারো চোখে ঘুম নেই। সুশান্ত একেকবার একেকটা চিন্তা করছে আর প্রিয়ন্তীকে মোবাইল করছে। প্রিয়ন্তীর কোনটাই পছন্দ হচ্ছে না। আবার প্রিয়ন্তী কোন একটা চিন্তা করে করলে সেটা সুশান্তর চিন্তার সঙ্গে মিলছে না। এমনভাবে চিন্তা করতে করতে সুশান্ত মনে মনে খুঁজছে এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে করেছে এমন কাউকে পাওয়া যায় কি না? মনে মনে খুঁজতে খুঁজতে তার মনে হলো তার রুম মটে মিজানের এক মামাতো ভাই কিছুদিন আগে কোর্টে এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে করে এখন সংসার করছে। এখনো মিজানের কাছে মাঝে মাঝে আসে একবার মিজানকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়। মিজান সুশান্তর সঙ্গে পড়ে, অন্য সাবজেক্টে।

সুশান্ত একবার মিজানের দিকে তাকাল। সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আগেও এরকম কিছু হলে তাকে ডাকলে সে কিছু মনে করে না, খুব সহজে বিরক্ত হয় না। সুশান্ত একবার মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকাল, রাত একটা বাজে।

সুশান্ত আস্তে আস্তে ডাক দিল, মিজান, মিজান।

মিজান চোখ মেলে তাকাল, কে?

মিজান আমি সুশান্ত।

মিজান হাত দিয়ে দু’চোখ নেড়ে বলল, কী ব্যাপার সুশান্ত?

মিজান আসলে তোকে এত রাতে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, সুশান্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল।

কোন ফরমালিটিজ দরকার নেই, কী হয়েছে বল? বলে মিজান বিছানায় উঠে বসল।

মিজান তোর মামাতো ভাই তো এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে করল, তাই না?

হ্যাঁ।

এখন কেমন আছে?

ভালো, দিব্বি সংসার করছে।

কোন আইন আদালত, পুলিশি ঝামেলা হয়েছিল নাকি?

না তো কোন কিছু হয়নি, কেন কি ব্যাপার খুলে বলতো।

মিজান তুই তো জানিস আমি প্রিয়ন্তীকে ভালোবাসি।

হ্যাঁ, শুনেছি।

আমি প্রিয়ন্তীকে বিয়ে করব।

তোরা না কোনদিন মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এলি?

হ্যাঁ, আমরা দু’জনে ঠাকুর সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছি কিন্তু সেই বিয়ের তো কোন স্বীকৃতি নেই।

স্বীকৃতিনেই মানে?

মানে সেটা তো বিয়ে না আবেগের বশে দু’জনে একটা সান্ত্বনা দাঁড় করিয়েছি, কার্তিক মাসে। আমাদের ধর্মে কার্তিক মাসে বিয়ে হয় না। সেকথা ঠাকুর মন্ত্র পাঠের সময় বলে দিয়েছে।

তাতে কী?

আমাদের সমাজে বিয়ের চিহ্ন সিঁদুর আর সাক্ষী সমাজ, আমরা যদি সাক্ষী রেখে অন্য কোন মাসে, যেসব মাসে বিয়ে হয় সেসব মাসের মধ্যে কোন একদিন সমাজ সাক্ষী রেখে বিয়ে করতাম আর প্রিয়ন্তী যদি সেদিন থেকে সিঁদুর পরতো তবে সবাই সে বিয়েকে স্বীকৃতি দিত কিন্তু তাকে তো কেউ সিঁদুর পরতে দেখেনি। গ্রহণযোগ্য কোন সাক্ষীও নেই। তাই সে বিয়ের না আছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি , না আছে সামাজিক স্বীকৃতি।

এখন কি তোরা এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে করতে চাস?

হ্যাঁ, সেজন্যই তো তোকে বলছি।

মিজান যেন ব্যাপারটা সহজে হেসে উড়িয়ে দিল, সেজন্য রাত জেগে নিজের ঘুম নষ্ট করছিস আর বার বার করে মোবাইল করে বেচারিরও ঘুম নষ্ট করছিস? ঘুমা।

সুশান্ত অসহায়ের মতো বলল, তাহলে এখন কী হবে?

সব হবে, কাল সকালে দু’জনকে নিয়ে কোর্টে যাবো, সেখানে যে উকিল আমার মামাতো ভাইয়ের এ্যাফিডেভিট করেছিল তার কাছে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। তাহলে এটা একই বউয়ের সঙ্গে তোর দ্বিতীয়বার বিয়ে?

সুশান্ত হাসলো।

সুশান্ত অনেকটা নিশ্চিত হলো। সে প্রিয়ন্তীকে মোবাইল করে বিষয়টি বলল। প্রিয়ন্তী শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও তার মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা রয়েই গেল।

সে সুশান্তকে মোবাইলে বলল, সুশান্ত একটা কথা চিন্তা করেছিস?

কী কথা?

ওরা মুসলমান আর আমরা হিন্দু।

সুশান্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ল, হ্যাঁ তুই তো ঠিকই বলেছিস।

সুশান্ত আবার মিজানকে বলল, মিজান একটা সমস্যা হয়ে গেল যে?

কী সমস্যা?

আমরা তো হিন্দু, এ্যাফিডেভিট করে আমাদের বিয়ে হয় কিনা এটা তো আমার জানা নেই।

মিজান কিছুটা ধমকের সুরে বলল, দেখ সুশান্ত তোকে আমি বলেছি তুই ঘুমা, তুই ঘুমাবি। ঐসব তফাৎ আছে মন্দির, মসজিদ, গির্জায়। রাষ্ট্রের কাছে সবাই মানুষ। তুই আর একটা কথাও বলবি না এখন লাইট অফ করে ঘুমা।

সুশান্ত আর কিছু বলল না।

 

পরদিন সকালবেলা সুশান্ত তার একজন বন্ধুকে বলল। সে আর মিজান একটা রিক্সায় এবং প্রিয়ন্তী আর সুশান্ত আরেকটা রিক্সায় চেপে কোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। সুশান্তর চোখে-মুখে একটা আতংকের ছাপ পড়েছে, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সে মাথা নিচু করে আপন মনে অনেক কথা ভাবছিল।

প্রিয়ন্তী সেটা খেয়াল করেছে সে অনেকক্ষণ সুশান্তর চিন্তামগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সুশান্তকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, এই সুশান্ত কী ভাবছিস?

না কিছু না।

কিছু তো অবশ্যই ভাবছিলি? সন্দেহ হচ্ছে আমি তোকে কোন বিপদে ফেলি কি না? তাই না?

না।

ভয় হচ্ছে?

সুশান্ত সায় দিল।

কোন ভয় নেই আমি তোর সঙ্গে আছি না, কিচ্ছু হবে না।

রিক্সা কোর্ট এলাকায় পৌঁছালো। মিজান কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর এসে বলল, উকিল সাহেবের একটা মামলার শুনানি চলছে, সেটা শেষ হতে সময় লাগবে। তারপর এ্যাফিডেভিট হবে। তোরা দু’জনে বস।

সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী একটা হোটেলে বসল। দুজনে মুখোমুখি বসেছে, ফিসফিস করে অনেকক্ষণ কথা। প্রিয়ন্তীর চোখে মুখে কোন অস্বাভাবিকতানেই কিন্তু সুশান্তর মুখ থেকে কালো মেঘটা সরেই যাচ্ছে না। কথার মাঝে মাঝে সুশান্ত আনমনা হয়ে যাচ্ছে তখন প্রিয়ন্তী আবার বলছে এই সুশান্ত কী হচ্ছে? কী চিন্তা করছিস?

সুশান্ত চমকে উঠছে, না কিছু না।

প্রিয়ন্তী এবার ধমকের সুরে বলল, বেশি ভয় পেলে, আমাকে বোঝা মনে করলে থাক। আমার জন্য তোকে কোন বিপদে পড়তে হবে না, আমি চলে যাচ্ছি।

সুশান্ত অনুরোধের সুরে বলল, প্রিয়ন্তী রাগ করিস না, প্লিজ বস।

বসবো তো কিন্তু তুই এমন নার্ভাস হচ্ছিস কেন?

প্রিয়ন্তী একবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, আজ আমাদের আনন্দের দিন, আনন্দের দিনে কেউ এমন মুখ গোমরা করে থাকে?

সুশান্ত চুপ করে রইল।

প্রিয়ন্তী আবার বলল, তুই এমন করে থাকলে খুব খারাপ লাগে, আজ আমাদের বিয়ে, একবার অন্তত: শুভদৃষ্টি বিনিময় হওয়া উচিত। তুই একবার আমার চোখের দিকে তাকা।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে উঠল।

মিজান এলো, এই সুশান্ত আয় উকিল সাহেব এসেছেন। দু’জনে আয়।

দুজনে মিজানের সঙ্গে গেল। বিরাট এক কক্ষে অনেক উকিল বসে আছে, ভিড়ে গিজগিজ করছে। মিজান দুজনকে একজন উকিলের কাছে নিয়ে গেল। উকিল সাহেবের টেবিলের সামনে দু’টা চেয়ার আছে।

মিজান বলল, তোরা বস।

সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী চেয়ারে বসল।

উকিল সাহেব সুশান্তকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী?

সুশান্ত দত্ত।

আর তোমার? বলে তিনি প্রিয়ন্তীর দিকে তাকালেন।

প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী।

এই তো সমস্যা, তোমাদের বিয়েতে আবার বর্ণ মানতে হয়। পরে কোন ঝামেলাই হয় নাকি?

মিজান বলল, আঙ্কেল আমি বলছি কোন ঝামেলা হবে না।

এস.এস.সি পাসের সার্টিফিকেট এনেছ?

সুশান্ত বলল, হ্যাঁ।

দেখি।

সুশান্ত তার এবং প্রিয়ন্তীর সার্টিফিকেট দু’টা এক সঙ্গে করে উকিল সাহেবের হাতে দিল।

উকিল সাহেব সার্টিফিকেট দেখে বলল, বয়সে কোন সমস্যা নেই? তারপর প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি নিজের ইচ্ছায় এসেছ তো?

হ্যাঁ।

পরে আবার বলো না যে ও তোমাকে জোর করে বা ফুসলিয়ে নিয়ে এসেছে?

প্রিয়ন্তী দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, না বলব না।

উকিল সাহেব তাদের নাম, ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে দুজনের ছবি সংযোজন করে দু’জনের স্বাক্ষর নিলেন, মিজান এবং সুশান্তর যে বন্ধু সঙ্গে এসেছিল সাক্ষী হিসেবে তাদের দু’জনের সাক্ষর নিলেন। তারপর এ্যাফিডেভিটের কাজ সম্পন্ন করে তার এক সহযোগীকে দিয়ে ফটোকপি করতে দিলেন কিন্তু তখন বিদ্যুৎ না থাকায় সেদিন ফটোকপি করা হলো না। উকিল সাহেব বললেন সমস্যা নেই একজন এসে একটা ফটোকপি নিয়ে যেও।

মিজান সুশান্তর কাছ থেকে টাকা নিয়ে উকিল সাহেবকে দিয়ে বললেন, আঙ্কেল তাহলে আসি।

আচ্ছা।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, কাজ শেষ।

হ্যাঁ।

কোর্ট এলাকা থেকে বেরিয়ে আবার সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী একটা রিক্সায় উঠল। মিজান আর সুশান্তর বন্ধু আরেকটা রিক্সায় উঠল। নানকিং চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে এসে মিজান রিক্সা থামালো। সুশান্তর রিক্সাটা পিছনে ছিল, মিজানের রিক্সার কাছে আসতেই সুশান্ত রিক্সা থামাতে বলল, কী ব্যাপার মিজান?

সুশান্ত খিদে লেগেছে, কোথায় খাওয়াবি? এখানে নাকি অন্য কোথাও?

চিলি’স-এ।

আচ্ছা।

চার জনে চিলি’স-এ খাবার পর মিজান আর সুশান্তর যে বন্ধুটা এসেছিল তারা চলে গেল। সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী একটা রিক্সায় উঠল।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী এখন কোথায় যাবি?

মেসে।

কিন্তু-বলে সুশান্ত প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু কী?

সুশান্ত কানে কানে বলল, আজ আমাদের বিয়ে হয়েছে না?

তাতে কী?

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর কানে কানে কি যেন বলল, প্রিয়ন্তীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

 

বারো

 

রাজশাহী সাহেব বাজার মোড় থেকে একটা রাস্তা ডান দিকে চলে গেছে। সেই রাস্তার পাশে হাতের ডানে এবং বাঁয়ে কয়েকটা আবাসিক হোটেল আছে। ভালো উন্নত মানের কি না তা সুশান্ত কিংবা প্রিয়ন্তী কেউ জানে না কারণ কেউ কোনদিন আবাসিক হোটেলে থাকেনি।

একটা আবাসিক হোটেলের সামনে রিক্সা এসে দাঁড়ালো। দুজনে রিক্সা থেকে নেমে ভিতরে ঢুকলো।

একটা হাতল চেয়ারে একজন মধ্যবয়সী লোক বসে আছে, সম্ভবত: তিনিই ম্যানেজার। সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, দাদা একটা ডাবল রুম হবে।

ম্যানেজার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, কে থাকবে?

আমরা।

ম্যানেজার সুশান্তকে ইঙ্গিত করে বলল, উনি আপনার কে হয়?

আমার ওয়াইফ।

ম্যানেজার তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আপনার ওয়াইফ?

সুশান্ত বলল, হ্যাঁ।

দেখুন আমরা সাধারণত ফ্যামিলি ভাড়া দিই না। আজ বৃহস্পতিবার অনেক রুম খালি, আচ্ছা ঠিক আছে, তিন’শ টাকা ভাড়া পড়বে।

সুশান্ত বলল, ঠিক আছে।

ম্যানেজার রেজিস্টার খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল, নাম ঠিকানা লিখুন।

সুশান্ত প্রথমে তার নাম, ঠিকানা লিখল তারপর নিচের সারিতে প্রিয়ন্তী ঠিকানা লিখল।

দু’জনের নাম, ঠিকানা লেখা শেষে ম্যানেজার খাতাটা তার দিকে নিয়ে সুশান্তকে ইঙ্গিত করে বলল, আপনার নাম সুশান্ত দত্ত তারপর প্রিয়ন্তীকে ইঙ্গিত করে বলল, আপনার নাম প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী।

প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ।

ম্যানেজার আপন মনে ফিসফিস করে বলল, হিন্দু বউ অথচ শাঁখা সিঁদুর নেই। কেমন যেন রহস্যজনক মনে হচ্ছে। যাক আমার টাকা পেলেই হলো।

ম্যানেজার কলিং বেল টিপে একজন বয়কে ডাক দিয়ে বলল, এই কুদ্দুস তিন’শ চার নাম্বার রুমটার বেড সিটটা বদলে দে তো।

একজন বয় এসে ম্যানেজারের কাছ থেকে একটা চাবি নিয়ে বলল, আসুন।

দু’জনে বয়-এর পিছনে পিছনে উপরে উঠে গেল।

বয় তিন’শ চার নাম্বার রুমটা খুলে বেড সিটটা পরিবর্তন করে দিয়ে বলল, আমার নাম কুদ্দুস, আমি এই ফ্লোরে ডিউটি করি, কোনকিছু দরকার হলে এই সুইচটা টিপ দিবেন বলে সে কলিং বেল-এর সুইচটা দেখিয়ে দিল।

আচ্ছা ঠিক আছে, সুশান্ত বলল।

কুদ্দুস চলে গেল।

সুশান্ত দরজা বন্ধ করল। প্রিয়ন্তী কিছু বলল না।

রুমে বড় আকারের একটা চৌকি। পাশাপাশি দু’টা বালিশ ছড়ানো আছে। টি.ভি স্ট্যান্ডে একটা ছোট ১৪ ইঞ্চি রঙিন টি.ভি। একটা কাঠের আলমারির ভিতরে কয়েকটা হ্যাঙ্গার ঝুলানো আছে। সুশান্ত টি.ভি চালু করে দিল। বাথ রুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এলো। ততক্ষণে প্রিয়ন্তী ব্যাগ থেকে কাপড়-চোপড় বের করে কাঠের আলমারিতে সাজিয়েছে।

সুশান্ত বাথ রুম থেকে বের হয়ে আসার পর প্রিয়ন্তী বাথ রুমে ঢুকল।

সুশান্ত একবার মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকাল, রাত দশটা বাজে।

দু’জনে হোটেলে আসার আগে ভাত খেয়ে এসেছে। সুশান্ত প্রিয়ন্তী বলে আস্তে ডাক দিল।

প্রিয়ন্তী বের হয়ে এলো, কিছু বলবে?

তোর কি খিদে লেগেছে কিছু আনতে বলব?

এখনো খিদে লাগেনি, তবে কিছু এনে রাখলে ভালো হতো।

সুশান্ত কলিং বেল-এ টিপ দিল।

কুদ্দুস চলে এলো, স্যার।

সুশান্ত একটা এক’শ টাকার নোট দিয়ে বলল, নিচ থেকে এক হালি কমলা আর হাফ কেজি আপেল নিয়ে এসো।

কুদ্দুস চলে গেল।

সুশান্ত দরজা বন্ধ করে দিয়ে প্রিয়ন্তীর কাঁধে হাত রাখল। প্রিয়ন্তী সুশান্তর চোখে চোখ রাখল, কী?

আজ বোধ হয় শেষ হলো অপেক্ষার দিন।

প্রিয়ন্তী হাসল, এখনো শেষ হয়নি কুদ্দুস আরো একবার আসবে।

দু’জনে হাসল।

কিছুক্ষণ পর কুদ্দুস আপেল আর কমলা দিয়ে গেল।

সুশান্ত দরজা বন্ধ করে দিয়ে লাইটটা অফ করে দিল।

প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, লাইটটা অফ করলি কেন?

এমনি।

অন্তত: ড্রিম লাইটটা দাও।

সুশান্ত ড্রিম লাইটটা অন করল।

ড্রিম লাইটের সামান্য লাল আলো প্রিয়ন্তীর মুখের ওপর পড়েছে। তার ফর্সা মুখ যেন জবা ফুলের মতো রক্তিম আকার ধারণ করেছে। সুশান্ত কিছুক্ষণ প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, কী দেখছিস?

কী দেখছিস না, কী দেখছ। কারণ আজ থেকে আমি তোমার হ্যাজবেন্ড।

হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ।

তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।

তাই নাকি?

হ্যাঁ।

আরো সুন্দর লাগতো যদি আমাদের ফুলশয্যার রাতে সমস্ত বিছানা ফুলে ফুলে ভরা থাকতো। অথচ দেখো আমাদের ফুলশয্যার রাতে একটা ফুলের গন্ধও নেই।

তাহলে ফুলশয্যার রাত বলো না, মধু চন্দ্রিমার রাত বলো।

না আজ আকাশে চাঁদও নেই, আজ আমাবস্যার রাত।

সুশান্ত তুমি আজ খুব বেশি কথা বলছ, কোন কিছু না থাকলেও আমি তো আছি।

হ্যাঁ, আসলে তুমিই তো আমার কাছে সব, তুমি আছ আর আমার কিছু চাই না।

প্রিয়ন্তী রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, সুশান্ত তুমি তো জানো আমি সবাইকে ছেড়ে, সবকিছু ছেড়ে তোমার সঙ্গে চলে এসেছি, আমাকে কোনদিন কষ্ট দিবে না তো?

আমিও তো সবাইকে ছেড়ে এসেছি প্রিয়ন্তী, তোমার যেমন পৃথিবীতে আমি ছাড়া কেউ নেই তেমনি আমারো তো তুমি ছাড়া কেউ নেই। পৃথিবীতে আমরা দুজ’নে শুধু দু’জনার।

প্রিয়ন্তী কামিজ সালোয়ার পরে ছিল, তার মাথায় ওড়না দিয়ে ঘোমটা বানানো ছিল। এবার সুশান্ত ঘোমটা সরিয়ে প্রিয়ন্তীর কপালে চুমু খেলো।

এমন সময় দরজা নক করার শব্দ।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, কে?

দরজা খুলে দিন, আমরা পুলিশ।

সুশান্তর বুক কেঁপে উঠল। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। সে চাপাস্বরে প্রিয়ন্তীকে জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী এখন কী হবে?

প্রিয়ন্তী বলল, কী হবে? আমরা সত্য কথা বলব।

আবার দরজা নক করার শব্দ।

সুশান্ত দরজা খুলে দিল।

দরজা খুলে দিতেই একজন পুলিশ অফিসার রুমে ঢুকল আর কয়েকজন কনস্টেবল দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।

পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?

সুশান্ত দত্ত।

কী করো?

লেখাপড়া।

পুলিশ প্রিয়ন্তীর দিকে ইঙ্গিত করল, ও তোমার কে হয়?

ওয়াইফ।

তুমি একটু আমার সঙ্গে এসো, বলে পুলিশ অফিসার তাকে পাশের একটা রুমে নিয়ে গেল।

তোমার শ্বশুরবাড়ি কোথায়?

দিনাজপুর।

তোমার শ্বশুরের নাম, ঠিকানা আর মোবাইল নাম্বার দাও।

সুশান্ত চুপ করে রইল।

চুপ করে আছ কেন? তারমানে শ্বশুরের নাম, ঠিকানা পর্যন্ত জানো না। আর বলছ ও তোমার ওয়াইফ হয়।

সুশান্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, স্যার আমাদের আজকেই বিয়ে হয়েছে তাই আমার সবকিছু জানা নেই।

কোথায় বিয়ে হলো?

কোর্টে, এ্যাফিডেভিট করে।

এ্যাফিডেভিট সঙ্গে আছে?

না।

তুমি এ ঘরে বসো।

প্রিয়ন্তীর হৃৎপিণ্ড তখন দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে। তার মনে হাজার চিন্তা পুলিশ অফিসার সুশান্তকে কী জিজ্ঞেস করছে, ঠিকমতো বলতে না পারলে কী হবে? পুলিশ যদি তাদের থানায় ধরে নিয়ে যায় তবে মহাকেলেঙ্কারী হবে। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তার মুখ দেখানো কঠিন হবে। ক্ষণিক আগেই ড্রিম লাইটের লাল বাতি তার যে মুখকে রাঙ্গিয়ে তুলেছিল এখন উজ্জ্বল আলোতেও যেন তার সেই মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেছে।

পুলিশ অফিসার এবার ঢুকল প্রিয়ন্তীর রুমে, দরজায় কয়েকজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে রইল।

ঢুকেই গম্ভীর কণ্ঠে বলল, তোমার নাম কী?

প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী।

সুশান্ত তোমার কে হয়?

হ্যাজবেন্ড।

তুমি একজন হিন্দু বিবাহিতা মেয়ে তোমার শাঁখা-সিঁদুর কোথায়?

প্রিয়ন্তী থতমত খেয়ে গেল, স্যার অনেকদিন আগে আমাদের ঠাকুরের কাছে বিয়ে হয়েছে তখন একবার সিঁদুর পরেছিলাম। তারপর থেকে আর সিঁদুর পরিনা।

কিন্তু সুশান্ত যে বলল, তোমাদের আজকেই কোর্টে এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে হয়েছে?

ও ঠিক বলেছে স্যার।

পুলিশ অফিসার মাথা বাঁকিয়ে বলল, উহুঁ, তোমাদের কথা-বার্তা মিলছে না। কোর্টের এ্যাফিডেভিট আছে?

এ্যাফিডেভিট সঙ্গে নেই স্যার।

পুলিশ অফিসার মুহূর্তেই রেগে গেল, তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। সে প্রচণ্ড রেগে বলল, এই দু’জনকে হ্যান্ডকাপ লাগা, থানায় নিয়ে চল।

প্রিয়ন্তী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, স্যার আমাদের থানায় নিয়ে যাবেন না, বাবা জানলে হার্ট এ্যাটাক করবে।

কেন? তোমরা যদি বিয়ে করেছ তবে বাবা হার্ট এ্যাটাক করবে কেন? এই নিয়ে চল।

পুলিশ দু’জনকে হ্যাণ্ডকাপ লাগিয়ে পিক আপ ভ্যানে তুলল।

 

তেরো

 

হাজত খানায় আরো একজন ভদ্রলোক ছিল। তাকেও হোটেল থেকে ধরে নিয়ে এসেছে। সে স্কুল শিক্ষক, এবারই প্রথমে শিক্ষা বোর্ডে একটা কাজ নিয়ে রাজশাহী এসেছে, রাত্রি যাপনের জন্য একটা হোটেলে উঠেছে তারপর সেখান থেকে রাতে পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে। ভদ্রলোক এত করে অনুনয় করেছিল সে কোন অনৈতিক কাজ করেনি কিন্তু পুলিশ তার কথায় কর্ণপাত করেনি। ভদ্রলোকের গণ্ডদেশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কথায় কথায় বলল, বাড়িতে বড় ছেলেমেয়ে আছে তারা যখন তার বাবার চরিত্র জানবে তখন সে কীভাবে তাদের সামনে মুখ দেখাবে। তার এতদিনের সংসার, তার প্রতি স্ত্রীর গভীর ভালোবাসা ছিল, অন্ধ বিশ্বাস ছিল আজ সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

ভদ্রলোকের কাছ থেকে শুনে সুশান্তর শান্ত মন অশান্ত হয়ে উঠল। রাজশাহী শহরে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, বিভিন্ন জেলার ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে লেখাপড়া করতে আসে। শহরের কোন কোন পাড়ায় মাদকের আস্তানা আছে সেখানে গিয়ে ছেলেমেয়েরা মাদকের নেশায় অতলে ডুবে যাচ্ছে। লেখাপড়ার নামে বাড়ি থেকে বাবা-মা’র কষ্টার্জিত টাকা এনে ছেলেমেয়েরা মাদক সেবন করছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে পুলিশের মাসহারা গ্রহণের বিষয়টি পত্রিকায় নিউজ আকারে আসে। প্রথম ক’দিন চিরুনি অভিযান, সাঁড়াশি অভিযান নামে একটু একটু ধর পাকড় চলে তারপর আবার চালু হয়। শহরে চুরি, ছিনতাই, মাদকের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি লেগেই আছে। এই শহরে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। এসব ব্যাপারে প্রশাসন, নীতিনির্ধারক মহলের তৎপরতা এখনো ইলেকট্রনিক কিংবা প্রিন্টিং মিডিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

একজন সদ্য বিবাহিত দম্পতি যাদের সঙ্গে এ্যাফিডেভিট নেই কিংবা একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার একসঙ্গে রাত্রিযাপন সমাজে সামান্যতম বিরূপ প্রভাব ফেললেও সমাজের দৃষ্টিতে সেটা অসামাজিক কাজ, অপরাধও বটে। এই অপরাধের ভয়াবহতার চেয়ে মাদকের ভয়াবহতা, চুরি ছিনতাই, খুন জখম, ঘুষ আদান-প্রদান ইত্যাদি সমাজ এবং রাষ্ট্রে অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও মানুষের ধারণাটি এখনো সেকেলেই রয়ে গেছে। অপরাধের কুফল বিবেচনা না করে কোন কোন লঘু পাপে গুরুদণ্ড আবার অনেক বেশি অপরাধ করেও সমাজের চোখে পূজনীয় সেজে বসে আছে। হয়ত একদিন সমাজে অপরাধের সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারিত হবে, নিরীহ প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের অধিকার পাবে, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, চোর, ছিনতাইকারী এবং ঘুষ আদান-প্রদানকারীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু সুশান্ত এবং প্রিয়ন্তী তাদের আজকের অপমানের বিচার কোনদিন পাবে না।

সুশান্ত আপন মনে বিড়বিড় করে বলল, আমি আজ থেকে শুধু স্রষ্টা বলে ডাকবো, কোনদিন ভগবান, আল্লাহ, ঈশ্বর বলে সম্বোধন করব না। কারণ ভগবান শুধু মানুষ সৃষ্টি করেছে, মানুষে মানুষে এই বিভাজন তৈরি করেছে মানুষ। আমি এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী, আমি মানুষে মানুষে বিভাজনে বিশ্বাসী না।

প্রিয়ন্তীর সঙ্গে হাজতে যে মেয়েটি আছে সে পেশাদার কল গার্ল। শহরে একটা মেসে সিট ভাড়া নিয়ে থাকে, বাড়ি একটা নিভৃত পল্লীতে। বাবা প্রান্তিক চাষি, পাঁচ বোনের মধ্যে সে সবার বড়। গ্রামের একটা স্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেছে তারপর আর লেখাপড়া করেনি। গ্রামের তার এক পাড়াতো বোনের হাত ধরে শহরে এসেছে, সেই পাড়াতো বোনটি যৌনকর্মী। সে তাকে প্রথমএ পথে নামিয়েছে এখন সে নিজেই কখনো হোটেলে আবার কখনো ভদ্রলোকের বিলাসবহুল বাড়িতে নিজেকে বিক্রি করে।

কথায় কথায় মেয়েটি বলল, কী করব আপা? এই দেহটা ছাড়া তো আর কিছু নেই, বাড়িতে জানে আমি একটা ক্লিনিকে আয়ার কাজ করি। মাসে মাসে বাবা-মা’র কাছে কিছু টাকাও পাঠাই। এতে দোষের কী? যারা খারাপ বলে তারা তো দশটা টাকা দেওয়ার আগে আমার সুন্দর দেহটার দিকে চিক চিক চোখে তাকায়। এমনি ভালো আছি। আজ ধরে এনেছে ক’দিন পর আবার ছেড়ে দিবে, অসুবিধা কী? আবার কাজ করব।

প্রিয়ন্তী লক্ষ্য করেছে মেয়েটির মধ্যে কোন পাপবোধ নেই, কোন লজ্জা বা সংকোচ নেই। এভাবে বার বার ধরা পড়তে পড়তে তার লজ্জা হারিয়ে গেছে। পুলিশের দু’য়েকজনের আচরণে মনে হলো তাকে আগে থেকেই চিনে।

এই সব পথহারা মেয়েদের ধরে এনে শাস্তি দেওয়ার আইন আছে, এরা শাস্তি ভোগ করে আবার অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে কিন্তু এদের যদি সংশোধনের এবং তৎপরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকতো তবে এসব অপরাধ বার বার ঘটতো না।

সুশান্ত সারারাত মিজানের মোবাইলে রিং দিয়েছে কিন্তু মিজানের মোবাইল বন্ধ। সুশান্ত আগে থেকেই জানে মিজান রাতে মোবাইল বন্ধ করে ঘুমায় কিন্তু কে জানে যে এমন দুর্ঘটনা ঘটবে।

মিজানের মোবাইল চালু হলো সকাল সাতটায়। মোবাইলের রিং বেজে উঠতেই সে রিসিভ করল, হ্যালো সুশান্ত।

মিজান আমাদের খুব বিপদ।

কী হয়েছে?

প্রিয়ন্তী আর আমাকে পুলিশ থানায় ধরে এনেছে।

কেন?

ওরা বিশ্বাস করেনি আমরা হ্যাজবেন্ড-ওয়াইফ।

তোরা বলিসনি যে তোদের এ্যাফিডেভিট করে বিয়ে হয়েছে।

বলেছিলাম এ্যাফিডেভিট সঙ্গে নেই সেজন্য আমাদের ধরে এনেছে।

আচ্ছা তোরা একটু অপেক্ষা কর, আমি উকিলের বাসা চিনি, উকিলের বাসা থেকে এ্যাফিডেভিট নিয়ে থানায় আসছি।

আচ্ছা।

মিজান প্রায় আধঘণ্টার মধ্যে এ্যাফিডেভিট নিয়ে থানায় এলো।

মিজান এসে প্রথমে ডিউটি অফিসারের কাছে বসল, তাকে সবকিছু খুলে বলল। তারপর পুলিশ অফিসার ওয়্যারলেসে বিড় বিড় করে কী যেন বলল।

ওপর পাশ থেকে উত্তর  পাবার পর পুলিশ অফিসার বলল, থানায় কেস হয়ে গেছে, এখন এ্যাফিডেভিট দেখালেই আমরা ছেড়ে দিতে পারবো না। আমরা কোর্টে চালান দিচ্ছি আপনি কোর্টে এ্যাফিডেভিট দেখালেও জামিন হয়ে যাবে।

মিজান অনেক অনুরোধ করল কিন্তু কোন কাজ হলো না। পুলিশ অফিসার তার সিদ্ধান্তে অনড়। অবস্থা বেগতিক দেখে মিজান থানা থেকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে পুলিশ অফিসারকে ফিসফিস করে কী যেন বলল কিন্তু পুলিশ অফিসার না সূচক মাথা নাড়ল।

মিজান আবার বিনয়ের সঙ্গে বলল, স্যার কোর্টে উঠলে ব্যাপারটা হৈ চৈ হয়ে যাবে, মান-সম্মান বলে আর কিছু থাকবে না। ছাত্র মানুষ এর চেয়ে বেশি তো আর দিতে পারবে না স্যার।

পুলিশ অফিসারের মুখে যেন একটা আভা ফুটে উঠল।

পুলিশ অফিসার স্যান্ট্রি বলে ডাক দিতেই একজন কনস্টেবল এসে স্যালুট দিল, স্যার।

সুশান্ত আর প্রিয়ন্তীকে ছেড়ে দাও।

তিনজনই থানা থেকে বের হলো। সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী একটা রিক্সায় উঠল, কারো মুখে কোন কথা নেই, থানায় থাকতে দু’জনের চোখে-মুখে যে একটা অজানা আতঙ্ক ছিল, একটা অনিশ্চয়তা ছিল সেটা এখন কেটে গেছে। আগে প্রিয়ন্তী বিয়ের কথা বাড়ির কাউকে বলতে ভয় পেত কিন্তু আজ থানায় গিয়ে তার অনেকটা সাহস হয়েছে। বাড়ি থেকে বার বার করে বিয়ে দিতে চাইবে আর সে বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে যাবে তা আর সে চায় না। এ্যাফিডেভিটের পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হলো কিন্তু সামাজিক স্বীকৃতির জন্য চাই আনুষ্ঠানিক বিয়ে। তার বুকে আজ অনেকটা সাহস হয়েছে। এবার সে সামাজিকভাবে সুশান্তকে নিয়ে সংসার করতে চায়। সবাইকে বলতে চায় সুশান্ত তার হ্যাজবেন্ড। বর্ণ-গোত্র যা-ই হোক না কেন এ্যাফিডেভিট করে সে তাকে বিয়ে করেছে এবার সে হাতে শাঁখা মাথায় সিঁদুর পরে বিয়ে করতে চায়। প্রিয়ন্তী কয়েক মুহূর্ত সুশান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, সুশান্ত এখন কী করবে?

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রিয়ন্তীকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী বলো?

সুশান্ত চলো আমরা আজ বিকেলে ঠাকুরের কাছে যাই।

বিয়ে করতে?

প্রিয়ন্তী দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, হ্যাঁ।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর বাহুতে চাপ দিয়ে বলল, একবার আমার দিকে তাকাও।

প্রিয়ন্তী সুশান্তর চোখে চোখ রাখল, বলো।

এতদিনে তুমি আমার মনের কথা বলেছ।

 

চৌদ্দ

 

মন্দিরের সামনে বিরাট খোলা মাঠে একটা চৌচালা টিন সেড। সেখানে প্রতি বৎসর একবার করে কীর্তন হয়। তখন প্রচুর লোক সমাগম হয়। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসে, কীর্তন চলে একটানা অনেকদিন। মন্দির সংলগ্ন একটা আশ্রম আছে, আশ্রমে প্রতিদিন আগতদের জন্য খাবার-দাবার রান্না হয়, কত মানুষ এখানে খেয়ে পরে বাঁচে তার হিসেব নেই। প্রতিদিন অনেকে আসে ঠাকুরের পায়ে পুষ্পমাল্য দিতে। বৃদ্ধ পুরোহিত সারাদিন খালি গায়ে পৈতা ঝুলিয়ে সেবায় মশগুল থাকে আর মাঝে মাঝে প্রসাদ বিতরণ করে।

মন্দিরের গেটে দু’টা রিক্সা এসে দাঁড়ালো। একটা রিক্সায় সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী আর আরেকটা রিক্সায় দিলীপ এবং তিথি। কয়েকমাস আগে ওদের বিয়ে হয়েছে পারিবারিকভাবে ধুমধাম করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। রিক্সা থেকে নেমেই দিলীপ পুরোহিতের কাছে গেল।

পুরোহিত জিজ্ঞেস করলেন, এ্যাফিডেভিট নিয়ে এসেছ?

হ্যাঁ।

দেখি।

পুরোহিত এ্যাফিডেভিটটা দেখে কিছুটা অবাক বিস্ময়ে বলল, বরের নাম সুশান্ত দত্ত আর কনের নাম প্রিয়ন্তী চক্রবর্তী!

দিলীপ কিছু বলল না।

শঙ্কর জন্ম হবে বাপু, তোমরা তো আজকাল জাত-পাত কিছুই মানতে চাও না। এসব কাজ ভালো না, ভবিষ্যতে খারাপ হয়।

দিলীপ বলল, ঠাকুর মশাই, ওরা এ্যাফিডেভিট করে ফেলেছে এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতাটা বাকী আছে।

আচ্ছা ঠিক আছে, শাঁখা সিঁদুর এনেছ?

দিলীপ একবার এদিক-সেদিক তাকাতেই তিথি সাড়া দিল, কী হলো?

দিলীপ কাছে গেল, শাঁখা সিঁদুর এনেছ?

তিথি প্রিয়ন্তীর মেসে থাকে, এমনিতেই প্রিয়ন্তীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো কিন্তু এ্যাফিডেভিট করার সময় সে ছিল না। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। পরদিন সকালবেলা প্রিয়ন্তী তার কাছে শুধু গভীর রাতে হাজত বাসের কথাটুকু গোপন করে সব কথা বলেছে এবং আজ যে মন্দিরে গিয়ে বিয়ের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করবে সেকথাও বলেছে। শুনে তিথি নিজেই এক রকম আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেছে এবং দিলীপকেও তার মেসে আসতে বলেছে।

বিকেলবেলা সবাই যখন রিক্সায় উঠেছে তখন সুশান্ত কিংবা প্রিয়ন্তী কেউ-ই খেয়াল করেনি বিয়ে সম্পন্ন করতে কী কী লাগবে?

তিথি কাউকে না জানিয়ে সবকিছু কিনে রেখেছে, সে সুশান্ত আর প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে মুখ আংশিক বিকৃত করে একটা মুচকি হাসি হেসে বলল, সে কি আর আমি বাদ রেখেছি, যার বিয়ে তার তো এসবের কোন খেয়াল নেই। সে তো কনে সেজে বাসর ঘরে ঢোকার জন্য তৈরি হয়ে আছে।

প্রিয়ন্তী আজ লাল শাড়ি পরেছে, মা ছোটবেলা তাকে যে গয়নাগুলো দিয়েছিল সবগুলো পরেছে, কানে এক জোড়া ঝুমকা ঝুলছে, গলায় একটা হার। কপালে একটা বড় টিপ পরেছে। তিথি তাকে বউ সাজিয়ে মাথায় ঘোমটা দিতে একবার শিখিয়ে দিয়েছে। প্রিয়ন্তীকে আজ খুব সুন্দর মানিয়েছে, সে মাথা নত করে সুশান্তর পাশে দাঁড়িয়েছিল। তিথির কথাগুলো তার কানে গেল, অন্য সময় হলে সে অবশ্যই উত্তর দিত কিন্তু আজ কিছু বলল না। লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেল।

তিথি তার ছোট ব্যাগ থেকে শাঁখা সিঁদুরসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র বের করে দিল।

পুরোহিত মন্ত্র পড়ে প্রিয়ন্তীকে শাঁখা সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে বিয়ের কাজ সমাপ্ত করল।

 

বিয়ের পর তিথি খুব করে ধরল তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। তিথির বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর উপজেলায়। সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী দুজনে পরামর্শ করে তাদের সঙ্গে গেল। সেখানে তিনদিন কেটে গেল। তারপর একদিন রাতে প্রিয়ন্তী তার বাবার মোবাইলে রিং করল।

কিন্তু মোবাইল বন্ধ।

সে আর কাউকে মোবাইল করল না। তার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন দেখা দিল, বাবা তো কখনো মোবাইল বন্ধ রাখে না। কয়েকদিন পর আবার মোবাইল করল কিন্তু মোবাইল তখনো বন্ধ। তারপর সে তার অরুণের মোবাইলে রিং করল কিন্তু অরুণ মোবাইল রিসিভ করল না।

বিষয়টি প্রিয়ন্তীর মনে আরো বেশি চিন্তার কারণ হলো, কেউ কি আমাদের বিয়ের কথা বাড়িতে বলে দিয়েছে? না এই মেসে তাদের এলাকার কোন মেয়ে থাকে না, সুশান্তর মেসেও তেমন কেউ থাকে না। সুশান্তর সঙ্গে আমার বিয়ের কথা জানলে কি সবাই চুপ করে থাকতো? এতদিনে লঙ্কা কাণ্ড করে ফেলতো।

প্রিয়ন্তীর কাছে তার দিদি এবং জামাই বাবুর মোবাইল নাম্বারআছে কিন্তু সেদিন তার মেসে জামাই বাবু এসে সুশান্তকে দেখার পর আর তাদের মোবাইলে রিং দিতে গিয়ে প্রিয়ন্তীর বুক কেঁপে উঠল। জামাই বাবু কিংবা দিদিকে মোবাইল করলে তার কি বলে ঠিক নেই আর তার বিয়েতে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ জড়িত আছে জামাই বাবুর।

সেদিন বিকেলে প্রিয়ন্তী আর সুশান্ত মার্কেটে বেরিয়েছিল ছোট-খাটো কিছু কেনাকাটা করতে কিন্তু প্রিয়ন্তী বার বার করে আনমনা হয়ে যাচ্ছিল।

সুশান্ত ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে, সে মার্কেট থেকে বের হওয়ার জন্য বাইরের দিকে এগিয়ে গেল।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, সুশান্ত কোথায় যাচ্ছ?

সুশান্ত দাঁড়ালো, প্রিয়ন্তী পিছনে পিছনে এসে সুশান্তর কাছে এলো।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল, চলো আগে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি।

কেন?

তোমার মনটা ভালো হবে।

প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, আমার মন খারাপ?

হ্যাঁ।

পণ্ডিত মশাই তুমি কিভাবে বুঝলে যে আমার মন খারাপ?

শুধু মন খারাপ না, তোমার মনের সব খবর আমি বলে দিতে পারবো কিন্তু বলি না।

এটা আবার চাপাবাজি।

দু’জনে হেসে উঠল।

ততক্ষণে দু’জনে হাটতে হাটতে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।

একটা রিক্সা সামনে এসে দাঁড়ালো, মামা যাবেন নাকি?

চলো।

কিছুদূর যাওয়ার পর রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, মামা কই যাবেন?

সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কোথায় যাবে?

এতক্ষণ তো বললে আমার মনের খবর জানো, তবে আবার জিজ্ঞেস করছ কেন? বলে দাও।

তুমি পদ্মার পাড়ে যাও। সুশান্ত বলল।

প্রিয়ন্তী হেসে বলল, আমি পদ্মার পাড়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম?

সুশান্ত পণ্ডিতের মতো বলল, হ্যাঁ।

এক্সাক্টলি।

কয়েক মিনিটের মধ্যে রিক্সা পদ্মার পাড়ে এলো।

দু’জনে রিক্সা থেকে নেমে তাদের চিরচেনা পদ্মার পাড়ের একটা বেঞ্চে বসল।

প্রিয়ন্তীর আনমনা ভাবটা তখনো কাটেনি।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী বলোতো কী হয়েছে?

না কিছু হয়নি।

তাহলে আমি ঠিকভাবে তোমার মন পড়তে পারিনি, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো কিছু হয়নি।

প্রিয়ন্তী সুশান্তর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমার মনটা ঠিক পড়তে পেরেছ। আমার মনটা আসলে ভালো নেই।

কেন?

ক’দিন থেকে খুব বাবার কথা মনে পড়ছে।

মোবাইলে কথা বলো।

মোবাইল করছি কিন্তু বাবার মোবাইল বন্ধ, দাদা রিসিভ করছে না। আমার মনে হচ্ছে বাড়িতে কোনভাবে আমাদের বিয়ের বিষয়টা জানতে পেরেছে। সেজন্যই কেউ আমার মোবাইল রিসিভ করছে না।

তোমাদের পাড়ার কারো মোবাইল নাম্বার তোমার কাছে নেই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করো।

প্রিয়ন্তী গম্ভীর হলো, রাগান্বিত চোখে সুশান্তর দিকে তাকিয়ে বলল, সুশান্ত, এই তোমার বুদ্ধি? বাবা-মা’র সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই এটা প্রতিবেশীদের জানাবো?

সরি প্রিয়ন্তী।

সুশান্ত আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কী সিদ্ধান্ত?

আমি বাড়ি যাবো।

যাবে তবে সামান্য অসুবিধা আছে।

কী অসুবিধা?

না, আমি তোমার পথ রোধ করব না। তুমি যেতে চাইলে আমি তোমাকে পারমিশন দিব।

আমি বাবার বাড়িতে গেলে তোমার পারমিশন নিয়ে যেতে হবে!

হ্যাঁ আশ্চর্য হচ্ছ কেন? স্ত্রী বাবার বাড়ি গেলে তো স্বামীর পারমিশন নিয়ে যেতে হবে।

এই সুশান্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলোতো, আমি বাবার বাড়ি গেলে কি তোমার পারমিশন নিয়ে যেতে হবে?

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর চোখের দিকে তাকাল না। বলল, না আমি তোমাকে পারমিশন দিয়ে দিলাম।

প্রিয়ন্তী কৃত্রিম রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, সুশান্ত।

সুশান্ত মুখ তুলে তাকাল, তারপর দু’জনে হেসে ফেলল।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, তুমি একাই যাবে?

প্রিয়ন্তী প্রথমে ভেবেছিল একাই যাবে কিন্তু সুশান্তর আগ্রহ তাকে আরো চিন্তার মধ্যে ফেলল। সে সুশান্তকে জিজ্ঞেস করল, তুমি যাবে?

গেলে অসুবিধা কী?

জানি না কিন্তু আমার খুব ভয় হচ্ছে ওরা যদি তোমাকে অসম্মান করে।

আমি কিচ্ছু মনে করব না কিন্তু আমি তোমাকে একাই ছেড়ে দিব না। যা কিছু ঘটবে দু’জনে ফেস করব।

প্রিয়ন্তীর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল, তুমি খুব ভালো সুশান্ত।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর চোখের জল মুছে দিল।

কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই, হৃদয় আবেগ আল্পুত, অকৃত্রিম ভালোবাসায় বোবা দু’টি প্রাণী।

সুশান্ত প্রথম নীরবতা ভাঙ্গল, তাহলে আমরা যাচ্ছি কবে?

পরশুদিন যাই।

প্রিয়ন্তী ক’টা দিন ওয়েট করো, আগামী সপ্তাহে যাই।

কেন?

যেতে তো অনেক টাকা খরচ হবে, কোচিংয়ের বেতন পাই তারপর আগামী সপ্তাহে যাবো।

তুমি না ক’দিন আগে বললে ব্যাংকে তোমার কিছু টাকা আছে।

ছিল, এখন নেই।

কী করলে?

খরচ হয়ে গেছে।

প্রিয়ন্তী রেগে গেল, সুশান্ত তোমাকে না আমি একদিন বলেছি তুমি আমাকে কোনদিন মিথ্যা কথা বলবে না, কোন কথা লুকাবে না।

প্রিয়ন্তী কথাটা আমি আসলে তোমাকে বলতে চাইনি কিন্তু বলতে হচ্ছে, না হলে তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে না।

বলো।

মিজানের আমাদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে পুলিশকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তারপর এ ক’দিন আমাদের খরচ সবকিছু মিলিয়ে আর বোধ হয় বেশি টাকা নেই।

আমার কিন্তু তোমার ঐ বন্ধুটাকে বিশ্বাস হয় না, আমার মনে হয় ওতো টাকা লাগেনি।

প্রিয়ন্তী বিপদের সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন তাকে বিশ্বাস না করে আমাদের উপায়ও ছিল না।

তাই বলে উপকারের বিনিময় নিবে?

প্রিয়ন্তী বাদ দাও তো ওর কথা।

এখন কি প্রথমবার বউকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার মতো টাকাও তোমার কাছে হবে না?

ব্যালেন্স দেখলে তা হয়ত হবে। বলে সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে দুশ্চিন্তা মুক্ত করার জন্য বলল, তুমি কিছু ভেবো না একটা ব্যবস্থা হবেই।

প্রিয়ন্তী একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, ঠিক আছে।

 

পনেরো

 

বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেন রাজশাহী থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে ছাড়লো। বিরামপুর পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। কয়েক বছরের ছাত্র জীবনে প্রিয়ন্তী অনেকবার বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনে বিরামপুর যাতায়াত করেছে। ট্রেনে উঠেই  তার মনে হতো কতক্ষণে ট্রেন পৌঁছাবে, ট্রেনটা যেন তার পুরো গতিতে চলছে না। ট্রেনে উঠেই মা’র মুখটা মনে পড়তো, নারিকেলের নাড়ুর সঙ্গে মুড়ি মিশিয়ে খাওয়া প্রিয়ন্তীর খুব প্রিয়। প্রতিবার বাড়িতে গিয়ে সে আগে তার প্রিয় খাবার খেত, মা পাশে বসে দেখতো আর বলতো, হ্যাঁরে মা ওখানকার খাবার বুঝি ভালো না, না?

না মা, খাবার খারাপ না।

তবে শুকিয়ে গেছিস কেন?

মা একথা তুমি প্রতিবারই বলো, তুমি যতবার শুকিয়ে যাওয়ার কথা বলছ ততবার যদি আমি শুকিয়ে যেতাম তবে এতদিন আমার ওজন জিরো হয়ে যেত।

বাসন্তী বলতো মায়ের চোখ তো, তুই যেদিন মা হবি সেদিন বুঝবি।

মাতৃস্নেহ অতুলনীয় একথা অস্বীকার করার কেউ নেই, এ নিয়ে বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থ এবং সাহিত্যে কত যে উপদেশ, নির্দেশ এবং গল্প রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রিয়ন্তীরপ্রায়ই মনে হয় পৃথিবীতে কোন ধর্ম গ্রন্থ এবং সাহিত্যে মাতৃস্নেহের পাশাপাশি পিতৃ স্নেহের কথাটা এমনভাবে এড়িয়ে যাওয়ায় পুরুষদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।

দীপক বাবু প্রিয়ন্তীকে খুব স্নেহ করে। প্রিয়ন্তীর কাছে মাতৃস্নেহ এবং পিতৃ স্নেহের মধ্যে তফাৎটা খুব সামান্য। প্রিয়ন্তী যখন প্রথম রাজশাহী ভর্তি হলো তখন বিরামপুর পর্যন্ত এসে বাবা কিংবা অরুণ তাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে যেত আবার যেদিন রাজশাহী থেকে ফিরবে সেদিন বিরামপুর এসে তার পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করতো। অরুণের বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস হলো এর মধ্যে তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আজ ট্রেনে তার আসার কথা সে কাউকে জানায়নি। অনেকদিন থেকে মোবাইলে কারো সঙ্গে কথাও হয়নি।

অঞ্জনার সঙ্গে তার ঝগড়া সব সময় লেগেই থাকতো, সম্পর্কটা যেন ছিল খুব মধুর। ঝগড়া করার সঙ্গে সঙ্গে আবার কোন খাবার খেলে প্রিয়ন্তীকে ছাড়া মুখে তুলত না। প্রিয়ন্তীকে একাই কোন আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে যেতে দিত না তার একা থাকতে কষ্ট হবে বলে। পূযয় দু’জনে ঠিক একই রকম জামা কাপড় কিনত অথচ বিয়ের পর অঞ্জনা কেমন যেন বদলে গেল। এখন অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক হয়েছে, তার শ্বশুরবাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো কিন্তু তারপরও বাবার বাড়ি এলে কী নিয়ে যাবে তা নিয়েই অস্থির হয়ে পড়ে।

আজ ট্রেনে বসে প্রিয়ন্তীর নানান কথা মনে পড়ছে। একদিন যে মা নারিকেলের নাড়ু আর মুড়ি নিয়ে প্রিয়ন্তীর জন্য অপেক্ষা করতো, যে দাদা স্টেশনে তার ফেরার জন্য অপেক্ষা করতো আজ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিম্ন বর্ণের একজন ছেলেকে বিয়ে করে হাতে শাঁখা সিঁদুর নিয়ে উপস্থিত হয়ে সে তাদের কী জবাব দিবে? অথচ কোন উপায়ও ছিল না, প্রিয়ন্তীর আচরণে সংশয় হওয়ায় তারা বার বার করে যেভাবে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল তাতে করে যে কোন সময় তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দিয়ে দিত।

জানালার দিকে তাকিয়ে এমনি নানান কথা ভাবতে ভাবতে প্রিয়ন্তীর গণ্ডদেশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সুশান্ত চোখের পানি মুছে দিল, প্রিয়ন্তী মন খারাপ করছ কেন? আমি তো তোমার সঙ্গে আছি।

প্রিয়ন্তী মুখে কিছু বলল না। মনে মনে বলল, হ্যাঁ তুমি আছ বলেই তো ভরসা।

ছন্দ হীন শব্দের পতন ঘটিয়ে ট্রেন থামলো। শান্তাহার স্টেশন।

সুশান্ত জানালা দিয়ে ডেকে চিনাবাদাম কিনলো। তারপর প্রথম কয়েকটা বাদাম খোসা ছড়িয়ে প্রিয়ন্তীর হাতে দিল।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলল, অনেকদিন প্রেম করলাম অথচ তোমার সঙ্গে কোনদিন কলেজের মাঠে বসে বাদাম খেতে পারলাম না।

প্রিয়ন্তী আর হাসি ধরে রাখতে পারল না। সে বলল, সুশান্ত জীবনের কেবল শুরু আগে খেতে পারনি তাতে কী? এখনো সামনে সারাজীবন পড়ে আছে।

 

বজ ঠাকুর তখন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। দূর থেকে একটা রিক্সা ভ্যান আসতে দেখে চোখ পরিষ্কার করে ভালো করে তাকাল। ততক্ষণে ভ্যান মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বজ ঠাকুর জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী না?

প্রিয়ন্তী প্রণাম জানিয়ে বলল, হ্যাঁ ঠাকুর মশাই আমি প্রিয়ন্তী।

বজ ঠাকুর মুখ গম্ভীর করে বিড় বিড় করে কী বলল তা বোঝা গেল না। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার হাতে শাঁখা, মাথায় সিঁদুর ব্যাপার কী?

প্রিয়ন্তী বজ ঠাকুরকে সুশান্তর সঙ্গে পরিচয় করে দিল, ঠাকুর মশাই ও হলো সুশান্ত আমার স্বামী।

সুশান্ত কী? নামের পরে পদবী আছে না?

প্রিয়ন্তী মুখ গম্ভীর করে বলল, সুশান্ত দত্ত।

বজ ঠাকুর পৈতা ছুঁয়ে বলল, রাম, রাম, রাম। শেষ পর্যন্ত একটা নিচু জাতের ছেলেকে বিবাহ করিলে, এই বংশে এই রকম কাজ আগে কেউ করে নাই। কলি যুগ জাত-পাত সব উচ্ছন্নে গেল।

প্রিয়ন্তী আর দাঁড়ালো না। সোজা ভ্যান থেকে মালামাল নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে বারান্দায় মালামালগুলো রাখল। বারান্দার একাংশে একটা চেয়ার ছিল, সেই চেয়ারে সুশান্তকে বসতে দিল। মাকে তার চোখে পড়েনি, বউদি রান্নাঘর থেকে আঙিনায় এসে চেঁচিয়ে বলল, কী ব্যাপার প্রিয়ন্তী? কাউকে না বলে একেবারে বিয়ে করে স্বামী কেনিয়ে চলে এলি?

প্রিয়ন্তী বউদিকে প্রণাম করল।

সুশান্তও প্রণাম করতে গেল।

থাক আর প্রণাম করতে হবে না। নিজের জাতের তো বারোটা বাজিয়েছিস এখন এসেছিস ভাইকে সমাজের কাছে ছোট করতে, না?

বউদি।

তুই বারান্দায় বস, আমি তোর দাদাকে মোবাইল করছি, তুই ততক্ষণ ঘরে ঢুকিস না।

কথাটা প্রিয়ন্তীর বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হলো। এটা তার বাবার বাড়ি, এই বারান্দায় সে ছোটবেলা হামাগুড়ি দিয়ে বড় হয়েছে, যে ঘরের সঙ্গে বারান্দায় সে মালপত্র রেখেছে সে ঘরে তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। এই ঘরে ঢুকতে তার কারো অনুমতি লাগবে একথা সে কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। তারওপর একথা যদি তার মা-বাবা কিংবা ভাইবোন বলতো তবে সেকথা মানতে তার কম কষ্ট হতো কিন্তু তার বউদি যে মাত্র কয়েক মাস আগে এ বাড়িতে এসেছে তার মুখ থেকে এ কথা শুনে প্রিয়ন্তীর যেন হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত হলো।

সে জিজ্ঞেস করল, কেন?

বউদি একথার কোন জবাব না দিয়ে আঙিনার অপর প্রান্তে গিয়ে মোবাইল করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে অরুণ এলো। তার চুল সম্প্রতি ন্যাড়া করা হয়েছে, মাথার ওপর কাঁটার মতো নতুন চুল গজাতে শুরু করেছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দু’টো লাল যেন চোখ দিয়ে রক্ত ফেটে বের হচ্ছে।

প্রিয়ন্তী ও সুশান্ত দুজনে প্রণাম করল।

অরুণ রাগান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, এই ছেলেটার নাম কি সুশান্ত দত্ত?

হ্যাঁ।

তুই এ রকম একটা নিচু জাতের ছেলেকে বিয়ে করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসার সাহস কোথায় পেলি?

প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে বলল, এটা আমার বাবার বাড়ি, দাদার বাড়ি, জামাইকে তো এখানেই নিয়ে আসবো দাদা।

না, বাপ-দাদার মুখ তুই রাখিসনি। তুই সমাজে আমাকে ছোট করেছিস, তোর সঙ্গে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই-

অরুণের মোবাইলের রিং বেজে উঠল।

সে রিসিভ করল, হ্যালো জামাইবাবু।

বউদি মোবাইল করেছে, প্রিয়ন্তী নাকি সেই নিচু জাতের ছেলেটাকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এসেছে।

হ্যাঁ।

আমার একটা কথা আছে দাদা?

কী কথা বলুন?

প্রিয়ন্তী আমাদের সবার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে এখনো কোন উঁচু-নিচু জাতের রক্ত মিশ্রিত হয়নি। নিচু জাতের কারো সঙ্গে আমাদের কোন আত্মীয়তাও নেই। তাই আমি বলছি প্রিয়ন্তী এবং সুশান্তকে যদি আপনারা মেনে নেন তবে আমার সঙ্গে আপনাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না।

ঠিক আছে তোমার কথা আমার মনে থাকবে, বলে অরুণ মোবাইল রেখে দিল।

প্রিয়ন্তী তখনো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। সুশান্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেয়ারে বসে আছে।

অরুণ বলল, প্রিয়ন্তী এখনি জামাই বাবু মোবাইল করল, তোর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখলে সে আমাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখবে না, তোর পাপের জন্য তো আমরা প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি না। তুই বেরিয়ে যা, আর কখনো এ বাড়িতে আসবি না। আমি মনে করব প্রিয়ন্তী নামে আমার কোন বোন নেই।

এতক্ষণ প্রিয়ন্তী খেয়াল করেনি, অরুণের মাথা ন্যাড়া কেন? সে সব সময় লুঙি পরে থাকে আজ সে ধুতি পরেছে কেন?

এমন সময় তার মা বাড়িতে ঢুকল। মা সাদা শাড়ি পরেছে, হাতে শাঁখা-সিঁদুর নেই। তার আর বুঝতে বাকী রইল না।

সে তার মায়ের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

বউদি বলল, এখন মায়া কান্না করে আর কি হবে? বাবার মাথাটা তো তুই খেলি। মা আমি দিব্যি করে বলছি আপনি কিন্তু প্রিয়ন্তীকে কোনভাবেই মেনে নিবেন না।

বাসন্তীও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সেই কান্নার রোল ভেদ করল বউদির কথাগুলো, আপনি এ কি করছেন মা? বাবার কথাগুলো আপনার মনে নেই।

বাসন্তী জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, তুই চলে যা প্রিয়ন্তী, আর কখনো এ বাড়িতে আসবি না।

প্রিয়ন্তী চোখ মুছল তারপর দৃঢ়ভাবে বলল, আসবো না কিন্তু তার আগে আমাকে বলতে হবে বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে মোবাইল করলে না কেন?

সেটা তোর বাবার নির্দেশ, স্বর্গবাসী হওয়ার আগে সবাইকে বলেছে তোকে যেন তার স্বর্গবাসী হওয়ার খবর না জানাই।

প্রিয়ন্তী কিছু বলল না, তার বুক চিরে একটা কথা অষ্ফুটস্বরে বের হলো, বাবা।

অরুণ বলল, হ্যাঁ বাবাই বলেছে।

প্রিয়ন্তী কান্না ভাঙ্গা গলায় বলল, তোমার ওপর আমার ভরসা ছিল মা। আমি আশা করেছিলাম সবাই ত্যাগ করলেও তুমি আমাকে ফেলে দিবে না কিন্তু আমার ধারণা ভুল। আমি চলে যাচ্ছি মা, আর কোনদিন বোন হয়ে ভাইয়ের কাছে এবং মেয়ে হয়ে মায়ের কাছে অধিকার নিয়ে আসবো না। আমি শুধু তোমার আশীর্বাদ চাই মা, আর কিচ্ছু চাই না। বলে প্রিয়ন্তী সুশান্তকে ইশারা করে বলল, চলো সুশান্ত, তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। স্ত্রী হয়ে তোমাকে শ্বশুরবাড়ি এনে শুধু অপমান করলাম।

সুশান্ত বলল, চলো প্রিয়ন্তী।

 

ষোল

 

সুশান্তর চেয়ে প্রশান্ত বড়, শৈশব থেকেই সে কিছুটা দুরন্ত প্রকৃতির তাই কেউ কেউ তাকে প্রশান্ত নামে না ডেকে দুরন্ত বলে ডাকতো। প্রায় দিনই স্কুল থেকে কোন না কোন অভিযোগ আসতো, বেশিরভাগ দিনই ক্লাসের পড়া ফাঁকি দিয়েছে, কোনদিন কাউকে মেরেছে, কোনদিন ধাক্কা দিয়েছে, কোনদিন শিক্ষককে গালি পর্যন্ত দিয়েছে। প্রশান্তর স্কুল জীবনের এসব অভিযোগ শুনতে শুনতে তার বাবা এক রকম অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। সে মনে মনে ঠাকুরের কাছে জপ করছিল কোনভাবে স্কুল জীবন শেষ হলেই হয়। তারপর কলেজে নতুন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হয়ত প্রথম প্রথম এত কিছু করার সাহস পাবে না।

কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টা। তার স্কুল জীবনের অভিযোগগুলো দুষ্ট ছেলে বলে কান মলে দেওয়া কিংবা কয়েকটা কঞ্চির বাড়ি দেওয়া পর্যন্তই সমাপ্তি ঘটতো। কিন্তু কলেজে তার বাড়াবাড়ি ক্ষমার অযোগ্য। হঠাৎ করে প্রশান্ত বাড়ি থেকে উধাও হলো, খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। বেশিদূর যায়নি তার পিসির বাড়িতে গেছে। কারণ হিসেবে জানা গেল, পিসি তাকে খুব আদর করে, তাই বেড়াতে গেছে, ক’দিন থেকে আবার চলে আসবে। বাবা-মা দু’জন আপাতত: আশ্বস্ত হলো কিন্তু প্রকৃত কারণ অনুমান করা গেল আরো দু’দিন পর। কলেজ থেকে একটা নোটিশ এলো, আগামীকাল কলেজে মিটিং আছে, মিটিংয়ের আলোচ্য বিষয় দেখে বাবা কৃষাণ দত্ত-এর মুখ যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল, সে দুর্গা, দুর্গা বলে নোটিশটা পকেটে পুরলো।

কৃষাণ দত্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি, শুধুমাত্র আবাদি জমিই এক’শ বিঘার কম হবে না, প্রায় দশ বিঘা জমির ওপর একটা আম বাগান আছে। একটা রাইস মিল আছে, বড় আকারের চাতাল আছে। ব্যবসায়ী হিসেবেও সে পোক্ত, জীবনের শুরু কৃষি কাজ দিয়ে, মাত্র দশ বিঘা জমি নিয়ে। দশ বিঘা জমিকে সে শত বিঘা অতিক্রান্ত করেছে, ব্যাংকে শূন্য স্থিতিকে সে হয়ত কোটিতে উন্নীত করেছে কিন্তু এসব উন্নতির কারণ হিসেবে তার আছে মেধা, শ্রম এবং টাকার কড়াক্রান্তি হিসাব। হিসেবের বেলায় সে পাকা। কোটি টাকা আছে বলে একটি পয়সাও তার কাছে নগণ্য নয়।

এলাকায় তার একটা নাম, ডাক আছে। সে রাজনীতি করে না কিন্তু যারা রাজনীতি করে তারাই নির্বাচনে নমিনেশন পেপার দাখিলের আগে আশীর্বাদ নিতে আসে। ইউনিয়ন পরিষদে গেলে চেয়ারম্যান সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার মুখের ওপর কোন কথা বলার মতো আচরণ তাকে কেউ কোনদিন করেনি।

অধ্যক্ষের চেম্বারে ঢোকার আগে কৃষাণ দত্ত পাশের কক্ষে তিনটা মেয়েকে বসে গল্প করতে দেখে এবং মিটিংয়ে রাজেনকে দেখে তার অনুমান হয়েছে এবার প্রশান্ত কোন বড় ধরনের অপরাধ করেছে, সেটা নারী ঘটিত অপরাধ হওয়ার আশংকাই বেশি। কলেজে মিটিং শুরু হয়েছে। কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি, সদস্যগণ, অধ্যক্ষ আর পাশের গ্রামের রাজেন চন্দ্র শীল। মিটিংয়ে থমথমে ভাব, একটা পিনপতন নীরবতা।

সব নীরবতা ভেঙ্গে অধ্যক্ষ সাহেব প্রশান্তর ঘটানো অপ্রিয়, অমার্জনীয় ঘটনাটি মার্জিতভাবে বলতে শুরু করল, দাদা আপনি এলাকার একজন সম্মানী মানুষ, কথাটা আপনাকে বলতে আমার সংকোচ হচ্ছে। তবু না বলে উপায় নেই ব্যাপারটা আমার নিজের হলে আমি আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা করে দিতাম কিন্তু অন্তত এতটুকু না করলে ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কোর্ট-কাচারি পর্যন্ত গড়াতে পারে তাতে আমাদের কলেজের যেমন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে তেমনি আপনারও সম্মান হানি হতে পারে।

কৃষাণ বাবু বুঝতে পারল, ব্যাপারটা অতি জটিল। সে মলিন মুখে বলল, প্রিন্সিপাল সাহেব আপনি বলুন।

ঘটনাটা তিনদিন আগে। প্রশান্ত কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার ওপর রাজেনের মেয়ের ওড়না টেনে ধরেছে। তার আগেরও কিছু ঘটনা আছে। কলেজে নবীন বরণের দিন থেকেই সে তার সঙ্গে একটু গায়ে পড়ে কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু মেয়েটি তার সঙ্গে হয়ত কথা বলেনি তাই বলে রাস্তার ওপর একটা মেয়ের ওড়না টেনে ধরবে?

কৃষাণ বাবু বুকে যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। তার মনে হলো মাটি ফেটে যাক সে মাটির ভিতর ঢুকে যাক। সে মাথা নত করে বসে রইল।

কারো মুখে কোন কথা নেই, সবাই কৃষাণের দিকে তাকিয়ে রইল।

ধীরে ধীরে নীরবতার অবসান হলো। কেউ কেউ ফিস ফিস করে বিভিন্ন ধরণের কথা বলতে শুরু করল। কৃষাণ বাবু শুনেও না শোনার ভান করে বসে রইল।

সভাপতি সাহেব বললেন, দাদা আপনি বলুন, আপনার মেয়ের হলে কী করতেন?

কৃষাণ বাবু মাথা নত করে বিনীত কণ্ঠে বলল, প্রশান্ত যে অপরাধ করেছে তা ক্ষমার যোগ্য নয়, এ বিষয়ে আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিবেন আমি তাতে দ্বিমত করব না।

কমিটির একজন সদস্য বলল, দাদা শুনেছি প্রশান্ত নাকি স্কুলেও অনেক কাণ্ড ঘটিয়েছে?

কৃষাণ বাবু মাথা নত করে নীরবে বসে রইল।

না আমি বলছিলাম প্রশান্ত ভবিষ্যতে আর কোন অঘটন ঘটাবে না আপনি যদি এমন নিশ্চয়তা দিতে পারেন তবে না হয় এবারের মতো কমিটি তাকে সংশোধনের সুযোগ দিত।

কৃষাণ বাবু এ কথার কোন উত্তর খুঁজে পেল না। প্রশান্ত তার নিজের ছেলে কিন্তু তার প্রতি তার বিন্দু মাত্র বিশ্বাস নেই। সে যে কোন সময় যে কোন ধরনের কাণ্ড ঘটাতে পারে। এবারে যে কাণ্ড ঘটিয়েছে তাতে তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মুখে জুতা মারার সমতুল্য অপমান করা হয়েছে। সে আর এমন কোন কাণ্ড ঘটাবে না এই নিশ্চয়তা দিয়ে যদি সে আবার কোন অপকর্ম করে বসে তখন এই কমিটি এবং শিক্ষকদের সামনে সে হাজির হবে কী করে?

কৃষাণ বাবু নিজের মুখ দিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথাটি জোরালোভাবে না বলে কৌশল অবলম্বন করল, প্রশান্ত আপনাদের ছাত্র, আপনারা কিছুদিন থেকে তার চালচলন দেখছেন। আপনাদের দৃষ্টিতে যদি মনে হয় সে আর এমন কোন অপকর্ম করবে না তবে তাকে এবারের মতো সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই উত্তম আর আপনারা যদি মনে করেন তার কারণে কলেজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশংকা আছে তবে আপনারা সেটা ভেবে দেখবেন।

অধ্যক্ষ সাহেব বলল, দাদা আমরা সবাই আপনাকে শ্রদ্ধাকরি, প্রশান্তর মঙ্গল চাই, আপনি বরং প্রশান্তকে অন্য কোন কলেজে ভর্তি করে দিন।

সভাপতি সাহেব বললেন, হ্যাঁ আমিও তাই বলছিলাম।

কৃষাণ বাবু বুঝতে পারল প্রকারান্তরে কর্তৃপক্ষ প্রশান্তকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করতে চায়। সে বলল, দেখুন আমিও একজন এই কলেজের শুভাকাঙ্ক্ষী, শ্রশান্তর উপস্থিতি যদি কলেজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে তবে আমিও আপনাদের সঙ্গেই থাকবো।

সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রশান্তকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। কৃষাণ বাবুর মুখ যেন ক্ষণিকের মধ্যেই শুকিয়ে গেল। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। তার ধারণা ছিল বিচারে প্রশান্তর পাপে তার প্রায়শ্চিত্ত এ পর্যন্তই সমাপ্ত হলো কিন্তু না এখানেই শেষ নয়। শিক্ষকদের মধ্যে একজন বলল, কিন্তু মেয়েটির কী হবে? একথা তো আর লুকিয়ে থাকবে না। ক’দিন পরেই কথাটা সবার মুখে মুখে হয়ে যাবে তখন মেয়েটার বিয়ে দিতে তো আর কম সমস্যা হবে না।

এ কথার অর্থ বুঝতে কারো বাকি রইল না। কিন্তু মেয়েটির বিয়ের দায়ভার নেওয়ার ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষ যে যুক্তি দেখালো তা গ্রহণযোগ্য এবং যুক্তিযুক্ত। সভাপতি সাহেব বললেন, কলেজে প্রশান্ত যে অপরাধ করেছে তার সর্বচ্চ্য শাস্তি কলেজে থেকে তার ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে এর চেয়ে বেশি করা কলেজের আওতা বহির্ভূত। এ বিষয়ে আর কলেজের কিছু করণীয় নেই।

কৃষাণ বাবু লক্ষ্য করল রাজেন এ বিচারে সন্তুষ্ট নয়। দু’য়েকজন শিক্ষক বিষয়টি জিইয়ে রাখতে ইন্ধন দিচ্ছে। কৃষাণ বাবু রাজেনকে বিনয়ের সুরে বলল, রাজেন আমি সবকিছু বুঝি, ব্যাপারটা যদি ঠিক উল্টো হতো তোমার ছেলে আমার মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করতো তবে তুমি কী করতে? তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো, প্রশান্তকে ছোট মানুষ মনে করে মাফ করে দাও।

কিন্তু দাদা।

কৃষাণ বাবু রাজেনকে আশ্বাস দিল, রাজেন তোমার মেয়ের বিয়েতে যদি কোন সমস্যা হয়, মানে আমি বলছিলাম যদি পণের বিষয়ে যদি তেমন আর্থিক সমস্যা হয় তবে আমাকে বলো আমি তোমাকে সহযোগিতা করব।

কৃষাণ বাবুর একথা বলার অর্থ হলো, রাজেনকে এখানেই থামাতে না পারলে সে হয়ত কোর্ট-কাচারি পর্যন্ত যেতে পারে। কৃষাণকে সবাই যেমন শ্রদ্ধা করে তেমনি তার শত্রুরও অভাব নেই। পরে ব্যাপারটা আরো জটিল হওয়ার আশংকায় সে রাজেনকে এই আশ্বাস দিল। লজ্জায় তার মাথা কাটা গেল। কারণ এটা শুধু রাজেনকে সহযোগিতাই নয় একরকম আর্থিক দণ্ড।

প্রশান্তর লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটল। কৃষাণ বাবু তার বোনকে প্রশান্তকে নিয়ে আসার জন্য খবর দিল। পরদিন পিসি আর প্রশান্ত এলো। কৃষাণ বাবু তার বোনকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। পিসি তো প্রশান্তর ওপর ভীষণ রাগ করল, ছিঃ প্রশান্ত তুই শেষ পর্যন্ত এমন একটা কাণ্ড ঘটালি যে লজ্জায় দাদার মাথা হেঁট হয়ে গেল।

প্রশান্ত মাথা নত করে বসে দাঁড়িয়ে রইল।

কৃষাণ বাবুর বোনের নাম মাধবী। ভাই-বোনের মধ্যে সম্পর্ক খুব ভালো। দুজনের সংসারেই যে কোন সিদ্ধান্ত ভাই-বোন মিলে গ্রহণ করে। কৃষাণ বাবু প্রশান্তকে বাইরে যেতে বলে মাধবীকে জিজ্ঞেস করল, মাধবী প্রশান্তকে দিয়ে আর লেখাপড়া হবে না। তাকে বিয়ে দেওয়ায় উত্তম না হলে যে কোনদিন কোন নিচু জাতের, গরীব ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে ফেলতে পারে। আমি প্রশান্তর জন্য তার স্কুল জীবনে অনেক অভিযোগ মোকাবেলা করেছি কিন্তু তখনকার অভিযোগ আর এখনকার অপরাধগুলো ভিন্ন ধরনের তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি প্রশান্তকে বিয়ে দিব।

এত অল্প বয়সে?

যে ছেলে রাস্তায় কোন মেয়ের ওড়না টেনে ধরতে পারে তার বয়স অল্প না। এখনি তাকে বিয়ে না দিলে সে যে কোন দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তুমি মেয়ে দেখো।

প্রশান্তর জন্য মেয়ে দেখা শুরু হলো। অনেক ভালো ভালো ঘরের সম্বন্ধ এলো তবে প্রশান্তর গুণে নয়, কৃষাণ দত্তের ধন-সম্পত্তির গুণে। কৃষাণ দত্ত একে একে সুক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ করে যে মেয়েটিকে নির্বাচন করল সে মেয়েটি বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। বাবা ধনী মানুষ, উচ্চ বিত্ত কৃষক, অনেক জমিজমা আছে। ভদ্রলোক বুদ্ধিমান, নিজের ছেলে না থাকায় নিজের পঞ্চাশ বিঘা জমি মেয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। ব্যাংক ব্যালেন্সের টাকা মেয়ের নামে নমিনি করা আছে। মেয়ের গায়ের রং কিছুটা শ্যামলা তাতে কৃষাণ বাবুর কোন আপত্তি নেই।

কৌশলে প্রশান্ত একদিন মেয়ে দেখে এসেছে, প্রশান্তরও মেয়ে পছন্দ হয়েছে। প্রশান্তর শুধু এই মেয়েকে নয় আজকাল যে মেয়েকে দেখে তাকেই পছন্দ করে, তাকেই বিয়ে করতে ইচ্ছা করে।

বিবাহ সুসম্পন্ন হলো। নগদ হিসেবে পণ হলো একটা মোটর সাইকেল, পনেরো ভরি স্বর্ণালংকার, মেয়ের ঘর সাজানো, একটা সিনেমা কোয়ালিটি রঙিন টি.ভি, একটা ফ্রিজ আরো অনেক আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। প্রশান্তর বিয়ে দিয়ে কৃষাণ বাবু অনেকটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

 

সুশান্তর এক ক্লাস ফ্রেন্ডের মাধ্যমে কৃষাণ বাবু তার বিয়ের কথা শুনে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। কৃষাণ বাবু মহামায়াকে ডেকে বলল, সুশান্তর কথা শুনেছ?

কী কথা?

সুশান্ত বিয়ে করেছে।

বিয়ে করেছে মানে?

বিয়ে করেছে মানে বিয়ে করেছে।

আমাদেরকে না জানিয়ে?

হ্যাঁ আমাদেরকে না জানিয়ে কোথাকার কোন ভিখারিকে বিয়ে করেছে তার ঠিক আছে। শুনেছি মেয়ের বাবার অবস্থা ভালো কিন্তু বেঁচে নেই, মা-ভাই এই বিয়ে মেনে নেয়নি। মেয়ের জন্য চিরতরে বাড়ির দরজা বন্ধ।

তাতে কী মেয়ে আর বাবার বাড়ি যাবে না।

বাবার বাড়ি গেলেই বা লাভ কী? তিনি তো আগেই পটল তুলেছেন। বিষয়-সম্পত্তি যা আছে তা একমাত্র পুত্র সন্তানের, হিন্দু ধর্মে মেয়েদের তো পৈত্রিক সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই। ছেলেটা আমার সব স্বপ্নভেঙ্গে দিল। প্রশান্ত কম শিক্ষিত তারওপর সে যা পণ পেয়েছে তাতে তার সারাজীবন কাজ না করে খেলেও কেটে যাবে। আর সুশান্ত তো একটা শিক্ষিত ছেলে সে বিয়েতে কত পণ পেত তুমি হিসেব করেছ।

তুমি তো সব সময় শুধু টাকার হিসেব করো।

টাকার হিসাব করি বলেই তো আজ এতকিছু করতে পেরেছি, আমার বন্ধুরা অনেকেই এখনো আগের মতোই আছে, কেউ কেউ নিঃস্ব হয়েছে আর আমি, আমি কত উপরে উঠেছি। পৃথিবীর সবকিছুতেই হিসেবি হতে হয়। তাছাড়া উপরে উঠা যায় না, তোমাকে আমি বলে রাখলাম সুশান্ত কোনদিন উপরে উঠতে পারবে না।

বাপ হয়ে এমন কথা বলতে হয় না। সুশান্ত বিয়ে করেছে আমি একবার মোবাইল করছি বউকে নিয়ে আসুক আমি বউ দেখবো।

আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করে বউ নিয়ে আমার বাড়িতে আসবে আর তুমি বউ দেখবে, না? তোমার যদি বউ দেখতে খুব ইচ্ছা করে তবে আমাকে একেবারে ছেড়ে ছোট ছেলের কাছে চলে যাও। আর কোনদিন ফিরে আসবে না, আর না হয় বউকে দেখবে আমার মৃত্যুর পর।

এ তুমি কি বলছ?

হ্যাঁ আমি ঠিকই বলেছি, আমি বেঁচে থাকতে সুশান্তকে আমি কোনদিন ছেলে হিসেবে গ্রহণ করব না। তুমিও কোনদিন তার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে না। যদি বলো তবে তুমি সুশান্তর সঙ্গে চলে যাবে স্বামীর সংসার ছেড়ে ছেলের সংসারে ঝিয়ের কাজ করে খাবে। আর আমি শীঘ্রই সুশান্তকে ত্যাজ্য করব।

মহামায়া হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল, ওগো তুমি এমন নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিও না। ভগবান শাস্তি দিবে।

 

সতেরো

 

সুশান্ত তার বিয়ের কথা বাবাকে বলেনি। বাবা জানতে পেরেছে কী না সেকথাও সে জানে না। আগে সুশান্ত মাঝে মাঝে বাড়িতে মোবাইল করতো কিন্তু বিয়ের পর থেকে সুশান্তর বাবাকে মোবাইল করতে সংকোচ বোধ করছে। কিন্তু না কৃষাণ বাবুও কোনদিন একটা মোবাইল পর্যন্ত করল না। বাবা যে তার বিয়ের কথা জানতে পেরেছে একথা সুশান্ত বুঝতে পারেনি। সেদিন দুপুরবেলা সুশান্ত বাবাকে মোবাইল করল, হ্যালো বাবা নমস্কার।

কৃষাণ বাবু বলল, খালি খালি আর আমাকে নমস্কার দিয়ে কী করবি? মাথায় তো লাথি দিয়েছিস, পায় ছুঁয়ে প্রণাম করে আর কী করবি?

বাবা।

হ্যাঁ, তোর শুভ বিবাহের খবর আমি শুনেছি।

বাবা বউমাকে দেখবে না?

কার বউমা? আমি তোকে বিয়ে দিয়েছি যে আমার বউমা হবে? যদি আমার বউমা হতো তবে তো আমিই সব দায়িত্ব পালন করতাম।

বাবা, তুমি আবার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে তোমার বউমাকে ঘরে তোল।

বাঃ, বাঃ আনুষ্ঠানিকতা পালন করে ঘরে তুলব একটা রাস্তার মেয়েকে। আহারে বড় বউমার বাবার বাড়ি থেকে প্রশান্তর মতো একটা গোমূর্খ কত জিনিসপত্র, গয়না-গাঁটি, জমি-জমা পণ পেল আর তুই তো একটা অনার্স পাস ছেলে তোর ওপর আমি কত আশা করেছিলাম, আমার কথা না হোক নিজের কথা ভেবে হলেও তো বিয়ে করার আগে একটু ভাবতে পারতিস।

বাবা এসব কথা মোবাইলে-

তুই কি ভাবছিস? আমি তোকে কাছে ডেকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে এসব কথা বলব? যতদিন ঐ মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবি ততদিন আমার বাড়ির দিকে মুখ ফিরে তাকাবি না। কোনদিন মনে করবি না তোর বাবা বেঁচে আছে। আমিও মনে করব সুশান্ত মরে গেছে, বলতে বলতে কৃষাণ বাবুর কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

মহামায়া কৃষাণ বাবুর উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনে কাছে এসে দাঁড়ালো, কী হয়েছে? কার সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলছ?

কৃষাণ বাবু মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল, কার সঙ্গে আবার, তোমার গুণধর ছেলের সঙ্গে, বউকে নিয়ে বাড়িতে আসতে চায়।

কৃষাণ বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে মহামায়া কিছু বলার সাহস পেলো না। কিন্তু মায়ের মন অনেকটা দুর্বল হয়ে গেল। অনেকদিন থেকে সুশান্তকে দেখেনি, সে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে। নিজের বউমাকে একবার দেখার ইচ্ছা হলো। মহামায়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ধীরে ধীরে কৃষাণ বাবুর মুখের ক্রুদ্ধ ভাবটা কিছুটা নমনীয় হলো।

মহামায়া কৃষাণ বাবুর কাছে গিয়ে বলল, গরমে ঘেমে গেছ, টেবিল ফ্যানটা একবার কাছে এনে দিব।

কৃষাণ বাবু কর্কশ কণ্ঠে বলল, মতলবটা কী? ছেলের পক্ষ নিয়ে ওকালতি করতে এসেছ নাকি?

মহামায়ার ধারণা ভুল। সে কৃষাণ বাবুর মুখের ভাব দেখে সে মনের ক্রুদ্ধতা অনুমান করতে পারেনি। তার রাগ বিন্দুমাত্রও কমেনি। সহজে কমারও নয় কারণ প্রশান্ত তার শ্বশুরালয় থেকে অনেক পণ পেয়েছে আর সুশান্ত খালি হাতে একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসবে এত উদার মনের মানুষ কৃষাণ বাবু নয়। কিন্তু মহামায়া সহজ-সরল প্রকৃতির মহিলা, কৃষাণ বাবুর মতো জটিল, হিসেবী মানুষের মনের গভীরতা মাপার কৌশল মহামায়ার জানার কথা নয়।

মহামায়া আর কোন কথা বলল না। সে চোখের জল মুছে তার কাজে চলে গেল।

 

সুশান্ত শান্ত প্রকৃতির কিন্তু জেদি। ছোটবেলা থেকে বাবা-মা’র কাছে যে আবদার করতো তা বাবা কোনভাবে পাশ কাটিয়ে গেলেও মা লুকিয়ে তার আবদার পূরণ করতো। শৈশবে তার আবদার পূরণ না হলে বাসার তৈজসপত্র ভাংচুর করতো, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ভাংচুরের অভ্যাসটা গাম্ভীর্যে রূপান্তরিত হয়েছে। আজ বাবার সঙ্গে কথা বলা শেষে মোবাইলটা সিটের ওপর রেখে কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে বসে রইল।

বিকেলবেলা প্রিয়ন্তী মোবাইল করল, হ্যালো।

হ্যাঁ প্রিয়ন্তী বলো।

তোমার কী হয়েছে?

কিছু না।

নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, তুমি রেডি হও তো আমি তোমার মেসের গেটে আসছি।

আচ্ছা।

কিছুক্ষণের মধ্যে প্রিয়ন্তী সুশান্তর মেসের গেটে এসে মিস কল দিল।

সুশান্ত বেরিয়ে এলো, তুমি কি রেডি হয়ে আমাকে মোবাইল করেছিলে নাকি?

কেন?

খুব তাড়াতাড়ি এলে তো।

হ্যাঁ।

কোথাও যাবে?

পদ্মার পাড়ে।

কেন?

তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।

চলো, বলে একটা রিক্সা ডেকে দুজনে রিক্সায় উঠল।

শরত কাল, পদ্মায় অনেক চর জেগেছে, সেই চরের কাশবনে অনেক ছেলেমেয়ে নিরিবিলি পরস্পরের গায়ে গা ছুঁয়ে গল্প করার জন্য যায়। আগে প্রিয়ন্তী আর সুশান্তও যেত, সুশান্ত প্রিয়ন্তীর কোলে মাথা রাখতো আর প্রিয়ন্তী সুশান্তর চুল আঙ্গুল এলিয়ে দিত। এখন আর যায়না, শুধু কাশবনে নয়, ভদ্রা পার্কেও যায় না। ওসব জায়গায় প্রেমিক-প্রেমিকারা যায়, স্বামী-স্ত্রীরা খুব একটা যায় না। কারণ সবার চোখে ফাঁকি দেওয়ার সময়টা তারা অতিক্রম করেছে, যাবার আগ্রহটাও অনেকটা কমে গেছে। আজকাল খুব বেশি হলে পদ্মার পাড়ে আসে প্রয়োজনীয় কথা বলে চলে যায়।

প্রিয়ন্তী আর সুশান্ত একটা বেঞ্চে বসলো।

সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী কী খবর বলো?

সুশান্ত সবকিছু তো বোঝা হলো, আমার বাড়ি থেকে তো আর টাকা আসবে না। ঐদিকে মুখ করে আর তাকাবার সুযোগও নেই। বাবা থাকলে হয়ত কান্নাকাটি করে একসময় তার মন গলাতে পারতাম, মা আছে কিন্তু মায়ের হাতে তো সংসারের কোনকিছু নেই। হিন্দু সম্প্রদায়ে বিয়ের পর বাপের বাড়িতে মেয়েদের কোন অধিকার থাকে না।

সুশান্ত চুপ করে বলল। প্রিয়ন্তী কী বলতে চাইছে তা খুব সহজ, সুশান্তর বুঝতে অসুবিধা হলো না। সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, প্রিয়ন্তী তুমি কী করতে চাও?

আবার আমাকেই জিজ্ঞেস করছ কেন? কি করা উচিত তুমি বলো?

প্লিজ প্রিয়ন্তী তুমি বলো আমার মাথা কাজ করছে না।

আমি তিথির সঙ্গে কথা বলেছি, আমরা শেয়ার করলে ওরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবে। এমনিতেই তো আমাদের দু’দিকে খরচ হচ্ছে তাই না? বলে প্রিয়ন্তী সুশান্তর উত্তরের অপেক্ষায় রইল।

সুশান্ত বলল, টাকা?

দু’জন মেসে থাকলে আমাদের টাকা লাগছে না? মনে করো সেই টাকাটা এক জায়গায় খরচ হবে। দু’জনে টিউশনি করব। আর বাকি টাকা-

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই বলল, বাকি টাকা কোথা থেকে আসবে?

প্রিয়ন্তী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার বাড়ির খবর কি জেনেছে?

হুঁ।

তারপর।

সুশান্ত কিছু বলল না। সে মাথা নত করে বসে রইল।

প্রিয়ন্তী বলল, সুশান্ত আমার কিছু গয়না আছে, আপাতত: সেখান থেকে কিছু বিক্রি করে ওদের সঙ্গে বাসায় উঠি, তারপর দুজনে টিউশনি করাবো। আমাদের দুজনেরই ইংরেজিতে অনার্স, কোচিং সেন্টারগুলোতে চাকরি পেতে আমাদের খুব একটা অসুবিধা হবে না। অবশিষ্ট সময় বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়াবো।

প্রিয়ন্তী তোমার মাথায় যে বুদ্ধি এসেছে আমার মাথায় কোনদিন সে বুদ্ধি আসতো না। তবে আমার একটা কথা আছে?

কী কথা?

তোমাকে গয়না বিক্রি করতে হবে না।

টাকা।

আমি ব্যবস্থা করব।

টাকা কোথায় পাবে?

আছে।

প্রিয়ন্তী একবার আকাশের দিকে তাকালো। আকাশে সাদা খণ্ড খণ্ড মেঘ খেলা করছে, পাখিরা নীড়ে ফিরতে শুরু করছে। হাল্কা হাল্কা কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। প্রিয়ন্তী বলল, চলো, শীত পড়ছে।

হ্যাঁ চলো।

 

আঠারো

 

একটা তিনতলা বাসার তৃতীয় তলায় একটা তিন কক্ষ বিশিষ্ট বাসা পাওয়া গেল। দুইটি বেড রুমের সঙ্গেই একটি করে এটাচ্‌ড বাথ, একটি করে বারান্দা, পুরো বাসার জন্য একটি ড্রয়িং রুম এবং একটি কিচেন আছে। ড্রয়িং রুমটা দুই পরিবারকে শেয়ার করে ব্যবহার করতে হবে, ঠিক ডাইনিং স্পেসটা এবং কিচেনটাও তাই। বাসার ধরণ দেখে যে কেউ মনে করবে যেন বাসাটা শেয়ার করে থাকার জন্য ছোট পরিবারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। বাসাটা প্রিয়ন্তীর খুব পছন্দ হয়েছে, তিথিরও।

বাসায় থাকতেই প্রিয়ন্তী সুশান্তকে মোবাইল করল, এই শুনছ?

বলো?

একটা বাসা পাওয়া গেছে, বাসাটা আমার খুব সুন্দর লেগেছে, তোমারও খুব পছন্দ হবে।

বেশ তো, তিথির সঙ্গে আলাপ করো।

তিথিরও খুব পছন্দ হয়েছে সে টাকা এডভান্স করতে বলেছে।

তুমি টাকা নিয়ে গেছ?

না, তিথিই টাকা এডভান্স দিবে আমাদের পরে দিলেও হবে।

ঠিক আছে কনফার্ম করে ফেলো।

তিথি প্রিয়ন্তীর কাছ থেকে শুনে এক মাসের টাকা এডভান্স করে করল। ভাড়া আড়াই হাজার টাকা।

দিলীপ ধনী লোকের ছেলে, তার মনটাও বেশ উদার। সে নিজে থেকে বলল, সুশান্ত তোমাদের এক হাজার টাকা দিলেই হবে। আমরা দেড় হাজার টাকা দিব, তুমি কি বলো তিথি?

হ্যাঁ ঠিক আছে।

প্রিয়ন্তী এবং সুশান্ত কিছুটা লজ্জিত হলো, তারা বুঝতে পারল দিলীপ আর তিথি তাদের করুণা করছে। কিন্তু কেউ কিছু বলল না।

মাসের এক তারিখে নতুন বাসায় উঠল। দু’জনে তাদের মেস থেকে বিছানা বালিশ নিয়ে গিয়ে বিকেলে বাজারে বের হলো, বাজার থেকে একটা খুব কম দামি চৌকি, কিছু থালা-বাসন আর কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরল। নতুন সংসার, হাভাতে সংসার, টাকা-পয়সার অভাবে তেমন কোন জিনিসপত্র কেনা হয়নি কিন্তু তাদের দু’জনের মধ্যে যেন  না পাওয়ার কোন অতৃপ্তিও নেই।

তিথি আর দিলীপ বাসায় ফিরল আরো একটু বেশি রাতে। তারা বিয়ের সময় অনেক কিছু জিনিসপত্র পেয়েছে সামান্য কিছু যা কেনার ছিল তাও আজ কিনে নিয়ে এসেছে। সবকিছু কোন রকমে বাসায় তুলতেই তিথি হাঁপিয়ে উঠেছে। সে ডাইনিং স্পেসে সবকিছু এলোমেলো করে রেখেই প্রিয়ন্তীর রুমে এসে হাঁফ ছেড়ে বসল, ওহ্‌ ক্লান্ত হয়ে গেলাম রে।

বস, এক গ্লাস জল দিই।

না, থাক লাগবে না, একটু বিশ্রাম নিই।

প্রিয়ন্তী মৃদু কণ্ঠে বলল, তোদের তো অনেক কিছু আছে আমরা তো না পেলাম কোন পক্ষ থেকে, না পারলাম নিজেরা কিনতে।

ও নিয়ে তুই কিছু ভাবিস না, আমার সবকিছু তুইও ব্যবহার করবি, এই যে আমাদের ফ্রিজ সেখানে তুইও মাছ-মাংস রাখতে পারবি, আমরা একসঙ্গে বসে টি.ভি দেখব।

কৃতজ্ঞতায় প্রিয়ন্তীরকণ্ঠস্বরবুজে এলো, দু’চোখ ছল ছল করে উঠল, তিথি তুই খুব ভালো রে।

সুশান্ত এতক্ষণ বাথ রুমে ছিল, এবার বের হয়ে বলল, তিথিকে কিছু খেতে দিয়েছ?

প্রিয়ন্তী একটু অপ্রস্তুত হলো, ও তাই তো।

তিথি প্রিয়ন্তীর হাত চেপে ধরল, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তার রুমে গেল।

সামান্য চাল, ভাগাভাগির চুলো নিয়ে সুশান্তর কিছু গচ্ছিত টাকা নিয়ে প্রিয়ন্তী আর সুশান্তর সংসার শুরু হলো। তারপর সুশান্তর শুরু হলো একটা চাকরি জোগাড় করার পালা, চাকরি তো নয় কাজ বললেই হয়। প্রায় মাস খানেকের মধ্যে একটা কোচিং সেন্টারে সুশান্তর চাকরি হলো, আগামী মাসের এক তারিখ থেকে যোগদান করতে হবে। বেতন যৎ সামান্য যা দিয়ে না চালানো যাবে সংসার, না বলা যাবে কোন আত্মীয়-স্বজনকে। দুজনেই ইংরেজিতে অনার্স, সুশান্তর একবার ইচ্ছা হলো প্রিয়ন্তীকে কোচিং সেন্টারে চাকরি করতে দিয়ে নিজে বাইরে একটা বা দু’টা প্রাইভেট টিউশনি করলে তাদের দিন হয়ত কোনমতে চলে যাবে কিন্তু কোচিং সেন্টারের তাতে আপত্তি না থাকলেও পরক্ষণেই সুশান্ত তার মত পাল্টালো। কারণ কোচিং সেন্টারের অধিকাংশ শিক্ষক তরুণ, তাদের মধ্যে প্রিয়ন্তীকে চাকরি করতে দিতে তার বুক যেন কেঁপে উঠল।

তাদের বিষয়টা অনেক বন্ধু-বান্ধবকে বলা ছিল। ক’দিনের মধ্যে একটা প্রাইভেট টিউশনি যোগাড় হলো। ক্লাস ওয়ানের একটা বাচ্চাকে বাসায় গিয়ে পড়াতে হবে। বাড়ির কর্তা-গিন্নী দু’জনে পেশায় ডাক্তার, বেতন নির্ধারিত হলো দু’হাজার টাকা। কিন্তু তারা চায় শিক্ষয়িত্রী।

সবকিছু শুনে সুশান্ত খুশি হলো। আগামী মাসের এক তারিখ থেকে পড়াতে হবে। রাতে সুশান্ত আপন মনে হিসেব করতে শুরু করল, তোমার বেতন দু’হাজার টাকা আর আমার বেতন দেড় হাজার টাকা মোট সাড়ে তিন হাজার টাকা।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, কী হিসেব করছ?

আমাদের দু’জনের ইনকাম সাড়ে তিন হাজার টাকা, সাড়ে তিন হাজার টাকায় সংসার চালাতে পারবে তো?

প্রিয়ন্তী ধীর শান্ত কণ্ঠে বলল, পারতে হবে।

আমার তো শুধু একবেলা ডিউটি, আরো দু’য়েকটা টিউশনি পেলে আমি করব। তখন আরো কিছু ইনকাম বাড়বে।

তখন খরচও বাড়বে না?

সুশান্ত বুঝতে পারল না, মানে?

প্রিয়ন্তী সুশান্তকে আস্তে আস্তে বলল, ঘরে নতুন মুখ আসবে না?

দু’জনে হেসে উঠল।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীকে জড়িয়ে ধরল।

তিথি জোরে ডাক দিল, এই প্রিয়ন্তী, এত হাসাহাসি কীসের হচ্ছে রে?

প্রিয়ন্তী নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো, এই ছাড়ো, ছাড়ো।

তিথি আর প্রিয়ন্তীর মধ্যে খুব মিল। প্রায় সব কথা দু’জনে শেয়ার করে। তিথির ডাক শুনে প্রিয়ন্তী ঘর থেকে বের হলো, কী রে ডাকছিস কেন?

টি.ভি’তে একটা ভালো নাটক হচ্ছে, দেখবি আয়।

প্রিয়ন্তী আর সুশান্ত নাটক দেখতে চলে গেল।

তিথি আর দিলীপ প্রথমে প্রেমে পড়ে তারপর উভয়ের বাবা-মা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দিয়েছে। বিয়েতে একটা বাসার জন্য প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র দিয়েছে সেগুলো তিথি তার শ্বশুরবাড়ি রেখে এসেছে, এখন যেটা প্রয়োজন পড়ছে সেটা তার শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে আসছে। তাদের সংসারের এক রকম সব জিনিস আছে। তাছাড়া তিথির মা প্রায় দিনই মোবাইল করে, তার শ্বশুরও তাকে খুব স্নেহ করে মাঝে মাঝে মোবাইল করে খোঁজ-খবর নেয়।

কথায় কথায় তিথি দিলীপকে ধমক দেয়, দেখো কিন্তু আমাকে কিছু বললে বাবাকে বলে দিব।

বাহ আমার বাবার কাছে তুমি কমপ্লেইন করবে আমার বিরুদ্ধে?

হ্যাঁ, তুমি নিশ্চয়ই জানো তোমার বাবা আমাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করে। আমি কোন কমপ্লেইন করলে কাজ তো হবেই। তারওপর আমি যদি একটু কান্নার অভিনয় করে মোবাইল করি তবে এসে হাজির হবে।

দিলীপ তিথির কাঁধে হাত দিয়ে আদর করে বলে, লক্মী সোনা কমপ্লেইন করো না, আমাকে একটু ভালো থাকতে দাও।

তিথি নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। থাক আর বলতে হবে না।

দিলীপ আর তিথির সুখ দেখে প্রিয়ন্তীর হিংসে হয় না, মনটা জুড়িয়ে যায়। সে এমন একটা জীবন আশা করেছিল। আসলে স্রষ্টা মানুষের সব আশা পূরণ করে না।

সুশান্ত আর প্রিয়ন্তী তাদের ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং স্পেস থেকে তিথিকে ডাক দিল, এই তিথি আসবো?

চলে আয়।

সবাই এক সঙ্গে টি.ভি দেখল।

 

বাড়িওয়ালা ভালো মানুষ, তাদের একটা চিলাকোঠার চাবি দিয়েছে। দিনের বেলা কখনো কখনো তারা ছাদে কাপড় শুকাতে দেয়। ছাদে উঁচু প্যারাপেট আছে সহজে পড়ে যাওয়ার আশংকা নেই। ছাদের ওপর টবে কিছু গাছ লাগানো আছে। মাঝে মাঝে ফুল ফোটে, সুগন্ধ ছড়ায়।

প্রিয়ন্তী ছোটবেলা গান শিখেছে, তারপর আর প্র্যাকটিস করা হয় না। তবে সে মাঝে মাঝে গুন গুন করে গান গায়। সুশান্তকে দেখে লজ্জা পায়, গান বন্ধ করে। তারপর সুশান্তর শত অনুরোধেও আর গায় না আবার যখন বাসায় একা থাকে তখন গান গায়।

জ্যোৎস্না প্রিয়ন্তীর খুব প্রিয়। মাঝে মাঝে জ্যোৎস্না রাতে দু’জনে ছাদে যায়। গল্প করে, আড্ডা দেয়। কোন কোন দিন তিথি আর দিলীপও ছাদে যায় তবে তিথির ঘুম বেশি, অনেকদিন পর হয়ত একবার যায়। প্রিয়ন্তীদের ঘরটা দক্ষিণ দিকে, দক্ষিণে একটা জানালা এবং একটা বারান্দা আছে। বারান্দায় জ্যোৎস্না খেলা করছে, দেখে প্রিয়ন্তীর খুব ছাদে যেতে ইচ্ছা করছে। সে সুশান্তকে দু’বার বলল, এই চলো না, আজ খুব ভালো জ্যোৎস্না হয়েছে।

সুশান্তরও আগ্রহ আছে কিন্তু সে আজ প্রিয়ন্তীর গান শুনতে চায়। তাই সে বলল, তুমি বারান্দায় গিয়ে জ্যোৎস্নায় স্নান করে এসো, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।

প্রিয়ন্তী একটা চিমটি কেটে বলল, এখন কেবল রাত দশটা বাজে, তুমি কোনদিন এত আগে ঘুমাও না। জ্যোৎস্না দেখে আমি ছাদে যেতে চাইবো তাই ঘুমানোর ভাব দেখাচ্ছ, না? ওঠো।

সুশান্ত কৃত্রিম জড়ানো গলায় বলল, বাদ দাও তো, আজ আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।

তোমার ঘুম পাচ্ছে, না? আমি আজ তোমাকে প্রথম দেখছি, তুমি রাত দশটার সময় ঘুমানো মানুষ? ওঠো।

সুশান্ত প্রিয়ন্তীর একটা হাত টেনে ধরল, উঠবো তবে একটা শর্ত আছে?

বলো।
একটা গান শোনাতে হবে।

আমি গান গাইতে পারিনা তো।

যেভাবে পারো, সেভাবেই গাইতে হবে।

আচ্ছা চলো।

 

উনিশ

 

কয়েক মাস কেটে গেল। এ ক’মাসে তার সব সময় শুধু প্রিয়ন্তীর কথা মনে পড়েছে, চোখের সামনে সবকিছু আছে কিন্তু তবুও অন্তরটা সব সময় খাঁ খাঁ করছে। সব সময় মনে হচ্ছে কি যেন নেই। তার প্রিয়ন্তীর শৈশবের কথা মনে পড়ছে, তার মা একদিন বলেছে সে যখন প্রথম হাঁটতে শিখল তখন এক মুহূর্ত বসে থাকতো না, আঙ্গিনায় সব সময় হাঁটাহাঁটি করতো। ছোট্ট মেয়ে হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যেত। কৈশোরে সে যখন স্কুলে পড়তো তখন তার রেজাল্ট সব সময় ভালো হতো। ক্লাসে শিক্ষকরা সবাই তাকে খুব স্নেহ করতো।

প্রিয়ন্তীর বাবাও তাকে খুব স্নেহ করতো, প্রথম সে যখন রাজশাহী ভর্তি হলো তখন সে প্রায়ই মেয়েকে দেখতে আসতো। প্রিয়ন্তী বাড়িতে এলে মেয়ে মানুষের মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব শুনতো। তার বাবা বেঁচে থাকলে প্রিয়ন্তীকে এভাবে ফেলে দিত না। কিন্তু প্রিয়ন্তীরমা’র শুধু চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছুই নেই, স্বামীরমৃত্যুর পর মেয়েদের নিজেদেরই ছেলের সংসারে বোঝা হয়ে থাকতে হয়। তারওপর অবাধ্য মেয়েকে মেনে নিয়ে সংসারের বোঝা আরো বাড়ানোর মতো কথা অরুণকে সে কোনদিন বলতে চায়নি কিন্তু মায়ের মন শত বাধাতেও সে নিজেকে সামলাতে পারেনি।

একদিন অরুণকে বলল, অরুণ অনেকদিন তো হলো আমার প্রিয়ন্তীকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে, তুই আমাকে একবার রাজশাহী যাবার ব্যবস্থা করে দে বাবা।

মা এটা আসলে হয় না, বাবার নিষেধ আছে, প্রিয়ন্তীকে বাড়িতে আশ্রয় দিলে বা তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে বাবা স্বর্গেসুখে থাকবে না। তাছাড়া প্রিয়ন্তীকে মেনে নিলে সমাজে আমাদের মান-সম্মান বলে কিছু থাকবে না। তারপরও আমি তোমাকে রাজশাহী পাঠিয়ে দিতাম কিন্তু তুমি তো কোনদিন রাজশাহী যাওনি। শেষ পর্যন্ত তুমি কোন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলো।

মা জানে এগুলো অরুণের তাকে না পাঠানোর অজুহাত মাত্র। সে আর কিছু বলল না জল মুছল।

কয়েকদিন আগে অঞ্জনা এসেছিল, মা অঞ্জনাকে বলল, অঞ্জনা তোরা দু’বোন, তুই এসেছিস যদি প্রিয়ন্তীও আসতো তবে খুব আনন্দ হতো। তুই একটু অরুণকে বোঝা তো মা, অরুণ সম্মতি দিলে আমি মোবাইল করে প্রিয়ন্তীকে নিয়ে আসবো।

অঞ্জনা যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল, মা তুমি আসলে বুঝতে পারছ না, তোমার জামাই আমাকে বলে দিয়েছে ঐ নিচু জাতের ছেলেকে ত্যাগ না করলে তোমার জামাই কোনদিন এ বাড়িতে তো আসবে না। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। তুমি কি চাও তোমার একটা মেয়েকে মেনে নিতে গিয়ে আরেকটা মেয়ের সংসার ভাঙ্গবে?

মা আর কিছু বলেনি। চোখের জল মুছে ভগবানের কাছে বিচার দিয়েছে।

 

সুশান্তর মা প্রায়ই তাকে মোবাইল করে, প্রিয়ন্তীর সঙ্গেও মোবাইলে কথা বলে। মোবাইলে যেন তার কথার শেষ নেই। কথা বলতে বলতে যেন তার কান্না জড়িত কণ্ঠস্বরভেসে আসতো, সুশান্ত সকালে নাস্তা খেয়েছিস? বউমা ভালো রাঁধতে পারে? শুনেছি তুই নাকি বাসা ভাড়া নিয়ে বউমাকে নিয়ে উঠেছিস? এত টাকা পাচ্ছিস কোথায়?

মা তুমি এত চিন্তা করো না তো, আমরা এখন বড় হয়েছি না। আমি একটা কোচিং সেন্টারে চাকরি করছি, টিউশনি করছি, প্রিয়ন্তীও একটা টিউশনি করছে-

মা সুশান্তর কথা মাঝে বাধা দিয়ে বলল, বউমাও চাকরি করছে, তুই জানিস না এ বাড়ির বউরা কোনদিন চাকরি করে না, গৃহস্থ ঘরের বউ সংসার করে।

মা আগের দিনের বউরা তেমন লেখাপড়া জানতো না, অল্প লেখাপড়া শিখেই বাপ-মা বিয়ে দিয়ে দিত। এখন মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে, সব মেয়েরাই কোন না কোন চাকরি করছে। সংসারে তারাও অবদান রাখছে। খারাপ কী?

তোর সব যুক্তি আমি মানছি কিন্তু তোর বুঝি টাকা-পয়সার অভাব যাচ্ছে তাই বউমাকে চাকরি করতে দিয়েছিস। টাকার অভাবটা না হয় বউকে চাকরি করতে দিয়ে মিটালি কিন্তু আমাকে দেখতে ইচ্ছা করে না, বলতে বলতে মায়ের কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

সুশান্ত আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। সে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, করে।

একবার আয় না বাবা বাড়িতে।

মা, তুমি তো জানো বাবা আমাকে বাড়ি যেতে নিষেধ করেছে।

বাবা না হয় নিষেধ করেছে কিন্তু আমি তো কিছু বলিনি।

মা, সংসারে আর তোমার অধিকার কতটুকু, আমাদের সংসারে তো বাবাই সব। অযথা আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে নিজে অপমান হবে কেন?

ঠিক আছে বাবা, তোকে আমার দেখতে ইচ্ছা করছে আমি ক’দিন পরেই রাজশাহী আসবো।

এসো মা।

সুশান্তদের বাড়ির পাশের গ্রামের এক ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, তাকে দিয়ে আগেও তার মা কয়েকবার টাকা পাঠিয়েছে। আজ কথা বলা শেষ করার পর সুশান্তর মনে হলো মা আবার টাকা পাঠাবে। হ্যাঁ সত্যি সত্যি পরদিনই সুশান্তর সেই প্রতিবেশী ছেলেটা তাকে মোবাইল করল, দাদা আপনি যে মেস চেঞ্জ করেছেন তা তো জানি না। আমি একবার আপনার সঙ্গে দেখা করব।

সুশান্ত তাকে তার বাসার ঠিকানা দিল।

প্রায় আধঘণ্টা পর ছেলেটি এলো। তাদের বাড়ির অবস্থা জানালো। তারপর সুশান্তর হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বলল, মাসী দিয়েছে, আর বলেছে কয়েকদিনের মধ্যে তিনি রাজশাহী আসবেন।

সুশান্তর জিজ্ঞেস করল, মা ভালো আছে?

হ্যাঁ।

সুশান্তর চোখের সামনে মায়ের অশ্রুসজল মুখ ভেসে উঠল। সুশান্তর গণ্ডদেশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

 

বিশ

 

সকালবেলা দু’জনের কোন কাজ থাকে না, প্রতিদিন বিকেলে সুশান্ত কোচিং সেণ্টারেযায় আর প্রিয়ন্তী যায় প্রাইভেট টিউশনি করতে। দুজনের গন্তব্য দু’দিকে, সুশান্তর কোচিং তাদের বাসা থেকে কাছেই কিন্তু প্রিয়ন্তীর প্রাইভেট একটু দূরে, প্রায় দু’কিলোমিটার হবে। প্রিয়ন্তী এই দু’কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে যায়, তবুও তার ক্লান্তি নেই। প্রিয়ন্তী ঘরে ঢুকতেই সুশান্ত যখন একটা হাসি দেয় তখন তার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

বেশিরভাগ দিনই প্রিয়ন্তী প্রাইভেট পড়িয়ে আগে চলে আসে, কোন কোন দিন সুশান্ত আগে এলে প্রিয়ন্তীর জন্য বারান্দায় পায়চারি করে। প্রিয়ন্তীর বেলায়ও ঠিক তেমনি কোনদিন সুশান্তর ফিরতে দেরি হলে প্রিয়ন্তী বারান্দায় পায়চারি করে প্রথমে একবার মোবাইল করে জিজ্ঞেস করে, এই তোমার কি আসতে দেরি হবে?

সুশান্ত হ্যাঁ বা না বলে মোবাইল রেখে দেয় কিন্তু প্রিয়ন্তীর যেন তবুও অবসর নেই। সে বার বার মিস কল দেয়। একদিন বাসায় এসে সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, প্রিয়ন্তী তোমাকে তো বললাম আমি আসছি। তুমি এত চঞ্চল কেন?

তাড়াতাড়ি এসো আমি একাই কী করব? বলো।

তিথির সঙ্গে গল্প করো।

প্রিয়ন্তী হেসে ফেলে, তিথির সঙ্গে গল্প করলেই যদি হতো তবে তো দু’জনে মেসে থেকে গল্প করতাম, তোমাকে আর বিয়ে করতে হতো না।

প্রিয়ন্তী যে ছেলেটিকে পড়ায় তার নাম অর্পণ। সে খুব মিশুক প্রকৃতির। পড়ালেখায় ভালো কিন্তু পড়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প করে। তার গল্পের মধ্যে অনেকটা অংশ জুড়ে থাকে তার বাবা-মা এবং সংসারের কথা। এমন কথা বলে ফেলে যে প্রিয়ন্তীকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। একদিন বলল, জানেন ম্যাডাম কাল আব্বু-আম্মু অনেক রাত পর্যন্ত ঝগড়া করেছে।

প্রিয়ন্তী কোন আগ্রহ দেখাল না।

অর্পণ বইটা বন্ধ করে বলল, আগে গল্পটা বলি তারপর পড়ব।

প্রিয়ন্তী বলল, না বাবা থাক, আরেকদিন শুনব আজ তুমি পড়।

না আপনাকে আজকেই শুনতে হবে। তারপর কী হলো জানেন?

প্রিয়ন্তী চুপ করে রইল।

তারপর আব্বু আম্মুর মোবাইলটা ভেঙ্গে দিয়েছে।

প্রিয়ন্তী কিছু বলল না।

কেন ঝগড়া হয়েছে জানেন? টাকা নিয়ে।

এবার প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, কীসের টাকা?

টাকা নিয়ে আব্বু-আম্মু প্রায় ঝগড়া করে। প্রতিদিন আব্বুও অনেকগুলো টাকা নিয়ে আসে, আম্মুও টাকা আনে। আর আমি কিছু নিতে চাইলে বলে টাকা নাই, টাকা নাই।

প্রিয়ন্তী আপন মনে বলল, এত টাকা, গাড়ি-বাড়ি তবুও টাকা নেই। একটা মানুষের জীবন-যাপনের জন্য আর কত টাকা প্রয়োজন?

অর্পণ এবার বই খুলল, আপনি আমার কথা শুনছেন না, আমার কথা কেউ শুনে না। আব্বুকে বললেও শুনে না, আম্মুও শুনে না, আপনিও শুনেন না। আমি আজই আব্বুকে বলে দিব, আপনি আমার কথা শুনেন না।

না বাবা, সব কথা আব্বু-আম্মুকে বলতে হয় না আর বড়দের সব কথা শুনতেও হয় না।

তাহলে আমি কার সঙ্গে কথা বলব? বলুন?

তুমি স্কুলে যাও, সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলবে। আমি পড়াতে আসি আমার সঙ্গে কথা বলছ আর কত কথা বলতে হবে। অন্য সময় তুমি নিজের পড়া পড়বে, টি.ভি দেখবে।

আমার তো তাড়াতাড়ি পড়া মুখস্থ হয়। আপনি বলুন আমি আপনাকে কোনদিন পড়া দিতে পারি না?

হ্যাঁ পারো।

সেজন্যই তো আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান। কাল থেকে আমি আর তাড়াতাড়ি পড়া মুখস্থ করব না।

না বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি পড়া মুখস্থ করবে আমি পড়া শেষে তোমার সঙ্গে গল্প করব, এখন পড়।

পরদিন থেকে পড়ানো শেষ করে প্রিয়ন্তী চলে আসতে চাইলে অর্পণ একরকম মুখ ভার করতো কিন্তু প্রিয়ন্তীরও কিছু করার ছিল না। কারণ কোনদিন বেশি দেরি হলে সুশান্ত মন খারাপ করে, প্রিয়ন্তীর ওপর রাগ করে। প্রিয়ন্তী কোনভাবে চায় না সুশান্ত তার ওপর রাগ করুক।

সেদিন প্রিয়ন্তী অন্যান্য দিনের মতো প্রাইভেট পড়িয়ে বাসায় চলে এসেছে। আসার সময় সে লক্ষ্য করেছে অর্পণ মুখ ভার করে আছে। প্রিয়ন্তী কিছু বলেনি, সে মোবাইলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চলে এসেছে। রাত দশটায় তার মোবাইলের রিং বেজে উঠল। সে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে রিং এসেছে।

সে রিসিভ করল, হ্যালো।

অপরিচিত কণ্ঠস্বর, হ্যালো আপনি কি প্রিয়ন্তী বলছেন?

প্রিয়ন্তী একবার সুশান্তর দিকে তাকাতেই তার চোখে চোখ পড়ল।

প্রিয়ন্তী মোবাইলে বলল, হ্যাঁ বলছি।

আমি অর্পণের আব্বা।

আপনি এত রাতে?

আপনি ভালো আছেন?

হ্যাঁ, আপনি?

ভালো আছি, আপনাকে এত রাতে বিরক্ত করছি কারণ আজ বাসায় ফিরে দেখলাম অর্পণ মন খারাপ করে বসে আছে। জিজ্ঞেস করলাম তো আপনার কথা বলল।

কী বলল?

ও বোধ হয় আপনার কাছে আরেকটু সময় চাচ্ছে?

কেন আমার পড়ানো কি সে বুঝতে পারে না?

পড়ালেখার ব্যাপারে কোন সমস্যা নেই, এই ছোট মানুষ তো আর আমরাও কেউ বাসায় থাকি না, ছেলেটা খুব বোর ফিল করে।

কিন্তু-

না আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে অর্পণের জন্য আরেকটু সময় দিতেন। আমি আপনার টিউশন ফি বাড়িয়ে দিব।

আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি। আমি না হয় আপনাকে আমার ডিসিশন দু’য়েকদিন পরে জানাবো।

আচ্ছা ঠিক আছে।

প্রিয়ন্তী মোবাইল রেখে দিল।

সুশান্তর চোখে কৌতূহল এবং কিছুটা সন্দেহ। তার চোখের দিকে তাকাতেই প্রিয়ন্তীর বুক কেঁপে উঠল। সে থতমত খেয়ে বলল, সুশান্ত বিষয়টা তোমার সঙ্গে শেয়ার করা দরকার।

কী বিষয়?

অর্পণের বাবা, মানে আমার ছাত্রের গার্জিয়ান অর্পণকে আরো একটু বেশি সময় পড়াতে বলে, মানে আমার টিউশন ফি আরো বাড়িয়ে দিবে।

সুশান্ত একটা শুষ্ক হাসি হেসে বলল, বেশ তো।

তুমি কী বলো?

আমি আর কী বলব? তুমি তো দু’য়েকদিন পর তোমার ডিসিশন জানাতে চাইলে।

হ্যাঁ আমি তো তোমার জন্য কিছু বললাম না।

সুশান্ত কিছু বলল না।

প্রিয়ন্তী বলল, সুশান্ত আমাদের বেশ টানাটানি যাচ্ছে। আমি আরো একটা টিউশনি করতে পারলে ভালো হতো কিন্তু দু’টা টিউশনির টাকা যদি একটা টিউশনি করেই পাই তবে খারাপ কী?

তুমি পারবে? তোমার কষ্ট হবে না?

কষ্ট হলে আর কি করা?

সুশান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল, বেশ।

 

একুশ

 

পরদিন অর্পণের বাবার সঙ্গে কথা বলে প্রিয়ন্তী অর্পণের জন্য আরো সময় বাড়িয়ে দিয়েছে তাতে তার টিউশন ফি বেড়েছে আরো এক হাজার টাকা। এই বাড়তি সময় পড়াতে গিয়ে প্রিয়ন্তীর ইদানীং বাসায় ফিরতে দেরি হয়। প্রিয়ন্তী প্রায় দিনই বাসায় ফিরে দেখে সুশান্ত ঘরে কিংবা বারান্দায় পায়চারি করছে। কোনদিন গম্ভীর মুখে বসে আছে। সুশান্তর মুখ দেখে প্রিয়ন্তীর কথা বলতে ভয় করে।

সেদিন রাতে অর্পণের বাবা প্রিয়ন্তীকে মোবাইল করার পর থেকে সুশান্তর মনের মধ্যে একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছে, অর্পণের বাবা প্রিয়ন্তীকে মোবাইল করবে কেন? বেশি করে সময় দিবে কেন? অর্পণের পড়ার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন ততটুকু সময়ই পড়াবে। প্রিয়ন্তী দেরিতে ফিরলে আমার কষ্ট হয় একথা বললে কি প্রিয়ন্তী বিষয়টা সহজভাবে নিবে? প্রিয়ন্তী যদি মাইন্ড করে? যদি বলে সুশান্ত তুমি আমাকে সন্দেহ করছ?

না সুশান্ত কিছু বলবে না। আরো কিছুদিন দেখবে, প্রিয়ন্তী যদি নিজেই বুঝতে পারে তবে আর তাকে বলার প্রয়োজন কী?

কিন্তু প্রিয়ন্তী নিজে থেকে কিছু বলল না। প্রায় দিনই দেরিতে বাসায় ফিরে, আজ সুশান্ত মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রিয়ন্তীকে সে তার কষ্টের কথা বলবে, প্রিয়ন্তী এভাবে হয় না, সামান্য ক’টা টাকার জন্য আমাদের এমন সুন্দর মুহূর্তগুলো ম্লান হয়ে যাবে? একটা হাসি দিয়ে বলে, তুমি অনেক আগে ফিরেছ, না? আর দেরি হবে না। কি করব বলো? ছোট ছেলে তো, একেবারে একা। আমি যখন চলে আসার জন্য উঠে দাঁড়াই তখন আমার দিকে এমন করে তাকায় যে ওকে ছেড়ে আসতে আমার খুব কষ্ট হয়।

ওকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয় আর আমাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয়, না? আসলে ওকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয় নাকি ওর বাবাকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়? ছিঃ প্রিয়ন্তী তুমি..

কলিং বেল বেজে উঠল। সুশান্ত চমকে উঠল। বাসায় দিলীপ এবং তিথি বাসায় নেই। সুশান্ত দরজা খুলে দিল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রিয়ন্তীর বুক কেঁপে উঠল, কী ব্যাপার সুশান্ত?

কিছু না।

কিছু না কেন? নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, আমাকে বলো?

প্রিয়ন্তী কথা বলো না, আমার ভালো লাগছে না।

তুমি একটু বসো, আমি চা তৈরি করছে।

সুশান্ত নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, সে চেয়ারে বসল।

প্রিয়ন্তী চা তৈরি করল, চা তৈরি করতে করতে সে দু’য়েকবার সুশান্তর মুখের দিকে তাকিয়েছে কিন্তু রাগ কমেনি। সে চায়ের কাপ সুশান্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, সুশান্ত কী হয়েছে আমাকে বলো? আমি কোন দোষ করেছি?

সুশান্ত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর গম্ভীর মুখ তুলে বলল, প্রিয়ন্তী তোমার টিউশনিটা ছেড়ে দিলে হয় না?

কেন?

প্রিয়ন্তী তোমার আজকাল আসতে অনেক দেরি হচ্ছে, একা বাসায় থাকতে আমার খুব খারাপ লাগে।

কিন্তু তাই বলে এত সুন্দর একটা টিউশনি, মাসে মাসে অনেকগুলো টাকা। টিউশনিটা ছেড়ে দিব।

হ্যাঁ, ছেড়ে দাও।

তারপর দিন চলবে কী করে?

চলবে কোনভাবে?

সুশান্ত আমাকে বোঝাও দিন চলবে কী করে? আমি ছেড়ে দিব।

সুশান্ত আর কিছু বলল না। তার মনে তখন অনেক কথা বিড় বিড় করছে, দিন চালানোর অজুহাতে তুমি টিউশনিটা ছাড়বে না। একদিন এমন ছিল তুমি আমার জন্য পৃথিবীর সব ছাড়তে পারতে, ছেড়েছেও কিন্তু আজ আমার জন্য সামান্য একটা টিউশনিও ছাড়তে পারছ না। আমার চেয়ে তোমার কাছে টিউশনিটা বেশি হলো?

তখন রাত দশটা বাজে, সুশান্তর ঘাড় ব্যথা শুরু হলো, চোখ দু’টো লাল যেন ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। ব্যথায় সে অস্থির হয়ে পড়ল। প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করল, ঘাড়ে তেল মালিশ করে দিব?

সুশান্ত কিছু বলল না।

প্রিয়ন্তী ঘাড়ে তেল মালিশ করে দিল অনেকক্ষণ কিন্তু কোন উন্নতি হলো না।

দিলীপ এবং তিথির পরামর্শে রাতেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। না তেমন কিছু হয়নি, প্রেশারটা বেড়েছে ডাক্তার প্রেশারের ঔষধ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে ডাক্তার বলে দিয়েছে প্রেশারের ঔষধটা যেন কোনদিন বাদ না যায়? প্রেশারের ঔষধ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সুশান্ত সুস্থ হয়ে উঠল।

সেদিনের পর প্রিয়ন্তী কয়েকদিন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছে। তারপর থেকে আবার দেরি করে বাসায় ফিরতে শুরু করেছে। প্রিয়ন্তী পড়েছে উভয় সংকটে, একদিকে বেশি বেতনের একটা টিউশনি, অর্পণের মতো নিষ্পাপ শিশুর আকুতি আরেকদিকে সুশান্তর অভিমান। সে আসলে কী করবে বুঝতেই পারছে না। সব সময় তার মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। সে কোন দোষ করছে না অথচ সুশান্ত তাকে দোষী ভাবছে, সে কোনভাবেই সুশান্তকে বোঝাতেই পারছে না।

আজকাল সুশান্তও দেরিতে বাসায় ফিরে। কোচিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে কোন কোনদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বেড়াতে যায়, কোনদিন পদ্মার পাড়ে বেড়াতে যায়। প্রিয়ন্তী কিছু জিজ্ঞেস করলেই রেগে যায়, তুমি বাসায় থাকো না তো আমি একাই বাসায় তাড়াতাড়ি এসে কী করব?

প্রিয়ন্তী সুশান্তর একথার কোন জবাব দিতে পারে না। সুশান্ত শুকিয়ে গেছে, তার চোখের গোড়া কালো হয়ে গেছে, ক’দিন থেকে দাড়ি সেভ করেনি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গজিয়েছে। প্রিয়ন্তী সুশান্তর এ অবস্থা সইতে পারে না আবার কিছু বলতেও পারে না।

সেদিন সুশান্ত আসতে দেরি হলো। প্রিয়ন্তী মোবাইল করল কিন্তু সুশান্ত মোবাইল রিসিভ করল না। একটি অপরিচিত কণ্ঠের মানুষ মোবাইল রিসিভ করেছে।

প্রিয়ন্তী চমকে উঠল, আপনি কে? সুশান্তর মোবাইল আপনার হাতে কেন?

সুশান্ত, সুশান্ত আপনার কে হয়?

আমার হ্যাজবেন্ড।

আপনার হ্যাজবেন্ড এখন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, আপনি এখুনি হাসপাতালে চলে আসুন।

প্রিয়ন্তী জোরে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল, ও মা গো।

তিথি এবং দিলীপ দুজনে একসঙ্গে তাদের ঘর থেকে বের হলো, প্রিয়ন্তী কী হয়েছে?

তিথি সুশান্ত হাসপাতালে, দাদা চলুন তো একটু আমার সঙ্গে, প্রিয়ন্তী কাকুতি করে বলল।

ঠিক আছে চলো, বলে সবাই এক কাপড়ে বের হলো।

মেডিক্যাল কলেজের গেট দিয়ে একে একে জিজ্ঞেস করতে করতে সবাই হৃৎরোগ বিভাগে এলো। সুশান্তর নাকে মুখে একটা যন্ত্র লাগানো আছে। একজন সাদা ইউনিফর্ম পরা লোক তার পালস পরীক্ষা করে বলল, এখানে পেশেন্টের কেউ আছেন?

প্রিয়ন্তী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ আমি।

সরি, তিনি হার্ট এ্যাটাক করেছিলেন, আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু সম্ভব হলো না।

প্রিয়ন্তী সুশান্তর বুকের ওপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, তুমি তো জানো কোচিং থেকে একটু দেরিতে ফিরলেই আমি কেমন চঞ্চল হয়ে পড়ি। তুমি কেমন করে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে।

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী একটা স্ট্রেচার নিয়ে এসে তারা সুশান্তর মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বের করল। দিলীপ প্রিয়ন্তীর কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে তার শ্বশুরবাড়ি মোবাইল করল। তার শ্বশুর তো মোবাইলে পাগলের মতো কেঁদে উঠল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমরা আমাকে আগে খবর দিলে না কেন? আমি আগে খবর পেলে যেমন করেই হোক, যত টাকাই হোক সুশান্তকে বাঁচিয়ে তুলতাম।

দিলীপ বলল, আমরাও জানতাম না, খবর পেয়ে যখন হাসপাতালে এসেছি তখন সে আর নেই।

প্রিয়ন্তী, তিথি আর দিলীপ তিনজনে উভয় পক্ষের গার্জিয়ানদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত হলো, সুশান্তর মৃতদেহ এ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে তাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাবে।

সুশান্তর মৃতদেহ নিয়ে হাসপাতালের একটা এ্যাম্বুলেন্স তাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ছাড়া আরো তিনটি মানুষ যেন বোবা কারো মুখে কোন কথা নেই, শুধু প্রিয়ন্তী মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে আবার কখনো ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে আর তিথি তার চোখে মুখে পানি দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলছে।

এ্যাম্বুলেন্স যখন সুশান্তদের বাড়ির সামনে খোলা আঙিনায় পৌঁছালো তখন সুশান্তর মা অজ্ঞান হয়ে উঠানে পড়ে আছে, তাকে কয়েকজন পাখার বাতাস করছে কেউ বা মাথায় পানি ঢালছে। তার বাবা বোবা হয়ে একটা ইজি চেয়ারে বসে আছে যেন বাড়িতে কিছুই হয়নি। তার বোধ শক্তি আছে বলে মনে হলো না।

সুশান্তর মৃতদেহ খোলা আঙিনায় একটা খাটিয়ার ওপর রাখা হয়েছে সেখানে একজন কাজের লোক পাহারা দিচ্ছে যেমন করে মানুষ কোন উচ্ছিষ্ট কোন কিছু পাহারা দেয়।

আরো ঘণ্টা খানেক পর প্রিয়ন্তীদের বাড়ি থেকে তার মা আর দাদা অরুণ এলো। তার মা অজ্ঞান প্রায়, তাকে সবাই ধরাধরি করে উঠানে নিয়ে গেল। তার দাদা অরুণের চোখে পানি। প্রিয়ন্তী অরুণের বুক চাপড়ে বলল, আজ কেন এলি? নিচু জাতের বাড়িতে? আজ কেন এলি? তোদের জন্য, তোদের জন্য আজ আমার হাত থেকে শাঁখা খুলে ফেলতে হচ্ছে, কপাল থেকে সিঁদুর মুছে ফেলতে হচ্ছে। তোরা সবাই চলে যা।

তিথি সান্ত্বনা দিল, প্রিয়ন্তী চুপ কর বোন, তোর কপালে যা ছিল তাই হয়েছে, এখানে কারো কোন দোষ নেই।

প্রিয়ন্তীর কান্না থামলো না, সে পাগলের মতো কান্না করতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পর তাকে সুশান্ত মৃতদেহর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। সে বুঝতে পারল না, কারণ এর আগে সে কোন মৃতদেহ এবং তার বিধবা স্ত্রী দেখেনি। এসব সংস্কারের কাছে সে পরিচিত না। প্রিয়ন্তী মোটা করে সিঁদুর পরতো এটা দেখে একদিন তিথি বলেছিল, এত মোটা করে সিঁদুর পরতে হয় না।

প্রিয়ন্তী জিজ্ঞেস করেছিল, কেন রে?

মাথায় সিঁদুর থাকলে আর কেউ তাকায় না, তখন নিজেকে খুব ছোট এবং অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়।

প্রিয়ন্তী বলেছিল, আমার তো সিঁদুরটাই সব রে, মাথার সিঁদুরটা ছাড়া তো আমার আর কিছু নেই।

একদিন সুশান্ত তার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল সেদিন তার মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবকিছু সে জয় করেছে, স্রষ্টার কাছ থেকে তার সব পাওয়া হয়ে গেছে। কয়েকজন বিধবা মহিলা এলো, তারা প্রিয়ন্তীকে সুশান্তর মৃতদেহের কাছে নিয়ে গিয়ে সুশান্তর পা দিয়ে তার মাথার সিঁদুর মুছে দিল। তখন প্রিয়ন্তী কান্নায় গড়াগড়ি যাচ্ছে কিন্তু সেদিকে কারো কোন দয়ামায়া বলতে কিছু নেই। সুশান্ত এখন লাশ যত তাড়াতাড়ি তার সৎকার করা যায় ততই পুণ্য।

একটা খাটিয়ার চার পাশে চারজন কাঁধে নিয়ে বল হরি, হরি বল বলে সুশান্তর মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে সুশান্তর লাশ ভস্ম হলো।

কৃষাণ দত্তের বাড়ির অদূরে একটা বড় পুকুর আছে পরদিন তাকে পুকুরে নামিয়ে তার পরনের কাপড় বদলিয়ে সাদা শাড়ি পরানো হলো, শাঁখা খুলে দেয়া হলো। তারপর অনেকক্ষণ ধরে প্রিয়ন্তীকে বিধবার চাল-চলন সম্পর্কে জ্ঞান বিতরণ করা হলো।

প্রিয়ন্তী বুঝতে পারল যে, যে সমাজ, সামাজিক, আর্থিক বা জন্মগত বৈষম্যর কারণে তাদের দুজনের বৈবাহিক সম্পর্ককে মেনে নেয়নি, সুশান্তর মৃত্যুর পর তার শাঁখা, সিঁদুর খুলে, সাদা শাড়ি পরে বিধবা সাজিয়ে স্বামী-স্ত্রীর স্বীকৃতি দিয়ে স্বীকার করে নিল, বর্ণ-গোত্র যা-ই হোক না কেন সুশান্ত তার স্বামী। এখন সে সমাজে স্বীকৃত স্বর্গবাসী সুশান্তর বিধবা স্ত্রী।

 

সমাপ্ত

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*