ট্রেন টু ভিলেজ

ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে রকি টনিকে বললো, এই টনি তুই এবার ভ্যাকেশনে কী করবি?
কী করবো মানে?
রকি বললো, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।
কী আইডিয়া?
এবার ভেকেশনে আমি গ্রামে যাবো।
টনি রকির কথা শুনে লাফিয়ে উঠলো, ওয়াও গুড আইডিয়া। তোর মাথায় তো খুব ভালো একটা আইডিয়া এসেছে।
যাবি?
অফকোর্স কিন্তু কোন্‌ গ্রামে যাবি? গ্রামে তো আমাদের কোনো রিলেটিভ নেই।
আমাদের আছে। তুই আমার সঙ্গে যাবি।
ওকে। তাহলে এক কাজ করি?
কী কাজ?
জেমসকে বলি?
বল।
জেমস একটু পিছিয়ে পড়েছিলো। রকি আর টনি মাঠে দাঁড়ালো। জেমস ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো। সে একটু সহজ-সরল প্রকৃতির। কোনো কথা বুঝতে না পারলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সে রকি আর টনিকে কথা বলতে দেখে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী রে, কী করছিস তোরা?
কথাটা রকি জেমসকে বললো, এই জেমস শোন্‌ আমরা না গ্রামে যাবো।
গ্রামে?
হ্যাঁ।
কেনো?
গ্রাম দেখতে।
জেমস রকির মুখের দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সে আকাশ থেকে পড়লো।
রকি কিছুটা ধমকের সুরে বললো, কী রে এমনভাবে তাকাচ্ছিস মনে হয় কথাটা বুঝতে পারিসনি?
তাইতো, আই ক্যান নট আন্ডার স্ট্যান্ড গ্রামে দেখার কী আছে? বলে সে টনির দিকে তাকিয়ে বললো, এই টনি দেখতো রকি আমাকে কী বলছে। আই ক্যান নট ইমাজিন গ্রামে দেখার কী আছে?
টনিও ধমক দিলো, কী আছে মানে? গ্রাম দেখেছিস কোনোদিন?
না। তবে ছবিতে দেখেছি।
তো, না দেখেই বলছিস কেন যে গ্রামে কী দেখার আছে। তুই যাবি কী না বল?
যাবো বাট ডেডিকে বলতে হবে। আচ্ছা কতক্ষণ সময় লাগবে যেতে আসতে। আই মিন আমি যদি স্কুলের কথা বলে যেতে পারতাম…
টনি এবার কিছুটা রেগে গেলো, গ্রামে যাওয়া কী দু’য়েক ঘণ্টার ব্যাপার নাকি?
তো?
কয়েকদিনের জন্য।
ইম্পসিবল। ডেডি কোনোভাবেই এগ্রি করবে না।
রকি বললো, আগে বলে দেখ্‌, এগ্রি করতেও তো পারে। তাছাড়া ডেডি বলেছে একসময় সবার বাড়ি গ্রামেই ছিলো। খুঁজে দেখলে দেখতে পাবি গ্রামে তোদেরও অনেক রিলেটিভ আছে।
জেমস আবারো রকির মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু স্মরণ করার চেষ্টা করলো, তা হতে পারে। মাম্মি একদিন বলছিলো, গ্রামে নাকি আমাদের কে কে সব আছে।
টনি জিজ্ঞেস করলো, তাহলে তুই যাবি?
ডেডি যদি পারমিশন দেয় তো অবশ্যই যাবো।
ওকে।
জেমস আবার জিজ্ঞেস করলো, তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়?
টনি বললো, রকির সঙ্গে, ওর রিলেটিভের বাড়িতে।
তিনজনই হাঁটতে হাঁটতে মাঠের এক কোণের বেঞ্চে এসে বসলো। তারপর জেমস জোরে চিৎকার করে বয়কে কোল্ড ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিলো, এই পিচ্চি তিনটা ডিঙ্কস নিয়ে আয় তো।
বয় তিনটা এনার্জি ড্রিঙ্কস নিয়ে এলো। তিনজনই পরস্পরের এনার্জি ড্রিঙ্কসের ক্যানের গায়ে গা ঠেকিয়ে বললো, চিয়ার্স।
তারপর টনি পাইপে একটা টান দিয়ে এক ঢোক ড্রিঙ্কস টেনে নিয়ে রকিকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ফ্রেন্ড এই আইডিয়াটা তোর মাথায় এলো কীভাবে?
আগে থেকেই আমি যখন টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেটে গ্রামের ছবি দেখতাম তখন আমার গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা হতো। আমি মনে করতাম গ্রামে আমাদের কোনো রিলেটিভ নেই। কিন্তু ক’দিন আগে আমাদের বাসায় আব্বুর এক তাহইতো ভাই এলো।
টনি পাইপ থেকে মুখ তুলে বললো, তাহইতো ভাই কী রে?
রকি একটা মুচকি হাসি হাসলো।
জেমস জিজ্ঞেস করলো, তাইতো তাহইতো ভাই কী রে? তুই হাসছিস কেনো?
আমি জানতাম তোরা এটা বুঝ্‌বি না।
টনি বললো, বল, প্লিজ!
রকি একটু ভাব নিলো, সে তার কণ্ঠস্বর কৃত্রিম গম্ভীর করে বললো, বুঝ্‌বি না, তোরা বুঝ্‌বি নাতো, আমি আছি দেখে তোরা অনেককিছু জানতে পারিস, না হলে তোরা সব…মূর্খ হয়ে থাকতিস, তবে শোন্‌।
টনি এবং জেমস দু’জনে রকির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
রকি বলতে শুরু করলো, তাহইতো ভাই হলো ডেডির যে সিস্টার আছে না, সেই সিস্টারের তো বিয়ে হয়েছে। সেই সিস্টারের ব্রাদার ইন ল।
দু’জনে মাথা নেড়ে জানালো তারা বুঝেছে।
জেমস বললো, গ্রামের মানুষ তোদের বাড়িতে এসেছিলো! আর তোরা এ্যালাউ করলি! কেমন নোংরা, নোংরা না?
রকি কিছুটা ধমকের সুরে বললো, এই নোংরা কী রে?
টনি বললো, আমিও তো তাই জানি গ্রামের মানুষ সবসময় লুঙ্গি পরে থাকে, ময়লা কাপড়-চোপড় পরে থাকে। কথাবার্তায় কেমন ব্যাক ডেটেড, আনকালচারর্ড।
জেমসও টনির কথায় মাথা নেড়ে সায় জানালো।
রকি কিছুটা রেগে গেলো, না, তোদের ধারণা ঠিক না। ডেডির সেই তাহইতো ভাই, মানে কাজিন তো এসেছিলো ভালো কাপড়-চোপড় পরে, প্যান্ট-শার্ট পরে। তিনি নাকি স্কুলের ইংলিশ টিচার। আমার সঙ্গে তো ইংরেজি বাংলা মিশিয়েই কথা বললো।
জেমস বললো, তাই নাকি?
টনি বললো, ফুললি ইংলিশ বলতে পারবে না দেখে ইংলিশ বাংলা মিশিয়ে বলেছে।
রকি অস্বীকার করলো, তোদের ধারণা ঠিক না। তিনি ভালো ইংলিশ জানেন।
জেমস বললো, তাই নাকি?
অফকোর্স। আর তার সঙ্গে যে মেয়েটি এসেছিলো ওর নাম তুলি। তুলিও খুব স্মার্ট মেয়ে।
টনি বললো, ও তাই বল। তুই তাহলে গ্রাম দেখতে যাবি না। আমরা যাবো গ্রাম দেখতে আর তুই যাবি তুলিকে দেখতে। তারপর তুই তুলি দিয়ে ছবি আর্ট করে এক্সিবিশন করবি।
আরে না। তুলি তো এসেছিলো একটা টি.ভি চ্যানেলে মিউজিক কম্পিটিশনে পার্টিসিপেট করতে।
টি.ভি চ্যানেলে? তাহলে তো তুলি সিঙ্গার।
ও খুব ভালো গান গায়। যেদিন কম্পিটিশন হয়েছিলো সেদিন আমিও টি.ভি দেখেছি। তোরা তো দেশি চ্যানেল দেখিস না।
টনি আর জেমস পাশাপাশি বেঞ্চে বসেছে। টনি জেমসকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো, আর তুই বুঝি দেখিস? সেদিন তুলির কম্পিটিশন ছিলো তাই তুই দেশি টি.ভি’র চ্যানেল দেখেছিস।
জেমস তিরস্কারের সুরে বললো, তাই না রকি?
রকি আম্‌তা আম্‌তা করে বললো, তা অবশ্য ঠিক। তবে সেদিনের পর থেকে আমি দেশি চ্যানেল দেখতে শুরু করেছি।
ড্রিঙ্কস শেষ হলো। টনি জিজ্ঞেস করলো, তাহলে তুই সিডিউল ঠিক কর, আমিও যাবো।
জেমস বললো, ডেডি যদি আমাকে পারমিশন দেয় তো আমি যাবো।
রকি বললো, ওকে তাহলে ডিসিশন ফাইনাল। আমরা যাচ্ছি।

দুই

জেমস বাবা মা’র একমাত্র সন্তান। বিয়ের পর দীর্ঘ দিন তাদের কোনো সন্তান হয়নি। একটা সন্তানের জন্য কামরান সাহেব জুলেখাকে নিয়ে ছুটে গেছেন দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকের কাছে। পীরের আশীর্বাদের জন্য ছুটে গেছেন দেশের বিভিন্ন স’ানে পীরের মাজারে এমন কোনো কাজ নেই যে তিনি করেননি তারপর আল্লাহর অশেষ রহমতে তাদের কোল জুড়ে এসেছে একমাত্র সন্তান, জেমস। তারপর তাদের আরো একটা সন্তান নেয়ার কিন্তু সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আর কোনো সন্তান হলো না।
কামরান সাহেব কিংবা জুলেখা এক মুহূর্ত তাদের চোখের আড়াল করে থাকতে পারে না। তাই জেমস আজ স্কুল থেকে এসে যখন তার মাকে বললো, মাম্মি আমি গ্রামে যাবো।
জুলেখা প্রথমে এতোটাই অবাক হলো যে সে বুঝতেই পারলো না। সে কয়েকমুহূর্ত জেমসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো, কী বললি? আমি তোর কথা কিছুই বুঝতে পারলাম না।
আমি গ্রামে যাবো।
তুই গ্রামে যাবি! গ্রামে আমাদের কে আছে, তুই কার কাছে যাবি? হঠাৎ গ্রামে কেনো? একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন করতে করতে সে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়লো।
আমি, টনি আর রকি তিনজন যাবো।
কেনো?
বেড়াতে।
ঢাকা শহরে কি বেড়ানোর জায়গার অভাব হলো? সদর ঘাট, আহসান মঞ্জিল, বলধা গার্ডেন আছে না?
না। আমি গ্রামে যাবো।
আর একবারো বলবি না। তোর ডেডি শুনলে রাগ করবে।
করুক, আমি তবু ডেডিকে বলবো।
কী, কী বললি? তবু তুই ডেডিকে বলবি? তবু তুই গ্রামে যাবি? বলতে বলতে জুলেখা জেমসকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
রাতে কামরান সাহেব বাসায় এলেন। জুলেখার দিকে তাকিয়েই যেনো চমকে উঠলেন, জুলেখা কী হয়েছে তোমার?
জুলেখা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো, ওগো শুনছো তোমার ছেলে নাকি গ্রামে যাবে।
কামরান সাহেব ড্রয়িং রুমে ঢুকে সোফায় ধপাস করে বসে পড়লেন, কী বললে?
আমাদের জেমস নাকি গ্রামে যাবে।
কেনো? গ্রামে যাবে কেনো?
বেড়াতে।
কোথায়, ওকে ডাকোতো ভালো করে শুনি।
জেমস তার রুম থেকে বাবা-মা’র কথা শুনছিলো। মা ডাকার আগেই সে তার রুম থেকে ড্রয়িং রুমে বেরিয়ে এলো, ডেডি আমাকে ডেকেছো?
হ্যাঁ ডেকেছি। কী হয়েছে বলতো?
কিছু হয়নি তো। আমি গ্রামে বেড়াতে যাবো, মাম্মিকে তাই বলেছি।
না, তোর গ্রামে যাওয়া হবে না।
কেনো?
গ্রামের অবস’া কী তুই জানিস। গ্রামে খুব ঠাণ্ডা, গাছ-গাছড়া, খাল-বিল, কাদার রাস্তা। এই যে আমরা ঢাকা শহরে থাকি কত আরাম। আমাদের যদি গরম লাগে তো এসি চালু করে দিই, যদি ঠাণ্ডা লাগে তো রুম হিটার চালু করি।
ওখানে নেই?
কামরান সাহেব কিছুটা ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বললেন, এসি! রুম হিটার!
হ্যাঁ।
ঐদিকে তো ইলেকট্রিসিটি-ই নেই। এসি, রুম হিটার তো পরের কথা।
তাহলে মানুষ গ্রামে থাকে কীভাবে?
কষ্ট করে, গরম লাগলে গাছের নিচে বসে থাকে, হাত পাখার বাতাস করে।
আর ঠাণ্ডা লাগলে?
খড়, গাছের পাতায় আগুন জ্বালিয়ে পাশে বসে থাকে।
জেমস কয়েকমুহূর্ত তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, খড় কী ডেডি?
খড় হলো ধান গাছ থেকে ধান নেয়ার পর তার যে ডাল-পালা থাকে তাকে খড় বলে।
জুলেখা ডাইনিংয়ে খাবার দিতে দিতে ড্রয়িং রুমে এলো, তুমি যাই বলো আমি কিন্তু ছেলেকে গ্রামে যেতে দিবো না।
কামরান সাহেব জেমসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জুলেখার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, নাহ, ও যাবে না।
জেমস জিদ ধরলো, না আমি যাবো।
জুলেখার চোখ দিয়ে পানি বের হলো। সে জেমসের কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, না, তুই যাবি না। আজ তোর সঙ্গে কথা বলার পর আমি সব শুনছি। গ্রামে সাপ আছে, পুকুর আছে। তুই আমাদের একমাত্র সন্তান, তুই যদি গ্রামে যাস আর তোকে যদি সাপে কামড় দেয়, তুই যদি পুকুরে নামোস আর পুকুরে ডুবে যাস। তবে আমাদের কী হবে? তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না বাবা। তুই কোথাও যাবি না। শোনো জেমসের আব্বা তুমি কিন্তু ওকে যেতে দিও না।
কামরান সাহেব সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে জানালেন তিনি জেমসকে গ্রামে যেতে দিবেন না।
এসো তোমরা ডাইনিংয়ে এসো। আমি বাবার সঙ্গে কথা বলবো। বলেই জুলেখা দ্রুত বেগে ডাইনিংয়ে চলে গেলো তারপর তার মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে তার বাবাকে ফোন করলো, হ্যালো বাবা আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। কী হয়েছে মা? তোর গলার স্বর এমন শুনাচ্ছে কেনো?
বাবা তোমাকে এক বার আমাদের বাড়িতে আসতে হবে।
কবে?
কাল, সকালে।
কেনো মা?
বাবা একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে।
এখনি বল মা।
না বাবা তুমি কাল আগে এসো।
জুলেখার বাবা কিছুটা অবাক হলেন, এখনি একটু বল মা। এমন কী হয়েছে যে তুই একেবারে…
জুলেখা আর কান্না ধরে রাখতে পারলো না, বাবা তোমার নাতি বলছে ও নাকি গ্রামে যাবে।
ও, তাই তুমি কাঁদছো।
জুলেখা কান্না ভাঙ্গা গলায় বললো, বাবা, ও চলে গেলে আমি বাঁচবো না বাবা। যদি ওর একটা কিছু হয়ে যায়…
আচ্ছা মা এখন তুই থাক কাল তো আমি আসছি। তারপর আমি না হয় জেমসকে বুঝিয়ে বলবো।
তোমাকে ও খুব পছন্দ করে বাবা, তুমি বুঝিয়ে বললে ও যাবে না।
আচ্ছা।

তিন

প্রতিদিন সকালবেলা মনিরা টনিকে নিয়ে স্কুলে যায়, যতক্ষণ ক্লাস চলে ততক্ষণ সেও স্কুলের ক্যাফেটেরিয়া, ওয়েটিং রুমে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেয়।
কয়েকদিন আগে মনিরার পরিচয় হয়েছে আদিত্যর সঙ্গে। আদিত্যর মেয়ে তিথি আর টনি একসঙ্গে লেখাপড়া করে। তিথির মা’র সঙ্গেও মনিরার পরিচয় আছে। ভদ্রমহিলা সরকারি চাকরি করে। আগে প্রতিদিন তিথিকে তার মা-ই নামিয়ে দিতে আসতো কিন্তু কয়েকদিন থেকে তিথি একাই স্কুলে আসছে আবার মাঝে মাঝে আদিত্যও তিথিকে নামিয়ে দিতে আসে।
সেদিন মনিরা টনিকে ক্লাসে পাঠিয়ে দিয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় দিকে যাচ্ছিলো। পথে আদিত্যর সঙ্গে দেখা। আদিত্যই প্রথম কথা বললো, হাই ম্যাডাম।
মনিরা বললো, হাই।
কেমন আছেন?
ভালো, আপনি?
ভালো। টনি কেমন লেখাপড়া করছে?
ভালো কিন্তু তিথির মতো না। আপনার মেয়ে তো জিনিয়াস।
এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন? চলুন ক্যাফেটেরিয়ায়…
হ্যাঁ চলুন।
দু’জনে ক্যাফেটেরিয়ায় বসলো।
আদিত্য জিজ্ঞেস করলো, কী খাবেন, বলুন?
আপনার যা ইচ্ছা।
আপনি বলুন, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমি মেয়েদের ওপর নির্ভর করি।
তারমানে এটা মেয়েদের ব্যাপার-স্যাপার, আর অন্য সব ব্যাপারে মেয়েদের কোনো গুরুত্ব নেই, না?
সরি। আসলে আমি এভাবে বলতে চাইনি। মানে আমি বলছিলাম কী খাবো সেটা আপনি বলুন। আই ডিজলাইক টু বারগেইনিং।
মনিরা হেসে ফেললো।
হাসছেন কেনো?
আপনি তো দেখছি খুব সহজে মেনে নেন। ভেরি গুড, এটা আমার খুব পছন্দ। এ্যানিওয়ে আমি কফি খাবো। আপনি?
কফি।
ওকে। বলে আদিত্য কফির অর্ডার দিলো।
মনিরা বললো, ক’দিন থেকে ভাবীকে দেখছি না।
ওর একটু সমস্যা হয়েছে।
মানে? কোনো অসুখ?
ওতো গভ:মেন্ট জব করে। আগে এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় ওর অফিসের রাস্তায় পড়তো তাই ও দিয়ে যেতো, এখন বদলি হয়ে গেছে। তাই এখন আমি আসছি।
আর আপনি?
আমি একটা কোম্পানিতে জব করি। যেদিন আমার ইভিনিং ডিউটি পড়ে সেদিন আমি তিথিকে নিয়ে আসি আর কখনো কখনো তো ও একাই আসে।
কফি চলে এলো।
আদিত্য হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, নিন প্লিজ!
মনিরা কফি নিলো।
আদিত্য কফিতে চুমুক দিয়ে বললো, আপনার হ্যাজবেন্ড কী করেন?
মনিরার মুখের ওপর একটা কালো মেঘ ঢেকে গেলো। সে প্রথমে কোনো কথা বললো না।
আদিত্য তার কথা ফিরিয়ে নিলো, সরি। আপনার আপত্তি থাকলে থাক বলতে হবে না।
না। আপত্তি নেই। ও দেশের বাইরে থাকে।
জব করে?
হ্যাঁ।
কোন্‌ দেশে?
দুবাই।
ভালোতো।
মনিরা মৃদু কণ্ঠে বললো, হ্যাঁ ভালোই।

টনির বাবা দেশের বাইরে থাকে। বছরে একবার এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসে আর বছরে একবার বা দু’বার টনি তার মা-সহ বাবার কাছে বেড়াতে যায়। মা মনিরা বেগম গৃহিণী। মনিরা বেগম, টনি আর বাসায় কাজের মেয়ে পারুল এই তিনজনের সংসার তাদের।
টনির বাবা ফারুক সাহেবের ছুটি এক মাস পিছিয়েছে শুনে মনিরার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। সেদিন পরিচয় হওয়ার পর আদিত্যর সঙ্গে মনিরার আরো একদিন কথা হয়েছে। আজ দু’দিন থেকে মনিরা আদিত্যকে মনে মনে খুঁজলো কিন্তু চোখে পড়লো না।
আদিত্য এলো কয়েকদিন পর। মনিরা আদিত্যকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলো। আদিত্য মনিরাকে দেখেই বললো, হাই ম্যাডাম। কেমন আছেন?
মনিরা শুষ্ক কণ্ঠে বললো, আমার কথা থাক, আপনি ভালো আছেন তো?
থাকবে কেনো? কী হয়েছে আপনার?
মনিরা কিছুটা অভিমানের সুরে বললো, বললাম তো আমার কথা থাক। আপনি ভালো থাকলেই সব ভালো।
এ্যানিথিং রং।
না। কোনো রং নয়। অল ওকে। কী হয়েছিলো আপনার?
কিছু হয়নি তো।
স্কুলে এলেন না যে।
পর পর কয়েকদিন মর্নিং ডিউটি পড়েছিলো তখন তিথি একা আসতে শুরু করলো, তাই আমি আর এলাম না। আপনার মুড অফ কেনো? কী হয়েছে?
না। এমনিতেই।
আদিত্য একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, কেবল তো ক্লাস শুরু হলো, চলুন না বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি।
কোথায়?
বাইরে, কোনো রেস্টুরেন্টে বসে কফি খাবো।
মনিরা মাথা দুলিয়ে সায় দিলো। তারপর দু’জনে স্কুল থেকে বের হলো।
দিনে দিনে মনিরার সঙ্গে আদিত্যর একটা ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আজকাল একটু সময় পেলেই মনিরা আদিত্যকে ফোন করে। তাদের দু’জনের সম্পর্কের বিষয়টি এখন তিথি আর টনির মধ্যেও গোপন নেই। তারা দু’জনে শৈশব থেকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে, বিদেশি সংস্কৃতিতে লেখাপড়া করছে। বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী ইংরেজিতে কথা বলে। অনেক গার্জিয়ানও ইংরেজিতে কথা বলে। তাদের চালচলনও বদলে গেছে। কোনো কোনো ছাত্র-ছাত্রীর মা প্যান্ট-শার্ট পরে স্কুলে আসে। তারপরও কেউ কিছু বলে না। এখানে পাছে লোকে কিছু বলে কোনো কথা নেই। তাদের স্কুল ক্যাম্পাস যেনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছোট্ট একটি ইউরোপ। ক্যাম্পাসের ভিতরে তারা সবাই যেনো ইউরোপিয়ান। তাই বাবা-মা’র বন্ধুত্বের বিষয়টিকে তারা বন্ধুত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেছে। আদিত্য আর মনিরা অবশ্য সেরকম না। তাদের মধ্যে এখনো অনেকটা বাঙালিপনা রয়েই গেছে।
সেদিন আদিত্য স্কুল আসেনি। আজকাল যেদিন আদিত্য আসে না সেদিন তার স্কুলের সময়টা কষ্টেই কাটে। বেশিরভাগ গার্জিয়ান অনেক বেশি আধুনিক। মনিরা এখনো তাদের মতো আধুনিক হতে পারেনি। সে তখন একা একটা চেয়ারে বসেছিলো। স্কুল ছুটির পর টনি আর তিথি বেরিয়ে এলো। মনিরাকে একা চেয়ারে বসে থাকতে টনি জিজ্ঞেস করলো, হাই মাম্মি! আজ তোমার ফ্রেন্ড আসেনি?
টনির প্রশ্নের উত্তর দিলো তিথি, ডেডির তো আজ মর্নিং ডিউটি।
আজ স্কুল ছুটির পর টনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসতেই যখন বললো, মাম্মি আমি গ্রামে যাবো। তখন মনিরা যেনো চমকে উঠলো, তুই গ্রামে যাবি? কার সাথে?
আমার ফ্রেন্ডরা যাবে।
ফ্রেন্ডরা মানে? স্কুল থেকে?
না। আমি, রকি আর জেমস।
হঠাৎ করে গ্রামে যাবি কেনো?
সবাই যাবে তাই আমিও যাবো, বলে টনি কয়েকমুহূর্ত তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর বায়নার সুরে বললো, কী যেতে দিবে না? ডেডির আসাতো পিছালো।
কিন্তু ডেডি কি তোকে যেতে দিবে?
ডেডিকে আমি ম্যানেজ করবো।
আমার কোনো আপত্তি নেই তোর ডেডিকে যদি ম্যানেজ করতে পারিস তো যাবি।
ওকে, ডেডি তো আমাকে পারমিশন দিবেই। সো থ্যাঙ্ক ইউ মাই মাম্মি।

চার

মনিরা কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললো, একটা কথা শুনেছেন?
কী কথা?
টনিরা যে গ্রামে যাবে।
তাই নাকি? শুনিনি তো। কে কে যাবে?
জেমস, রকি আর টনি।
কবে?
এইতো পূজার ছুটিতে যাবে মনে হয়।
টনির বাবা নাকি আসছে?
হ্যাঁ আসার কথা তো ছিলো কিন্তু এক মাস পিছিয়েছে। সেজন্যই তো ছেলেটা যাওয়ার জন্য অসি’র হয়ে উঠেছে। আসলে কোথাও যাওয়া হয় না তো। স্কুল আর বাসা, বাসা আর স্কুল করে করে বাচ্চারা হাঁপিয়ে উঠেছে।
এক্সাক্টলি।

রকি, জেমস আর টনি টিফিন পিরিয়ডে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। টনি রকিকে জিজ্ঞেস করলো, আমাদের গ্রামে যাওয়ার কী হলো ফ্রেন্ড?
রকি জেমসকে জিজ্ঞেস করলো, জেমস তুই যাবি? তুই তো আবার হাই ব্রিড।
জেমস রকির মুখের দিকে কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে রইলো, এই রকি তুই আমাকে হাই ব্রিড বললি?
হ্যাঁ তোকেই বললাম। তোর তো আবার কথাও যেতে গেলে পারমিশন নিতে হবে। তুই কি পারমিশন পেয়েছিস?
জেমস আম্‌তা আম্‌তা করে বললো, না রে, মাম্মি খুব কান্নাকাটি করছে। আমাকে যেতে দিবে না।
রকি জিজ্ঞেস করলো, টনি?
আই হ্যাভ নো প্রব্লেম, তোর?
আমারো কোনো প্রব্লেম নেই। বাবা পারমিশন দিয়েছে। বাবার তো গ্রামের প্রতি খুব টান এখনো। কিন্তু…
টনি রকির কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললো, তবে আর কিন্তু কেনো?
আরে আমার সিস্টার আছে না, মানে আমার এক ঘণ্টার ছোটো বোন।
টনি আর জেমস দু’জনে আগ্রহ সহকারে রকির মুখের দিকে তাকালো। টনি জিজ্ঞেস করলো, কী করেছে ও?
ও যাবে।
টনি বললো, যাবে। প্রব্লেম কী?
ডেডি-মাম্মি কেউ যেতে দিবে না।
জেমস খুব সহজ-সরল প্রকৃতির, বুদ্ধিমত্তাতেও সে অনেকটা পিছিয়ে। কোনো কথা বুঝতে তার একটু বেশি সময় লাগে। সে রকি আর টনির মুখের দিকে তাকিয়ে কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, কেনো? ও তোদের সঙ্গে গেলে তো ভালোই হবে।
রকি কিছুটা ধমকের সুরে বললো, বুঝিস না বেটা, আমরা দু’জন ছেলের সঙ্গে ও একা একটা মেয়ে কেনো যাবে?
জেমস বললো, দু’জন বয় আর একজন গার্ল গেলে বুঝি গার্ল একা হয়। সি অলসো ম্যা বি ইওর ফ্রেন্ড।
টনি বললো, জেমস ঠিকই বলেছে, সেও আমাদের ফ্রেন্ড হতে পারে।
দূর থেকে তিথি আসছে। তার হাঁটার ধরণটা অনেকটা স্টাইলিস্ট। তাকে দেখে রকির মুখ অনেকটা উজ্জ্বল হলো, তবে আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।
কী আইডিয়া? তুই তো আবার আইডিয়ালিস্ট টনি বললো।
যদি আমাদের সঙ্গে তিথি যায়।
টনি জিজ্ঞেস করলো, তাতে কি প্রব্লেম সলভ হলো?
রকি বললো, মাম্মিকে তিথির কথা বললে রিতুকে যেতে দিতে পারে। তাছাড়া ডেডির খুব একটা আপত্তি নেই।
টনি রকিকে বললো, তিথিকে বলে দেখ্‌।
আমি?
হ্যাঁ।
টনি একটা মুচ্‌কি হাসি হেসে বললো, কেনো? বলতে পারবি না কেনো? ওতো আবার তোর…
আমার কী রে। ও তোরও ফ্রেন্ড, আমারো ফ্রেন্ড।
টনি বললো, তারপরও তোর সঙ্গে একটা ব্যাপার আছে না, তোর তো আবার অন্যরকম ফ্রেন্ড।
দু’জনে কথা বলতে বলতে তিথি কাছাকাছি চলে এলো।
ওকে আমি বলছি। উই আর অলসো ফ্রেন্ড। সো আমি বলছি আই হ্যাভ নো হ্যাজিটেশন।
তিথি জেমসের কথা শুনে ফেলেছে, কী রে, কীসের হ্যাজিটেশনের কথা হচ্ছে?
জেমস বললো, তিথি টনি আর রকি গ্রামে যাচ্ছে।
গ্রামে? গ্রামে কেনো?
টনি বললো, বেড়াতে। আমরা কখনো গ্রাম দেখিনিতো তাই। অবশ্য আইডিয়াটা এসেছে আইডিয়ালিস্ট রকির কাছ থেকে। রকির আরো একটা আইডিয়া আছে। সেটাতে অবশ্য তোর হেল্প লাগবে।
জেমস তিথিকে জিজ্ঞেস করলো, তুই যাবি?
তিথি নিজের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, আমি! অফকোর্স। তোরা গেলে আমি যাবো না! বলে তিথি টনিকে জিজ্ঞেস করলো, আমার কী হেল্প রে?
এটাই।
এটাই মানে কী?
মানে রকির ইওঙ্গার সিস্টার যেতে চায় কিন্তু…
টনি রকির কথার মাঝে বলতে শুরু করলো, কিন্তু মেয়ে বলে ডেডি-মাম্মি ওকে যেতে দিবে না। তাই তুই সঙ্গে গেলে ও যেতে পারবে। অবশ্য তোরও যাওয়াটা সহজ হবে।
সহজ আর কঠিন বলে কোনো কথা না দোস্ত, তোরা গেলে আমিও যাবো এটা ফাইনাল। এই তোর ডেডি-মাম্মি কেমন রে মেয়ে বলে ওকে যেতে দিবে না। এগুলো ব্যাক ডেটেড কালচার।
রকি বললো, ওকে তুই তাহলে যাচ্ছিস আমাদের সঙ্গে।
ওকে। ফাইনাল।
টনি জিজ্ঞেস করলো, তোকে আবার যেতে দিবে তো?
তিথি আবেগ প্রবণ মেয়ে। তাকে যেতে দিবে কী না এ প্রশ্ন করায় সে প্রচণ্ড রেগে গেলো। তার ফর্সা মুখ যেনো মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে গেলো।
টনি একটা ঢোক গিলে বললো, না মানে তোকে আবার যেতে দিবে তো? আফটার অল তুইও তো একটা মেয়ে।
রেগে তিথির পায়ের রক্ত যেনো মাথায় উঠে গেলো, স্টপ। আমাকে কখনো মেয়ে বলবি না, নট গার্ল, নট বয় আই এ্যাম ম্যান। আমার ডেডি-মাম্মি কখনো আমাকে সেভাবে মিন করে না। তুই আর কখনো আমাকে সেভাবে মিন করবি না।
রকি তিথিকে শান্ত করার চেষ্টা করলো, তিথি প্লিজ ওকে মাফ করে দে। টনি কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছে। বলে টনিকে বললো, এই টনি সরি বল, সরি বল।
টনি সরি বললো।
তিথি যেমন তাড়াতাড়ি রেগে যায় তেমনি তাড়াতাড়ি তার রাগ থেমেও যায়। বেশি রাগি মানুষ এমনই হয়। খুব তাড়াতাড়ি রেগে যায় আবার তাড়াতাড়ি থেমেও যায়। বেশি রাগি মানুষ রাগ ধরে রেখে মনে মনে গুমড়ে ওঠে না। আর কম রাগি মানুষ রাগ ধরে রেখে গুমড়ে গুমড়ে উঠে, বুদ্ধি পাকায় কীভাবে তার রাগের প্রতিশোধ নিবে।
তিথি বললো, ওকে। তাহলে আমরা কে কে যাচ্ছি?
রকি বললো, আমি, টনি, রিতু আর তুই।
তিথি জেমসকে জিজ্ঞেস করলো, তুই যাবি না?
জেমস না সূচক মাথা নাড়লো।
তিথি তার ব্যাগ থেকে কয়েকটা কাঁচের চূড়ি বের করে জেমসের হাত ধরে বললো, তোকে পরিয়ে দিই। রিতু, আমি মেয়ে না, তুই মেয়ে। মেয়ে আর ছেলে শুধু জেন্ডারের ব্যাপার না, সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার। তুই সাইকোলজিক্যালি মেয়ে এগুলো তোর পরা দরকার।
জেমস অসহায়ের মতো বললো, মাম্মি খুব কান্নাকাটি করছে রে।
তিথি নিজের বুকের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, দেখিস আমি যেতে চেয়েছি না। ঠিকই যাবো।
টনি জিজ্ঞেস করলো, তুই চূড়িও পরিস, জানতাম না তো?
তিথি বললো, পরি না, সেদিন মাম্মি কিনে দিয়েছে, তাই ব্যাগে রেখে দিয়েছি।
রকি বললো, ওকে, বাদ দে।
তিথি বললো, তাহলে আমরা যাচ্ছি কবে?
রকি বললো, সানডে থেকে ছুটি না, তাহলে আমরা ফ্রাইডেতে স্টার্ট করবো।
ওকে।

পাঁচ

স্কুল থেকে ফেরার পথে তিথি তার বাবাকে প্রথম বললো। তার কথা বলার ধরনে কিছুটা আবদারের সুর, ডেডি!
হ্যাঁ মা, বল।
আমার ফ্রেন্ডরা সবাই গ্রামে যাচ্ছে তুমি কি জানো?
আমি কীভাবে জানবো তোদের ফ্রেন্ডদের ব্যাপার? তবে শুনেছি।
তোমার ফ্রেন্ডের কাছে? বলে তিথি একটা মুচ্‌কি হাসি হাসলো।
আমার ফ্রেন্ড! আদিত্য কিছুটা লজ্জায় পেলো।
তিথি আদিত্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, ডেডি লজ্জা পাচ্ছো কেনো? তোমার তো কোনো ফ্রেন্ড থাকতেই পারে, নাকি?
পারে তবে তোর মা জানলে…
মা জানবে কেনো, সবার একটা প্রাইভেসি আছে না। তোমার একজন ফ্রেন্ড থাকবে আর সেটা যদি মাম্মি জেনে জেলাস ফিল করে তবে তুমি মাম্মিকে জানাবে না।
আদিত্য তিথির মুখের দিকে কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে রইলো তারপর বললো, তুই বলবি নাতো?
ইম্পসিবল।
থ্যাঙ্ক ইউ মাই চাইল্ড।
কিছুক্ষণ বাবা মেয়ের মধ্যে কোনো কথা নেই। সি.এন.জি বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। দু’জনে গাড়ি থেকে নেমে লিফটে উঠলো। লিফটে বাবা আর মেয়ে তিথি লিফটেই আদিত্যকে বললো, ডেডি আমিও যাবো।
কোথায়?
গ্রামে।
ওরা না শুধু দু’জন ছেলে যাবে।
যদি আমি যেতে চাই তবে রিতুও যাবে।
রিতু কে?
রকির সিস্টার।
তা হলো কিন্তু ওরা তো ভাই-বোন। ওরা আর তুই তো এক হলি না। যাওয়া ঠিক হবে না।
কেনো? ঠিক হবে না কেনো?
রকি আর রিতু ভাইবোন, ওদের একসঙ্গে যাওয়া আর তুই ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়া এক হলো না রে মা।
তিথি তার বাবার কথা শুনে অভিমানে লাল হয়ে গেলো, ডেডি তুমিও!
আমি কী রে মা?
তুমি না সবসময় বলো, ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। ওরা আমার ফ্রেন্ড। আমরা তো কখনো নিজেদের ছেলে বা মেয়ে ভাবি না ডেডি।
আগে ভাবিসনি কিন্তু এখন ভাবতে হবে রে মা।
বাবা-মেয়ে লিফট থেকে নেমে বাসায় ঢুকলো। তিথি আদিত্যর একটা হাত নিজের মধ্যে নিয়ে তার বাবার কাঁধের ওপর কিছুটা ঝুঁকে পড়লো, ডেডি আমি যাবো। তুমি না করবে না প্লিজ।
আদিত্য তিথির মুখের দিকে তাকালো। তিথি চোখে-মুখে জিদ ফুটে উঠেছে। আদিত্য তিথির এই অভিমানের অর্থ বোঝে, তিথি একবার যেটা করতে চায় সেটা থেকে আর পিছু হটে না।
তিথি রুমানা-আদিত্যর একমাত্র সন্তান। জন্মের পর থেকে তারা তাকে অত্যন্ত আদর যত্নে লালন-পালন করেছে। আর সে কারণে মাত্রাতিরিক্ত আদর পেয়ে পেয়ে মেয়েটি আরো বেশি জেদি হয়েছে। আদিত্য জানে এখনো তিথি আব্দারের সুরে বললেও তা মুহূর্তে জিদে পরিণত হবে। সে সোফায় বসতে বসতে বললো, তাহলে তোর মা আসুক তারপর কাউন্সিলিং হবে।
কিন্তু তুমি তো রাতে থাকবে না।
আগামীকাল তো আমার মর্নিং ডিউটি। বিকেলে একসঙ্গে নাস্তা করবো। তখন কাউন্সিলিং হবে।
ডেডি আমি কিন্তু তোমাকে বলে রাখছি, আমি যাবো দ্যটস ফাইনাল।
তিথির চোখে-মুখ লাল হয়ে গেছে দেখে আদিত্য তাকে সহজ করার জন্য বললো, এখনি ফাইনাল করিস না, বরং এটাকে সেমি ফাইনাল বলতে পারিস। বলে আদিত্য হেসে উঠলো।

পরদিন বিকেলে নাস্তার টেবিলেই কাউন্সিলিং শুরু হলো। তিথি প্রথমে বায়নার সুরেই বললো, মাম্মি।
রুমানা তিথি মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী রে?
মাম্মি তোমাকে একটা কথা বলবো?
সেতো তোর কথার সুর শুনেই বুঝতে পাচ্ছি। বলে ফেল্‌?
মাম্মি আমি গ্রামে যাবো।
রুমানা এমনভাবে তিথির মুখের দিকে তাকালো যেনো সে এরকম কথা জীবনে কোনোদিন শুনেনি। সে কয়েকমুহূর্ত তিথির মুখের দিকেই তাকিয়ে রইলো।
তিথি আবার বললো, মাম্মি।
কী বললি যেনো?
আমি গ্রামে যাবো।
গ্রামে? কেনো?
বেড়াতে, গ্রাম দেখতে।
আচ্ছা। আগামীকাল তো আমার অফিস বন্ধ আছে। চল তোকে নিয়ে আশুলিয়া, সাভার, মানিকগঞ্জ ঘুরে আসি।
মাম্মি তুমি বুঝতে পারোনি।
মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন? রুমানার গলার স্বর কিছুটা ঝাঁঝালো।
থাক। আর বলবো না।
তাহলে থাক আর বলতে হবে না।
কিন্তু আমাকে যে বলতেই হবে।
তাহলে বলে ফেল্‌।
মানে আমার ফ্রেন্ডরা গ্রামে বেড়াতে যাবে।
ফ্রেন্ডরা মানে, স্কুল থেকে?
না। আমার ফ্রেন্ড রকি আর টনি গ্রামে বেড়াতে যাবে।
যাবে। ওরা দু’জন ফ্রেন্ড গ্রামে যাবে তো যাবে।
তিথি আবদারের সুরে বললো, মাম্মি আমিও যাবো।
রুমানা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রেগে গেলো, ওরা দু’ফ্রেন্ড তো ছেলে, ওদের সঙ্গে তুই যাবি?
তিথি বললো, মাম্মি ওদের সাথে রকির বোন রিতু যাবে।
যাবে। রিতু রকির বোন, ও যেতে পারে। তুই তো আর তোর ভাই’র সঙ্গে যাচ্ছিস না।
মাম্মি প্লিজ! প্রব্লেম কী? ওরা তো আমার ফ্রেন্ড।
ফ্রেন্ড হোক, ছেলে তো।
মাম্মি বিলিভ দেম, ওরা সেরকম ছেলেই না। ওরা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
তিথি অন্যায় আবদার করবি না, বলে সে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললো, এই জন্য তোর বাবাকে বলেছিলাম মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করার দরকার নেই। এখন বোঝো।
তিথি রেগে গেলো, আমার স্কুল কী দোষ করলো মাম্মি?
তোর স্কুল কী দোষ করলো মানে? তুই কি বুঝতে পারছিস, তুই কী কথা বলছিস, ছেলে আর মেয়ে কখনো কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়া যায়? ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্টুডেন্ট না হয়ে আমাদের দেশের কোনো গভ:মেন্ট বা নন-গভ:মেন্ট স্কুলের স্টুডেন্ট হলে সে এরকম চিন্তাই করতে পারতো না, বলে রুমানা আদিত্যকে বললো, তুমি কোনো কথা বলছো না কেনো? মেয়েকে বোঝাও। বাপ মেয়ে তো দেখি খুব মিল।
আদিত্য কিছু বললো না।
মাম্মি তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো। আমি তো আর একাই যাচ্ছি না। রিতুও যাচ্ছে।
এবার রোমানা রাগান্বিতস্বরে বললো, তিথি তোকে আমি একবারই বলেছি অন্যায় আবদার নিয়ে আসবি না।
তিথিও রেগে গেলো, আসলে তোমাকে বলাই ভুল হয়েছে।
রুমানা অবাক দৃষ্টিতে কয়েকমুহূর্ত তিথির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো তারপর বললো, না বলে তুই কী করতিস? আমাদের না জানিয়েই চলে যেতিস? এতোবড় সাহস তোর।
দেখো মাম্মি আমি কিন্তু অন্যায় আবদার করিনি। রিতু না গেলে আমিও যেতে চাইতাম না।
কিন্তু বিষয়টা যদি এমন হয় যে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই ওরা রিতুকে সাজিয়েছে।
এখানে সাজানোর কী আছে? ওরা যাচ্ছে, ওদের সঙ্গে একজন ফ্রেন্ডের বোন যাচ্ছে। ও তো দু’জনেরই বোন হতে পারে।
দেখ্‌ তিথি আমি তোর সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। আমি শুধু জানি তুই যাবি না। একটা কথা মনে রাখিস ছেলে আর মেয়ে কখনো বন্ধু হয় না।
তুমি ঠিক বলছো না মাম্মি। ফ্রেন্ড ফ্রেন্ডই। ছেলে হোক আর মেয়ে হোক।
সেজন্য তো দেখছি ছেলেমেয়ে বন্ধুত্বের নামে আজকাল কত কী ঘটছে। আমি চাই না আমার মেয়ে হয়ে তোর নামে কোনো কেলেঙ্কারি হোক। সো তুই যাবি না এটাই ফাইনাল।

ছয়

তিথির মন ভালো নেই। সে রাতে ভাত খেলো না, রুমানা ভাত খাওয়ার জন্য দু’য়েকবার বললো কিন্তু তিথি ভাত খেলো না। রাতে সে আর পড়ার টেবিলেই বসলো না, রাত দশটা বাজতে না বাজতেই বিছানায় শুয়ে পড়লো। আদিত্য তিথির ঘরে গিয়ে তার মাথায় হাত দিয়ে দেখে বললো, না কিচ্ছু হয়নি। ডিনার করবি না?
তিথি রাগে ফোঁস করে উঠলো, না। তুমি এখান থেকে চলে যাও।
ডিনার করবি না?
বললাম তো, না, প্লিজ তুমি এখান থেকে যাও। ডন্ট ডিস্টার্ব মি প্লিজ।
আদিত্য তিথির ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, মায়ের রাগ পেয়েছিস। একবার যা বলবি তাই করবি। এতোবড় রাত না খেয়ে থাকলে…বলতে বলতে আদিত্য তিথির ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
রুমানা আদিত্যর কথা শুনতে পেয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বললো, আমার কথা কী বললে তুমি?
আদিত্য থমকে গেলো, তোমার কথা! না, তোমার কথা কিছু বলিনি তো। আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? তোমাকে নিয়ে আমি কোনো কমেন্টস করবো!
পারো না, না? সুযোগ পেলে তো সবকিছুই বলো। আচ্ছা তোমাকে আমি একটা কথা বলবো?
বলো। একটা না, হাজারটা বলো, তোমার কথা শুনতে আমার একবিন্দুও আপত্তি নেই।
আদিত্য ভেবেছিলো তার কথা শুনে রুমানা হেসে ফেলবে কিন্তু রুমানা হাসলো না। সে আবার রাগান্বিত কণ্ঠে বললো, মেয়েটা কি আমার একার?
মোটেই না।
তবে মেয়ে তার ফ্রেন্ডদের সঙ্গে বেড়াতে যাবে এটা আমাকে একা নিষেধ করতে হবে কেনো? তোমার কি কোনো দায়িত্ব নেই? ওখানে মেয়েটার যদি কিছু হয়ে যায়?
আমি কি তোমাকে একবারও বলেছি ওকে যেতে দাও।
বলোনি কিন্তু আমি যেভাবে নিষেধ করেছি সেভাবে নিষেধও করোনি। শাসন না করে না করে মেয়েটা মাথায় উঠেছে। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি দু’জন ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে যাবে একথা বলার সাহস সে পেলো কীভাবে।
তোমার কি ধারণা আমি ওকে সাহস দিয়েছি?
বলছি তো তা দাও নি কিন্তু যেভাবে ওকে শাসন করার কথা ছিলো সেভাবে শাসনও করোনি। আমি তোমার চালাকি বুঝি, তুমি মেয়ের কাছে ফেরেশতা হয়ে থাকতে চাও। মেয়ের যত রাগ আমার ওপরই হোক।
কী করবো বলো। এই দু’বছর আগেও মেয়েটা আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো। এখনো সকাল বিকাল ও সবকিছু আমার সঙ্গেই শেয়ার করে। ওকে যদি আমি না বলি আর ও যদি মন খারাপ করে তবে আমিও খুব কষ্ট পাবো, বলতে বলতে আদিত্যর কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

পরদিন সকালবেলাও তিথি নাস্তা না খেয়েই স্কুল চলে গেলো। রুমানা কয়েকবার বললো, আদিত্য হাত ধরে নাস্তার টেবিলে বসানোর চেষ্টা করলো কিন্তু তিথি কারো কথাই শুনলো না। পর পর কয়েকটা ক্লাসের পর বিরতি। বিরতির সময় আদিত্য স্কুলের ক্যান্টিনে তিথিকে নাস্তা খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু তিথি আদিত্যর কথাও শুনলো না।
টনি, রকি আর জেমস একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলো। তিথি কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে হেলে-দুলে এলো, রকি জিজ্ঞেস করলো, হাই ফ্রেন্ড। হোয়াট ইজ ইওর কন্ডিশন?
নাথিং। দ্যা কন্ডিশন ইজ ভেরি বেড।
তোকে খুব টায়ার্ড দেখাচ্ছে। এ্যানি প্রব্লেম?
তিথি মাথা নেড়ে জানালো, প্রব্লেম।
জেমস কিছুটা অবাক হয়ে বললো, তোর প্রব্লেম?
টনি সামনে এগিয়ে এলো, কী প্রব্লেম আমাদের বল? উই আর অলসো ইওর ফ্রেন্ড।
তিথি বললো, বাট প্রব্লেমটাও তোদের নিয়েই।
তিনজনই যেনো আকাশ থেকে পড়লো, আমাদের নিয়ে।
ইয়েস। তোরা ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে আমার তোদের সঙ্গে গ্রামে যাওয়া হতো। কিন্তু মাম্মি ছেলেদের সঙ্গে আমাকে গ্রামে যেতে দিবে না।
রকি বললো, কেনো তুই রিতুর কথা বলিসনি?
বলেছি। তোরা ভাই-বোন একসঙ্গে যাবি, আমি তো আর তোদের বোন না।
সবাই কিছুটা নিরাশ হলো। রকি বললো, তাহলে-
তিথি বললো, আমি এখনো ট্রাই করছি। আই হোপ আই উইল সাকসেস।
কীভাবে? জেমস জিজ্ঞেস করলো।
একরাত না খেয়েই তিথির মুখটা শুকিয়ে গেছে। কণ্ঠস্বর বদলে গেছে সে শুষ্ক কণ্ঠে বললো, হ্যাঙ্গার স্ট্রাইক।
রকি বললো, ও সেজন্য তোর এই অবস’া।
জেমস বললো, নো নো ফ্রেন্ড, এটা তোর ঠিক হয়নি। তোর চেহারাটা একেবারে…
তিথি বললো, ওয়াও। জেমসের দেখি আমার জন্য খুব সেমপ্যাথি হচ্ছে।
হবে না। ফ্রেন্ডের জন্য ফ্রেন্ডের তো সেমপ্যাথি হবেই। বলে সে ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে ফিসফিস করে তিথিকে জিজ্ঞেস, তোর ডেডি স্কুলে এসেছে?
তিথি হাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
কোথায়?
ক্যান্টিনে।
তাহলে তো ক্যান্টিনে গিয়ে তোকে খাওয়ানো যাচ্ছে না। তুই ক্লাসে যা আমি তোর জন্য স্যান্ডউইচ নিয়ে আসছি।
তিথির পেট তখন ক্ষিদে চোঁ চোঁ করছে। তার মনে হচ্ছে এখনই ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খেয়ে অন্তত: পেটের এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে।
তিথি টনি আর রকির দিকে তাকালো। রকি বললো, তুই ক্লাসে যা।
তিথি বললো, তুই না একটা মেকানিজম করতে চাইলি।
সেজন্যই তো রিতুকে নিয়ে যেতে চাইলাম কিন্তু তাতেও তো কোনো কাজ হলো না। তুই তোর চেষ্টা চালিয়ে যা। আমি দেখছি আবার কোনো মেকানিজম করা যায় কী না।
প্লিজ ফ্রেন্ড, আই উড লাইক টু গো উইথ ইউ।
তিথি চলে গেলো।
টনি বললো, তিথি কেনো আমাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য এডামেন্ট হয়ে গেছে জানিস?
রকি বললো, গ্রাম দেখতে যাবে তাই।
সেটা তো ঠিক আছে। আরো একটা কারণ আছে।
কী বলতো?
ওর মাথায় ঢুকেছে। গ্রাম থেকে তোদের বাড়িতে তুলি নামে একটা মেয়ে এসেছিলো আর আমরা সেই তুলিদের বাড়িতেই যাচ্ছি। মেয়েদের খুব জেলাসি।
রকি একটা মুচকি হাসি হেসে বললো, জেলাসি শুধু মেয়েদের না, ছেলেদেরও। তিথি যখন আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলো তখন কি তুই কম করেছিস।
টনি কিছুটা লজ্জা পেলো।
সাত

টনি তুলির কথা বলতেই রকির মনে পড়লো তুলির তাদের বাসায় আসার দিনের কথা। সেদিন স্কুল বন্ধ ছিলো। তুলি আর তার বাবা তাদের বাসায় এসে পৌঁছালো তখন সন্ধ্যা। কলিং বেলে টিপ দিতেই রইস দরজা খুলে দিলো, আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম, কী রে ভালো আছিস?
হ্যাঁ ভালো।
তোর আসতে কোনো কষ্ট হয়নি তো?
না।
কথা বলতে বলতে রইস হারুন আর তুলিকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর লোপা তার রুম থেকে বেরিয়ে এলো, বাড়িতে গেস্ট এসেছে দেখে রকি, রিতুও ড্রয়িং রুমে এলো।
রইস হারুনের সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করে দিলো, লোপা এ হচ্ছে হারুন, আমার তাহইতো ভাই, তোমাকে তো ওদের কথা আগেই বলেছি। আর বলে সে তুলির দিকে মুখ করে তাকাতেই হারুন বললো, আমার মেয়ে তুলি।
তুলি সবাইকে সালাম দিলো।
রইস এবার লোপার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো, হারুন, বুঝতেই পাচ্ছিস তোর ভাবী বলে রকির দিকে তাকাতেই সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, হাই, আমি রকি।
তুলি হাত বাড়ালো না, সে একবার ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে বললো, আমি তুলি, ক্লাস নাইনে পড়ি।
রকি মুখ কালো করলো।
রিতু তার পরিচয় দিলো।
সেদিন রাতে ডাইনিং টেবিলে তুলির সঙ্গে রকি আর রিতুর দু’য়েক কথা হলো। পরদিনও স্কুল বন্ধ ছিলো। সকালবেলা নাস্তার পর রইস আর হারুন চলে গেলো বাজার করতে। রকি তার রুমে গিয়ে কম্পিউটারে বসলো। কিছুক্ষণ পর রকি তার রুম থেকে জোরে ডাক দিলো, এই রিতু।
বল?
কী করছিস?
তুলির সঙ্গে গল্প করছি।
রকি কিছুটা অভিমানের সুরে বললো, গল্প করতে হবে না। এদিকে আয়।
কেনো?
আয় বলছি।
রিতু রকির রুমে এলো, বল?
কে রে মেয়েটা?
ডেডি গতকাল পরিচয় করে দিলো না, ও হচ্ছে তুলি। ডেডির তাহইতো ভাইয়ের মেয়ে।
তাহইতো ভাই কাকে বলে রে?
রিতু না সূচক মাথা নেড়ে বললো, তুলি জানে, কথা বলবি ওর সঙ্গে?
রকি আম্‌তা আম্‌তা করে বললো, কথা বলবে? মেয়েটাকে দেখে তো আনকালচার্ড মনে হচ্ছে।
রিতু তার নিজের মুখে আঙ্গুল দিয়ে বললো, আস্তে বল। তুলি শুনতে পাবে তো।
শুনতে পাওয়ার জন্যই তো বলছি।
আনকালচার্ড কী না আগে কথা বল, শুনলে তুইও অবাক হবি।
তাই নাকি?
হাঁ, আমার রুমে আয়।
দু’জনে কথা বলতে বলতে রিতুর রুমে ঢুকলো।
তুলির পরনে একটা প্রিন্টের থ্রি-পিস, মাথায় ওড়না। সে বিছানায় বসে ছিলো। রকিকে রুমে ঢুকতে দেখে সে একটু নড়েচড়ে বসে মাথায় ওড়না টেনে দিয়ে সালাম দিলো, আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম।
রকি রিতুর পড়ার টেবিলে বসলো আর রিতু তুলির পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, এই তুলি তাহইতো ভাই কাকে বলে রে?
তুলি ফিক করে একটা হাসি হাসলো, তাহইতো ভাই হলো…বলে তুলি কথা বলার ধরন পাল্টালো, আচ্ছা তোকে বুঝিয়ে বলি যেমন তাহইতো ভাই হলো তোর বিয়ে হলে তোর হ্যাজবেন্ডের ভাই আর রকি ভাইয়া তাহইতো ভাই হবে।
এবার রকি বললো, ও বুঝেছি। দ্যাট মিনস ব্রাদার ইন ল।
তুলি বললো, এক্সাক্টলি।
তুলি জিজ্ঞেস করলো, আপনারা তুলির এক্সাক্টলি বলার উচ্চারণ শুনে দেখে রকি তুলির মুখের দিকে তাকালো।
কী বলেন?
রকি বললো, আমাদের তো তেমন কোনো রিলেটিভ নেই।
রিলেটিভ নেই মানে?
আছে, আমার ফ্রেন্ডরা আছে।
আর…, চাচা-চাচি, মামা-মামি, খালা-খালু…
রকি বলতে শুরু করলো, না, ডেডির দিক থেকে তো কোনো রিলেটিভ নেই, মাম্মিরও কোনো ব্রাদার-সিস্টার নেই।
আপনার নানা বাড়ি কোথায়?
পাশেই।
আপনাদের গ্রামের বাড়ি কোথায়? তুলি জিজ্ঞেস করলো।
রিতু বললো, গ্রামে তো আমাদের কোনো বাড়িই নেই।
রকি বললো, আমরা তো কোনোদিন গ্রামেই যাইনি।
ও মাই গড। চলে আসুন। আমাদের গ্রামে আসুন। গ্রাম কত সুন্দর। আমাদের গ্রামে নদী আছে, পুকুর আছে, শালবন আছে।
রকি জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করো?
জি। আমি ঢাকা এসেছি একটা টি.ভি চ্যানেলে মিউজিক কম্পিটিশনে পার্টিসিপেট করতে।
রকি আর রিতু দু’জনে কিছুটা অবাক হলো, রকি জিজ্ঞেস করলো, কবে?
আজ বিকেল চারটায়।
লাইভ দেখাবে?
হ্যাঁ।
রিতু বললো, তারমানে তোকে আমরা আজ বিকেল চারটায় টি.ভিতে দেখছি।
তুলি মাথা নেড়ে সায় দিলো।
রকি আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললো, ওয়াও। ইউ আর অলসো স্টার।
তুলি প্রতিবাদ করলো, স্টার না, সিঙ্গার।
সেদিনের কম্পিটিশনের লাইভ অনুষ্ঠান রকি, রিতু, রইস আর লোপা একসঙ্গে বসে দেখেছে। অনুষ্ঠানে তুলি রানার্স আপ হয়েছে। কম্পিটিশন শেষে তুলি আর তার বাবা যখন বাসায় ফিরলো তখন রকি আর রিতু ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানালো। রকি সামনে এসে রিতুর হাতে ফুল দিয়ে বললো, কনগ্রাচুলেশন তুলি।
থ্যাঙ্ক ইউ।

হারুনের সেদিন রাতের বাসে দিনাজপুর ফেরার কথা কিন্তু সেদিন ফেরার কথা শুনেই শুধু রইস না, পুরো বাসার সবাই যেনো প্রতিবাদ করলো। লোপা বললো, না, না, ভাই আজ কোনোভাবেই আমি আপনাকে যেতে দিচ্ছি না। আবার কবে আসবেন তার ঠিক নেই।
রিতু বললো, না আঙ্কল তুলিকে আমরা আজ যেতে দিবো না। এতোবড় শিল্পীকে আমরা এতো সহজে ছাড়ছি না।
হারুন তুলিকে জিজ্ঞেস করলো, কী রে মা থাকবি?
তুলি এতোক্ষণ মাথা নত করে চুপ করেছিলো এবার সবার মুখের দিকে একবার তাকাতেই রিতু তুলির কানে কানে ফিস্‌ফিস করে বললো, হ্যাঁ বল।
তুলি হেসে ফেললো।

আট
রাতের খাবারের পর রিতু আর তুলি রিতুর রুমে চলে গেলো। কয়েকমিনিট পর রকিও রিতুর রুমে এলো, হাই সিঙ্গার, আমাদের গান শুনাবি না?
তুলি কিছুটা লজ্জা পেলো।
রিতু বললো, নে, তুলি একটা গান শুরু কর, লজ্জা কীসের?
তুলি শুরু করলো, আমি রজনীগন্ধ্যা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই,
আমি মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো আলো বিলিয়ে যাই…
তুলির গান গাওয়ার সময় রকি এবং রিতু মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
গান শুনে লোপা ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো।
গান শেষ হতে না হতেই রকি আর তুলি দু’জনে ওয়াও বলে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করলো। তারপর রকি বললো, ইউ আর সো গ্রেট সিঙ্গার।
লোপা ভিতরে ঢুকে তুলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আবেগ আল্পুত হয়ে বললো, তুই সত্যি মেঘে ঢাকা চাঁদ মা। একদিন মেঘ সরে যাবে। তুই অনেক বড় হবি, অনেক বড় শিল্পী হবি, বলতে বলতে লোপার কণ্ঠস্বর আবেগে জড়িয়ে গেলো।
ড্রয়িং রুম থেকে রইস জোরে ডাক দিলো, মা তুলি এদিকে আয় তো, রকি, রিতু তোরাও আয়। সবাই একসঙ্গে বসে তুলির গান শুনি।
তুলি ড্রয়িং রুমে কার্পেটের ওপর বসলো। রইস আর হারুন সোফার ওপর থেকে কার্পেটের ওপর বসলো।
তুলি গান গাইতে শুরু করলো, শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো,
তোমাদেরই মন ভোলাবো,
শিল্পী হয়ে তোমাদেরই মাঝে
শিল্পী হয়ে তোমাদেরই মাঝে
চিরদিন আমি রবো
শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো
তোমাদেরই মন ভোলাবো।
শিল্পী, আমি শিল্পী…
তুলি একে একে কয়েকটা গান গাইলো। তুলি গান গাওয়ার সময় সবাই মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। গান শেষ হতেই রইস আবেগে আল্পুত হয়ে পড়লো, সত্যি সত্যি তুই একদিন খুব ভালো শিল্পী হবি মা।
গান শেষ হতে না হতেই লোপা তার রুমে গেলো, রুম থেকে ফিরে এসে তুলি গলায় একটা চেইন পরিয়ে দিয়ে বললো, অনেক বড় হ মা।
রকি জিজ্ঞেস করলো, এগুলো গান তুই কার কাছে শিখেছিস তুলি?
আমার এক ফুপুর কাছে।
রকি একবার এদিক-সেদিক তাকালো। লোপা বুঝতে পেরেছে রকি কী জানতে চেয়েছে। সে বললো, ফুপু হলো বাবার বোন, গাধা কোথাকার! বলে লোপা বললো, অনেক ধন্যবাদ মা এবার তুই ঘুমাতে যা। রিতু তুলিকে তোর রুমে নিয়ে যা।
হারুন তুলিকে বললো, তাড়াতাড়ি ঘুমাবি মা, সকাল দশটায় বাস, আমরা ন’টায় এখান থেকে রওয়ানা দিবো।

পরদিন সকালবেলা তুলি কাপড়-চোপড় পরে রেডি হয়ে রিতুর সঙ্গে কথা বলছে এমনসময় রকি জোরে ডাক দিলো, রিতু।
বল।
কী করিস?
তুলির সঙ্গে গল্প করছি।
আমার রুমে আয়তো একটু।
কেনো?
এমনি।
রিতু তুলিকে বললো, চল তুলি।
রিতু আর তুলি দু’জনে রকির রুমে ঢুকলো।
ওয়াও, গুড মর্নিং।
তুলি বললো, গুড মর্নিং।
রওয়ানা দিচ্ছিস?
হ্যাঁ। আমাদের গ্রামে আসবেন।
অবশ্যই। আমি গ্রাম কোনোদিন দেখিনি, কোনোদিন আগ্রহ ছিলো না। এখন মনে হচ্ছে সুযোগ পেলেই একবার গ্রামে গিয়ে ঘুরে আসবো।
অবশ্যই আসবেন।
লোপা জোরে ডাক দিলো রিতু, তুলি আয় মা। নাস্তা রেডি।
ওকে। ভালো থেকো।
আপনিও ভালো থাকবেন।
রিতু প্রতিবাদ করলো, এই আপনি কী রে? কাল থেকে তুই শুধু আপনি আপনি করছিস। আমরা একসঙ্গে পড়ি না?
তুলি মাথা উঁচু-নিচু করে জানালো তারা একসঙ্গে পড়ে।
তাহলে তুই ওকে আপনি আপনি করছিস কেনো? আমরা সবাই সমান।
রকি বললো, অফকোর্স, উই আর অলসো ফ্রেন্ড।
না। সমান না, তোর চেয়ে আমি এক ঘণ্টার বড়। আমি কিছু মনে করি না তাই, তোর আমাকে আপনি বলা উচিত, ভাইয়া বলা উচিত। তুলি আর আমি সমান। বলে রকি তুলির সঙ্গে হ্যান্ড শ্যাক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।
এই দেড় দিনের মধ্যে তুলি যেনো সবার মন জয় করে ফেলেছে। হারুন আর তুলিকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে লোপা বার বার করে চোখ মুছলো, রিতু, রকি, রইস সবার চোখ যেনো পানিতে ছল্‌ছল্‌ করছে।
তুলি লোপা আর রইসের পা ছুঁয়ে সালাম করতেই লোপা তুলিকে বুকে টেনে নিলো, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, আবার আসিস মা, ভালোভাবে লেখাপড়া করিস, আমি তোর জন্য দোয়া করছি তুই একদিন অনেক বড় হবি।
তুলিও আবেগজড়িত কণ্ঠে বললো, আপনিও আমাদের বাসায় আসাবেন আন্টি।
যাবো মা, অবশ্যই যাবো।
হারুন বললো, রইস, ভাবী কিন্তু বললো আমাদের বাড়ি আসবে, এবার আর না করবি না। চলে আসবি, রকি, রিতু তোমরাও এসো মা।
জি আঙ্কল, রকি বললো।
সিঁড়ির ল্যান্ডিং পর্যন্ত সবাই দাঁড়িয়ে হাত তুললো।

নয়

কয়েকমাস পরের কথা। আর কয়েকদিন পর রকির পরীক্ষা শেষ হবে, তারপর ছুটি। সেদিন রাতে রকিই প্রথম কথা তুললো, মাম্মি আমি গ্রামে যাবো।
গ্রামে? কেনো?
এমনি, বেড়াতে। তুমি না বললে তুলিদের বাড়িতে যাবা।
বলেছিলাম। শুধু তোর না আমারো যেতে ইচ্ছা করছে। বলে সে কয়েকমুহূর্তের জন্য উদাস হয়ে গেলো তারপর আপনমনে বললো, তুলি…খুব সুন্দর মেয়ে যেমনি সুন্দর তেমনি গানের কণ্ঠ। তোর সাথে তো আমারো যেতে ইচ্ছে করছে। বলে লোপা চুপ করে রইলো।
রকি জিজ্ঞেস করলো, মাম্মি?
কার সাথে যাবি?
কার সাথে আবার আমি একা।
লোপা জোর প্রতিবাদ করলো, না তুই একা যেতে পারবি না।
তো?
তো কী? যদি আরো কেউ যেতো তবে তুই তাদের সাথে যেতে পারতিস।
মা’র কাছ থেকে বাধা পেয়ে রকি বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ডেডি তুমি কিছু বলছো না যে? তোমার কি ধারণা আমি একা যেতে পারবো না?
রইস রকির দিকে তাকিয়ে বললো, আমার বিশ্বাস তুই যেতে পারবি তারপর লোপার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে একটা ঢোক গিলে বললো, আবার নাও পারতে পারিস। আজকাল যা দিনকাল খারাপ পড়েছে।

রইসের শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে গ্রামে। মহান মুক্তিযুদ্ধে রইসের বাবা-মা দু’জনে শহীদ হয়েছেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় রইস। তখন সে সবেমাত্র ক্লাস ফাইভ পাস করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রইসকে তার মামা ঢাকায় নিয়ে আসে। মামার বাসায় থেকে রইস লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকুরীতে জয়েন করেছে।
ছাত্রজীবনে রইস কয়েকবার মামার সঙ্গে তাদের গ্রামের বাড়িতে গেছে। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি জীবনেও দু’য়েকবার গেছে তারপর চাকরি জীবনের ব্যস্ততায় গ্রামে যাওয়াটা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য গ্রামে যাওয়ার সুতোটাও ছিঁড়ে গেছে। রইস বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। কাছের আত্মীয়-স্বজন বলতে গ্রামে তেমন কেউ নেই। তাই বিয়ের পর ঢাকায় জমি কেনার সময় গ্রামে যা জমি-জমা ছিলো বিক্রি করে দেয়। ফলে দু’য়েক বছর পর পর জমি দেখার অজুহাতে গ্রামে যাওয়ার পথটাও বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে তার বাল্য বন্ধু বলে যা বোঝায়, প্রাইমারি স্কুলে যাদের সঙ্গে লেখাপড়া করে বিভিন্ন অফিসে চাকরি করছে তাদের কেউ কেউ যোগাযোগটা ধরে রেখেছে আর মোবাইল ফোন আবিস্কারের সুবাদে তাদের কাছ থেকে মোবাইল নাম্বার নিয়ে এখনো কেউ কেউ যোগাযোগ করে। কোনোদিন কোনো বাল্য বন্ধু ফোন করলে রইসের বুকটা ভরে যায়। সে ফিরে যায় শৈশবে। ইট-কাঠ পাথরে গড়া ঢাকা শহর থেকে তার মন ছুটে যায় সবুজ মাঠে, আঁকা-বাঁকা মেঠোপথে, শাপলা ফোটা পুকুরে। তাই রকি যখন তার গ্রামে যাওয়ার কথা বললো তখন রইস কিছুক্ষণ উদাস হয়ে রকির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
রকি বাবাকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো, ডেডি।
হ্যাঁ বল।
কিছু বলছো না কেনো?
রিতুকে টেবিলে খাবার বাড়িয়ে অন্তত: পনের মিনিট থেকে ডাকতে হবে, রিতু খাবার রেডি চলে আয়, রিতু….
তারপর সে আসবে। আজ খাবার টেবিলে গ্রামের যাওয়ার কথাটা তার কানে যেতেই একবার ডাক পড়তেই সে চলে এলো, কী হয়েছে বাবা?
লোপা জানে গ্রামের প্রতি রিতুর একটা টান আছে। সে বিষয়টা চাপা দেয়ার জন্য বললো, কিছু হয়নি, খেতে বস।
রকি বললো, আমি গ্রামে যাবো।
কে কে যাবি?
আমি একা যেতে চাচ্ছি কিন্তু মাম্মি বলছে আমি নাকি একা যেতে পারবো না। ভাবছি আমার ফ্রেন্ডরা যাবো মানে আমি আর টনি যাবো।
রিতু বাবার কাঁধে একটা হাত রেখে বায়নার সুরে বললো, বাবা আমিও যাবো?
লোপা রিতুর দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে বললো, রিতু, খেতে বস।
বসছি তো, বলে রিতু বাবার চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, বাবা প্লিজ!
লোপা ডাইনিং থেকে রান্নাঘরে গেলো সে সুযোগে রকি বাবার দিকে তাকিয়ে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললো, বাবা প্লিজ!
রইস মাথা উঁচু-নিচু করে সায় দিলো।
রকি বললো, থ্যাঙ্ক ইউ ডেডি।
লোপা ফিরে এলো। সে পরিসি’তি বুঝতে পেরে কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললো, ও বললো আর তুমি পারমিশন দিয়ে দিলে।
রইস সাহেব একটা মুচকি হাসি হেসে বললো, পারমিশন দিইনি তো।
রকি এবং রিতু বাবার দিকে তাকালো।
তো? রকি তোমাকে থ্যাঙ্কস দিলো কেনো?
ঐ একটু মাথাটা উঁচু-নিচু করেছি আর কী।
লোপা যেনো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো, মাথা উঁচু-নিচু করা আর পারমিশন দেয়ার মধ্যে তফাৎ কী?
ছেলেটা গ্রাম দেখতে যেতে চাচ্ছে, যাক্‌ না।
রিতু বললো, হ্যাঁ আমিও তাই বলছি, বাংলাদেশে প্রায় আটাশি হাজার গ্রাম আছে আর আমরা যদি একটা গ্রামও না দেখি তো আমাদের জীবনটাই বৃথা।
লোপা রিতুর দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললো, এই আমরা কী রে? রকি যদি ওর বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চায় তো যাবে। তোর যাওয়া হবে না। বলে লোপা আবার রান্না ঘরে চলে গেলো।
রকি বললো, ডন্ট ওরি মাই সিস্টার, তুই যাবি তো, দেখিস আমি একটা মেক্যানিজম বের করে ফেলবো।
তুই কি মেক্যানিজম বের করবি?
সেটা আমি বুঝবো। তাছাড়া ডেডির তো সাইলেন্ট পারমিশন আছে।
থ্যাঙ্ক ইউ।
লোপা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো, কী হলো? আবার থ্যাঙ্কস কেনো? বলে সে রইসকে বললো, এই কী হলো বলোতো?
রইস কিছু না বোঝার ভান করে বললো, আমি তো খাচ্ছিলাম।
ও, তাইতো, তুমি তো চোখ-কান বন্ধ করে খাচ্ছিলে। সবাই মিলে দল পাকিয়েছো।
আমি আবার কী পাকালাম। আমি বলছি ছেলেটা যেতে চায় যাক্‌।
লোপা আবার বলতে শুরু করলো, সারাজীবন নিজে নিজে সব সিদ্ধান্ত নিলে, কোনোদিনও তুমি আমার কথার কোনো গুরুত্ব দিলে না।
আমি তোমার কোন কথার গুরুত্ব দিই না। বরং সব সিদ্ধান্ত তো তুমি নাও।
থাক আর বলতে হবে না। তোমার ছেলেমেয়ে তুমি যা ভালো বোঝো করো, বলে লোপা আবার রান্নাঘরে চলে গেলো।

দশ
হারুন ফোন রিসিভ করলো, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম, কী রে হারুন কেমন আছিস?
ভালো, তুই?
ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। শোন্‌ একটা খবর আছে।
বল, কী খবর?
রকি তোদের বাড়িতে যাবে।
তাই নাকি? খুব খুশি হয়েছি। কবে?
আগামী শুক্রবার ঢাকা থেকে রওয়ানা দিবে।
হারুন জিজ্ঞেস করলো, তুই, রিতু, ভাবীসহ আসছিস তো?
আমার আর সময় কই রে, তোর ভাবীরও সময় নেই।
তো?
রকি আর ওর সঙ্গে ওর দু’য়েকজন ফ্রেন্ড যেতে পারে। কোনো সমস্যা নেইতো?
না। সমস্যা কীসের? কীভাবে আসবে?
সেসব তোকে আমি পরে জানাবো। তাহই কেমন আছে রে?
ভালো।
কী করে এখন?
কী আবার তার সেই লাইব্রেরি, জ্ঞান চর্চা আর মোড়ের মানুষকে জ্ঞানের কথা শোনানো। আজকাল আবার শুরু করেছে অনলাইনে লেখাপড়া যেনো তার লেখাপড়ার শেষ নেই।
শেষ পর্যন্ত গ্রামে থেকেই জীবনটা শেষ করে দিলো।
হুঁম। তার যেমন ইচ্ছা।
তাহইর শরীর ভালো আছে তো?
হ্যাঁ, এখনো আমাদের মতোই এনার্জেটিক আছে।
তাহইকে আমার সালাম দিস।
আচ্ছা।
ওকে, ভালো থাকিস। এখন রাখি।
তুই ভালো থাকিস। তবে তুইসহ সবাইকে নিয়ে এলে আমরা খুশি হতাম।
ওরা যাক। পরে একসময় যাবো।
আচ্ছা।
ফোন রেখে হারুন প্রথমে তুলিকে খবরটা দিলো, মা তুলি।
জি বাবা।
এদিকে আয় তো। তোর মাকে ডাক দে। বাসায় মেহমান আসবে।
তুলি দৌড়ে এলো, কী হয়েছে বাবা? কে আসবে?
ঢাকা থেকে…কে আসবে বলতো?
রকি, রিতু নিশ্চয়ই। সঙ্গে আক্কেল আন্টি।
না। শুধু রকি আসবে আর ওর সঙ্গে দু’য়েকজন ফ্রেন্ড। বাবা কোথায়? দেখ্‌তো বাবাকে খবরটা জানাই।
দাদু লাইব্রেরিতে আছে বাবা, তাহলে আমি যাই দাদুকে খবরটা দিই।

বিরল কালিয়াগঞ্জ রোডের উভয় পাশের কয়েকটি পাড়া নিয়ে একটি গ্রাম, মির্জাপুর। দেশের প্রায় আটাশি হাজার গ্রামের মতোই একটি সাধারণ গ্রাম। আজকাল প্রায় সারাবছর ক্ষেতে সবুজের সমারোহ থাকে। ধানক্ষেত, পাটক্ষেত, বিভিন্ন ধরণের শাকসবজির ক্ষেত তো আছেই। একটা বিল মাঝ দিয়ে বয়ে গিয়ে গ্রামকে দ্বিখণ্ডিত করেছে কিন্তু বিভাজন করতে পারেনি গ্রামের মানুষকে। এই গ্রামে হিন্দু-মুসলমান আছে একসাথে ভাই ভাই হয়ে। পূজার সময় সমস্ত মুসলমান হিন্দুদের পূজার উৎসব পালন করে, আবার হিন্দুরাও মুসলমানদের ঈদের সময় আনন্দ করে। ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত মির্জাপুর গ্রাম।
রাস্তার পূর্ব পাশে বিশাল সীমানা প্রাচীর ঘেরা বাড়ি। এল প্যাটার্নের কয়েকটি সেমিপাকা ঘর, ওপরে সবুজ ঢেউ টিনের ছাউনি। খোলা বারান্দা। পাশাপাশি ঘরে থাকে তুলির চাচা। বাপ-চাচা আর দাদা-দাদি মিলে তুলিদের একান্নবতী পরিবার। প্রতিদিন বড় পাতিলে পুরো পরিবারের জন্য ভাত রান্না হয়। বড় খোলা বারান্দায় সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে একসঙ্গে খাবার খায়।
তুলির দাদার নাম আব্দুল লতিফ। বয়স পঁচাত্তর বছর। এই বয়সেও ডাইনিং টেবিলে থেকে সবাইকে ডাক দিবে, কেউ না এলে তার আসার কারণ না জানা পর্যন্ত খাবার মুখে তুলবেন না। ডাইনিং টেবিলে গোল হয়ে বসবেন ছেলে-বউমা, নাতি-নাতনিরা সব। খাওয়ার পর শুরু হবে সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা। সবাইকে সংসারের, নাতি-নাতনিদের লেখাপড়ার বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেন। আগে এই দিক নির্দেশনায় অংশ নিতেন তুলির দাদিও কিন্তু কয়েকবছর আগে তিনি এই সমাজ-সংসারের মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
স্ত্রী বেঁচে থাকতে লতিফ সাহেব সংসারের দেখভাল নিজেই করতেন। সকালবেলা কামলা-কিষাণদের কাজের নির্দেশনাও দিতেন। তারপর কয়েকঘণ্টা কাটাতেন লাইব্রেরিতে, লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ক্ষেতখামার দেখতে যেতেন। স্ত্রী বিয়োগের পর সংসার থেকে তিনিও অনেকটা বিয়োগ হয়েছেন। এখন লাইব্রেরিই যেন তার ঘর-সংসার।
হারুন লাইব্রেরিতে গেলো, বাবা।
বল।
বাবা বাসায় ঢাকা থেকে মেহমান আসবে।
লতিফ সাহেব র‌্যাকে একটা বই খুঁজছিলেন। এবার তিনি মাথা তুলে হারুনের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ঢাকা থেকে আবার কে আসবে?
রকি আসবে, রইসের ছেলে রকি।
রইস আসবে না।
না, ওরা খুব ব্যস্ত।
লতিফ সাহেব ভেবেছিলেন রইসও আসবে কিন্তু রইস না আসার কথা শুনে মুখ কালো করলেন, অ।
কবে আসবে?
শুক্রবার।
লতিফ সাহেব বইয়ের র‌্যাকের কাছ থেকে চেয়ারে এসে বসলেন, তাহলে তো আর সময় নেই। ওরা থাকবে কোন্‌ ঘরে?
কেবল খবরটা শুনলাম। এখনো কিছু চিন্তা করিনি।
এ্যাটাচড বাথ ওয়ালা রুম টাতে ওদের থাকার ব্যবস’া কর, বিদ্যুতের যা অবস’া, আই.পি.এস’টা ঠিক আছে কী না সেটা ভালো করে দেখ। ওরা তো মনে হয় ঢাকার বাইরে কোনোদিন বের হয়নি।
সেজন্যই আসছে গ্রাম দেখতে।
আচ্ছা। ওরা আসছে কীভাবে?
রইস কমলাপুর ট্রেনে উঠিয়ে দিবে আর আমি দিনাজপুর রিসিভ করতে যাবো।
অ। তাহলে তো একটা মাইক্রোবাস ঠিক করতে হবে। এক কাজ কর, আমাদের সাদেকের মাইক্রোবাসটা ভাড়া দেয় না।
হারুন বললো, দেয়।
ওর ড্রাইভারের মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে রাখ আর বলে রাখ মেহমান কোথাও যেতে চাইলে ওকে ফোন করলে যেনো চলে আসে।
জি আব্বা।
ওরা যে ক’দিন থাকবে সে ক’দিন যেনো খাওয়া-থাকা, যাতায়াতে কোনো ত্রুটি না হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়িতে ধুমধাম আয়োজন শুরু হলো। হারুনের ছোট ভাই হাসিব গেলো রং মিস্ত্রি আনতে, বাড়ির রং পুরানা হয়ে গেছে। পরদিন সকালবেলা রং মিস্ত্রি বাইরে ওয়েদার কোট আর ভিতরে ডিসটেম্পারের কাজে লেগে গেলো। পড়শিদের মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হলো।
কেউ কেউ বললো, হঠাৎ করে হারুনের বাড়িতে রং-চংয়ের কাজ শুরু হলো কেনো? হারুনের মেয়ের বিয়ে নাকি?
আবার কেউ কেউ বললো, লতিফ ভাইকে তোমরা চেনো না, সারাজীবন যিনি বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ আর কুসংস্কারের জন্য কথা বলেছেন তিনি কি তার স্কুল পড়-য়া নাতনিকে বিয়ে দিবেন নাকি?
হারুন বাড়ি থেকে বের হয়ে বোর্ডের হাটের দিকে যাচ্ছিলো। মোড়ে হাসেমের সঙ্গে দেখা। হাসেম হারুনের দূর-সম্পর্কের চাচা। বয়সে কাছাকাছি হওয়ায় সে প্রায়ই হারুনের সঙ্গে ঠাট্টা করে। সে হারুনকে মোড়ে পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, হারুন বাড়িতে এতো ধুমধাম কেনো? তোমার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ নাকি? বলে সে এক গাল হাসি হাসলো।
হারুন ধমকের সুরে বললো, তোমার তো দেখি কাণ্ড জ্ঞান কমে গেছে চাচা, আমার মেয়ের বিয়ে এখনই।
হাসেম একটা ঢোক গিলল, না, মানে বাড়িতে…
হ্যাঁ রং-চংয়ের কাজ চলছে, ঢাকা থেকে মেহমান আসবে, রইস আছে না, আমার তাহইতো ভাই। ওর ছেলে আসবে, গ্রাম দেখতে, ওরা নাকি কোনোদিন গ্রামে যায়নি তাই গ্রাম দেখতে আসবে।
অ, তাই বলো।

এগারো

অনশন করতে করতে তিথির চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে। রাতের খাবারের সময় রুমানা কয়েকবার তিথি, তিথি বলে ডাক দিলো কিন্তু তিথি কোনো সাড়া দিলো না। রুমানা তিথির রুমে গেলো। তিথির মাথায় হাত দিয়েই চমকে উঠলো, জ্বর এসেছে নাকি তোর?
তিথি রেগে ফোঁস করে উঠলো, না। আমার কিচ্ছু হয়নি। তুমি যাও।
রুমানা লাইট জ্বালিয়ে দিলো, ইসস! চোখ-মুখ শুকিয়ে একেবারে শেষ হয়ে গেছে।
তাতে তোমার কী। আমি মরে গেলেই তো তোমার ভালো।
তিথির মুখে তার মরে যাওয়ার কথা শুনে তার চোখ দিয়ে ছিটকে পানি বের হলো, কেনো? এভাবে বলছিস কেনো? তুই আমার একমাত্র সন্তান, তুই মরে গেলে আমি খুশি হবো মানে।
তাহলে তো আমার সঙ্গে তুমি এমন আচরণ করতে না।
তুই বল, কোনো মা কি এই বয়সের একজন মেয়েকে ছেলেদের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যেতে দিতে পারে, ফ্রেন্ড হোক ছেলে তো।
কেনো পৃথিবীর সব ছেলেরাই কি খারাপ? রকি, টনি ওরা আমার ফ্রেন্ড, যতই হোক ছেলে আমি ওদের চিনি ওরা আমার কোনো ক্ষতি করবে না। তাছাড়া ওদের সাথে তো রিতুও যাচ্ছে।
রিতু যাচ্ছে?
হ্যাঁ। ক’দিন থেকে তো আমি তোমাকে সেটাই বলছি।
আচ্ছা আমি খবর নিচ্ছি, তুই ভাত খা, যদি ওদের সাথে রিতু যায় তবে তুইও যাবি।
তিথি বিছানা থেকে একরকম লাফিয়ে উঠলো।

রুমানার কথা শুনে লোপা চমকে উঠলো, আমি তো জানি শুধু রকি যাচ্ছে, রিতু তো যাচ্ছে না।
রুমানা বললো, আপা তিথি বলছিলো রিতু যাচ্ছে, তাই আমি ভাবছিলাম রিতু যদি যায় তবে ওর সাথে তিথিও যেতো।
লোপা বললো, আমি তো শুনছি উল্টোটা, তিথি যাবে ওর সাথে রিতুও যাবে। বলে লোপা রকি রকি করে ডাকতে ডাকতে রকির রুমে গেলো, এই রকি কার সাথে কে যাচ্ছে বলতো?
কার সাথে কে যাচ্ছে মানে?
মানে তিথি যাবে বলে রিতু যাবে, নাকি রিতু যাবে বলে তিথিও যাবে?
রকি একটা ঢোক গিলে আম্‌তা আম্‌তা করে বললো, না মানে ওরা দু’জনে যাবে, মা তুমি না করো না প্লিজ!
লোপা যখন মোবাইল ফোন নিয়ে রকির রুমে যাচ্ছিল তখন রিতুও তার পিছনে পিছনে গেলো। লোপা রকির কথা শুনে পিছনে ফিরে তাকাতেই রিতু হাত জোড় করে বললো, মা প্লিজ!
লোপা মোবাইল ফোন কানের কাছে নিয়ে বললো, আমি আপনাকে পরে জানাচ্ছি আপা। বলে লোপা ফোন রেখে দিলো।
লোপা রকিকে জিজ্ঞেস করলো, আমি তো তোকে প্রথমেই বলেছি তুই যাবি যা, তোর ফ্রেন্ডদের সঙ্গে নিয়ে যা, তুই আবার রিতুকে সাজাচ্ছিস কেনো? আবার রিতু যাচ্ছে বলে তিথিকে ওর মাকে ওকে ম্যানেজ করতে লাগিয়ে দিয়েছিস, এসব কী হচ্ছে বলতো।
রকি মৃদু কণ্ঠে বললো, কিছু হচ্ছে না মা।
কিছু হচ্ছে না তো আমি এসব উল্টা-পাল্টা কী শুনছি।
রকি প্রচণ্ড রেগে গেলো, বলছি তো কিছু না। ওকে, তুমি যখন বলছো তখন আর যাবোই না। থাক সব সিডিউল প্যাক আপ। বলে সে বারান্দায় চলে গেলো।
রইস এতোক্ষণ ড্রয়িং রুমে বসে টি.ভি দেখছিলো রকির জোরে চিৎকার শুনে সে বেরিয়ে এলো, কী হয়েছে রকি? এত জোরে চিৎকার করছিস কেনো?
রকি কোনো কথা বললো না। লোপা রকির রুম থেকে বেরিয়ে এসে রইসকে এতোক্ষণ ফোনে রুমানার ফোন, তিথি আর রিতুর যাওয়ার বিষয়ে সবকিছু বললো।
সবকিছু শুনে রইস বললো, আচ্ছা বুঝছি, বলে সে রকি বলে জোরে ডাক দিতেই সে রইসের সামনে এসে রাগান্বিত কণ্ঠে বললো, বলো?
কী হয়েছে?
শুনলে তো সবকিছু।
কে কে যাচ্ছিস তোরা?
আমি, টনি, তিথি আর রিতু।
তিথিকে ওর মা যেতে দিবে?
রিতু গেলে তিথিও যাবে।
আচ্ছা তুই যা, আমি তোর মা’র সঙ্গে কথা বলছি বলে রইস লোপা লোপা বলে ডাক দিতেই সে গজগজ করে বললো, শুনছি, যা বলার বলতে থাকো।
তুমি ড্রয়িং রুমে এসো তো।
দু’জনে ড্রয়িং রুমে ঢুকলো, বলো?
ওরা এডামেন্ট যাবেই। এখান থেকে ট্রেনে যাবে, আমি কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবো আর স্টেশনে হারুন রিসিভ করে বাড়িতে নিয়ে যাবে। এর মধ্যে আমিতো কোনো সমস্যা দেখি না। আসলে দিন বদলেছে আমরা বাবা-মা’র কথা বিনা বাক্যে মেনে নিতাম আর আজকালকার ছেলেমেয়েরা বাবা-মা’র মুখে মুখে তর্ক করে। উল্টো যুক্তি দেখায়। অকাট্য যুক্তি। আজকালকার ছেলেমেয়েদের সাথে পেরে ওঠা কঠিন।
লোপা প্রচণ্ড রেগে বললো, তোমার ছেলেমেয়ে তুমি যা ভালো বোঝো করো, এমন হবে জানলে আমি ছুটি নিয়ে রকি আর রিতুকে নিয়ে যেতাম এখন শেষ মুহূর্তে এসে তো আমিও আর ছুটি পাবো না।
রইস বললো, থাক বাদ দাও এখন ওসব। তোমাকে কি তিথির মা ফোন করেছিলো?
লোপা রাগান্বিত কণ্ঠে বললো, হ্যাঁ, এতোক্ষণ কী বললাম তোমাকে।
আচ্ছা তুমি বলে দাও রিতু যাচ্ছে।
আমি বলতে পারবো না, তুমি বলো, বলে লোপা মোবাইল ফোনটা রইসের হাতে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো, এতোটুকু ছেলেমেয়েরা এত চালাক হয়েছে বাপ-মা’র সঙ্গে চালাকি করে, আমরা গুরুজনদের কথার ওপর কোনোদিন কথা বলিনি।
রইস ফোন হাতে নিয়ে রুমানাকে ফোন করলো।

বারো

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন লতিফ সাহেব। তাঁর পরণে পাঞ্জাবি-পায়জামা, চুল-দাড়ি সব পেকে সাদা হয়ে গেছে। বয়সের ভারে কোমরটা সামনের দিকে সামান্য হেলে পড়েছে কিন্তু প্রাণ শক্তি যেনো এখনো অফুরন্ত। তাঁর কাছ থেকে কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে তুলি তার চাচাতো ভাই তরু। তুলি বার বার করে ঘড়ি দেখছে। একটা মাইক্রোবাস আসতে দেখে তুলি তরুকে বললো, এই তরু দেখ্‌তো একটা মাইক্রোবাস আসছে না?
হ্যাঁ আসছে তো, একটা মাইক্রোবাস আসছে।
মাইক্রোবাসটা আরো কাছে আসতেই তুলি হাত তালি দিয়ে উঠলো, হ্যাঁ এটাই তো ঐ যে সামনে রকিকে দেখা যাচ্ছে। তরু দাদুকে ডাক দে তো।
তরু জোরে দাদু বলে ডাক দিতেই লতিফ সাহেব এগিয়ে এলেন।
একটা মাইক্রোবাস রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।
মাইক্রোবাস থেকে সবাই নামলো। তুলি লতিফ সাহেবের সঙ্গে সবার পরিচয় করে দিলো, রকি ইনি হচ্ছেন আমার দাদু। আর…বলতেই রকি আর টনি হাই বলে শুভেচ্ছা জানালো।
লতিফ সাহেব মৃদু হেসে বললেন, হাই।
আর দাদু ও হচ্ছে তিথি, ওদের ফ্রেন্ড।
তিথিও হাই বললো।
সবার শেষে তুলি রিতুকে পরিচয় করে দিলো। রিতু সালাম দিলো, আস্‌সালামুয়ালায়কুম দাদু।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। কেমন আছো দাদু? বলে লতিফ সাহেব কাছে এসে রিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করলেন।
এবার তুলি তরুর দিকে তাকিয়ে বললো, ও তোকে আবার পরিচয় করে দিইনি, রিতু ও হচ্ছে তরু আমার চাচাতো ভাই।
এটা রিলেশনটা নিশ্চয়ই তোরা জানিস?
রকি বললো, কাজিন।
তুলি বললো, এক্সাক্টলি। বলে তুলি একটু থামলো তারপর একটা মুচ্‌কি হাসি হেসে বললো, যদিও তোরা সবাই চিনতে পেরেছিস তারপরও ফরমালি একটা পরিচয় হওয়া দরকার, ইনি হলেন এভার গ্রিন বয় আব্দুল লতিফ, আমার দাদু।
লতিফ সাহেব মৃদু হাসলেন।
সবাই তুলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তিথি জিজ্ঞেস করলো, এভার গ্রিন বয় মানে?
তুলি একটা দুষ্টুমির হাসি হেসে বললো, সেটা আরো পরে বুঝবি। ওয়েট মাই ফ্রেন্ড।

বাড়ির পাশে মরিচ-বেগুন ক্ষেত সেখানে একটা পাঁঠা দাঁড়িয়ে ছিলো। তার শরীরের লোমগুলো ছিল অনেক লম্বা আর দাড়িও অনেক বড় বড়। একে একে সবাই বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে। পিছনে পড়েছে রকি আর টনি। টনি রকিকে পাঁঠা দেখিয়ে দিয়ে বললো, এই রকি দেখ্‌ দেখ্‌। সিংহের মতো ওটা কী রে?
হ্যাঁ, সিংহের মতোই তো। বাচ্চা সিংহ মনে হয়।
এতো মানুষের সমাগম আর মাইক্রোবাস দেখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁঠাটা দৌড়ে এগিয়ে এলো। পাঁঠাকে এগিয়ে আসতে দেখে দু’জনে একবার এদিক-সেদিক তাকালো তারপর টনি বললো, রকি পালা, পালা…
টনি বলামাত্র দু’জন দু’দিকে দৌড় দিলো। পাঁঠা রকির পিছু নিলো। কিছুদূর যাওয়ার পর পাশে একটা গর্তের মধ্যে সে পড়ে গেলো। মরিচ-বেগুনের ক্ষেতে একজন কাজ করছিলো সে এই ঘটনা দেখে হাসতে হাসতে টলে পড়লো আরেকজন দৌড়ে এসে পাঁঠাকে তাড়িয়ে দিয়ে রকিকে উদ্ধার করলো।
পাঁঠা চলে যাওয়ার পর টনি বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ালো তার চোখে-মুখে তখনো আতঙ্ক, সে হাঁপাচ্ছে। রকিকে যে উদ্ধার করলো সেও তাকে নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকলো। রকির এ অবস’া দেখে রিতু আর তিথিও ভয় পেলো, কী হয়েছে? তোর এ অবস’া কেনো?
টনি কাঁপতে কাঁপতে বললো, ওকে একটা সিংহ এ্যাটাক করেছিলো।
লতিফ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, এখানে আবার সিংহ এলো কীভাবে? কী হয়েছে রে হামিম? বলে তিনি রকিকে যে উদ্ধার করেছিলো তার দিকে তাকালেন।
হামিম বললো, পাঁঠা দাবাড় দিয়েছিলো।
ঢাকা থেকে আগত মেহমান, বাড়ির যৌথ পরিবারের অনেক লোক আর প্রতিবেশীদের কয়েকজন আসাতে আঙিনায় একটা জটলা তৈরি হয়েছিলো। হামিমের কাছে ঘটনার বিবরণ আর টনির পাঁঠাকে সিংহ বলতে শুনে সবাই হেসে উঠলো।
লতিফ সাহেব রকি আর টনিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী বলবা দাদু ভাই তোরা পাঁঠাকে সিংহ বলছিস, মানে তোরা ক্লাস নাইনে পড়ে যেমন পাঁঠা চিনিস না, তেমনি ও তোদের চেনে না, হাই বুঝে না। সেজন্য একটা মিসআন্ডাস্ট্যন্ডিং হয়ে গেছে।
রকি আর টনি বুঝতে পারলো না কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারলো যে তাদের একটা বোকামি হয়েছে। আসলে এই প্রাণীটি তাদের আরো আগে চেনা উচিত ছিলো। দু’জনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো।
লতিফ সাহেব বললেন, গ্রামের মানুষ হাই বলে না। একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেয়। কয়েকদিন গ্রামে থাক এখানে কত গাছ-পালা আছে, পশু-পাখি আছে সব দেখ্‌বি। সবার আগে দরকার তোদের রেস্ট। সারারাত জার্নি করে এসেছিস আসলে রইস এমন একটা ভুল করলো।
রইসের ভুল করার কথা শুনে রকি এবং রিতু লতিফ সাহেবের দিকে তাকালো।
লতিফ সাহেব বললেন, আসলে তোদের দ্রুতযানে না পাঠিয়ে একতা এক্সপ্রেসে পাঠালে তোরা দিনে দিনে আসতে পারতিস।
রকি বললো, ডেডি একবার বলেছিলো কিন্তু পরে বললো একতা নাকি দিনাজপুর পৌঁছাতে রাত হয়।
এ্যানিওয়ে, চল এখন ড্রেস চেঞ্জ কর, লাঞ্চ কর। কিছুক্ষণ রেস্ট নে তারপর বিকেলে তোদের নিয়ে আমি বের হবো।

বিকেলে লতিফ সাহেব রকি আর টনিকে নিয়ে বের হবেন এমনসময় রিতু রকিকে জিজ্ঞেস করলো, এই তোরা কোথায় যাচ্ছিস?
রকি হাত ঈশারা করে জানালো, জানে না।
রকির কাছ থেকে কিছু জানতে না পেরে তিথি লতিফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছেন দাদু?
হাট।
আমিও যাবো, বলে তিথি আনন্দে দু’হাত একরকম লাফাতে লাগলো তার রিতুকে বললো, এই রিতু তুই যাবি?
রিতু জোর দিয়ে বললো, অবশ্যই।
তুলি হাসতে হাসতে একরকম টলে পড়লো। তুলির মা, চাচী সবাই তখন আঙিনায় দাঁড়িয়েছিলো। তারা তিথি আর রিতুর কথা শুনে লজ্জায় মুখ ঢাকলো।
লতিফ সাহেব মৃদু হেসে বললেন, তোদের যাওয়া যাবে না।
তিথি বললো, কেনো? কেনো যাওয়া যাবে না দাদু?
আমরা যাচ্ছি তুলি তুই বোঝাতো। বলে লতিফ সাহেব রকি, টনি আর তরুকে নিয়ে চলে গেলেন।
তুলি বললো, এই রিতু তোরা আজ যা কাণ্ডটা করলি…
রিতু বললো, কী করেছি?
তোরা হাট চিনিস না?
রিতু বললো, না।
তুলি কিছুটা অবাক হলো, তোরা হাট চিনিস না?
রিতু বললো, চিনবো কী করে আমরা কি কোনোদিন গ্রামে দেখছি।
তাহলে শোন হাট হলো বাজারের মতো কিন্তু প্রতিদিন না। সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন হাট বসে। গ্রামে তো প্রতিদিন বাজার বসে না সেজন্য সবাই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য হাটে যায়।
তিথি বললো, আমরাও যেতাম। আমরা যেতে পারবো না কেনো? মার্কেটে কি আমরা যাই না?
তুলি বললো, না, হাট শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য, মেয়েরা হাটে যায় না।
তিথি বললো, তাহলে তো এখনি রকিকে বলতে হয়…বলে সে তখনি রকিকে ফোন করলো, হ্যালো।
বল।
তুই হাটের ছবি ভিডিও করে আনিস তো।
ওকে।
ফিরবি কখন?
জানি না।
তাড়াতাড়ি ফিরিস।
কেনো?
তিথি অভিমান করে বললো, থাক তাড়াতাড়ি আসতে হবে না, যখন ইচ্ছা হয় তখন আসিস, কিচ্ছু বুঝিস না। গাধা। আমরা একটা নতুন জায়গায় এসেছি সেজন্য আসতে বলছি আর ওর হাজারটা কেনো। থাক তোকে আসতে হবে না। আজ হাটে থাকিস।
তিথি যখন রকির সঙ্গে কথা বলছিলো তুলি তখন তিথির দিকে তাকিয়েছিলো। তিথির কথা বলা শেষ হতে না হতেই সে বললো, চল আমরা মেহেদি পাতা তুলি।
তুলি বললো, কেনো?
মেহেদি পরবো।
তিথি খুব খুশি হলো, ওয়াও, গুড আইডিয়া।

তেরো

আজগরের চা দোকান অনেক পুরতান। একসময় সবাই আজগরের চা’র দোকান বলতো কিন্তু কালক্রমে তা সংক্ষিপ্ত হয়ে নাম ধারণ করেছে আজগর চা’র দোকান। এই চা বলতে কেউ কেউ চা’র দোকান মনে করে আবার কেউ কেউ মনে করে আজগর চাচার দোকান।
লতিফ সাহেব দোকানে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, আজগর চা (চাচা) কেমন আছেন বারে?
ভালো। আপনি?
হুঁম, ভালো।
এই ছেলে দু’টা কে?
লতিফ সাহেব রকিকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এর নাম রকি, আমার বিহাই বেটা রইসের ছেলে, আর বলে তিনি টনিকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এর নাম টনি রকির ফ্রেন্ড।
টনি হাই বলতেই রকি টনির হাতে একটা চাপ দিতেই সে সালাম দিলো, আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
টনির হাই বলতে শুনে আজগর হা করে তাকিয়ে রইলো। দোকানের অন্যান্য কাস্টমাররাও হেসে উঠলো। বলতে গেলে টনির এই অতি আধুনিকতা একটা হাস্য রসের সৃষ্টি করলো।
লতিফ সাহেব সবাইকে ধমকের সুরে বললেন, এই হাসি কীসের? হাই মানে কি তোমরা বোঝো না? আগে তো হ্যালো মানেও বুঝতে না আর এখন সবাই হ্যালো বলছো। চুপ করো।
লতিফ সাহেব এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ, উচ্চ শিক্ষিত এবং মুরুব্বী মানুষ। গায়ের রং ফর্সা ধবধবে, চুল দাড়ি পেকে কাশফুলের মতো আকার ধারণ করেছে। এই এলাকায় সবাইকে ধমক দেয়ার মতো অধিকার শুধু তাঁরই আছে।
লতিফ সাহেবের ধমক শুনে সবাই চুপসে গেলো।
কিছুক্ষণ পুরো হোটেল জুড়ে একটা নীরবতা বিরাজ করলো। অবশ্য নীরবতা ভঙ্গ করলেন লতিফ সাহেবই। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, এই যে ছেলে দু’টা দেখেছো এরা দু’জনে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। এদের বই-পুস্তক সবকিছু ব্রিটিশ থাকে আসে। এদেশে বাস করে বটে কিন্তু এদের জীবন-যাপন বিদেশিদের মতোই, বলা যায় এদের স্কুলটা বাংলাদেশের মধ্যে একটা ইংল্যান্ড।
কেউ কেউ মাথা নেড়ে সায় দিলো।
লতিফ সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন, দু’জনে কোনোদিন গ্রাম দেখেনি। তাই গ্রাম দেখতে এসেছে।
আজগর হেসে বললো, ও তাই এ অবস’া।
লতিফ সাহেব নাস্তার অর্ডার দিলেন, এই আজগর ঝুরি বুন্দিয়া দাও আমাদের।
নাস্তা খেতে খেতে টনি জিজ্ঞেস করলো, দাদু এখানে ফাস্ট ফুডের দোকান নেই?
তা নেই কিন্তু বেকারি আছে, রুটি-বিস্কুট, চানাচুর পাওয়া যায়।
বার্গার পাওয়া যাবে না?
লতিফ সাহেব হেসে উঠলেন, না দাদু, এখানে বার্গার, ভেজিটেবল রোল, পিজা এসব পাওয়া যাবে না।
স্যান্ড উইচ।
লতিফ সাহেব না সূচক মাথা নাড়লেন।
নাস্তা শেষ করে সবাই চায়ের দোকান থেকে বের হলো।
হাট ঘুরে ঘুরে দেখালো।
মাছ হাটিতে ঢুকে আবার রকি শুরু করলো নানান প্রশ্ন। টনির বাবা দেশের বাইরে থাকে, বাড়ির সব বাজার তার মা করে তাই সেও মাঝে মাঝে মা’র সঙ্গে কাঁচাবাজারে গেছে কিন্তু রকি কোনোদিন কাঁচাবাজারে যায়নি। তার বাবা যখন কাঁচাবাজারে যেতো তখন সেও বাবার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরতো, রকির বাবাও তাকে নিয়ে যেতে চাইতো কিন্তু কাঁচাবাজার নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত বলে লোপা তাকে কোনোদিন বাজার যেতে দেয়নি।
রকি একটা মাছ দেখিয়ে বললো, দাদু এটা কোন্‌ মাছ?
টনি ব্যঙ্গাত্বক সুরে বললো, আরে গাধা এটা বুঝিস না, এটা বালেয়া মাছ।
রকি বললো, তুই তো দেখি অল রাউন্ডার হয়ে গেছিস।
এবার আরেকটা মাছ দেখিয়ে রকি জিজ্ঞেস করলো, বলতো এটা কোন্‌ মাছ?
টনি বললো, গোতা মাছ।
রকি লতিফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো, দাদু টনি কি ঠিক বলেছে?
লতিফ সাহেব না সূচক মাথা নাড়লেন।
টনি জিজ্ঞেস করলো, দাদু আই এ্যাম নট রাইট?
না দাদু। এটা হলো বায়েন মাছ।
রকি টনিকে বললো, কী হলো অল রাউন্ডার।
টনি কোনো কথা বললো না।
পুরো হাট ঘুরে দেখে সবাই মাইক্রোবাসে এসে উঠলো। কিছুদূর আসার পর লতিফ সাহেব বললেন, কেমন লাগছে তোদের?
দু’জনে একসঙ্গে বললো, ফ্যান্টাস্টিক।
শোনো মানুষ প্রকৃতি থেকে যে শিক্ষা পায় শুধু বই পড়ে সে শিক্ষা কোনোদিন অর্জন করা সম্ভব হয় না। এই যে তোরা আজ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি দেখলি এগুলো যদি বই পড়ে শিখতে হতো তবে কতদিন সময় লাগতো, কতগুলো বই পড়তে হতো, কয়টা বায়োলজি ল্যাব লাগতো একবার চিন্তা করে দেখ।
টনি আর রকি দু’জনে মাথা নেড়ে সায় দিলো।
লতিফ সাহেব বললেন, তোদের আরো আগে গ্রামে আসা উচিত ছিলো।
টনি জোর দিয়ে বললো, ঠিক বলেছেন দাদু।
রকি আড় চোখে লতিফ সাহেবের দিকে তাকালেন।
টনি আবার বলতে শুরু করলো, কিন্তু আসবো কার কাছে? আমাদের তো গ্রামে কেউ নেই।
খুঁজে দেখলে অবশ্যই পাবি। আসলে যারা একবার উপরে উঠে গেছে তারা আর কোনোদিন নিচের দিকে ফিরে তাকায় না। খুঁজে দেখলে দেখা যাবে সবারই গ্রামে শিকড় আছে। শিকড় ছাড়া যেমন গাছ হয় না, গ্রাম ছাড়া তেমনি শহরেরও জন্ম হয় না। সারাদেশ খুঁজে দেখ যত শিক্ষিত, বড় অফিসার, রাজনীতিবিদ সবারই কিন্তু গ্রাম আছে। সবার হৃদয়ে আছে গ্রাম। তোরা কোনোদিন খুঁজিসনি তাই পাসনি।
মাম্মি তো বলেছে গ্রামে নাকি আমাদের কেউ নেই।
মাম্মি বলবে না দাদু। মা বলবি, মা কথায় যেমন একটা রক্তের টান, নাড়ির টান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার টান আছে মাম্মি কথাটাতে তেমনটি আছে বলে মনে হয় না। একটু দূরত্ব বেশি বেশি বলে মনে হয়। অথচ মা ও সন্তানের সম্পর্কের মতো সম্পর্ক পৃথিবীতে আর নেই, কোনোদিন হবেও না।
লতিফ সাহেব যখন কথা বলছিলেন রকি আর টনি তখন তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েছিলো।
লতিফ সাহেব বললেন, এখন থেকে আমাদের বাড়িতে আসবি যখন আসতে ইচ্ছা করবে তখনই চলে আসবি।
টনি বললো, অফকোর্স।

চৌদ্দ

বাড়ির গেটের পাশেই কাগজি লেবুর গাছ দিয়ে দেয়া বেড়ার ভিতরে একটা ছোট্ট বাগান। বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছপালায় ভরা। তারই এক কোণে একটা মেহেদি গাছ। বাঁশের তৈরি ছোট পকেট গেট দিয়ে ঢুকতেই রিতু জিজ্ঞেস করলো, কোন্‌টা মেহেদি গাছ রে তুলি?
তুলি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।
রিতু মেহেদি গাছের কাছে গিয়ে মেহেদি পাতা ছেঁড়ার জন্য হাত বাড়াতেই তিথি জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো, এই রিতু হাত দিয়ে ছিঁড়িস না, কাঁটা বিঁধবে।
মেহেদি গাছে কাঁটা থাকে? বলে তুলি হাসতে হাসতে তিথির গায়ের ওপর একরকম টলে পড়লো।
তিথি কিছুটা লজ্জা পেলো।
রিতু বললো, হাসছিস কেন রে, আমরা কি কখনো মেহেদি পাতা দেখেছি। আমরা তো টিউবের মেহেদি কিনে পরি। আর তিথি তো তাও পরে না। ওতো কোনো ওর্নামেন্টসও পরে না, বলে ওগুলো নাকি মেয়েরা পরে।
তুলি বললো, ও মেয়ে না?
এবার তিথি কথা বলতে শুরু করলো, মেয়ে কিন্তু তাই বলে কি সবসময় নাকে, কানে, হাতে ওর্নামেন্টস পরে প্রমাণ করতে হবে বলে তিথি মুখ ভেংচি কেটে বললো, আমি মেয়ে, আমি মেয়ে…
সেজন্য কি তুই সবসময় ফতুয়া আর প্যান্ট পরিস?
অফকোর্স।
তুলি বললো, তবে তোকে কিন্তু শাড়ি-চূড়ি পরলেও ভালো মানাবে। ঐযে দেখ্‌ একটা কত ছোট্ট মেয়ে শাড়ি পরেছে, ভালো দেখাচ্ছে না?
তিথি তুলির আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললো, ওয়াও।
এই ধর শাড়ি পরবি, ম্যাচিং করে চূড়ি, ঠোঁটে লিপ স্টিক, কপালে টিপ। দেখিস তোকে খুব ভালো লাগবে। আর হাতে থাকবে মেহেদি। মেহেদি পরলে মেয়েদের হাত আরো সুন্দর লাগে। আঙ্গুল তো ছেলেমেয়ে সবারই আছে কিন্তু মেয়েদের আঙ্গুল সুন্দর বলে তো মেয়েদের আঙ্গুলের একটা স্প্যাশালিটি আছে। সেজন্যই তো বলে লেডিস ফিঙ্গার।
তিথি খুব খুশি হলো, ওয়াও। তাহলে হয়ে যাক। তোর শাড়ি আছে?
আছে।
লাল শাড়ি?
তুলি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
তিথি আবেগপ্রবণ হয়ে বললো, তাহলে আজই পরবো।
তুলি বললো, তাহলে তাড়াতাড়ি মেহেদি পাতা নিয়ে বাড়ি চল।
রিতু তুলি আর তিথির কথা শুনছিলো আর মেহেদি পাতা তুলছিলো। বার বার করে সে মাথা নাড়ছিলো।
তুলি জিজ্ঞেস করলো, এই রিতু তুই কথা বলছিস না কেনো? কী ভাবছিস? মুড অফ কেনো?
একটা কথা মনে করতে পারছি না। এই মেহেদি পাতা নিয়ে। কী যেনো একটা কবিতা নাকি গান।
তুলি বললো, মেহেদি পাতা নিয়ে একটা কবিতা আছে। অনেকেই ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ইউজ করে।
রিতু বললো, এক্সাক্টলি।
বাংলা কবিতা! তিথি কথাটা এমনভাবে বললো যেনো বাংলায় কোনো ভালো কবিতা থাকতে পারে না।
তুলি বললো, বাংলা কবিতা শোনার পর তুই এমন করলি কেনো? যেনো বাংলা কবিতা কোনো কবিতাই না। তাহলে তো তোকে মেহেদি পাতা নিয়ে লেখা কবিতাটা শোনাতেই হয়।
রিতু বললো, খুব সুন্দর কবিতা।
তিথি এবার মনোযোগী হলো, ওকে, তোরা যখন বলছিস।
রিতু বললো, তুলি শোনা তো।
তুলি শুরু করলো, অনন্ত মেহেদি পাতা দেখেছো নিশ্চয়ই
ওপরে সবুজ ভিতরে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত
নিজেকে আজকাল বড় বেশি মেহেদি পাতার মতো মনে হয় কেনো?
ওপরে আমি অথচ ভিতরে কষ্টের যন্ত্রণা।

এমনিভাবে কবিতার কয়েকটা লাইন আবৃতি করতে না করতেই তিথিও আবেগে চিৎকার দিয়ে উঠলো, ওয়াও। এত সুন্দর কবিতা!
রিতু বললো, আমি তোকে বলেছিলাম না? আসলে তুই বাংলা কবিতা পড়িস না সেজন্য।
তিথি স্বীকার করলো, আসলে তুই ঠিকই বলেছিস। এখন থেকে আমিও বাংলা কবিতা পড়বো।
মেহেদি পাতা তুলে তুলি আগে তিথি আর রিতুকে আলপনা এঁকে হাতে মেহেদি পরিয়ে দিয়ে নিজেও মেহেদি পরে বললো, তোরা মেহেদি হাতে বসে থাক। আমি মাকে বলে ততক্ষণে আমার শাড়ি-কাপড়গুলো বের করি। বলে তুলি একটা মুচকি হাসি হেসে চলে গেলো।

বাইরে একটা রিকশা ভ্যান এসে দাঁড়ালো।
তরু বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো।
রান্না ঘরে বাজার পৌঁছে দিয়ে তরু একটা প্যাকেট হাতে আঙিনায় দাঁড়িয়ে বললো, তুলি এটা রাখতো।
তুলি বললো, আমার হাতে মেহেদি?
সে সবার দিকে তাকিয়ে দেখলো, সবাই মেহেদি পরেছিস?
রিতু মাথা নেড়ে সায় দিলো।
তুলি জিজ্ঞেস করলো, কী এনেছিস?
চানাচুর।
কোন্‌ দোকান থেকে?
দিলদারের।
তুলি মুচকি হাসলো।
তরু জিজ্ঞেস করলো, হাসছিস কেনো?
না এমনি।
এমনি কেউ হাসে না বুঝ্‌লি।
নিশ্চয়ই তোর মনের মধ্যে কোনো শয়তানি জেগেছে।
এবার তুলি আরো হেসে উঠলো। কোনোকিছু না বুঝে রিতু এবং তিথিও হেসে উঠলো।
তরু উঠানে রাখা একটা চৌকিতে রেখে তুলির মাথায় একটা ঠোকা মেরে বাইরে চলে গেলো।
রিতু জিজ্ঞেস করলো, হাসলি কেনো রে রিতু?
তোরা বুঝবি না।
তিথি বললো, বুঝিয়ে বল?
তুলি বলতে শুরু করলো, দিলদারের চানাচুর নিয়ে চাচির জীবনে একটা ঘটনা আছে সেজন্য।
তিথি জিজ্ঞেস করলো, কী?
তুলি বললো, না রে থাক।
তিথি জিদ ধরলো, ভাব নিচ্ছিস কেনো? বল না প্লিজ!
চাচির তো চাচার সঙ্গে লাভ ম্যারেজ। তো চাচার সঙ্গে যখন চাচির প্রথম দেখা হয়েছিলো তখন চাচা চাচিকে দিলদারের চানাচুর কিনে দিয়েছিলো।
রিতু বললো, তাতে কী?
চাচার ফ্রেন্ডরা ঘটনাটা জেনে ফেলেছিলো তাই বিয়ের অনেক পরেও নাকি চাচির দেবররা চাচিকে দিলদারের চানাচুর বলে ক্ষেপাতো।
তুলির কথা শুনে রিতু আর তিথি হেসে ফেললো। তারপর রিতু বললো, কারো সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ তো কোনো না কোনো ঘটনার মধ্য দিয়েই হতে পারে। তবে আর দিলদারের চানাচুরের দোষ কী।
তিথি মৃদু হেসে বললো, তবে দিলদারের চানাচুরের নামটা তোরা পাল্টে দিতে পারতিস তুলি।
মানে?
মানে এটা জানাজানির পর তোরা যদি দিলদারের চানাচুর নামটা পাল্টে দিতিস, এই যেমন হতে পারতো রোমান্টিক চানাচুর।

পনেরো

আদিত্য তখন ড্রয়িং রুমে বসে একের পর এক টি.ভি’র চ্যানেল পরিবর্তন করছে। তাকে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস’ দেখাচ্ছে আর রুমানা বারান্দায় পায়চারি করছে আর বার বার তিথিকে ফোন করছে কিন্তু সে ফোন রিসিভ করছে না। রুমানা বারান্দা থেকে রুমে এলো। আদিত্যর হাত থেকে রিমোটটা এক রকম কেড়ে নিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললো এটা রাখো আগে তুমি আমার মেয়েকে এনে দাও। এজন্য আমি ওকে পাঠাতে চাইনি তুমি আমাকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে আর মেয়েকে সায় দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছো। আমার মেয়ের যদি কোনোকিছু হয় তবে তোমাকে আমি ছাড়বো না।
আদিত্য রুমানাকে সান্ত্বনা দিলো, রুমানা একটু ধৈর্য ধরো। এমন কী হয়েছে যে তুমি একেবারে অসি’র হয়ে পড়েছো?
অসি’র হবো না। আমার একটাই মাত্র সন্তান। ওর যদি কিছু একটা…
আদিত্য রেগে গেলো, রুমানা কিছু হবে না। তুমি দেখো এভরিথিং ইজ ওকে।
ওকে। তুমি বলছো আর হচ্ছে? কীসের ভিত্তিতে বলছো তুমি? তুমি কি একবার ফোন করে রিতুর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলছো, নাকি ধারণার ওপর ডিপেন্ড করে বলছো? বসে না থেকে তো একবার রিতুর বাবাকে, টনির মাকে ফোন করে দেখতে পারো?
ও তুমি ঠিক বলেছো। বলে আদিত্য প্রথমে রকির বাবাকে ফোন করলো, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। ভাই কেমন আছেন?
জি ভাই ভালো আছি। আপনি?
ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ।
আচ্ছা ভাই আপনার কি রকি বা রিতুর সঙ্গে কথা হয়েছে?
হয়েছে তো, কেনো বলুনতো?
তিথিকে ওর মা বার বার ফোন করছে কিন্তু ও ফোন রিসিভ করছে না।
ওরা তো ভালো আছে। টনি, রকি ওরা…
রইসের কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই আদিত্য ফোনটা রুমানাকে দিলো, আচ্ছা আমি ওর মাকে দিচ্ছি বলে সে ফোনটা রুমানার হতে দিলো।
রুমানা ফোন হাতে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, বলুনতো ভাই ওদের কী খবর? তিথি ফোন ধরছে না কেনো?
আপা ওরা তো খুব ভালো আছে। ওরা টাইমটাকে ভালোভাবে এনজয় করছে। টনি, রকি হাট গেছে আর রিতু, তিথি, তুলি ওরা বাসায় আছে।
তাহলে ফোন ধরছে না কেনো?
হয়তো ফোন সাইলেন্ট করে বাইরে আছে। সবাই মিলে হৈ চৈ করছে। একটু আগে রকির সঙ্গে আমার কথা হলো।
রুমানা উত্তেজিত কণ্ঠে বললো, তাহলে তিথি আমার ফোন ধরছে না কেনো?
রইস বললো, আচ্ছা আপা আপনি বরং রকিকে কিংবা রিতুকে ফোন করুন। যদি তিথির ফোন সাইলেন্ট থাকে তবে ওরা এখন আপনাকে তিথির সঙ্গে কথা বলার ব্যবস’া করে দিবে।
দিন ভাই, প্লিজ!
রইস রিতুর নাম্বার দিলো।
রুমানা রিতুকে ফোন করলো।
ততক্ষণে রিতু মেহেদি ধুয়ে ফেলেছে। সে ফোন রিসিভ করলো, হ্যালো আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম।
কে বলছেন প্লিজ।
মামুনি আমি তিথির মাম্মি, তোমরা এখন কোথায় আছো মা?
রিতু বললো, বাসায় আন্টি।
তিথি কোথায়?
আমরা একসঙ্গে আছি আন্টি।
ওকে একবার দাও তো মা।
ওকে আন্টি কথা বলুন। বলে রিতু তার ফোনটা তিথির কানের কাছে ধরলো।
তিথি বললো, হ্যালো মাম্মি। বলো?
রুমানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, ফোন ধরছিস না কেনো মা?
মাম্মি আমার ফোন সাইলেন্ট করে চার্জে দিয়েছি।
কেনো তুই জানিস না তোর সাথে কিছুক্ষণ পর পর কথা না বললে আমি থাকতে পারি না। কেনো? এমন করলি কেনো?
সরি মাম্মি।
ওকে। আর কখনো এমন করবি না।
ওকে মাম্মি। মাম্মি আমি হাতে মেহেদি পরেছি, একটু পর আমার হাতগুলো খুব সুন্দর হবে। তাই না মাম্মি?
হবে মা। তোর আঙ্গুলগুলোতো এমনিতেও অনেক সুন্দর।
আমি আমার হাতের ছবি তুলে তোমাকে পাঠিয়ে দিবো। আমরা সবাই খুব ভালো আছি মাম্মি। তুমি কোনো টেনশন করো না। মাম্মি একটু পর আমি শাড়ি পরবো।
কেনো?
এমনিতে। তুলির শাড়ি আছে। আমি ওর শাড়ি-চূড়ি, নাক ফুল আর বলে একটু লাইনে থাকো জেনে নিই, এই তিথি কানের ওর্নামেন্টসকে কী বলে রে?
তুলি বললো, দুল
তিথি তার মাকে বললো, দুল পরবো। পরে তোমাকে ছবি পাঠাবো।
তাহলে একবারে পাঠাবি।
ওকে। মাম্মি এখন রাখি পরে আমি তোমার সাথে কথা বলবো।
রুমানা বললো, কেনো রে আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। তোর ডেডির সাথে কথা বলবি না?
বলবো মাম্মি আমার দু’হাতে মেহেদি তো সেজন্য কথা বলতে প্রবলেম হচ্ছে। রিতু ওর ফোনটা আমার কানের কাছে ধরে আছে আর আমি কথা বলছি। রাতে আমি ফোন দিবো মাম্মি।
ওকে মা। দেরি করিস না যেনো। আর ফোন সবসময় হাতের কাছে রাখ্‌বি, আমি যখনই ফোন দিবো তখনই যেনো তোর সঙ্গে কথা বলতে পারি।
ওকে মাম্মি।
রুমানা কথা শেষ করে চোখ মুছলো।
আদিত্য বললো, হলো তো! তুমি একটুতেই খুব অসি’র হয়ে পড়ো। একটু ধৈর্য ধরবে তা না।
তুমি এতো নিষ্ঠুর কেনো বলোতো? আমাদের একমাত্র সন্তানকে আমি খুঁজে পাবো না আর আমি চুপ করে থাকবো?
ধৈর্য ধরবে, খুঁজবে। নাকি কান্নাকাটি করবে আমাকে বকাবকি করবে।
করবো, আমি বকাবকি করবো, কান্নাকাটি করবো, আমি তোমার মতো হার্টলেস হতে পারবো না।
তবে আমার মেয়ে ওরকম করলে বলো কেনো বাবার মতো হয়েছে।
ওতো এক্সাক্টলি তোমার মতো হয়েছে। তোমার মতো আবেগ-অনুভূতি, রাগ-ক্ষোভ, জিদ-অভিমান সব তোমার মতো। তবে পাগলামিটা তোমার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। দেখতে হবে না মেয়েটা কার। আমার মেয়ে সেজন্য দোষগুলো তোমার মতো হয়েছে আর গুণগুলো আমার মতো।
রুমানা হেসে ফেললো।
আদিত্য জিজ্ঞেস করলো, কী বললো?
রুমানা হঠাৎ করে হেসে উঠলো, ও নাকি হাতে মেহেদি পরেছে। হাতে মেহেদি পরলে ওকে খুব সুন্দর দেখাবে। বললো রাতে শাড়ি পরবে, চূড়ি পরবে। বউ সাজবে বলে রুমানা জোরে হেসে উঠলো।
আদিত্য জিজ্ঞেস করলো, পাগল হলে নাকি?
হবো না। মেয়েটা আমার বড় হচ্ছে। হঠাৎ করে ওর আবার সখ হয়েছে শাড়ি পরার।
ছবি পাঠাতে বলেছো না?
বলেছি, পাঠাবে।
রুমানা তিরস্কারের সুরে বললো, তবে আর কী মেইল খুলে বসে থাকো।
আদিত্য বললো, থাকবোই তো।
হ্যাঁ আমি জানি তো।

ষোলো

বাজার থেকে আসার পর রকি আর টনি ড্রয়িং রুমে বসলো। টনি কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক তাকালো। রকি একবার উঠানে এসে আঙিনায় উঁকি দিলো কিন্তু কাউকে চোখে পড়লো না। শুধু রান্না ঘরে রান্নার কাজ চলছে। কিন্তু ওরা গেলো কোথায়? রকি আবার ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই টনি জিজ্ঞেস করলো, পেয়েছিস?
রকি বললো, নাতো।
কোথায় গেলো ওরা?
রকি তার মোবাইল ফোন বের করে বললো, আচ্ছা রিং দিচ্ছি।
পাশের রুম থেকে মোবাইলের রিং বেজে উঠলো কিন্তু রিতু রিসিভ করলো না। রকি পর পর কয়েকবার ফোন করলো কিন্তু রিতু রিসিভ করলো না।
টনি জিজ্ঞস করলো, ফোন ধরছে না?
না।
ঘটনা কী?
বাদ দে। একটু পর এমনি খুলে দিবে।
কিছুক্ষণ পর রিতু দরজা খুলে ড্রয়িং রুমে এলো। রকি কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললো, কী রে ফোন ধরলি না কেনো?
রিতু মুখে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বললো, আগে আয় দেখ, তারপর বলছি।
কোথায়?
পাশের রুমে।
রকি আর টনি পাশের রুমে গেলো।
তিথি লাল শাড়ি পরেছে, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে চূড়ি, আলতা, লিপস্টিক পরেছে, কপালে দিয়েছে বড় একটা টিপ। রকি রুমে ঢুকতেই চমকে উঠলো, ওয়াও। ইউ আর লুকিং নাইস।
টনি বললো, বিউটিফুল!
টনি বললো, তোকে তো শাড়ি পরে খুব সুন্দর লাগছে। কিন্তু তুই না এসব ড্রেস পছন্দ করতিস না। আজ আবার হঠাৎ করে…
হঠাৎ করে না, সখ করে। বলে তিথি আরো কী যেনো কথা বলতে যাচ্ছিলো। তুলি তিথির মুখে হাত দিয়ে বললো, এই চুপ, চুপ, নতুন বউকে কথা বলতে হয় না।
তিথি মৃদু হাসলো।
রকি তার মোবাইল ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুললো তারপর রিতু রকির কাছ থেকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে বললো, এই তিথি নামতো। এই তোরা সবাই পাশাপাশি দাঁড়া কয়েকটা ছবি তুলি।
সবাই পাশাপাশি দাঁড়ালো। কিন্তু তিথি বসা থেকে উঠতে গিয়েও পারলো না। তুলি বুঝতে পারলো, সে তিথির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো, বুঝতে পাচ্ছি তুই নিজে উঠতে পারবি না, আমার হাত ধরে ওঠ।
তিথি তুলির হাত ধরে খাট থেকে উঠে সাবধানে নিচে নামলো।
রিতু কয়েকটা ছবি তুললো তারপর তুলি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে বললো, এবার তুই বস আমি তোদের ছবি তুলি।
তরু উঠানে দাঁড়িয়ে জোরে ডাক দিলো, এই তুলি কী করছিস?
ও, তুই কোথায় ছিলি এতোক্ষণ? আয়, আয় ভিতরে আয়।
তরু রুমে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালো, তিথি শাড়ি পরেছিস, তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তো।
রিতু বললো, শুধু শাড়ি পরেছে, বউ সেজেছে।
তাইতো।
তুলি বললো, আচ্ছা এখন তুই ওদের পাশে দাঁড়া। আমরা সবাই ছবি তুলেছি এবার তুইও দাঁড়া কয়েকটা ছবি তুলি।
তুলি কয়েকটা ছবি তুললো।
তারপর তুলি বললো, চল সবাই বাইরে গিয়ে বসি।
তিথি বললো, নারে আমি শাড়ি পরে বাইরে যেতে পারবো না।
কেনো? লজ্জা পাচ্ছিস?
তিথি মাথা নেড়ে সায় দিলো।
লজ্জা কীসের? শাড়ি পরা কি কোনো লজ্জার বিষয়?
না, তা না। তবুও আমার কেমন যেনো লাগছে।
রিতু বললো, ভাব নিচ্ছিস কেনো? চল।
তিথি বললো তাহলে একটু ওয়েট কর, আগে ডেডিকে ছবিগুলো মেইল করি। এই রকি ছবিগুলো আমার ফোনে পাঠিয়ে দেতো।
রকি তার ছবিগুলো তিথির ফোনে পাঠিয়ে দিলো।
তরু বললো, তোরা এখানে বস আমরা আঙিনায় গিয়ে বসছি।
তিথি তার ছবিগুলো তার বাবাকে মেইল করার পর তার বাবার সঙ্গে কথা বললো তারপর তিথি, তুলি আর রিতু আঙিনায় যাওয়ার জন্য উঠলো।
তুলি আর রিতু একটু সামনে আর তিথি কয়েকপা পিছনে হাঁটতে হাঁটতে খুব সাবধানে রুম থেকে বারান্দায় গেলো। বারান্দা থেকে আঙিনায় নামতে গিয়ে তিথির পায়ের সাথে শাড়ি পেঁচিয়ে সে আঙিনায় উপুড় হয়ে আছড়ে পড়লো, ও মাই গড।
তুলি আর রিতু দৌড়ে এলো। দু’জনে তিথিকে তুললো। তুলি জিজ্ঞেস করলো, ব্যথা পেয়েছিস?
তিথি মাথা উঁচু-নিচু করে জানালো সে ব্যথা পেয়েছে।
তিথিকে পড়ে যেতে দেখে টনি আর রকি হাসিতে টলে পড়তে লাগলো।
তরু বললো, শাড়ি পরে হাঁটতে পারিস না। জীবনে কী যে শিখলি।
তিথিকে পড়ে যেতে দেখে রান্না ঘর থেকে তুলির মা ছুটে এলো। তুলির মা তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললো, তুই আবার ওকে শাড়ি পরাতে গেছিস কেনো?
ও নিজেই পরেছে মা।
পরেছে ভালো কথা, ঘরে কাপড়-চোপড় বদলে আসলে হতো না। মেয়েটা কষ্ট পেলো বলে সে তিথির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, কিছু মনে করিস না মা। তুলি ওকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে যা, আগে ওর কাপড় বদলে তারপর বাইরে নিয়ে আয়।
ঠিক আছে মা। তিথি চল তোকে রুমে দিয়ে আসি।
লতিফ সাহেব তুলিকে জোরে ডাক দিলো, তুলি।
জি দাদু।
এদিকে আয়তো।
আসছি।
তুলি রিতুকে বললো, রিতু তুই নিয়ে যাতো, পারবি?
রিতু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
যা, সাবধানে নিয়ে যাস। তিথি এক পা এক পা করে যাবি। শাড়ির ওপর যেনো পায়ে না পড়ে, তাহলে কিন্তু আবার পড়ে যাবি।
তিথি কিছুটা লজ্জিত হলো, ওকে।
তুলি চলে যাবার পর রিতু চাপা স্বরে তিথিকে বললো, তুই ডুবালি। শাড়ি পরে হাঁটতে পারলি না। এরা ভাববে শহরের মেয়েরা অকর্মণ্য। এতোবড় মেয়ে শাড়ি পরে হাঁটতে পারে না।
তিথি বললো, তুই পরলে বুঝতিস শাড়ি পরে হাঁটা কঠিন কী না।
কিন্তু বিকেলে যে দেখলাম এতোটুকু মেয়েরা শাড়ি পরেছে।
পরেছে, ওরা অভ্যস’ হয়ে গেছে।
কথা বলতে বলতে তিথি আর রিতু আবার রুমে ঢুকলো।

সতেরো

তুলির এক ফুপু আর রইস একসঙ্গে লেখাপড়া করতো। সে যখন শুনলো রইসের ছেলেমেয়েরা ঢাকা থেকে আসছে তখন তার বাসায় যাওয়ার জন্য দাওয়াত করলো। রাতে খাবার পর বাইরের আঙিনায় জোৎস্নার আলোতে সবাই যখন আড্ডা দিচ্ছিলো তখন তুলি বললো, এই যে বন্ধুগণ সবাই মনোযোগী হও।
সবাই নড়েচড়ে বসলো।
আগামীকাল জাহান ফুপু আমাদের দাওয়াত করেছে।
সবাই পরষ্পরের মুখের দিকে তাকালো।
তুলি গলা ঝেড়ে বলতে স্বাভাবিকভাবে বলতে শুরু করলো, আমার মনে হয় তোরা কেউ চিনতে পারছিস না। জাহান ফুপুর বাড়ি দ্বীপনগর। ফুপু তো তোরা বুঝতেই পাচ্ছিস আমার ফুপু। ওখানে গেলে তোরা দেখতে পাবি ঘন শালবন, নানান প্রজাতির পাখি, কাশফুল, আরো, আরো অনেককিছু।
তিথি যেনো শুনেই আবেগ আল্পুত হয়ে গেলো, ওয়াও, ফরেস্ট দেখতে পাবো, ফ্যান্টাস্টিক।
রকি বললো, ভেরি ভেরি ফ্যান্টাস্টিক। উই মাস্ট গো।
টনি তুলিকে বললো, অফকোর্স, তুই যাচ্ছিস তো আমার সঙ্গে?
অবশ্যই।
তিথি খোঁচা মেরে বললো, সে চিন্তা তোকে করতে হবে না। তুই যাবি আর তুলি যাবে না তা কী করে হয়।
টনি বললো, দিজ ইজ ভেরি বেড তিথি। তুই সবকিছুতেই টিজ করবি এটা ভালো দেখায় না। তুই তো কালকে ফোন করে রকিকে তাড়াতাড়ি হাট থেকে আসতে বলছিস, সেটা নিয়ে কি কেউ তোকে টিজ করেছে?
তিথি জোর গলায় বললো, বলেছি তো কী হয়েছে, আমরা একসঙ্গে এসেছি তোরা দু’জন হাট গেছিস, আমরা তো তোদের তাড়াতাড়ি আসতে বলতেই পারি।
টনি বললো, তোদের বলছিস কেনো? বল রকিকে।
তিথি বললো, ও তোকে ফোন করিনি সেজন্য তুই জেলাস ফিল করছিস? আমি সেভাবে চিন্তা করিনি। আমি ভাবছি আমরা সবাই ফ্রেন্ড। একজনের সঙ্গে আরেকজনের ভালো সম্পর্ক থাকতেই পারে। বলতে বলতে তিথির ফর্সা রং লাল হয়ে গেলো।
টনি বললো, ও অন্য কেউ করলে দোষ আর তুই করলে কোনো দোষ নেই।
রকি বললো, ওকে, এভরিথিং ইজ ওকে, উই আর অলসো ফ্রেন্ড, মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হতেই পারে।
তিথি রিতুর পাশে বসেছিলো। রিতু অনেকক্ষণ থেকে কোনো কথা বলছে না দেখে সে রিতুর কানে কানে বললো, এই তুই কথা বলছিস না কেনো? যাবি না।
যাবো।
চুপ করে আছিস কেনো?
শুনছি তো।
কিছু বলছিস না যে? মুড অফ।
সবাই বললে শুনবে কে?
ও তাইতো।
তরু এ বাড়িরই ছেলে তাই তার দায়িত্ব পড়েছে ঢাকা থেকে আগত মেহমানদের আপ্যায়ন, তাদের সিডিউল ঠিক করা এসবের তাই সে কখনো সবার সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে আবার কখনো কখনো ছুটে যাচ্ছে তার দায়িত্বের টানে। সে রুম থেকে বেরিয়ে মোড়ে গিয়েছিলো। তাই এতোক্ষণ সে ছিলো না।
বাইরের দরজা খোলা আছে। সে আসছে, শরতের হাল্কা কুয়াশা আর মেঘের সাথে চাঁদের লুকোচুরি খেলার মতো কখনো শুভ্র জোৎস্নায় আলোকিত আবার কখনো মেঘে ঢাকা তারার মতো স্তিমিত আলোকিত হয়ে। তরুর আসা নিশ্চিত হয়ে তিথি রিতুর থুতনিতে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, তরু আসছে না?
তাইতো মনে হচ্ছে।
তরু কাছে আসতেই তিথি জোরে চিৎকার দিয়ে বললো, হাই প্রিন্স ইউ আর সো লেট। প্লিজ বসুন। বলে সে রিতুর পাশের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করলো।
তরু রিতুর পাশের চেয়ারে বসলো।
রিতু ফিস্‌ফিস্‌ করে বললো, দ্বীপনগর চিনিস?
চিনবো না, জাহান ফুপুর বাড়ি।
তুই যাবি না?
হ্যাঁ।
তিথি পাশেই ছিলো সে রিতু আর তরুর কথা শুনে চাপাস্বরে বললো, বুকে একটা ফুঁ দে।
রিতু রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে বললো, তিথি টিজ করার জন্য এখনি সবাই তোকে…
তিথি তার ভুল বুঝতে পারলো, সরি রিতু। বিশ্বাস কর এবার আমি আসলে টিজ করিনি আমি বলতে চেয়েছিলাম সবাই মিলে না গেলে, হৈ চৈ না হলে আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যেতো। আর তোরা সবাই শুধু আমার টিজ করাটাই দেখিস।
তুলি সবার উদ্দেশ্যে বললো, এটেনশন প্লিজ।
সবাই আবার মনোযোগী হলো।
তুলি বললো, তোরা কেউ ইন্ডিয়া দেখেছিস?
সবাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো।
তিথি বললো, তুই খুব নাটক করতে পারিস?
কেনো? এটা আবার নাটকের কী হলো?
তিথি বললো, তুই জানিস না আমরা গ্রাম দেখতে এসেছি। আমরা তো গ্রামই দেখিনি তাহলে ইন্ডিয়া দেখবো কী করে, ঢাকা শহরের আশেপাশে তো আর বোর্ডার নেই।
তুলি বললো, সরি।
তরু বললো, তোরা যে দুনিয়াতে কী দেখেছিস?
তিথি বললো, কী দেখেছি মানে? সংসদ ভবন দেখেছি, আহসানউল্লাহ মঞ্জিল দেখেছি, লালবাগের বাশের কেল্লা দেখেছি। ভাসানি নভো থিয়েটার দেখেছি। তোদের দেখাগুলো এক ধরণের আর আমাদেরগুলো আরেক ধরণের।
তরু রিতুর দিকে তাকিয়ে বললো, তাই বলে এই বয়সেও গ্রাম দেখবি না, মেহেদি পাতায় কাঁটা থাকে কী না জানবি না, ধান গাছের তক্তা হয় কী না জানবি না, তোদের জীবন ষোল আনাই মিছে।
মানে? টনি জিজ্ঞেস করলো।
মানে সুকুমার রায়ের একটা কবিতা আছে ষোল আনাই মিছে। মানে পুরো জীবনটাই নষ্ট। বলে তরু তুলিকে বললো, এই তুলি কবিতাটা তোর মুখস’ আছে নাকি রে?
তুলি মাথা নেড়ে সায় দিলো।
তরু বললো, থাকবে না, এভারগ্রিন বয়ের যোগ্য নাতনি যে।
তিথি বললো, আচ্ছা তোরা বার বার এভারগ্রিন বয় কাকে বলছিস বলতো?
তরু বললো, এটা যার পরিচয় সেই দিবে।
তুলি বললো, তুইওতো যোগ্য নাতি হতে পারতিস।
আমার দরকার নেই ওসব আজাইড়া কাজ করার।
কী? দাদু আজাইড়া কাজ করে? এরকম একটা গ্রামে যেখানে দু’য়েকজন তরুণ-তরুণী ফেসবুক ব্যবহার করে, যে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ফেসবুক বলতে কিছু বোঝে না, অনলাইন সম্পর্কে যাদের তেমন কোনো ধারণাই নেই সে গ্রামে পঁচাত্তর বছর বয়সের একজন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে, গ্রামের ঐতিহ্য বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয় তার কাজকে তুই আজাইড়া বলছিস। জানিস আমি যদি দাদুকে বলে দিই তোকে কী করবে?
সরি আপা দাদুকে বলিস না। বলে তরু তুলির দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করলো।
ওকে। মাফ করে দিলাম। তবে আবার যদি কোনোদিন বলেছিস তো আমি কিন্তু আর তোকে মাফ করতে পারবো না। তোকে শাস্তি পেতে হবে।
ওকে। এখন ওদের একটু কবিতাটা শোনা।
তুলির কবিতা আবৃত্তি শুরু করতে দেরি হচ্ছে দেখে তিথি অধৈর্য হয়ে উঠলো, দেরি করছিস কেনো? আবার নাটক করছিস কেনো? তোর কবিতা আবৃত্তি তো খুব সুন্দর। সেই যে মেহেদি পাতা দেখেছো কখনো… কবিতাটা আবৃত্তি করলি মনে হয় এখনো মনের মধ্যে বাজছে কথাগুলো।
তুলি শুরু করলো,
ষোল আনাই মিছে
-সুকুমার রায়
বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে,
মাঝিরে কন, “বলতে পারিস সূর্যি কেন ওঠে?
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?’’
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে হাসে।
বাবু বলেন, “সারা জীবন মরলিরে তুই খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি।’’

খানিক বাদে কহেন বাবু, “বলতো দেখি ভেবে
নদীর ধারা কেমনে আসে পাহাড় থেকে নেমে?
বলতো কেনো লবণ পোরা সাগর ভরা পানি?
মাঝি সে কয়, “আরে মশাই অত কি আর জানি?’’
বাবু বলেন, “এই বয়সে জানিসনেও তা কি
জীবনটা তোর নেহাৎ খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি!’’
তরু কবিতা আবৃত্তির মাঝে বললো, এই যে তোরা অষ্ট আনা মানে জানিস? আনা মানেই তো জানিস না।
তিথি তার মুখে আঙ্গুল দিয়ে কথা না বলার জন্য ইশারা করলো আর তুলিকে ইশারা করলো আবৃত্তি চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
তুলি আবৃত্তি চালিয়ে গেলো।
আবার ভেবে কহেন বাবু, “বলতো ওরে বুড়ো,
কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চূড়ো?
বলতো দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহণ লাগে কেন?’’
বৃদ্ধ বলে, আমায় কেন লজ্জা দেছেন হেন?’’
বাবু বলেন, “বলব কি আর বলব তোরে কি তা,-
দেখছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।’’

খানিক বাদে ঝড় উঠেছে, ঢেউ উঠেছে ফুলে,
বাবু দেখেন, নৌকাখানি ডুবলো বুঝি দুলে!
মাঝিরে কন, “একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি,
ডুবলো নাকি নৌকা এবার? মরব নাকি আজি?’’
মঝি শুধায়, “সাঁতার জানো?’’-মাথা নাড়েন বাবু,
মূর্খ মাঝি বলে, “মশাই, এখন কেন কাবু?
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,
তোমার দেখি জীবন খানা ষোল আনাই মিছে!’’
কবিতা আবৃতি শেষ হতেই সবাই হাততালি দিলো।
রকি আবেগ আল্পুত হয়ে বললো, ইউ আর সো গ্রেট তুলি।
এই প্রথম তিথি তুলিকে সমর্থন দিলো, তুলির আবৃত্তির প্রশংসা করলো, অসাধারণ। তুমি খুব সুন্দর আবৃত্তি করো তুলি। আই এ্যাম ভেরি গ্লাড।
তুলি বললো, তাহলে আমরা কাল সকালে রওয়ানা দিচ্ছি।
ওকে।
তুলির মোবাইল ফোন বেজে উঠলো, একটু থাম প্লিজ! জাহান ফুপু ফোন করেছে।
তুলি ফোন রিসিভ করলো, হ্যালো ফুপু আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
তুলি কয়েকমুহূর্ত কানের কাছে ফোন রেখে দিলো তারপর কানের কাছ থেকে ফোন রাখতেই হারুন জোরে ডাক দিলো, তুলি সবাইকে নিয়ে আয়। খাবার রেডি।
তুলি বললো, আসছি আব্বু।

আঠারো

ঘন শালবন। এক দল এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় কিশোর-কিশোরী জঙ্গলের মেঠো পথ দিয়ে চলছে। কার কত প্রশ্ন, যেনো প্রশ্নের শেষ নেই। একটা উইপোকার ঢিবি দেখে তিথি জিজ্ঞেস করলো, এই রকি এটা কী বলতো?
রকি বললো, আমি জানি না।
তো? কে বলতে পারবে?
তরু বললো, এটা উইপোকার ঢিবি।
তিথি জিজ্ঞেস করলো, উইপোকা মানে?
তরু বললো, মানে এক প্রজাতির পাখি।
টনি বললো, দাঁড়া তোরা তো সবাই মূর্খ, আমি দেখছি বলে সে তার সাথে থাকা ট্যাব চালু করে উইপোকা লিখে সার্চ দিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো উইপোকার ছবিসহ জীবন বৃত্তান্ত। সে জোরে জোরে সবাইকে পড়ে শোনালো, উইপোকা একটি একটি ছোট পোকা। এর আয়তন এক ইঞ্চির দশ ভাগের এক ভাগ। উইপোকার শরীরে শক্ত খোলস পোশম নেই। উইপোকা দলবদ্ধভাবে গাছের বাকলে আড়ালে, ভিজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা কিংবা মাটির ঢিবি করে বসবাস করে।
সবাই হাততালি দিলো।
তিথি আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললো, ওয়াও।
সবাই আবার চলতে শুরু করলো। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তা একাধিক দিকে বিভক্ত হয়ে গেছে। রকি সবার সামনে দিয়ে হাঁটছিলো। সে পিছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, তুলি এখন কোন্‌ দিকে যাবো রে?
তিথি রকির পিছনেই ছিলো। রকি তুলির নাম উচ্চারণ করায় সে মুখ বিকৃত করে বললো, সেটা তুলি কী করে বলবে?
ও তাইতো। এই তরু বলে রকি ডান দিকের রাস্তাটা দেখিয়ে দিয়ে বললো, এই রাস্তাটা কোথায় গেছে রে?
তরু বললো, অনেকদূর। কিছুদূর যাওয়ার পর ধানক্ষেত। তারপর একটা আদিবাসী গ্রাম।
আদিবাসী?
তরু বললো, আদিবাসী চেনো না? সাঁওতাল।
তিথি কিছু না বুঝেই বললো, রকি চল আমরা ওদিকে যাই।
রকি জিজ্ঞেস করলো, আগে সবগুলো রাস্তার কথা শুনি।
তিথি কিছুটা জিদের ভঙ্গিতে বললো, আর কিছু শুনতে হবে না, আমি বলছি যাবো, তুই চল।
রকি এবার তরুকে বাঁ দিকে হাত দেখিয়ে বললো, এটা কোন্‌ দিকে গেছে?
তরু বললো, এটা কতদূর গেছে আমি জানি না। তবে আমার মনে হয় এটা গভীর বনে চলে গেছে, না যাওয়াই ভালো হবে।
রিতু তরুর কথাকে সমর্থন করলো, ঠিক বলেছিস। আমরা এখানে থাকবো।
তিথি বললো, তাই বলে জঙ্গল দেখতে এসে এখানে বসে থাকবো। ইম্পসিবল।
টনি তরুকে জিজ্ঞেস করলো, আর সোজা গেলে?
এটাও গভীর বনে গেছে। যাস না শেষে তোরা যদি পথ হারিয়ে ফেলিস তবে আর বের হতে পারবি না।
টনি তুলিকে জিজ্ঞেস করলো, তুই কোনোদিন এসেছিস জঙ্গলে? অনেকদূর গেলে বের হতে পারবি?
কোনোদিন আসিনি তবে মনে হয় বের হয়ে আসতে পারবো।
তিথি আবার টিজ করলো, তুই তো শিল্পী, পথ হারিয়ে ফেললে গান গাইবি তখন আমরা তোকে নিয়ে আসবো।
তুলি মুখ কালো করলো পরক্ষণেই হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললো, না, না তার প্রয়োজন হবে না, সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন আছে না?
ও তাইতো, বলে তিথি তার ছোট ব্যাগ হাতড়িয়ে দেখলো, আমার মোবাইল?
না তার কোনো ব্যাগ বা পকেটে মোবাইল ফোন নেই।
রকি তিথির ফোনে রিং দিয়ে বললো, রিং হচ্ছে তো। কয়েকবার রিং দেয়ার পর এক অপরিচিত নারী কণ্ঠ ফোন রিসিভ করলো। রকি তার ফোনটা তুলিকে দিয়ে বললো, কথা বলতো, মনে হয় তোদের বাড়িতে কেউ রিসিভ করেছে।
তুলি ফোনটা কানের কাছে নিয়েই বললো, হ্যালো চাচি।
তুলির চাচি ফোন রিসিভ করেছে, সে বললো, চাচি এটা তিথির ফোন চার্জ দেয়া শেষ হলে তোমার কাছে রেখে দিও। আর ওর বাড়ি থেকে যদি ফোন করে তবে বলো যে ওরা বেড়াতে গেছে।
আচ্ছা।
তিথি রকিকে বললো, চল, আমরা ঐদিকে যাই। বলে সে তরু যেদিকে গভীর জঙ্গল দেখিয়ে দিয়েছে সেদিকে যেতে বললো।
তুই না এদিকে যেতে চাইলি বলে রকি সাঁওতাল গ্রামের দিকে দেখিয়ে দিতেই তিথি বললো, না এখন আর ওদিকে যাবো না। আমি গভীর জঙ্গলের দিকেই যাবো।
তোরা আবার পথ হারাবি না তো? তোরা তো দু’জনে নতুন।
হারাবো না। আমরা যেতে পারবো। বরং তোরা এখানে থাক। আমরা জঙ্গল দেখতে এসেছি, জঙ্গলের গভীরে যাবো।
টনি আমরা- বলে তুলির মুখের দিকে তাকালো।
তুলি বললো, আমরা এখানেই থাকবো। আশে-পাশে, বেশিদূর গেলে আমার ভয় করবে। যদি পথ হারিয়ে ফেলি।
তরু বললো, আমি ভাবছিলাম সবাই একসঙ্গে বেড়াবো। কারণ আমিও জঙ্গলে দু’য়েকবার এসেছি মাত্র।
তিথি রেগে গেলো, তাহলে তোরা একসঙ্গে থাক, রকি চল আমরা যাই।
ওকে। বলে রকি আর তিথি চলে যাচ্ছিলো।
তরু বললো, কেউ যদি পথ হারিয়ে ফেলিস তবে ফোন করবি। আর সবাই ঠিক এই মোড়ে চলে আসবি। আর না হয় গাড়ির কাছে।
ওকে। বলে রকি আর তিথি চলে গেলো।
তরু বললো, রিতু, তুলি আয় এদিকে একটু বসি।
রিতু বললো, ওকে।
তরু আর রিতু হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে গেলো। টনি আর তুলি একটু পিছনে হাঁটছে টনি আর তুলি, কিছুদূর যাবার পর একটা ছোট্ট মাঠ। মাঠ বললে ভুল হবে একটু ফাঁকা জায়গা। তার পাশেই একটা গাছ প্রকৃতির খেয়ালে বাঁকা হয়ে, আধ শোয়া হয়ে বেড়ে উঠেছে। তরু আধ শোয়া গাছের ওপর উঠতে যাচ্ছিলো। রিতু একরকম আঁতকে উঠলো, উঠবি না, পড়ে যাবি তো।
তরু একটু হাসলো, এটুকু গাছের ওপর থেকে পড়ে যাবো, এর চেয়ে কত বড় বড় গাছে উঠেছি বলে সে আধ শোয়া গাছের ওপর উঠে বসে টনির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।
টনি না সূচক মাথা নেড়ে বললো, না আমার ভয় করে।
এটুকু গাছে উঠতে পারবি না। এই গাছে তো তুলিই উঠতে পারবে, তুলি? বলে তরু তুলির দিকে তাকাতেই তুলি এক লাফে গাছে উঠলো।
টনির মুখ শুকিয়ে গেলো। তার বুক ধুকধুক করে উঠলো, তুলি তুই নেমে আয়। পড়ে যাবি, নেমে আয় প্লিজ!
তুলি বললো, কিচ্ছু হবে না। আমি এ গাছের ডালে ডালে যেতে পারবো।
টনি জিদ ধরে বললো, না, না তোকে আর ডালে যেতে হবে না, নেমে আয়।
একটু থাম্‌, তোর কয়েকটা ছবি তুলি বলেই রিতু তার মোবাইল ফোন দিয়ে তুলির ছবি তুললো।
রিতু তুই উঠবি? বলে তরু রিতুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।
না, আমার ভয় করছে।
কীসের ভয়, আমি তোকে বলেছি না, আমি আছি ভয় নেই।
রিতু কিছুটা তিরস্কারের সুরে বললো, বাহ্‌, ভালো বলেছিস, আমি গাছ থেকে পড়ে গেলে তুই আমাকে কী করবি, শুনি? বলেই সে হেসে ফেললো।
তুই পড়ে যাবি কেনো? আমি তোকে হাত ধরে টেনে তুলবো। পাশে বসিয়ে রাখবো। বলে সে আবার হাত বাড়িয়ে দিলো।
তুলি বললো, ঠিকই বলেছে তরু খুব রিলায়েবল। একবার তোর হাত ধরলে আর কোনোদিন ছাড়বে না।
রিতু অদ্ভুত ভঙ্গিতে তরুর দিকে তাকিয়ে বললো, রিয়েলি?
একবার হাত বাড়িয়েই দেখো।
রিতু তার মোবাইল ফোনটা টনির হাতে দিয়ে বললো, তুই আমাদের কয়েকটা ছবি তুলবি তো। বলে সে তরুর বাড়ানো হাতের দিকে হাত বাড়াতেই তরু রিতুর হাত ধরে তাকে টেনে গাছে তুললো। তাকে পাশে বসিয়ে তার বাহুতে হাত রেখে বললো, এখনো ভয় করে?
রিতু না সূচক মাথা নাড়লো।
তরু বললো, সুকুমার রায় ঠিকই বলেছে তোদের জীবন আসলে ষোল আনাই মিছে।
হোক, মিছে হোক, তবু গাছে উঠে আমার কাজ নেই, বলে সে তুলির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো, তুই গান গাইবি।
তুলি গাছ থেকে নেমে বললো, আচ্ছা।
তরু বললো, তুলি গান গাইতে গাইতে যেনো দূরে যাস না। আমরাও যেনো তোর গান শুনতে পাই।
ওকে ভাইয়া।
তরু আর তুলি সমবয়সী সাধারণত কেউ কাউকে ভাইয়া বা আপা বলে না। এখন আপা বলায় প্রথমে তরু হেসে উঠলো তারপর সবাই তার সঙ্গে হাসিতে যোগ দিলো।

উনিশ

রকি আর তিথি জঙ্গলের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটছে আর মাঝে মাঝে ছবি তুলছে কখনো অপরূপ প্রকৃতির, কখনো গাছপালা-লতাপাতার আবার কখনো সেলফি তুলছে নিজেদের এই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলোর। এমনিভাবে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে তারা পথ হারিয়ে ফেলেছে দু’জনের কেউ-ই বুঝতে পারেনি। অনেকক্ষণ এভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়াবার পর তিথি রকির কাঁধের ওপর একটা হাত রেখে বললো, এই আমরা কোথায় যাচ্ছি?
রকি বললো, আমি তো সেকথা চিন্তা করিনি। আমাদের ফিরে যাওয়া দরকার। চল, যেদিক থেকে এসেছি সেদিকে ফিরে যাই।
কিন্তু ফেরার রাস্তা কোন্‌ দিকে?
রকি সামনের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, এদিকে।
তিথি রকির আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, গাধা ওদিকে তো আমরা যাচ্ছি। বলে সে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, আমি যেদিকে বলি সেদিকে চল। আমার মনে আছে। আমরা এদিক দিয়ে এসেছি।
রকি কিছুটা রেগে গেলো, সেজন্য আমি আসতে চাইনি। তরু ঠিকই বলেছিলো সবাই একসঙ্গে থাকতে।
তিথিও রেগে গেলো, এখন সব দোষ আমার! তুই আসতিস না, আমি একাই আসতাম।
একাই আসতিস না? দু’জনে এসেও পথ হারিয়ে ফেলছি আর তুই একাই আসতিস না?
সঙ্গে এসেছিস সেজন্য তোকে ধন্যবাদ। এখন কথা বলিস না।
কয়েকমুহূর্ত কারো মুখে কোনো কথা নেই। তিথি গাছের ডালে একটা সুন্দর পাখিকে ঠোকর মারতে দেখে বললো, ওয়াও, রকি দেখ্‌ দেখ্‌ একটা সুন্দর পাখি।
রকি মাথা উঁচু করে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বললো, কোথায়?
তিথি রকির মাথা ঘুরিয়ে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বললো, ঐযে গাছের ডালে, দেখতে পাচ্ছিস? কী সুন্দর না?
ওয়াও। খুব সুন্দর তো। দাঁড়া একটা ছবি তুলি বলে রকি তার মোবাইল ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুললো।
তিথি বললো, দেখছিস, আমি যদি তোকে না নিয়ে আসতাম তবে তুই এতো সুন্দর একটা পাখি দেখতে পেতিস না। থ্যাঙ্কস বল।
রকি বললো, থ্যাঙ্কস ফ্রেন্ড।
তিথি জিজ্ঞেস করলো, কী নাম পাখিটার জানিস?
না।
তিথি দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, এটা পাখির নাম জানিস না তুই? এটা ময়ূর।
রকি বললো, তুই যেভাবে বললি তাতে মনে হলো তুই জানিস, আসলে এটা ময়ূর না।
কী তাহলে?
আমিও জানি না। তবে এটা ময়ূর না এটা আমি কনফার্ম।
তুই তো কিছুই জানিস না। তুই ময়ূরটাকেও চিনিস না। এটা ময়ূরের বাচ্চা।
আচ্ছা থাক। তুই যখন এটাকে ময়ূর বলছিস তখন আমার কিছু বলার নেই। আগে বাসায় যাই। তারপর বই দেখে তোকে আমি ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দিবো।
ওকে।
ওকে চল বলে দু’জনে হাঁটতে শুরু করলো।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর তিথি জিজ্ঞেস করলো, ক’টা বাজে রে দেখতো?
রকি সময় দেখার জন্য তার মোবাইল ফোন বের করলো। ফোন হাতে নিয়েই সে মুখ কালো করলো, ও মাই গড, ফোন অফ!
তিথির মুখ শুকিয়ে গেলো, হোয়াট?
চার্জ নেই মনে হয় বলে রকি বার বার ফোন অন করার চেষ্টা করলো কিন্তু ফোন আর চালু হলো না। দু’জনেরই মুখ শুকিয়ে গেলো, এখন!
তিথি রকির কাঁধে একটা হাত রেখে বললো, চল একটু বসি, আমি আর হাঁটতে পারছি না।
রকি বললো, আমিও।
দু’জনে ঘাসের ওপর বসলো।
কারো মুখে কোনো কথা নেই। এই ক্ষণিক আগের হাসি-খুশি মুখে এখন দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা। তিথি কান্না কান্না গলায় বললো, ফোনে চার্জ আছে কী না তুই সকালবেলা দেখবি না?
মনে ছিলো না।
তিথির গলায় উত্তেজনা, কেনো মনে ছিলো না? কেনো?
রকি বললো, তোর যেমন মোবাইল ফোন নিয়ে আসার কথা মনে ছিলো না তেমনি আমারো সকালবেলা ফোন চার্জ দেয়ার কথা মনে ছিলো না।
কী হবে এখন? আমরা কীভাবে এখান থেকে বের হবো।
তিথি প্লিজ একটু শান্ত হ, ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভেবে দেখি, কী করা যায়।
তিথি আবারো উত্তেজিত হলো, কী করবি তুই? আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে, আমি আর হাঁটতে পারছি না। যদি এখান থেকে বের হতে না পারি…
তিথি প্লিজ তুই একটু চুপ করবি।
আমি তো চুপ করে থাকতেই চাই কিন্তু…
রকি বললো, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।
তিথি কৌতূহলী দৃষ্টিতে রকির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী বুদ্ধি?
জোরে জোরে টনির নাম ধরে ডাকবো।
তিথির মুখ উজ্জ্বল হলো, ওয়াও। গুড আইডিয়া। এমনি আমি তোকে আইডিয়ালিস্ট বলি। তোর মাথায় আসলে বুদ্ধি আছে বলে সে রকির মাথায় একটা ঠোকা মারলো।
রকি টনি, তরু বলে পর পর কয়েকবার জোরে ডাক দিলো। কিন্তু কোনো সাড়া মিললো না। রকি আবারো টনি টনি বলে ডাকতে শুরু করলো কিন্তু কারো সাড়া না পেয়ে তিথিকে বললো, চল, এখানে বসে থেকে ডাক দিলে হবে না। চল আমরা যেদিক থেকে এসেছি ডাকতে ডাকতে সেদিকে যাই।
ওকে।
দু’জনে উঠে দাঁড়ালো।
রকি তিথির একটা হাত ধরে যেতে শুরু করলো, তিথি বললো , এদিকে কেনো?
আমরা এদিক দিয়ে এসেছি না?
না, বলে তিথি অন্যদিকে হাত দেখালো।
রকি সূর্যের দিকে তাকিয়ে বললো, দেখ্‌ আমরা যখন এসেছিলাম তখন সূর্যটা আমাদের ডান দিকে হেলে ছিলো আর এখন বাম দিকে।
এক্সাক্টলি। আমরা এসেছিলাম সকালে এখন কি সকাল?
রকি বললো, ওকে চল, তুই যেদিকে যেতে চাস সেদিকেই চল। বলে রকি আবার টনি… বলে ডাকতে শুরু করলো।

সবার একত্রিত হওয়ার কথা ছিলো দুপুর একটা মধ্যে কিন্তু এখন বেলা দু’টা বাজে কিন্তু রকি আর তিথি ফিরে এলো না। প্রথমে সবাই স্বাভাবিক মনে করেছিলো কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা থেকে বার বার ফোন করে যখন ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। তখন সবার মুখ শুকিয়ে গেলো। তরু জোরে রকি রকি বলে ডাকতে শুরু করেছে কিন্তু তাদের কোনো সাড়া মিলছে না।
রিতু কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, এখন কী হবে? ওদের যদি না পাওয়া যায়?
তরু কিছুটা ধমকের সুরে বললো, রিতু এমন কথা বলিস না তো। দেখ্‌ কোনো একটা ব্যবস’া হবেই। আমার মনে হয় ওরা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে, খুঁজে খুঁজে ঠিকই আসবে।
কীভাবে আসবে? ওরা তো কোনোদিন জঙ্গলে আসেনি।
আমরা যেমন খুঁজছি, ওরাও তেমনি আমাদের খুঁজছে। আমি একটা কথা বলি?
সবাই তরুর দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো।
তুলি আর রিতুকে মাইক্রোবাসের কাছে রেখে আসি আর আমরা দু’জন আবার জঙ্গলে ঢুকে জোরে জোরে নাম ধরে ডাকি। এখানে বসে থেকে তো অনেকবার ডাকলাম। মনে হয় ওরা অনেক দূরে আছে সেজন্য ওরা আমাদের ডাক শুনতে পাচ্ছে না।
তুলি বললো, তাহলে আমরাও সঙ্গে থাকলে অসুবিধা কী।
রিতু শুষ্ক মুখে বললো, আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। আমি আর হাঁটতে পারবো না।
তরু একটা শুষ্ক হাসি হাসলো, ও তুই তো আবার হাই ব্রিড।
রিতু বললো, মানে?
মানে হাই ব্রিড পোল্ট্রি মুরগী যেমন কষ্ট সহ্য করতে পারে না, একটু বেশি গরম বা একটু বেশি ঠাণ্ডা হলেই ঝিমিয়ে পড়ে তেমনি।
ইয়ার্কি না?
ভেঙ্গে পড়ছিস কেনো? একটা ব্যবস’া হবেই। চল আগে তোদের মাইক্রোবাসের কাছে রেখে আসি।

বিশ

রকি কখনো টনি আর কখনো তরু বলে ডাকছে কিন্তু কারো কোনো সাড়া নেই এভাবে জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে আর জোরে ডাকতে ডাকতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার পা দু’টো যেনো শিথিল হয়ে আসছে। তিথি রকির কাঁধে ভর করে হাঁটছে। দু’জনে একটা মোড়ে এসে পৌঁছালো।
তিথি রকির কাঁধ থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে ধপাস করে নিচে বসে পড়লো, এটা সেই মোড় না? যেখান থেকে আমরা গেছিলাম?
রকি একবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে তারপর বললো, কীভাবে বলবো আমার কাছে তো সব রাস্তা, সব মোড়, সব গাছ একই রকম মনে হচ্ছে।
তিথি বললো, আমি আর পারছি না রকি, আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে, আমার খুব পানি খেতে ইচ্ছা করছে। আই নিড সাম ওয়াটার, আই নিড লাঞ্চ।
রকি একটা কষ্টের হাসি হাসলো, এখনো ইংরেজি। পশু-পাখিরা নিশ্চয়ই ইংরেজি বোঝে না। ওদের ভাষা আলাদা। আমি কনফার্ম, আমরা যদি ওদের ভাষা বুঝতাম তবে ওরা আমাদের সহযোগিতা করতো।
তিথি একটা কষ্টের হাসি হেসে বললো, এখনো ইয়ার্কি করছিস? এখন আমাদের জীবন বাঁচানোই কঠিন আর তুই আছিস ইয়ার্কি নিয়ে।
রকি আবার জোরে ডাক দিলো, তরু…
তিথি উঠে দাঁড়িয়ে রকির কাঁধের ওপর ভর করলো। রকি সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
হঠাৎ রকি চমকে উঠলো, তিথি!
বল।
দেখতো ওগুলো কী? ভল্লুকের মতো।
তিথির বুক কেঁপে উঠলো, আতঙ্কে তার মুখ শুকিয়ে গেলো। সে পেছন থেকে রকির গলা জড়িয়ে ধরে বললো, ও মাই গড। রকি আমার খুব ভয় করছে, প্লিজ এখান থেকে চল।
দু’জনে ভয়ে কাঁপছে। প্রাণীগুলো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। দু’জনের আতঙ্ক আরো বাড়ছে। তিথি বললো, চল আমরা কোথাও লুকাই।
দু’জনে রাস্তার পাশে একটু ঘন জঙ্গল দেখে লুকালো। প্রাণীগুলো সোজা রাস্তা দিয়ে তাদের অতিক্রম করলো। কিন্তু তাদের পেছনে থাকা কালো মানুষটি তাদের দেখে ফেললো। তার হাতে তীর ধনুক, মাথায় মাথাল দু’আঙ্গুলের ফাঁকে শালপাতার বিড়ি। সে সামনে এসে দাঁড়াতেই দু’জনের আতঙ্ক আরো বেড়ে গেলো। অজানা আশঙ্কায় হৃদপিণ্ড ধড়াস ধড়াস করে কাঁপছে।
তাদের আতঙ্ক দেখে সে আশ্বস’ করলো, আলোবেন বতর:আ বাবু, আলোবেন বতর: আ, অকয় কানাবেন আবেন দো? চেকাতেবেন হেচ্‌ এনা ননডেদো? অকাতে বাংবেন চালা:কানা? (ভয় নেই বাবু, ভয় নেই। তোমরা কে? এখানে কীভাবে এলে? এখন কোথায় যাবে?)।
লোকটি যখন কথা বলছিলো তখন তার নাম-মুখ দিয়ে বিড়ির ধোঁয়া বের হচ্ছিলো। রকি তিথির দিকে তাকালো। তিথির চোখ-মুখ থেকে আতঙ্ক কমছে না। নাকের কাছ থেকে ধোঁয়া সরিয়ে সে রকির শার্টের কলার চেপে ধরে বললো, না, তুমি কথা বলবে না। আমার খুব ভয় করছে, যদি কিছু হয়ে যায়।
রকি বললো, না তিথি, দেখে আমার তা মনে হচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে এই লোকটি আমাদের জন্য হেল্পফুল হবে।
রকি আর তিথির ঠোঁটে কাঁপুনির তীব্রতা দেখে সে বললো, আলোবেন বতর:আ বাবু, ইঞা: ত্রু:তুম দ ফিলিপ মারন্ডী, জাত দ সাঁওতাল মেনখান মানওয়া গে। ইঞ দ বেন পাতিয়াউ দাড়েয়াঞা (ভয় নেই বাবু, আমার নাম ফিলিপ মারন্ডী, জাতে সাঁওতাল কিন্তু মানুষ। তোমরা আমাকে বিশ্বাস করতে পারো)।
ফিলিপের কথা দু’জনের কেউ-ই বুঝলো না। তবে অনুমান করতে পারলো যে সে তাদের জন্য হেল্পফুল হবে।
রকি উঠে দাঁড়ালো। তিথি রকির কাঁধে ভর করে দাঁড়ালো।
রকি বললো, আমার নাম রকি ওর নাম তিথি। আমরা জঙ্গল দেখতে এসেছি।
ফিলিপ মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো সে বুঝতে পেরেছে।
তারপর রকি তাদের আলাদা হওয়া এবং পথ ভুলে যাওয়ার ঘটনা শোনালো।
সবকিছু শুনে ফিলিপ বললো, আবেন দ আডি ভিতরী গাজাড়রেবেন বলোয়াকানা, আভি লাংগাবেন ঞেল: কানা। দেলা আলে ওড়া: সেচ সেনকাতে যা উভিচ। ওনা তায়নম গাড়িঠেন ইঞ্‌ সেটের কাবেনা নাহা: (তোমরা জঙ্গলের অনেক গভীরে চলে এসেছো। তোমাদের তো খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে। তোমরা আমার বাড়িতে চলো। তারপর আমি তোমাদের গাড়ির কাছে পৌঁছে দিবো)।
তিথি আপত্তি করলো, না, না আপনি আমাদের মাইক্রোবাসের কাছে যাবার পথ দেখিয়ে দিন, প্লিজ!
হর ইঞ্চ উদু: আবেন খান্‌ আর হ হরবেন আদা নাহা:। দেলা ইঞ্‌ গেঞ্‌ ইদি সেটের কাবেনা। (পথ দেখিয়ে দিলে তোমরা যেতে পারবে না বাবু। আবার পথ হারিয়ে ফেলবে। চলো আমি তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি, তোমরা আমার সঙ্গে এসো), বলে সে সামনে চলতে থাকলো আর বিড়বিড় করে রকি আর তিথিকে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করতে শুরু করলো, আডি কাজাক বেন বতরলেনা বাং (তোমরা খুব ভয় পেয়েছিলে না)?
তিথির ভয় তখনো কাটেনি, সে একটা ঢোক গিলে রকির কানে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললো, আমার কিন্তু এখনো ভয় করছে, লোকটা আমাদের অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে না তো।
রকি তিথির কথায় গুরুত্ব না দিয়ে যেমন হাঁটছিলো তেমনিভাবে হাঁটতে হাঁটতে আম্‌তা আম্‌তা করে বললো, তা একটু পেয়েছিলাম।
আলোবেন বতর:আ বাবু, আলোবেন বতর:আ, নেতার দ গাজাড়রে জাহান বতর দ বানু: আ, যত বতর দ একেন শহর রে গে। (ভয় পাবে না বাবু, ভয় পাবে না, আজকাল জঙ্গলে কোনো ভয় নেই যত ভয় শহরে)।
রকি আর তিথি কোনো কথা বলছে না তার পিছু পিছু হাঁটছে কিন্তু সেদিকে ফিলিপের কোনো লক্ষ্য নেই। সে আপন মনে বিড় বিড় করে কথা বলছে আর হাঁটছে, মিতধাও ইঞ ঢাকা তেঞ চালাওলেনা। মিত্‌দিন আয়ুপ বেলাঞ ঞেল কেদা যে, থোড়াগান ছিনাতাইকারী, মিত হড় ছুরিতে কো সব: কেদেয়া আর টাকা কো ইদি কেত্‌ তায়া- শায় শায় হড়কো হিজু: চালা: কানা মেনখান অকয় ইঁ চেত হঁ বাকো রড় লেদা। নোয়া গাজাড় রে হোয়লেন খান নুই ফিলিপ মারন্ডী খান নোয়া আ: সারতে ওনকোয়া: কোড়াম ইঞ্চ্‌ তুঞ্চ পারম কেয়া। আড়ি আঁট রারা: সানা লেদিঞা বাবু, ঞিনদা ইঞ্‌রেন সুবোল এ মেতাদিঞা, আমদো তাড়া: তে চালাংমে। ঢাকারে দো বাম তাঁহে দাড়েয়া: আ আ্যাম দো। দোসার হিল: গেঞ হেচ্‌ এনা। আপেয়া: শহর মঁজ বাঞ আইকাউলেদা বাবু। আপেয়া: শহর বে যুদি দিন মাহারে শায় হড় সামাংরে হড়গে হড়কো গচদাড়ে লেখান। আর আলেয়া: নোয়া গাজাড়রে হেচকাতে বিঞ কিদিঞ আর জানোয়ার কো নাপায়তেকো বিদায়পে খান, অকাটা:দ বোগে হোয়া: আ বাবু? (আমি একবার ঢাকা গেছিলাম। সেদিন বিকেলে আমি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম একটা লোককে কয়েকজন ছিনতাইকারী ছুরি মেরে টাকা নিয়ে গেলো। অথচ পাশ দিয়ে শত শত মানুষ যাচ্ছে আসছে কিন্তু কেউ কোনো কথা বললো না। এই জঙ্গলে হলে…বলে সে ঘুরে তীর ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে বললো, এই ফিলিপ মারন্ডী হলে এই তীর দিয়ে ওদের বুক আমি ঝাঁঝরা করে দিতাম। আমার খুব কান্না পেয়েছিলো বাবু, রাতে আমার সুবল বললো, তুমি বাড়ি যাও বাবা। তুমি ঢাকা থাকতে পারবে না। আমি পরদিন চলে এসেছি। তোমাদের শহর আমার ভালো লাগেনি বাবু। তোমাদের শহরে যদি দিনের আলোয়, শত শত মানুষের সামনে মানুষ মানুষকে মারতে পারে আর আমাদের এই জঙ্গলে এসে সাপ-পোকামাকড়, হিংস্র প্রাণী যদি তোমাদের নিরাপদে ফিরিয়ে দেয় তবে কোন্‌টা ভালো বাবু?)
এতক্ষণে তিথির ভয় কেটেছে সে বললো, আপনি ঠিকই বলেছেন আঙ্কল।
হেচ সেটেরেনাবেন বাবু, হানে আবেনা: গাড়ি ঞেল:কানা (তোমরা এসে গেছো বাবু, ঐ দেখো তোমাদের গাড়ি দেখা যায়)।
তিথি আনন্দে লাফিয়ে উঠলো, ওয়াও।
তুলি অভিমানের সুরে বললো, তোরা এসেছিস তাহলে!
ফিলিপ বললো, নিত: দঞ রুয়াড়া বাবু, জোহার মামুনি, জোহার, জোহার (আমি আসি বাবু, আসি মামুনি, আদাব)।
তিথি বললো, না আপনি যাবেন না, তারপর তুলিকে বললো, তুই আমাদের কয়েকটা ছবি তোলতো, রকি আয়।
ফিলিপের দু’পাশে রকি আর তিথি দাঁড়ালো। তুলি ছবি তুললো।
রকি বললো, থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কল।
ফিলিপ আবার জোহার বাবু, জোহার মামুনি (আসি বাবু, আসি মামুনি) বলে চলে গেলো।
তিথি তুলির কাছে গেলো, তার দু’কাঁধে হাত রেখে চোখের দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো, তোর জেলাসি হচ্ছে? বলে সে আপনমনে হো হো করে হেসে উঠলো।
রাগে তুলির চোখ-মুখ লাল হয়ে গেলো। সে বললো, তা হবে কেনো? তোদের দু’জনের জন্য আমাদের কতক্ষণ থেকে টেনশন করতে হলো। আমরা তো ভেবেছিলাম তোরা হারিয়েই গেছিস?
রিয়্যালি। আমরা তো হারিয়েই গেছিলাম। ভাগ্যিস এক ফিলিপ আঙ্কল আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এলো।
রিতু মুচকি হাসি হেসে বললো, তাহলে তো ভালোই হয়েছিলো।
রকি রিতুকে ধমকের সুরে বললো, রিতু! তারপর বললো, বাদদে তো ওসব। টনি, তরু ওরা কোথায়?
তুলি বললো, ওরা তোদের খুঁজতে গেছে।
ওদের আসতে বল।
দাঁড়া আমি ফোন করছি বলে তুলি ফোন করলো।

একুশ

কালিয়াগঞ্জ হাট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ একপাশে ঘন বন আর অপর পাশে লোকালয় তারপর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা গ্রাম দ্বীপনগর। শুধু সীমান্ত ঘেঁষা বললে ভুল হবে। সীমান্তের ওপর বলাই যুক্তিসঙ্গত। গ্রামের তিন দিকেই ভারতীয় ভূখণ্ড শুধু উত্তর দিকে বাংলাদেশ ভূখণ্ড গ্রামটিকে ডিম্বাকৃতিতে ধারণ করেছে। এই গ্রামেরই শেষ বাড়িটি জাহানের। জানালা খুললেই ভারত।
মাইক্রোবাস যখন জাহানের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো তখন বিকেল চারটা বাজে। তরু সবার সঙ্গে জাহান আর আতাউরের পরিচয় করে দিলো।
জাহান রকির পাশে এসে দাঁড়ালো, ও বাবা তুমি রইসের বেটা না?
রকি জাহানের মুখে বেটা কথা শুনে একটা শুষ্ক হাসি হেসে সায় দিলো।
আর বেটি?
রিতু জাহানের পাশে গিয়ে ফিক করে একটা হাসি দিয়ে বললো, আমি।
জাহান আরো কথা বাড়াবে জেনে আতা তাড়া করলো, তুমি আগে খেতে দাও। তারপর কথা বলো।

খাওয়ার পর সবাই বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালো। তিথি কাঁটাতারের বেড়া দেখিয়ে রকিকে জিজ্ঞেস করলো, এই তরু কাঁটাতারের বেড়া কেনো রে ঐদিকে?
জাহান বললো, ওটা ইন্ডিয়া মা।
তিথি আনন্দে চিৎকার করে বললো, ওয়াও। তারপর দৌড়ে সেদিকে যেতে উদ্যত হচ্ছিলো।
তুলি হাত টেনে ধরলো, যাবি না। আগে ভালো করে শোন একবার হারিয়ে গিয়ে তুই আমাদের অনেক টেনশনে ফেলেছিলি এবার ইন্ডিয়া গিয়ে যদি আবার ধরা পড়িস তখন আরেকটা ঝামেলায় পড়বো আমরা।
তিথি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, তাতে কী হয়েছে একটা নতুন এক্সপেরিয়েন্স হয়েছে।
জাহান নিষেধ করলো, যেও না মা। কাঁটাতারের বেড়া দূরে হলেও বোর্ডার আরো কাছে বলে জাহান সামনে কয়েকফুট দূরে একটা সীমানা পিলার দেখিয়ে দিয়ে বললো, এই যে পিলারটা দেখছো ওটার ভিতরে বাংলাদেশ আর বাইরে ইন্ডিয়া।
আন্টি পিলারের ওপাশে যাওয়া যাবে না?
না মা।
তিথি কারো কোনো কথা শুনলো না, সে দৌড়ে সীমানা পিলারের বাইরে ভারতীয় ভুখণ্ডের কয়েকফুট ভিতরে গিয়ে আবার ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, দেখ তোরা কিন্তু যেতে পারলি না। আমি ইন্ডিয়া থেকে ঘুরে এলাম।
রকি তিথির একটা হাত চেপে ধরে বললো, ভেরি গুড, ইউ আর এ গুড গার্ল। কিন্তু এমন আর করিস না।
জাহান বললো, আর যেও না মা।
আতা মন্টু বলে জোরে ডাক দিতেই বাড়ির কাজের ছেলেটি চলে এলো, চাচা।
এখানে কয়েকটা চেয়ার এনে দে তো।
আচ্ছা।
মন্টু কয়েকটি চেয়ার এনে দিলো।
সবাই গোল হয়ে বসলো।
একেক জনের একেক রকম প্রশ্ন, ফুপু তুমি কখনো গেছো ইন্ডিয়ায়? রকি প্রশ্ন করলো।
না।
তিথি অবাক হয়ে গেলো, একবারো যাননি?
না।
যেতে ইচ্ছা করেনি আপনার?
করেছিলো, এদিকের অনেকেই যায় কিন্তু বাবা আমাকে নিষেধ করেছে। বাবা বলেছে বেআইনিভাবে ইন্ডিয়া যেতে হয় না। তাই ইচ্ছা করলেও আমার যাওয়া হয়নি।
তিথি বললো, আমি হলে যেতাম। আমার এখনই খুব যেতে ইচ্ছা করছে আর আপনি…
জাহান বললো, আমরা বাবা-মা’র কথা মেনে চলি মা। বলেই জাহান উদাস হয়ে গেলো, তোমার ফুপাকে দেখছো না, আমাদের বিয়ের পঁচিশ বছর হলো কোনো ছেলেমেয়ে হলো না। অনেকেই কত বলেছে আরেকটা বিয়ে করতে কিন্তু তোদের ফুপা করলো না তার মা নিষেধ করেছে বলে। বলতে বলতে জাহানের দু’চোখ পানিতে ভরে গেলো।
আতা ধমকের সুরে বললো, এদের এসব কথা বলছ কেনো? এরা ছোটো মানুষ।
জাহান আতার ধমককে পাত্তা দিলো না। আবার বলতে শুরু করলো, রইস আর আমি প্রাইমারি স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম। এস.এস.সি পাসের পর বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দিলো বলতে বলতে জাহান রিতুকে বললো, তোমরা আজ থাকো মা।
রিতু অপ্রস’ত হয়ে গেলো। সে একবার সবার দিকে তাকালো, তুলি ইশারায় না সূচক উত্তর জানালো।
তিথি বললো, ওয়াও গুড আইডিয়া।
রকি তিথির হাতে একটা চাপ দিয়ে বললো, না।
কেনো?
রকি বললো, তোর ফোন ছেড়ে এসেছিস। এতোক্ষণ কতবার তোর ফোন এসেছে জানিস?
তাতে কী। মাম্মিকে সরি বললে সব…
তরু বললো, না ফুপু দাদু রাগ করবে। বলে দিয়েছে রাতে সবাইকে নিয়ে বসবে।
আমি বাবাকে ফোন করে বলছি, জাহান বললো।
তুলি বললো, ফুপু ওরা কোনোদিন গ্রামে আসেনি। খুব কম সময়ের জন্য এসেছে। দাদু বলেছে ওরা যেনো অল্প সময়ের মধ্যে অনেককিছু দেখতে পারে।
তাতো বলবেই, বাবার তো সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি।
আতা বললো, তুমি বরং তাড়াতাড়ি চা করে নিয়ে এসো।
চা-চক্র শেষ হলো। সবাই মাইক্রোবাসে উঠবে এমনসময় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বরাবর উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠলো। সবাই একরকম চমকে উঠলো।
রিতু বললো, ফুপু কী হলো?
জাহান বললো, বোর্ডারের আলো জ্বলে উঠলো।
তিথি আবেগজড়িত কণ্ঠে বললো, ফ্যান্টাস্টিক। মানুষ খুব কনজারভেটিভ, এই বোর্ডারটা না থাকলে কী হতো, আমরা এখন যেতে পারতাম।
কথা বলতে বলতে সবাই জাহান আর আতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠলো। জাহান রাস্তায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে লাগলো।
তিথি আবার কথা বলতে শুরু করলো, আমার মনে হয় পৃথিবীতে মানুষ ছাড়া সবাই স্বাধীন।
রিতু বললো, মানে?
এই যেমন পশু-পাখিরা যদি এখনই মনে করে তারা ইন্ডিয়ায় যাবে চলে যেতে পারে তাদের কোনো সীমানা নেই। কিন্তু মানুষের যত বাধা।
তুলি বললো, আমিও তাই মনে করি মানুষের যত বাধা। শুধু কি ইন্ডিয়ার কাঁটা তারের বেড়া? কথা বলতে বাধা, কথা শুনতে বাধা, যেনো দুনিয়াতে নিজের মতো করে কিছু করতে গেলে বাধাই বেশি।
তরু গলা ঝেড়ে কিছুটা গম্ভীর হয়ে মুরুব্বিপনা কথা বললো, তোরা সব ঠিক বলছিস না, ভালো কাজে কোনো বাধা নেই যত বাধা মন্দ কাজে আর মন্দ কাজে মানুষের আসক্তি বেশি।
তুলি ইয়ার্কি করে বললো, তুই ঠিক বলেছিস দাদু ভাই।
সবাই হেসে উঠলো।

বাইশ

বাড়িতে এসেই তিথি আগে তার মাকে ফোন করলো, হ্যালো মাম্মি।
হ্যালো। মা কেমন আছিস? রুমানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো।
ভালো আছি মাম্মি। তুমি কাঁদছো কেনো?
রুমানা অভিামানের সুরে বললো, কেনো কাঁদছি, না? সকালে কথা বলে গেলি একবার মনে করলাম তোর সঙ্গে একটু কথা বলি। তোকে কতবার যে ফোন দিলাম তুই ফোন রিসিভ করছিস না। পরে জানলাম তুই জঙ্গল দেখতে গেছিস।
হ্যাঁ। মাম্মি সে এক ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার তোমাকে গিয়ে বলবো।
এসে কেনো এখনি বল।
জঙ্গলে গিয়ে আমরা হারিয়ে গেছিলাম।
মানে?
দ্যট মিনস আমরা জঙ্গল থেকে বের হবার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
তারপর-
তিথি রুমানাকে তাদের জঙ্গল থেকে বের হওয়ার কথা বললো। সবকিছু শুনে রুমানা বললো, একথা আর কাউকে বলবি না মা।
তিথি এতোক্ষণ আনন্দের সঙ্গে মা’র সঙ্গে কথা বলছিলো এবার সে একটু থমকে গেলো, কেনো মাম্মি?
এটা ভালো শুনায় না মা।
কেনো? আমরা জঙ্গলে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম একথা কাউকে বলা যাবে না কেনো?
বড় হলে বুঝবি মা। আর কোথাও যাস না মা, তাড়াতাড়ি চলে আয় সবাই মিলে।
ওকে মাম্মি তুমি কোনো চিন্তা করো না।
চিন্তা তো করতে চাই না মা। কিন্তু চিন্তা না করে কী থাকতে পারছি? তোকে আর আমি কোথাও একা যেতে দিবো না। বলতে বলতে রুমানার কণ্ঠস্বর আবার জড়িয়ে গেলো।
তিথি বললো, মাম্মি তুমি কাঁদছো! ওকে মাম্মি আমি আসছি এজ আর্লিয়েস্ট পসিবল।
ততক্ষণে সবাই ড্রেস বদলে আঙিনায় চেয়ার নিয়ে গোল হয়ে বসেছে। তুলির মা বললো, তুলি তোর দাদু তোকে দু’বার খুঁজেছে।
ও তাইতো। রিতু যাবি? এই রকি, টনি তোরা যাবি?
কোথায়?
দাদু ডেকেছে।
রকি বললো, তিথি আসুক।
তুলি বাঁকা চোখে রকির দিকে তাকিয়ে বললো, ও তোরা তো আবার ট্যাগ হয়েছিস।
সবাই হা হা হা করে হেসে উঠলো।
তিথি এলো, কী রে আমার নাম করে হা হা করে হাসছিস কেনো? আমি কনফার্ম তোরা আমাকে নিয়ে কিছু বলছিলি।
রিতু বললো, আরে না। তোকে নিয়ে কেউ কিছু বলবে এতো সহজ, আমি আছি না। চল দাদু ডেকেছে।
কথা বলতে বলতে সবাই লতিফ সাহেবের ঘরে ঢুকলো।
লতিফ সাহেব তখন ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। সবাইকে ভিতরে আসতে দেখে তিনি যেভাবে কাজ করছিলেন সেভাবেই মৃদু হেসে বললেন, ওয়েলকাম অল ইয়ংম্যান এন্ড ইয়ং লেডি।
তুলি বললো, থ্যাঙ্ক ইউ ইয়ং ম্যান।
তুলি লতিফ সাহেবকে ইয়ং ম্যান বলায় তিথি হেসে উঠলো।
লতিফ সাহেব একবার তিথির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করলেন, তোরা সবাই বস। আমি স্ট্যাটাসটা দিই। বলতে বলতে লতিফ সাহেব টাইপ করতে শুরু করলেন।
রকি, টনি রিতু, তিথি সবাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো।
রিতু তুলিকে জিজ্ঞেস করলো, মানে?
তুলি মুখে একটা আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলো, চুপ!
তিথি বলেই ফেললো, স্ট্যাটাস মানে? আপনার কি ফেসবুকে এ্যাকাউন্ট আছে নাকি?
ততক্ষণে লতিফ সাহেবের স্ট্যাটাস দেয়া শেষ হয়েছে। তিনি ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে বললেন, হ্যাঁ? সার্চ দাও দেখি বলে তিনি তার এ্যাকাউন্ট আই.ডি বললেন।
সবাই মোবাইল ফোনে লতিফ সাহেবের এ্যাকাউন্ট সার্চ দিলো।
তিথি প্রথম খুঁজে পেলো, ওয়াও। ইউ হ্যাভ এ লট অফ ফ্রেন্ড।
তরু রুমে ঢুকলো, ও তোরা সবাই ইয়ং ম্যানের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিস।
তিথি বললো, হি ইজ অলসো এন ইয়ং ম্যান।
তুলি হাসতে হাসতে বললো, আমিতো বলি এভারগ্রিন বয়।
রিতু বললো, ঠিকই বলিস।
তিথি বললো, এক্সাক্টলি।
তোরা সবাই নাস্তা খেয়েছিস।
তুলি একটা নি:শ্বাস টেনে বললো, সে সময় আর পেলাম কই। এভারগ্রিন বয় তো…
আমি ডেকেছি এইতো। ওকে, তরু তুই আমাদের জন্য নাস্তা নিয়ে আয় এখানে। আজ আমরা সবাই এখানে বসে নাস্তা করবো।
তুলি বললো, ফেসবুকে দাদুর একটা গ্রুপ আছে।
রিতু বললো, তোমার গ্রুপের নাম কী দাদু?
লতিফ সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ট্রেন টু ভিলেজ।
টনি সবার আগে গ্রুপে ঢুকে বললো, ওয়াও, খুব সুন্দর কভার তো। এতো সুন্দর ছবি আপনি কোথায় পেয়েছেন? জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ট্রেন…এটা কোথায় পেয়েছেন?
লতিফ সাহেব বললেন, আমার গ্রুপ মেম্বাররা পাঠিয়েছে। তাছাড়া বলে লতিফ সাহেব তুলির দিকে মুখ করে বললেন, তাছাড়া আমার ডার্লিং তো আছেই।
তুলি মৃদু হাসলো।
অসাধারণ মেয়ে, ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল, আবার নাচ, গান, কম্পিউটার, ইন্টারনেট বলে তুলির মাথায় আদর দিয়ে বললেন, মাই সুইট হার্ট।
এবার তুলি একটু লজ্জা পেলো, দাদু।
রকি বললো, ইওর কালেকশন ইজ ভেরি গুড। যেমন তোমার ট্রেন টু ভিলেজ তেমনি তুলি। আসলে তুলি আমাদের বাসায় না গেলে আর আমরা গ্রামে না এলে আমরা কোনোদিন জানতামই না যে এখানে তুলির মতো ওভার ব্রিলিয়ান্ট কোনো মেয়ে থাকতে পারে।
তিথি বললো, শুধু তুলির কথাই বললি, আর দাদু। দাদুকে না দেখলে কেউ জানবেই না যে এতো বয়সের একজন মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করে, শুধু ব্যবহার করে না, ফেসবুক ব্যবহার করে, ফেসবুকে গ্রুপ ওপেন করে।
লতিফ সাহেবের এ্যাকাউন্ট আই.ডি আর গ্রুপের নাম শোনার পর সবাই এখন ফোন নিয়ে ব্যস্ত। সবাই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো। গ্রুপে জয়েন করলো। লতিফ সাহেব সবার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করলেন, সবাইকে গ্রুপে এক্সেপ্ট করলেন।
নাস্তা চলে এলো।
লতিফ সাহেব সবাইকে নাস্তা নিতে বললেন। সবাই নাস্তা খেতে খেতে ফেসবুকে ব্যস্ত হয়ে পড়লো এবার তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন, প্লিজ এটেনশন মি।
সবাই মোবাইল ফোন থেকে মুখ তুললো কিন্তু তিথি যেমন মনোযোগ সহকারে ফেসবুকে চ্যাটিং করছিলো সে মুখ না তুলে তেমনিভাবে বললো, প্লিজ বলুন, ইয়ং ম্যান।
লতিফ সাহেব মৃদু অভিমানের সুরে বললেন, তিথি-
তিথি মুখ তুললো, ও সরি।
লতিফ সাহেব বললেন, ওকে। একটা কথা সবাই মনে রাখবি। সবচেয়ে ভালো ফ্রেন্ড যারা তোদের কাছের মানুষ যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদু-দাদি, কাজিন এরা। সামাজিক যোগাযোগ বলতে সেটা শুরু হবে ফ্যামিলি থেকে।
তিথি আবদারের সুরে বললো, দাদু প্লিজ।
রকি বললো, দাদু তিথি সরি বলেছে, ছেড়ে দাও।
তুলি মুখ বিকৃত করে বললো, তিথিকে বলছে দেখে তোকে লাগছে কেনো? এখন যদি বলি…
তিথি বললো, কী বলবি? বল?
তুলি বললো, না থাক।
লতিফ সাহেব সবাইকে থামতে বললেন, ওকে। এভরিথিং ইজ ওকে। আমি এখন তোদের ট্রেন টু ভিলেজ নিয়ে কিছু বলবো।
সবাই মনোযোগী হলো।
তোরা ঢাকা থেকে সবাই গ্রাম দেখতে এসেছিস। ভালো লাগছে তো তোদের?
তিথি সবার আগে জবাব দিলো, ভেরি ইন্টারেস্টিং।
সবাই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
কিন্তু এটাও ইন্টারেস্টিং যে তোরা এই চৌদ্দ পনের বছর বয়সে এই প্রথম গ্রাম দেখলি।
অফ কোর্স, আরো আগে দেখা উচিত ছিলো, রকি বললো।
টনি বললো, কিন্তু আমাদের তো গ্রামে কোনো রিলেটিভ নেই। আমরা কার কাছে আসবো?
লতিফ সাহেব বললেন, প্রবলেমটা এখানেই। খুঁজে দেখলে তোদেরও অনেক রিলেটিভ পাওয়া যাবে কিন্তু তোরা কেউ খুঁজতে চাস না। বরং ভুলতে চাস। আর সেটাই হয়েছে, তোরা ভুলতে চাইছিস, ভুলে গেছিস। আজ থেকে দুই বা তিন জেনারেশন আগে সবারই গ্রামে কোনো না কোনো রিলেটিভ ছিলো।
রকি বললো, তা হয়তো ছিলো।
অবশ্যই ছিলো। এই যে আমাদের রইস, রকির বাবার নাম বলায় রিতু আর রকি লতিফ সাহেবের মুখের দিকে তাকালো।
লতিফ সাহেব বলতে শুরু করলেন, রইস ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত গ্রামে থেকে লেখাপড়া করেছে। তারপর ঢাকা শহরে চলে গেছে, হায়ার এডুকেশন নিয়েছে, লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হয়েছে। তারপরও সে কয়েকবার গ্রামে এসেছে। কিন্তু সেটা রইস পর্যন্তই, তোরা বলে তিনি রকি আর রিতুর মুখের দিকে তাকালেন, তোরা এই প্রথম গ্রামে এলি। তোদের যখন ছেলেমেয়ে হবে তারা নিশ্চয়ই জানবে না গ্রামে তাদের কেউ আছে।
টনি মাথা নেড়ে সায় দিলো।
লতিফ সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন, এই যেমন টনি বলছে ওর গ্রামে কেউ নেই। এটাই বাস্তবতা যে রকি আর রিতুর ছেলেমেয়েরাও একদিন বলবে গ্রামে ওদের কেউ নেই। এমনিভাবে গ্রাম আর শহরের মানুষের মধ্যে একটা প্রাচীর তৈরি হয়েছে এবং এটা দিনে দিনে আরো উঁচু হচ্ছে। তোরা এখানে আসার আগে হয়তো ভাবতিস গ্রাম মানে নোংরা, কাদা, পুকুর, নদী, খাল জঙ্গল এসব, মানে ভয়ঙ্কর কিছু।
তিথি বললো, এক্সাক্টলি।
তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো কী। একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ আলু মাটির নিচে নাকি ওপরে ফলে, ধান গাছের তক্তা হয় কীনা জানতে চাইবে। গাছ থেকে বেগুন তুলতে গিয়ে কাঁচি নিয়ে ছুটে যাবে। একজন পরিপূর্ণ মানুষ সাঁতার জানবে না, পুকুর দেখে ভয় পাবে এই শিক্ষা অপরিপূর্ণ।
লতিফ সাহেব যখন কথা বলছিলেন তখন সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।
লতিফ সাহেব একটা দীর্ঘ নি:শ্বাস টেনে আবার বলতে শুরু করলেন, এই সোস্যাল নেটওয়ার্কের কথাই বল। সামাজিক যোগাযোগের জন্য ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে গিয়ে মানুষ যদি প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, দূরের মানুষ কাছে টানতে গিয়ে যদি কাছের মানুষ দূরে চলে যায় তবে তো সোস্যাল নেটওয়ার্কও ফেল করলো।
তিথি বললো, এক্সাক্টলি।
আমার ট্রেন টু ভিলেজের উদ্দেশ্যে গ্রাম আর শহরের মানুষের মধ্যে যেনো এই প্রাচীর তৈরি না হয়। মানুষে মানুষে কোনো তফাৎ নেই, গ্রাম কিংবা শহর, ধনী কিংবা দরিদ্র, ধর্ম কিংবা বর্ণ। মানুষ মানুষে কোনো তফাৎ নেই। কেউ এসি রুমে বসে সফটওয়ার আবিস্কার করে আর কেউ রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কৃষিকাজ করে তাদের খাদ্যের জোগান দেয়। সমাজে অবদানের দিক থেকে কৃষকের অবদানই বেশি অথচ কৃষক মানে আজকাল দরিদ্র, গ্রাম মানে জরা-বার্ধক্য। মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে আগামী প্রজন্মের মানুষ যেনো আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে সেজন্য গ্রামের অপার সৌন্দর্যকে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড ছড়িয়ে দেয়া। কথা বলতে বলতে লতিফ সাহেব হাঁপিয়ে উঠেছেন, তাঁর দু’চোখ পানিতে ছল্‌ছল্‌ করে উঠলো।
সবাই একবাক্যে বললো, আমরা আপনার ট্রেন টু ভিলেজকে ছড়িয়ে দিবো দাদু।
থ্যাঙ্কস এভরিবডি।
তুলি লতিফ সাহেবের কাছে গিয়ে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, এবার ক্ষান্ত হও বালক। তুমি ক্লান্ত।
তিথি বললো, ইউ আর সো টায়ার্ড।
লতিফ সাহেব দৃঢ় চিত্তে, বলিষ্ঠ কণ্ঠে আঙ্গুল উঁচু করে নজরুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তি করলেন, বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত, আমি সেই দিন হবো শান্ত।

তেইশ

তিনজনে এক বিছানায় শুয়েছে। আজ সারাদিন, না শুধু আজ সারাদিন নয়, এ’দিন খুব পরিশ্রম গেছে ওদের ওপর দিয়ে। সবাই একরকম ক্লান্ত। রিতুর একটু একটু ঘুমের তন্দ্রা এসেছে, তুলিও ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তিথির চলছে একের পর এক প্রশ্ন।
ক’দিন থেকেই ঢাক-ঢোল বাজছে। আগেও তিথির কানে এসেছে কিন্তু সে ভালোভাবে লক্ষ্য করেনি। আজ সেই বাজনা আরো বেড়েছে। তার কৌতূহলী স্বভাববশত: তুলিকে জিজ্ঞেস করলো, এই তুলি মিউজিক হচ্ছে নাকি রে?
তুলি মৃদু হেসে বললো, মিউজিক না, পূজার ঢোল বাজছে।
এদিকেও পূজা হয়!
হ্যাঁ, হবে না কেনো, বিলের ওপারে যে পাড়াটা আছে, ওটা হিন্দু পাড়া, ঐ পাড়ায় আমাদের অনেক আত্মীয় আছে।
রিতু জিজ্ঞেস করলো, আত্মীয়?
হ্যাঁ।
হিন্দু আর মুসলমানে আত্মীয় হয়?
কেনো হবে না। আত্মার সম্পর্কই তো আত্মীয়। আমরা ওদের বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠানে যাই, ওরাও আসে, ওদের পূজার সময় আমরা যাই আবার আমাদের ঈদের সময় ওরা আসে। তবে আর আত্মীয়তার বাকি থাকলো কী।
তিথি সায় দিলো, এক্সাক্টলি! এভরিবডি ইজ ইকুয়াল। তুই আগে বললে আজ পূজা দেখতেও যেতাম।
রিতু স্বীকার করলো, তুই ঠিকই বলেছিস, এভাবে তো কোনোদিন চিন্তা করিনি।
শেষ হয়নি তো, কালকেও যেতে পারবি। আগামীকাল বিজয়া দশমী।
বিজয়া দশমী কী?
বিজয়া দশমীতে হিন্দুরা তাদের দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দেয়।
তিথি জিজ্ঞেস করলো, তুই পূজা করতেও জানিস নাকি?
পুরোপুরি জানি না একটু একটু জানি।
তিথি তার মোবাইল ফোন বের করে আদিত্যকে ফোন করলো।
রিতু জিজ্ঞেস করলো, কাকে ফোন দিচ্ছিস?
ডেডিকে।
কেনো?
কাল যে পূজা, ডেডিকে জানাবো না।
কালকে জানাতে পারতিস। তোর সবকিছু বেশি বেশি।
তিথি তার বাবার সঙ্গে কথা বললো, হ্যালো ডেডি।
বল মা? এতো রাতে কেনো? এ্যানি প্রব্লেম?
না ডেডি। এদিকে দুর্গা পূজা স্টার্ট হয়েছে। কাল আমরা পূজা দেখতে যাবো।
ভেরি গুড। সাবধানে থাকিস মা।
ওকে ডেডি। ডেডি আমার না একটা এভারগ্রিন বয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।
আদিত্য কপালে চোখ তুলে বললো, এভারগ্রিন বয়!
হ্যাঁ। সেভেনটি ফাইভ ইয়ার্স ইয়ং ম্যান, টুয়েলভ ইয়ার্স গ্রিন বয়। আমরা ওর নাম দিয়েছি এভারগ্রিন বয়।
আমি তোর কথা বুঝতে পারছি না মা। একটু ক্লিয়ারলি বলতো।
আমরা যাদের বাড়ি এসেছি, তুলি। ওর দাদু সেভেনটি ফাইভ ইয়ার্স ওল্ড স্টিল হি ইজ এন ইয়ং ম্যান।
পাশে থেকে রুমানা জিজ্ঞেস করলো, কী বলছে তিথি। কী সব বয়, ইয়ং ম্যান শুনছি। আমাকে দাও তো, বলে রুমানা একরকম জোর করে আদিত্যর হাত থেকে মোবাইল ফোনটা নিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললো, এই কী হয়েছে রে? কী সব বয়, ইয়ং ম্যান, গ্রিন বয় বলছিস?
মাম্মি তুলির দাদু। হি ইজ সেভেনটি ফাইভ ইয়ার্স ওল্ড বাট স্টিল নাউ হি ইজ এন ইয়ং ম্যান। তুমি তার এক্টিভিটিজ জানলে অবাক হয়ে যাবে। সবাই তার নাম দিয়েছে এভারগ্রিন বয়।
আচ্ছা। ঠিক আছে এখন অনেক রাত হয়েছে, ঘুমা।
ওকে মাম্মি।
তিথি ঘুমালো না। সে আবার ফোন টিপতে শুরু করলো।
রিতু আবারো বিরক্তির সুরে বললো, আবার কাকে?
রকিকে বলবো না, একটা মেন্টাল প্রিপারেশনের ব্যাপার আছে না, শোন সবকিছুতে মেন্টাল প্রিপারেশনের প্রয়োজন আছে। আর কোনোকিছু এনজয় করার জন্য তো মেন্টাল প্রিপারেশন মাস্ট।
ওকে বল। তবে তাড়াতাড়ি শেষ কর।
ওকে। বলে সে রকিকে ফোন দিলো।
রকি ঘুমের মধ্যে ফোন রিসিভ করে বললো, হ্যালো কে বলছেন প্লিজ?
এই আমাকে চিনতে পাচ্ছিস না? ঘুমিয়েছিস নাকি?
রকি বিরক্তির সুরে বললো, হ্যাঁ ঘুমাচ্ছিলাম। দিলি তো ঘুমটা ভেঙ্গে। বল কী হয়েছে?
শোন কাল আমরা পূজা দেখতে যাবো। মেন্টালি প্রিপারেশন নে।
কেনো ওখানে গিয়ে আমাকে ফাইট করতে হবে?
রেগে যাচ্ছিস না। তোকে না বলাই ভালো ছিলো। দিলি তো আমার মেজাজটা বিগড়ে। মেজাজ বিগড়ে গেলে আমি সারারাত ঘুমাতেই পারবো না।
ওকে। ওকে সরি। এখন রাখি প্লিজ!
থ্যাঙ্ক ইউ।

চব্বিশ

পূজা মণ্ডপের সামনের পূজারি আর দর্শণার্থীদের ভিড় জমে উঠেছে। দূর থেকে এই নবাগতদের দেখে সবাই রাস্তা ফাঁকা করে দিলো। একটা গুঞ্জনের সৃষ্টি হলো, এই সরে দাঁড়া, সরে দাঁড়া।
কেউ কেউ বললো, কে এলো? নতুন মনে হচ্ছে?
মণ্ডপের কাছে যেতেই তিথি আনন্দে একরকম লাফিয়ে উঠলো, ওয়াও। ভেরি ইন্টারেস্টিং। এই রকি দেখ দেখ বলে তিথি পাশে তাকাতেই রিতু বললো, ওরা তো ছেলেদের লাইনে। এখানে ছেলেদের লাইন আর মেয়েদের লাইন আলাদা।
তিথি বললো, ও।
দূর থেকে টনি হাত নেড়ে জানালো, এই তুলি আমরা এখানে।
রকিও হাত তুলতেই তিথি বললো, হাই।
তিথি তুলিকে জিজ্ঞেস করলো, এই তুলি দুর্গার এতোগুলো হাত কেনো রে?
আমি জানি না রে।
তুলিকে দেখে একটা মেয়ে এগিয়ে এলো, তুলি, কখন এলি?
এইমাত্র এলাম। বলে তুলি বললো, সাবিত্রী তোকে পরিচয় করে দিই। বলতেই তিথি হাই বলে তার নাম বললো।
রিতু মিষ্টি হাসি হেসে বললো, আমি রিতু।
সাবিত্রী বললো, আদাব।
তিথি তুলিকে কাছে টেনে নিয়ে কানে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললো, আদাবের কী জবাব দিতে হয় রে।
তুলি বললো, আদাব।
তিথি সাবিত্রীর আদাবের জবাবে মাথা নত করে বললো, আদাব।
তুলি জিজ্ঞেস করলো, এই সাবিত্রী তুই কি জানিস দুর্গার এতোগুলো হাত কেনো?
সাবিত্রী দেবি দুর্গাকে লক্ষ্য করে দু’হাত একসঙ্গে করে শ্রদ্ধা জানিয়ে বললো, দেবী দুর্গা দুর্গতি নাশিনী। মানে সমস্ত দূর্গতি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য, সেজন্য দুর্গার অনেকগুলো হাত।
তিথি বললো, থ্যাঙ্কস।
এখন কয়েকটা ছবি তুলে নিই বলে তিথি তার মোবাইল ফোন বের করে ছবি তুলতে তুলতে বললো, এখান থেকে গিয়ে ছবিগুলো ট্রেন টু ভিলেজে আপলোড দিতে হবে।
সবাই পূজা মণ্ডপ থেকে বের হলো। মণ্ডপের সামনে মেলা বসেছে। হরেক রকম খেলনা, মুড়ি, মুড়কি, খুরমা, জিলাপি, পিঁয়াজিসহ বিভিন্ন ধরণের দোকান বসেছে।
তুলি কিছু কিনতে যাচ্ছিলো কিন্তু তিথি হাত টেনে ধরলো, এগুলো কিনবি না, নোংরা-ময়লা এগুলো খেলে যেকোনো ডিজিস হতে পারে।
তুলি হাসলো, কিচ্ছু হবে না। তোদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম সেজন্য এতো চিন্তা করিস, সবাই খাচ্ছে দেখিস কিচ্ছু হবে না। বলে তুলি মুচকি হাসি হেসে বললো, ধুলোবালি যাই থাকুক ফরমালিন তো আর নেই।
তিথি স্বীকার করলো, তা অবশ্য ঠিকই বলেছিস।
সাবিত্রী তাড়া করলো, তাড়াতাড়ি চল।
রিতু জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবো এখন তুলি?
সাবিত্রীদের বাড়িতে।
ওরা কোথায় বলে রিতু ডানে-বাঁয়ে একবার তাকালো তারপর হাত তুলে ডাক দিলো, এই রকি। আমরা এদিকে।
রকি, টনি আর তরু এলো।
রিতু রকিকে জিজ্ঞেস করলো, যাবি?
কোথায়?
সাবিত্রীদের বাড়িতে।
রকি বলার আগে তিথি উৎসাহের সঙ্গে বললো, অফকোর্স।
সবাই মেলা থেকে বের হলো।

মণ্ডপের অদূরে সাবিত্রীদের বাড়ি। মাটির দেয়ালের ওপর ছনের ছাউনি। সবাই বাড়িতে ঢুকতেই তিথি আনন্দে একরকম লাফিয়ে উঠলো, ওয়াও, ভেরি গুড।
তুলি জিজ্ঞেস করলো, কী?
তিথি ছনের ছাউনির দিকে দেখিয়ে দিয়ে বললো, এগুলোকে কী বলে তুলি?
তুলি বললো, ছন। ছনের ছাউনি।
এই রিতু দেখ, দেখ কী সুন্দর না? কটেজের মতো।
রিতু মৃদু হেসে বললো, এক্সাক্টলি।
সাবিত্রীর মা রান্না ঘরে কাজ করছিলো সবাইকে ঢুকতে দেখে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
তুলি বললো, আদাব পিসি।
সাবিত্রীর মা উঠানে একটা পাটি পেতে দিতে দিতে বললো, তোদের যে কী বসতে দিই মা। আমরা গরীব মানুষ।
তুলি বললো, এভাবে বলবেন না পিসি।
সবাই পাটিতে গোল হয়ে বসলো। তিথি আবার তুলিকে কাছে টেনে নিয়ে কানে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললো, পিসি কী রে?
তুলি মৃদু হেসে বললো, পিসি হলো ফুপু।
তিথি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, সাবিত্রীর মা তোর পিসি হয়! তোরা মুসলমান আর…দাঁড়া একটু মিলিয়ে নেই।
রকি তিথির দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে চাপাস্বরে বললো, তিথি! এতো কিউরিসিটি ভালো না।
সাবিত্রী প্লেটে করে নারিকেলের নাড়-, সন্দেশ, বাতাসি নিয়ে এলো।
সাবিত্রী বিনয়ের সঙ্গে বললো, প্লিজ স্টার্ট কর।
তিথি বললো, ভেরি নাইস। এই রকি আজ পিকনিক, পিকনিক মনে হচ্ছে না?
সবাই তিথির কথাকে সমর্থন করলো।

সবাই বের হয়ে যখন মণ্ডপের কাছে এলো তখন প্রতিমা বিসর্জনের প্রস’তি শুরু হয়ে গেছে। দুর্গাকে একটা গরুর গাড়িতে উঠানো হয়েছে, পিছনে নারী-পুরুষের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেছে। বিলের দু’পাশে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। হিন্দু-মুসলমান সবাই প্রতিমা বিসর্জন উপভোগ করছে।
সাবিত্রী বললো, এখানে দাঁড়া। এদিক দিয়ে নিয়ে যাবে আর বলে সাবিত্রী দূরে বিলের সামান্য স্রোতকে দেখিয়ে দিয়ে বললো, ওখানে বিসর্জন দিবে, বলতে বলতে সাবিত্রীর দু’চোখ পানিতে ছলছল করে উঠলো, কণ্ঠস্বর বুজে এলো।

পঁচিশ

বিদায়ের ঘণ্টা বেজে উঠলো। আগামীকাল সকালে সবাই ঢাকা ফিরবে। সন্ধ্যায় পূজা থেকে ফিরে সবাই লতিফ সাহেবের ঘরে গেলো। তিনি তখন একটা বই পড়ছিলেন। রিতু সবার আগে ছিল সে সালাম দিলো, দাদু আস্‌সালামুয়ালায়কুম।
ওয়ালেকুম আস্‌সালাম। ও তোরা এসেছিস, বস। তুলি কোথায়?
তরু তুলি বলে জোরে ডাক দিলো।
তুলি এলো, এভারগ্রিন বয়, বলো?
তোর হারমোনিয়াম নিয়ে আয় আজ একটু গান শোনা। অনেকদিন থেকে তোর গান শোনা হয় না।
তুলি চলে গেলো। তিথি তার মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। লতিফ সাহেব কিছুটা অভিমানের সুরে বললেন, হাই তিথি তারপর একটু হেসে বললেন, উই আর অলসো এ লট অফ ফ্রেন্ড ওয়েট ফর ইউ। প্লিজ এটেনশন।
তিথি মোবাইল ফোন থেকে মুখ তুলে বললো, সরি এভারগ্রিন বয়। ট্রেন টু ভিলেজে পূজার ছবি আপলোড দিচ্ছিলাম।
লতিফ সাহেব তার ল্যাপটপে দেখে বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ। খুব সুন্দর হয়েছে।
তুলি তার হারমোনিয়াম নিয়ে এলো। তরু মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সবাই গোল হয়ে বসলো।
তুলি হারমোনিয়ামে সুর তোলার আগে লতিফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো, ইয়ং ম্যান কোন্‌ গান?
তরু আমার ক্যামেরাটা নে। ভিডিও করবি বলে লতিফ সাহেব তরুর হাতে ক্যামেরাটা দিয়ে বললেন, ইয়েস র্স্টাট। আগে তোর পছন্দমতো দু’য়েকটা গান গা, তারপর আমার পছন্দে…
ওকে। বলে তুলি শুরু করলো লতা মুঙ্গেস্করের গান
আমি যে কে তোমার তুমি তা বোঝো না
আমি চিরদিন তোমারই তো থাকবো
তুমি আমার আমি তোমার
এ মনে কী আছে পারো যদি খুঁজে নাও
আমি তোমাকেই বুকে ধরে রাখবো
তুমি আমার আমি তোমার তুমি তা বোঝো না…
তুলির গান শেষে সবাই হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানালো।
গানের সুর শুনে তিথির বাবা-মা, চাচা-চাচি সবাই লতিফ সাহেবের দরজার সামনে ভিড় জমালো। লতিফ সাহেব জোরে ডাক দিলেন, হারুন, হাসিব, বউমা সবাই ভিতরে এসো।
তুলি একে একে কয়েকটা গান গাইলো আর সবাই হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিলো।
অনেকক্ষণ একটানা কয়েকটা গান গাওয়ার পর তুলি হারমোনিয়াম থেকে মুখ তুলে বললো, ইয়ং ম্যান তোমার পছন্দের…
লতিফ সাহেব বললেন, একটা আব্দুল আলীমের গান।
তুলি বললো, কোন্‌টা বলো?
লতিফ সাহেব বললেন, পরের জায়গা পরের জমি।
তুলি শুরু করলো, পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি লই
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।
এই ঘরখানা তার জমিদারি, আমি পাই না তাহার হুকুমজারি
আমি পাই না জমিদারের দেখা মনের দু:খ কারে কই
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।
গান শুনতে শুনতে লতিফ সাহেব উদাসীন হয়ে গেলেন, তার দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।
গান শেষ করে তুলি বললো, হাই ইয়ং ম্যান তুমি কোথায় চলে গেছো?
লতিফ সাহেব যেন তন্দ্রার মধ্যে পড়েছিলেন। তুলি কাছে গিয়ে কানের কাছে বললো, হাই ইয়ং ম্যান।
লতিফ সাহেব চমকে উঠলেন, হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস। আমি যেনো হারিয়ে গেছিলাম। গান শুনতে শুনতে আমি যেনো এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছিলাম।
তুলি একটা দুষ্টুমীর হাসি হেসে বললো, নিশ্চয়ই দাদির কাছে।
তিথি কৃত্রিম আশ্চার্যান্বিত হয়ে বললো, হোয়াট। ভেরি বেড ইয়ং ম্যান।
রিতু বললো, আমরা এখানে এতগুলো ফ্রেন্ড তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আর তুমি কী না…
লতিফ সাহেব কান্না জড়িত একটা হাসি হেসে বললেন, সরি, সরি এভরিবডি।
ওকে। এবার তুমি একটা গান শোনাও তুলি বললো।
টনি রকির কানে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললো, দাদু গান গাইতে পারে?
রকি ঠোঁট উল্টে বললো, কী জানি পারতেও পারে। এই বুড়ো তো দেখি সবই পারে।
লতিফ সাহেব একবার রকির দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকালো।
তুলি লতিফ সাহেবের দিকে হারমোনিয়াম এগিয়ে দিয়ে বললো, নাও এবার শুরু করো।
লতিফ সাহেব শুরু করলেন,
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।

কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়েছিলাম রাস্তার ধারে মাগো
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।
হাতে যদি থাকতো ছোরা
তোর ক্ষুদি কি পড়তো ধরা মাগো
রক্ত-মাংসে এক করিতাম
দেখতো জগতবাসী।

শনিবার বেলা দশটার পরে
জোজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি।
বারো লক্ষ তেত্রিশ কোটি
রইলো মা তোর বেটা বেটি মাগো
তাদের নিয়ে ঘর করিস মা
ওদের করিস দাসী।
দশ মাস দশ দিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে মাগো
তখন যদি না চিনতে পারিস
দেখবি গলায় ফাঁসি।
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।

গান গাইতে গাইতে লতিফ সাহেবের চোখের পানিতে সাদা দাড়ি ভিজে গেলো। তিনি গান শেষ করে কাশতে শুরু করলেন। তারপর কাশ থামিয়ে চোখ মুছে বলতে শুরু করলেন, আমি জানি তোরা কেউ ক্ষুদিরামের ইতিহাস জানিস না। ক্ষুদিরাম, মাস্টার দা সূর্যসেনসহ অসংখ্য মানুষ ভারত বর্ষের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের ইতিহাস আজ অনেকেই জানে না। অথচ মানুষের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার জন্য এসব ইতিহাস জানা অনেক ইমপোর্টেন্ট। ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। আমরা মনে করলাম আমরাও স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু না, আমরা স্বাধীন হতে পারলাম না। আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের পরাধীনতায় বন্দি হলাম। শুরু হলো মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য আন্দোলন। মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য জীবন দিয়েছি পৃথিবীর ইতিহাসে আমরাই প্রথম, আমরাই সেই গর্বিত জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। স্যালুট রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা সেই বীরদের।
কী দেশপ্রেম! ১৯৭১ সালে এদেশের মানুষ হালের পেন্ডি নিয়ে কামানের গোলার সামনে বুক পেতে দিলো। মা চোখের পানি মুছে সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিলো। গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমানের রক্ত একাকার হয়ে মিশে গেলো। কই সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিলো সেদিন তো রক্ত আলাদা হলো না। কারণ সেদিন কোনো হিন্দু মরে নি, কোনো মুসলমান মরেনি, কোনো খ্রিস্টান মরেনি। যারা সেদিন জীবন দিয়েছে তারা সবাই দেশপ্রেমিক। তোরাও সবাই দেশপ্রেমিক হবি। আজকাল দেশপ্রেমিক মানুষের খুব অভাব। কথা বলতে বলতে লতিফ সাহেবের দাড়ি গড়িয়ে পানি পড়তে লাগলো।
তুলি লতিফ সাহেবের কাছে গেলো। তার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললো, এভারগ্রিন বয়, তুমি তো সহজে চোখের পানি ফেলো না। তুমি তো নিজে বলো চোখের পানি ফেলতে নেই। মানুষকে চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। তুমি এখন সোজা হয়ে দাঁড়াও, তোমার ট্রেন টু ভিলেজে গ্রামের দৃশ্য আপলোড দাও। গ্রাম বাংলার শোভা, গ্রাম-বাংলার মানুষের কৃষ্টি-কালচার, বিশ্বময় ছড়িয়ে দাও। এখন তো আমরাও আছি তোমার সঙ্গে।
তিথি বললো, অফকোর্স, এখন আমরাও তোমার সঙ্গে আছি। আফটার অল ইউ আর অলসো আওয়ার ফ্রেন্ড।
রকি বললো, অফকোর্স। তুমি দেখো এখন থেকে আমরাও প্রতি বছর একবার করে গ্রামে আসবো।
লতিফ সাহেব আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললেন, শুধু আসবি না, গ্রামকে নিয়ে ভাববি, গ্রামের উন্নয়নের কথা ভাববি যে ট্রেনে তোরা এসেছিস এই ট্রেনে হেড লাইটের মতো তোদের শিক্ষার আলো আর প্রযুক্তির গতি দিয়ে গ্রামকেও শহরের আলোতে আলোকিত করে তুলবি।
টনি বললো, অবশ্যই দাদু।
রিতু বললো, তুমি দেখো, তুমি যে আশঙ্কা করছ গ্রাম আর শহরের মানুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একটা প্রাচীর তৈরি হচ্ছে সেটা আমরা হতে দেবো না। আমরা ঠিকই…
তরু ক্যামেরাটা আব্বুকে দে, তুইও দাদুর পাশে আয়, বলে তুলি সবাইকে নিয়ে লতিফ সাহেবের পিছনে এসে দাঁড়ালো।
সমাপ্ত

Facebook Twitter Email

চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। কবিতার পাশাপাশি সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে শুরু হলো ছোটগল্প, উপন্যাস লেখা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকলো কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস। প্রকাশিত হলো অমর একুশে বইমেলা-২০১৮ পর্যন্ত ০১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ০৪ টি কিশোর উপন্যাস, ০১ টি গল্পগ্রন্থ এবং ০১ টি ধারাবাহিক উপন্যাসের ০৩ খণ্ড। গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পাশাপাশি লেখা ছড়িয়ে পড়লো অনলাইনেও। লেখার শ্লোগানের মতো প্রতিটি উপন্যাসই যেন সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি ১টি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা-২০১৮।

Posted in উপন্যাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*